ধর্মের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

০. ভূমিকার পরিবর্তে

ধর্মের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – রিচার্ড হলোওয়ে / ভাষান্তর : কাজী মাহবুব হাসান
A little History of Religion – Richard Holloway
প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ভূমিকার পরিবর্তে

Religion is the most powerful alternative to God.– Richard Holloway

এই বইটি হাতে নেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ। এটি মূলত রিচার্ড হলোওয়ে’র ‘এ লিটল হিস্ট্রি অব রেলিজিয়ন’ বইটির বাংলা অনুবাদ। ধর্মতত্ত্বে দীক্ষিত এবং এডিনবরা এপিসকোপাল চার্চের প্রাক্তন বিশপ রিচার্ড হলোওয়ে একজন সুখ্যাত লেখক এবং চিন্তাবিদ। সাধারণত ধর্ম নিয়ে যারা লেখেন তাঁদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব কিছু উদ্দেশ্য থাকে, বিশ্বাসীরা ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন, অন্যদিকে ধর্মবিরোধীরা ধর্মের দাবিগুলো সন্দেহাতীতভাবেই ভুল প্রমাণ করতে একই পরিমাণ শক্তি খরচ করেন, এবং তাদের দাবি, এই ভুলটি একই সাথে নিষ্ঠুর এবং ক্ষতিকর। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে রিচার্ড হলোওয়ে সতর্ক গুরুত্ব বণ্টন আর পরিশীলিত ভারসাম্যময় বাক্য ব্যবহারে পৃথিবীর ধর্মগুলোর একটি আকর্ষণীয় আর কৌতূহল-জাগানো সংক্ষিপ্ত ইতিহাস রচনা করেছেন। অবশ্যই তিনি কোনো পক্ষ নেননি এবং তাঁর বিজ্ঞ বিশ্লেষণ বইটিতে উল্লেখিত সবকয়টি ধর্মের প্রতি ন্যায়বিচার করতে সক্ষম হয়েছে, একই সাথে তিনি খুব সহজাতভাবেই ধর্মবিশ্বাসের আবেদন আর এর সমস্যাগুলো ব্যাখ্যা করেছেন।

বিশপ হলোওয়ে একজন অজ্ঞেয়বাদী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন ২০০০ সালে, যখন দীর্ঘ চার দশকের কর্মক্ষেত্র, চার্চ থেকে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। এরপর থেকেই স্পষ্টভাবেই ঈশ্বরবিশ্বাস নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সংগ্রামের কথা তিনি বলেছেন, বিশেষ করে তাঁর বিখ্যাত স্মৃতিকথা লিভিং আলেক্সান্দ্রিয়া বইটিতে। দীর্ঘদিন থেকে হলোওয়ে বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে যুক্ত, যে প্রচেষ্টাগুলো চার্চ এবং রাষ্ট্রের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর মানবাধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করছে। যৌন-পরিচয়, মাদকাসক্তি এবং জীবনীতিশাস্ত্রের ক্ষেত্রে জটিল নৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন এবং আলোচনায় তিনি তাঁর ঈর্ষণীয় প্রজ্ঞা ব্যবহার করেছেন একাধিক বই এবং রেডিও-অনুষ্ঠানে। তবে ঈশ্বরে অবিশ্বাস সত্ত্বেও ধর্ম নিয়ে কোনো ক্ষোভ তিনি মনে পুষে রাখেননি, যে ধর্মকে তিনি তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বিশাল একটি অংশ পেশা হিসাবে নিয়েছিলেন।

এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে যখন বিশ্বব্যাপী বহু হাজার বছরের পরিক্রমায় ধর্মের উত্থান আর (কখনো) পতনের মানচিত্রটি তিনি এঁকেছেন, এর সমান্তরালে তিনি সেই মানব-পরিস্থিতি আর মানসিকতারও অনুসন্ধান করেছেন, যা ধর্মের জন্য মানুষের তীব্র লালসাটিকে প্ররোচিত করেছিল। তিনি লিখেছেন : আমরা এখনও জানতে চাই একটি প্রজাতি হিসাবে আমরা কোথা থেকে এসেছি, এই অকল্পনীয় বিশাল মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান কী, আর ‘একা’ হবার ভয়টি সম্ভবত আমাদের আবেগকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। খুব সরলতম বাক্যে যদি সংক্ষেপিত করা হয়, তাহলে বলা যায়, কিছু আচার আর বিশ্বাসকে ঘিরে সমাজগঠনে কিংবা একজন চূড়ান্ত ন্যায়বিচারকের অস্তিত্ব আছে এমন সান্ত্বনায় অথবা এই জীবনের পরে অন্য একটি জীবনের কল্পনায় ধর্ম আমাদের আশার ক্ষুধা মেটায়।

এই ইতিহাসটির সূচনা ১৩০,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে–যখন আমাদের পূর্বসূরিদের সমাহিত করার আচারে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রমাণ মিলেছিল–আজকের সায়েন্টোলজি, সেকুলার মানবতাবাদী এবং ভীতিকর মৌলবাদী অবধি। এর আগে সময়ের এই বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে যারা কাজ করেছিলেন, তাঁরা পরিশেষে সেই ধর্মটিকে বেছে নিয়েছিলেন–যে ধর্মটি তারা সবচেয়ে ভালো জানেন, হয়তো ব্যক্তিগত পছন্দ, প্রতিপালন অথবা সাংস্কৃতিক কারণে একটি বিশেষ শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু হলোওয়ে এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে তেমন কিছু করেননি, তিনি কোনো পক্ষপাতিত্ব দেখাননি খ্রিস্টানধর্মের নানা শাখার প্রতি, তিনি যেমন একইভাবে প্রামাণিক ছিলেন ইসলাম এবং অ্যাঙলিকানিজমের ক্ষেত্রে। এবং বর্তমানে, মধ্যপ্রাচ্যের মেরুকরণের আবহাওয়ায় ইতিহাসবিদরা প্রায়শই — মুহাম্মদের অধিকাংশ বার্তা মৌলিক ছিল না যখন তিনি ধর্মপ্রচার করতে শুরু করেছিলেন অথবা ইহুদিবাদের কাছে ইসলামের অনেক ঋণ আছে–এই কথাগুলো বলা থেকে বিরত থাকেন, কিন্তু এই বিষয়ে হলোওয়ে কোনো গোঁজামিল দেননি, সুস্পষ্টভাবেই তিনি বলেছেন, মুহাম্মদের বার্তায় কোনো মৌলিকতা ছিল না এবং তিনি এমন কিছু দাবিও করেননি। বরং তার বার্তাটি যা কিছু তারা ভুলে গেছেন সেগুলো স্মরণ করিয়ে দেবার একটি তাগিদ ছিল।

তিনি একইভাবে স্পষ্ট সেই মানুষগুলোর ক্ষেত্রে, যারা স্বর্গীয় মনের একটি ‘নতুন’ অন্তর্দৃষ্টি পেয়েছেন বলে দাবি করেন, এবং তাদের নিজস্ব ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন (এরা প্রায় সবাই পুরুষ); তিনি লিখেছেন : এভাবে ধর্ম খুবই সস্তা, এবং আধ্যাত্মিকতার বাজারে সবসময়ই আরো একটি ধর্ম যুক্ত হবার জায়গা আছে। কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন হতে শুরু করে যখন সেই বিশ্বাসটি ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। আর সেটাই, তিনি বলেন, ঘটেছিল প্রথম শতাব্দীতে জেরুজালেমে যিশুর সাথে এবং সপ্তম শতাব্দীতে মুহাম্মদের সাথে মক্কায়। আর এই বিষয়টি ধর্মীয় সহিংসতার বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

ধর্ম পৃথিবীর সব সহিংসতার কারণ, এমন কিছু ভাবা পশ্চিমে খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। যদিও কিছু বিশেষজ্ঞ জোরালো যুক্তি দিয়েছেন এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে, যেমন, তাদের মধ্যে সুপরিচিত ধর্মীয় ইতিহাসবিদ কারেন আর্মস্ট্রং, হলোওয়ের মতো একসময় তিনিও ধর্মের সাথে যুক্ত ছিলেন (ক্যাথলিক নান), যিনি এখন সেটি ত্যাগ করার পর পুরো বিষয়টিকে একটি নির্মোহ দৃষ্টি দিয়ে দেখে থাকেন। তিনি মনে করেন, ঈশ্বরের নামের দাবি করে সহিংসতা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে সেই সংঘর্ষের কারণগুলো ছিল অন্য রাজনৈতিক, সামাজিক, বর্ণবাদী এবং অর্থনৈতিক। হলোওয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গিটি আংশিক মেনে নিয়েছেন, কিন্তু তিনি ধর্মকে এই অপরাধ থেকে দায়মুক্ত করতে অনিচ্ছুক, তিনি তাগাদা দেন এখনও। ইতিহাসের সবচয়ে খারাপতম সহিংসার কারণ হয়েছে এটি, সুতরাং যদি আমরা ঈশ্বর বলতে বোঝাই এই মহাবিশ্বের একজন প্রেমময় দয়াশীল ঈশ্বর, তাহলে তার হয় কোনো অস্তিত্ব নেই অথবা তাকে পুরোপুরিভাবে ভুল বুঝেছে ধর্ম।

অবশ্যই ১৩০,০০০ বছরের ইতিহাসকে সংক্ষেপ করার প্রচেষ্টাটির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে; যেমন, খ্রিস্টধর্মের মেথোডিস্ট আর ব্যাপ্টিস্টরা হয়তো মনোক্ষুণ্ণ হয়েছেন, যখন তাদের উপেক্ষা করা হয়েছে এবং অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ধর্মগোষ্ঠী কোয়েকাররা এই বইয়ে পুরো একটি অধ্যায় পেয়েছেন। একই সাথে বিশ্বাসের জটিল কাঠামোটিকে মূলসারে পরিস্রবণ করতে গিয়ে, যা বহু হাজার বছর ধরে বিবর্তিত হয়েছে, আর সেগুলো সংক্ষিপ্ত আর স্বচ্ছ বাক্যে ব্যক্ত করতে খানিকটা সমঝোতার আশ্রয় তাকে নিতে হয়। আমাদের সময়ে এই বইটির যদি কোনো বার্তা থেকে থাকে, তবে সেটি এসেছিল যখন হলোওয়ে উল্লেখ করেছিলেন, ধর্মের টিকে থাকার অসাধারণ একটি প্রবৃত্তি আছে; তিনি লিখেছেন : এটি সেই কামারের নেহাই যা বহু হাতুড়ি ক্ষয় করেছে। সুতরাং এই ধারণার ভিত্তিতে বলা যায়, আমাদের পূর্বপরিজ্ঞেয় ভবিষ্যতে এটি তার অস্তিত্ব ধরে রাখবে; আর তাদের সম্বন্ধে আরো কিছু জানতে এই আলোকিত বইটির পাতার মতো আর কোনো উত্তম জায়গা নেই।

কাজী মাহবুব হাসান
সেপ্টেম্বর, ২০১৯

১. উপরে কি কেউ আছেন?

ধর্ম কী? আর কোথা থেকে এটি এসেছে? ধর্ম এসেছে মানব প্রাণীদের মন থেকে, সুতরাং আমাদের কাছ থেকেই এটি এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান যে, পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণীরই ধর্মের প্রয়োজন নেই। আর আমরা যতদূর বলতে পারি তারা কোনো ধর্মও সৃষ্টি করেনি। তার কারণ, আমাদের চেয়ে তারা তাদের জীবনের সাথে অনেক বেশি একাত্ম। সহজাত প্রবৃত্তি অনুযায়ী তারা আচরণ করে। তারা তাদের অস্তিত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতার সাথেই জীবন কাটায় সারাক্ষণ সেই বিষয়ে না-ভেবে। মানব প্রাণী সেই কাজটি করার ক্ষমতা হারিয়েছে। আমাদের মস্তিষ্ক এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে, এটি আমাদের আত্মসচেতন করে তোলে। নিজেদের ব্যাপারে আমরা বেশ কৌতূহলী। কোনোকিছু নিয়ে না-ভেবে আমরা থাকতে পারি না। আমরা চিন্তা না করে থাকতে পারি না।

আর সবচেয়ে বড় যে-বিষয়টি নিয়ে আমরা চিন্তা করি, সেটি এই মহাবিশ্ব নিয়ে, এবং কোথা থেকে এটি এসেছে সেই বিষয়ে। কেউ কি কোথাও আছেন যিনি এটি সৃষ্টি করেছেন? আর সম্ভাব্য সেই কেউ বা কোনোকিছুকে বোঝাতে আমরা যে-শব্দটি ব্যবহার করি সেটি হচ্ছে ‘গড’ বা ‘ঈশ্বর’, গ্রিক ভাষায় ‘থিওস’, আর এমন কেউ যিনি মনে করেন একজনের ঈশ্বর আছেন তাকে বলা হয়। ‘থেইস্ট বা আস্তিক’। আর যিনি ভাবেন কোথাও এমন কেউ বা কিছু নেই আর এই মহাবিশ্বে আমরা একা, তাদের বলা হয় ‘এথেইস্ট বা নাস্তিক’। আর ঈশ্বরকে নিয়ে অধ্যয়ন আর আমাদের কাছে তিনি কী চাইছেন সেই বিষয়ে জ্ঞানার্জনকে বলা হয় ধর্মতত্ত্ব বা ‘থিওলজি’। আরেকটি বড় প্রশ্ন যা আমরা নিজেদেরকে না করে থাকতে পারি না, সেটি হচ্ছে, মৃত্যুর পরে আমাদের সাথে কী ঘটবে? যখন আমরা মারা যাব, সেটাই কি শেষ নাকি এর পরে আরো কিছু ঘটবে? আর যদি কিছু থেকে থাকে, কেমন হবে সেটি?

যা আমরা ধর্ম বলে চিহ্নিত করি, সেটি হচ্ছে এইসব প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যে আমাদের প্রথম প্রচেষ্টা। প্রথম প্রশ্নটির জন্যে এর উত্তর খুব সহজ। মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছে একটি শক্তিশালী সত্তা, যাকে আমরা কেউ কেউ ‘গড’ বা ‘ঈশ্বর’ বলি, এবং যা-কিছু তিনি সৃষ্টি করেছিলেন, সেগুলো নিয়ে তার কৌতূহল আর সেখানে হস্তক্ষেপ করা অব্যাহত রেখেছেন। ঈশ্বর নামের শক্তিশালী সত্তাটি কেমন, এবং আমাদের কাছে এটি কী প্রত্যাশা করে, প্রতিটি ধর্ম সেই বিষয়ে পৃথক পৃথক সংস্করণ প্রস্তাবনা করেছে, কিন্তু সেগুলোর প্রত্যেকটি কোনো-না-কোনো একটি রূপে এর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। সেগুলো আমাদের বলে, এই মহাবিশ্বে আমরা একা নই। আমাদের বোধের সীমানার বাইরেও অন্য বহু বাস্তবতা আছে, অন্য জগৎ। আমরা তাদের ‘অতিপ্রাকৃত’ বলি, কারণ সেগুলো এই প্রাকৃতিক জগতের বাইরে অবস্থিত, যে প্রাকৃতিক জগৎটি আমাদের ইন্দ্রিয়ের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে অভিগম্য।

যদি ধর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাসটি হয়, এই জগতের বাইরে আরো একটি বাস্তবতার অস্তিত্বের ওপর বিশ্বাস, যাকে আমরা ঈশ্বর বলছি, তাহলে কী এই বিশ্বাসটিকে প্ররোচিত বা অনুপ্রাণিত করেছিল, আর কখন এটি শুরু হয়েছিল? এটি শুরু হয়েছিল বহু যুগ আগে। বাস্তবিকভাবে, আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, এমন কোনো সময় আসলেই কখনো ছিল না, যখন মানুষ এই পৃথিবীর বাইরে একটি অতিপ্রাকৃত জগতের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেনি। এবং মানুষ মারা যাবার পর সেই মানুষগুলোর সাথে কী ঘটে সেই বিষয়টি নিয়ে কল্পনা আর ভাবনা হয়তো এইসব কিছুর সূচনা করেছিল। সব প্রাণীই মারা যায়, কিন্তু অন্যদের ব্যতিক্রম, মানুষ তাদের স্বজনদের মৃতদেহ যেখানে তারা মারা যাচ্ছে সেখানে পড়ে পচার জন্যে ফেলে রেখে যায় না। যতদূর আমরা সেই মানুষগুলোর ইতিহাস অনুসরণ করতে পারি, মানুষ স্পষ্টতই মৃতদের জন্যে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করত। আর তারা সেই অনুষ্ঠানটি যেভাবে পরিকল্পনা করতেন, সেটি তাদের সবচেয়ে প্রাচীনতম বিশ্বাসগুলো সম্বন্ধে আমাদের কিছুটা ধারণা দেয়।

অবশ্যই, এর মানে এমন কিছু বলা হচ্ছে না যে, অন্য প্রাণীরা তাদের মৃত সঙ্গীদের জন্যে শোক প্রকাশ করে না। বহু প্রমাণ আছে যে, অনেক প্রাণী সেটি করে। এডিনবরায় ছোট একটি কুকুরের বিখ্যাত মূর্তি আছে, যার নাম ছিল ‘গ্রেফ্রায়ার্স ববি’, সেটি সাক্ষ্য দিচ্ছে কোনো প্রাণী কীভাবে দুঃখ অনুভব করে যখন তারা তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত এমন কাউকে হারায়। ববি মারা গিয়েছিল ১৮৭২ সালে, তার জীবনের শেষ চৌদ্দটি বছর সে তার মৃত মনিব, জন গ্রে’র কবরের উপর শুয়ে কাটিয়েছিল। কোনো সন্দেহ নেই ববি তার বন্ধুর অনুপস্থিতি গভীরভাবে অনুভব করেছিল, কিন্তু জন গ্রে’র মানব-পরিবারই তার জন্য প্রকৃত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, এবং গ্রেফ্রায়ার্স কার্কইয়ার্ডে তাকে সমাহিত করেছিল। এবং তাকে সমাহিত করার মাধ্যমে তারা খুব বৈশিষ্ট্যসূচক মানব-আচরণগুলোর একটি আচরণ সম্পন্ন করেছিলেন। তাহলে কোন বিষয়টি মৃতদের সমাহিত করা শুরু করতে মানুষকে প্ররোচিত করেছিল?

মৃতদের ব্যাপারে যে সুস্পষ্ট ব্যাপারটি আমাদের নজরে পড়ে সেটি হচ্ছে তাদের ভিতরে যা-কিছু ঘটছিল সেটি ঘটা বন্ধ হয়ে গেছে। তারা আর শ্বাস নিচ্ছে না। আর নিশ্বাস নেবার কাজটির সাথে সেই ধারণাটিকে সংশ্লিষ্ট করা ছিল খুব ক্ষুদ্র একটি পদক্ষেপ : আমাদের ভিতরে কিছু বাস করছে, কিন্তু সেটি আমাদের ভৌত শরীর থেকে পৃথক এবং যা এটিকে জীবন দিচ্ছে। এর জন্য গ্রিক শব্দটি ছিল ‘সাইকি’, ল্যাটিন ‘স্পিরিটাস’, এই দুটোই এসেছে সেই ক্রিয়াপদগুলো থেকে, যার অর্থ শ্বাস নেওয়া অথবা ফুঁ দেওয়া। একটি ‘স্পিরিট’ অথবা ‘সোল’ বা ‘আত্মা’ হচ্ছে এমন কিছু, যা কোনো-একটি শরীরকে জীবন্ত করে ও এটিকে নিশ্বাস নেওয়ায়। খানিকটা সময়ের জন্যে একটি শরীরের মধ্যে এটি বাস করে। যখন শরীর মারা যায়, এটি শরীরটিকে ত্যাগ করে চলে যায়। কিন্তু এটি কোথায় যায়? একটি ব্যাখ্যা ছিল, এটি এই জগতের ওপারে অন্য সেই জগতে চলে যায়, ‘আত্মার জগৎ, আমরা পৃথিবীতে যে-জগতে বাস করছি, এটি সেই জগতেরই অপর পিঠ।’

প্রাচীন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া-সংশ্লিষ্ট আচরণগুলো যা আমরা আবিষ্কার করেছি সেগুলো সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করছে, যদিও আমাদের দূরের পূর্বসূরিরা, তারা কী চিন্তা করছিলেন তার নীরব কিছু চিহ্ন আমাদের জন্যে রেখে গেছেন। তখনও লেখার পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি, সুতরাং তাদের চিন্তাগুলো কিংবা তাদের বিশ্বাসের বিবরণ তারা আমাদের জন্যে লিখে রেখে যেতে পারেননি, যেন আজ আমরা সেগুলো পড়তে পারি। কিন্তু তারা যা চিন্তা করেছিলেন সেই বিষয়ে আমাদের জন্যে কিছু ইঙ্গিত রেখে গেছেন। সেগুলো খুঁজে পেতে আমাদের বর্তমান ‘কমন’ সময়ের (যিশুর জন্ম) বেশ কয়েক হাজার বছর আগে ফিরে যেতে হবে। তবে আলোচনায় আরো অগ্রসর হবার আগে ‘বিসিই’, (‘বিফোর কমন এরা’ –কমন সময়ের আগে) শব্দটির একটি ব্যাখ্যা দরকার।

যখন অতীতে কোনো ঘটনা ঘটে, সেগুলো ঘটার দিন-তারিখ চিহ্নিত করার জন্যে কোনো বৈশ্বিক ক্যালেন্ডার বা উপায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ। যা আমরা এখন ব্যবহার করি সেটি ষষ্ঠ শতাব্দীতে (কমন এরা) পরিকল্পনা করেছিল খ্রিস্টীয় জগৎ, যা প্রদর্শন করছে, আমাদের ইতিহাসে ধর্ম ঠিক কতটা প্রভাবশালী হতে পারে। হাজার বছর ধরে ক্যাথলিক চার্চ পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাশালী একটি প্রতিষ্ঠান ছিল, এতই ক্ষমতাবান যে তারা সেই ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করেছিল, যা আমরা এখনো ব্যবহার করছি। ক্যাথলিক চার্চের প্রতিষ্ঠাতা, যিশুখ্রিস্টের জন্ম ছিল এর কেন্দ্রীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁর জন্মসাল হচ্ছে ‘ইয়ার ওয়ান’ বা প্রথম খ্রিস্টাব্দ। যা-কিছু এর আগে ঘটেছে সেগুলো ‘বিফোর ক্রাইস্ট’ বা বি.সি. বা খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এরপরে যে বছরগুলো এসেছিল সেটি হচ্ছে এ.ডি. বা আনো ডমিনি, দ্য ইয়ার অব দ্য লর্ড (আমাদের প্রভুর বছর)।

আমাদের এই সময়ে বি.সি. আর এ.ডি, প্রতিস্থাপিত হয়েছে বি.সি.ই. বা বিফোর কমন এরা অথবা সি.ই. বা উইদইন কমন এরা শব্দগুলো দিয়ে, যে শব্দগুলো কোনো ধর্মীয় ইঙ্গিত ছাড়াই অনুবাদ করা যেতে পারে : হয় খ্রিস্টীয় যুগের পূর্বে বা বি.সি.ই. এবং খ্রিস্টীয় যুগের মধ্যে বা সি.ই. অথবা কমন এরার পূর্বে বা বি.সি.ই. অথবা কমন এরার মধ্যে বা সি.ই.। কীভাবে এই শব্দগুলো বুঝবেন সেটি আপনি নিজেই বাছাই করতে পারেন। এই বইয়ে আমি বি.সি.ই. ব্যবহার করব সেই ঘটনাগুলোকে চিহ্নিত করতে, যেগুলো ঘটেছিল খ্রিস্টের জন্মের আগে অথবা কমন এরার আগে। কিন্তু লেখার মধ্যে বিশৃঙ্খলা যেন সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আমি সি.ই. শব্দটির পরিমিত ব্যবহার করব এবং শুধুমাত্র যেখানে প্রয়োজনীয় সেখানেই সেটি শুধু ব্যবহার করব। সুতরাং যদি এমন কোনো তারিখ আপনার চোখে পড়ে যার পরে বি.সি.ই কিংবা সি.ই, শব্দটি নেই, আপনি জানবেন যে এটি উইথইন দ্য ক্রিশ্চিয়ান অথবা কমন এরা হবে (অর্থাৎ খ্রিস্টাব্দ)।

যাই হোক, ১৩০,০০০ বি.সি.ই. (খ্রিস্টপূর্ব) থেকেই আমাদের পূর্বসূরিরা যেভাবে তাদের মৃতদের সমাহিত করতেন সেখান থেকে তাদের একধরনের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রমাণ আমরা পাই। কবরের মধ্যে মৃতদেহের পাশে খাদ্য, ব্যবহার করার মতো হাতিয়ার বা যন্ত্র আর অলংকার সাজিয়ে রাখা হয়েছে, এমন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, যা মৃতরা একধরনের মৃত্যুপরবর্তী জীবনের পথে যাত্রা করে এবং সেই যাত্রার জন্যে তাদের প্রস্তুত করে প্রেরণ করা প্রয়োজন, এমন একধরনের বিশ্বাসের উপস্থিতি প্রস্তাব করে। আরেকটি আচরণ ছিল, মৃতদের শরীর লাল গিরিমাটি দিয়ে চিত্রিত করা; হয়তো চলমান জীবনের প্রতীকী প্রকাশ ছিল সেটি। এটি আবিষ্কৃত হয়েছিল আপাতত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীনতম সমাধিক্ষেত্রে, একটি মা ও শিশুর সমাধি ছিল এটি, ইজরায়েলের কাফজে হতে, এটির সময়কাল প্রায় ১০০,০০০ বি.সি.ই. (খ্রিস্টপূর্ব)। ঠিক সেই একই আচরণ আবার খুঁজে পাওয়া যায় অর্ধেক পৃথিবী দূরত্বে অস্ট্রেলিয়ার লেক মুংগো এলাকা, ৪২,০০০ বি.সি.ই. সময়কালের, যেখানে সমাহিত ব্যক্তির শরীর চিত্রিত ছিল লাল গিরিমাটি দিয়ে। মৃতদেহের শরীর-চিত্রায়ন মানবতার সবচেয়ে বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ ধারণাগুলোর উন্মেষকাল হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, সেটি হচ্ছে প্রতীকী চিন্তা। ধর্মে এমন চিন্তা খুব ব্যাপকভাবেই উপস্থিত, সুতরাং বিষয়টি বোঝা খুব জরুরি।

অন্য অনেক উপযোগী শব্দের মতো ‘সিম্বল’ শব্দটি এসেছে গ্রিকভাষা থেকে। এর মানে সেই জিনিসগুলো একসাথে জড়ো করা যা আলাদা হয়ে গেছে, যেভাবে কোনো ভাঙা প্লেটের টুকরোগুলো আঠা দিয়ে লাগিয়ে একসাথে করতে পারেন আপনি। তারপর একটি প্রতীক একটি বস্তুতে পরিণত হয় যদি সেটি কোনোকিছুর পক্ষে অথবা কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু তারপরও এর সেই ধারণাটি থাকে যা নানা জিনিসকে যুক্ত করার বিষয়টি ইঙ্গিত করে, কিন্তু শুধুমাত্র ভাঙা প্লেটের টুকরো আঠা দিয়ে জোড়া লাগানোর চেয়েও এটি আরো বেশি জটিল রূপ ধারণ করে। প্রতাঁকের একটি চমৎকার উদাহরণ হচ্ছে জাতীয় পতাকা; যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্টার আর স্ট্রাইপস’। যখন আমরা এই নক্ষত্র আর লাল সাদা দাগগুলো দেখি, সেটি আমাদের মনে যুক্তরাষ্ট্র নামের একটি দেশের প্রতি তথ্যনির্দেশ করে। এটি এর প্রতীকী রূপ, এর পরিবর্তে যা প্রকাশ করা যেতে পারে।

প্রতীক মানুষের কাছে পবিত্র হয়ে ওঠে, কারণ ভাষায় যতটুকু প্রকাশ করা। সম্ভব, সেগুলো তারচেয়েও আরো গভীর আনুগত্যের প্রতিনিধিত্ব করে। আর সেকারণে সবাই তাদের প্রিয় প্রতীকগুলোর অবমাননা দেখতে ঘৃণাবোধ করেন। পুরোনো একটি কাপড় আগুন দিয়ে পুড়ানোর মধ্যে দোষের কিছু নেই, কিন্তু যদি ‘সেটি’ ঘটনাক্রমে আপনার নিজের জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করে, এটি আপনাকে ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে। যখন প্রতীকগুলো ধর্মীয়, কোনো একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে পবিত্র, সেগুলো আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর সেগুলোর অপমান উন্মত্ত ক্রোধের সূচনা করতে পারে। আপনার মনের মধ্যে প্রতাঁকের ধারণাটি কিছুক্ষণ ধরে রাখুন, কারণ এই বইয়ে এই ধারণাটির পুনরাবৃত্তি হবে। একটি জিনিস, যেমন, লাল গিরিমাটি, অন্যকিছুর প্রতিনিধিত্ব করছে, সেই চিন্তাটি, যেমন, সেই বিশ্বাসটি, মৃতরা তাদের মৃত্যুর পরে অন্য একটি জগতে তাদের নতুন জীবন শুরু করে।

প্রতীকী চিন্তার আরো একটি উদাহরণ হচ্ছে যেখানে মৃতদের সমাহিত করা হয়েছে, সেটি চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে যদি তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ কোনো ব্যক্তি হন। কখনো তাদের শুইয়ে রাখা হতো দানবীয় পাথরের টুকরোর নিচে, কখনো খুব সতর্কভাবে নির্মিত পাথরের কক্ষে যাদের ‘ডলমেন’ বলা হয়, যা মূলত দুটি খাড়া করে দাঁড় করানো পাথর, যা আরো একটি বড় পাথরকে এর ছাদ হিসাবে ধরে রাখে। মৃতদের জন্যে নির্মিত সবচেয়ে নাটকীয় স্মারকস্তম্ভ হচ্ছে মিশরের গির্জায় পিরামিডগুলো। কবর ছাড়াও, পিরামিডগুলোকে ভাবা হয় একধরনের উৎক্ষেপণ এলাকা হিসাবে, যেখান থেকে সেই পিরামিডগুলোর রাজকীয় বাসিন্দারা অমরত্ব অভিমুখে যাত্রা করতেন।

সময়ের সাথে সমাহিত করার আচার শুধুমাত্র আরো বিস্তারিতভাবে জটিলই হয়নি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেগুলো রূপান্তরিত হয়েছিল ভয়ংকর নিষ্ঠুর একটি আচরণেও, যেখানে মৃতব্যক্তিদের এই জীবন-পরবর্তী অন্য জীবনে সবধরনের স্বাচ্ছন্দ্য আর মর্যাদা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে জোরপূর্বক বিসর্জন দেওয়ার মাধ্যমে। স্ত্রী ও ভৃত্যদেরও তার সাথে সেখানে পাঠানো হতো। এখানে লক্ষ করা দরকার, শুরু থেকেই ধর্মের একটি নিষ্ঠুর দিক ছিল, কোনো একক ব্যক্তির জীবনকে যা খুব সামান্যই মূল্য দিয়েছে।

এইসব ইঙ্গিতগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলে বোঝা যায়, মৃত্যুকে আমাদের পূর্বসূরিরা অস্তিত্বের আরেকটি স্তরে প্রবেশ হিসাবে দেখেছিলেন, যা এই জীবনের একটি অন্য সংস্করণ হিসাবে কল্পিত হয়েছে। এই পৃথিবী ছাড়িয়ে আরেক পৃথিবীর ওপর তাদের বিশ্বাসটিকে আমরা একনজর দেখতে পাই, যে-জীবনের সাথে এই জীবন সংযুক্ত, শুধুমাত্র দরজা হিসাবে মৃত্যু যে জীবনদুটির মাঝে দাঁড়িয়ে আছে।

এ পর্যন্ত ধর্মীয় বিশ্বাস দেখতে এমনই ছিল, যেন সেটি অনুপ্রাণিত অনুমান নির্ভর কোনো ধারণার ওপর ভর করে অর্জিত হয়েছে। আমাদের পূর্বসূরিরা। নিজেদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কোথা থেকে এই পৃথিবী এসেছে এবং তারা ধারণা করেছিলেন, এটি অবশ্যই সৃষ্টি করেছে কোনো উচ্চতর শক্তিমান সত্তা, যিনি এই পৃথিবীর বাইরে কোথাও আছেন। তারা নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া মৃতদের লক্ষ। করেছিলেন এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, তাদের আত্মা অবশ্যই তাদের শরীর ত্যাগ করেছে, যা একসময় সেই শরীরে বাস করত এবং এখন সেটি অন্য কোথাও চলে গেছে।

কিন্তু ধর্মের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীর সদস্যরা কিন্তু শরীরত্যাগী আত্মার গন্তব্য হিসাবে এই জগতের সীমানা পেরিয়ে অন্য কোনো জগতের অস্তিত্ব শুধুমাত্র ‘কল্পনা’ বা ‘অনুমান’ করেনি। তারা আমাদের বলেছেন যে, তারা সেই জগতে গিয়েছেন, এবং সেই জগৎটি তাদের কাছে এসেছে। আমাদের কাছে সেটি কী প্রত্যাশা করেছে সেটি তারা শুনেছেন। তাদের ওপর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেন তারা সেই নির্দেশগুলোর কথা অন্যদের বলেন, তারা কী দেখেছেন আর শুনেছেন। সুতরাং তারা দাবি করেছেন সেই বার্তাগুলো, যা তাদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে এবং তারা গ্রহণ করেছেন। তারা বহু অনুসারীদের আকৃষ্ট করে। থাকেন, যারা তার কথার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং তাদের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন কাটাতে শুরু করেন। আমরা তাদের বলি নবী, প্রফেট কিংবা প্রাজ্ঞ সাধু। এবং এদের মাধ্যমেই নতুন ধর্মগুলোর জন্ম হয়েছিল।

