‘না, স্যর। ফিরে যেতে হবে না আমাদের।’ আচমকা চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল নেলসনের। ‘মূর্তিটাকে এখানে…এই মাঝ-সাগরেই ফেলে দিতে পারি আমরা। ওটা নিজেই নিজের আস্তানায় ফিরে যেতে পারবে, স্যর। আমরাও ওটার অভিশাপ থেকে বেঁচে যাব।’
পরবর্তী কয়েকটা মুহূর্ত চোখভরা অবিশ্বাস নিয়ে নেলসনের দিকে তাকিয়ে রইলেন ক্যাপ্টেন রবার্ট বায়রন। তাঁর সামনে দাঁড়ানো লোকটাকে এতদিন একজন বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবেই জেনে এসেছেন তিনি। অতীতে কখনওই সে এতটা নির্বোধের মত আচরণ করেনি
গলা অনেকখানি চড়ে গেল ক্যাপ্টেন বায়রনের। ‘তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি কি সব লোপ পেয়েছে, নেলসন? এত দামী একটা জিনিস এভাবে স্বেচ্ছায় জলে ফেলে দেব, এমনটা ভাবলে কী করে তুমি?’
মূক পশুর মত ঠায় দাঁড়িয়ে রইল নেলসন, কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। বলে চললেন ক্যাপ্টেন বায়রন, ‘তাছাড়া এভাবে মূর্তিটাকে জলে ফেলে দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এটাই বা তোমাকে কে বলল? হিতে বিপরীতও তো হতে পারে। হয়তো দেখা গেল পানিতে চুবানোর জন্য আরও বেশি রেগে উঠেছেন তাখাপোং, তখন?’
এবার যেন হালে কিছুটা পানি পেল ফার্স্ট মেট। চটজলদি বলে উঠল, ‘না, না, স্যর। মোটেও রাগবেন না তিনি, উল্টো মুক্তি দিয়েছি বলে আমাদের উপর বেশ প্রসন্ন হবেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই এখন একমাত্র পথ, স্যর।’
‘কী করে জানলে সেটা? এটাও কি স্বপ্নে দেখেছ নাকি?
ক্যাপ্টেনের কণ্ঠের প্রচ্ছন্ন উপহাসের সুরটা ধরতে পারল না নেলসন। তড়িঘড়ি বলল, ‘তৈমুরের কাছ থেকে জেনেছি, স্যর। ও-ই আমাদেরকে সবকিছু খুলে বলেছে।’
নিমিষেই পাল্টে গেল ক্যাপ্টেন বায়রনের চেহারা; প্রচণ্ড রেগে গেছেন তিনি। ‘এই তাহলে ব্যাপার? তৈমুরের অবাস্তব গল্পগুলোই তাহলে তোমাদের উদ্ভট স্বপ্নের রসদ জোগাচ্ছে!’ হতাশায় বার কয়েক মাথা দোলালেন ক্যাপ্টেন। ‘ছিঃ, নেলসন। লজ্জা পাওয়া উচিত তোমাদের। একটা মাতালের গল্প শুনে জাহাজসুদ্ধ এতগুলো বুদ্ধিমান লোক কেমন করে ভড়কে গেলে?’ মাথা নিচু করে রইল ফার্স্ট মেট। ভুল কিছু বলেননি ক্যাপ্টেন; তৈমুর সত্যিই নির্ভরযোগ্য কোন মানুষ নয়।
.
নতুন একজন খালাসীর নাম তৈমুর। লোকটা শ্রীলঙ্কার বাসিন্দা; এবারই প্রথম সী- কুইনে কাজ নিয়েছে সে। হাবভাবে বেশ শিক্ষিতই মনে হয় তাকে, যদিও মুখে কখনও সেটা স্বীকার করেনি লোকটা।
গায়ের রঙ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ; অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকলে চট করে চোখে পড়ে না, সহজেই নজর এড়িয়ে যায়।
এমনিতে লোকটা মন্দ নয়, নিজের কাজে বেশ পারদর্শী। বিনাবাক্যব্যয়ে যে কোন আদেশ মেনে নেয়, কোন রা করে না।
তবে সমস্যা একটাই; তার ভয়াবহ মদ-প্রীতি!
