মদ…এই মদই শেষতক সর্বনাশ করল তাহলে। কয়েক ঢোক গিললেই কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায় তার, তখনই হয়তো কোন এক ফাঁকে তাখাপোং-এর কাহিনিটা বলে ফেলেছিল সে নাবিকদের। আর এ-কান ও-কান করতে-করতে শেষটায় কথাটা পৌছে গেছে ক্যাপ্টেনের কান অবধি। এখন আর কিছুই করার নেই তার; বন্দুক থেকে বেরনো গুলি আর মুখ ফসকে বলে ফেলা কথা, কোনটাই আর ফেরানো যায় না।
নিজের দোষ স্বীকার করল তৈমুর, নীরবে মাথা দোলাল উপর-নীচে
‘তোমাকে বার-বার মানা করার পরও কী কারণে আজগুবি গল্পটা ফাঁদলে, শুনি?’ ক্যাপ্টেনের কণ্ঠে ক্রোধাগ্নির উত্তাপ।
‘আমি…আমি মাতাল ছিলাম, স্যর,’ আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করল তৈমুর। মাথা নিচু করে রেখেছে; অপরাধবোধে ভুগছে।
অগ্নিদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন ক্যাপ্টেন বায়রন, কিছু বলার মত ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি।
আচমকা নিজের উপর জোর খাটিয়ে মুখটা তুলল তৈমুর। নিজের ভিতরকার সবটুকু সাহস জড় করে বলল, ‘কথাটা কিন্তু সত্যি, স্যর, নির্জলা সত্যি। নিছক কোন গল্প নয়, একবিন্দু মিথ্যে নেই ওতে।’
‘মানে?’ হতভম্ব গলায় জানতে চাইলেন ক্যাপ্টেন রবার্ট; তৈমুরের কণ্ঠের দৃঢ়তা বিস্মিত করেছে তাঁকে।
‘সত্যিই রাসংদের অভিশাপের দেবতা তাখাপোং-এর মূর্তি বয়ে চলেছি আমরা। প্রতি মুহূর্তে নিজের পূজারীদের সাথে দূরত্ব বাড়ছে তাঁর। যে কোন সময় ভয়ানক খেপে উঠতে পারেন তিনি, প্রাণঘাতী কোন অভিশাপ দিয়ে বসতে পারেন আমাদেরকে। এর ফল কোনমতেই শুভ হবে না, স্যর। আমাদের উচিত যত দ্রুত সম্ভব মূর্তিটাকে সমুদ্রের জলে নিক্ষেপ করা। তাহলেই কেবল তাখাপোং-এর করাল গ্রাস থেকে মুক্তির আশা করতে পারি আমরা।’
‘এতটা জোর গলায় বলছ কী করে? তুমি নিজেই কি একজন রাসং? নাহলে কী করে জানলে এতকিছু? তাছাড়া কেন একজন আদিবাসী দেবতা নিয়ে মাথা ঘামাতে যাব আমরা, শুনি? অতীতে কখনও তাখাপোং-এর উপাসনা করিনি আমরা, ভবিষ্যতেও করার কোন সম্ভাবনা দেখছি না। তাহলে?’
