‘ওদের জীবন-মৃত্যুর দেবতার নাম, কালকেম। বাতাসকে বলা হয় এই দেবতার প্রতিনিধি। তিনিই নাকের সরু দুটো ফুটো দিয়ে বাতাস চলাচলের অনুমতি দেন, আর একারণেই বেঁচে থাকে মানুষ; এমনটাই বিশ্বাস করে রাসংরা কালকেমের উপাসনার ধরনটাও অন্যদের তুলনায় অনেকখানি আলাদা। একাকী করতে হয়, দলবদ্ধভাবে নয়। দিনের নির্দিষ্ট একটা সময় নির্ধারণ করে প্রত্যেক রাসংই আলাদাভাবে কালকেমের আরাধনা করে। চোখ মুদে, দম বন্ধ করে কালকেমের কাছে দীর্ঘায়ু কামনা করে পূজারীরা।
‘আর তাখাপোং-এর কথা তো আপনারা জানেনই। রাসংদের অভিশাপের দেবতা এই তাখাপোং। অন্ধকারকে বিবেচনা করা হয় এই দেবতার প্রতিনিধি হিসেবে। তাখাপোং-এর উপাসনার জন্য আলাদা মন্দির আছে। নিজের শরীরের কয়েক ফোঁটা রক্ত সঁপে দিতে হয় দেবতার চরণে। নাহয় তাখাপোং রুষ্ট হয়ে ভয়াবহ অভিশাপ দেবেন, আর তাতে যে কোন মানুষের ধ্বংস অনিবার্য। অন্য দেবতাদের চেয়ে তাখাপোংকেই বেশি ভয় পায় ওরা। তাখাপোং-এর অভিশাপ থেকে বেঁচে গেছে কেউ, এমন কোন নজির নেই রাসং-সমাজে।’
‘কথা শেষ হয়েছে তোমার?’ গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন ক্যাপ্টেন রবার্ট। চেহারা নির্বিকার। হ্যাঁ-সূচক মাথা দোলাল তৈমুর; ক্যাপ্টেনের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছে।
‘গল্পটা চমৎকার। বুঝতে পারছি, কেন সবাই তোমার কথায় প্রভাবিত হয়েছে,’ শান্ত গলায় বললেন ক্যাপ্টেন। ‘তবে আমাকে টলানোর জন্য কেবল এটুকুই যথেষ্ট নয়। একটা উপকথার উপর ভিত্তি করে অত দামী একটা মূর্তিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া কিংবা জলে ফেলে দেয়া, কোনটাই আমার পক্ষে সম্ভব নয়। দুঃখিত।
এক পলকের জন্য নেলসনের মুখের উপর দৃষ্টি বোলালেন তিনি, তারপর আবারও স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন তৈমুরের দিকে।
‘প্রথমত, আমি নিজে রাসং সম্প্রদায়ের কেউ নই। তাই তাদের দেব-দেবী, উপদেবতা-অপদেবতা, কোনকিছু নিয়েই মাথাব্যথা নেই আমার। গল্প হিসেবে শোনা যায়, তবে এগুলো মনে-প্রাণে বিশ্বাস করার ব্যাপারে ঢের আপত্তি আছে আমার।
‘জগতের সমস্ত দেব-দেবীর তুষ্টির দিকে খেয়াল রাখতে গেলে মানুষের পক্ষে কাজকর্ম করাটাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। সম্ভবত একারণেই নিজেদের সুবিধামত দেব-দেবী বেছে নিয়েছে নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষজন।
‘একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, দেবতারা তাদের পূজারী বেছে নেন না, বরঞ্চ পূজারীরাই তাদের দেবতা বেছে নেয়।
‘এই কারণেই ওই কষ্টি পাথরের মূর্তিটা আমার কাছে অন্য দশটা মূর্তির মতই সাধারণ একটা মূর্তি, এর বেশি কিছু নয়।