তারপর অন্যকিছু ঘটেছিল। তারা যে-গল্পগুলো বলেছিলেন সেটি তাদের অনুসারীরা মুখস্থ করেছিলেন। প্রথমে এটি মুখে-মুখে হস্তান্তরিত হয়েছে। কিন্তু একটি সময় সেগুলো কাগজের উপর লেখা হয়েছিল। তারপর এটি সেই বিশেষ বইয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল, যেগুলোকে আমরা বলি, হলি স্ত্রিপচার বা পবিত্র গ্রন্থ। বা ধর্মগ্রন্থ, শাস্ত্র ইত্যাদি। দ্য বাইবেল! দ্য বুক! এবং এটাই ধর্মের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতাঁকে রূপান্তরিত হয়েছিল। আসলেই এটি একটি বই অবশ্যই, মানুষই এটি লিখেছে। আমরা এর ইতিহাস অনুসরণ করতে পারি। কিন্তু এর শব্দগুলোর মাধ্যমে অন্য জগতের বার্তা আমাদের জগতে নিয়ে আসা হয়েছে। এই বইটি সীমাবদ্ধ সময় আর অনন্তকালের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করেছে। মানুষকে এটি স্বর্গীয় সত্তার সাথে যুক্ত করেছে। আর সে-কারণে এটিকে বিস্ময়কর শ্রদ্ধার সাথে দেখা হয় আর গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়। আর সে-কারণে যখন এটিকে ধ্বংস কিংবা অবজ্ঞা করা হয়, তখন বিশ্বাসীরা খুবই অপছন্দ করেন।

ধর্মের ইতিহাস হচ্ছে এইসব নবী আর সাধুদের গল্প এবং যে-আন্দোলনগুলো তারা শুরু করেছিলেন এবং যে-ধর্মগ্রন্থগুলো লেখা হয়েছে তাদেরকে নিয়ে। কিন্তু এটি বেশ বিতর্কিত আর মতানৈক্যেরও একটি বিষয়। এইসব নবীদের, এমনকি কারো কারো আদৌ অস্তিত্ব ছিল কিনা সেটি নিয়ে সন্দেহবাদীরা প্রশ্ন তুলেছেন। এইসব স্বর্গীয় বা ঈশ্বর বা তার প্রেরিত কোনো প্রতিনিধির দৃশ্য বা কণ্ঠস্বর নিয়ে করা নবীদের দাবিগুলো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। অবশ্যই যুক্তিসংগত, কিন্তু মূল বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হওয়ার একটি সম্ভাবনা আছে। যা সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে সেটি হচ্ছে, তাদের নিয়ে বলা সব গল্পে তাদের অস্তিত্ব আছে, যে-গল্পগুলো বহু। হাজার কোটি মানুষের জন্যে এখনো অর্থবহ।

এই বইটিতে আমরা সেই গল্পগুলো পড়ব, ধর্মগুলো আমাদেরকে যে গল্পগুলো এর নিজের সম্বন্ধে বলেছে, আসলেই এভাবে অতীতে ঘটনাগুলো ঘটেছিল কিনা সারাক্ষণ এমন কিছু জিজ্ঞাসা না করে। কিন্তু যেহেতু সেই প্রশ্নটিকে পুরোপুরি অবজ্ঞা করাও ভুল হবে, আমরা পরে অধ্যায়টি চিন্তা করে কাটাব, আসলেই কী ঘটে যখন ঐসব নবী আর সাধুরা কোনো ঐশী দৃশ্যের দ্রষ্টা হন বা কণ্ঠস্বর শোনেন। এইসব নবীদের মধ্যে একজনের নাম ছিল ‘মোজেস’।

০২. দরজাগুলো

ধরুন ১৩০০ বি.সি.ই. (খ্রিস্টপূর্বাব্দে) একদিন সকালে মিশরের সাইনাই মরুভূমিতে আপনি নিজেকে আবিষ্কার করলেন। আপনি হয়তো দাড়িওয়ালা একজন ব্যক্তির দেখা পেতে পারেন, যিনি নগ্নপায়ে একটি কাঁটাঝোঁপের সামনে নতজানু হয়ে আছেন। আপনি দেখবেন তিনি গভীর মনোযোগের সাথে ঝোঁপের কথা শুনছেন, তারপর তিনি ঝোঁপটার সাথে কথা বলছেন, তারপর তিনি আবার শুনতে শুরু করেন। অবশেষে উদ্দেশ্যমূলক একটি সংকল্প নিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন, এবং সেখান থেকে দ্রুত হেঁটে চলে গেলেন। এই মানুষটির নাম হচ্ছে ‘মোজেস’। ধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত নবীদের একজন ও ইহুদি ধর্মের একজন প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। একদিন তাকে নিয়ে যে গল্প লেখা হবে সেটি বলবে, এইদিনে জ্বলন্ত একটি ঝোঁপ থেকে ঈশ্বর তার সাথে কথা বলেছিলেন, এবং তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ক্রীতদাসদের একটি দলের নেতৃত্ব দিয়ে মিশর থেকে প্যালেস্টাইনে, তাদের প্রতিশ্রুত দেশে স্বাধীনতার পথে নিয়ে যেতে।

আপনার কাছে, যিনি বিষয়টি দেখছেন, কাঁটার সেই ঝোঁপটি কোনো আগুনে প্রজ্বলিত ছিল না, যা কিনা এটিকে পুড়িয়ে দাহ করতে পারে। উজ্জ্বল লাল রঙের ক্ষুদ্রাকার ফল দিয়ে এটি পূর্ণ ছিল। এবং যখন আপনি লক্ষ করবেন, মোজেস ঠিক কতটা মনোযোগী যখন কিনা সে ঝোঁপের কথা শুনছিল, যদিও আপনি শুনতে পারবেন না তাকে যা-কিছু তখন বলা হচ্ছিল, কিন্তু আপনি তার প্রতিউত্তরগুলো বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু এইসব কিছু দেখে আপনি কিন্তু বিশেষভাবে বিস্মিত নন। আপনার ছোটবোনও তার পুতুলের সাথে এভাবে প্রাণবন্তভাবে কথা বলে। আর আপনার একজন অল্পবয়সি আত্মীয় আছেন, যিনি কাল্পনিক এক বন্ধুর সাথে কথা বলেন, যে বন্ধুটি তার কাছে তার বাবা-মার মতোই বাস্তব। আপনি হয়তো শুনেছেন যে, মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরা অদৃশ্য শ্রোতাদের সাথে বেশ গভীরভাবেই কথোপকথন করতে পারেন। সুতরাং আপনি সেই ধারণাটির সাথে অভ্যস্ত, কিছু মানুষ আছেন যারা অন্যের কণ্ঠস্বর শুনতে পান, যা আর কেউই শুনতে পায় না।

কিন্তু আসুন, মোজেসের কাছ থেকে কিছুক্ষণের জন্য আমরা অন্যদিকে তাকাই এবং সেই অদৃশ্য বক্তার কথা ভাবি, যিনি তাকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। আপনার মনের সেই ভাবনাটিকে স্থির করুন, সময় ও স্থানের বাইরে একটি অদৃশ্য বাস্তবতার ধারণা, যা সরাসরি মানুষের সাথে কথা বলতে পারে। সেই চিন্তাটিকে বোঝার চেষ্টা করুন, তাহলে আপনি ধর্মের কেন্দ্রীয় ধারণাটিকে উপলব্ধি করতে পারবেন। এই মহাবিশ্বে আমাদের শারীরিক সব ইন্দ্রিয়ের কাছে যা-কিছু লভ্য এবং বোধগম্য, তার বাইরে একটি শক্তি আছে এবং এটি নিজেকে উন্মোচিত করে অথবা জানান দেয় সেইসব বিশেষ মানুষগুলোর কাছে, যারা সেই বার্তাগুলো অন্যদের কাছে ঘোষণা ও প্রচার করে। আপতত আমরা এই বক্তব্যটির সাথে একমত কিংবা ভিন্নমত, কোনোটাই পোষণ করছি না। আমরা শুধু মূল ভাবনাটি খোঁজার চেষ্টা করছি। একটি অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্ব আছে, যাকে আমরা ঈশ্বর বা গড বলছি এবং এটি আমাদের সাথে তার সম্পর্ক ধরে রেখেছেন!’ –এটাই হচ্ছে দাবি। আমরা যখন এই ইতিহাস অনুসন্ধানে আরো অগ্রসর হব, জানব যে ভিন্ন। ভিন্ন ধর্মগুলোর প্রত্যেকটিরই সেই দাবিটির ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ আছে, এবং আমাদেরকে সেগুলো সেটি বলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই কোনো প্রশ্ন ছাড়াই স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছেন, হ্যাঁ, এটি সেখানে আছে। আর তাদের বিশ্বাসের রূপটি এর অস্তিত্বের প্রতি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিউত্তর।

আসুন আবার মোজেসের গল্পে ফেরা যাক, এবং এই মরুভূমির অভিজ্ঞতাটির বিবরণে তার দিকটির প্রতি মনোযোগ দিই। আপনার দৃষ্টিতে ঝোঁপটি যেমন আগুনে জ্বলন্ত ছিল না, তেমনি আপনি সেখান থেকে বের হয়ে আসা ঈশ্বরের গম্ভীর গলার স্বরও শুনতে পারেননি। কিন্তু তাহলে মোজেস কীভাবে সেখান থেকে আগুনের শিখার তাপ অনুভব করেছিলেন এবং এত গভীর মনোযোগের সাথে তাকে কিছু করতে নির্দেশ দেওয়া সেই কণ্ঠস্বর শুনেছিলেন, এবং সেই নির্দেশ তিনি মান্য করছিলেন? তাহলে কি এটি শুধুমাত্র তার মস্তিষ্কের মধ্যে ঘটেছিল, যে কারণে সেখানে কী ঘটছে সেটি আপনি দেখতে পারেননি? অথবা, তার মন কি অন্য কোনো মনের সংস্পর্শে এসেছে যা আপনার ইন্দ্রিয়গুলোর বোঝার সীমানার বাইরে? যদি ধর্মের সূচনা হয়ে থাকে সাধু ও নবীদের মনের অভিজ্ঞতাগুলো দিয়ে, আপনি যদি তাদেরকে নিরপেক্ষভাবে বিচার করেন এবং কল্পনা হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের বাতিল করে না দেন, তাহলে আপনাকে বিবেচনা করতে হবে কিছু মানুষ কি সেই বাস্তবতাগুলোর প্রতি বেশি উন্মুক্ত কিনা, আমরা বাকিরা যার প্রতি অন্ধ এবং বধির।

একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমাদের মন দুটি ভিন্ন স্তরে কাজ করে, যেমন, একতলা কোনো বাড়ির মতো, যেখানে নিচে একটি বেসমেন্ট অথবা সেলার থাকবে। যখন স্বপ্ন দেখি, আমরা সেই পার্থক্যটির অভিজ্ঞতা অনুভব করি। দিনের বেলায় সচেতন মন উপরতলায় জেগে আছে, এটি তার পরিকল্পিত সুশৃঙ্খল জীবন কাটায়। কিন্তু যখনই আলো নিভিয়ে ফেলা হয় আর আমরা রাতে ঘুমাতে যাই, নিচের তলার সেলারের দরজা খুলে যায়, আমাদের স্বপ্ন-দেখা মনকে এলোমেলো অসংলগ্ন নানা অপ্রকাশিত কামনা আর ভুলে যাওয়া আতঙ্ক দিয়ে পূর্ণ করে। সুতরাং যদি আমরা আপাতত সেই প্রশ্নটি একপাশে সরিয়ে রাখি, আমরা যা-কিছু চোখে দেখি তারচেয়ে আরো অন্য কোনো মহাবিশ্ব আছে কিনা, আমরা অন্তত স্বীকার করব যে আমাদের জীবনে, নিয়মিত, জেগে-থাকা সময়গুলো ছাড়াও আরো কিছু আছে। মানবমনের মাটির নিচে একটি বেসমন্টের মতো আছে যাকে বলা হয় সাবকনশাস বা অবচেতন এবং যখন আমরা ঘুমাই, এর দরজা খুলে যায় এবং সেই দরজা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে বহু চিত্র আর কণ্ঠস্বর, যাদের আমরা স্বপ্ন বলি।

ধর্মের ইতিহাসে আমরা সেই মানুষগুলোকে খুঁজে পাব, যারা জাগ্রত অবস্থায় এ-ধরনের সাক্ষাতের মুখোমুখি হয়ে থাকেন, যা বাকি আমরা শুধু স্বপ্নেই দেখতে পাই। আমরা তাদের নবী (প্রফেট) আর স্বপ্নদ্রষ্টা বলি। কিন্তু অন্য একটি উপায় হচ্ছে, সৃজনশীল শিল্পী হিসাবে তাদেরকে ভাবা, যারা চিত্রকর্ম উপন্যাসে তাদের সেই অভিজ্ঞতাগুলো ব্যক্ত না করে বরং বাধ্য হন সেগুলোকে বার্তায় অনুবাদ করতে, যা বহু মিলিয়ন মানুষকে তারা যা-কিছু দেখেছেন আর শুনেছেন সেটি বিশ্বাস করতে প্ররোচিত করেন। আর এই রহস্যময় কার্যকলাপের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণটি ছিলেন মোজেস। কোনোকিছু তার সংস্পর্শে এসেছিল কোনো-না-কোনো একটি জায়গা থেকে, আর ইতিহাসে সেই সাক্ষাতের ঘটনাটি ইহুদি জনগোষ্ঠীর জীবন চিরকালের জন্যে বদলে দিয়েছিল। কিন্তু সেই কিছুটা কী ছিল আর সেটি কোথা থেকে এসেছিল? এটি কি তার ভিতরে ছিল? নাকি তার বাইরে ছিল? অথবা একই সাথে কি সেটি ঘটতে পারে?

সাইনাই মরুভূমিতে মোজেসের সাথে যা ঘটেছিল, সেটিকে একটি উদাহরণ হিসাবে নিয়ে এবং সচেতন আর অবচেতন মনের মধ্যে দরজার রূপকটি আমাদের বোঝার সুবিধার্থে ব্যবহার করে, আমি একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রস্তাব করছি, যা ধর্মীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে চিন্তা করতে তিনটি ভিন্ন উপায় উপস্থাপন করে।

এই ধরনের কোনো ঘটনায়, অবচেতন আর সচেতন মনের মধ্যবর্তী দরজাটি খুলে যায়। এরপর যা ঘটে সেটি স্বপ্নের মতো। নবীরা বিশ্বাস করতেন এটি আসছে তাদের বাইরে থেকে, কিন্তু এটি আসলে তাদের নিজেদের অবচেতন মন থেকে এসেছিল। যে কণ্ঠস্বর তারা শোনেন, সেটি সত্য। এটি তাদের সাথে কথা বলে। কিন্তু এটি তাদের নিজেদেরই কণ্ঠ, যা তাদের নিজেদের মনের মধ্যে থেকে আসছে। আর সে-কারণে আর কেউ সেটি শুনতে পারে না।

অথবা এটি হতে পারে যে, দুটি দরজা উন্মুক্ত থাকে নবীদের এই ধরনের অভিজ্ঞতায়। অবচেতন অথবা স্বপ্নরত মন হয়তো অতিপ্রাকৃত সেই জগতে প্রবেশ করে, সেই জগৎটি তার জন্যে আরো অভিগম্য হয়ে ওঠে। যদি আসলেই অন্য একটি বাস্তবতা থেকে থাকে অথবা আমাদের মনে সীমানার বাইরে আরেকটি মনের অস্তি ত্ব থাকে, আমাদের সাথে সেটির সংযোগ করার চেষ্টা করাটা খুব অসম্ভাব্য নয়। নবীদের সাথে এই ঐশী প্রকাশ বা উন্মোচনে যা ঘটে সেটি হচ্ছে, তারা সেই অন্য বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন এবং এর মন তাদের মনের সাথে কথা বলেছে। এবং তারা বাকি পৃথিবীর সবাইকে জানিয়েছিলেন যা তাদের বলা হয়েছে।

এই ‘এক দরজা’ তত্ত্ব আর ‘দুই দরজা’ তত্ত্বের মাঝখানে একটি মধ্যবর্তী অবস্থান আছে। হ্যাঁ, মানব-অবচেতনের হয়তো দুটি দরজা থাকতে পারে। আর মানবমনের হয়তো আসলেই এমন কিছুর সাথে সাক্ষাৎ হতে পারে। কিন্তু আমরা জানি অন্য একটি মন বোঝার ক্ষেত্রে ঠিক কতটা অনির্ভরযোগ্য হতে পারে মানুষ। সুতরাং স্বর্গীয় মনের সাথে সম্মিলন নিয়ে তাদের দাবিগুলোর ব্যাপারে আমাদের আসলে সতর্ক হতে হবে। আসলেই হয়তো অবচেতন মনের দুটি দরজা থাকতে পারে। কিন্তু যে-দরজাটি অন্য একটি জগতের দিকে উন্মুক্ত হয়, সেটির পুরোপুরি ভাবে খোলার সম্ভাবনা কম, সুতরাং নবীরা দেখেছেন বা শুনেছেন বলে দাবি করে থাকেন, সে-ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হতে পারি না।

মরুভূমিতে মোজেসের সাথে আসলে কী ঘটেছিল এবং ধর্মের প্রতি যে তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি যা এটি প্রস্তাব করছে, সেগুলো আবা। বুঝতে আসুন আমরা আবার দরজার রূপকটা ব্যবহার করি। আপনি যদি ‘এক দরজা’ দৃষ্টিভঙ্গি নেন, মোজেসের একটি স্বপ্ন ছিল যা মিশরে তার স্বজাতির মানুষদের পরিত্রাতা হতে তাকে শক্তি দিয়েছিল এবং সংকল্পবদ্ধ করেছিল। যে গল্পটি আমরা আরো বিস্তারিত দেখব আগামী অধ্যায়ে। এই অভিজ্ঞতাটি ছিল আন্তরিক। এটি ঘটেছিল, কিন্তু পুরোপুরিভাবে এটি তার অবচেতন মন থেকে এসেছিল। ধর্মের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গির ভালো একটি সমরূপ উদাহরণ এসেছে পুরনো সিনেমাহল থেকে, যা আমি শৈশবে খুব ভালোবাসতাম। সেই দিনগুলোয় চলচ্চিত্রগুলো প্রস্ফুটিত করা হতো সেলুলয়েডের ফিতার উপর। সিনেমাহলের পেছনে ব্যালকনির উপরে একটি বুথ বা কক্ষ থাকত, যেখান থেকে ছবিটি বিপরীতদিকের দেয়ালে রুপালি একটি পর্দায় প্রক্ষেপ করা হতো। আমরা যেখানে বসে থাকতাম দর্শক হিসাবে, সেখান থেকে আমরা শুধুমাত্র আমাদের সামনের দিকটা দেখতাম, কিন্তু এটি আসলে আসছে আমাদের পেছনের একটি যন্ত্র থেকে। ধর্ম নিয়ে ভাবার একটি উপায় হচ্ছে, এটি জীবনের রুপালি পর্দার উপর অবচেতন মনের ভয় আর কামনাগুলোর একটি প্রক্ষেপণ। মনে হতে পারে যে, ধর্মের উপস্থিতি আছে আমাদের বাইরে এবং এর একটি নিজস্ব জীবন আছে। কিন্তু আসলে এটি আসছে সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিজেদের কল্পনার গভীর থেকে। এটি সম্পূর্ণভাবে মানুষেরই একটি উৎপাদন।

আপনি এখানে থামতে পারেন, এবং এখানে সেটি বাতিল করতে পারেন অথবা অধিকাংশ বিবরণ মেনে নিয়ে এবং দ্বিতীয় দরজার ধারণায় প্রবেশ করতে পারেন। ধর্মীয় অভিজ্ঞতার মানবিক দিকটি খুঁটিনাটি বিষয় পরিবর্তন না করেই, বিশ্বাস করা সম্ভব যে, এটিও ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছে। আমরা সেই কণ্ঠস্বর শুনতে পারি না যা মোজেস শুনতে পাচ্ছেন, এর কারণ হচ্ছে এটি সেই ঘটনা যেখানে ঈশ্বরের মন সরাসরি মোজেসের মনের সাথে সংযোগ করছে। আমাদের কাছে যা অদৃশ্য আর শ্রবণের সীমানার বাইরে, এটি ছিল আরেকটি বাস্তবতার সাথে সত্যিকারের একটি সাক্ষাৎকার। আমরা পুরোপুরিভাবে সেই ঘটনাটিকে বুঝতে পারি না, কিন্তু আমরা এর পরিণতিগুলো দেখেছি।

দ্বিতীয় দরজার ধারণাটিকে আরেকটি ভিন্ন রূপ দেওয়া যেতে পারে সেই বিষয়টি মনে রেখে যে, প্রতিদিন অন্যদের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় মানুষ প্রায়শই কত সহজে ভুল-বোঝাবুঝির স্বীকার হয়। ঈশ্বরের সাথে সাক্ষাতের যে দাবিগুলো তারা করছেন, সেই সম্বন্ধে বিচার করার সময় তাদের সতর্ক হওয়া উচিত হবে এবং সংশয় আর পরিমিত সংযমের সাথেই তাদের বিবেচনা করা উচিত। এর মানে হচ্ছে ধর্মীয় দাবিগুলোর ব্যাপারে আমাদের সতর্ক পর্যালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ করা উচিত, শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব আত্মবিশ্লেষণের ভিত্তিতে সেটি গ্রহণ করা উচিত নয়।

সুতরাং আপনি একজন অবিশ্বাসী, একজন সত্যিকার বিশ্বাসী অথবা সচেতন সমালোচনামূলক বিশ্বাসী হতে পারেন। যখন আপনি এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাববেন হয়তো আবিষ্কার করবেন সময়ের সাথে এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে আপনি জায়গা বদল করেছেন, যেমন অনেকেই করেন। এই বইতে যে গল্পগুলো আপনি পড়বেন সেগুলো ব্যাখ্যা করার সেরা উপায় কোটি, সেই বিষয়ে নিজের মনস্থির করার দায়িত্ব আমি আপনার ওপরেই ছেড়ে দেব, অথবা এই বিষয়টি অনির্ধারিত রাখুন যতক্ষণ-না শেষ পৃষ্ঠা অবধি পড়ছেন। আর এমনকি কোনো সিদ্ধান্ত না নেবারও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, একটি অবস্থান, যা পরিচিত ‘অ্যাগনস্টিসিজম’ বা অজ্ঞেয়বাদ নামে, এর উৎস একটি গ্রিক শব্দ, যার অর্থ ‘যা জানা সম্ভব নয়’ বা অজ্ঞেয়।

আপাতত আমরা ধর্মকে নিয়ে ভেবেছি সাধারণ একটি অর্থে। এবার সুনির্দিষ্টভাবে একক ধর্মগুলো নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করা হবে, সেটি বেশ কৌতূহলী একটি প্রশ্ন। যেমন, চামাদের কোন্ ক্রম অনুসরণ করা উচিত হবে? বিজ্ঞান বা দর্শনের ইতিহাসের ব্যতিক্রম, ধর্মের ব্যাপারে কঠোর সময়ানুক্রমিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেনা। ভিন্ন ভিন্ন জিনিস একই সাথে ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় একই সময়ে ঘটেছিল, সুতরাং আমরা কোনো নিরবচ্ছিন্ন। ক্রমবিকাশের ইতিহাস অনুসরণ করতে পারব না। আমাদের সময়ের ক্ষেত্রে এবং ভৌগোলিকভাবে আঁকাবাঁকা পথই বেছে নিতে হবে।

এই পদ্ধতির একটি সুবিধা হচ্ছে এটি আমাদের প্রদর্শন করে যে, একেবারে শুরু থেকে মানবতার বড় প্রশ্নগুলোর যে-সমস্ত উত্তর বিভিন্ন ধর্ম দিয়েছে, সেগুলো আসলেই কত বিচিত্র ছিল। প্রশ্ন হয়তো একই হতে পারে, ‘কেউ কি আমাদের উপরে আছেন?’ আর, ‘মৃত্যুর পর কী হয় আমাদের সাথে’? কিন্তু উত্তরগুলো পরস্পর থেকে খুবই ভিন্ন ছিল। আর সে-কারণে ধর্মের ইতিহাস এত বিস্ময়কর আর আকর্ষণীয়।

সৌভাগ্য যে, আমাদের যাত্রাপথের একটি সুস্পষ্ট সূচনাবিন্দু আছে। জীবন্ত সব ধর্মগুলোর মধ্যে এটি অবশ্যই সবচেয়ে প্রাচীনতম ধর্ম এবং বহুভাবেই বর্তমানে জীবিত কোনো ধর্মের চেয়ে অনেক বেশি জটিল — হিন্দুধর্ম। সুতরাং আমরা ভারত থেকেই শুরু করব।

০৩. চাকা

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির একটি জনপ্রিয় মূলভাবনা হচ্ছে, একজন নায়ক সময়ের অতীতে যিনি ফিরে যান, অতীতের কিছু ঘটনা পরিবর্তন করতে, মানব-ইতিহাসের ওপর যে ঘটনাগুলো ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছিল। এরকমই একটি গল্পের শুরুতে আমরা দেখি, উন্মত্ত, সন্ত্রাসী একজন বোমাবাজসহ একটি রেলগাড়ি রেললাইন ধরে দ্রুতবেগে ছুটে যাচ্ছে। এবং রেলগাড়িটি যখন বিশাল একটি বাঁধের উপর দিয়ে অতিক্রম করছিল, সে বোমা বিস্ফোরণ করে এটিকে উড়িয়ে দেয়, এবং সেই বাঁধটি ভাঙার কারণে পুরো শহরটি নিমজ্জিত করার মতো ভয়াবহ প্লাবনের সৃষ্টি করে। সৌভাগ্যজনকভাবে সরকারের একটি গোপন বিভাগ একটি কৌশল পরিশীলিত করেছিল, তারা চাইলে যে-কোনো একজন ব্যক্তিকে অতীতের কোনো নির্দিষ্ট একটি সময়ে পাঠিয়ে দিতে পারে। এই নতুন যন্ত্র ব্যবহার করে এই রেলগাড়িটি স্টেশন ত্যাগ করার আগেই তারা তাদের একজন এজেন্টকে সেই রেলগাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। বোমাবাজকে খুঁজে বের করা এবং বোমাটিকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য তাকে দুইঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় অতিক্রান্ত হবার কয়েক মুহূর্ত আগে সেই এজেন্টটি তার মিশনটি সফল করতে পেরেছিলেন, শহরটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল। আমরা অধিকাংশই এভাবে অতীতে ফিরে যাবার ইচ্ছা পোষণ করেছি, যেমন, কিছু ঘটার আগে একটি ম্যাসেজ যদি মুছে ফেলতে পারি অথবা কিছু করার তাড়না ঠিক সময়মতো দমন করতে পারি যা অন্যদের কষ্ট দিয়েছে এবং আমাদের জন্যে কেবল দুঃখের কারণ হয়েছে। কিন্তু ‘ল অব কনসিকোয়েন্স’ (পরিণতির সূত্র অথবা একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনার পরে ঘটবে এমন একটি শর্ত) পুরো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় আর আমরা যা করেছিলাম তার পরিণতিসহ আটকা পড়ে যাই।

হিন্দুধর্মে এটিকে কার্মা অথবা কর্মের সূত্র (ল অব ডিড) বলা হয়। কিন্তু এটির ব্যাপ্তি শুধুমাত্র এই জীবনটি নয় যা আপনি এখন যাপন করছেন। হিন্দুধর্মের শিক্ষানুয়ায়ী, আপনার আত্মা এই মুহূর্তে যে-জীবনটি আপনি কাটাচ্ছেন, সেটিতে আসার আগে, অতীতে আরো বহু জীবন কাটিয়ে এসেছে। আর এই জীবনটি শেষ হবার পরে ভবিষ্যতে আপনি আরো বহু জীবন কাটাবেন। এই জীবনগুলো প্রত্যেকটি নির্ধারিত হয় কীভাবে আপনি এর আগের জীবনটি কাটিয়েছেন তার ওপর, এবং সেটি নির্ভর করবে এরও আগের জীবন এবং সেই জীবনের আগের জীবন কেমন কাটিয়েছিলেন তার ওপর। এভাবে বহুদূর একটি অতীতের অস্পষ্টতায় যা বিস্তৃত হয়ে আছে। ঠিক এখন যেভাবে আপনি আচরণ করছেন সেটি জীবনের চাকার পরবর্তী ঘূর্ণনে আপনি কেমন জীবন পাবেন সেটিকে প্রভাবিত করবে।

যখন ভারতের নবী আর প্রাজ্ঞ সাধুরা দূরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, এবং মানুষ যখন মারা যায় তাদের সাথে কী ঘটে সেই বিষয়ে ভেবেছিলেন, তারা একটি আকর্ষণীয় উত্তর পেয়েছিলেন। মানুষ আসলে মরে না, সেই অর্থে যে সম্পূর্ণভাবে তাদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়, অথবা সেই অর্থে যে তারা মৃত্যুর পরে অন্য কোনো একধরনের জীবন কাটানো অব্যাহত রাখেন। না, তারা পৃথিবীতেই আবার ফিরে আসেন অন্য কোনো জীবনের রূপে, যে রূপটি কী হবে তা নির্দেশ করে তাদের অতীত সব জীবনের কার্মা। আর সেই জীবনটি মানুষ হিসাবে নাও হতে পারে। পুরো অস্তিত্বটাই এখানে একটি বিশাল রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহৃত হবার কারখানা, যেখানে জীবনের গুণগতমান, যা ‘মৃত্যু’ চিহ্নিত দরজা দিয়ে অতিক্রম করে, সেটি ‘পুনর্জন্ম’ নামে চিহ্নিত দরজার অন্যদিক থেকে বের হয়ে আসা জীবনের রূপ ও গুণগত মানকে প্রভাবিত করে। আর এই কারখানাটির নাম হচ্ছে ‘সামসারা’ (সংসার, জন্ম-মৃত্যু-পুনর্জন্মের চক্র, মানে এই চক্রের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করা), কারণ আত্মাগুলো এর মধ্যদিয়ে বাহিত হয়ে তাদের পরবর্তী এবং তার পরবর্তী (এবং পরবর্তী…) রূপগুলো পায়। ভালো কিংবা খারাপ, প্রতিটি কর্ম যা তারা একটি জীবনে করেছিলেন, সেগুলো তাদের পরবর্তী জীবনগুলোর গুণগত মানটিকে প্রভাবিত করে। আর শুধুমাত্র মানুষ প্রাণীরাই এই সামসারার চক্রে আটকে পড়ে নেই। পুরো পৃথিবীটা নিজেই মৃত্যু আর পুনর্জন্মের একই আইন মেনে চলে। এই অস্তিত্বের বর্তমান চক্রটি শেষে, এটি একটি বিশ্রামপর্বে প্রবেশ করবে, যেখান থেকে সময় হলে আবার এটিকে ডেকে নিয়ে আসা হবে অস্তিত্বের ভিন্ন একটি রূপে। সুতরাং অস্তিত্বের এই চাকাটি বিরতিহীনভাবেই ঘূর্ণায়মান।

কিন্তু এই কার্মাকে (বা কর্ম : কাজ, অভিপ্রায় ও ফল) তারা অতিপ্রাকৃত কোনো আত্মা-পরিদর্শকের পরিকল্পিত শাস্তি হিসাবে মনে করেন না। কার্মা মাধ্যাকর্ষণের সূত্রের মতো নৈর্ব্যক্তিক একটি আইন, যেখানে কোনো একটি জিনিস আরেক জিনিস থেকে আসে, যেভাবে কোনো ফলাফল কারণ অনুসরণ করে। যেমন, একটির-পর-একটি সাজানো ইটের প্রথমটিকে স্পর্শ করে ধাক্কা দিলে দেখা যায় একটার-পর-একটা সবগুলো ইটই পড়ে যাচ্ছে। ‘সামসারা’র মধ্যে দিয়ে এর যাত্রায় আত্মাকে হয়তো এমনকি আট মিলিয়ন সংখ্যক বার জীবনের রূপে আবির্ভূত হতে হয় অবশেষ-এর মোক্ষ অর্জন করার পূর্বে।

মৃত্যুর পর আমাদের সাথে কী ঘটে, সেটির এই বিবরণটির ধর্মীয় পরিভাষায় নাম হচ্ছে ‘রিইনকারনেশন’ বা পুনর্জন্ম। সারা পৃথিবীজুড়েই বহু সমাজেই এটি বিশ্বাস করে আসা হচ্ছে, তবে ভারতে হিন্দুধর্মের মতো আর কোথাও এটি এত তীব্রতা অর্জন করতে পারেনি। এটিকে ব্যাখ্যা করতে যেসব শব্দ আমি ব্যবহার করেছি, কার্মা, কাজের সূত্র, ‘সামসারা’, ‘মোক্ষ’ বা মুক্তির অনুসন্ধানে জন্ম জন্মান্তরের আত্মার পরিভ্রমণ, সব এসেছে সংস্কৃত নামক একটি প্রাচীন ভাষা থেকে। এই ভাষাটিকে ভারতে নিয়ে এসেছিল উত্তর থেকে আসা একদল বন্য আগ্রাসনকারী। কমন এরা শুরু হবার প্রায় দুই হাজার বছর আগে (খ্রিস্টপূর্ব) ভারতে তাদের আবির্ভাবে সাথে আমরা হিন্দুধর্মের সূচনাপর্বটির সময় নির্ধারণ করতে পারি।

ভারতের উপরে বহু দূর-উত্তরে তৃণভূমির বিস্তৃত একটি ভৌগোলিক এলাকা আছে, যাদের বলা হয় মধ্য-এশীয় স্টেপস। এটি মৃত, রুক্ষ, বৃক্ষহীন, তৃণাবৃত, সুবিস্তীর্ণ সমতল একটি এলাকা, ঘোড়সওয়ার কাউবয়দের জন্যে আদর্শ, যারা তাদের গবাদি পশুর পালের জন্যে সেরা চারণভূমির সন্ধানে চিরব্যস্ত। নিশ্চিত নয় এমন কিছু কারণে কমন এরা শুরু হবার আগের দ্বিতীয় সহস্রাব্দে, আরো উত্তম একটি জীবন খুঁজে পাবার প্রত্যাশায় মানুষ এই স্টেপস থেকে দক্ষিণে অভিযাত্রা করতে শুরু করেছিল। তাদের অনেকেই আরো দক্ষিণে ভারতে প্রবেশ করেছিল। তারা তাদের নিজেদের স্বদেশবাসী/স্বদেশি বা স্বজাতি বলতেন, তাদের নিজেদের ভাষায়, ‘আর্য’। তারা যুদ্ধপ্রিয় একটি জাতি ছিল, দ্রুতগামী রথ পরিচালনা করতেন; উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম কোণে সিন্ধুনদের উপত্যকায় দলবেঁধে ঢেউয়ের মতো তারা প্রবেশ করেছিলেন।

