হ্যারি এখানে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল তা সে বলতে পারবে না। একটা আচ্ছন্নতা তাকে ঘিরে ছিল। দীর্ঘসময় তার ঘোরের ভেতর কাটল। দূর থেকে শোরগোল শুনে হ্যারির চেতনা ফিরে এলো।
এখানে তো আর বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব নয়। তাকে ডর্মিটরিতে ফিরে যেতে হবে। ইচ্ছে না হলেও এখান থেকে তাকে বেরুতে হবে। মায়ের চেহারা থেকে হ্যারি তার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। অস্ফুট কণ্ঠে হ্যারি বলল–আমি আবার আসব। এই বলে হ্যারি সেখান থেকে বিদায় নিল।
*****
তুমি তো আমাকে জাগাতে পারতে। অনুযোগের স্বরে রন হ্যারিকে বলল।
তুমি আজ রাতে যেতে পারো। আমি আজও যাব। আমি তোমাকে সেই আয়নাটা দেখাতে চাই।
আমি তোমার বাবা–মাকে দেখতে চাই। রন আগ্রহের স্বরে বলল।
আর আমি তোমার পরিবারের সবাইকে দেখতে চাই। উইলি পরিবারের সবাইকে। তুমি আমাকে তোমার অন্যান্য ভাই ও তোমার পরিবারের সবাইকে দেখাবে। হ্যারি বলল।
তুমি যখনই খুশি তাদের দেখতে পারো। রন বলল–তুমি এই গ্রীষ্মকালে আমার সাথে আমার বাড়িতে এসো। সত্যি লজ্জাজনক যে আমরা ফ্লামেলের বিষয়টা ভুলেই গেছি। জানতে পারিনি। আরো কিছু খাবার মাও। একি, তুমি খাচ্ছ না কেন?
আসলে হ্যারি খেতে পারছিল না। তার বাবা–মার চেহারা বার বার তার চোখে ভাসছে। সে ফ্লামেলের কথা সম্পূর্ণরূপে ভুলে গিয়েছিল। কারণ এখন ফ্লামেল তার কাছে তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিন মাথা কুকুরও এখন তার ভাবনার বিষয় নয়। আর অধ্যাপক স্নেইপ যদি কোন কিছু চুরি করেই থাকেন তাতে হ্যারির কী আসে যায়।
তুমি ঠিক আছ তো? রন তাকে জিজ্ঞেস করে। তোমাকে খুব অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে।
***
হ্যারি মনে মনে ভয় পাচ্ছিল–আরেকবার গিয়ে যদি আয়নাটি না পাওয়া যায়।
রন আর হ্যারি অদৃশ্য হওয়ার পোশাক পরে তাদের অভিযানে বেরুল। লাইব্রেরি থেকে বেশ ধীরে ধীরে তারা এগুতে থাকল। তারা আগের পথ ধরেই অন্ধকারে প্রায় আধঘণ্টা কাটাল।
আমি বরফে জমে যাচ্ছি। রন বলল।
কোন কথা বলবে না। হ্যারি বলল–আমি জানি এটা এখানে কোথাও হবে।
উল্টোদিক থেকে আসা একটা ডাইনি পেত্নীকে তারা অতিক্রম করল। এছাড়া তারা কোন লোকজন দেখতে পেল না। হ্যারি অস্ত্রভাণ্ডার ঘরটা শনাক্ত করে বলল-এটা এখানে।
দরোজা ধাক্কা দিয়ে তারা দুজনে ভেতরে ঢুকলো। ঘাড় থেকে অদৃশ্য হবার পোশাকটা নামিয়ে হ্যারি আয়নার দিকে তাকাল।
তারা দুজনেই আয়নার সামনে দাঁড়াল। হ্যারির বাবা–মা উৎফুল্ল হলেন।
তাকিয়ে দেখ। নিচু হয়ে হ্যারি রনকে বলল।
রন জবাব দিল–আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
ভালো করে দেখ। এখানে সবাই আছে। হ্যারি বলল।
আমি তো কেবল তোমাকে দেখছি। রন বলল।
ভালো করে দেখ। আমি যেখানে আছি সেখানে এসে দাঁড়াও।
হ্যারি সরে দাঁড়াল।
রন আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালে সে নিজেকে ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না।
রন হতবুদ্ধি হয়ে তার নিজের ছায়ামূর্তি দেখছিল। হ্যারি বলল আমার দিকে তাকাও।
তুমি দেখতে পাচ্ছ তোমাদের পরিবারের সবাই তোমার চারদিকে দাঁড়িয়ে আছে।
না, আমি কিছুই দেখছি না। এখানে আমি একা। আমাকে একটু বুড়ো বুড়ো দেখাচ্ছে। আমি এখন হেডবয়।
তুমি কি বললে?
