আমি খুব সরলীকৃত ধারণা করেছি যে প্রতিটি একক প্রাণী হিসাব নিকাশ করে বের করে কোনটি তার জিনের জন্য সবচেয়ে ভালো। বাস্তবে যা ঘটে সেটি হচ্ছে জিনপুল পূর্ণ হয়ে যায় সেইসব জিন দিয়ে যা শরীরকে প্রভাবিত করে এমনভাবে যে তারা এমনভাবে আচরণ করে যেন আসলেই তারা এভাবে হিসাব নিকাশ করছে। যাই হোক না কেন এই হিসাব নিকাশ শুধুমাত্র প্রাথমিক স্তরের একটি পরিস্থিতি, আদর্শ পরিস্থিতি যা হওয়ার কথা তার একটি নিকটবর্তী অবস্থান মাত্র। এটি বহু কিছু অবজ্ঞা করেছে, যার মধ্যে আছে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বয়স। যদি আমি কেবলই যথেষ্ট পরিমান খাদ্য গ্রহন করে থাকি কিছুক্ষণ আগেই, একটির বেশী মাশরুম আমি খেতে পারবো না, সেখানে খাদ্য সন্ধানের খবর দিয়ে ডাক দিয়ে আনার নেট বেনিফিট স্কোর হবে আরো বেশী, আমি যদি ক্ষুধার্ত হই সেই পরিস্থিতি থেকে। কোনো শেষ নেই এই ধারাবাহিকভাবে আরো সূক্ষ্মতর হিসাব নিকাশে, যা অর্জন করা যেতে পারে সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সেরা পরিণতি। কিন্তু বাস্তব জীবন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম পরিস্থিতি নয়। আমরা আশা করতে পারি না যে, সত্যিকারের প্রাণীরা যখন কোনো অনুকূল সিদ্ধান্ত নেয় তারা একেবারে প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় গভীরভাবে খতিয়ে দেখে। আমাদের আবিষ্কার করতে হবে, পর্যবেক্ষণ আর পরীক্ষামূলক গবেষণার মাধ্যমে, সত্যিকারের প্রাণীরা আদর্শ লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণের আসলেই কতটা কাছাকাছি আসতে পারে।
শুধু আমাদের আশ্বস্ত করার জন্য যে, আমরা আসলেই এই আত্মগত উদাহরণটি পড়ে বেশী আপ্লুত না হয়ে পড়ি, আমাদের আবার জিনের ভাষায় ফিরতে হবে কিছুক্ষণের জন্য। জীবন্ত শরীরগুলো আসলে যন্ত্র, যা প্রোগ্রাম করা সেই সব জিন দিয়ে, যেগুলো টিকে গেছে। জিন যেগুলো টিকে গেছে তারা সেই কাজটি করেছে এমন পরিস্থিতিগুলোয় যা ‘গড়পড়তায়’ অতীতে সেই প্রজাতিগুলোর পরিবেশে জন্যে বৈশিষ্ট্যসূচক। সেকারণে মূল্য পরিশোধ এবং এর লাভ সংক্রান্ত কোনো আনুমানিক ধারণা নির্ভর করে এর অতীত ‘অভিজ্ঞতার উপর, ঠিক যেমন মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহন করার ক্ষেত্রেও যা ঘটে থাকে। তবে এই ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার একটি বিশেষ অর্থ আছে জিন অভিজ্ঞতায় বা আরো সুনির্দিষ্টভাবে, অতীতের জিনগুলোর টিকে থাকার পরিস্থিতিগুলোর উপর। (যেহেতু জিনরা তাদের সারভাইভাল মেশিনদের কোনো কিছু শেখার দক্ষতা প্রদান করে, কিছু লাভ-ক্ষতির পরিমাপ বলা যেতে পারে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপরে নির্ভর করে।), সুতরাং যতক্ষণ পরিস্থিতির খুব বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না হচ্ছে, এই অনুমান খুব ভালো অনুমান হবে এবং সারভাইভাল মেশিনদের ‘গড়ে’ সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার প্রবণতা থাকবে। যদি পরিস্থিতির কোনো বড় মাপের পরিবর্তন হয়, তাহলে সারভাইভাল মেশিনগুলোর ভুল সিদ্ধান্ত নেবার প্রবণতা থাকবে এবং তাদের জিনকে শাস্তি পেতে হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ তথ্যের উপর নেয়া মানুষের সিদ্ধান্তগুলোর ভুল হবার ঠিক যে-ধরনের প্রবণতা থাকে।
