ফ্যানটার কথা মনেই ছিল না রবির। আগের ভাড়াটের এই একটা জিনিসই এখনও রয়ে গেছে ঘরে!
ঝট করে উঠে দাঁড়াল রবি। দৌড়ে পালাতে চাইল ঘরের বাইরে। তবে তাকে সে সুযোগ দেয়া হলো না!
আচমকা খুলে গেল ফ্যানের সবকটা পাখা। প্রচণ্ড বেগে সেগুলো ধেয়ে গেল রবির দিকে। ধারাল ব্লেডের উপর্যুপরি আঘাতে নিমিষেই চিরে ফালাফালা হয়ে গেল তার গোটা দেহ।
কেবলমাত্র একবারই গলা ফাটিয়ে চেঁচানোর সুযোগ পেল রবি। নীরব রাতে সেই চিৎকারটা অনেক দূর থেকেও স্পষ্ট শোনা গেল। বহু মানুষের ঘুম ভাঙিয়ে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়ল রবি!
ওরাকল
এক
দিগন্ত বিস্তৃত বনভূমি, মাঝে এক চিলতে খোলা জায়গা। বাওয়াদের সবচেয়ে বড় গ্রামটা এখানেই। গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়ানো কয়েক সারি কুঁড়েঘর। বাঁশের বেড়ার দেয়াল, মাথার উপর মাকানো পাতার ছাউনি। সবক’টা দেখতে অবিকল একই রকম।
প্রথম দর্শনে নিতান্ত নড়বড়ে মনে হলেও, ঘরগুলো আদতে বেশ পোক্ত। পাকা বাঁশের কঞ্চির ফাঁকে-ফাঁকে বেতের ডাল গুঁজে মজবুত করা হয়েছে দেয়াল।
আর রোদ-বৃষ্টি ঠেকাতে মাকানো পাতার ছাদের কোন জুড়ি যে নেই, সে তো সবারই জানা। একেকটা পাতা প্রায় এক মানুষ সমান লম্বা, প্রস্থেও নেহায়েত কম নয়। পরিণত পাতার প্রান্তের দিকে এক ধরনের আঠা তৈরি হয়। তাই সহজেই একটার সঙ্গে আরেকটা জোড়া লাগিয়ে আকার বাড়ানো যায়। আঠার কারণেই কি না কে জানে, পাতাগুলো বেশ পিচ্ছিল হয়। বৃষ্টির জল সহজেই গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে, লেগে থাকে না।
দার্শনিক অংরা, মাকানো পাতাকে বেশ পছন্দ করতেন। তাঁর ধারণা ছিল, মানব সভ্যতার বিকাশে এর বেশ বড় রকমের অবদান রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী, তাই মাকানো পাতাতেই আদিম মানুষ প্রথম চিত্র আঁকতে শুরু করে বলে মত প্রকাশ করে গেছেন তিনি।
বাওয়াদের ধারণাও নেই, এই বনের বাইরেও একটা জগৎ আছে, সেখানেও বাস করে মানুষ। দৃষ্টিসীমার ভিতরের পর্বত, নদী, অরণ্য, এসব নিয়েই বাওয়াদের পৃথিবী।
গ্রামটার নাম, সাসাকো। বাওয়া ভাষায় যার অর্থ দাঁড়ায়, নদীর কন্যা। গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা লানু নদীর কারণেই এহেন নামকরণ। তবে কন্যার প্রতি মাঝে-মাঝেই বিমাতাসুলভ আচরণ করতে দেখা যায় লানুকে। ভরা বর্ষায় যখন দু’কূল ছাপিয়ে প্লাবিত হয় লানু, তখন সাসাকোকেও সে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয় না। গোটা গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় তখন।
তবে লানুর মেজাজ-মর্জির খবর বাওয়ারা আগে থেকেই টের পেয়ে যায়। তাই তল্পিতল্পা গুটিয়ে অদূরের পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে পারে। খুব একটা ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না কখনওই।