সন্ধ্যার পর আর তাকে দিয়ে কোন কাজ করানোর জো নেই, একেবারে বেহেড মাতাল হয়ে থাকে তখন লোকটা। কয়েক ঢোক পেটে পড়া মাত্রই হুঁশ- জ্ঞান লোপ পায়, চোখের পলকে সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষে পরিণত হয় সে। ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদে, প্রলাপ বকে। যেন গোটা জীবনের দুঃখগুলো ভাসিয়ে দিতে চায় দু’চোখের নোনা জলে।
কান্নার পর্বটা শেষ হলে খানিকটা শান্ত হয় সে; গল্প বলতে শুরু করে। তার গল্পের ধরনটা বেশ অদ্ভুত, কাহিনিগুলো তারচেয়েও বেশি চমকপ্রদ।
চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বিশ্রামরত নাবিকেরা বেশ আগ্রহ নিয়েই শোনে তার বয়ান। সমুদ্রযাত্রার একঘেয়ে সন্ধ্যাগুলোয় এহেন বিচিত্র কেচ্ছা-কাহিনি, সবার কাছেই বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়। গল্পকথকের বিশ্বাসটা শ্রোতাদের ভিতরে সঞ্চারিত হতে সময় লাগে না।
এতটাই দৃঢ়তার সাথে কথাগুলো ব্যক্ত করে তৈমুর, যেন সে নিজেই সেগুলো চাক্ষুষ করেছে। শুনতে যত উদ্ভটই লাগুক না কেন, অনেকটা বাধ্য হয়েই শ্রোতারা ভাবতে বসে, গল্পগুলো তো সত্যি হতেও পারে, তাই না? এই বিপুলা পৃথিবীর কতটুকুই বা আর জানতে পেরেছে মানুষ?
জরুরি পয়গাম পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ক্যাপ্টেনের কেবিনে ছুটে এল তৈমুর। চোখের তারায় বিরক্তি খেলা করছে। মাত্রই মদের বোতলটা খুলতে শুরু করেছিল সে; সুখযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটলে কারই বা আর ভাল লাগে?
তবে ক্যাপ্টেন রবার্টের দিকে চোখ পড়া মাত্রই চুপসে গেল সে, নিমিষেই বেমালুম গায়েব হয়ে গেল চেহারার সমস্ত বিরক্তি। স্পষ্ট বুঝতে পারছে, খোশগল্প করতে ডাকা হয়নি তাকে। অজ্ঞাত কারণে রেগে বোম হয়ে আছেন ক্যাপ্টেন বায়রন!
রাগটা কি তার উপর? কী করেছে সে? কী শাস্তি অপেক্ষা করছে তার জন্য?
এক লহমায় মনের কোণে অনেকগুলো প্রশ্ন এসে উঁকি দিতে শুরু করল, যার একটারও জবাব জানা নেই তার। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে রইল সে; অপেক্ষা করছে। কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর মুখ খুললেন ক্যাপ্টেন বায়রন। ঝাঁঝাল গলায় বললেন, ‘সবাইকে দেবতা তাখাপোং-এর গাঁজাখুরি গল্পটা তাহলে তুমিই শুনিয়েছ, তাই না?’
প্রশ্নটা শুনে তৈমুরের মনে হলো, এর চেয়ে বুঝি নীরবতাই ভাল ছিল। কালো মুখটা আরও অনেকখানি কালো হয়ে গেল তার। ভাল করেই জানে সে, বাস্তবতা বিবর্জিত গল্পগুজব একদমই পছন্দ করেন না ক্যাপ্টেন রবার্ট। একারণে আগেও বেশ কয়েকবার সতর্ক করা হয়েছে তাকে। সচেতনই ছিল সে, কিন্তু আর বুঝি শেষ রক্ষা হলো না।