‘দ্বিতীয়ত, আমি একজন কর্তব্যপরায়ণ মানুষ। আমি নিজের উপর অর্পিত দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করি; তোমাদের নিজেদেরও ঠিক সেটাই করা উচিত। তোমাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই, ওই মূর্তিটা এই জাহাজের মালিক স্বয়ং রানীকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন। প্রাপকের হাতে পৌঁছে দেয়ার আগপর্যন্ত ওটার দেখভাল করাটাই আমাদের কর্তব্য; ওটার কোনরকম ক্ষতিসাধন কিংবা গোটা মূর্তিটাকেই খুইয়ে ফেলা নয়।
‘এ সমস্ত অবাস্তব চিন্তা-ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে নিজেদের কাজে মনোযোগী হও তোমরা, এতেই সবার মঙ্গল হবে। ফালতু দুশ্চিন্তায় মাথা খাটিয়ে মগজ ক্ষয় করার কোন মানে হয় না।
‘এ নিয়ে আর কোন কথা যেন না শুনি। দু’জনেই আপাতত বিদেয় হও, খানিকক্ষণ একা থাকতে চাই আমি।’
ক্ষণিকের জন্য মিলিত হলো দু’জোড়া বিমর্ষ চোখের দৃষ্টি, পরক্ষণেই বিনাবাক্যব্যয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল ওরা।
কী-ই বা আর বলার আছে ওদের? অযৌক্তিক কিছু তো বলেননি ক্যাপ্টেন বায়রন।
নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল নেলসন। মনটা ভার হয়ে আছে, দেখতে-দেখতে চোখের পাতাও ভারী হয়ে এল তার।
তৈমুর ফিরে গেল তার মদের বোতলের কাছে; আকণ্ঠ সুরাপানের মধ্য দিয়েই তাখাপোংকে ভুলে থাকতে চায় সে।
ব্যাপারটা শুরু হলো অতর্কিতে, সাবধান হওয়ার কোনরকম সুযোগই পাওয়া গেল না।
এক সন্ধ্যায় আচমকা পাগলামি শুরু করল তৈমুর, চিৎকার করে ক্যাপ্টেন রবার্টকে গালাগাল করতে শুরু করল সে!
তার অশ্রাব্য খিস্তির তোড়ে ভীষণ লজ্জিত বোধ করলেন ক্যাপ্টেন। নিজেকে কেবিনেই বন্দি করে রাখলেন তিনি, বাইরে আর বেরোলেন না। অধস্তন কেউ যদি অকারণে এভাবে গাল বকতে শুরু করে, অন্যদের কাছে কি আর মুখ দেখানোর জো থাকে?
প্রথমটায় সবাই ভাবল, আজ বুঝি খানিকটা আগেভাগেই মদ গেলা শুরু করেছে তৈমুর। একারণেই এমন অপ্রকৃতিস্থের মত আচরণ করছে ব্যাটা।
কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই আবিষ্কার হলো যে, সকাল থেকে মদের বোতলের ধারেকাছেও ঘেঁষেনি সে, মাতাল হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না!
বেশ অবাক হলো সবাই। শরাব না গিলে থাকলে আচমকা এমন উন্মাদ হয়ে ওঠার কারণটা কী? প্রশ্নটার জবাব পাওয়ার আগেই পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠল!
দেখতে-দেখতে পাগলামিটা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, একেবারে মহামারীর মত! প্রথমে আক্রান্ত হলো তৈমুরের আশপাশে অবস্থান করা নাবিকেরা, পরের ধাপে জাহাজসুদ্ধ সব ক’জন মানুষ!
প্রত্যেকেই স্পষ্ট টের পেল যে, তার পাশের জন উন্মাদের মত আচরণ করছে; কিন্তু নিজের করা পূর্ণমাত্রার উদ্ভট কর্মকাণ্ডগুলো সম্পর্কে বেখবরই রইল সবাই!