ইতিমধ্যেই সেখানে একটি উন্নত সভ্যতার অস্তিত্ব তখন ছিল, যে সভ্যতাটির অগ্রসর পর্যায়ের শিল্পকলা, স্থাপত্য আর ধর্মের একটি কাঠামো ছিল। আর উন্নত সমাজের মতোই এটিরও যেমন সদগুণাবলি ছিল, তেমন অনাচারও ছিল। আর এরকম একটি দৃশ্যে এই আর্য আগ্রাসনকারীরা তাদের ঘোড়ায় চড়ে হাজির হয়েছিলেন, তাদের সূক্ষ্ম পরিশীলতায় যে ঘাটতি ছিল, শক্তি আর সাহস দিয়ে তারা সেই ঘাটতিটি পুষিয়ে নিয়েছিল। আরেকটি বিষয় যা স্থানীয়দের থেকে আগ্রাসীদের পৃথক করেছিল, সেটি হচ্ছে তার চামড়ার রং ছিল হালকা, আর সেই চামড়ার রঙের পার্থক্যের মধ্য বহু ইঙ্গিত প্রবেশ করেছিল, যা এখনো আমাদের এই সময় অবধি প্রতিধ্বনিত্ব হচ্ছে, যা সেই আর্য শব্দটিকে একটি কুৎসিত অর্থ। দিয়েছে। কিন্তু এই আগ্রাসীরা তাদের হালকা রঙের চামড়া ছাড়াও আরো কিছু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। তাদের দেবদেবীদেরও তারা সাথে নিয়ে এসেছিলেন। এছাড়াও এনেছিলেন বিস্ময়কর ব্যাপ্তির একটি ধর্মীয় সাহিত্যকর্মের সূচনা– যার নাম ‘বেদ’।

লিখিত রূপে বেদ রচিত হয়েছিল কমন এরা শুরু হবার ১২০০ থেকে ১০০০ বছর আগে, যখন আর্যরা ভারতে তাদের দৃঢ়ভাবে স্থাপন এবং এখানকার জীবনযাত্রার ওপর তাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। ‘শ্রুতি’ বা শোনা হিসাবে পরিচিত, বেদকে দুটি পৃথক অথচ সম্পর্কযুক্ত অর্থে বোঝা হতো। তাদের মূল বিষয়গুলো মূলত শুনেছিলেন অতীতের সাধুরা, অস্তিত্বের অর্থ তাদের কাছে পরপার থেকে উন্মোচিত হবার যারা অপেক্ষায় ছিলেন। তারা ছিলেন এর মূল শ্ৰোতা সেই মানুষগুলোর সাথে যেই কণ্ঠগুলো কথা বলেছে। এবং তারা যা শুনেছিলেন, সেটি তাদের কাছ থেকেই শুনেছিলেন তাদের অনুসারীরা, যা তাদের কাছে বারবার পুনরাবৃত্তি করেছেন তাদের শিক্ষকরা। এভাবে বেদের মূল আধেয়টি মুখে-মুখে শতাব্দীর-পর-শতাব্দী হস্তান্তরিত হয়েছিল। হিন্দুশাস্ত্র শিখতে চায় এমন কারো সেগুলো উচ্চস্বরে আবৃত্তি করা এখনো পছন্দনীয় একটি উপায়। আপনি কোনো বাইবেল বা কুর’আন পাবেন না হিন্দু মন্দিরে, কিন্তু এর উচ্চারিত সমতূল্য শব্দগুলো সেখানে পালিত হওয়া বিভিন্ন আচারে আপনি শুনতে পারবেন।

বেদ শব্দটির অর্থ ‘জ্ঞান’। শব্দটির মূল ইংরেজি ‘উইট’ বা ‘উইসডোম’ শব্দটির মূলের মতো। মোট চারটি বেদ ছিল : ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদ। প্রত্যেকটি বেদ আবার চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত : সংহিতা (মন্ত্র ও আশীর্বচন), আরণ্যক (ধর্মীয় আচার, ধর্মীয় ক্রিয়াকর্ম, যজ্ঞ ও প্রতীকী যজ্ঞ), ব্রাহ্মণ (ধর্মীয় আচার, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও যজ্ঞাদির ওপর টীকা) ও উপনিষদ (ধ্যান, দর্শন ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান-সংক্রান্ত আলোচনা)। এদের সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত কিছু তথ্য এখানে যুক্ত করছিঃ যেমন, ঋগ্বেদ সংহিতা এই চারটি বেদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন; এখানে এক হাজারের বেশি স্তোত্র ও মন্ত্র আছে যা দেবতাদের প্রতি স্ত বগাথা। ধর্মে এই আচারটিকে বলা হয় ‘পূজা’ (উপাসনা)। অন্য আরেকটি উপায়ে এটি ভাবা যেতে পারে। এটি সেই ধরনের চাটুকারিতা যা শক্তিশালী শাসকরা সাধারণত উপভোগ করে থাকেন, অনেকটাই সেরকম যেভাবে ব্রিটেইনের রানিকে সম্বোধন করা হয়, ‘ইয়োর ম্যাজেস্টি’, এবং প্রজারা সবাই মাথা নুইয়ে সম্মান জানাবে এমন প্রত্যাশা করা হয় যখনই তার সাথে দেখা হবে, এখানে যেমন ঋগ্বেদের একটি উদাহরণ :

সবকিছুর স্রষ্টা, অসীম জ্ঞানী, অসীম শক্তিমান, স্রষ্টা, নির্দেশদাতা, সর্বোচ্চ আদর্শ … আপনি একটি ধারণা পেয়েছেন নিশ্চয়ই। খুব স্পষ্ট করেই এটি বলে দিচ্ছে! আর যেমন করে পার্থিব সম্রাটরা উপহার পেতে ভালোবাসেন, এছাড়া প্রশংসায় আপুত হয়ে আকণ্ঠ ডুবে থাকতে পছন্দ করেন, দেবতারাও সেটাই চান। যদি স্তোত্ৰগীত দেবতাদের উদ্দেশে নিবেদিত আমাদের চাটুকারিতা হয়ে থাকে, বিসর্জনগুলো হচ্ছে সেই উপহারগুলো, যা সাধারণত এসবের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে। এবং সেগুলো সতর্কভাবে পরিকল্পিত অনুষ্ঠান আচারের মাধ্যমে দেবতাদের প্রতি নিবেদন করতে হবে, যার জন্যে দক্ষ পেশাজীবীদের দরকার, যারা পুরো অনুষ্ঠানটি নিয়মমাফিক পরিচালনা করেন। হিন্দু ঐতিহ্যে যে-পুরোহিতরা এই বিসর্জনের বিষয়টি পরিচালনা করেন তাদের বলা হয় ব্রাহ্মণ (বর্ণ), আর এই কাজে তাদের সহায়তা করতে নির্মিত নির্দেশিকাগুলো, যা তারা সংকলিত করেছিলেন, সেটিকে হিন্দুশাস্ত্র বলা হয়।

এই ধরনের নির্দেশিকা অধিকাংশ মানুষের জন্যে ক্লান্তিকর একটি বিষয়। কিন্তু সেগুলো বিশেষ ধরনের ধর্মীয় মনের কাছে প্রায় আচ্ছন্ন করে রাখার মতোই আগ্রহোদ্দীপক হতে পারে। তারুণ্যে যাজক হবার জন্যে যখন আমি প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম, খ্রিস্টীয় বিভিন্ন প্রথার বহু বিচিত্র আচার আর অনুষ্ঠানের নির্দেশিকা আমাকে বিস্মিত করেছিল। বিশাল আকারের একটি বই আছে, যার নাম ‘দ্য সেরেমনিস অফ দ্য রোমান রাইট ডেসক্রাইবড’, এছাড়াও অপেক্ষাকৃত বেশ নিপ্রভ চার্চ অব ইংল্যান্ডেরও এই বইটির একটি সংস্করণ আছে : ‘রিচ্যুয়াল নোটস’। আমি খুব উৎসাহের সাথে সেই বইয়ে ডুবে যেতাম, কল্পনা করতাম বিশপদের বাহিনী ধীরে সুবিশাল ক্যাথিড্রালের মধ্যদিয়ে হেঁটে আসছেন, মিষ্টি ধূপের ধোয়ায় পুরো ক্যাথিড্রাল পূর্ণ। ঐ বইগুলোই ছিল ক্যাথলিক খ্রিস্টীয় ধর্মের জন্য ব্রাহ্মণ। কিন্তু শুধুমাত্র ধর্মীয় কর্মকর্তারাই আনুষ্ঠানিক কাপড় পরেন, বা বিস্তারিত আচার পালন করেন না। বহু গোপনীয় ক্লাব আর শিক্ষার্থীদের ভ্রাতৃত্ব সংগঠনগুলোরও নিজস্ব গোপন আচার-অনুষ্ঠান আছে, যা প্রতীক আর আনুষ্ঠানিক আচারের মানব প্রয়োজনীয়তাটি স্মরণ করিয়ে দেয়।

যদি আমার মতো আপনিও বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে কোনো একটি ধর্মের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসগুলোর ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হয়ে থাকেন, তাহলে বেদ এর বিবর্তনের চূড়ান্ত ধাপটির আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিত। এটি এসেছে উপনিষদে; যা লেখা হয়েছে প্রায় তিন শতাব্দী বিস্তৃত একটি সময়পর্বে এবং এর কাজ শেষ হয়েছে কমন এরা শুরু হবার প্রায় ৩০০ বছর আগে। উপনিষদ বা ‘একজন শিক্ষকের নিকট উপবেশন’ –ধর্মীয় আচার, আনুষ্ঠানিক প্রথা ও উৎসবের দিক থেকে হিন্দুধর্মের আগ্রহের লক্ষ্যটিকে দার্শনিক আর ধর্মতত্ত্বের দিকে পরিচালিত করেছিল। এই উপনিষদেই আমরা প্রথম ‘কার্মা’ আর ‘সামসারা’র মতবাদটি খুঁজে পেয়েছিলাম, যা আমরা এই অধ্যায়ের শুরুতে খানিকটা আলোচনা করেছি।

পরবর্তী অধ্যায়ে এইসব সুনির্দিষ্ট হিন্দুশিক্ষাগুলোর কয়েকটির আবির্ভাব কীভাবে হয়েছিল আর যেভাবে সেগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সেটি আমরা অনুসন্ধান করব। কিন্তু আমি ধর্মের আরেকটি বড় প্রশ্নের হিন্দুধর্মীয় উত্তরটি দিয়ে এই অধ্যায়টি শেষ করতে চাই। মৃত্যুর পর আমাদের সাথে কী ঘটে সেই প্রশ্নটির উত্তর এই ধর্মটি কীভাবে দিয়েছে ইতিমধ্যেই সেটি আমরা দেখেছি। উপনিষদের উত্তরটি ছিল পুনর্জন্মবাদের আকর্ষণীয় মতবাদ। আরেকটি যে-প্রশ্ন ধর্ম সবসময়ই জিজ্ঞাসা করে থাকে, সেটি হচ্ছে : যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে এই মহাবিশ্বের সীমানা পেরিয়ে সেই অসীম অন্ধকারে আসলে কী আছে? অন্য ধর্মগুলো মূলত নবীদের নাম উল্লেখ করেছে, যারা তাদের এই উত্তরগুলো দিয়ে গেছেন, এবং তাদের উত্তরগুলোকে তারা নিজেদের উত্তর হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছেন। তাদের নামেই তারা নিজেদের ও তাদের ধর্মের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু হিন্দুধর্মের সাথে

এমনটা ঘটেনি। এই ধর্মে এমন কোনো প্রতিষ্ঠাতা নেই, যার কাছ থেকে ধর্মটি। তার নাম নিতে পারে। অতীতেও একক কোনো চরিত্র নেই, যার কাছ থেকে এটি অনুপ্রেরণা পেয়েছে বলে দাবি করতে পারে। ভারতের গভীর অতীতের অজ্ঞাতনামা কিছু স্বাপ্নিকদের কাছ থেকে এটি এসেছিল। কিন্তু যদিও ঐসব প্রাচীন স্বাপ্নিকদের নাম তারা মনে রাখেননি ঠিকই, তবে তাদের যা-কিছু বলা হয়েছিল, সেটি তারা সংরক্ষণ করেছেন।

এবং ঋগ্বেদে এটি ধর্মের সেই প্রশ্নটির উত্তর দেওয়া শুরু করেছিল, আসলেই আমাদের এই মহাবিশ্বের বাইরে কী আছে। আর এটি শুনতে হলে সেই উত্তর ভারতের নক্ষত্রপূর্ণ আকাশের নিচে আগুনের পাশে বসে আছেন এমন একটি দৃশ্য কল্পনা করতে হবে, যেখানে তাদের অজানা সাধুদের একজন সময়কে ভেদ করে মহাবিশ্বের সেই সূচনা আর সেটিকে ছাড়িয়ে যেতেন। কথা নয়, রাতের অন্ধকারের দিকে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে তিনি স্তব পাঠ করতেন :

যখন অনস্তিত্ব কিংবা অস্তিত্ব কিছুই ছিল না: কোনো বায়ুর
জগৎ ছিল না, সেটি ছাড়িয়ে ছিল না কোনো আকাশ;
সেই ‘একটি’ মাত্র জিনিস, কোনো নিশ্বাস ছাড়া,
তার নিজের প্রকৃতি দিয়ে শ্বাস নিয়েছিল :
এটি ছাড়া আর কোনোকিছুই ছিল না।
এই পৃথিবী তৈরি হবার পরেই দেবতাদের সৃষ্টি হয়েছে।
কে তাহলে জানে।
কীভাবে এটি প্রথম অস্তিত্বশীল হয়ে উঠেছিল?
তিনি, এইসব সৃষ্টির যিনি প্রথম, তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছিলেন,
অথবা করেননি।
যার চোখ নিয়ন্ত্রণ করে সর্বোচ্চ আকাশ,
আসলেই তিনি সবকিছুই জানেন,
অথবা হয়তো তিনি সেটি জানেন না।

তিনি যে স্তবটি পাঠ করছেন আর আমরা শুনছি, সেখানে বিস্ময় আছে। আমাদের বলা হয়েছে, দেবতারা আছে, কিন্তু তাদের সৃষ্টি হয়েছে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির পরে। এর মানে হচ্ছে তারাও, আমাদের মতোই সৃষ্ট এবং তারা সময়ের সেই চক্রের ঘূর্ণনে আবদ্ধ। তারাও আমাদের মতোই আসেন এবং চলে যান। কিন্তু সেই স্বাপ্নিক আভাস দিয়েছেন, ঐসব রূপ-পরিবর্তনের পেছনে এমন কিছু আছে যা কখনোই বদলায় না, অপরিবর্তনশীল; সেই একটা জিনিস, যেভাবে তিনি বলেছেন। যেন ইতিহাস আর এর পাত্রপাত্রীরা সব কুয়াশার মতো কিছু, যা বিশাল কোনো পর্বতের উপস্থিতিকেও আচ্ছাদিত আর বিকৃত করে উপস্থাপন করতে পারে : ‘সেই একটি জিনিস’, কিন্তু কী সেটা? আর দেবতারাই বা কে, যারা এর প্রতিনিধিঃ

০৪. এক থেকে অনেক

একদিন শুনতে পেলেন, আপনার প্রিয় লেখক আপনার শহরে আসছেন তার কাজ নিয়ে কথা বলতে। আপনি সেই বইয়ের দোকানে গেলেন, যেখানে তিনি তার বক্তব্য দেবেন, এবং নতুন বই থেকে কিছু অংশ তিনি পাঠ করে শোনালেন, আপনার কাছে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত চরিত্রগুলোর সাম্প্রতিক নানা অভিযানের কাহিনি। আপনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথা থেকে এইসব চরিত্রগুলো এসেছে। কোথাও কি আসলেই তাদের অস্তিত্ব আছে? তিনি হাসলেন এবং বললেন, শুধুমাত্র আমার কল্পনায়। এই সবকিছুই তার মনগড়া। তারা সবাই এসেছে তার মস্তিষ্ক থেকে। সুতরাং তিনি তাদেরকে দিয়ে তার ইচ্ছামতো যে-কোনো কিছুই করাতে পারেন।

কী হতে পারে যদি বাসায় ফেরার পথে আপনার নিজেরই হঠাৎ করে মনে হয়, হয়তো আপনিও তাদের মতো বাস্তব কোনো চরিত্র না? আর আপনি হয়তো অন্য কোনো একজনের সৃষ্টি, কারো কল্পনা-সৃষ্ট প্লটের একটি চরিত্র?। যদি এমন কিছু ঘটে, তাহলে সেটি হবে যেন কোনো একটি বইয়ের চরিত্র অনুধাবন করতে পেরেছে যে, আসলে তার স্বাধীন কোনো জীবন নেই, তিনি শুধুমাত্র কোনো একজন লেখকের কল্পনার সৃষ্টি।

এটি সেই ধারণাটির মতো যা ভারতের সাধুদের কোনো ঐশী প্রত্যাদেশের শক্তিতে আঘাত করেছিল। তারা নিজেরাই আসলে বাস্তব নয়। শুধুমাত্র একটি জিনিসই চূড়ান্তভাবে বাস্তব : বিশ্বজনীন আত্মা অথবা স্পিরিট, যার নাম তারা দিয়েছিলেন ‘ব্রহ্ম’ (ব্রহ্ম), যা এরা নিজেকেই বহুরূপে প্রকাশ ও সৃষ্টি করেছিল। এই পৃথিবীতে সত্যিকার বাস্তবতায় যা-কিছুর অস্তিত্ব আছে, সেগুলো বাস্ত বিকভাবেই ব্ৰহ্মনের বহু ছদ্মবেশ আর রূপের একটি দিক মাত্র। যেমন, উপনিষদ বলেছে, সবকিছুর মধ্যেই এটি লুকিয়ে আছে, সব সত্তার মধ্যে সেই নিজস্ব স্বরূপ–যা সব সৃষ্টি আর কর্মের ওপর তদারকি করছে, যা সব সত্তার ভিতরে বাস করছে, সাক্ষী, পর্যবেক্ষণকারী, শুধুমাত্র একটি ‘সত্তা’। এবং তারা যেমন ব্রহ্মনের অংশ, ব্রহ্মও তাদের অংশ।

উপনিষদের একটি গল্প এই আত্মপরিচয়ের নৈকট্যটিকে খুব চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছে। একজন পিতা তার সন্তানকে বলছেন, ‘সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম মূলসার যেটি–এই পুরো মহাবিশ্ব সেটি ধারণ করছে এর আত্মা হিসাবে–এবং …. সেটাই হচ্ছে বাস্তবতা… আর…সেটাই হচ্ছ তুমি, শ্বেতকেতু’। মানুষ হয়তো চিন্তা করতে পারে যে, তাদের একটি পৃথক, একক অস্তিত্ব আছে, কিন্তু সেটি একটি মায়া বা বিভ্রম। তারা সবাই হচ্ছে সেইসব চরিত্র যারা ক্রমশ উন্মোচিত হতে থাকা ব্রহ্মনের কাহিনিতে বারবার আবির্ভূত হয়, আর পরের পর্বে তাদের ভূমিকা কী হবে সেটির রচয়িতা হচ্ছে তাদের কার্মা।

আর শুধুমাত্র একক সদস্যরাই নয়, যাদের ভূমিকা কী হবে সেটি তাদের জন্য পূর্বনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, বিভিন্ন শ্রেণি ও বর্ণে সমাজ কীভাবে সংগঠিত হবে, সেটিও সুনির্দিষ্টভাবে পূর্বনির্ধারিত একটি নির্দেশ অনুসরণ করে। যখনই একটি মানব-আত্মার পুনর্জন্ম হয়, এটি এই শ্রেণিগুলোর কোনো-একটিতে নিজেকে আবিষ্কার করে। এবং পরবর্তী মৃত্যু আর পুনর্জন্ম হবার আগে এই শ্রেণিতে তার এই জীবনটি কাটাতে হয়। যেহেতু বিভিন্ন জাত এবং তাদের রঙের একটি সুস্পষ্ট সংযোগ আছে, আমাদের মনে করা উচিত, আর্য আগ্রাসনকারীরা যারা তাদের ভাষা আর ধর্মকে সিন্ধু উপত্যকায় নিয়ে এসেছিলেন, তাদের গায়ের চামড়ার রঙ ছিল হালকা; যখন তারা এই ভূখণ্ডে এসেছিল সম্ভবত তারা অবজ্ঞার চোখেই স্থানীয় গাঢ় রঙের চামড়ার মানুষদের দেখতে শুরু করেছিল। আর্যদের ভারতে আসার আগেই বিভিন্ন জাতের কোনো একধরনের শ্রেণিবিন্যাসের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু সর্বোচ্চ বাস্তবতার নির্দেশে সৃষ্ট একটি বন্দোবস্ত হিসাবে তারা এটি যুক্তিযুক্ত করেছিল। এবং একটি ধর্মশাস্ত্রও ছিল যা এই প্রথার উৎপত্তি ব্যাখ্যা করেছিল।

এই মহাবিশ্ব নির্মাণ করতে ব্রহ্মন্ যে সৃষ্টিকর্তা দেবতার ওপর দায়িত্ব দিয়েছিলেন, খানিকটা সংশয়পূর্ণভাবেই তার নাম হচ্ছ ব্রহ্মা। ব্রহ্মা প্রথম মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন, ‘মনু’, এবং প্রথম নারী, শতরূপা। আর তাদের কাছ থেকেই এসেছে সমগ্র মানবজাতি। কিন্তু সব মানুষকে সমানভাবে সৃষ্টি করা হয়নি। গুরুত্বে ক্রমশ নিম্নমুখী এই ক্রমবিন্যাসে চারটি পৃথক জাত বা বর্ণ ছিল। সবার শীর্ষে ছিলেন ব্রাহ্মণরা, যারা ছিলেন পুরোহিত আর শিক্ষক। এরপরে আছেন ক্ষত্রিয়রা–রাজা, অভিজাতশ্রেণি ও যোদ্ধারা এই বর্ণের অন্তর্ভুক্ত। তাদের পরে এই ক্রমে আছেন বৈশ্যরা, যারা ব্যবসায়ী, কারুশিল্পী। এবং নিচের শ্রেণিতে আছে। দ্ররা, যারা ভৃত্য কিংবা জমির মজুর। ব্রাহ্মণরা ফর্সা, ক্ষত্রিয়রা লালচে, বৈশ্যরা হলদে, শূদ্ররা কালো। এবং এইসব বর্ণগুলোর সবচেয়ে নিচে আছে একটি শ্রেণি, যাদের কাজ, যেমন– ল্যাট্রিন বা পায়খানা পরিষ্কার এবং আরো অনেক ধরনের নোংরা কাজ করা, যে-কাজগুলো তাদের স্থায়ীভাবেই অপরিষ্কার এবং কলুষিত করেছে–তারা হচ্ছেন ‘অস্পৃশ্য, এমনকি তাদের ছায়া যেখানে পড়ে সেটিও নাকি অপবিত্র হয়ে যায়। খুবই কঠোর আর অনমনীয় একটি পদ্ধতি ছিল এটি, কিন্তু কার্মা আর ‘সামসারা’য় বিশ্বাস এই অস্তিত্ব থেকে খানিকটা হতাশা অপসারণ করেছিল। কার্মা দ্বারা নির্ধারিত জীবনগুলোয় তাদের জন্মজন্মান্তরের যাত্রায় মানুষ সবসময়ই আশা করতে পারে যে, সঠিকভাবে বাঁচলে হয়তো পরবর্তী জীবনে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হতে পারে।

কিন্তু জাত আর বিভাজনসহ বহু বিচিত্ররূপে পূর্ণ জীবনে পৃথিবীই একমাত্র উপায় নয় যেখানে ব্রাহ্মণ তার নিজেকে প্রকাশ করেন। এছাড়া তিনি দেবদেবীদেরও সৃষ্টি করেছিলেন, সংখ্যায় যারা অগণিত, তারা হচ্ছেন আরো একটি উপায় যার মাধ্যমে নিরাকার’ সেই সত্তাটি বিভিন্ন আকার ধারণ করতে পারেন। কিন্তু এইসব দেবতাদের নিয়ে আমরা কীভাবে ভাবব, সে-বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। উপরিদৃষ্টিতে হিন্দুধর্ম হচ্ছে সেই ধরনের একটি ধর্ম, যাদের আমরা বলি পলিথেইস্টিক বা বহুঈশ্বরবাদী বহুদেববাদী। সেটি হচ্ছে আরেকটি উপায়ে বলা যে, তারা বহুদেবতায় বিশ্বাস করেন। কিন্তু খুব সঠিকভাবে এটিকে মনোথেইস্টিক বা একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে, কারণ এর অগণিত দেবদেবী সবাই একটিমাত্র দেবতার প্রতিমূর্তি বা অংশ বা অভিব্যক্তি। কিন্তু এমনকি একজন ‘দেবতার ধারণাটিও পুরোপুরি ঠিক না। হিন্দুবিশ্বাসে, জীবনের মধ্যে দিয়ে দ্রুত ভেসে চলে যাওয়া পরিবর্তনশীল অলীক সব চরিত্রগুলোর নেপথ্যে দেবদেবীসহ একটিমাত্র ‘পরম বাস্তবতা আছে, সেই একটি জিনিস’, একক সত্তা, যেভাবে উপনিষদ এটি বর্ণনা করেছে। আর আপনি যদি বিভিন্ন জিনিসের কারিগরি নাম জানতে পছন্দ করেন, এই বিশ্বাসটি মনিজম’ নামে পরিচিত, অর্থাৎ অদ্বৈতবাদ, একেশ্বরবাদ নয়।

যেহেতু সবার সেই ধরনের মন নেই, যা কিনা এই ধরনের কোনো বিশাল ধারণার সাথে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারে, দেবদেবীদের ছবি ‘সেই একক সত্তা’র প্রতীক হিসাবে তৈরি করা হয়, যা মানুষকে কোনোকিছুর দিকে তাকাতে এবং মনোযোগ দিতে সুযোগ করে দেয়। মনে রাখবেন : একটি প্রতীক হচ্ছে একটি বস্তু যা কোনো-একটি বড় ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে এবং আমাদেরকে সেই ধারণাটির সাথে সংযুক্ত করে। হিন্দুধর্মে বাছাই করার জন্য বহু সহস্র দেবদেবী। আর চিত্র আছে, আর উপাসনাকারীর চিন্তাগুলোকে, যার মাধ্যমে সবকিছুর অস্তিত্ব সম্ভব হয়েছে সেই ‘একক’ সত্তার প্রতি আকর্ষণ করতেই সেগুলো পরিকল্পিত হয়েছে।

হিন্দু দেবতারা কেমন দেখতে সেটি যদি আপনি জানতে চান, তাহলে তাদের খুঁজতে কোনো মন্দিরে আপনাকে প্রবেশ করতে হবে। সুতরাং আসুন আমরা সবচেয়ে নিকটবর্তী একটি মন্দির খুঁজে বের করি। প্রথমে আমরা সিঁড়ি বেয়ে একটি চাতালে পৌঁছাব, সেখানে আমাদের জুতা খুলে রেখে খালিপায়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে হবে। আমরা মূল হলঘরে আসব, সেখানে একপ্রান্তে সিঁড়ি দিয়ে বাঁধানো উঁচু বেদির উপর একটি বা কয়েকটি দেবতার মূর্তি আবিষ্কার করব, যারা সেখানে বাস করেন। ভারতের বড় মন্দিরগুলো আরো অনেক বেশি মূর্তি দিয়ে পূর্ণ থাকে। তবে অন্য কোনো সাধারণ মন্দিরে হয়তো তিনটি প্রতিমা থাকতে পারে, যে-দেবতারা খুবই জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ।

আপনি হয়তো সেই মূর্তিটি দেখেছেন যেখানে আমরা নৃত্যরত একজন পুরুষকে দেখব, যার তিনটি চোখ আর চারটি হাত আছে, যার মাথা থেকে ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত নদীটি বের হয়ে এসেছে, গঙ্গা। এছাড়া আরেকটি মূর্তিও খুব পরিচিত মনে হতে পারে, যার ভুঁড়িসহ বিশাল একটি মানবশরীর আছে এবং মাথাটি একটি হাতির মাথার মতোই। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে নাড়িয়ে দেবার মতো প্রতিমাটি অবশ্যই নারীদেবীর একটি মূর্তি, তার বিশাল জিহ্বাটি বের হয়েছে, তারও চারটি হাত, তার একটিতে সে ধরে আছে ধারালো তলোয়ার, অন্য হাতে একটি খণ্ডিত মাথা, যেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।

ঐ নৃত্যরত তিন চোখ আর চার হাতসহ মূর্তিটি হচ্ছে দেবতা শিব, ধ্বংসকারী। হাতির মাথাসহ প্রতিমাটি গণেশ, দেবী পার্বতী আর শিবের পুত্রদের একজন। আর চার হাতের যে-নারীটি খণ্ডিত মস্তিষ্ক হাতে ধরে আছে তিনি হচ্ছেন কালী, শিবের স্ত্রীদের মধ্যে অন্যতম একজন। গণেশের মাথাটি হাতির মতো কারণ একদিন তার বাবা তাকে চিনতে না পেরে ভুল করে মাথাটি কেটে ফেলেছিলেন। তার ভুল-বোঝার পর প্রথম যে প্রাণীর দেখা পাবেন তার থেকে নতুন একটি মাথার প্রতিস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে সেই প্রাণীটি ছিল হাতি। এই ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সহ্য করেছিলেন যিনি, তার জন্য মানানসই পরিমাণে গণেশ খুব জনপ্রিয় আর কাছের দেবতা, যিনি তার অনুসারীদের জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সহায়তা করেন।

কালীর কাহিনিটি অপেক্ষাকৃত কম-সান্ত্বনাদায়ক। হিন্দুধর্মের দেবতারা তাদের বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন করার ব্যাপারে খুবই দক্ষ। এবং কালী হচ্ছে মা দেবীর বহু রূপের একটি, দেবতার রমণীয় দিকের একটি অংশ। অশুভের সাথে তার বহু যুদ্ধের একটিতে কালী ধ্বংসলীলায় এতটাই বেশি মত্ত হয়ে পড়েছিলেন, এবং তিনি তার সামনে আসা সবকিছুকেই জবাই করতে শুরু করেছিলেন। তার এই উন্মত্ততা থামাতে, শিব নিজেকে তার পায়ের উপর ছুঁড়ে মেরেছিলেন, এবং কালী তার এই আচরণে এতটাই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন যে, বিস্ময়ে তার জিহ্বা বের হয়ে এসেছিল। কালী আর গণেশ বেশ বর্ণিল দুটি চরিত্র, কিন্তু শিব আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দুদেবতাদের বিশাল ভাণ্ডারে তিনি স্মরণীয় তিন সর্বোচ্চ দেবতাদের একজন, অন্য দুইজন হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা, যার সাথে আমাদের আগেই দেখা হয়েছে এবং বিষ্ণু, যিনি রক্ষক।

হিন্দুধর্মে এই তিন প্রধান দেবতার অবস্থান কোথায় সেটি বুঝতে হলে, সময় নিয়ে ভিন্ন দুটি উপায়ে ভাবনার বিষয়টি প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে। পশ্চিমা চিন্তায় সময় চলে কোনো নিশানা বরাবর ধনুক থেকে ছোঁড়া তীরের মতো, যা নিশানার দিকে ছুটে চলে, তাহলে এর সবচেয়ে সেরা চিত্রটি হবে একটি সরলরেখার মতো, যা সামনে ধাবমান (à) ভারতীয় ভাবনায় সময়চক্র বা বৃত্তাকার চাকার মতো ঘূর্ণায়মান, সুতরাং এর সবচেয়ে ভালো প্রতীকী রূপ হবে একটি বৃত্ত (০)। ঠিক যেভাবে কার্মা প্রতিটি মানুষকে পুনর্জন্মের নিরন্তর চক্রের মধ্যদিয়ে পরিচালিত করে, মহাবিশ্বও সেই একই নিয়মে বন্দি। বর্তমান সময়ের শেষে এটি শুন্যতার শূন্যতায় ম্লান হয়ে মিলিয়ে যায়, যতক্ষণ-না ‘সেই একক সত্তা’ সময়ের চাকাটি আবার ঘোরানো শুরু করেন, এবং ব্রহ্মা আরেকটি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেন।

পরবর্তী চাকা-ঘোরানো অবধি তার কাজ শেষ হলে, ব্রহ্মা বিশ্রাম নেন এবং বিষ্ণু এই মহাবিশ্বের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেন। বিষ্ণুকে তার ডানহাতে কর্তৃত্বের প্রতীক হিসাবে একটি গদাসহ আঁকা হয়, তিনি হলেন সেই দেবতা যিনি দয়াময় পিতার মতো মহাবিশ্বের প্রতিপালন করেন এবং এটিকে সুরক্ষিত রাখতে কঠোর পরিশ্রম করেন। বিষ্ণু আমাদের আশ্বস্ত করেন ও স্বস্তি দেন, হয়তো তাকে খানিকটা ক্লান্তিকর নীরস অনুভূত হতে পারে। শিব অবশ্যই বর্ণিল একটি চরিত্র, তিনি মানবচরিত্রের যুদ্ধপ্রিয় দিকটির প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি ধ্বংসকারী, ব্রহ্মা যা শুরু করেছিলেন, তিনি সেটি শেষ করেন এবং বিষ্ণু সেটি প্রতিপালন করেন। তার সবচেয়ে নাটকীয় কর্মটি হচ্ছে তাণ্ডবনৃত্য বা ড্যান্স অব ডেথ, তাণ্ডব ধ্বংসাত্মক ও পুরুষালি নৃত্য; শিব কাল-মহাকাল বেশে বিশ্বধ্বংসের উদ্দেশে এই নাচ নাচেন, তিনি সময় আর মহাজগৎকে তার পায়ের নিচে পাড়িয়ে ধ্বংস করেন, চাকার পরবর্তী ঘূর্ণন অবধি, যখন ব্রহ্মা আবার আরেকটি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেন।

ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা যখন তাদের দেবদেবীদের ছবির দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকান এবং সেই প্রতিমূর্তিটি যা-কিছুর প্রতিনিধিত্ব করছে সেই বিষয়ে ভাবেন, সময়ের চাকার সেই ঘূর্ণনের কথা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, যা তাদের জন্ম-জন্মান্তরের চক্রে বিরতিহীনভাবে ঘোরাতে থাকে। এটি ঘুরতে থাকা একটি মঞ্চ, যেখানে তারা সবাই আসা-যাওয়া করেন, আবির্ভূত হন আবার অদৃশ্য হয়ে যান, তারা মঞ্চে প্রবেশ আর প্রস্থান করেন। একটি অসাধারণ কিন্তু ক্লান্তিকর একটি দৃশ্য। কোনো কি উপায় আছে, যার মাধ্যমে তারা এই মঞ্চ থেকে বের হয়ে এসে অবসর নিতে পারেন? সামসারা বা সংসারের এই আসা-যাওয়ার পর্ব থেকে কি একটি চূড়ান্ত প্রস্থান সম্ভব?

