মানুষটা আর কেউ নয়, স্বয়ং তৈমুর!
উন্মাদের দল মানসিক ভারসাম্য হারানোর পরও বর্ণ বৈষম্যের দোষটা কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে।
নিজেকে কিছুতেই আর নিবৃত্ত করতে পারলেন না ক্যাপ্টেন বায়রন; সাতপাঁচ না ভেবেই ছুটে গেলেন বাইরে। তাঁর সামনে একজন অসহায় মানুষকে খুন করা হবে, আর তিনি সেটা চেয়ে-চেয়ে দেখবেন, এটা একেবারেই অসম্ভব একটা ব্যাপার।
গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, দুর্বৃত্তদেরকে থামতে বললেন।
যে যার জায়গায় অনড় দাঁড়িয়ে রইল নগ্ন নাবিকের দল, শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে তাকাল ক্যাপ্টেন রবার্টের দিকে। চোখে অবিশ্বাসের দৃষ্টি, মুখে পিত্তি জ্বালানো হাসি। বৃত্তের পরিধি ভেদ করে একেবারে কেন্দ্রে পৌছে গেলেন ক্যাপ্টেন বায়রন, যত দ্রুত সম্ভব তৈমুরের বাঁধন খুলে দিতে চান।
তিনি কাছাকাছি পৌঁছনো মাত্রই তাঁকে হতবাক করে দিয়ে ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়াল তৈমুর। কীসের বাঁধন, সারাক্ষণ মুক্তই ছিল সে!
বজ্রাহত মানুষের মত ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন ক্যাপ্টেন রবার্ট; কী হচ্ছে এসব?
তাঁর প্রশ্নের জবাব দিতে স্বপ্রণোদিত হয়েই এগিয়ে এল ফার্স্ট মেট নেলসন। ‘তৈমুর আমাদেরই লোক, স্যর। আপনাকে বের করে আনার জন্য এটা একটা ফাঁদ ছিল। আপনাকে তো আর আমরা জোর করতে পারি না, তাই না? সেটা কি আমাদের পক্ষে শোভা পায়?
‘আমরা ঠিকই জানতাম যে, চোখের সামনে নরহত্যা ঘটতে দেখলে আপনি কিছুতেই আর আত্মগোপন করে থাকতে পারবেন না; নির্দ্বিধায় মানুষটাকে বাঁচাতে ছুটে আসবেন। এজন্যই এই ছোট্ট নাটকটা মঞ্চস্থ করতে হয়েছে আমাদেরকে।’
‘কেন? কী দরকার আমাকে?’ চিবিয়ে-চিবিয়ে বললেন ক্যাপ্টেন বায়রন, ঘৃণায় গা রি-রি করছে তাঁর।
‘এটা কি আপনাকে বুঝিয়ে বলতে হবে, স্যর?’ অবাক হওয়ার কাঁচা অভিনয় করল নেলসন। ‘দেবতা তাখাপোং-এর উদ্দেশে বলি দেয়া হবে আপনাকে। কারণ আপনিই সেই বেঈমান, যে সবকিছু জানার পরও দেবতাকে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
‘আমাকে হত্যা করলেই তোমাদের অপদেবতা তুষ্ট হবেন তোমাদের উপর?’ নিস্পৃহ স্বরে জানতে চাইলেন ক্যাপ্টেন। নিজের সম্ভাব্য পরিণতিটা বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন তিনি।
‘হয়তো হবেন, হয়তো হবেন না। এটাকে একটা জুয়া বলতে পারেন। কিন্তু এছাড়া অন্য কোন পথও তো খোলা নেই আমাদের সামনে।’
তৈমুরের দিকে ফিরে তাকালেন ক্যাপ্টেন। শীতল গলায় বললেন, ‘এই আইডিয়াটাও নিশ্চয়ই তোমার মাথা থেকেই এসেছে?’
দু’পাটি দাঁত বের করে হাসল তৈমুর, নিজেকে নিয়ে অহংকারের শেষ নেই তার। ‘একদম ঠিক ধরেছেন, স্যর। দেবতা তাখাপোং-এর ব্যাপারে আমার চেয়ে বেশি আর কে-ই বা জানে এখানে?’
