প্রথমে হালকা গালিগালাজ দিয়ে শুরু হলেও, ক্রমেই ব্যাপারটা হাতাহাতিতে গড়াল। যে যাকে পারছে, মারছে। সেই সাথে অনবরত বর্ষিত হচ্ছে ছাপার অযোগ্য সব খিস্তি-খেউড়!
এক দঙ্গল পাগলের ধুন্ধুমার কাণ্ডে অল্পক্ষণের মধ্যেই গোটা জাহাজ নরক গুলজার হয়ে উঠল। চেঁচামেচিতে অতিষ্ঠ হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন ক্যাপ্টেন বায়রন। খোলা ডেকে পা রাখা মাত্রই রীতিমত হতভম্ব হয়ে পড়লেন তিনি। নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তাঁর! কী দেখছেন এসব?
ইতোমধ্যেই শরীরের সমস্ত পোশাক-পরিচ্ছদ বর্জন করেছে নাবিকেরা, পুরোপুরি নগ্ন এখন সব ক’জন!
হাতের কাছে যে যা পাচ্ছে, তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারছে অন্যদের দিকে; কোনরকম বাছবিচার করছে না।
এদিক-ওদিক হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে বেশ কয়েকজন উলঙ্গ নাবিক। বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে, খোদা মালুম!
ক্যাপ্টেনের দিকে চোখ পড়া মাত্রই তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল একজন খালাসী। হাতের মাঝারি আকারের পিপেটা সজোরে ছুঁড়ে মারল সে ক্যাপ্টেনের দিকে।
সরে যাওয়ার কোন সুযোগই পেলেন না তিনি। তাঁর ডান হাঁটুতে এসে আছড়ে পড়ল জলভরা ভারী পিপেটা।
ককিয়ে উঠলেন তিনি, হুমড়ি খেয়ে পড়লেন মেঝেতে।
তাঁর এই সশব্দ পতনটা অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করল। দাঁত কেলিয়ে হাসতে-হাসতে নিজেদের হাতের জিনিসপত্র তাঁর দিকে ছুঁড়ে মারতে শুরু করল ওরা।
রকমারি উডুক্কু সামগ্রীর আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে রীতিমত যুঝতে হলো ক্যাপ্টেন বায়রনকে।
তবুও শেষরক্ষা হলো না; ভারী এবং ধারাল জিনিসপত্রের আঘাতে শরীরের নানান জায়গায় মারাত্মক আহত হলেন তিনি। অচিরেই বুঝতে পারলেন, এভাবে খোলা জায়গায় পড়ে থাকলে প্রাণ বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তাই পিঠের উপর মালামালের ভারী বর্ষণ সহ্য করেই হামাগুড়ি দিয়ে নিজের কেবিনের উদ্দেশে এগোতে শুরু করলেন তিনি। মাঝখানের স্বল্পদৈর্ঘ্যের জায়গাটা তাঁর কাছে এখন সাত সমুদ্র তেরো নদীর শামিল।
অবশেষে বহুকষ্টে যখন নিজের কেবিনে পৌঁছলেন ক্যাপ্টেন বায়রন, একবিন্দু শক্তিও তখন অবশিষ্ট নেই তাঁর দেহে।
শরীরের এখানে-ওখানে থেঁতলে গেছে মাংসপেশী; চামড়া ফেটে গিয়ে রক্ত ঝরছে কয়েক জায়গায়।
কোনমতে দরজার খিলটা এঁটে দিয়েই মেঝেতে গড়িয়ে পড়লেন তিনি। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই জ্ঞান হারালেন।
.
চেতনা ফিরে পেয়ে ধীরে-ধীরে চোখ মেললেন ক্যাপ্টেন রবার্ট। ঘরের অন্ধকারের সাথে মানিয়ে নিতে বার কয়েক চোখ পিট-পিট করলেন।
ইতোমধ্যে কেটে গেছে অনেকটা সময়, মধ্যরাত পেরিয়ে ভোরের দিকে যাত্রা শুরু করেছে ঘড়ির কাঁটা।
জাহাজটাকে এতটা শান্ত মনে হচ্ছে কেন? কোথাও কোন কোলাহল নেই! উন্মাদের দল গেল কোথায়? সবক’টা একযোগে সমুদ্রে ঝাঁপ দিল নাকি?