কিছু শৃঙ্খলা আছে, যা আত্মা অনুশীলন করতে পারে, যা তাদের এই সময়ের ঘূর্ণায়মান মঞ্চ থেকে পালাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সেগুলো বুঝতে হলে যে-পরিস্থিতি আর দুর্দশার মধ্যে মানুষের বসবাস সেটি আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। তারা নিজেরাই বাস্তব নয়, কিন্তু তারপরও তারা একটি মায়ার মধ্যে আটকে আছে আর সেটি তারা নিজেই। এই মায়া থেকে মুক্তি অর্জন করা এবং নিজসত্তাটিকে অবশেষে অদৃশ্য হতে দেওয়াই হচ্ছে পরিত্রাণ। সরলভাবে ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যে আমরা সেই শৃঙ্খলাগুলোকে ভাগ করতে পারি, যা মুক্তিকে দুটি ভিন্ন আধ্যাত্মিক অনুশীলনের আরো নিকটে নিয়ে আসতে পারে। বাহ্যিক উপায় এবং অভ্যন্তরীণ উপায় হিসাবে আমরা হয়তো সেগুলোকে ভাবতে পারি কোনোকিছুর ওপর মনোযোগ দেবার উপায় এবং কিছু নয় এমন কিছুর ওপর মনোযোগ দেবার উপায়।

একটি বাহ্যিক উপায়, যা লাভিং ডিভভাশন বা প্রেমময় ভক্তি হিসাবে পরিচিত, যেখানে উপাসনাকারীরা কোনো একটি প্রতীকী রূপ অথবা কোনো দেবদেবীর ছবি ব্যবহার করেন নিরাকার সেই একমাত্র সত্তার সাথে একাত্মতা অর্জন করতে। তারা মন্দিরে তাদের দেবতাদের জন্যে উপহার নিয়ে আসেন, প্রেমময় ভক্তি দিয়ে তারা দেবতার সেবা করেন। এইসব আচারগুলো পালন করার সময়ে তারা নিজেদের মধ্য থেকে সেই অখণ্ড নিরাকার সত্তার সন্নিকটে আসতে বের হয়ে আসেন। এটি একধরনের আত্মবিস্মৃতি প্ররোচিত করে, যা ধীরে ধীরে তাদের মানবচরিত্রের শক্ত বাঁধন থেকে মুক্তি দেয়, যা তাদের মায়ার ফাঁদে আটকে রেখেছে। কিন্তু প্রক্রিয়াটির ধীরগতির কারণে হয়তো অগণিত জীবন অতিক্রম করতে হয় চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের সেই চাকা থেকে চূড়ান্ত মুক্তি অর্জন করতে।

পরিত্রাণের অন্য উপায়টি এর বিপরীত একটি পথ বেছে নিয়েছে। এটি কোনো চিত্র ব্যবহার করে আপাতদৃশ্যমান এই জগতের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে না। ধ্যানের অনুশীলন করে এটি নিজেকে মায়ামুক্ত করার চেষ্টা করে। স্থির হয়ে বসা এবং শরীরের সব অস্বস্তি আর মনের মধ্যে দৌড়ে বেড়ানো অসংখ্য চিত্তবিক্ষেপকারী চিন্তা উপেক্ষা করতে শেখার মাধ্যমে এর অনুশীলনকারীরা নিজস্ব সত্তার বিভ্রমটিকে থেকে নিজেদের মুক্ত করেন এবং বাস্তবতার সাথে একাত্মতা অর্জন করেন। কিন্তু ধ্যানও খুব দ্রুত কোনো সমাধান নয়। যে মিলনের বোধ এটি নিয়ে আসে সেটি খুবই সাময়িক এবং শূন্য মন দ্রুত আবার পূর্ণ হয়ে ওঠে পরিচিত সব কামনা আর বিভ্রান্তি দিয়ে। আর সে-কারণেই আত্মবিস্মরণের একটি স্থায়ী পরিস্থিতি অর্জন করতে আর একক সেই সত্তার সাথে মিলনের সন্ধানে কেউ কেউ তাদের সব পার্থিব সম্পর্ক ত্যাগ করেন এবং যাযাবর ভিক্ষুক হিসাবে চূড়ান্ত আত্মবিসর্জনে তাদের জীবনটি কাটিয়ে দেন। তারা শরীরের সব চাহিদাকে অবদমন করেন, যা তাদেরকে এই জীবনের সাথে বন্দি করে রাখে, আর তারা সেটি করেন সেই অখণ্ড সত্তার মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিতে, শুধুমাত্র একাই যে বাস্তব।

সময়ের চক্র থেকে চূড়ান্ত মুক্তি প্রতিশ্রুতি হিন্দুধর্ম দেয়, কিন্তু সেই অসীম সংখ্যক জীবনের ভাবনা, এই মুক্তি অর্জন করার জন্যে যা প্রয়োজন, আমাদের হতবাক করে দেয়। কমন এরা শুরু হবার প্রায় ৫০০ বছর আগে কাউকে কাউকে এই সমস্যাটি নিয়ে ভাবতে প্ররোচিত করেছিল, এই অতি-আকাঙ্ক্ষিত মুক্তি অর্জন। করার কি কোনো সংক্ষিপ্ত আর দ্রুততর উপায় আছে কিনা। এই উত্তরটাই দিয়েছিলেন ধর্মীয় ইতিহাসে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতিভাবান ব্যক্তিদের একজন, পরের অধ্যায়ে আমরা তার কথা শুনব। তার নাম ছিল সিদ্ধার্থ গৌতম এবং তিনি একজন রাজপুত্র ছিলেন। তবে বুদ্ধ নামেই তিনি সুপরিচিত।

০৫. রাজকুমার থেকে বুদ্ধ

সেই আর্য ঘোড়সওয়ারদের ভারতে প্রবেশ আর জটিল আর বর্ণিল একটি ধর্মের বিবর্তন শুরু করবার পর যে ধর্মটিকে এখন আমরা হিন্দুধর্ম বলি-পনেরোশত বছর পরে একজন ব্যক্তি অশেষ পুনর্জন্মের এই মতবাদটির দিকে গম্ভীর হতাশা নিয়ে তাকিয়েছিলেন। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন, আসলেই কোন্ জিনিসটি আমাদের আত্মাকে ‘সামসারা’র চক্রে এভাবে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে। আর এই প্রশ্নের উত্তর থেকে একটি নতুন আধ্যাত্মিক আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল। কমন এরা শুরু হবার ৫৮০ বছর আগে (খ্রিস্টপূর্ব) উত্তর-পূর্ব ভারতে হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার নাম ছিল সিদ্ধার্থ গৌতম এবং এটি তার কাহিনি।

সিদ্ধার্থ ছিলেন রাজা আর যোদ্ধাদের ক্ষত্রিয় বর্ণের একজন সদস্য। তার পিতা শুদ্ধোদনের, শাক্য রাজ্যের রাজা (শাক্য প্রজাতন্ত্রের নির্বাচিত প্রধান), বয়স যখন পঞ্চাশ, তখন তার স্ত্রী রানী মায়া (মায়াদেবী) তাদের এই পুত্রসন্তানটির জন্ম দিয়েছিলেন। একজন ধর্মপ্রাণ শিশু হিসাবে, সিদ্ধার্থ হিন্দুধর্মের পবিত্রতম গ্রন্থ বেদ অধ্যয়ন করেছিলেন। এবং যদিও তিনি রাজকুমার ছিলেন, যিনি কিনা বিশেষভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত বিলাসী একটি জীবন কাটাতেন, তার শিক্ষকরা কিন্তু তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, বহু জীবনের সেই জন্মজন্মান্তর চক্রের দীর্ঘ একটি যাত্রায় বাকি আর সবার মতোই তিনিও একজন যাত্রী। তার বয়স যখন ষোলো, তিনি রাজকুমারী যশোধরাকে বিয়ে করেছিলেন, এবং তাদের একটি পুত্রসন্তান হয়েছিল, রাহুল। উনত্রিশ বছর বয়স অবধি সিদ্ধার্থ সুরক্ষিত আর বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত একটি জীবন কাটিয়েছিলেন, তার প্রতিটি প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্যে ছিল রাজভৃত্যদের একটি বিশাল বাহিনী। কিন্তু অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে ধারাবাহিকভাবে ঘটা কিছু ঘটনা চিরকালের জন্যে তার জীবনটাকে বদলে দিয়েছিল। সে-ঘটনাগুলো চার নিমিত্ত দর্শনের কাহিনি (স্টোরি অব ফোর সাইটস) হিসাবে পরে পরিচিতি পেয়েছিল।

প্রথম দিনে, দিনের শেষে শিকার থেকে ফেরার পথে, সিদ্ধার্থ একজন রোগজীর্ণ রুগ্ণ ব্যক্তিকে মাটিতে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখেছিলেন। তিনি তার দেহরক্ষী ও সারথি ছন্নকে (ছন্দক) জিজ্ঞাসা করছিলেন এই লোকটির কী হয়েছে। ‘লোকটি অসুস্থ’, এটাই ছিল উত্তর। রাজকুমার জিজ্ঞাসা করেন, ‘কেন সে অসুস্থ’? ‘রাজকুমার, এটাই জীবনের নিয়ম। সব মানুষই অসুস্থ হবে’। রাজকুমারকে দেখে মনে হয়েছিল তিনি কিছু ভাবছেন, কিন্তু আর কিছু বলেননি।

পরের দিন, ধনুকের মতো বাঁকা পিঠসহ একজন বৃদ্ধকে তিনি দেখেছিলেন, তার মাথা আর হাত ছিল কম্পমান। এমনকি দুটো লাঠির উপর ভর করেও তার জন্যে, হাঁটা স্পষ্টতই বেশ কষ্টকর অনুভূত হয়েছিল। ‘ঐ মানুষটাও কি অসুস্থ?’ রাজকুমার ছন্নকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। ‘না’, ছন্ন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘উনি বৃদ্ধ, বৃদ্ধবয়সে সব মানুষের সাথে এমনই হয়’। রাজকুমারকে দেখে মনে হয়েছিল তিনি কিছু ভাবছেন, কিন্তু আর কিছু তিনি বলেননি।

তৃতীয় দৃশ্য ছিল একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার যাত্রা। একজন মৃত মানুষকে শ্মশানে দাহ করতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল হিন্দুধর্মের নিয়মানুযায়ী, এবং মৃতের ক্রন্দনরত বিধবা স্ত্রী আর সন্তানরা সেটি অনুসরণ করছিলেন। সিদ্ধার্থ ছন্নকে প্রশ্ন করেছিলেন, কী হচ্ছে এখানে। ‘এটি সব রক্ত-মাংস দিয়ে গড়া মানুষের নিয়তি’। তিনি ব্যাখ্যা করেন, রাজকুমার কিংবা ভিক্ষুক, আমাদের সবার জন্যেই মৃত্যু আসবে। আবারও সিদ্ধার্থ কোনো উত্তর দিলেন না।

সিদ্ধার্থ অসুখ, বার্ধক্য আর মৃত্যুর দুঃখের সাক্ষী হয়েছিলেন। ‘এইসব দুঃখের কারণ কী?’ তিনি ভাবতে শুরু করেছিলেন। তিনি বেদ পড়েছিলেন, কিন্তু সেটি তাকে যা বলেছিল সেটি হচ্ছে, এটাই জীবনের নিয়ম, এটাই হচ্ছে কার্মা। যখন তিনি তার প্রাসাদে বসে এইসব রহস্যগুলো নিয়ে ভাবছিলেন, একটি গানের শব্দ জানালা দিয়ে তার কান অবধি ভেসে এসেছিল। কিন্তু সেটি তাকে আরো বিষণ্ণ করে তুলেছিল। আনন্দ সাময়িক, তিনি অনুধাবন করেছিলেন। এটি স্বস্তি দেয় কিন্তু মৃত্যুর ক্রমশ এগিয়ে আসাটিকে মন্থর করার জন্যে কিছুই করতে পারে না।

চতুর্থ দিনে তিনি একটি বাজারে গিয়েছিলেন, যথারীতি ছন্নও ছিল তার সাথে। দোকানি আর ব্যবসায়ীদের মধ্যে, যারা ক্রেতাদের সব প্রয়োজন পূরণ করেন, সিদ্ধার্থ মোটা কাপড়ের জামা পরা একজন সন্ন্যাসীকে দেখেছিলেন, যিনি খাদ্যের জন্যে সবার কাছে ভিক্ষা প্রার্থনা করছিলেন। তিনি বৃদ্ধ এবং স্পষ্টতই দরিদ্র, কিন্তু তারপরও তাকে দেখতে সুখী আর প্রশান্তিময় মনে হয়েছিল। ‘এটি কেমন ধরনের মানুষ’? তিনি ছন্নকে আবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন। ছন্ন ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘তিনি সেই মানুষগুলোর একজন, যারা গৃহত্যাগ করেছেন নিজস্ব কোনো সম্পদ আর মায়া ছাড়া বাঁচতে, সংসার যে মোহের সৃষ্টি করে সেটি থেকে মুক্তি পেতে।’

গভীর চিন্তা নিয়েই সিদ্ধার্থ তার প্রাসাদে স্বাচ্ছন্দ্যে ফিরে আসেন। সেই নিদ্রাহীন আর অস্থির রাতে একটি অনুধাবন তাকে আমূল নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেটি হচ্ছে আসলেই তৃষ্ণাই (কামনা কিংবা বাসনা) হচ্ছে সব মানব-দুঃখের মূল কারণ। নারী ও পুরুষ কখনোই কেউ তাদের ভাগ্য নিয়ে সন্তুষ্ট নয়, কখনোই তারা শান্তিতে নেই। তারা সেটাই কামনা করে, যা তাদের নেই। কিন্তু যখনই তাদের সেই কাঙ্ক্ষিত দ্রব্যটি অর্জন করা হয়ে যাবে, সেই জায়গায় নতুন আরো একটি কামনাও জেগে উঠবে। আর বিষয়টি নিয়ে যতই তিনি ভাবছিলেন, ততই এই কামনাগুলো তার অসহ্য মনে হয়েছিল, তীব্র বিতৃষ্ণা তিনি অনুভব করেছিলেন। এই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া প্রতিটি সত্তাকে আক্রান্ত করে এটি এমন একটি অসুখ, এই বাধ্যবাধকতা থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই। যদিও কামনা তাকে বিতৃষ্ণ করে তুলেছিল, কিন্তু সেই মানুষগুলোর প্রতি সহমর্মিতায় তার হৃদয় পূর্ণ। হয়েছিল, যাদের এটি নিরন্তর নিপীড়ন করছে। তখনই তিনি তাদের সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি তাদের জন্যে একটি উপায় খুঁজে বের করবেন, যেন তৃষ্ণার এই কারাগার থেকে তারা মুক্তি পেতে পারে, যেন তাদের আর এই দুঃখময় পৃথিবীতে কখনোই জন্ম নিতে না হয়। তিনি সেই জ্ঞানের অনুসন্ধান করবেন যা তাকে পুনর্জন্ম চক্রের অনন্ত ঘূর্ণন থেকে মুক্তি দেবে। তারপর তিনি অন্যদের তার সেই খুঁজে-পাওয়া পথটি প্রদর্শন করবেন।

এই সিদ্ধান্তটি নেবার পর তিনি তার বিছানা থেকে উঠে পড়েছিলেন, তার স্ত্রী আর পুত্রকে নীরবে বিদায় জানিয়ে তিনি ছন্নকে ডেকে পাঠান। সারথি ছন্নকে নিয়ে তার প্রিয় ঘোড়া কন্থকের টানা রথে তারা রাতের অন্ধকারে প্রাসাদের বাইরে বের হয়ে আসেন। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যখন তারা বনের প্রান্তে এসে পৌঁছান, সিদ্ধার্থ রথ থেকে নেমে তলোয়ার দিয়ে তার দীর্ঘ চুল কেটে মুণ্ডিতমস্তক হন। তিনি ছন্নকে তার চুলের গোছাটি দেন এবং তাকে প্রাসাদে ফেরত পাঠান, যেন সেটি সে প্রমাণ হিসাবে দেখাতে পারে, আজ থেকে তিনি একটি নতুন জীবনের পথে যাত্রা শুরু করেছেন। এরপর তিনি তার মূল্যবান রাজবস্ত্র একটি ভিখারির ছিন্নবস্ত্রের সাথে রদবদল করে নেন, এবং গৃহহীন এক তীর্থযাত্রী হিসাবে তার যাত্রা শুরু করেন। রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম যখন ভিক্ষুকের জীবন বেছে নিয়েছিলেন তখন তার বয়স ছিল উনত্রিশ। তার কাহিনির এই মুহূর্তটি পরিচিত মহাভিনিষ্ক্রমণ (দ্য গ্রেট রিনানসিয়েশন) নামে।

ছয় বছর তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, বোধিলাভ আর বাসনা থেকে মুক্তি পাবার শ্রেষ্ঠ উপায় অনুসন্ধান করে। তার সাথে দেখা হওয়া সাধুরা দুটি পথ প্রস্তাব করেছিলেন। একটি ছিল খুব কঠোর মানসিক অনুশীলন, যা পরিকল্পিত হয়েছে মনকে শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং বাসনাগুলোকে স্থির করতে। সিদ্ধার্থ এই কৌশলটি আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন এবং এগুলো সহায়ক এমন প্রমাণও পেয়েছিলেন। কিন্তু এটি তার সেই চূড়ান্ত মুক্তি বা বোধিলাভ যা তিনি অনুসন্ধান করছিলেন তা নিকটে আনতে পারেননি। সুতরাং তিনি ধ্যানে মগ্ন হয়ে থাকা সাধুদের ত্যাগ করে আবার তার যাত্রা শুরু করেন। এভাবে তিনি একদল সন্ন্যাসীর দেখা পান, যারা অনশন, শারীরিক নিপীড়ন ও কঠোর সাধনার তপস্যা করতেন। তারা তাকে বলেছিলেন, যত তীব্রতার সাথে তিনি তার শরীরকে ত্যাগস্বীকার করাতে পারবেন, ততই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে তার মন। আপনি যদি আত্মার মুক্তি চান, তাহলে আপনাকে অবশ্যই অনশন করতে হবে, শরীরকে অভুক্ত রাখতে হবে। সিদ্ধার্থ আত্ম-অস্বীকৃতির এই আচার শুরু করেছিলেন, যা তাকে প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি নিয়ে এসেছিল। এই সময়ে তার নিজের সম্বন্ধে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন :

যখন আমি দিনে মাত্র একটি ফল খেয়ে বেঁচে ছিলাম আমার শরীর শীর্ণ আর রুগ্ণ হয়েছিল… আমার হাতপাগুলো পরিণত হয়েছিল যেন শুকনো কোনো লতাগাছের জটগুলো.. ভেঙে পড়া ছাদের কড়ি-বরগার রূপ নিয়ে ছিল আমার বুকের রুগ্ণ পাজর.. যদি আমি আমার পেটটা ছুঁতে যেতাম, হাতে ধরা পড়ত আমার মেরুদণ্ড।

তিনি আপন মনেই চিন্তা করেছিলেন : এই শারীরিক কৃচ্ছসাধনের তত্ত্ব যদি সত্য হয়, নিশ্চয়ই আমি ইতিমধ্যেই বোধিলাভ করে ফেলতাম, কারণ আমি প্রায় মৃত্যুর সীমানায় এসে উপস্থিত হয়েছি। এখন এতই দুর্বল যে, তিনি তার শরীর নিয়ে দাঁড়াতেও পারছিলেন না। এমনকি আর একবিন্দু তার শরীরটাকে টেনে নিয়ে যেতে পারছিলেন না। সিদ্ধার্থ জ্ঞান হারিয়েছিলেন। তার সতীর্থরা ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো আসন্ন মৃত্যুর মুখোমুখি, কিন্তু তিনি আরোগ্য লাভ করেছিলেন। এবং যখন তিনি তার স্বরূপে ফিরে এসেছিলেন, তখন সন্ন্যাসীদের বলেছিলেন, তিনি একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। ছয় বছরের তীব্র ধ্যান আর আত্ম-অস্বীকৃতি তার খুঁজে-বেড়ানো বোধির আদৌ কাছাকাছি তাকে নিয়ে আসতে পারেননি। সুতরাং তিনি এই অনশন আর আত্মনিপীড়ন বন্ধ করবেন। তার এই ঘোষণায় ব্যথিত হয়ে সন্ন্যাসীরা তাকে ত্যাগ করে চলে যান, এবং সিদ্ধার্থ একাই তার পথ চলতে শুরু করেন।

তিনি একটি বন্য অশ্বথগাছের কাছে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন, এর ছায়ায় বিশ্রাম নেবার সময় তিনি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যদি আমার চামড়া, স্নায় আর অস্থি ক্ষয় হয়েও যায়, আমার জীবন-রক্ত শুকিয়েও যায়, তারপরও যতক্ষণ-না আমি সত্যজ্ঞান লাভ করছি আমি এখানেই বসে থাকব। সাত দিন পর, তিনি হঠাৎ করেই অনুধাবন করেছিলেন, তার নিজের মধ্য থেকে তৃষ্ণা দূর করার তৃষ্ণাটিও একটি তৃষ্ণা। তিনি অনুধাবন করেছিলেন এই বাসনা থেকে মুক্তি পাবার বাসনাই তার নিজের বোধিলাভ করার পথের অন্তরায়। এবং যখন এই অন্তদৃষ্টির প্রকৃত অর্থ তার কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, তার মনের মধ্যে বিকশিত হয়েছিল, তিনি সচেতন হয়ে উঠেছিলেন যে, তিনি এখন সব বাসনাশূন্য, সব তৃষ্ণা থেকে মুক্ত। তিনি পরমানন্দময় একটি অবস্থায় প্রবেশ করেন, যেখানে ‘অজ্ঞতা ধ্বংস হয়েছিল, জ্ঞানের জন্ম হয়েছিল; অন্ধকার দূর হয়েছিল, আলোয় প্লাবিত হয়েছিল।’

তাৎক্ষণিকভাবে তিনি অনুধাবন করেছিলেন, ‘পুনর্জন্ম আর নয়। আমি সর্বোচ্চ জীবন কাটিয়েছি, আমার কাজ এখন শেষ, আর এখন আমি যা ছিলাম, সেটির আর কোনো অস্তিত্ব নেই।’ সামসারার চক্রের ঘূর্ণন আর পুনর্জন্ম তার জন্যে থেমে গিয়েছিল। আর তখন তিনি বুদ্ধে পরিণত হয়েছিলেন ‘যিনি পরম শাশ্বত বোধ বা জ্ঞান লাভ করেছেন।’ যেদিন সর্বতৃষ্ণার ক্ষয় সাধন করে তিনি বোধিজ্ঞান লাভ করে বুদ্ধ হয়েছিলেন, সেটি মহাপবিত্র রাত্রি নামে পরিচিত (বুদ্ধ পূর্ণিমা)। উনপঞ্চাশ দিন ধরে ধ্যান করার পর তিনি বোধিপ্রাপ্ত হন। এই সময় তিনি মানবজীবনে দুঃখ ও তার কারণ এবং দুঃখ নিবারণের উপায় সম্বন্ধে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেন, যা ‘চতুরার্য সত্য’ নামে খ্যাত হয়। তার মতে এই সত্য সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করলে মুক্তি বা নির্বাণ লাভ সম্ভব।

এরপর তিনি সেই সাধুদের খুঁজতে গিয়েছিলেন যাদের তিনি হতাশ করেছিলেন তাদের বোধিলাভের পথ অনুসরণ না করে। উত্তর-ভারতে গঙ্গার তীরে অবস্থিত একটি শহর বারানসীর একটি মৃগ-উদ্যানে তিনি তাদের খুঁজে পান। একসময় তাদের পরিত্যাগ করা সত্ত্বেও তারা তাকে সৌজন্যের সাথে স্বাগত জানিয়েছিলেন। বারানসীর নিকট ঋষিপতনের এই মৃগ-উদ্যানে যাত্রা করে তার সাধনার সময়ের পাঁচ প্রাক্তন সঙ্গীদের তিনি তার প্রথম শিক্ষা প্রদান করেন। এইভাবে তাদের নিয়ে ইতিহাসের প্রথম বৌদ্ধসংঘটি গঠিত হয়েছিল। তাদের নম্র অভিযোগ যে, কৃচ্ছসাধনের জীবন ত্যাগ করে তিনি বোধিলাভ করার সুযোগ হারিয়েছেন, এর উত্তরই ছিল বুদ্ধের প্রথম ধর্মশিক্ষা, যা বৌদ্ধ ঐতিহ্যে ‘ধর্মচক্রবর্তন’ নামে খ্যাত। (সার্সন অব দ্য টার্নিং অব দ্য হুইল)। এই শিক্ষা দেবার সময় তিনি আবার সেই প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করেছিলেন যা বোধিলাভের উদ্দেশ্যে তার গৃহত্যাগ করার মুহূর্ত থেকেই তার মনে সবসময়ই উপস্থিত ছিল। সামসারা’র এই ঘূর্ণায়মান চক্রকে থামাতে পারে কি, যার সাথে আমাদের তৃষ্ণাগুলো আমাদের শৃঙ্খলিত করে রেখেছে? প্রশ্নটির যে উত্তর তিনি দিয়েছিলেন সেটি হচ্ছে : এর থেকে বের হবার উপায় হচ্ছে দুই চূড়ান্ত উপায়ের মধ্যবর্তী পথটি। তিনি এটিকে বলেছিলেন মধ্যম পন্থা (দ্য মিডল পাথ)। তিনি সন্ন্যাসীদের বলেন : দুটি চূড়ান্ত পথ আমাদের এড়িয়ে চলতে হবে। একটি সুখানুভূতি অর্জনের জীবন, এবং এর কামনা, এটি অধঃপাত, এবং এখানে কোনো লক্ষ্য বা মুক্তি নেই। আরেকটি চূড়ান্ত প্রান্ত হচ্ছে আত্ম অস্বীকৃতির জীবন। এটি কষ্টকর, এখানেও কোনো মুক্তি নেই। এই দুটি চূড়ান্ত পথ এড়িয়ে যদি আমরা মধ্যম পন্থা অর্জন করি, এটি আমাদের বোধিলাভের দিকে নিয়ে যায়। এই মধ্যম পথের নির্দেশকগুলো হচ্ছে চারটি মহান সত্য, চতুরার্য সত্য (ফোর নোবেল ট্রুথ, চতুরার্য প্রধান জ্ঞান দর্শন। এই চারটি সত্য হল : দুঃখ, দুঃখ-সমুদয়, দুঃখ-নিরোধ ও দুঃখ-নিরোধ মার্গ। চতুরার্য সত্যের প্রথম সত্য হল দুঃখ। দ্বিতীয় সত্য হল দুঃখ সমুদয় বা দুঃখের কারণ হচ্ছে তৃষ্ণা বা আসক্তি। তৃষ্ণাকে দৃঢ়ভাবে সংযত করে ও ক্রমশ পরিত্যাগ করে বিনাশ করাকে গৌতম বুদ্ধ দুঃখ-নিরোধ বলেছেন। চতুরার্য সত্যের প্রথম তিনটি সত্য দুঃখের বৈশিষ্ট্য ও কারণকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, এর চতুর্থ সত্য দুঃখ-নিবারণের ব্যবহারিক উপায় দর্শায়। গৌতম বুদ্ধ দ্বারা বর্ণিত দুঃখ-নিরোধ মার্গ বা দুঃখ-নিরসনের উপায়কে অষ্টাঙ্গিক মার্গ বলা হয়। পুরো জীবনটাই পূর্ণ দুঃখে। আর দুঃখের কারণ হচ্ছে কামনা/তৃষ্ণা/আসক্তি। আর তৃষ্ণাকে নিরোধ বা বর্জন করা যেতে পারে। আর দুঃখ নিরসনের উপায় হচ্ছে তার অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করা (এইটফোন্ড পাথ বা অষ্টাঙ্গিক মার্গ : গৌতম বুদ্ধ দ্বারা বর্ণিত দুঃখ-নিরোধ মার্গ বা দুঃখ-নিরসনের উপায়। এটি বৌদ্ধধর্মের মূলকথা চতুরার্য সত্যের চতুর্থতম অংশ।)

বুদ্ধ প্রয়োগবুদ্ধিসম্পন্ন একজন ব্যক্তি ছিলেন, তিনি কর্মে বিশ্বাস করতেন। আর এই ধরনের মানুষদের বিশেষভাবে লক্ষণীয় একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা তালিকা তৈরি করতে পছন্দ করেন; যেমন, কী করতে হবে, কী মনে রাখতে হবে, বাজারে গেলে কী কী কিনতে হবে ইত্যাদি। আর বুদ্ধের অষ্টাঙ্গিক মার্গের তালিকাটি হচ্ছে দুঃখের, কারণ তৃষ্ণাকে দূর করার জন্যে যা-কিছু করতে হবে : সম্যক দৃষ্টি/বিশ্বাস, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রযত্ন, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। সম্যক বা সঠিক বিশ্বাস আর সঠিক সংকল্প হচ্ছে মধ্যম পথ খোঁজা এবং সেটি অনুসরণ করা। এরপরে হচ্ছে সেই সিদ্ধান্ত : কখনোই পরনিন্দা অথবা কটুবাক্য ব্যবহার না করা। এমনকি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কোনোকিছু চুরি, হত্যা অথবা লজ্জাজনক কোনো কাজ করতে অস্বীকার করা, এবং সেইসব পেশা বর্জন করা, যা অন্যের ক্ষতি করে।

বৌদ্ধধর্ম হচ্ছে একটি অনুশীলন; এটি কোনো ধর্মীয় মতবিশ্বাস বা মতবাদ নয়। এখানে কোনোকিছু বিশ্বাস করার বিষয় নেই বরং কিছু করার বিষয় আছে। এর কার্যকারিতার মূল চাবিটি হচ্ছে ধ্যানের মাধ্যমে অস্থির সেই তৃষ্ণার্ত মনকে নিয়ন্ত্রণ করা। স্থির হয়ে বসে, এবং কীভাবে তারা শ্বাস নিচ্ছেন সেটি লক্ষ করে, কোনো একটি শব্দ আর একটি ফল নিয়ে ধ্যান করার মাধ্যমে এর অনুশীলনকারীরা সচেতনতার বিভিন্ন স্তরে অতিক্রম করে শান্ত ও সুস্থির হবেন, যা তাদের তৃষ্ণাকে হাস করে। বুদ্ধ হয়তো একমত হতেন সপ্তদশ শতাব্দীর ফরাসি চিন্তাশীল দার্শনিক ব্লেইজ পাসকলের সেই অন্তদৃষ্টির সাথে : ‘একটি ঘরে সুস্থির বসে থাকতে পারার অক্ষমতাই সব মানবিক অশুভ কর্মকাণ্ডের কারণ।’

বুদ্ধের মধ্যম পন্থার ব্যাখ্যায় প্রণোদিত হয়ে সেই সন্ন্যাসীরা তার অনুসারীতে পরিণত হয়েছিলেন; এবং সংঘ, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসিনীদের সংগঠনটির জন্ম হয়েছিল। যদিও বুদ্ধের শিক্ষা কোনো ধর্মীয় মতবিশ্বাস এর অনুসারীদের ওপর চাপিয়ে দেয়নি, তবে এর ভিত্তিতে আছে ভারতীয় ধর্মের দুটি প্রধান ধারণা : কার্মা এবং সামসারা; কর্মের সেই আইন যা বহু লক্ষবার পুনর্জন্মের কারণ, তিনি শিখিয়েছিলেন যে, পুনর্জন্মের এই চক্রটি বন্ধ করার সবচেয়ে দ্রুততম উপায় হচ্ছে সন্ন্যাস নেওয়া এবং শৃঙ্খলার অনুশাসন মেনে চলা যা এর অনুশীলনকারীকে বোধিলাভ করার পথে নিয়ে যাবে। কিন্তু যদি পরিস্থিতি এমন কিছু করা আপনার জন্যে অসম্ভব করে তোলে, সেক্ষেত্রে সবচেয়ে সেরা উপায়টি হচ্ছে একটি নৈতিক জীবন কাটানো, এমন আশায় যে, পরের বার যেন আপনি সেই অবস্থা অর্জন করতে পারেন, যেখানে সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনীর কমলা আলখাল্লা পরা আপনার জন্যে সম্ভব হতে পারে।

বেনারসে প্রথম ধর্মপ্রচারের পর পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে বুদ্ধ ভ্রমণ করেছিলেন, এবং তার সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসিনীদের সংঘটিকে আরো মজবুত করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। যখন তিনি মৃত্যুর কাছাকাছি উপস্থিত হয়েছিলেন, তিনি তার অনুসারীদের বলেছিলেন, তার এই মহাপরিনির্বাণ গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ তার শিক্ষা। রয়ে যাবে। এবং এই শিক্ষাগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। রাজকুমার, যিনি বুদ্ধ হয়েছিলেন বেনারসের উত্তর-পূর্বে একটি শহরে, তার শেষ যাত্রাটি করেছিলেন মহাপরিনির্বাণের আগে (কুশীনগর)। অসুস্থতা অনুভব করে সেখানে তিনি দুটি শালবৃক্ষের মাঝে একটুকরো কাপড় বিছিয়ে তার উপর শুয়ে পড়েছিলেন, এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছিল। তখন তার বয়স হয়েছিল আশি। যে ধর্মটি সিদ্ধার্থ গৌতম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটি সারা এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল, এবং সময়ের একটি পর্যায়ে এটি বিশ্বধর্মে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু তার জন্মদেশে আজ এর অনুসারীর সংখ্যা বেশ কম, জৈনধর্মের ব্যতিক্রম, যাকে আর কোথাও পাওয়াই যায় না বললেই চলে। পরের অধ্যায়ে আমরা সেটি নিয়ে আলোচনা করব।

