নিয়ন্ত্রিত শাখাটা ছিল লাইব্রেরির ঠিক পেছনের ডানদিকে। দড়ির ওপর দিয়ে হ্যারি সতর্কভাবে হাঁটতে লাগল। দড়িটা বইগুলোকে মূল লাইব্রেরি থেকে পৃথক করে রেখেছিল। হ্যারির খুব একটা লাভ হলো না। বইয়ের মুছে যাওয়া, মলিন হয়ে যাওয়া স্বর্ণাক্ষরের লেখা হ্যারি বুঝতে পারেনি কারণ সেগুলো ছিল ভিন্ন ভাষায়। কোনও কোনও বইয়ে নামও ছিল না। একটা বই দেখে হ্যারি শিউরে উঠল। মনে হয় রক্তমাখা। হয়ত তার মনের ভুল। কে যেন ফিসফিস করছে। হয়ত বা শোনার ভুল। হঠাৎ নিচের রকে একটা মোটা বই নজরে পড়ল। কালো চামড়ায় রূপালী লেখা। বেশ ভারী। কোলের ওপর নিয়ে হ্যারি বইয়ের পাতা ওলটাতে লাগল।
আরে একি। বইটা যেন আর্তনাদ করছে। অস্ফুট চাপা আর্তনাদ। ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়াতেই তার প্রদীপটা পড়ে গেল। চারদিক আবার অন্ধকার। আরও ভয় পেয়ে গেল হ্যারি। কার যেন পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
দৌড়ে পালাতে গিয়ে হ্যারি দেখল অধ্যাপক স্নেইপ ও কেয়ারটেকার ফিল। তারা অবশ্য হ্যারিকে দেখতে পাননি। পথটা ছিল খুবই সরু। সে পথে গেলে এঁদের দুজনের সাথে ধাক্কা লাগবেই। পোশাক তাকে অদৃশ্য করতে পারলেও তার শারীরিক অবয়বকে অদৃশ্য করতে পারবে না।
হ্যারি দৌড় শুরু করল।
হ্যারি হাঁপাতে হাঁপাতে মালখানায় এসে পৌঁছল।
এতক্ষণ পালাবার সময় তার খেয়ালই ছিল না, সে কোন দিকে যাচ্ছে। চারদিক অন্ধকার থাকায় সে এটাও ঠাহর করতে পারেনি যে, সে এখন কোথায় আছে।
শুনতে পেল, প্রফেসর, আপনার কাছে সরাসরি চলে আসার জন্য আমাকে বলেছিলেন। যাতে রাতে কেউ লাইব্রেরিতে আসে কিনা সেটা দেখা যায়। মনে হয় লাইব্রেরির নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কেউ না কেউ আছে।
হ্যারির মনে হলো তার মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। সে যেখানেই যাবে ফিলচ তা জানতে পারবে। তার কণ্ঠস্বর খুব কাছ থেকেই শোনা যাচ্ছে। ভীত হ্যারি শুনতে পেল যে অধ্যাপক স্নেইপ কথার জবাব দিচ্ছেন।
নিয়ন্ত্রিত এলাকা? এটা তো খুব দূরে নয়। যেই আসুক তাকে আমরা ধরতে পারব।
হ্যারি দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। অধ্যাপক স্নেইপ ও কেয়ারটেকার ফিলচ তার সামনে দিয়ে গেলেও তাকে দেখতে পেল না। আহ্, খুব বাঁচা গেছে। হ্যারি মনে মনে ভাবল।
হ্যারি একটু এগোতেই তার সামনে একটা দরোজা খুলে গেল। দরোজা দিয়ে সে ভেতরে চলে ঢুকলো। অধ্যাপক স্নেইপ ও ফিলচের দৃষ্টি এড়িয়ে হ্যারি একটি কক্ষের ভেতর প্রবেশ করল। আরো একটু আগে বেড়ে যে কক্ষে প্রবেশ করল। দেখে মনে হলো সেটা একটা পরিত্যক্ত ক্লাসরুম!