হাঁচড়ে-পাঁচড়ে উঠে দাঁড়ালেন ক্যাপ্টেন, চোখ রাখলেন দরজার উপরের লুক- হোলে। কী কাণ্ড! কাউকে চোখে পড়ছে না কেন? হাওয়ায় মিলিয়ে গেল নাকি সবাই? এই মুহূর্তে পুরো জাহাজে উনি কি একাই রয়ে গেলেন নাকি?
একটা অদ্ভুত আতঙ্ক ঘিরে ধরল তাঁকে। যদি সত্যিই জাহাজের বাকি সবাই কোন কারণে মরে গিয়ে থাকে, তাহলে এক অর্থে তিনি নিজেও মৃত!
এই আহত শরীরে এতবড় একটা জাহাজকে ঠিকঠাক তীরে নিয়ে যাওয়ার কথা কল্পনাও করা যায় না।
একমুঠো খাবারও নিশ্চয়ই অবশিষ্ট নেই জাহাজে। নিজের চোখে পাগলগুলোকে খাবারের বাক্সগুলো ছুঁড়ে ফেলতে দেখেছেন তিনি।
নাহ্, কোন আশা নেই। আর যদি গোটা ডেকে ছেয়ে থাকে মৃত নাবিকদের লাশ…
আর ভাবতে পারলেন না ক্যাপ্টেন রবার্ট, গা গুলিয়ে এল তাঁর। বমি ঠেকাতে রীতিমত কসরত করতে হলো তাঁকে।
ওখানে যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, এই অন্ধকারে সেটা নিরীখ করতে যাওয়ার কোন মানে হয় না। এগিয়ে গিয়ে বিছানায় পা তুলে বসলেন তিনি, হেলান দিলেন পিছনের দেয়ালে।
মাথা ভার হয়ে আছে এলোমেলো সব ভাবনায়; অল্পক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়েই পড়লেন।
.
ঘড়ির কাঁটায় খুব বেশি সময় পেরোয়নি, একটা চাপা হট্টগোলের শব্দে কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল তাঁর।
কোত্থেকে আসছে আওয়াজটা? কীসে করছে?
প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে লুক-হোলে চোখ রাখতেই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল তাঁর। যা দেখছেন, ঠিক দেখছেন তো?
মরেনি উন্মাদগুলো; মনে হচ্ছে সব ক’জনই বেঁচেবর্তে আছে।
কার্গো হোল্ড থেকে ডেকে তুলে আনা হয়েছে তাখাপোং-এর মূর্তিটাকে। দু’পাশে আগুনের কুণ্ডলী জ্বেলে আলোকিত করা হয়েছে জায়গাটা। কয়েকটা কাঠের পাটাতন জড় করে সামনে একটা বেদিমতন তৈরি করা হয়েছে। ওটাকে ঘিরেই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দিগম্বরের দল, কী যেন এক দুরভিসন্ধি পাকাচ্ছে।
ঘোলাটে কাচের ভিতর দিয়ে তাকিয়ে গোটা ব্যাপারটা আঁচ করতে কয়েক মুহূর্ত বেশি সময় লাগল ক্যাপ্টেন বায়রনের, তবে শেষতক ঠিকই তিনি আয়োজনটার উদ্দেশ্যটা ধরতে পারলেন। পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেলেন তিনি, এ-ও কি সম্ভব?
তাখাপোং-এর সামনে একটা নরবলি ঘটাতে চলেছে উন্মাদের দল, সেটাই চাক্ষুষ করছেন তিনি!
এক কোনায় ধারাল একখানা ভোজালি হাতে দাঁড়িয়ে আছে এক ন্যাংটো নাবিক, তার সামনে উবু হয়ে আছে একজন অসহায় মানুষ।
হাঁটু গেড়ে বসে আছে সে, হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধা।