আত্মীয়তার সম্পর্কের পরিমাপগুলোয় নানা ভুল ও অনিশ্চয়তার শিকার হতে পারে। আমাদের অতিসরলীকৃত গণনা যা আমরা এতক্ষণ আলোচনা করেছি, আমরা এমনভাবে কথা বলেছি যেন সারভাইভাল মেশিনরা প্রত্যেকেই জানে কারা তাদের আত্মীয় এবং তাদের সম্পর্কগুলো কতটা নিকট। বাস্তব জীবনে এধরনের নিশ্চিৎ কোনো জ্ঞান শুধুমাত্র মাঝে মাঝে জানা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু সচরাচর ঘটে, সেটি হচ্ছে আত্মীয়তার সম্পর্কটি শুধুমাত্র পরিমাপ করা সম্ভব গড় কোনো একটি সংখ্যা হিসাবে। যেমন, ধরুন যে ‘ক’ এবং ‘খ’ সমান সম্ভাবনা আছে যে তারা, সৎভাই অথবা আসল ভাই হতে পারে। তাদের আত্মীয়তা হয় ১/৪ বা ১/২ কিন্তু যেহেতু আমাদের জানা নেই, তারা আপন, নাকি সৎ ভাই, কার্যত এখানে ব্যবহার করার মত সংখ্যাটি হচ্ছে গড় ৩/৮; যদি এটা নিশ্চিৎ করা সম্ভব হয় তাদের মা একজনই, কিন্তু তাদের বাবা এক হবার সম্ভাবনা শুধুমাত্র ১০ জনে ১ জন। তাহলে ৯০ শতাংশ সময় আমরা নিশ্চিৎ যে তারা আসলে সৎ ভাই এবং মাত্র ১০ শতাংশ সময়ে নিশ্চিৎ যে তারা আপন ভাই, তাহলে কার্যত তাদের আত্মীয়তা হচ্ছে (১/১০X১/২) + (৯/১০X১/৪) = ০.২৭৫।
কিন্তু যখন আমরা এমন কিছু বলি যেমন ‘এটি’ ৯০ শতাংশ নিশ্চিৎ, সেটি আসলে কি বোঝাচ্ছে? আমরা কি বোঝাতে চাইছি কোনো মানব প্রকৃতিবিদকে যিনি দীর্ঘ মাঠ পর্যায়ে গবেষণা শেষে ৯০ শতাংশ নিশ্চিৎ হয়েছেন বা নাকি আমরা বোঝাতে চাইছি প্রাণীরা ৯০ শতাংশ নিশ্চিৎ? কিছুটা ভাগ্য সহায়ক থাকলে এই দুটোই প্রায় একই বিষয়। সেটা দেখার জন্য, আমাদের ভাবতে হবে কিভাবে প্রাণীরা আসলেই তাদের নিকট আত্মীয় কারা, সেটি পরিমাপ করার চেষ্টা করে (৭)।
আমরা জানি কারা আমাদের আত্মীয় কারণ সেটি আমাদের বলা হয়েছে, কারণ আমরা তাদের নাম দিয়েছি, কারণ আমাদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিবাহ প্রথার প্রচলন আছে,এবং কারণ আমরা সেগুলো লিখিতভাবে সংরক্ষণ করি এবং আমাদের ভালো স্মরণশক্তি আছে। বহু সামাজিক নৃতত্ত্ববিদ অত্যন্ত ব্যস্ত সমাজের এই ‘আত্মীয়তা’ বা কিনশীপ নিয়ে, যা তারা গবেষণা করে থাকেন। তারা আসলেই কিন্তু সত্যিকারের জিনগত আত্মীয়তার কথা বোঝাতে চান না বরং কিছুটা ব্যক্তিক আর সামাজিক ধারণায় আমরা যাকে আত্মীয়তা বলি। মানুষর প্রথা ও গোত্রভিত্তিক আচার আচরণ। সাধারণত বিশেষভাবে জোর দেয় কিনশীপ বা আত্মীয়তার উপর: পূর্বপুরুষদের উপাসনা করার ব্যাপারটি খুবই প্রচলিত নানা সমাজে। পারিবারিক দায়বদ্ধতা আর কর্তব্য এবং আনুগত্য আমাদের জীবনের বিশাল একটি অংশ জুড়ে বিরাজমান। জন্মগত শত্রুতা, আন্তঃগোত্র যুদ্ধ খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব হ্যামিলটনের জিনগত তত্ত্বের মাধ্যমে। ইনসেষ্ট বা নিকট সম্পর্কে মধ্যে যৌনাচার অর্থাৎ অজাচারের ট্যাবু বা প্রতিষিদ্ধতা সাক্ষ্য দেয় মানুষের আত্মীয়তা সচেতনাতাটিকে, যদিও এই ইনসেষ্ট প্রতিষিদ্ধতার একটি জিনগতভাবে সুবিধা আছে, সেটি পরার্থবাদীতার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। খুবই সম্ভবত তার কারণ ‘রেসেসিভ’ বা প্রচ্ছন্ন জিনগুলোর ক্ষতিকর প্রভাবগুলো, যা আত্মীয়দের মধ্যে প্রজনন বা আন্তর্জনন এর সময় দেখা যেতে পারে (কিছু কারণে বহু নৃতত্ত্ববিদ এই ব্যাখ্যাটি পছন্দ করেন না)(৮)।