বাওয়াদের জীবনযাত্রা খুব সহজ। দক্ষতার নিরিখে শ্রমবিভাগ গড়ে উঠেছে বাওয়া সমাজে। সবচেয়ে শক্তিশালী গড়নের পুরুষেরা যোদ্ধা হয়। গাঁয়ের সবার নিরাপত্তার ভার ওদের উপর। শিকারের মাধ্যমে সবক’টা মুখে আহার জোগানোর কাজটাও ওরাই করে।
অপেক্ষাকৃত দুর্বল পুরুষেরা সাধারণত শ্রমিক হয়। ঘরবাড়ি, অস্ত্রশস্ত্রসহ নিত্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিসপত্র নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়ভার তাদের।
মহিলারা মূলত ঘরের কাজেই ব্যস্ত থাকে। রন্ধনশৈলীর প্রদর্শন ছাড়া, সন্তান উৎপাদন এবং প্রতিপালনকেই তাদের প্রধান কাজ বলে গণ্য করা হয়। তবে যৎসামান্য কৃষিকাজের যে প্রচলন বাওয়া সমাজে আছে, সেটা মহিলারাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কৃষিকে চিরকাল অসম্মানের চোখেই দেখতে অভ্যস্ত বাওয়ারা।
গোটা সাসাকো জুড়েই আজ উৎসবের আমেজ। বাওয়াদের সবার মধ্যেই অন্যান্যদিনের তুলনায় খানিকটা বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য লক্ষ করা যাচ্ছে আজ। কালো-কালো মুখগুলো নিষ্পাপ হাসিতে উদ্ভাসিত, ভিতরের খুশি গোপন করার কোন চেষ্টাই করছে না সহজ-সরল মানুষগুলো। উৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সবাই, সূর্য ডুবলেই শুরু হবে মূল অনুষ্ঠান। আজ সন্ধ্যারাতেই সিংহাসনে আরোহণ করতে চলেছে সাসাকোর নতুন সর্দার। পূর্ববর্তী সর্দার শাংকুর ছেলে, কিকা। বাওয়ারা সবাই তাকে পছন্দ করে, এজন্য তাদের খুশিটাও পুরোপুরি নিখাদ প্রয়াত সর্দার শাংকুকেও ভালবাসত বাওয়ারা। নিজের মৃত্যুশয্যায় অধীনস্তদের চোখে শতভাগ অকৃত্রিম বিষাদ দেখতে পাওয়ার সৌভাগ্য সব শাসকের কপালে জোটে না। একশো সতেরো বছর বয়সে থুথুড়ে বুড়ো হয়ে মরার আগে সর্দার শাংকু সেটাই দেখে যেতে পেরেছে। দিন সাতেক আগে, ভর সন্ধ্যাবেলায় গোটা সাসাকোবাসীকে কাঁদিয়ে পরলোকগমন করেছে সে।
সেদিন থেকে গতকাল রাত অবধি তার জন্য শোক পালন করেছে বাওয়ারা। ভাগাড়ে থাকা পুরানো শুকনো খাবার খেয়ে থেকেছে, শিকারে যায়নি কেউই। মদ গেলেনি, সঙ্গম করেনি। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া অহেতুক ঢাকও বাজায়নি I কবরের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল গোটা সাসাকো জুড়ে। শিশুরাও বুঝতে পেরেছিল, অবস্থা বিশেষ সুবিধের নয়। তাই তারাও সারাক্ষণ বড়দের মত মুখ ভার করে রেখেছিল। যেন সব ক’জন সুবোধ বালক-বালিকা, চেঁচামেচি কাকে বলে জানেই না কেউ!
তবে আজ সকালে উৎসবের সপ্তাহ শুরু হওয়া মাত্রই ওরা চোখের পলকে আমূল বদলে গেছে, ফিরে গেছে ওদের চিরচেনা রূপে। এতদিন গোলমাল না করার শোধটা তুলে নিচ্ছে কড়ায়-গণ্ডায়। তাদের সম্মিলিত রণনিনাদের তোড়ে বড়দের কানের পর্দা ফাটার উপক্রম হলেও, আজ তাদের শাসন করতে এগিয়ে যাচ্ছে না কেউ। বরঞ্চ হাসিমুখে সহ্য করছে সমস্ত অত্যাচার। আজ উৎসবের দিন, আজ আনন্দের দিন। শাসন-বারণের নিয়মগুলো আজকের জন্য মুলতবী রাখা হয়েছে।