‘না, স্যর। আমি রাসং নই,’ নরম গলায় জবাব দিল তৈমুর। ‘তবে রাসং সম্প্রদায়ে অনেক বন্ধু আছে আমার। ওদের কাছ থেকেই সবকিছু জেনেছি আমি। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটিকে কিন্তু আপনিও দেখেছেন, স্যর। জাহাজ ছাড়ার সময় আমাকে বিদায় জানাতে বন্দরে এসেছিল সে। আমার প্রাণের বন্ধু, মিরাপ্পা। সৈকতে বসে সমস্ত দেবতার নামে হলফ করে নিজেদের নাম অদলবদল করেছি আমরা। কথা দিয়েছি, যতদিন বেঁচে থাকি, একে অন্যকে ভালবেসে যাব। যত দূরেই থাকি, হৃদয়ের বন্ধন অটুট থাকবে চিরকাল।
‘ওর কাছেই তাখাপোং-এর ব্যাপারে বিস্তারিত শুনেছি আমি। জেনেছি, কতটা নিষ্ঠুর এই দেবতা। মূর্তিটাকে আমাদের জাহাজে তুলতে দেখে ভয়ে কেঁপে উঠেছিল ও, বার-বার সাবধান করছিল আমাকে।
‘কিন্তু কথাটা আপনাকে বলার সাহস হয়নি আমার, স্যর। মাতাল হয়ে মুখ ফসকে বলে না ফেললে হয়তো গোপনই থাকত ব্যাপারটা। আর আপনারাও ধীরে-ধীরে এগিয়ে যেতেন ভয়াবহ এক পরিণতির দিকে, কোনকিছু না জেনেই।’
দম নেয়ার জন্য কয়েক মুহূর্ত বিরতি নিল তৈমুর। তারপর আবারও বলতে শুরু করল, ‘তাখাপোং একজন অপদেবতা, স্যর। অপদেবতারা এমনিতেই মানুষের কাছ থেকে খুব কম অর্চনা পায়। তাই যারা তাদের আরাধনা করে, তাদেরকে অনুগ্রহের সাগরে ভাসিয়ে দেয় ওরা; আর কেউ তাতে বাধা দিলে, তাদের জন্য বরাদ্দ থাকে সীমাহীন নিগ্রহ।
‘গোটা পৃথিবীতে একমাত্র রাসংরাই বোধহয় তাখাপোং-এর আরাধনা করে। তাই স্বভাবতই ওদের কাছ থেকে তাকে সরিয়ে নেয়াটা ভালভাবে নেবে না সে।’
‘রাসংরা কি শুধু তাখাপোং-এর পূজাই করে? নাকি আরও কোন দেবতা আছে ওদের?’ জানতে চাইল ফার্স্ট মেট নেলসন। এতক্ষণ চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে তৈমুরের কথা শুনছিল সে। লোকটা যে আদতেই একজন শিক্ষিত মানুষ, এ নিয়ে আর কোন সন্দেহ নেই তার মনে।
‘না, না, তা হবে কেন? আরও অনেক দেবতা আছে রাসংদের,’ গম্ভীর গলায় জবাব দিল তৈমুর। ‘সালজং ওদের উর্বরতার দেবতা। সূর্য হলো সালজং-এর প্রতিনিধি। ফসলের ভাল-মন্দ এই দেবতার মর্জির উপরই নির্ভর করে বলে রাসংরা বিশ্বাস করে। প্রতিটি রাসং-মাসের শুরুর দিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সালজং-এর পূজা করে ওরা। ফসলের মাঠে পানি ছিটায়, চিৎকার করে কাঁদে। তাদের প্রতি প্রীত হয়ে ন্যাড়া জমিনগুলো ফসলে ভরিয়ে দেন দেবতা সালজং।
‘রাসংদের ধন-দৌলতের দেবীর নাম, সুসাইম। এই দেবীর প্রতিনিধি হলো চন্দ্র। ভরা পূর্ণিমার রাতে দেবী সুসাইমের আরাধনা করে রাসংরা। উলঙ্গ হয়ে শুয়ে থাকে খোলা মাঠে, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আকাশের পূর্ণ চাঁদের দিকে। চাঁদটা অস্ত যাওয়ার আগ পর্যন্ত একটা শব্দও উচ্চারণ করে না ওরা। এই নির্বাক পূজার বিনিময়ে দেবী সুসাইম তাঁর ভক্তদের মাঝে সম্পদ বণ্টন করে দেন। রাসংদের ভিতরে শ্রেণিবিভাগ নেই, তাই প্রত্যেকেই তারা সমপরিমাণ সম্পদের মালিক হয়।
‘শক্তির দেবতার নাম, গোয়েরা। বজ্রকে ধরা হয় এই দেবতার প্রতিনিধি হিসেবে। প্রচণ্ড ঝড়-বাদলের সময় গোয়েরার উপাসনা করে রাসংরা। সবাই এক জায়গায় জড় হয়ে কোন একটা বিশাল বৃক্ষের নীচে বসে থাকে। খানিকক্ষণ পর- পর গোয়েরার নাম ধরে একযোগে চিৎকার করে। আশপাশের সমস্ত এলাকায় সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন গোয়েরা। কিন্তু পূজারীদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকায় রাসংদের কোনরকম ক্ষতিই করেন না তিনি। বজ্রের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে সবক’টা রাসং গ্রাম!
