খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর ধীরে-সুস্থে বোমাটা ফাটাল নেলসন। ‘কারণ, স্যর, রোজ রাতেই ওটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছি আমরা! স্বপ্নটা ভীষণ বিদঘুটে, স্যর। আর আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, সবার স্বপ্নই অবিকল এক!’
পরবর্তী কয়েকটা মুহূর্ত বিস্ফারিত নেত্রে নেলসনের দিকে চেয়ে রইলেন ক্যাপ্টেন বায়রন। বলছে কী এই লোক? অবিকল একই স্বপ্ন! তা কী করে হয়? ‘গোটা ব্যাপারটা খুলে বলো তো, নেলসন। স্বপ্নে ঠিক কী দেখতে পাচ্ছ তোমরা?’
বলার জন্য তৈরিই ছিল ফার্স্ট মেট। কালক্ষেপণ না করে তোতাপাখির মত ঠোঁট নাড়াতে শুরু করল সে।
.
স্বপ্নটা শুরু হয় খুব সাদামাঠাভাবে। লোকালয় থেকে অনেকটা দূরে, বিশাল এক ন্যাড়া পর্বতের অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা গুহায়, দেবতা তাখাপোং-এর উপাসনালয়।
মিশমিশে কালো কষ্টি পাথর কুঁদে বানানো দেবমূর্তির সামনে ছোট একখানা পোড়ামাটির বেদি। তাতে তাজা রক্তের পাশাপাশি, শুকিয়ে আসা ছোপ-ছোপ রক্তও অস্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। নিজের শরীরের রক্ত ঢেলেই এই দেবতার আরাধনা করা হয়। বেদিটাকে ঘিরে থাকে এক দঙ্গল পুরোহিত। পরনে এক গাছি সুতোও নেই ওদের। পুরোপুরি দিগম্বর।
সাধারণত অন্য উপজাতি সম্প্রদায়গুলোতে মহিলাদেরকে পুরোহিতদের কাজ করতে দেখা যায় না; তবে রাসংরা এক্ষেত্রে একেবারেই আলাদা। পুরুষদের পাশাপাশি বেশ ক’জন মহিলা পুরোহিতকেও নগ্ন হয়ে নাচতে দেখা যায় মূর্তিটার সামনে।
পুরোহিতদের তৈরি করা মানব ব্যূহটা পুরোপুরি অভেদ্য নয়, মাঝখানটায় একটা ফোকরমতন রয়েছে। সাধারণ পূজারীরা এই পথেই একসারিতে পায়ে- পায়ে এগিয়ে চলে বেদি অভিমুখে। বেদির সামনে গিয়ে খানিকক্ষণ চোখ মুদে দাঁড়াতে হয়। এ সময়টায় দেবতার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাওয়া হয়।
তারপর চোখ খোলামাত্রই সামনে রাখা ধারাল ছোরাটা নিজের হাতের যে কোন একটা আঙুলে অবলীলায় চালিয়ে দেয় ওরা। ক্ষতটা থেকে কয়েক ফোঁটা তাজা রক্ত বেদিতে গড়িয়ে পড়ার পর নির্বিবাদে জায়গাটা থেকে সরে দাঁড়ায়, আরাধনার সুযোগ করে দেয় পাশের জনকে। শত-শত রাসং ওখানটায় উপস্থিত থাকলেও কোথাও একরত্তি বিশৃঙ্খলা চোখে পড়ে না। সম্পূর্ণ নিঃশব্দে এগিয়ে চলে রক্ত সমর্পণের এই আয়োজন।
স্বপ্নের এ পর্যায়ে স্বপ্নদ্রষ্টা নিজেকে একেবারে সবার সামনে আবিষ্কার করে, যেন এবার তারই পুজো দেয়ার পালা! স্বভাবতই নিজের হাতে ছুরি চালাতে খানিকটা ইতস্তত করে সে। নিজেরা রাসং না হওয়ায় কাজটায় কেউই অভ্যস্ত নয়, কিছুটা জড়তা ভর করাটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।
ঠিক এই সময় উপস্থিত সবার পিলে চমকে দিয়ে আচমকা খুলে যায় দেবতা তাখাপোং-এর রক্তলাল দুটো চোখ! বেশ কিছুক্ষণ নির্নিমেষে স্বপ্নদ্রষ্টার দিকে তাকিয়ে থাকে সে। ধীরে-ধীরে নিজের বাম বাহুটা উঁচু করে তাখাপোং, সরাসরি তাক করে আসামীর বুকের দিকে। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে ওঠে, ‘এই লোকটা চুরি করে এখান থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। পরিণামে ভয়ঙ্কর শাস্তি ভোগ করতে হবে তাকে। এই মহাপাপের কোন ক্ষমা নেই। ধ্বংস অনিবার্য।’
কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই চোখের পলকে আবারও নিষ্প্রাণ মূর্তি বনে যায় ওটা। যেন চিরকাল অমন নিষ্প্রাণই ছিল, প্রাণের কোন চিহ্নই আর খুঁজে পাওয়া যায় না মূর্তিটার মধ্যে! তবে স্বপ্নদ্রষ্টার জন্য তখন আরও ভয়াবহ এক পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে অগণিত ক্রোধান্বিত রাসং; যারা দেবতা-চোরকে নিজের হাতে শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর!