০৬. কোনো ক্ষতি কোরো না

বৌদ্ধধর্মের মতো, জৈনধর্মও সেই প্রশ্নটির একটি উত্তর, হিন্দুধর্ম মানবতাকে যে প্রশ্নটির মুখোমুখি করেছিল। যদি আমাদের বর্তমান অস্তিত্বটি শুধুমাত্র ভবিষ্যতে কাটাতে হবে এমন বহুজীবনের সবচেয়ে সাম্প্রতিকতমটি হয়ে থাকে, কারণ আমাদের কার্মা পুনর্জন্মের সেই চক্রে আমাদের বন্দি করে রেখেছে, তাহলে কীভাবে আমরা এখান থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারি এবং পালিয়ে যেতে পারি সেই অবস্থায়, যাকে বলা হয় ‘নির্বাণ’? নির্বাণ হচ্ছে সংস্কৃত একটি শব্দ, যার অর্থ মোমবাতির শিখার মতো নিভে যাওয়া। এটি অর্জিত হয় যখন আত্মা অবশেষে ‘সামসারা’ থেকে মুক্তি পায়। বুদ্ধের উত্তর ছিল দুই চূড়ান্তের মধ্যম পন্থা। জৈনধর্ম এর বিপরীত দিকে গিয়েছিল। এটি কল্পনাযোগ্য সবচেয়ে কঠোর আত্ম-অস্বীকৃতির পথ নির্বাচন করেছিল। আর এর অনুসারীদের জন্য চূড়ান্ত আদর্শ ছিল সাল্লেখানা বা সন্ত্রা আচারটি পালন করা এবং উপোস করার মাধ্যমে নিজেদের মৃত্যু নিশ্চিত করা।

‘জৈন’ শব্দটি যে সংস্কৃত ক্রিয়াপদ (জিন) থেকে এসেছে, তার অর্থ হচ্ছে ‘জয় করা। এটি সেই যুদ্ধটির তথ্যনির্দেশ করছে, যে যুদ্ধটি জৈনধর্মানুসারীদের তাদের নিজেদের প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়তে হয়, বোধিলাভের সেই পর্যায় পৌঁছাতে, যা তাদের মুক্ত করে (জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি)। জৈনধর্মের চব্বিশ জন ‘জিন’ অথবা বিজয়ী ছিলেন, যারা তাদের সব তৃষ্ণার ওপর এমন দক্ষতা অর্জন করেছিলেন যে, তারা বোধিলাভ করেছিলেন। তারা তীর্থঙ্কর’ নামে পরিচিত ছিলেন [(জৈনধর্মে একজন তীর্থঙ্কর হলেন এক সর্বজ্ঞ শিক্ষক ঈশ্বর, যিনি ধর্ম (নৈতিক পথ) শিক্ষা দেন।] ‘তীর্থঙ্কর’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘তীর্থের প্রতিষ্ঠাতা’। আর জৈনধর্মে ‘তীর্থ’ বলতে ‘সংসার’ নামক অনন্ত জন্ম ও মৃত্যু সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে প্রসারিত একটি সংকীর্ণ পথকে বোঝায়, তীর্থঙ্করদের ‘শিক্ষক ঈশ্বর’, ‘পথ স্রষ্টা, যাত্রাপথ-স্রষ্টা’ ও ‘নদী পারাপারের পথস্রষ্টা; কারণ পুনর্জন্মের সেই নদীর উপর দিয়ে অন্যপ্রান্তে মোক্ষ (মুক্তি)-লাভের দিকে তারা আত্মাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যান। এইসব তীর্থঙ্করদের মধ্যে যিনি সর্বশেষ, তাকে সাধারণত জৈনধর্মের (জিন সাশন) প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে বর্ণনা করা হয়। তার নাম ছিল বর্ধমান, যদিও তিনি মহাবীর (মহান বীর) নামেই পরিচিত হয়েছিলেন। জৈনধর্মীয় ঐতিহ্য আমাদের জানাচ্ছে তিনি ৫৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, পূর্বভারতের। গাঙ্গেয় অববাহিকায়; এই এলাকায় সিদ্ধার্থ গৌতমও জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যিনি বুদ্ধ নামে পরিচিত হয়েছিলেন।

শুধুমাত্র ভূগোল বা সময় ছাড়াও বুদ্ধ আর মহাবীরের মধ্যে আরো বেশকিছু মিল আছে। তিনিও একজন রাজকুমার ছিলেন। তিনিও দুঃখের সমস্যা, এর কারণ আর প্রতিকার নিয়ে ভাবনায় আচ্ছন্ন ছিলেন। অনন্ত জ্ঞান বা সর্বজ্ঞতা লাভের আশায় তিনিও তার স্বচ্ছল বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত জীবন ত্যাগ করেছিলেন। এবং তিনি বুদ্ধের সাথে একমত হয়েছিলেন যে, তৃষ্ণাই (কামনা/আসক্তি) হচ্ছে সব দুঃখের কারণ। মানুষ অসুখী কারণ, তাদের যা নেই, তারা সেই জিনিসই কামনা করে। কিন্তু যখনই তারা যা তারা কামনা করেছিল সেটি পায়, আবার তারা অন্য কোনোকিছু কামনা করতে শুরু করে। সেকারণে তৃষ্ণাই হচ্ছে সব দুঃখের কারণ, এই তৃষ্ণা নির্বাপন করার মধ্যেই আছে আমাদের পরিত্রাণ। এবং যেভাবে তিনি এই তৃষ্ণা নির্বাপন করার পথ বেছে নিয়েছিলেন সেটি ইঙ্গিত করে মহাবীর আসলে ঠিক কতটা বৈপ্লবিক একটি চরিত্র ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, অশুভ সব কাজকে এড়িয়ে চলা এবং ভালো কাজ করার মাধ্যমেই জন্ম-জন্মান্তরের সামসারার চক্র থেকে মুক্তি অর্জন করা সম্ভব হতে পারে। বুদ্ধের মতোই, তিনিও তালিকা বানাতে ভালোবাসতেন। তিনি তার প্রক্রিয়াটিকে পাঁচটি নির্দেশনায় সূত্রবদ্ধ করেছিলেন। কোনো জীবিত প্রাণীকে হত্যা কিংবা ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা। চুরি না করা। মিথ্যাচার না করা। অপবিত্র কিংবা বিশৃঙ্খল জীবন না কাটানো। এবং কোনোকিছুতে আসক্তি বা কামনা না করা। এই পঞ্চব্রতগুলো হচ্ছে : অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য, অপরিগ্রহ।

প্রথম দৃষ্টিতে মনে হবে এই নির্দেশগুলোর মধ্যে নতুন কিছুই নেই। বিশ্বাসের অন্য অনেক পদ্ধতিই একই ধরনের তালিকা তাদের অনুসারীদের অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছে এর আগে। কিন্তু জৈনধর্মকে যা স্বতন্ত্র করেছে, সেটি হচ্ছে মহাবীরের প্রথম নির্দেশনাটির ওপর এটি যে-পরিমাণ গুরুত্ব দিয়েছে, কোনো জীবকে হত্যা বা জীবের ক্ষতি না করা। অহিংসা, তার শিক্ষার প্রধান বৈশিষ্ট্য। এটিকে তিনি বিশ্বজনীন এবং চূড়ান্ত একটি আদর্শ হিসাবে অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। যারা মোক্ষলাভ করতে চাইছেন, তারা শুধুমাত্র চরম অহিংসার মাধ্যমে কার্মাকে পরিবর্তন করতে পারবেন, যা তাদেরকে পুনর্জন্মের চক্রের সাথে বেঁধে রেখেছে।

জৈন সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসিনীরা অবশ্যই কোনোকিছুকে কষ্ট দিতে অথবা হত্যা করতে পারবেন না! খাদ্য হিসাবে কোনো প্রাণীকে হত্যা করা তাদের জন্যে। নিষিদ্ধ। তারা শিকার কিংবা মাছ ধরতে পারবেন না। এমনকি তারা মশাও মারতে পারবেন না, যখন কিনা সেটি তাদের মুখের উপর বসে রক্ত শুষে নেয়, কিংবা মৌমাছি, যদি সেটি তাদের ঘাড়ে হুল ফুটিয়ে দেয়। যদি তারা কোনো একটি মাকড়শা বা অবাঞ্ছিত কীট তাদের বাড়িতে খুঁজে পান, তারা তাদের হত্যা করতে পারবেন না। যদি তারা সেটি সেখানে না চান, তাহলে খুব সতর্কতার সাথে সেটি ধরতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে যেন এই প্রক্রিয়ায় সেগুলো আহত না হয়, এবং সম্মানের সাথে তাদের বাইরের পরিবেশে ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। এবং যেহেতু মাটিতে তারা হাঁটেন, যেখানে বহু ক্ষুদ্র জীবন্ত প্রাণীদের বাস, তাদের খুব সতর্কভাবে হাঁটতে হবে, যেন তারা কোনো প্রাণীরই ক্ষতি না করেন। তাদের পায়ের চাপে যেন কোনো জীবন পিষ্ট না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে জৈন সন্ন্যাসীরা নরম পালকের ঝাড়ু ব্যবহার করেন, এবং তারা হাঁটার সময় আগে খুব সতর্কভাবে ঝাড়ু দিয়ে নেন, সেখানে পা রাখার আগে। কেউ কেউ এমনকি মুখোশ পরেন, কোনো প্রাণী যেন ভুল করে শ্বাসনালীতে প্রবেশ করতে না পারে। তারা যেন কোনো জীবের ক্ষতি না করেন। সবধরনের জীবনের প্রতি তাদের এই বিশেষ শ্রদ্ধা, এমনি কন্দমূলের জন্যে প্রযোজ্য। মাটির নিচের সবজি টেনে উঠানো যেমন যাবে না, তেমনি সেভাবে সংগৃহীত খাদ্যও খাওয়া যাবে না, তাদেরও জীবন আছে, যে জীবন মানুষের জীবনের মতোই মূল্যবান।

বেশ, যদি তারা মাংস, মাছ অথবা সবজি না খান, তাহলে জৈনরা কী খেয়ে বেঁচে আছেন? তাদের কেউ কেউ আসলেই বেঁচে না-থাকারই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। সাল্লেখানা বা সন্ত্রা বা উপোস করার মাধ্যমে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া সর্বোচ্চ জৈন আদর্শ। এটি আত্মা থেকে সব আসক্তির নির্বাপণ এবং কার্মা থেকে চূড়ান্ত মুক্তি চিহ্নিত করে। কিন্তু আপনি কয়েক মুহূর্ত ভাবলেই বুঝতে পারবেন যে, এধরনের আত্মহত্যার একটি বিশ্বজনীন আচার হবার সম্ভাবনা নেই, এমনকি জৈন অনুসারীদের মধ্যেও। প্রতিটি ধর্মেই ধর্মীয় আচার অনুসরণ করার তীব্রতায় নানাধরনের স্তর আছে, অতিউৎসাহীদের তীব্র উগ্রতা থেকে শুরু করে কদাচিৎ আচার-অনুসরণকারী স্বল্পমাত্রার উৎসাহীরা। জৈনবাদ, যদিও ইতিহাসে খুবই তীব্র ধর্মগুলোর মধ্যে অন্যতম, তবে এর অনুসারীদের মধ্যেও এই তীব্রতার নানামাত্রা আমরা দেখতে পাই। অধিকাংশই উপোস করে আত্মহত্যা করেন না। কিন্তু তারা যা করেন সেটি যথেষ্ট পরিমাণেই চরম পর্যায়ের। তারা শুধু ফল খান, সেই ফল, যা মাটিতে পড়ে। জৈনরা বৈপ্লবিকমাত্রায় ফলাহারী। বাতাসের কারণে মাটিতে পড়া ফল খাওয়ার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখেন অন্য কোনোধরনের জীবনের ক্ষতি না করে।

সবধরনের জীবনের পবিত্রতার ওপর গভীর বিশ্বাস ছাড়া, জৈনধর্ম খুব সামান্যই ধর্মীয় তত্ত্বের ভারে নিজেকে ভারাবনত করেছে। এর পদ্ধতির মধ্যে এটি চূড়ান্ত কোনো ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার জন্যে জায়গা রাখেনি। জাত বা বর্ণপ্রথার নিষ্ঠুরতাগুলো এটি প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু এর মোক্ষ বা মুক্তি লাভ করার পথটি মহাবিশ্বের একটি সুনির্দিষ্ট মানচিত্রের ওপর নির্ভরশীল। জৈনরা বিশ্বাস করতেন দুটি দানবীয় আকারের বিশাল গোলক দিয়ে এই মহাবিশ্ব তৈরি, যে গোলকদুটি একটি সংকীর্ণ কোমর দিয়ে পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। ছবিটি কল্পনা করতে চাইলে একটি বাতাসভর্তি বেলুনের মাঝখানে একটি গিঁট বাঁধার চেষ্টা করুন, যা এটিকে আপনার গিঁটটি দিয়ে সংযুক্ত দুটি ভাগে বিভক্ত করবে। জৈন ধর্মমতে এই মধ্যবর্তী গিঁটটি হচ্ছে আমাদের এই বিশ্ব, যেখানে পুনর্জন্মের চক্রে আত্মারা তাদের সময় অতিবাহিত করে। ঠিক যেমন বেশি পরিমাণ খাদ্য আমাদের শরীরকে স্থূল করে তোলে এবং যখন সেটি বহন করে চলতে আমাদের কষ্ট হয়, সেভাবে জৈন বিশ্বাসে মনে করা হয়, খারাপ আচরণ আমাদের আত্মাকে ভারী করে তোলে, পুনর্জন্মের চাকা থেকে মুক্তি পাবার বিষয়টিকে এটি আরো কঠিন করে তোলে। যে আত্মাগুলো এর আগে খারাপ জীবন কাটিয়েছে তারা ফিরে আসে নিম্নতর কোনো রূপে। হয়তো কোনো সাপ বা ব্যাঙ হিসাবে, এমনকি গাজর কিংবা পিয়াজ রূপেও হতে পারে। যে আত্মাগুলো আসলেই খুবই অশুভ জীবন কাটিয়েছে সেগুলো এতই ভারী হয়ে ওঠে যে, তাদের ওজন এদের নিচের দিকে টেনে নিয়ে যায় মহাবিশ্বের নিচের গোলকের মধ্যে সাতটি নরকের কোনো একটিতে, যেখানে প্রতিটি নরক নির্যাতনের মাত্রায় এর উপরের নরকের চেয়েও আরো বেশি ভয়ংকর।

আর এই একই আইন মেনে, যে আত্মারা নিজেদের পাপমুক্ত করতে পারে, সেটি আরো হালকা হয়ে যেতে থাকে যতই তারা সংগ্রাম করে। সত্যিকারের জৈনরা কৃচ্ছত; কঠোর তপশ্চর্যার আচার পালন করেন (অ্যাসেটিসিজম শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিকের ক্রীড়াজগৎ থেকে, যার অর্থ হচ্ছে খুবই কঠোরভাবে পরিশ্রম করা, যেন তার ক্ষেত্রে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে পারেন)। জিনরা, যারা জৈনধর্মের সেরা চরিত্র, তারা তাদের আত্মার শুদ্ধির জন্যে এতটাই পরিশ্রম করেন যে, সেটি ক্রমশ হালকা হয়ে উপরের গোলকে স্বর্গে আরোহণ করে, ছাব্বিশটি স্বর্গ অতিক্রম করে তারা নির্বাণে পৌঁছে যান, যা তাদের সব সংগ্রামের চূড়ান্ত গন্তব্য। এখানে তারা স্থির পরমানন্দময় একটি অবস্থায় চিরবিরাজমান। অবশেষে মোক্ষলাভ।

জৈনধর্মের আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক দিক হচ্ছে, যেভাবে এটি তার। নির্ভারতার (আত্মার লঘুতা) সংগ্রামটির সম্প্রসারণ করেছিল ধারণার জগতেও। খারাপ কাজের মতোই, খারাপ ধারণাও আমাদের আত্মাকে আরো ভারী করে তুলতে পারে। ইতিহাস অবশ্যই সাক্ষী যে, ধর্মীয় ধারণাসহ নানাধরনের ধারণা নিয়ে অমিল মানুষের মধ্য সংঘর্ষের অন্যতম প্রধান একটি কারণ। কারণ জৈনদের জন্যে, অহিংসার মতবাদ সেই ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায়, যেভাবে তারা মানুষের শরীরকে দেখেন, তেমনি তাদের ধারণাগুলোকেও দেখেন। এমনকি তাদের মানসিক জীবনেও জৈনরা কারো ক্ষতি করার কথা এবং অহিংস আচরণ করা থেকে বিরত থাকেন। তারা সেই ভিন্নপথগুলোকে শ্রদ্ধা করেন, যেভাবে বিভিন্ন মানুষ তাদের বাস্তবতাকে পর্যবেক্ষণ আর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, এবং একই সাথে সেই বিষয়টিকেও শনাক্ত করেন : আসলে কেউই সার্বিকভাবে পুরো ব্যাপারটি একা দেখতে পারেন না।

শ্রদ্ধার এই মতবাদটির তারা নাম দিয়েছেন ‘অনেকান্তবাদ’। এবং এটি ব্যাখ্যা করার জন্য তারা অন্ধ ছয় ব্যক্তির একটি কাহিনি বর্ণনা করেছিলেন, যাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ অনুভব করে একটি হাতির বিবরণ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যে ব্যক্তি এর পা অনুভব করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন হাতি স্তম্ভের মতো দেখতে। যিনি এর লেজ স্পর্শ করেছিলেন তার কাছে এটি ছিল দড়ির মতো। যিনি এর শুড় অনুভব করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন এটি দেখতে একটি গাছের শাখার মতো। যে ব্যক্তি কান স্পর্শ করেছিলেন তার কাছে হাতি ছিল একটি হাতপাখার মতো, যিনি এর পেটে হাত বুলিয়েছিলেন এটি ছিল তারা কাছে একটি দেয়ালের মতো, যিনি এর শক্ত দাঁত ধরেছিলেন তিনি বলেছিলেন হাতি শক্ত একটি নলের মতো দেখতে। তাদের শিক্ষক সবাইকে বলেছিলেন, তারা সবাই সঠিক তাদের বিবরণে তবে একটি দৃষ্টিকোণ থেকে, কিন্তু প্রত্যেকেই পুরো অংশটির শুধুমাত্র একটি অংশ বুঝতে পেরেছিলেন। এই গল্পের নীতিবাক্য হচ্ছে যে, বাস্তবতা অনুধাবন করার ক্ষেত্রে মানুষের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। যদিও তারা সম্পূর্ণ বিষয়টির প্রতি অন্ধ নাও হতে পারেন, কিন্তু শুধুমাত্র একটি একক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা সেটি দেখতে পারেন। আর এটি ঠিক আছে, যতক্ষণ-না তারা দাবি করছেন যে, একমাত্র তাদের দৃষ্টিভঙ্গিটাই হচ্ছে সার্বিক চিত্র, এবং একইভাবে বিষয়টি দেখতে যখন তারা অন্যদের ওপর বল প্রয়োগ করেন।

জৈনরা মনে করেন, আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে সেই মায়া বা অবাস্তবতার পরিণতি যেখানে আমরা আমাদের এই পাপপূর্ণ অস্তিত্বে আটকে আছি। শুধুমাত্র সর্বজ্ঞানপ্রাপ্তরাই নিখুঁত জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছেন। জৈনধর্মের অন্য বিষয়গুলো নিয়ে আমরা যাই ভাবি না কেন, তবে আধ্যাত্মিক নম্রতার ব্যাপারে এর প্রণোদনা অন্যসব ধর্মের মধ্যে বিরল একটি বিষয়। ধর্মগুলো সাধারণত এমন কিছু দাবি করতে উৎসুক থাকে যে, শুধুমাত্র তাদের কাছে চূড়ান্ত সত্যটি আছে, সব ব্যাপারে তারাই সবকিছু জানেন। তারা সবাই সেই অন্ধ ভিখারিদের মতো, যারা একটি হাতির আকার নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে, এমন ধারণা তাদের কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়।

মহাবীর তার ধর্ম প্রচার করতে সারা ভারতজুড়েই ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, এবং তিনি বহু অনুসারীও আকৃষ্ট করেছিলেন। কমন এরা শুরু হবার ৪২৭ বছর আগে (খ্রিস্টপূর্ব) স্ব-নির্ধারিত উপোসের মাধ্যমে দেহত্যাগ করার সময়, যখন তার বয়স সত্তর, তার প্রায় চৌদ্দ হাজার সন্ন্যাসী আর ছত্রিশ হাজার সন্ন্যাসিনী অনুসারী ছিলেন। জৈনধর্মে সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসিনীরাই মূল খেলোয়াড়। তারা নিজেদেরকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করে তোলেন যেন বর্তমান জীবদ্দশাতেই নির্বাণপ্রাপ্তির জন্যে তাদের আত্মা নির্ভার হয়ে ওঠে। তারাই মহাবীরের অহিংসা আর সব জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাপ্রদর্শন-সংক্রান্ত উপদেশগুলো একত্র করে সংকলিত করেছিলেন, এটাই তাদের পবিত্র গ্রন্থ আগম।

অধিকাংশ ধর্মই যখন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, সেটি নানা উপদলে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। যেখানে প্রতিটি উপদলই মূল নবী বা শিক্ষকের প্রদর্শিত সত্যিকার সংস্করণটিকে অনুসরণ করছেন বলে দাবি করে থাকেন। জৈনধর্মও এর ব্যতিক্রম নয়। এটি দুটি গোষ্ঠীতে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে পার্থক্য মৃদু এবং আসলেই বেশ সামান্য। একটি গোষ্ঠী, যারা নিজেদের বলেন ‘দিগম্বর’ (আকাশই যার পরনের কাপড়), তারা দাবি করতেন, সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসিনীদের কোনো কাপড়ই পরা উচিত নয়। অন্যদিকে আরেকটি গোষ্ঠী, শ্বেতাম্বর, শুধুমাত্র সাদা কাপড় পরার অনুমতি দেয়।

এর সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনী ছাড়াও ভারতে এখনো জৈনধর্মের কয়েক মিলিয়ন অনুসারী আছেন। যদিও এর সন্ন্যাসী আর সন্নাসিনীরা মূল খেলোয়াড়, এর সাধারণ সদস্যরা সমাজে তাদের অবস্থান যতটুকু অনুমতি দেয় ততটাই সাধারণ জীবন যাপন করেন। একটি জীবনের সংগ্রামের মাধ্যমে তারা ছাব্বিশতম স্বর্গে পৌঁছানোর আশা করেন না। কিন্তু তারা আশা করেন যে, বর্তমান জীবনের অহিংস নম্রতা পরের জন্মে তাদের জন্যে একটি সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনীর জীবন নিশ্চিত করবে, এবং সেই জীবনের পর তারা অবশেষে নির্বাণে পৌঁছাতে পারবেন।

জৈনধর্মের প্রকৃতির জন্যই, এটি কখনোই একটি গণমানুষের ধর্মে পরিণত হয়নি। কিন্তু এটি প্রভাবশালী ছিল। এবং এটি একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়ের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যদিও কঠোর আচার-অনুশীলন করার বিষয়টি এমনিতেই শুধুমাত্র সংখ্যালঘু কিছু মানুষের মনে দাগ কাটতে পারে ঠিকই, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতে এটি প্রভাব ফেলতে পারে, যা এর দৃষ্টিভঙ্গিকে মৃদুতর করে তোলে। সব জীবনের চূড়ান্ত পবিত্রতা-সংক্রান্ত জৈনদর্শনটি নানারূপে ভেজিটারিয়ান বা নিরামিষাশী খাদ্য আন্দোলনে এর অবদান রেখেছে এবং এর অহিংস মতবাদ রাজনীতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিল। এটি মহাত্মা গান্ধীকে প্রভাবিত করেছিল, বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশে যে আইনজীবী ভারতকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করার আন্দোলনে সফল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এটি প্রভাবিত করেছিল মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকেও, খ্রিস্টীয় যে যাজক যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক-অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধাংশে।

জৈনধর্ম এখনো আমাদের সামনে সেই সত্যটিকে উন্মোচন করা অব্যাহত রেখেছে, তৃষ্ণাই বেশিরভাগ মানব-দুঃখের মূল কারণ এবং শুধুমাত্র তৃষ্ণাগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই আছে আমাদের সুখ এবং সন্তুষ্টি। আমাদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজনই হয়তো দিগম্বর হতে চাইবেন বা উপোস করে আত্মহত্যা করতে চাইবেন, কিন্তু যারা এই কাজ করেন, তাদের কথা স্মরণ করলে হয়তো আমরা খানিকটা সাধারণ জীবন কাটাতে অনুপ্রাণিত হতে পারি।

এই বইয়ের শুরুতে আমি উল্লেখ করেছিলাম, কঠোরভাবে সময়ের ধারাবাহিকতা মেনে চলার বিষয়টি খুব কঠিন হবে যখন বিভিন্ন ধর্মের আবির্ভাবের ইতিহাসের পথটি আমরা অনুসরণ করব। এর কারণ এই গল্পে সময়ের মতো স্থানও একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন জিনিস ঘটেছিল ভিন্ন ভিন্ন এলাকায়। সুতরাং ইতিহাসের মধ্যেই আমাদের আঁকাবাঁকা পথেই অগ্রসর হতে হবে। এই কারণে পরের অধ্যায়ে আমরা আর্যদের ভারত-প্রবেশের কয়েকশত বছর পরের একটি সময়ে যাব, তবে পশ্চিমের একটি জায়গায়, ধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন সম্বন্ধে জানতে। এই রহস্যময় চরিত্রটির নাম ছিল আব্রাহাম।

]

০৭. যাযাবর

আর (Ur)। সংক্ষিপ্ত দুটি অক্ষরের একটি শব্দ। এখানে ‘U’ উচ্চারিত হবে আ (যেমন up)। ‘r’ এমনভাবে উচ্চারণ করতে হবে যেমন করে স্কটল্যান্ডের অধিবাসীরা করেন, খানিকটা টেনে, সুতরাং Ur, অথবা Urrr, (আররর)। আর এখানেই কমন এরা শুরু ১৮০০ বছর (খ্রিস্টপূর্বাব্দ) আগে কোনো একটি সময় ধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি জন্মগ্রহণ করেছিলেন–গোত্রপিতা আব্রাহাম। ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমান, সবাই তাদের প্রতিষ্ঠাতা-পিতা হিসাবে আব্রাহামকে দাবি করেছে। পানির একটি ক্ষীণ স্রোতধারার কথা ভাবুন, হাজার মাইল দূরে কোনো পর্বত থেকে যা যাত্রা শুরু করেছে, সমতলে সেটি তিনটি বিশাল নদীতে পরিণত হয়েছে, সেই ধারণাটি সহজেই আপনি অনুধাবন করতে পারবেন। মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে ছিল ‘আর’ শহরটির অবস্থান। মেসোপটেমিয়া একটি গ্রিক নাম, যার অর্থ দুটি নদীর মধ্যবর্তী এলাকা এই নদীদুটি হচ্ছে টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেতিস। ‘আর’ শহরটি ছিল সেই দেশে যে দেশটির বর্তমান নাম ইরাক।

উত্তরাধিকারসূত্রে আমাদের কাছে আসা কাহিনি অনুযায়ী, আব্রাহাম ছিলেন টেরাহ’র পুত্র। তার দুইটি ভাই ছিল, নাহোর এবং হারান। বাইবেলে বুক অব জেনেসিসে আমরা তাদের কাহিনি খুঁজে পাই। কিন্তু হিব্রু বাইবেলের একটি প্রাচীন সহায়ক-বইয়ে তাদের সম্বন্ধে আমরা আরো কয়েকটি গল্প পাই। এটি আমাদের বলছে, তারা মেষপালক ছিলেন, ইউফ্রেটিসের উপত্যকায় সমৃদ্ধ তৃণভূমিতে তারা তাদের গবাদি পশুদের চারণ করাতেন। আর টেরাহ’র একটি লাভজনক পার্শ্বব্যবসা ছিল, তিনি সেই এলাকায় বসবাসরত মানুষদের উপাসনা করা দেবতাদের মূর্তি নির্মাণ করতেন। মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীদের চারজন প্রধান দেবতা ছিলেন। ‘আনু’ ছিলেন স্বর্গের দেবতা, ‘কি’ ছিলেন পৃথিবীর দেবী, এনলিল’ ছিলেন বাতাসের দেবতা আর ‘একি’ ছিলেন পানির দেবতা। সূর্য আর চাঁদকেও তারা দেবতা হিসাবে উপাসনা করতেন। এখানে লক্ষ করার মতো একটি বিষয় হচ্ছে, কীভাবে প্রাচীন ধর্মগুলোয় প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই স্বর্গীয় বিবেচনা করা হতো।

ভারতবাসীদের মত, মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরাও এমন কিছু চেয়েছিলেন যেদিকে তারা তাকাতে পারবেন, যখন দেবতাদের প্রতি তারা তাদের ভক্তি প্রদর্শন করবেন। টেরাহ বেশ আনন্দের সাথে তাদের চাহিদা পূরণ করতেন তার কারখানা থেকে মূর্তি সরবরাহ করে। একদিন যখন তিনি তার দোকানে অনুপস্থিত ছিলেন, আর ব্যবসা দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলেন আব্রাহাম, তখন সেখানে মূর্তি কিনতে এসেছিলেন একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি। আব্রাহাম তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনার বয়স কত? বৃদ্ধ বলেছিলেন, ‘সত্তর’। তাহলে বলতেই হবে, আপনি আসলেই একজন নির্বোধ’, আব্রাহাম তাকে বলেছিলেন, ‘সাত দশক আগে আপনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তারপরও আপনি এমন একটি মূর্তিকে পূজা করবেন, যা এই দোকানের পেছনের কারখানাতে কেবল গতকালই বানানো হয়েছে। বৃদ্ধ মানুষটি কিছুক্ষণ বিষয়টি নিয়ে ভাবলেন, তারপর আর মূর্তি না কিনে তিনি টাকা ফেরত নিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে যান।

ঘটনাটি জানতে পেরে তার ভাইরা খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তারা তাদের বাবাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, আব্রাহাম কিন্তু পারিবারিক ব্যবসাটিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে তার অনমনীয় মতামতের কারণে। সুতরাং টেরাহ আব্রাহামকে দোকানের সামনের অংশ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, এবং তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন পূজার নিবেদনগুলো সংগ্রহ করতে, খদ্দেররা যা নিয়ে আসতেন। দোকানেরই একটি ঘরে সাজানো তাদের প্রিয় দেবতাদের উদ্দেশ্যে। একদিন এক নারী দেবতাদের একজনের জন্য খাবার উপহার নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। প্রচলিত উপায়ে সেটি গ্রহণ না করে, আব্রাহাম তাকে ব্যঙ্গ করেছিলেন, ‘বেশ, এই দেবতার একটি মুখ আছে বটে, তিনি বলেছিলেন, কিন্তু আপনার তৈরি করা খাবার এ না পারবে খেতে, না পারবে আপনাকে ধন্যবাদ বলতে। এর হাত আছে, কিন্তু তার সামনে এই খাবার রাখলেও হাত দিয়ে এক টুকরো খাবারও সে মুখে তুলতে পারবে না। যদিও এর সুন্দর করে খোদাই করা পা আছে, সেই পা তুলে এটি এক পাও আপনার দিকে এগিয়ে আসতে পারবে না। অন্তত আমার কাছে, যারা এটি বানিয়েছেন আর যারা এটি পূজা করেন তারা এই মূর্তিটার মতোই নির্বোধ আর অকেজো’।

দুটি কারণে সেই সময়ে এই ধরনের কথাবার্তা খুবই বিপজ্জনক একটি বিষয় ছিল। সমাজে প্রতিষ্ঠিত একটি ধর্মকে চ্যালেঞ্জ করা কখনোই জনপ্রিয় পদক্ষেপ নয়। আর এটি আরো বেশি খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যদি সমালোচনা স্থানীয় অর্থনীতির জন্যে হুমকিস্বরূপ হয়। এটি ছিল এমন একটি সমাজ যেখানে বহু দেবতারই পূজা করা হতো, এবং এইসব পূজনীয় দেবতাদের মূর্তি বানানো বেশ লাভজনক একটি ব্যবসা ছিল। সুতরাং আব্রাহাম নিজেকে ঝামেলায় জড়িয়ে ফেলেছিলেন। তার জন্যে তখন একমাত্র নিরাপদ পথ ছিল, সেই শহর ত্যাগ করে চিরকালের জন্যে চলে যাওয়া। এই মুহূর্ত থেকেই তিনি গন্তব্যহীন যাযাবরে পরিণত হন, যিনি তার পরিবার আর পশুর পাল নিয়ে অনেক দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন। কিন্তু এটি তার একটি আধ্যাত্মিক যাত্রাও ছিল, যা ধর্মীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল।

আব্রাহামের গল্পটি সেই মুহূর্তটিকে চিহ্নিত করে, যখন বহুঈশ্বরবাদ থেকে একেশ্বরবাদ বরাবর ধর্মীয় ভাবনাগুলোর দিক পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, যখন বহু। দেবতার প্রতি শিথিল আনুগত্য আর উপাসনা, একজন ঈশ্বরের প্রতি কঠোর আনুগত্যে রূপান্তরিত হতে শুরু করেছিল। এই পরিবর্তনটিকে প্ররোচিত করেছিল কি? কেন আব্রাহাম তার বাবার দোকানের এইসব নিরীহ ছোট মূর্তিগুলোর ব্যাপারে এত ক্ষুব্ধ ছিলেন? আব্রাহামের মনের ভিতর প্রবেশ করতে আমাদেরকে কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে। কিন্তু সেখানে আসলে কী ঘটেছিল তার অংশবিশেষ অনুধাবন করার বিষয়টি বেশ সহজ। তিনি দেখেছিলেন যে, তার বাবা এই ছোট মূর্তিগুলো খোদাই করছেন। তিনি জানতেন এইসব বানাতে কী ব্যবহার করা হচ্ছে। সুতরাং তিনি কীভাবে এটিকে মানুষের খেলনা ছাড়া আর অন্যকিছু ভাববেন? বেশ, তাহলে সহজ বিশ্বাসীদের মতো তিনি কেন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বিষয়টি উপেক্ষা করেননি এবং নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেননি? কেন তিনি এত রেগে গিয়েছিলেন?