ডেস্ক আর চেয়ারগুলো দেয়ালের পাশে স্তূপ করে রাখা। ওয়েস্ট পেপারের বাস্কেটগুলো উলটিয়ে রাখা হয়েছে। এরপর হ্যারি যে জিনিসটার ওপর দৃষ্টি দিল সেটা ক্লাসরুমের অংশ মনে হলো না। মনে হলো বাইরে থেকে কেউ এনে এখানে বসিয়ে দিয়েছে।
সিলিংয়ের সমান উঁচু একটি আয়না। সোনার ফ্রেমে বাঁধা। আয়নার চারদিকে খোদাই করে লেখা-এরিসেড স্ত্রা এহরু অয়েত উবে কাফ্রু অয়েত অন ওহসি।
এতক্ষণে হ্যারির ভয় কেটে গেছে। ফিলচ আর স্নেইপেরও কোন সাড়াশব্দ নেই। নিজেকে দেখার জন্য হ্যারি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু কোন প্রতিবিম্ব দেখতে পেল না। সে আরও কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
ভয়ে চিৎকার বন্ধ করার জন্য হ্যারি নিজের মুখে হাত হাত চেপে ধরলো। সে যখন আয়নার দিকে তাকাল তখন সে শুধু নিজেকেই দেখল না দেখল বিশাল জনতা তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ হ্যারি যে কক্ষে দাঁড়িয়েছিল সে কক্ষটি ছিল সম্পূর্ণ খালি। দ্রুত নিশ্বাস নিতে নিতে হ্যারি আবার আয়নায় তাকাল।
হ্যারি আয়নায় অন্তত আরো দশটি মানুষের প্রতিবিম্ব দেখল। সে ঘাড় নাড়িয়ে এদিক–সেদিক তাকাল। না কেউই তো নেই। তাহলে আয়নায় যাদের চেহারা দেখা যাচ্ছে তারা কি সবাই অদৃশ্য।
হ্যারি আবার আয়নায় তাকাল। আয়নায় দেখা গেল একজন মহিলা ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। হ্যারি ভাবল-এই মহিলা যদি সত্যিই সত্যিই তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন তাহলে তার হাতের ছোঁয়া হ্যারি তার ঘাড়ে অনুভব করবে না, তেমন কিছু ঘটল না। তাহলে তাদের অস্তিত্ব কি কেবলই আয়নার মধ্যেই।
মহিলাটি খুবই সুন্দরী। তার ঘন লাল চুল। তার চোখ দুটি হ্যারির চোখের মত। চেহারাও অনেকটা হ্যারির মতো। হ্যারি আয়নাতে দেখল
মহিলা চিৎকার করছেন আবার হাসছেন আবার কাঁদছেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন একজন পুরুষ, ভদ্রলোকের চোখে চশমা। তিনি তার বাহু দিয়ে মহিলাকে জড়িয়ে ধরলেন। লোকের চুল ছিল একটু এলোমেলো। হ্যারি আয়নার এত কাছে এলো যে, তার নাক আয়না স্পর্শ করল।
মা হ্যারি অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠল।
একটু পর আবার উচ্চারণ করল–বাবা।
তাঁরা দুজনেই স্মিতহাস্যে হ্যারির দিকে তাকালেন। হ্যারি আয়নায় অন্য এক মানুষের প্রতিবিম্বও দেখল। তাকে ভাল করে লক্ষ্য করে হ্যারি, তার মত গাঢ় সবুজ দুই চোখ, তার মত নাক, খাটো বৃদ্ধ মানুষটার হাঁটু হ্যারির মতো। হ্যারি এই প্রথমবারের মতো তার পরিবারকে দেখতে পেল।
হ্যারির বাবা–মা স্মিতহাসিতে তার দিকে তাকালেন এবং হাত নেড়ে হ্যারিকে অভিনন্দন জানালেন। হ্যারি ক্ষুধার্ত মানুষের মতো আয়নার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। কিন্তু বাবা–মার সাথে করমর্দন করা গেল না। চরম আনন্দ আর প্রচণ্ড ক্ষোভ হ্যারিকে একাকার করে ফেলল।