ঘৃণাভরে তার দিকে একদলা থুতু ছুঁড়লেন ক্যাপ্টেন বায়রন। তবে তৈরি ছিল তৈমুর, চট করে নিচু হয়ে ধাবমান আঠাল তরলটার পথ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল সে।
দ্রুত বেঁধে ফেলা হলো ক্যাপ্টেনকে, তাখাপোং-এর মূর্তিটার সামনে মাথা নিচু করে বসতে বাধ্য করা হলো।
ভোজালি হাতে এগিয়ে এল তৈমুর; দেবতার সামনে জল্লাদ হিসেবে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে চায়।
শেষবারের মত মূর্তিটার দিকে ফিরে তাকালেন ক্যাপ্টেন বায়রন।
ভোজালির ধারাল প্রান্তটা তাঁর ঘাড় স্পর্শ করার আগপর্যন্ত একবারের জন্যও মূর্তিটার উপর থেকে চোখ সরালেন না তিনি!
খানিকক্ষণ পর একযোগেই ক্যাপ্টেন রবার্ট বায়রন এবং তাখাপোং-এর মূর্তিটাকে জলে ফেলা হলো। মূর্তিটা অক্ষত থাকলেও, ক্যাপ্টেনের শবটা ছিল মুণ্ডুহীন।
আর কখনও বন্দরে ফেরেনি সী-কুইন। তবে ওই তল্লাটের জেলেরা দাবি করে, এখনও নাকি রাত-বিরেতে মাঝেমধ্যে সী-কুইনের দেখা মেলে!
একদল গলাকাটা নগ্ন নাবিক পরিচালনা করে জাহাজটাকে। মাস্তুলের সাথে শিকল দিয়ে বাঁধা থাকে কালোমতন একজন মানুষ।
আর একের পর এক আদেশ দিয়ে সবাইকে সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত করে রাখেন, স্বয়ং ক্যাপ্টেন রবার্ট বায়রন!
চিলেকোঠা
এক
অপেক্ষা ব্যাপারটা ঠিক উপভোগের বিষয় নয়, আর রবির কাছে সেটা রীতিমত অসহ্য। চিরকালই চঞ্চল স্বভাবের ছেলে সে, ধীরস্থির হয়ে কোন কাজ করাটা তার ধাতে নেই। এজন্য প্রায়ই তাকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তবে এতে করে তার স্বভাব পরিবর্তন হয়নি এতটুকুও।
এই যেমন এখন, নির্দিষ্ট সময়ের আধঘণ্টা আগে হাজির হওয়ার মাশুল গুনতে হচ্ছে তাকে। অপেক্ষা করতে হচ্ছে, কখন ডাক আসে ডা. নোরার চেম্বার থেকে।
ডা. নোরা একজন সাইকিয়াট্রিস্ট। মনোবিজ্ঞানের উপর বেশ কয়েকটা বিলেতি ডিগ্রী আছে তাঁর। ওগুলোর নামগুলোও বেশ কঠিন, উচ্চারণ করতে রীতিমত দাঁত ভেঙে যাবার উপক্রম হয়। প্রতিদিন দশজনের বেশি রোগী দেখেন না নোরা। আর ভাগ্যের ফেরে সর্বশেষ নাম্বারটিই জুটেছে রবির কপালে।
ডা. নোরার অ্যাসিস্টেন্ট তাকে একাধিকবার বলে দিয়েছিল, সন্ধ্যা ছয়টার আগে তার সিরিয়াল আসার কোন চান্সই নেই। বরং আরও দেরি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মানসিক সমস্যা নিয়ে আসা মানুষজনের কার কতক্ষণ সময় লাগবে, তা কি আর আগে থেকে ঠাওর করা যায়?
তবুও স্বভাবসুলভ চপলতায় কাঁটায়-কাঁটায় ঠিক সাড়ে পাঁচটায় এসে হাজির হয়ে গেছে রবি। যদিও এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে, কাজটা মোটেও ঠিক করেনি সে। ছয়টার পরে এলেই ভাল করত।