এর কারণ, তিনি ছিলেন একজন নবী। যিনি তার মাথায় ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলেন। এবং সেই কণ্ঠ তাকে সতর্ক করেছিল, এইসব দেবতাদের পূজা করা শুধুমাত্র একটা খেলা নয়-যা মানুষকে বিনোদন দেয় অথবা মূর্তি ব্যবসায়ীদের জীবিকা অর্জনে সহায়তা করে। এর ভিত্তি একটি ভয়ংকর আর বিপজ্জনক মিথ্যা। শুধুমাত্র একজনই ঈশ্বর আছেন, তিনি শুধুমাত্র এইসব মূর্তি আর দেবতাদের ছবি দেখেই বিতৃষ্ণাই অনুভব করেননি, এগুলো তিনি তীব্রভাবে ঘৃণা। করতেন, কারণ এগুলো সত্যিকার সৃষ্টিকর্তা পিতার সাথে পরিচয় হওয়া থেকে। তার নিজের সন্তানদের বাধা দেয়। আগন্তুকের দ্বারা অপহৃত হওয়া সন্তানের পিতামাতাদের মতো তিনি তাদের ফেরত চান, আর তাদের যারা অপহরণ করছিল, তাদের শাস্তি চান।

এটি মানবকাহিনির ক্রান্তিকালীন গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত, এবং বিষয়টি নিয়ে আরেকটু ভাবা যুক্তিযুক্ত হতে পারে। আমাদের ইতিহাস থেকে স্পষ্ট যে, পরস্পরকে ঘৃণা করার ব্যাপারে মানুষ খুবই দক্ষ। সাধারণত যারা আমাদের থেকে কোনো না-কোনোভাবে ভিন্ন, তারাই আমাদের ঘৃণার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। বর্ণ, শ্রেণি, রঙ, লিঙ্গ, রাজনীতি, এমনকি চুলের রঙও আমাদের ভেতরে কুৎসিত আচরণ উসকে দিতে পারে। ধর্মও সেটি করতে পারে। বাস্তবিকভাবে, ধর্মীয় ঘৃণা সম্ভবত এই ধরনের মানব অসুস্থতার সবচেয়ে প্রাণঘাতী রূপ, কারণ এটি মানুষের ঘৃণাকে ঐশ্বরিক যৌক্তিকতা প্রদান করে। কারো মতামত পছন্দ নয় বলে সেই মানুষগুলোকে ঘৃণা করা এক জিনিস। তবে বিষয়টি পুরোটাই ভিন্ন হয়ে ওঠে, যখন এমন কিছু বলা হয় যে, ঈশ্বরও তাদের ঘৃণা করেন এবং তিনি তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চান। সুতরাং খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি লক্ষ করা যে, ধর্মীয় বিশ্বাস মানব সম্পর্কগুলোয় একটি বিপজ্জনক উপাদান যুক্ত করে আব্রাহামের কাহিনি থেকে আরেকটি ঘটনা যেমন সেটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।

মূর্তিগুলোকে ঘৃণা করার নির্দেশ দেওয়া ছাড়াও, আব্রাহামের মাথার মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠা সেই কণ্ঠ তাকে তার পিতৃভূমি ত্যাগ করে অন্য একটি দেশে চলে যাবার জন্যে নির্দেশ দিয়েছিল, যেখানে একটি সময় তিনি একটি মহান জাতির সূচনা করবেন। সুতরাং জেনেসিস আমাদের বলছে যে, আব্রাহাম তার পরিবার এবং গবাদি পশুর পাল নিয়ে দেশত্যাগ করেছিলেন, এবং তিনি ইউফ্রেতিস অতিক্রম করে পশ্চিমদিকে তার যাত্রা অব্যাহত রেখেছিলেন, যতক্ষণ-না তিনি কানানে এসে পৌঁছান। কানান আজ পরিচিত ইসরায়েল অথবা প্যালেস্টাইন নামে, একটি বিশাল সাগরের পূর্বতীরে যার অবস্থান, যে সাগরটিকে আমরা এখন ভূমধ্যসাগর নামে চিনি। তবে সাগরতীরে নয় বরং আব্রাহাম তার বসতি গড়েছিলেন আরো অভ্যন্তরে, দেশটির মেরুদণ্ডের মতো বিস্তৃত চুনাপাথরের পাহাড়শ্রেণির ধার ঘেঁষে বিস্তৃত সমতলে। এখানেই তার পরিবার আর তার অনুসারী গোত্র-সদস্যরা ক্রমশ আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন।

তারপর একদিন আবার সেই কণ্ঠটি আব্রাহামের মাথায় কথা বলে উঠেছিল। এটি তাকে নির্দেশ দিয়েছিল তার ছেলে আইজাককে স্থানীয় পাহাড়ের উপর একটি জায়গায় নিয়ে যেতে, যেখানে তাকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বিসর্জন দিতে হবে। আব্রাহাম পশুহত্যা এবং তাদের পুড়িয়ে ঈশ্বরের প্রতি বিসর্জন দেওয়ায় অভ্যস্ত। ছিলেন, কিন্তু তিনি কখনোই তার নিজের সন্তানদের কাউকে বিসর্জন দেবার এমন কোনো নির্দেশ পাননি। কিন্তু তিনি সেই নির্দেশকে প্রশ্ন কিংবা অমান্য করার সাহসও পাননি। পরের দিন বেশ সকালেই তিনি ঘুম থেকে উঠে বেশকিছু জ্বালানি কাঠ দড়ি দিয়ে বেঁধে তার গাধার পিঠে দুজন তরুণ আর তার ছেলেকে নিয়ে বের হয়েছিলেন। যখন সেই পাহাড়ের নিচে এসে পৌঁছেছিলেন, তিনি সেই তরুণদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তার জন্যে সেখানে অপেক্ষা করতে এবং তার গাধাটির পাহারা দিতে। তিনি জ্বালানি কাঠের আঁটিটা পুত্র আইজাকের পিঠে বেঁধে দেন, একটি মশাল জ্বালান এবং ধারালো একটি ছুরি তার কোমরবন্ধে গুঁজে নেন। এবং দুজনেই পর্বতের উপরে উঠতে শুরু করেন। যখন তারা এই পাহাড় বেয়ে উঠছিলেন আইজাক তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বিসর্জনের জন্য আপনার কাছে আগুন আর ছুরি প্রস্তুত আছে বাবা? কিন্তু সেই প্রাণী কৈ, যাকে আপনি জবাই করবেন? উত্তরে আব্রাহাম বলেছিলেন, চিন্তা কোরো না পুত্র, আমাদের যা দরকার তা সব ঈশ্বরই জোগাড় করে দেবেন।

যখন তারা পাহাড়ের উপর সেই জায়গায় উপস্থিত হলেন, যেখানে বিসর্জন দেবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আব্রাহাম পাথর দিয়ে সাজিয়ে একটি সাময়িক পূজার বেদি তৈরি করলেন, এবং এর উপর জ্বালানি কাঠ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারপর তিনি তার আতঙ্কে কম্পমান পুত্রকে ধরে মুখ নিচু করে সেই কাঠের সাথে বেঁধে ফেলেন। এরপর তিনি আইজাকের লম্বাচুল দুই হাতে ধরে মাথাটা টান দিয়ে উপরে তোলেন তার গলাটি উন্মুক্ত করতে। এরপর তিনি তার কোমর থেকে ছুরিটি টেনে বের করেন এবং তার পুত্রের গলা কাটতে উদ্যত হন, ঠিক যখনই এই কাজটি তিনি করবেন, তখনই তার মাথার সেই কণ্ঠস্বর আবার তাকে নির্দেশ দিয়েছিল।

‘আব্রাহাম, তোমার পুত্রকে হত্যা কোরো না, এটি বলেছিল, আমার নির্দেশে তাকে হত্যা করতে তোমার ইচ্ছাটাই প্রমাণ করে, মানবিক আবেগের চেয়ে আমার প্রতি তোমার আনুগত্য আরো বেশি শক্তিশালী। সুতরাং, আমি তোমার পুত্রের জীবন রক্ষা করব। ভয়ানকভাবে কম্পমান আব্রাহাম তার ছুরি নিচে নামিয়ে নেন, তারপরই তিনি কাছেই একটি বড় রামছাগল লক্ষ করেন, একটি কাঁটা ঝোপে যার শিং আটকে গিয়েছিল। উদ্বেগ থেকে মুক্তির উন্মত্ততায় তিনি তার পুত্রের পরিবর্তে দ্রুত সেই প্রাণীর গলা জবাই করেন এবং ঈশ্বরের প্রতি নিবেদন করেন সেই বেদিতে এই মাউন্ট মরিয়া’র বিষয়ে আমাদের কখনোই বলা হয়নি, আইজাক এই। ভয়ানক অভিজ্ঞতা নিয়ে কী ভেবেছিলেন। কিন্তু সেটি কল্পনা করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়।

আমরা জানি কিছু আদি ধর্মে মানব বিসর্জনের প্রচলন ছিল। এবং কীভাবে এটি শুরু হয়েছিল সেটি বোঝাও খুব কঠিন নয়। দেবতাদের যদি স্বেচ্ছাচারী শাসকদের মতো ভাবা হয়, যাদেরকে আপনার পক্ষে রাখতে হবে, তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন যে, কীভাবে আদিম মন হয়তো এমন কোনো উপসংহারে পৌঁছেছিল : সেরা প্রাণীটি বিসর্জন দেবার পাশাপাশি মাঝে মাঝে মানুষ বলি দিলে হয়তো আসলেই তাদের সমর্থন আর মন জয় করা সম্ভব হতে পারে। আব্রাহাম আর আইজাকের এই বিষণ্ণ গল্পে হয়তো একটি দূরের প্রতিধ্বনি আছে। কিন্তু এটি সেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি প্রথাগত জুডাইজম বা ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম আর ইসলামে। যে ধর্মগুলোর জন্যে এটি আবশ্যিক পাঠ্যাংশ। তাদের জন্য এই কাহিনিটি যা সংজ্ঞায়িত করেছে, সেটি হচ্ছে পৃথিবী সব বন্ধন উপেক্ষা করে। ঈশ্বরের ইচ্ছার প্রতি চূড়ান্ত নিবেদন আর আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ। যদিও আমরা এখন এমন কোনো পিতাকে অবশ্যই উন্মাদ ভাবব, যিনি কিনা দাবি করেন, তার পুত্রকে হত্যা করতে ঈশ্বরই তাকে নির্দেশ দিয়েছেন–এমনকি যদি সে শেষমুহূর্তে সেটি না করে পিছিয়েও আসেন–এর মানে এই না যে, সব ধর্মই একটি পাগলামি এমন কোনো সিদ্ধান্তে আমাদের খুব দ্রুত পৌঁছাতেই হবে। কিন্তু এর। কিছু দাবির বিপরীতে প্রশ্নবোধক চিহ্ন রাখা বুদ্ধিমানের মতো কাজ হবে, সময়ের সাথে যখন এই গল্পটাকে আমরা আরো অনুসরণ করব। যে বিপদটি আমরা এখানে লক্ষ করেছি, সেটি হচ্ছে মানবমনের মধ্যে কথা বলা ঈশ্বরের কণ্ঠকে অতিরিক্ত বেশি কর্তৃত্ব দেবার প্রবণতা। মূর্তির প্রতি আব্রাহামের গভীর ঘৃণা এখানে একটি ভালো নির্দেশিকা।

আমরা তার চিন্তাটিকে অনুসরণ করেছি, যেখানে তিনি মানুষের সৃষ্টি বলে মূর্তিগুলো প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছেন, এদের স্বর্গীয় কোনো শক্তি বলে ভাবা পুরোপুরিভাবেই অদ্ভুত একটি বিষয়। কিন্তু ঈশ্বর সম্বন্ধে মানুষের ধারণাগুলো কি মানুষেরই আবিষ্কার নয়? আমরা হয়তো সেগুলো পাথর কিংবা কাঠের টুকরো ব্যবহার করে নিজেদের হাত দিয়ে খোদাই করে তৈরি করিনি। কিন্তু আমরা সেটি করেছি আমাদের মনের গভীরে, শব্দ আর ধারণা দিয়ে। এইসব ধারণাগুলোর নামে করা দাবিগুলোর ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করে দেওয়ার জন্যে এটি যথেষ্ট একটি কারণ হওয়া উচিত। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি এরকম কিছু দাবি কত বিপজ্জনক হতে পারে। সেই ধারণাটি ঈশ্বর হয়তো চাইতে পারেন আমরা যেন আমাদের সন্তানদের বিসর্জন দিই– প্রদর্শন করে ধর্ম মানবসমাজের জন্যে একটি শক্র হতে পারে। আব্রাহামকে নিয়ে ঈশ্বরের পরীক্ষা আর কিছু না হলেও অন্তত এটি প্রমাণ করে যে, মানুষ তাদের নিজেদেরকে যে-কোনোকিছু করতেই প্ররোচিত করতে পারে, যদি তারা মনে করেন সেই নির্দেশটি এসেছে ‘উপর’ থেকে। কোনো-না-কোনো সময়, প্রায় সবকিছুই ধর্মের নামে করা হয়েছে।

আমি বলেছিলাম যে, আব্রাহামের গল্পটি ধর্মের ইতিহাসের একটি ক্রান্তিকালীন মুহূর্ত। এটি বহুঈশ্বরবাদ থেকে একেশ্বরবাদ, একজন ঈশ্বরের ধারণার দিকে মানুষের মন ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এবং এটি প্রদর্শন করেছিল ধর্মগুলো কখনোই স্থির বা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে না। সারাক্ষণই সেগুলো বিবর্তিত আর পরিবর্তিত হচ্ছে। ধর্ম অনেকটাই চলচ্চিত্রের মতো। আর সে-কারণে আব্রাহাম খুবই প্রভাবশালী একটি চরিত্র। তিনি বহুদূরে অজানায় যাত্রা করেছিলেন আর তার দিক পরিবর্তন করেছিলেন, সেটি শুধু পৃথিবীর উপরেই না, তার নিজের মনেও। এই ঘুরে দাঁড়ানো আর দিক পরিবর্তন করার ক্ষমতাই কৌতূহলোদ্দীপক সব মানুষেরই বৈশিষ্ট্যসূচক একটি চিহ্ন। আর ধর্ম বোঝার জন্যে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।

আব্রাহাম গন্তব্যহীন একটি পথের যাত্রী ছিলেন, এবং তার মৃত্যুর পর, যে গোত্রগুলো তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেগুলোর সদস্যরা তাদের যাত্রা অব্যাহত রেখেছিলেন, যেমন মানুষ সবসময়ই করেছে আরো উত্তম জীবনের অনুসন্ধানে। কাহিনি বলছে, আব্রাহামের মৃত্যুর কয়েক প্রজন্ম পরে একটি বড় দুর্ভিক্ষ কানান আক্রমণ করেছিল, যা বাধ্য করেছিল তার উত্তরসূরিদের আবার পথে নামতে। এইবার তারা দক্ষিণে আরেকটি বিশাল নদী অতিক্রম করে মিশরে গিয়েছিলেন। যেখানে তাদের ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। যেখানে মোজেসের সাথে আবার আমাদের দেখা হবে।

০৮. নলখাগড়ার বনে

আইজাক, যে ছেলেকে নিজের মাথার মধ্যে শোনা কণ্ঠের নির্দেশে আব্রাহাম প্রায় হত্যা করতে গিয়েছিলেন, তিনি বেঁচেছিলেন এবং নিজেই একসময় সন্তানের পিতা হতে পেরেছিলেন। আর আইজাকের ছেলে ইয়াকব, এর আগে তার পিতামহের মতো তার প্রতি নির্দেশিত ঈশ্বরের কণ্ঠ শুনতে পেয়েছিলেন। কণ্ঠটি বলেছিল, তাকে আর ইয়াকব বলে ডাকা হবে না। এখন থেকে তার নতুন নাম হবে ‘ইজরায়েল’, যার অর্থ ‘ঈশ্বর শাসন করেন’। সুতরাং তার বারোটি ছেলেকে ডাকা হতো চিলড্রেন অব ইসরায়েল (ইজরায়েলের সন্তান) নামে অথবা ‘ইজরায়েলাইটস’। দাদা আব্রাহামের মতোই, ইয়াকব, এখন যার নাম ইজরায়েল, একজন যাযাবর মেষপালক ছিলেন। পানি আর ভালো চারণভূমির সন্ধানে তিনি তার গবাদি পশুর পালকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যেতেন। ধীরে ধীরে ইজরায়েলাইটসরা একটি গোত্র হিসাবে আকারে বেশ বড় আর সবচেয়ে সমৃদ্ধ পানির কুয়া আর সেরা চারণভূমির জন্যে অন্য গোত্রগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করার মতো তারা যথেষ্ট পরিমাণ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু একসময় ভয়াবহ একটি দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছিল পুরো কানান এলাকাটি। এর ঘাস আর কুয়ার পানি শুকিয়ে গিয়েছিল, সুতরাং ইজরায়েলাইটরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, যেভাবে মানুষ সেই সময়ের সূচনা থেকেই করেছে, অন্য কোথাও গিয়ে তাদের ভাগ্যটা যাচাই করে দেখাই বরং তাদের জন্যে উত্তম হবে। এবং তারা আরো দক্ষিণে মিশরে এসে বসতি গড়েছিলেন, যেখানে নীলনদের পলিতে সমৃদ্ধ চারণভূমিতে তাদের গবাদি পশুরা চরে বেড়াত। প্রথমদিকে স্থানীয় মিশরীয়রা সাদরে তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, নীলনদের কাছে এবং সাগর থেকে খুব একটা দূরে নয়, গোশেন প্রদেশে তাদের বসতিস্থাপন করতে অনুমতি দিয়েছিল। এখানে ইজরায়েলাইটরা আরো বেশি সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং তাদের সংখ্যাও বেড়েছিল। কিন্তু তারা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতেন। মূর্তির প্রতি আব্রাহামের তীব্র ঘৃণার কথা স্মরণ করে, স্থানীয় ধর্ম থেকে তারা নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন, যা মূলত ছিল একধরনের প্রাণবন্ত বহুঈশ্বরবাদ, যেখানে দেবদেবীরা কুকুর, বিড়াল, কুমির এবং অন্য প্রাণীদের রূপে উপাস্য ছিলেন।

প্রায়শই সেই মানুষগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়ে থাকে, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাথে মিশতে অস্বীকার করেন, ইজরায়েলাইটরা ক্রমেই মিশরীয়দের অপছন্দের পাত্র হয়ে উঠতে শুরু করেছিলেন। এবং যখন তারা সংখ্যায় বেড়েছিলেন, এবং আরো বেশি সফল হয়ে উঠেছিলেন, যে অপছন্দ তারা স্থানীয়দের মনে উদ্রেক করেছিলেন, সেটি একসময় ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়েছিল। তারপর এই ঘৃণাই ইজরায়েলাইটদের উপর স্থানীয়দের নির্যাতন আর তাদেরকে বাধ্যতামূলক শ্ৰম-দাসে রূপান্তরিত করার একটি অজুহাতে পরিণত হয়েছিল। এবং যখন এই সংগঠিত নিষ্ঠুরতা তাদের দমন করতে ব্যর্থ হয়েছিল, মিশরীয় কতৃপক্ষ পরিকল্পিত উপায়ে তাদের ধ্বংস করার একটি নীতি গ্রহণ করেছিল। ইজরায়েলাইট নারীদের মিশরীয় পুরুষদের জীবনসঙ্গী হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য করতে এবং বাকিদের সাধারণ জনসংখ্যার সাথে একীভূত করার উদ্দেশ্যে রাজা সদ্যজাত সব পুরুষ ইজরায়েলাইটদের জন্মের পরপরই হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একজন মা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, চোখের সামনে নিজের সন্তানের হত্যাকাণ্ড দেখার চেয়ে বরং তাকে নিয়তির হাতেই ছেড়ে দেবেন। সুতরাং খুব সতর্কভাবে প্রস্তুত পানিরোধী একটি ঝুড়িতে শিশুটিকে রেখে, সেটি তিনি নীলনদের তীরে নলখাগড়ার বনের মধ্যে রেখে এসেছিলেন, ঠিক সেই জায়গায় যেখানে তিনি জানতেন ফারাও কন্যা, মিশরের রাজকুমারী, নিয়মিত স্নান করতে আসেন। তার এই কৌশলটি কাজে লেগেছিল। যখন রাজকন্যা নলখাগড়ার ঝোঁপের মধ্যে একটি ঝুড়িতে শিশুটিকে ভাসতে দেখেছিলেন, তার নিজের সন্তান হিসাবে তিনি শিশুটিকে দত্তক নেন এবং তাকে মিশরীয় একটি নাম দিয়েছিলেন, মোজেস।

যদিও তিনি রাজপ্রাসাদে বিলাসী আর স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি যে মিশরীয় নন, বরং একজন ইজরায়েলাইট, সেই বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। ক্রমশ দৃঢ় হতে থাকা একটি অনুভূতি তাকে একটি অনুধাবনে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল, আর সেটি হচ্ছে : তার নিয়তি ঐ ক্রীতদাসদের সাথে সংশ্লিষ্ট, তাদের শোষকদের সাথে নয়, যারা তাকে দত্তক নিয়েছিল এবং প্রতিপালন করেছে। সুতরাং তার স্বজাতিরা কেমন আছে সেটি দেখতে তিনি আরো বেশি কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন। একদিন কৌতূহলই কর্মরত তাদের একটি দলের কাছে যেতে তাকে প্ররোচিত করেছিল। যখন তিনি দেখেছিলেন যে, তাদের মিশরীয় তত্ত্বাবধায়ক নৃশংসভাবে একজন ইজরায়েলাইটকে প্রহার করছেন, তিনি এতই রেগে গিয়েছিলেন, তিনি সেই মিশরীয়কে সেখানেই হত্যা করে মরুভূমির বালির মধ্যে কবর দিয়ে রেখেছিলেন।

আবারো একই কৌতূহল পরের দিন তাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার তার ক্রোধ উসকে দিয়েছিল পরস্পরের সাথে হাতাহাতি করা দুইজন ইজরায়েলাইট। যখন তিনি এই ঝগড়া থামাতে হস্তক্ষেপ করতে উদ্যত হয়েছিলেন, ঝগড়াটি শুরু করেছিল যে ব্যক্তি, তিনি মোজেসকে দেখে ব্যঙ্গ করে বলে উঠেছিলেন : ‘ধরে নিচ্ছি এবার আপনি আমাকেও খুন করবেন, ঠিক গতকাল যেভাবে মিশরীয়কে মেরেছিলেন, তারপর একইভাবে আমাকেও বালির মধ্যে কবর দিয়ে রাখবেন’। তিনি আসলে কে, সেটি তারা বুঝতে পেরেছিলেন, আর এই খবর এখন দ্রুত প্রাসাদে পৌঁছে যাবে ও তাকে বিপদে ফেলবে, বিষয়টি অনুধাবন করে, মোজেস মরুভূমির দিকে পালিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে মেষপালকদের একটি পরিবার তাকে আশ্রয় দিয়েছিল।

এখানেই প্রথম তার সাথে আমাদের দেখা হয়েছিল এই বইয়ের শুরুতে, একটি মরুভূমির কাঁটা-ঝোঁপের সামনে তখন তিনি নতজানু হয়ে আছেন, যিনি সেই কণ্ঠটি শুনছিলেন, সেটি তাকে এমন কিছু বলছিল যা তিনি শুনতে চাইছিলেন না। তাকে সেই কণ্ঠস্বরটি বিপজ্জনক একটি কর্তব্য পালন করার জন্যে নির্দেশ দিয়েছিল, যে নির্দেশটি পালন করার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না। এটি সেই একই কণ্ঠস্বর, যা একদিন মেসোপোটেমিয়ানদের উপাস্যদেবতাদের প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে আব্রাহামকে তার জীবনের ঝুঁকি নিতে বলেছিল। এটি সেই কণ্ঠস্বর, পুত্র আইজাককে বিসর্জন দেবার জন্যে যা পরে আব্রাহামকে নির্দেশ দিয়েছিল। এবং এটি সেই একই কণ্ঠস্বর, যা ইয়াকবকে তার নাম পরিবর্তন করে ইজরায়েল (যার অর্থ ‘ঈশ্বর শাসন করেন’) রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এটি ছিল দেবতাদের নিয়ে ভাবার একটি নতুন উপায়। একসময় গ্রহণযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, প্রতিটি গোত্রের একটি নিজস্ব দেবতা (বা দেবতারা) থাকবে। কিন্তু এই ধারণাটি, একজন মাত্র দেবতা মানুষের নিয়তি নিয়ন্ত্রণ করেন, এমনকি হয়তো ইতিহাসও যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন, সেটি ছিল নতুন এবং ভীতিকর। যখন মোজেস সেই কণ্ঠস্বরটির নাম জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যিনি তার সাথে কথা বলছিলেন, তার উত্তরটিও এমনকি আরো বেশি অস্বস্তিকর ছিল। ‘আমি’, শুধুমাত্র এটাই ছিল তার উত্তর। এই বাক্যটির প্রকৃত অর্থ কী হতে পারে সেটি সমাধান করা বেশ কঠিন একটি ব্যাপার। কিন্তু এটি প্রস্তাব করেছিল যে, এই কণ্ঠস্বরই সব

জীবন আর শক্তির উৎস, এবং যা কিছুর অস্তিত্ব আছে এটি তার নেপথ্য অর্থ। এবং যাদের প্রতি এটি উচ্চারিত হয়েছিল তারা অনুভব করেছিলেন, এর সাথে নিজেদের যুক্ত করলে তাদের নিজেদের বিপদে পড়ার সম্ভাবনা আছে।

এমন নয় যে, এই ধরনের একটি পরিস্থিতিতে তাদের কিছু বলার সুযোগ আছে। এটি প্রায় শূন্য থেকে হাজির হয়ে তাদের মনে বজ্রপাতের মতো আঘাত হানে, এমন কোনো ধারণার মতো যে ধারণার কাছ থেকে কোনো নিস্তার নেই। এটি তাদের বলেছিল, মাত্র একজন’ ঈশ্বর আছেন, এবং শুধুমাত্র একজন ঈশ্বর হতে পারেন। বাকি সব দেবতারাই মানবসৃষ্ট, হয় মানব কল্পনা তাদের সৃষ্টি করেছে অথবা আক্ষরিকার্থে মানুষের হাতেই তাদের তৈরি করা হয়েছে। এইসব তথাকথিত দেবতারা সব মিথ্যা। এই মিথ্যাই মানুষের প্রাণশক্তিকে নষ্ট করেছে এবং সে-কারণেই এদের অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতে হবে, এবং একজন ও একমাত্র সত্যিকার ঈশ্বর, যিনি ইজরায়েলের সন্তানদের নির্বাচিত করেছেন, এই সত্যটি সারা পৃথিবীতে সবাইকে জানাতে হবে। কোনো সন্দেহ নেই যাদের কাছে এই বার্তা এসেছিল, তারা আতঙ্কিত হয়েছিলেন। বহুসংখ্যক দেবতা এবং অসংখ্য উৎসাহী পূজারি এবং এই দেবতাদের সেবা দেবার নামে প্রতিষ্ঠিত নানা ব্যবসায় পৃথিবী পূর্ণ। মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে অপমান করা এমনিতেই যথেষ্ট খারাপ একটি কাজ, এবং যেভাবে তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে সেটিকে হুমকি দেওয়া এমনকি আরো বিপজ্জনক।

সে-কারণে মোজেস এই কণ্ঠস্বরের দাবিগুলোকে অস্বীকার করতে চেষ্টা করেছিলেন। তিনি কেবলই মিশর আর এর শাসকদের কাছ থেকে থেকে পালিয়ে এসেছেন। কিন্তু এখন তার মাথার মধ্যে এই কণ্ঠস্বরটি তাকে আবার মিশরে ফিরে যেতে এবং সেখানে একটি বিপ্লব সংগঠিত করতে নির্দেশ দিচ্ছে। তার দায়িত্ব হচ্ছে ইজরায়েলাইটদের নেতৃত্ব দেয়া –ইতিমধ্যেই তিনি যাদের অকৃতজ্ঞ আর উছুঙ্খল একদল মানুষ হিসাবে জানেন–তিনি যেন তাদের মিশর থেকে বের করে অন্য একটি দেশে নিয়ে যান। যদি ধরে নেই তারা সেখানে পৌঁছাতে পারলেন, কিন্তু কে জানে ঠিক কী ধরনের অভ্যর্থনা তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। সেই দেশে, যার প্রতিশ্রুতি তাদের দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই কণ্ঠস্বরটির তীব্রতা কমেনি, এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও মোজেস সেই নির্দেশ মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। দুটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে আবার তিনি মিশরে ফিরে এসেছিলেন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি ছিল, ইজরায়েলাইটদের প্ররোচিত করা যে, আব্রাহাম, আইজাক আর ইয়াকবের ‘ঈশ্বর তাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তিনি তাদের মিশর থেকে নতুন একটি দেশের দিকে নিয়ে যান, যেখান থেকে তারা বহু প্রজন্ম আগে মিশরে এসেছিল। অভিযোগ আর অনুযোগ আর প্রতিবাদের পর তারা অবশেষে রাজি হয়েছিলেন তাকে অনুসরণ করতে, শুধুমাত্র যদি তিনি তাদের মুক্তি দিতে ফারাওকে রাজি করাতে পারেন। আর কীভাবে তিনি সেটি করার পরিকল্পনা করছেন?