বিল যে ধরনের ব্যাজ পরে আমি এখন সে ধরনের ব্যাজ পরে আছি। আমার হাতে হাউজক্যাপ আর কিডিচ ক্যাপ। আমি কিডিচ খেলায় অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করছি।
এই চমৎকার দৃশ্য থেকে রন তার দৃষ্টি ফিরিয়ে আনল। তারপর উত্তেজিতভাবে সে হ্যারিকে বলল–তুমি কি মনে কর এই আয়না ভবিষ্যৎ বলতে পারে?
আয়না কী করে বলবে। হ্যারি জবাব দিল–
হ্যারি নিজে আয়না দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
সে রনকে বলল,
আমার পরিবারের কেউ তো আর বেঁচে নেই। আমাকে আরেকবার আয়নাটি দেখতে দাও।
গত রাতে তো তুমি একাই দেখেছ। আজ তুমি আমাকে একটু বেশি সময় দাও।
তুমি তো কিডিচ কাপ হাতে ধরে নিজেকে দেখেছে। এর মধ্যে মজাটা কি? আর আমি আমার বাবা–মাকে দেখতে চাই। হ্যারি বলল।
আমাকে সরিয়ে দিও না।
বাইরের করিডোরে একটি শব্দ শুনে কথা বলা বন্ধ করলো ওরা। এতক্ষণ বুঝতে পারেনি যে তারা বেশ জোরেই কথা বলছিল।
তাড়াতাড়ি পালাও।
ওরা অদৃশ্য হওয়ার পোশাকটা দিয়ে নিজেদের ঢেকে ফেলো। মিসেস মরিসের জ্বলজ্বলে চোখ তখন দরোজার ওপর। হ্যারি আর রন দুজনেই দাঁড়িয়ে ভাবছিল-এই অদৃশ্য হওয়ার পোশাকটা কি বিড়ালের ওপরও কাজ করে। তাদের মনে হলো তারা এখানে এক যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মিসেস নরিস ঘুরে দাঁড়ালেন এবং ঘর ত্যাগ করলেন।
এটা মোটেও নিরাপদ নয়। তিনি ফিলচকে বলতে পারেন, আমি বাজি ধরে বলতে পারি তিনি আমাদের কথাবার্তা শুনতে পেয়েছেন। এসো। রন হাত ধরে হ্যারিকে ঘরের বাইরে নিয়ে এল।
***
পরদিন সকালে তখনও বরফ ভালোভাবে গলেনি।
হ্যারি, দাবা খেলবে নাকি? রন জিজ্ঞেস করে।
না। হ্যারি বলে।
তাহলে চল হ্যাগ্রিডকে দেখে আসি। রন আবার বলল।
না, যাব না। তুমি যাও।
আমি জানি তুমি কি চিন্তা করছ। হ্যারি, আজ রাতে আর ওখানে যেও না। রন বলল।
কেন যাব না? হ্যারি প্রশ্ন করে।
রন বলল–আমি ঠিক বলতে পারবো না, কিন্তু আমি সামনে বিপদ আশঙ্কা করছি। তুমি কয়েকবারই অল্পের জন্য বেঁচে গেছ। কেয়ারটেকার ফিলচ, অধ্যাপক স্নেইপ আর মিসেস নরিস সবাই তোমার ওপর নজর রাখছেন। তারা তোমাকে দেখতে না পেলেও তোমার আশেপাশেই ছিলেন। যদি হঠাৎ তারা তোমাকে দেখে ফেলেন।