ধীরে-ধীরে মানব-বৃত্তটা ছোট হয়ে আসে, বুনো জানোয়ারের হিংস্রতা ভর করে সবার চোখে-মুখে।
একেবারে অন্তিম মুহূর্তে যে-ই না ওরা আসামীর উপরে সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হয়, ঠিক তখনই ঘুমটা ভেঙে যায়!
তারপর আর চোখের পাতা এক করার সাহস হয় না কারও, জেগেই কাটাতে হয় পুরোটা রাত।
.
হাঁপাতে-হাঁপাতে নিজের বয়ান শেষ করল ফার্স্ট মেট নেলসন। ক্যাপ্টেনের কাছে স্বপ্নটা সবিস্তারে বলতে গিয়ে গায়ের সবক’টা লোম দাঁড়িয়ে গেছে তার।
রাতের স্বপ্নের মতই সবকিছু যেন জীবন্ত হয়ে ভাসছিল তার মনের পর্দায়।
কিন্তু ক্যাপ্টেন বায়রনকে দেখে মোটেও বিচলিত মনে হলো না। শিরদাঁড়া সোজা করে এমন একটা ভঙ্গিতে বসে আছেন, যেন এতক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে ঠাকুরমার ঝুলির কোন একটা সরেস গল্প শুনছিলেন তিনি!
তাঁর কথাতেও সেটা পরিষ্কার ফুটে উঠল। আমুদে গলায় বললেন, ‘গল্পটা দারুণ। বেশ রোমাঞ্চকর। রোজ রাতে এহেন অ্যাডভেঞ্চার করার সৌভাগ্য কিন্তু সবার হয় না, নেলসন। তোমাদের উচিত খুশি হয়ে স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা জানানো। আর তোমরা কিনা ভয় পাচ্ছ! স্বপ্ন তো স্বপ্নই, তাই না?’
ক্যাপ্টেনের কথায় বেশ মর্মাহত হলো ফার্স্ট মেট। তিনি গোটা বিষয়টা এতটা হালকাভাবে নেবেন, এটা সে কস্মিনকালেও কল্পনা করেনি।
‘আমরা কিন্তু ভয়ই পাচ্ছি, স্যর। কারণ আমাদের কাছে ব্যাপারটাকে এখন আর নিছক স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে না। সত্যি-সত্যিই কোন একটা দুর্যোগ নেমে আসার আগেই মূর্তিটাকে ফিরিয়ে দেয়া উচিত, স্যর।’
‘কিন্তু সেটা তো আর চাইলেই এখন করা যাচ্ছে না, তাই না? আমরা বন্দর ছেড়েছি অন্তত সপ্তাহখানেক আগে। এই হতচ্ছাড়া মূর্তিটার জন্য পুরোটা পথ আবার ফিরে যেতে বলছ নাকি? উপরওয়ালার কাছে এই ঘটনার কী ব্যাখ্যা দেব আমি, শুনি?’