মোজেসের প্রথম পদক্ষেপ ছিল, মিশরীয়দের কাছ থেকে কয়েকদিনের ছুটি আদায় করা, ইজরায়েলাইটরা যেন গোশেনের উত্তরে মরুভূমিতে তাদের ঈশ্বরের উপাসনা করতে পারেন। ইজরায়েলাইটদের অহংকারী আর একচেটিয়া স্বতন্ত্র ধর্মের প্রতি ইতিমধ্যেই ঘৃণাপূর্ণ মিশরীয়রা এই হিংসুটে দেবতার পূজা করতে। তাদের ছুটি দিতে অস্বীকার করেছিল। এরপর এই গল্পটি আমাদের বলছে, মোজেস দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা নিয়ে তার আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন, যেখানে ইজরায়েলাইটদের ঈশ্বর মিশরীয়দের উপর একের-পর-এক দুর্যোগ ঘটিয়ে আক্রমণ করেছিলেন। অবশেষে এটি এর চূড়ান্ত পরিণতি পেয়েছিল সেই ইজরায়েলাইটদের প্রথম পুত্রদের হত্যা করার মতো ভয়ংকর ঘটনার প্রতিধ্বনি করে, অতীতে যে-গণহত্যাটি একদিন মোজেসের জন্য ফারাও’র নিজের পরিবারে প্রতিপালিত হবার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল।

মোজেসকে সেই কণ্ঠস্বর নির্দেশ দিয়েছিল, ইজরায়েলাইটরা যেন একটি নির্দিষ্ট রাতে তাদের ঘরের দরজার বাইরে বের না হয় এবং প্রতিটি পরিবার একটি মেষ বিসর্জন দেবে এবং দরজার উপর সেই মেষের রক্ত দিয়ে একটি চিহ্ন এঁকে রাখবে, যা এটিকে মিশরীয়দের বাসা নয় বরং ইজরাইলাইটদের বাসা হিসাবে চিহ্নিত করবে। এবং সেই মধ্যরাতে প্রতিটি মিশরীয় পরিবারের প্রথম সন্তান, এমনকি তাদের গবাদি পশুর প্রথম সন্তানটিকে ঈশ্বর সারা দেশজুড়ে হত্যা করেছিলেন, কিন্তু রক্তদ্বারা চিহ্নিত ঘরগুলো তিনি এড়িয়ে যান তাদের কোনো ক্ষতি না করে। যখন সকাল এসেছিল, ভয়ংকর আর্তনাদে সারাদেশ কেঁপে উঠেছিল, দিনের আকাশ যা হাহাকারে বিদীর্ণ করেছিল। এমন কোনো মিশরীয় বাড়ি ছিল না যেখানে সেই রাতে কেউ মারা যায়নি। সুতরাং ফারাও মোজেসকে। ডেকে পাঠান এবং বলেন, ‘তুমি জিতেছ, তোমার স্বজাতির মানুষগুলোকে তুমি মরুভূমিতে নিয়ে যাও, কিছুদিনের জন্যে তোমাদের ঈশ্বরের উপাসনা করতে, আমাদের ত্যাগ করে যাও, যেন আমরা আমাদের মৃতদের নিয়ে শোক করতে পারি। সুতরাং সেই পালিয়ে যাবার পরিকল্পনাটি সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।

মোজেস ইজরায়েলাইটস আর তাদের গবাদি পশুদের দীর্ঘ বিশৃঙ্খল একটি দলকে পথ দেখিয়ে ভূমধ্যসাগরের উপকূলের নিকটেই ‘সি অব রিডস’ নামের একটি বিপজ্জনক নদীর মোহনা অতিক্রম করেছিলেন। তখন ভাটার সময় ছিল, এবং তারা নিরাপদে অপরপ্রান্তে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে মিশরীয়রা বুঝতে পেরেছিলেন, তাদের আসলে বোকা বানানো হয়েছে। ইজরায়েলাইটরা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যে মরুভূমিতে তাদের ধর্মীয় তীর্থে যায়নি। যদি তারা আসলেই সেই কাজটি করত, তাহলে তো তাদের গবাদি পশুর পাল নিয়ে মরুভূমিতে যাবার কথা ছিল না, সুতরাং তারা পালিয়ে যাবার পরিকল্পনাই করেছিল এবং ইতিমধ্যে বাড়তি একটা দিন পরিমাণ সময় তারা চুরি করে বহুদূর এগিয়ে গেছে। সুতরাং মিশরীয়রা তাদের দ্রুতগামী রথ আর ঘোড়ায় চড়ে তাদের ধরতে পিছু নিয়েছিলেন। ‘সি অব রিডসের মোহনায় এসে যখন তারা হাজির হয়েছিলেন, ঠিক তখনই জোয়ারের পানি সেখানে প্রবেশ করতে শুরু করেছিল প্রবল বেগে। সেই স্রোতে আটকা পড়ে তারা সবাই পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন। ইজরায়েলাইটরা এটি তাদের ঈশ্বরের একটি কাজ বলেই দিনটি উদযাপন করে থাকেন। অবশেষে তারা মিশরের দাসজীবন থেকে বহুদূরে এবং স্বাধীন হতে পেরেছিলেন।

এটি ইহুদি জাতির ইতিহাসে একটি নির্ধারণী মুহূর্ত ছিল, এবং এটি তারা সেই সময় থেকেই যথাযথ মর্যাদায় উদযাপন করে আসছেন। এটিকে বলা হয় ‘ফিস্ট অব পাসওভার। বার্ষিক এই উৎসবের দিনটিতে ইহুদিরা অতীতের সেই রাতটিকে স্মরণ করেন, যখন স্বর্গীয় বিনাশক ঈশ্বর ইজরায়েলের সন্তানদের নিরাপদে পার করে দিয়েছিলেন; এবং মিশরের ক্রীতদাস-জীবন থেকে তাদের জন্যে প্রতিশ্রুত দেশে পালিয়ে আসার সময় সুরক্ষা করেছিলেন। এই উৎসবের সন্ধ্যায় ইহুদি শিশুরা তাদের পিতামাতার কাছে জানতে চায়, পাসওভারের দিনটির খাওয়া তাদের অন্যসব উৎসবের খাওয়া থেকে এত ভিন্ন কেন।

এই রাতে সাধারণ রুটির পরিবর্তে কেন তারা মাটসো– চ্যাপ্টা আফোলা রুটি খায়? তাদেরকে এর উত্তরে বলা হয়, এটি খাওয়া হয় কারণ মাটসো তাদের মনে করিয়ে দেয়, মিশর থেকে পালিয়ে আসার সেই রাতে রুটি ফুলে ওঠার জন্যে অপেক্ষা করার মতো সময় তাদের হাতে ছিল না, তাড়াহুড়া করে চুলা থেকে রুটিগুলো যে-অবস্থায় ছিল সেভাবেই তাদের বের করে নিতে হয়েছিল। যখন তারা প্রশ্ন করে, প্রতিরাতে নানাধরনের শাকসবজির বদলে কেন এই রাতে তাদের অবশ্যই একটি তিতা’ শাক খেতে হয়। তাদের বলা হয়, মিশরে দাস হিসাবে তাদের তিক্ত দিনগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় এটি। সেই তিতা শাকটি একবার লবণ পানি আর একবার মিষ্টি মিশ্রণে ডুবিয়ে তারা স্মরণ করেন, তাদের অশ্রুগুলো আনন্দে এবং তাদের দুঃখ রূপান্তরিত হয়েছিল সুখে। এবং যখন তারা জিজ্ঞাসা করে, কেন এই রাতে তারা টেবিলে শুয়ে পড়তে পারবে। তাদের বলা হয়, মিশরে শুধুমাত্র স্বাধীন যারা তারাই শুয়ে শুয়ে খেতে পারতেন, যখন দাসদর অবশ্যই দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। এখন তারা স্বাধীন, সুতরাং তারা এখন সেটি করতে পারবেন।

ইহুদি শিশুরা এই প্রশ্নগুলো প্রতি পাসওভারের রাতে জিজ্ঞাসা করে আসছে গত ৩৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। একই প্রশ্ন করা হয় আর একই উত্তর দেওয়া হয়। তারা এখন স্বাধীন, তাই তারা এখন শুয়ে শুয়ে খেতে পারবেন! এই গল্পের হৃদয়স্পর্শী বিষয়টি হচ্ছে, তাদের ইতিহাসে অসংখ্যবার, যখন ইহুদি শিশুরা এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞাসা করেছে এবং সেই একই উত্তর শুনেছে, যা তাদের স্বাধীনতার ঘোষণা বহন করছে, কিন্তু তারা আবারও বন্দি হয়েছিলেন। আর এটাই সেই মেঘ –এই গল্পের উপর যা একটি ছায়া ফেলেছিল, যখন গল্পটি সময়ের সাথে অগ্রসর হয়েছিল। স্বাধীনতা অর্জন করার একটি মহান আর সাহসী উদ্যোগকে এটি উদযাপন করে সেই জাতির জন্যে একটি নির্ধারণী মুহূর্ত হিসাবে, যাদের ইতিহাস মূলত পুরোটাই নির্যাতন আর বন্দিত্বের।

কিন্তু এটি ধর্ম কীভাবে কাজ করে সেই বিষয়ে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ধর্মীয় গল্পগুলো হয়তো অতীতের দিকে তাকায় ঠিকই, কিন্তু সেগুলোর আসল অর্থ হচ্ছে ভবিষ্যতের জন্যে আশা দেওয়া। এভাবেই ইহুদি জনগোষ্ঠী এই গল্পটিকে ব্যবহার করে এসেছেন। তারা এই মহাঅভিপ্রয়াণটিকে স্মরণ করেন। একটি জাতি হিসাবে তাদের জন্মদিন হিসাবে। কিন্তু যা পরে এসেছিল সেটি আতশবাজি আর বিশেষ ভোজসহ স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন নয়। সেটি ছিল উত্তম একটি ভবিষ্যতের সন্ধানে মরুভূমির মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ আর দারুণ দুর্বিষহ একটি যাত্রা।

০৯. দশ নির্দেশ

ইজরায়েলের সন্তানরা মিশরে তাদের দাসত্ব থেকে পালিয়েছিলেন, কিন্তু তাদের সমস্যাগুলো আসলেই কেবল শুরু হয়েছিল। সি অব রিডসে’ মিশরীয় সেনাবাহিনীর নিমজ্জিত হবার ঘটনাটি তাদের সাহস জুগিয়েছিল এবং মোজেস মরুভূমির দিকে তাদের জন্য প্রতিশ্রুত দেশে যাবার জন্য তাকে অনুসরণ করতে প্ররোচিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তারা তখনও আসলে বুঝতে পারেনি, যখন ঈশ্বরকে নিয়ে মোজেস কথা বলছিলেন, তখন আসলে তিনি কী বলতে চাইছিলেন। সেই সময়ের গ্রহণযোগ্য সাধারণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, দেবতারা, বর্তমান সময়ের ফুটবল টিমগুলোর মতো, সংখ্যায় তারা অনেক এবং সহজলভ্য। অবশ্যই আপনি আপনার এলাকার দেবতাকে সমর্থন করবেন, কিন্তু তার মানে এই না যে, বাকি সব দেবতাদের ঘৃণা করবেন। কারণ, আপনি জানেন, ঈশ্বরদের এই লীগে খেলোয়াড়ের সংখ্যা অনেক। ইজরায়েলাইটরা জানতেন, মোজেসের সাথে যে ঈশ্বর কথা বলেছিলেন, তার মধ্যে বিশেষ কিছু আছে, কিন্তু তার মানে এই না যে, লীগে আর কোনো দেবতা নেই। এর মানে শুধু তাদের দেবতাই সবচেয়ে সেরা কারণ, এটি তাদের দেবতা।

আর মোজেস যে-বিষয়টিকে ঠিক সেভাবে দেখছিলেন না, সেটি আবিষ্কার করতে খুব বেশিদিন সময় লাগেনি তাদের। তিনি বলেছিলেন, এমন একটি দেশে তিনি তাদের নিয়ে যাচ্ছেন, যে-দেশে প্রাচুর্যের কোনো অভাব নেই, কিন্তু তাদের মনে হয়েছিল, সেই প্রতিশ্রুত দেশে তাদের নিয়ে যেতে মোজেসের মধ্যে তেমন বিশেষ কোনো তাড়া নেই। মিশর ত্যাগ করার বহুদিন পরে তারা একটি পর্বতের পাদদেশে এসে হাজির হয়েছিল। সেখানে তিনি তাদের বলেছিলেন, এখানে অপেক্ষা করো, আমি উপরে গিয়ে ঈশ্বরের কণ্ঠ থেকে পরবর্তী নির্দেশাবলি শুনে আসি। কিন্তু ফিরে আসতে তিনি এতই দীর্ঘ সময় নিয়েছিলেন যে, ইজরায়েলাইটরা অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, এবং তাদের কিছু করারও ছিল না। সুতরাং তাদের দেখাশুনা করার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা তাদের মনোযোগ অন্যদিকে পরিচালিত করতে একটি ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারিগরদের দিয়ে বিশাল একটি ষাঁড়-শাবকের স্বর্ণমূর্তি তারা নির্মাণ করিয়ে ছিলেন, মিশরীয় ধর্মে দেবতাদের অসংখ্য প্রতাঁকের একটি। একটি বেদির উপর সেটি স্থাপন করে ইজরায়েলাইটদের তারা সেটি পূজা করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। হয়তো তারা ইতিমধ্যে তাদের ছেড়ে আসা মিশরের কথা ভেবে বিষণ্ণ বোধ করছিলেন, অথবা মরুভূমির মধ্যে দিয়ে তাদের এই দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রার পর হয়তো তাদের খানিকটা বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। সোনার বাছুরের এই পূজা উন্মত্ত একটি অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। কোনো রক-কনসার্টে উত্তেজিত ভক্তদের মতো তারাও ঢোলের আওয়াজের সাথে মূর্তির চারপাশে ঘুরে সজোরে চিৎকার করে নাচতে শুরু করেছিলেন।

কিন্তু হঠাৎ করেই মোজেস ফিরে এসেছিলেন তাদের মধ্যে, এবং পরিস্থিতি দেখে তিনি খুবই ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। এই আনন্দ-উৎসব থামিয়ে সবাইকে তিনি নীরব হতে নির্দেশ দেন। তিনি তাদের জানান, পর্বতের উপরে যে কণ্ঠস্বর তার সাথে কথা বলেছিল, তিনি দশটি নির্দেশের একটি তালিকা দিয়ে তাকে ফেরত পাঠিয়েছেন, যে-নির্দেশগুলো ইজরায়েলাইটদের অবশ্যই এই মুহূর্ত থেকে শুরু করে মান্য করে চলতে হবে। এই দশটি নির্দেশই ‘টেন কম্যান্ডমেন্টস’ নামে পরিচিত।

বেশিরভাগ নির্দেশই যে-কোনো গোষ্ঠী বা সমাজের জন্যেই প্রযোজ্য, যে সমাজটি এর সব সদস্যদের একত্রে রাখতে চায়। কোনো হত্যা নয়, কোনো চুরি নয়, সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সাথে প্রতারণা নয়, মিথ্যাকথা নয়, শ্রমিকদের জন্যে একদিন বিশ্রাম নিশ্চিত করা ইত্যাদি খুবই যুক্তিসংগত নির্দেশ। প্রথম নির্দেশনাটিও যুক্তিসংগত ছিল। যে ঈশ্বর তাদের মিশর থেকে মুক্ত করে এনেছেন, তিনিই হবেন তাদের একমাত্র ঈশ্বর এবং কখনোই তারা অন্য কোনো ঈশ্বরের উপাসনা করতে পারবেন না। তারা বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন কারণ নিজেদের পক্ষকেই তারা সমর্থন করবে।

ইসরায়েলাইটদের যা বিস্মিত করেছিল সেটি হচ্ছে দ্বিতীয় নির্দেশটি, এটি তাদের কোনো ধরনের ছবি নির্মাণ করতে নিষেধ করেছিল, শুধু ঈশ্বরই নয়, যে কোনোকিছুরই ছবি তৈরি করা তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। কোনো ছবি নয়, কোনো শিল্পকলা নয়, বিষয়টি তাদের হতবাক করেছিল। যে প্রাণীদের তারা শিকার করতেন কিংবা যে দেবতাদের তারা উপাসনা করতেন, সেগুলো আঁকা তাদের জন্য শাস নেবার মতোই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার ছিল। এক টুকরো চক হাতে যে-কোনো শিশুই এর প্রমাণ দিতে পারবে। যে-কণ্ঠস্বরটি মোজেসের সাথে কথা বলেছিল তিনি যে-কোনো ধরনের শিল্পকলাকেই গভীর সন্দেহের চোখে দেখতেন, কিন্তু এটি চূড়ান্তভাবে ক্রোধোন্মত্ত হয়ে উঠত, যখন তার (ঈশ্বরের) নিজস্ব সত্তার নেপথ্যের রহস্যটি ধরার চেষ্টা করতে মানুষ চিত্রের শরণাপন্ন হতো। কিন্তু, ঈশ্বরের এই ক্ষোভের মূল কারণটি কী ছিল?

এই বিষয়টি বুঝতে সহায়ক হবে যদি আমরা প্রতীক-সংক্রান্ত আমাদের সেই আলোচনায় আবার ফিরে যাই। আমরা লক্ষ করেছিলাম, কীভাবে সেই প্রতীকগুলো মানুষকে আরো বৃহত্তর একটি বাস্তবতার সাথে সংযুক্ত করে। ঠিক যেভাবে এক টুকরো রঙিন কাপড় পুরো একটি দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। মানবতার সবচেয়ে উপযোগী আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে প্রতীক, সংক্ষিপ্ত একটি উপায়, যা আরো বিশাল কোনো বিমূর্ত বিষয়কে ধারণ করতে পারে, যেমন, একটি জাতির ধারণা। আর যখন লেখার পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছিল, তখন এই প্রতীক আরো বেশি উপযোগী প্রমাণিত হয়েছিল। এখন আপনি যে-কোনোকিছুই একটি বইয়ে শব্দে অনুবাদ করতে পারবেন, যে বইটি আপনি আপনার হাতে ধরতে পারবেন। কিন্তু ভুল হয় যখন সেই শব্দগুলো কিসের প্রতিনিধিত্ব করছে, সেই বিষয়ে আমরা সংশয়গ্রস্থ হয়ে পড়ি, এবং এগুলোর সাথে এমনভাবে আচরণ করি যেন এটি যা প্রতিনিধিত্ব করছে, এটি তারই সমতুল্য। কোনোকিছু সম্বন্ধে আমরা যা বলি’ সেটি কখনোই আসলে তেমন নয়। আপনি কিন্তু পানি’ শব্দটিকে পান করতে পারবেন না। এটি পানির জন্য ব্যবহৃত একটি প্রতীক, পানি নিজে’ নয়।

সমস্যা হচ্ছে যে, বিশ্বাসীরা প্রায়শই ধর্মীয় শব্দগুলো এমনভাবে ব্যবহার করে থাকেন, যেন এই নিয়মটি এই শব্দগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যেন তাদের ঈশ্বরের জন্য ব্যবহৃত শব্দটি আসলেই ঈশ্বর। তাদের বইগুলো কাগজের উপর কালির দাগ নয়, বরং দুই মলাটের মধ্যে ঈশ্বর নিজেই চেপে বসে আছেন। আর বিস্ময়ের কোনো কারণ নেই, কাদের শব্দগুলো সেরা আর ঈশ্বরের জন্য সেরা প্রতীকগুলো কাদের আছে, সেই বিষয়গুলো নিয়ে কেন তারা প্রায়শই পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করে। কোনোটাই আমার ধারণার ধারেকাছে আসতে পারে না, বজ্রপাতের মতো গর্জন করে দ্বিতীয় নির্দেশে ঈশ্বর তাদের বলেছিলেন। কোনো ধরনের মানব শিল্পকলা, সেটি দেয়ালে থাকা চিত্র হোক অথবা বইয়ের শব্দ, যে রূপেই প্রকাশ করা হোক না কেন, সেগুলোর কোনোটাই ঈশ্বরের অপার রহস্যময় ধারণাটি ধারণ করার নিকটে আসতে পারে না।

দ্বিতীয় নির্দেশনাটিই ঈশ্বর সম্বন্ধে মানুষের উদ্ভাবিত সব ধারণাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টিটি ধারণ করছে। এর মূল নিশানা ছিল ধর্ম। এবং শুধু সেই প্রকারের ধর্মই নয়, সেই মানুষগুলোকে, যা একটি স্বর্ণনির্মিত বাছুরের মূর্তির চারপাশে নাচতে প্ররোচিত করেছিল। এটি আমাদের জন্যে একটি সতর্কবার্তা ছিল, কোনো ধর্মীয় পদ্ধতিই ঈশ্বরের রহস্যকে ধরতে বা ধারণ করতে পারেনি। কিন্তু তারপরও আমরা ইতিহাসে, যেমন আমরা দেখব এই বইয়ে, ঠিক সেটাই অধিকাংশ ধর্মগুলো দাবি করা অব্যাহত রেখেছে। দ্বিতীয় নির্দেশটি ছিল একটি আদি সতর্কবাণী, যে সংগঠনগুলো দাবি করে, তারা ঈশ্বরের পক্ষে কথা বলছে, তারাই ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে, সব মূর্তিগুলোর মধ্যে যা সবচেয়ে বিপজ্জনক মূর্তি। কিন্তু এই বার্তাটি বুঝতে ইজরায়েলাইটদের বহুদিন সময় লেগেছিল।

সোনালি বাছুরের চারপাশে তাদের উন্মত্ত নৃত্যপর্বের পরে আবার পথ চলার সময় এসেছিল। কারণ তাদের প্রতিশ্রুত ভূমি জয় করতে হবে। মোজেস সেই দেশটিকে তাদের দৃষ্টিসীমানার মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন। ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর একটি পর্বতের উপর উঠে দূর থেকে সেই দেশটিকে দেখতে তাকে নির্দেশ দিয়েছিল। এখানেই মোজেস মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সুতরাং তার সেনাপতি জশুয়া তাদের প্রতিশ্রুত দেশটিতে আগ্রাসনের মূল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু এটি খুব সহজ বিজয় ছিল না। এমনকি সেই দেশে নিজেদের স্থাপিত করার পরও, সেই জায়গাটি ধরে রাখতে সারাক্ষণই তাদেরকে নিকটবর্তী গোত্রগুলোর সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে। সুতরাং ইজরায়েলাইটরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাদের একজন রাজা দরকার, যিনি এই নিরন্তর যুদ্ধগুলোয় তাদের নেতৃত্ব দেবেন। অন্য সব গোত্রেরই তো রাজা আছে, তাহলে তাদের রাজা কেন থাকবে না? তাদের প্রথম রাজা ছিলেন সল, কানানে ইজরায়েলের অবস্থানটি সুরক্ষিত করতে তিনি তার রাজত্বকালের প্রায় পুরোটা সময় কাটিয়েছিলেন।

যাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়তে হয়েছিল সেই গোত্রগুলির মধ্যে একটির নাম ছিল ফিলিস্টিন। এবং তাদের ভয়ংকর আর হিংস্র যোদ্ধাদের একজন ছিলেন একটি দানব, গলাইয়াথ। একদিন যখন যুদ্ধ শুরু করার আগে দুই সেনাবাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছিল। গলাইয়াথ সামনে এগিয়ে এসে সলের সেনাবাহিনী থেকে যে-কাউকে তার সাথে একক যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। ইজরায়েলের পক্ষ থেকে কারোরই সেই সাহস হয়নি যতক্ষণ-না সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন একজন বালক মেষপালক, যে সবার সামনে এসে গলাই সেই একক যুদ্ধের আহ্বানের চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সবাই তাকে দেখে ব্যঙ্গ করতে শুরু করেছিল। তারা জিজ্ঞাসা করেছিল, তার মতো একটি বালক কীভাবে প্রশিক্ষিত খুনি গলাইয়াথের সাথে লড়বে? ‘ঠিক যেভাবে নেকড়ের পাল থেকে আমি আমার বাবার মেষদের রক্ষা করে এসেছি’, উত্তর দিয়েছিল বালকটি, ‘গুলতি দিয়ে। সে সৈন্যদের সারি থেকে সামনে এগিয়ে এসে দানবটির সামনে দাঁড়ায়, যে তার দিকে তখন গর্জন করে তেড়ে এসেছিল। যখন গলাইয়াথ তার এক হাত পেছনের দিকে নিয়ে সেই বালকের উদ্দেশ্যে বর্শা ছুঁড়তে উদ্যত হয়েছিল, মেষপালক সেই বালকটি খুব শান্তভাবে, বিচলিত না হয়ে তার গুলতির মধ্যে একটি পাথর বেঁধে একবার মাথার উপর ঘুরিয়ে পাথরটি তার লক্ষ্যের দিকে ছুঁড়ে মেরেছিল। এটি ঠিক গলাইয়াথের কপালের মাঝখানে আঘাত করেছিল, এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ধরাশায়ী করেছিল। এরপর বালকটি গলাইয়াথের বিশাল তরবারি ব্যবহার করে তার শিরশ্চেদ করে। সেদিন সলের সেনারা যুদ্ধে জয় করেছিল এবং ইজরায়েলাইটরা একজন নতুন বীর পেয়েছিলেন। এই বালকটির নাম ছিল ডেভিড।

যখন সল যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন, ডেভিড তার জায়গায় ইজরায়েলের রাজা হয়েছিলেন। এমন একজন রাজা, ইজরায়েলাইটরা যাকে আর তার রাজত্বের সময়টিকে আদর্শ হিসাবে বিবেচনা করেন। তিনি ত্রিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন, যার অধিকাংশ সময়ই তাকে যুদ্ধে ব্যয় করতে হয়েছে। তার ছেলে সলোমনই ইসরায়েলের প্রথম টেম্পল বা মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে তারা ঈশ্বরের প্রতি তাদের সেরা পশু এবং শস্যক্ষেতের সবচেয়ে ভালো ফসলগুলো বিসর্জন দিতেন। এবং তারা ঈশ্বরকে তাদের প্রশস্তির ধূপের ধোয়ায় শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছিলেন। মিশরে তাদের দাসত্বের দিন থেকে তারা বহুদূর অগ্রসর হয়ে এসেছিলেন। ইজরায়েল আর যাযাবর কতগুলো ক্ষুদ্রগোত্রের শিথিল একটি জোট ছিল না, এটি সত্যিকারের একটি জাতি হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তাদের নিজস্ব একজন রাজা ছিল, আকর্ষণীয় একটি মন্দিরও ছিল। অবশেষে তারা সফল হতে পেরেছিলেন ঠিকই, তবে শুধুমাত্র তাদের ‘ঈশ্বর’ সেভাবে বিষয়টি ভাবেননি।

সুতরাং যে-কণ্ঠস্বর মোজেসের সাথে কথা বলেছিল, সেটি আবারো কথা বলতে শুরু করেছিল। বহু প্রজন্ম ধরেই এটি নীরব ছিল, কিন্তু এবার এটি বজ্রপাতের মতো নতুন প্রজন্মের নবীদের মনে আঘাত হেনেছিল। এই কণ্ঠস্বর তাদের বলেছিল, ইজরায়েলাইটরা যেভাবে তাকে রূপান্তরিত করেছে, সেটি তিনি কতটা ঘৃণা করেন। তাদের ত্রাণকর্তা লোভী মূর্তিগুলোর মতোই একটি মূর্তিতে পরিণত হয়েছিল, সেই মানুষগুলোর দেবতাদের মতো, যাদের তারা সেই দেশে প্রতিস্থাপিত করেছিল। কিন্তু এমন কিছু তিনি কামনা করেননি। তিনি অসহায়দের জন্যে ন্যায়বিচার চেয়েছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন বিধবা আর অনাথদের যেন দেখাশুনা করা হয়, সম্পত্তি থেকে যেন তাদের বঞ্চিত না করা হয়। সর্বোপরি তিনি চেয়েছিলেন, ইজরায়েলের সন্তানরা তাদের জীবনের সেই সরলতা যেন পুনরুদ্ধার করতে পারে, যে-সরলতা তাদের মধ্যে ছিল, যখন তারা মরুভূমিতে ছিলেন, যখন তারা পরস্পরের দেখাশুনা করতেন। কিন্তু আসলেই ঈশ্বর তাদের এতদিন ধরে কী বলে আসছেন, সেটি বুঝতে ভিনদেশে দাসত্বের আরো আরেকটি পর্ব তাদের পার করতে হয়েছিল।

একটি স্বাধীনরাজ্য হিসাবে ইজরায়েল কখনোই এমনিতেই বেশি সুরক্ষিত ছিলেন না। এমনকি স্থানীয় গোত্রদের সাথে যুদ্ধে জয়লাভ এবং কানানকে নিজেদের দেশ বানানোর পরেও তারা সারাক্ষণই বিপদের ঝুঁকিতে ছিলেন। তাদের প্রতিশ্রুত এই দেশটির অবস্থান ছিল উত্তর আর দক্ষিণে মহাপরাক্রমশালী দুটি রাজ্যের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ ভূখণ্ডে। দক্ষিণের মিশরের কথা তারা ইতিমধ্যেই জানতেন। তাদের নিজেদের ইতিহাসের একটি অংশ কেটেছে সেই দেশে। কিন্তু উত্তরের মেসোপটেমিয়ার আসিরিয়ান সাম্রাজ্যটি তাদের স্বাধীনতার ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাবটি ফেলেছিল। আসিরীয়রা তাদের রাজ্য আক্রমণ এবং তাদের পরাধীন একটি রাজ্যে পরিণত করেছিল। মিশর থেকে যে মহাঅভিপ্রয়াণ তাদের মুক্ত করেছিল, তার বহুশত বছর পরে ইজরায়েলাইটদের আবার দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি হতে হয়েছিল। দশ হাজারেরও বেশিসংখ্যক ইজরায়েলাইটকে ব্যাবিলনে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। কানানে তাদের জয়ের পর ঠিক যেভাবে তাদের ঈশ্বর ধারণাটি বদলে গিয়েছিল, সেভাবেই ব্যাবিলনে তাদের দুর্দশার অভিজ্ঞতাটি ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের ধারণাগুলো আবার বদলে দিয়েছিল।

প্রথমে তারা ভেবেছিলেন, ঈশ্বরকে তারা চিরকালের জন্যে হারিয়ে ফেলেছেন। জেরুজালেমে তার জন্যে সলোমনের বানানো সেই টেম্পলে তিনি আছেন। তারা ব্যাবিলনে নদীর তীরে বসে অশ্রুপাত করতেন, যখন সেই কথা তারা মনে করতেন। এই অদ্ভুত প্রবাসে কেমন করে তারা তাদের প্রভুর উদ্দেশ্যে গান গাইবেন? কিন্তু এই দুঃখ ঈশ্বর সম্বন্ধে তাদের নতুন একটি উপলব্ধি দিয়েছিল : ঈশ্বর মন্দিরের মধ্যে আটকে থাকা কোনো মূর্তি নয়। এমনকি কানানেও তিনি আটকে নেই। ঈশ্বর আছেন সর্বত্র। ঈশ্বর তাদের সাথে আছেন এই ব্যাবিলনেও, যেমন তিনি জেরুজালেমে তাদের সাথে ছিলেন, এবং মিশরেও। বাস্তবিকভাবেই ঈশ্বর সবসময় এবং সর্বত্রই তাদের সাথে ছিলেন। ঠিক যেভাবে তাদের নবীরা বলেছিলেন এর আগে। তারা পুরো বিষয়টি নতুনভাবে দেখতে সক্ষম হয়েছিলেন। শুধুমাত্র নবীরা তাদের আসলে কী বলতে চাইছেন তা যদি তারা আগেই বুঝতে পারতেন! কিন্তু তারা এখন এর প্রায়শ্চিত্ত করবেন।

তারা সেই গল্পগুলো সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে যে গল্পগুলো তাদের কাছে এসেছিল, তাদের জাতির অতীতে ঈশ্বরের সম্পাদিত নানা কর্মকাণ্ড। সেই কণ্ঠের গল্প, যা আব্রাহাম, আইজাক, ইয়াকব আর মোজেসের সাথে কথা বলেছিল। মিশর থেকে তাদের পালিয়ে আসা আর কানানে তাদের বসতিস্থাপনের গল্প; একজন সত্যিকারের ঈশ্বরের সাথে কীভাবে তারা অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছিলেন তার গল্প : স্বাধীনতায় কিংবা দাসত্বে, পরিচিত প্রিয় পাহাড় আর নদীসহ স্বদেশে অথবা নির্বাসনে, বিদেশে, যেখানে নদী আর ভাষা তাদের অপরিচিত, ঈশ্বর সবসময়ই তাদের সাথে থাকবেন। ব্যাবিলনে নির্বাসনে থাকার সময়ে এই ভাবনাগুলোই তাদের মনে এসেছিল, যখন তারা তাদের নিজেদের ইতিহাসের অর্থ বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। ঈশ্বর আবার তাদের সাথে কথা বলতে শুরু করেছিলেন তার প্রেরিত নবীদের মুখ দিয়ে। আর এবার তারা তাদের কথা শুনেছিলেন।

১০. নবীরা

নবীরা ভবিষ্যদ্বক্তা নন, তারা প্রকাশ বা প্রচার করেন। ঈশ্বরের কাছ থেকে তারা যা কিছু শোনেন সেটি যতটা তার প্রকাশ ও প্রচার করে থাকেন, সেভাবে তারা। ভবিষ্যতে কী হবে সেটি নিয়ে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করেন না। তারা এমন কিছু প্রচার করেন, যা শুধুমাত্র ঐশী প্রত্যাদেশের মাধ্যমে জানা সম্ভব। তারা ঈশ্বরের নির্দেশ ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন। তারা ঈশ্বরের সত্যকে এমনভাবে সবাইকে জানান যা মূলত শ্রোতাদের প্রভাবিত করার জন্যেই পূর্বপরিকল্পিত। ভবিষ্যৎ নিয়ে পূর্বধারণা তারা অবশ্য করতে পারেন, যদি সেভাবেই তারা সেটি ঈশ্বরের কাছ থেকে শোনেন। মেসোপটেমিয়ানদের মূর্তি দেবতাদের উপহাস করা ঈশ্বরের কণ্ঠ আব্রাহাম শুনেছিলেন। মোজেস শুনেছিলেন সেটি তাকে মিশরে ইজরায়েলাইটদের ত্রাণকর্তা হতে নির্দেশ দিচ্ছে, যেন তিনি পথ দেখিয়ে তাদের ঈশ্বর-প্রতিশ্রুত দেশে নিয়ে যেতে পারেন। যখন ইজরায়েলের সন্তানরা আবার কানানে তাদের বসতি গড়েছিলেন এবং রাজারা তাদের শাসন করেছিলেন, তখনো ঈশ্বরের কণ্ঠ নীরব হয়ে যায়নি। আর এটি শুনেছিলেন খুব সাধারণ কিছু মানুষ, যারা তাদের সাধারণ জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে, পবিত্র পর্বতে মোজেসকে দেওয়া ঈশ্বরের আইনগুলো রক্ষা করতে শক্তিশালীদের ব্যর্থতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। নবীরা ছিলেন প্ররোচিত করার মতো বক্তা, সাধারণ মানুষকে তাদের বার্তাগুলো বোঝাতে যারা গল্প ব্যবহার করতেন। এবং এমনকি রাজারাও তাদের নজরের বাইরে থাকতেন না। যেমন, একটি গল্পে আমরা দেখি, কীভাবে একজন নবী ইজরায়েলের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা ডেভিডকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। যার সাথে আমরা এর আগে পরিচিত হয়েছিলাম, গুলতি ব্যবহার করে, পাথর ছুঁড়ে যিনি দানব গলাইয়াথকে হত্যা করেছিলেন।

ডেভিড ইজরায়েলের সিংহাসনে বসেছিলেন কমন এরা শুরু হবার ১০০০ বছর আগে। তার রাজধানী জেরুজালেম (শান্তির নগরী) প্রতিষ্ঠা করার জন্যে তিনি একটি দুর্গসংরক্ষিত পাহাড়, মাউন্ট জাইওনকে নির্বাচন করেছিলেন। সুন্দর, যে-শহরটি বহু মিলিয়ন মানুষের কাছে এখনো পবিত্র একটি শহর। যদিও ডেভিড সাহসী যোদ্ধা আর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের একজন নেতা ছিলেন, কিন্তু তিনি কোনোভাবেই ক্রটিমুক্ত একজন মানুষ ছিলেন না। একদিন নাথান নামের একজন নবী এসে তাকে সাম্প্রতিক একটি ঘৃণ্য ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন : গ্রামের একজন ধনী ব্যক্তি, যার বহু হাজার মেষ ও গবাদি পশু ছিল এবং কোনোকিছুরই অভাব ছিল না। তার একজন ভাড়াটে ছিল, যে খুবই দরিদ্র একজন ব্যক্তি, তার একটি ভেড়া ছাড়া আর কিছুই ছিল না, যাকে তিনি তার নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসতেন। একবার যখন অপ্রত্যাশিতভাবে একজন অতিথি সেই ধনী ব্যক্তির বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন, তিনি তার নিজের হাজার ভেড়া বাদ দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করতে সেই গরিবের ভেড়াটিকেই বেছে নিয়েছিলেন।

যখন রাজা ডেভিড এই গল্পটি শুনেছিলেন, তিনি দ্রুত দাঁড়িয়ে উঠে দাবি করেছিলেন, এই অশুভ দানবটা কে? নাথান উত্তর দিয়েছিল, আপনিই হচ্ছেন সেই ব্যক্তি’। নাথান জানতেন, ডেভিড ইউরাইয়া’র স্ত্রী বাথশেবার সাথে রাত কাটিয়েছেন, যিনি ছিলেন তার সেনাবাহিনীর একজন অনুগত সৈন্য, এবং একটি সেনা-অভিযানে তখন তিনি ঘরের বাইরে ছিলেন। তার এই অপরাধ গোপন রাখতে তিনি ইউরাইয়াকে যুদ্ধক্ষেত্রেই হত্যা করার ব্যবস্থা করেন। তারপর তিনি বাথসেবাকে বিয়ে করেছিলেন গোপনে। নাথানের চ্যালেঞ্জের কারণে ডেভিড তার অপরাধ স্বীকার করেন এবং প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। নবীরা জানতেন, গল্পের শক্তি কারো জীবনে মোড়পরিবর্তন করানোর ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সব গল্পই তাদেরকে ঈশ্বরের অসন্তুষ্টির মুখোমুখি করার জন্যে পরিকল্পিত নয়। কখনো তিরস্কার বা সমালোচনা ছাড়াও, এগুলো সান্ত্বনা আর ভবিষ্যতের জন্যে আশার জোগান দেয়। যেমন আরেকটি গল্প –

ডেভিডের মৃত্যুর প্রায় চারশো বছর পরে, যখন ইজরায়েলাইটরা ব্যাবিলনে নির্বাসিত এবং হতাশা নিয়ে তারা তাদের প্রিয় জেরুসালেমকে স্মরণ করেছিলেন, তখন নির্বাসিতদের একজন তাদের জন্যে একটি বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। বার্তাটি তিনি তাদের ঈশ্বরের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। তার নাম ছিল ইজেকিয়েল। প্রথমে তিনি তাদের অতীতের জন্য গালমন্দ করেছিলেন। ঈশ্বর তাদের একদিন মিশরের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে প্রতিশ্রুত-দেশে এই কারণে নিয়ে আসেননি যে, তারা অন্যসব জাতির মতো একটি জাতিতে পরিণত হবে। অন্য জাতিগুলো বৈষয়িকভাবে সফল আর ধনী হতে চেয়েছিল এবং বিশ্বমঞ্চে দম্ভের সাথে তারা তাদের বিত্ত প্রদর্শন করতে চেয়েছিল। আর সেই অবস্থানে পৌঁছাতে তাদের সাহায্য করার জন্যে তারা দেবতাদের ব্যবহার করেছিল। ধর্ম তাদের জন্যে রাজনীতিরই একটি শাখা ছিল।

বেশ, ইসরায়েলের ঈশ্বর কোনো মূর্তি ছিলেন না, যা-কিনা রাজনীতিবিদরা ক্ষমতার খেলায় নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারতেন। একইভাবে অন্য কোনো জাতির মতো জাতি হবার কথাও ছিল না তাদের। কথা ছিল তাদের একটি পবিত্র জাতি হতে হবে, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে এই পৃথিবীতে তাদের ঈশ্বরের সেবা করা। কিন্তু স্থানীয় রাজনীতির ক্ষমতা দখলের খেলায় তারা নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছিলেন। সুতরাং ব্যাবিলনে তাদের নির্বাসন দেবার মাধ্যমে ঈশ্বর তাদের শাস্তি দিয়েছিলেন।

ইজরায়েলাইটদের এই নির্বাসনের কারণ হিসাবে ইজরায়েলের ‘পাপ’ দায়ী, ইজেকিয়েলের এই ব্যাখ্যাটি ধর্মের ইতিহাসের আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক ধারণা যুক্ত করেছিল। যখনই ইজরায়েলের জনগণ এলাকার ক্ষমতার সংগ্রামের কারণে দুর্দশায় পতিত হয়েছে, নবীরা তাদের সেই দুঃখের জন্যে তাদের উপর নির্যাতন করা শক্ৰ-সেনাদের দায়ী করেননি বরং ঈশ্বরের প্রতি তাদের বিশ্বাসের দুর্বলতা অথবা বিশ্বাসহীনতাকে দায়ী করেছিলেন। সেই ধারণাটির জন্ম হয়েছিল, যদি আপনার সাথে খারাপ কিছু ঘটে, সেটি ভাগ্যের খেলা নয়, এটি আপনার পাপের শাস্তি। আর যেহেতু ইজরায়েলের সাথে ক্রমাগতভাবেই খারাপ কিছু ঘটা অব্যাহত ছিল, সারাক্ষণই তারা তাদের পাপাচারের জন্যে নবীদের তিরস্কারও শুনেছিলেন। কিন্তু এমন সময়ও ছিল যখন ঈশ্বর এই তিরস্কার করা বন্ধ করে ইজরায়েলবাসীকে আশ্বস্ত করেছিলেন। এবং সান্ত্বনার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বার্তাগুলোর একটি তাদের কাছে এসেছিল ইজেকিয়েলের মাধ্যমে।

ইজেকিয়েল শুধুমাত্র কণ্ঠস্বরই শোনেননি, তিনি তার মনশ্চক্ষে নানা দৃশ্যও দেখেছিলেন। এবং এভাবে দেখা তার দৃশ্যগুলোর একটি বন্দি ইজরায়েলের জন্য একটি আশার বার্তা বহন করে এনেছিল। তার দেখা সেই দৃশ্যে তিনি একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে প্রশস্ত একটি উপত্যকার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, যে উপত্যকাটি শুষ্ক হাড় দিয়ে পূর্ণ ছিল। সেই কণ্ঠস্বরটি অস্থিগুলোকে উদ্দেশ্য করে একটি ভবিষ্যদ্বাণী করতে বলেছিল, যেন তিনি তাদের বলেন, তাদের মধ্যে নিশ্বাস প্রবেশ করবে, মাংশপেশি আবার তাদের আচ্ছাদিত করবে এবং তারা আবার একটি জীবন পাবেন। নির্দেশমতোই তিনি সেটি করেছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবেই সব অস্থিগুলো পরস্পরের সাথে যুক্ত হবার শব্দ শুনতে পেলেন তিনি এবং মানুষের কঙ্কালে পূর্ণ হয়ে উঠেছিল উপত্যকাটি। এরপর সন্ধি, মাংসপেশি আর চামড়া সেই কঙ্কালগুলো আচ্ছাদিত করতে শুরু করেছিল, আর মৃত শরীরগুলো পূর্ণ করেছিল সেই উপত্যকা। একেবারে শেষে নিশ্বাস শরীরগুলোর মধ্যে প্রবেশ করেছিল আর তারা উঠে দাঁড়িয়েছিল। যেন প্রাণবন্ত সেনাদের একটি বিশাল দল পুরো উপত্যকাটিকে পূর্ণ করে রেখেছে। সেই কণ্ঠস্বরটি ইজেকিয়েলকে বলেছিল, এই অস্থিগুলো ইজরায়েলের সন্তানদের, যারা ভেবেছিল তাদের জীবন শেষ হয়ে গেছে। এবং তারা মৃত এবং ব্যাবিলনে তাদের সমাহিত করা হয়েছে। কিন্তু ঈশ্বর খুব শীঘ্রই তাদের নিজেদের প্রিয় জীবনে পুনরায় স্থাপন করবেন এবং তাদের প্রিয় ইজরায়েলে তিনি তাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন।

আর ঠিক সেটাই ঘটেছিল, কমন এরা শুরু হবার ৫৩৯ বছর আগে (খ্রিস্টপূর্বাব্দে)। পারস্যবাসীরা আসিরীয়দের পরাজিত করেছিল এবং পারস্যবাসীদের রাজা সাইরাস নির্বাসিতদের ইজরায়েলে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং আসিরীয় বাহিনীদের ধ্বংস করা মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ এবং তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে বলেছিলেন। এরপর দুইশো বছর ইজরায়েলাইটরা তাদের নিজেদের ধর্মীয় প্রথা কোনো বাধা ছাড়াই পালন করতে পেরেছিলেন। অবশেষে, তারা তাদের দেশের সেই নামকরণের মর্যাদা রাখতে পেরেছিলেন, যেখানে শুধুমাত্র ঈশ্বরই রাজত্ব করেন। অন্য কোনো জাতির মতো তারা নিজেদেরকে শুধুমাত্র মানব কোনো নেতার নেতৃত্ব দেওয়া একটি জাতি হিসাবে ভাবেননি বরং তারা তাদের দেশটি শাসন করেছিলেন একটি ধর্মীয় সমাজ হিসাবে, যেখানে ঈশ্বরই রাজা, একটি ধর্মতন্ত্র বা থিওক্রেসি। এবং তারা তাদের সেই মন্দিরটি পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন, যে-মন্দিরটি ছিল তাদের মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতির একটি প্রতীক। তাদের অস্তিত্বের প্রাণকেন্দ্র। মন্দিরটির নির্মাণশেষে তারা সেটি ৫১৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছিলেন।

ইজরায়েলের আর কোনো রাজা ছিল না, সুতরাং মন্দিরের প্রধান পুরোহিতই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসাবেই তাকে বিবেচনা করা হয়েছে। আর দেশটির নিজেকে সুসংহত করার এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় কিছু জিনিস হারিয়েও গিয়েছিল, আব্রাহামের সময় থেকেই, যা তাদের। ইতিহাসেরই অংশ ছিল। সবধরনের ভবিষ্যদ্বাণীর সমাপ্তি ঘটেছিল, নবীদের সেই কণ্ঠ শোনাও শেষ হয়েছিল। এখন জীবন্ত নবীরা, যারা ইজরায়েলাইটদের কাছে নিরন্তর ঈশ্বরের নতুন বার্তার বিস্ময় বহন করে আনতেন, তাদের প্রতিস্থাপিত করতে ধর্মীয় বইগুলোর সংকলন করা হয়েছিল, যে-বইগুলো তাদের ঈশ্বর নির্দেশিত ইতিহাসের সব কাহিনি এবং তাদের জীবন-পরিচালনাকারী আইনগুলোকে একত্র করেছিল।

এই বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি ছিল বাইবেলের প্রথম পাঁচটি বই, যাদের বলা হয়, ‘পেন্টাটিউখ’ বা ‘ফাইভ স্ক্রলস’। প্যাপিরাসের স্ক্রল বা গোল করে প্যাচানো শুকনো প্যাপিরাসের পাতার উপর কালি দিয়ে প্রাচীন লিপিকারকরা লিখতেন। আর নির্বাসন থেকে ফিরে আসার পর, এই শান্তিপূর্ণ পর্বটিতে ঈশ্বরের সাথে ইজরায়েলের দীর্ঘ সম্পর্কটির কথা অবশেষে কাগজে-কলমে লিপিবদ্ধ করা শেষ হয়েছিল। এবং ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর শোনা জাতি থেকে তারা একটি পবিত্র গ্রন্থের জাতিতে পরিণত হয়েছিলেন।

শুরুর দিকে ইজরায়েলবাসীদের এই ধর্মটিকে নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করার প্রবণতা ছিল। আমরা এমনকি এটিকে একটি ফ্রিল্যান্স বা স্বাধীনভাবে পালিতধর্ম হিসাবেও বর্ণনা করতে পারি। তখনো এটি পেশাজীবী ধর্মযাজকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত হয়নি, বরং সেই কাজটি করেছিলেন প্রতিভাবান অপেশাজীবীরা, যারা সরাসরি তাদের মাধ্যমে ঈশ্বরকে কথা বলতে শুনেছিলেন। আর এভাবেই সব ধর্মের সূচনা হয়ে থাকে। এগুলো শুরু হয় বিশেষ গুণাবলির কিছু মানুষদের মাধ্যমে, যাদের আমরা নবী বা সাধু বলি, তারা ঈশ্বরের কণ্ঠ শোনেন বা কোনো স্বর্গীয় দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। আর তারা কী দেখেছেন বা কী শুনেছেন সেটি তারা অন্যদের বলেন। যারা এধরনের কোনো দৃশ্য দেখেননি বা কোনো কণ্ঠ শোনেননি, বিশ্বাসের মাধ্যমে তারা সেই। ধারণাগুলোকে তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেন, অর্থাৎ তাদের যা কিছু বলা হয়েছে সেগুলো তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। এবং এভাবে ধর্মীয় কাঠামো গড়ে ওঠে।

এইসব কাঠামো যখন আরো বিস্তারিত হয়, নতুন একধরনের নেতার তখন প্রয়োজন হয়। আর এটি সৌখিন অপেশাদারিত্ব থেকে বিস্তারিত জটিল পেশাদারিত্বের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। একত্রে সংকলিত করা গল্পগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্যে শিক্ষকের দরকার হয়। পুরোহিত আর যাজকদের দরকার পড়ে পবিত্র বইতে লিপিবদ্ধ নানা উৎসব পরিচালনা আর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো উদযাপন করতে। মন্দিরের দরকার হয়, যেখানে এই কর্মকাণ্ডগুলোর সিংহভাগই সংঘটিত হয়। এবং যখন এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয়, পৃথিবী এর ধর্মের ভাণ্ডারে পূর্ণমাত্রার একটি ধর্ম পায়।

এই প্রক্রিয়ায় চিরতরে কিছু উপাদান হারিয়ে গেছে এমন একটি অনুভূতি অবশিষ্ট থেকে যায়। আর সে-কারণে ধর্ম সবসময়ই অতীতে তাদের শুরুর দিনগুলোর দিকে অনুশোচনা-মিশ্রিত একটি কামনা নিয়ে ফিরে তাকায়। সেই দম্পত্তির মতো, যারা পরস্পরের সাথে দীর্ঘদিন থাকার কারণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, যখন তাদের ভালোবাসা জীবনের সেই শুরুর দিনগুলোর আবেগ হারিয়ে যায়। তারা অতীতের দিকে সেই কামনাসহ ফিরে তাকান, যখন তাদের সম্পর্কে সেই আবেগের সহজ প্রবাহ ছিল। আর সে-কারণে ধর্ম এই আদি মূল তীব্র ভালোবাসাটিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টায় প্রচুর সময় ব্যয় করে। কিন্তু বিষয়টি সহজ হয় না, কারণ স্বর্গীয় সেই প্রেমিকের কণ্ঠস্বর নীরব হয়ে গেছে, যা বাকি থাকে সেগুলো তার শব্দমালা।

অথবা, এমন কি হতে পারে, যারা ধর্মের ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন, ঈশ্বর যখন তাদের ফোন করেন, তারা আর ফোন ধরেন না, কারণ তাদের নিয়ন্ত্রিত এই প্রতিষ্ঠিত কাঠামো আর পদ্ধতির ভারসাম্য ঈশ্বর যেন নষ্ট না করতে পারেন, এটাই তাদের একান্ত কাম্য হয়ে ওঠে? সংঘটিত ধর্ম থেকে এই টানাপড়েনটি কখনোই দূরে ছিল না, যেমন, ইতিহাস আপনাদের সেটি দেখাবে। ব্যাবিলেনের নির্বাসন থেকে ফেরার পরপরই ইজরায়েল এর অবস্থান ক্রমশ আরো দৃঢ়তর করতে শুরু করেছিল ঠিক এভাবে। সেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এর অস্থিগুলো বাড়ি ফিরেছিল আবার একত্রে যুক্ত হয়ে। এর পরের দুই শতাব্দীর সেই মধ্যবর্তী বিরতির পর্বটি এসেছিল, যখন এটি শান্তি খুঁজে পেয়েছিল, যা এটি হাজার বছর ধরে খুঁজেছিল। এই সময়ে ইজরায়েল শাসন করেছিল সেই সাম্রাজ্যগুলো, যার নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তারা তাদের প্রজাদের ধর্মীয় আচারে কোনো হস্তক্ষেপ করবেন না। কিন্তু এটি বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি।

কমন এরা শুরু হবার ৩৩৩ বছর আগে গ্রিক সম্রাট আলেক্সান্ডার যখন মানুষের জানা পৃথিবীর অধিকাংশ এলাকাটি শাসন করতেন, তখন পরিবর্তনের আরেকটি চক্র শুরু হয়েছিল ইজরায়েলে। আলেক্সান্ডার ইজরায়েলাইটদের তাদের নিজেদের ধর্ম পালন করতে অনুমতি দিয়েছিলেন এবং এই বিষয়ে তিনি হস্তক্ষেপ করেননি। যখন তিনি মারা যান, তার রাজ্যের অংশগুলো, যা আমরা আজ চিনি আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন আর প্যালেস্টাইন নামে, সেগুলোর ক্ষমতা নিয়েছিলেন অন্য নেতারা, আর তাদের শাসনপদ্ধতিও ছিল ভিন্ন। তারা তাদের নিজস্ব সংস্করণের ধর্ম তাদের প্রজাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সুতরাং ইসরায়েলের হিংস্র হিংসুটে ঈশ্বরের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার ছিল। যে রাজা এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন তিনি ছিলেন চতুর্থ অ্যান্টাইওকাস। বংশানুক্রমে একজন গ্রিক, এলাকার সাম্রাজ্যের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরো বৃদ্ধি করার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় হতাশ হয়ে তিনি তার ইহুদি প্রজাদের তাদের আধিপত্যপ্রবণ ঈশ্বরের কাছ থেকে টেনে বের করে আনার চেষ্টা করেছিলেন, এবং তিনি তাদের ওপর গ্রিকধর্ম আর সংস্কৃতির অভিজাত আর সূক্ষ্ম আচারগুলো চাপিয়ে দিয়েছিলেন।

কমন এরা শুরু হবার ১৬৭ বছর (খ্রিস্টপূর্বাব্দ) আগে তিনি জেরুজালেমের মন্দিরটিকে গ্রিকদেবতা জিউসের একটি মন্দিরে রূপান্তরিত করেছিলেন, এবং সারা ইসরায়েল জুড়ে তিনি তার পেটোয়াবাহিনী পাঠিয়েছিলেন নিশ্চিত করতে, ইহুদিরা যেন অবশ্যই দেবতা জিউসের উপাসনা করেন। যখন তাদের একজন জেরুজালেমের কাছে একটি গ্রাম মডিনে এসে পৌঁছিলেন, তিনি গ্রামের যাজক, বৃদ্ধ মাত্তাথিয়াসকে রাজার নির্দেশ মান্য করে বিসর্জন দিতে অথবা মৃত্যুকে বরণ করতে বলেছিলেন। মাত্তাথিয়াস এর উত্তরে বিসর্জনের জন্য প্রস্তুত মেষের শরীরে ছুরি না ঢুকিয়ে, রাজার নির্দেশ নিয়ে আসা প্রহরীর শরীরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, তাকে বিসর্জনে পরিণত করেছিলেন। তিনি ও তার ছেলেরা তাদের নিষ্ঠুর রাজার বিরুদ্ধে তিন বছরব্যাপী যুদ্ধ করেছিলেন। রাজার বিরুদ্ধে তিনটি যুদ্ধে তারা জয়লাভ করেছিলেন এবং তাদের কলুষিত করা মন্দিরও তারা আবার দখল করতে পেরেছিল। ১৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ১৪ ডিসেম্বর, তারা আবার সেটি পবিত্রকরণ, সংস্কার আর পুনরায় ঈশ্বরকে নিবেদন করা শুরু করেছিলেন। এটি করতে তাদের আটদিন সময় লেগেছিল। এই পর্বটি ‘ফেস্টিভাল অব লাইটস’ বা হানুকা নামে ইহুদিরা উদ্যাপন করেন। হানুকার সময় প্রতিটি দিন তাদের আটটি বাহুর মোমদানি বা মেনোরায় একটি করে মোমবাতি জ্বালান, রাজা অ্যান্টিওকাসের দ্বারা কলুষিত জেরুজালেমের মন্দিরটি সংস্কারে পুনর্নির্মাণের কথা স্মরণ করতে।

অ্যান্টিওকাস ১৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মারা যান এবং ইসরায়েলের জন্যে জীবন আবার অপেক্ষাকৃত সহজতর হয়ে উঠেছিল। আশঙ্কাজনক একটি স্বাধীনতার পরিস্থিতিতে এটি নিজেকে টিকিয়ে রেখেছিল আরো এক শতাব্দী, এরপর ৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোম এটির দখল নিয়েছিল। এবং খেলার চূড়ান্তপর্বটি শুরু হয়েছিল।

১১. সমাপ্তি

খারাপ জিনিস ভালো মানুষদের সাথেও ঘটতে পারে। খ্রিস্টীয় বাইবেলের শেষ বইটি সেই খারাপ জিনিসগুলোকে শ্রেণিবিন্যস্ত করেছিল, যার নাম দিয়েছিল ‘ফোর হর্সম্যান অব অ্যাপোকালিপস’ বা মহাপ্রলয়ের চার ঘোড়সওয়ার : যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অসুখ আর মৃত্যু। সেই শুরুর সময় থেকে ঐ চার ঘোড়সওয়ার ইতিহাসের মধ্যদিয়ে তাদের ঘোড়া ছুটিয়ে চলছেন, আর থামার কোনো চিহ্নই তারা দেখাচ্ছেন না। যে-কারো পক্ষেই এসব ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন, কিন্তু ধর্মবিশ্বাসী মানুষগুলোর জন্যে তারা সুনির্দিষ্ট একটি সমস্যা সৃষ্টি করে। যদি আপনি কোনো ঈশ্বর বিশ্বাস না করেন, যদি আপনি আমাদের এই অস্তিত্বের চূড়ান্ত একটি অর্থ আছে এমন কিছু বিশ্বাস না করেন, তাহলে দুঃখ হচ্ছে অপ্রীতিকর একটি বাস্তবতা, বেঁচে থাকতে হলে যার মোকাবেলা আপনাকে করতেই হবে। কিন্তু যদি আপনি ঈশ্বর বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনাকে একটি কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। পৃথিবীতে এত বেশি দুঃখের উপস্থিতি কেন, কেনই বা ঈশ্বর এসব ঘটবার অনুমতি দিচ্ছেন? আর কেন প্রায়শই ভালো মানুষরাই মূলত সেই যন্ত্রণাভোগ করে, আর খারাপ সেই যন্ত্রণার শাস্তি না-পেয়েই পার পেয়ে যায়? এইসব প্রশ্নের উত্তর সব ধর্মেই আছে। জুডাইজম বা ইহুদি ধর্মে এই প্রশ্নটির একটি আদি উত্তর হচ্ছে, যদি ইজরায়েলকে কোনো দুঃখ আর দুর্দশা ভোগ করতে হয়, তবে এর কারণ এটি এর পাপের শাস্তি পাচ্ছে। এই অধ্যায়ে আমরা ইজরায়েলের দুর্দশা নিয়ে যখন ভাবব, সেটি একটি জনগোষ্ঠী কিংবা জাতি হিসাবে ভাবব, বিশেষ করে কোনো ‘একক ব্যক্তির দুর্দশা হিসাবে নয়; এবং খুব সুস্পষ্ট একটি কারণে। একমাত্র সত্য ঈশ্বর ইজরায়েলকে তার নির্বাচিত জাতি হিসাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন, যে তার কনে এবং প্রেয়সী। বেশ, তাহলে ঈশ্বরের সাথে ইজরায়েলের সম্পর্কটি কেন এমন ঝামেলাপূর্ণ, কষ্টসাধ্য একটি সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল? কেন এই বিশেষ সম্পর্কটি তাদের এত দুঃখের কারণ হয়েছিল? নবী ইজেকিয়েল তাদের বলেছিলেন : এর কারণ হচ্ছে, তারা আসলে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন, ঈশ্বরের বিশেষভাবে নির্বাচিত জাতি মানে হচ্ছে অন্যসব জাতি ও তাদের দেবতাদের থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ পৃথক করে রাখা। কিন্তু তার পরিবর্তে, ইহুদিরা অন্যদের অনুকরণ করেছেন। তাদের রাজনীতিতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছেন। সেই একমাত্র ঈশ্বরকে তারা এমনভাবে উপাসনা করেছেন, যেন তিনি কোনো মূর্তি, যিনি ন্যায়বিচার আর পবিত্রতার বদলে চাটুকারিতা আর পূজার বিসর্জন চাইছেন। আর সে-কারণেই। ব্যাবিলনে দাস হিসাবে বন্দিজীবন এখন তাদের নিয়তি। কিন্তু সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে জেরুজালেমে ফিরে আসার পর তারা তাদের শিক্ষা পেয়েছিলেন।

তাদের স্বদেশ, ইজরায়েলে ফেরার পর এমন একটি জাতি হিসাবে তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যাদের জন্যে ধর্মীয় শুদ্ধতাকে জীবনের উদ্দেশ্য আর অর্থ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পেন্টাটিউখে পাওয়া নির্দেশাবলি সতর্ক মনোযোগর সাথে তারা অনুসরণ করেছিলেন। প্রতিটি দিনই পূর্ণ ছিল নানা আচারে, যা তাদের সচেতনতায় একেবারে সম্মুখে ঈশ্বরকে স্থাপন করেছিল। ঈশ্বরের সেবায় নিবেদন করতে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল : তারা কী খেতে পারবেন থেকে শুরু করে তারা কী স্পর্শ করতে পারবেন, এমনকি কোন্ মানুষদের সাথে তারা সম্পর্ক করতে পারবেন। ইজরায়েল একটি ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল, একটি ধর্মতন্ত্র, একটি ঈশ্বররাষ্ট্র, যেখানে ধর্ম এর সামগ্রিক অস্তিত্বের একমাত্র উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছিল।

এই শান্তিতে ব্যাঘাত ঘটিয়েছিলেন রাজা অ্যান্টিওকাস এবং তাদের দুর্দশা আবার নতুন করে শুরু হয়েছিল। কিন্তু এবার একটু পার্থক্য ছিল। এখন তাদের ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস বা তাদের ধর্মবিশ্বাসই তাদের দুর্দশার কারণ হয়েছিল। সুতরাং তাদের দুর্দশা মানে ঈশ্বর তাদের শাস্তি দিচ্ছেন, এমন ব্যাখ্যা আর তাদের যুক্তিসংগত মনে হয়নি। একটি নতুন ব্যাখ্যা তাই খুঁজে বের করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। অ্যান্টিওকাসের নির্যাতনের সময় আরেকটি কাহিনির আবির্ভাব হয়েছিল। এবং এটি ইহুদি ধর্মে একটি নতুন উপাদান যুক্ত করেছিল, আর এটি শুধুমাত্র তাদের নিজেদের ইতিহাসের ওপর প্রভাব ফেলেনি, পরবর্তীতে আসা খ্রিস্টধর্ম আর ইসলামের ওপরেও এটি প্রভাব ফেলেছিল।

আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি, নবীরা, যারা ইজরায়েলের ইতিহাসে মূলচরিত্র ছিলেন তারা কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করে যাননি, তারা শুধু ইসরায়েলের ‘অতীত নিয়ে ঈশ্বরের ক্রোধের কথা বলেছিলেন। রাজা অ্যান্টিওকাসের সাথে তাদের সংগ্রামের সময় একটি নতুন চরিত্রের আবির্ভাব হয়েছিল, যিনি দাবি করেছিলেন যে, মৃত্যুর পরে কী ঘটে তিনি সেটি দেখতে পারেন, এমনকি ইতিহাসের পরেও, ভবিষ্যতে অনুগত দুর্দশাগ্রস্ত বিশ্বাসীদের জন্য ঈশ্বর কী নিয়তি নির্ধারণ করে রেখেছেন। পুরনো নবীদের ব্যতিক্রম, ঈশ্বরের সেই কণ্ঠটি তাকে যা বলেছিল সেটি প্রচার করতে তিনি একেবারে কেন্দ্রীয় মঞ্চ দখল করেননি। তিনি গুপ্তচরের মতোই সবার অগোচরে থেকেছিলেন, এবং তিনি যা শুনতেন তা কাগজে লিখে রাখতেন। এবং একজন গুপ্তচরের মতোই শক্রশিবির থেকে তার বার্তা পাঠাতেন। তিনি তার বার্তাগুলো সাংকেতিকভাবে লিখতেন, যেন শুধুমাত্র তার স্বপক্ষের কেউ সেটি পড়তে পারেন। এভাবে ঈশ্বরের কাছ থেকে গোপন তথ্য পাচার করার প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় অ্যাপোক্যালিপটিক’, বেশ ভীতিকর এই গ্রিকশব্দটির খুব সরল একটি অর্থ আছে। এর মানে, যা গোপন সেটি উন্মোচন করা, ঠিক যেভাবে কোনো থিয়েটারে পর্দা সরিয়ে ফেলা হয় মঞ্চে কী ঘটছে সেটি উন্মোচন করতে। এই অ্যাপোক্যালিপটিক লেখকদের কথা ভাবার সেরা উপায় হচ্ছে, তাদেরকে গুপ্তচর হিসাবে ভাবা, যারা শত্রুর বিরুদ্ধে ঈশ্বরের চূড়ান্ত যুদ্ধের পরিকল্পনা সম্বন্ধে জানেন। এবং সেই আগ্রাসনের জন্যে তার অনুগত বিশ্বাসীদের প্রস্তুত করতে তাদের প্রেরণ করা হয়েছে।

প্রথম ‘অ্যাপোক্যালিপটিক এজেন্ট নিজেকে ডানিয়েল নামে ডাকতেন। তিনি তার বার্তাগুলো সংক্ষিপ্ত একটি বইয়ে এমনভাবে লিখে গিয়েছিলেন, যা শুধুমাত্র তার ইহুদি-পাঠকদের কাছে বোধগম্য ছিল। তিনি এই কাহিনির প্রেক্ষাপট হিসাবে ব্যাবিলনের নির্বাসন-পর্বটিকে নির্বাচন করেছিলেন, শতবছর আগে যা ঘটেছিল। এটি আসলেই ছিল রাজা অ্যান্টিওকাসের নির্যাতনের সাংকেতিক বিবরণ, যা ঘটছিল, যখন এই বইটি লেখা হয়েছিল। এই বইটিতে মোট ছয়টি গল্প আর কিছু স্বপ্নের বিবরণ ছিল। সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি ডানিয়েলকে নিয়েই ছিল এবং এর উদ্দেশ্য ছিল ইহুদিদের বোঝানো যে, নির্যাতনকারীর অত্যাচার সহ্য করেও তারা বাঁচতে থাকবেন।

ব্যাবিলনের নির্বাসিত ইহুদিদের একজন, ডানিয়েলের কাহিনিটিতে, তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের একজন রাজকর্মকর্তা হয়েছিলেন। সাইরাসের পুত্র রাজা দারিউসের প্রিয়পাত্রও ছিলেন। সাইরাসই ইহুদিদের আবার তাদের স্বদেশ জুডেইয়াতে ফিরে যাবার অনুমতি দিয়েছিলেন। শুধুমাত্র ঈশ্বরের প্রতি তার বিশ্বাসের দৃঢ়তার কারণে নয় বরং প্রশাসক হিসাবে তার দক্ষতার কারণে ডানিয়েল রাজকর্মকর্তা হিসাবে রাজার সুনজরে আসতে পেরেছিলেন। কিন্তু ডানিয়েলের এই বিশেষ মর্যাদা অন্য কর্মকর্তাদের মনে ঈর্ষার বীজ বপন করেছিল। এবং তাকে ধ্বংস করতে পরিকল্পিতভাবে একটি ফাঁদ পাতা হয়েছিল। রাজা দারিউসকে তোষামোদ করে তারা প্রস্তাব করেছিলেন, তার একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, সারা সাম্রাজ্যজুড়ে দারিউস ছাড়া রাজ্যে আর কেউই অন্য কোনো দেবতার উপাসনা করতে পারবেন না। আর যে এই আইন ভঙ্গ করবে তাকে সিংহের গুহায় নিক্ষেপ করা হবে। দারিউস সেই আইনটি অনুমোদন করেছিলেন এবং ষড়যন্ত্রকারীরা দারুণ উল্লসিত হয়েছিলেন। তারা জানতেন যে, যাই ঘটুক না কেন, ডানিয়েল কখনোই ইসরায়েলের ঈশ্বরকে উপাসনা করা থামাবেন না।

তারা তার বাড়ির কাছেই ওঁত পেতে অপেক্ষা করছিল, এবং তাকে ঈশ্বরের উপাসনায় আবিষ্কার করেই রাজাকে জানিয়েছিলেন যে, ডানিয়েল তার আইন অমান্য করেছেন। রাজা খুবই বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন, যখন তিনি অবশেষে বুঝতে পেরেছিলেন তিনি আসলে তাদের ফাঁদে পা দিয়েছেন, কিন্তু আইন পাস করার কারণে তার এই উভয়সংকট থেকে বেরিয়ে আসার আর কোনো উপায় ছিল না। ভগ্নহৃদয় নিয়ে তিনি শাস্তি হিসাবে ডানিয়েলকে সিংহের খাঁচায় নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু পরের দিন দেখা যায়, ডানিয়েল সেই খাঁচা থেকে অক্ষত অবস্থায় বের হয়ে আসছেন, সিংহদের সাথে তার রাত কাটানোর কারণে তার কোনো ক্ষতি হয়নি। ডানিয়েল যারা পড়েছেন তারা এই গল্পটি জানেন, যা তিনশত বছর আগে ব্যাবিলনে ঘটেছিল। এটি ছিল ইজরায়েলাইটদের ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার কারণে অ্যান্টিওকাসের নিপীড়নের সময়, যা কিছু ইজরায়েলে ঘটেছিল সেই বিষয়ে। ডানিয়েল যেন তাদের বলছিলেন, যদিও তাদের সিংহের গর্তের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, কিন্তু ঈশ্বর তাদের রক্ষা করবেন, যদি তারা তাদের বিশ্বাসে অটল থাকেন। তাদের প্রতিরোধ আর মনোবলকে আরো শক্তিশালী করে তোলাই এই বইটির উদ্দেশ্য ছিল।

কিন্তু সেটাই ডানিয়েলের একমাত্র প্রস্তাবনা ছিল না। ইজরায়েলকে তার দুর্দশায় শুধু আশ্বস্ত করতেই চাননি, তিনি ঈশ্বরের শত্রুর বিরুদ্ধে তার শেষ যুদ্ধে তিনি ইজরায়েলকে প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন। ভারতীয় ঋষিদের ব্যতিক্রম, যারা কিনা সময়কে অশেষ ঘূর্ণায়মান চাকা হিসাবে দেখতেন, যেখানে আত্মা পরম আনন্দময় শূন্যতায় পালাতে চায়, ইহুদি-চিন্তাবিদরা সময়কে দেখেছিলেন ঈশ্বরের ধনুক থেকে বেরিয়ে আসা তীরের মতো, যার যাত্রা শেষ হবে যখন এটি তার গন্তব্যে পৌঁছাবে। আর ডানিয়েলের মতে সেই সময়টি ছিল খুবই সন্নিকটে। সময়ের এই যাত্রার শেষে ইসরায়েলের দুর্দশাও অবশেষে শেষ হবে। তাদের সৃষ্টিকর্তার মুখোমুখি হতে ও তার বিচারের দণ্ড পালন করতে তখন বহুযুগ ধরে মৃতরা তাদের কবর থেকে উঠে আসবেন। এখানেই ডানিয়েল ইজরায়েলে প্রথমবারের মতো মৃত্যুর পরেও জীবন আছে আর শেষবিচারের দিনে ঈশ্বরের আইন অনুযায়ী সব কর্মের বিচার হবে, এমন বিশ্বাসটি নিয়ে এসেছিলেন।

সেই মুহূর্তঅবধি এর ইতিহাসে ইজরায়েলাইটরা মৃত্যুপরবর্তী জীবন নিয়ে সামান্যই আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। সময়ের এই সীমানায় তাদের সাথে ঈশ্বরের সাথে দেখা হয় ঠিকই, কিন্তু মৃত্যুতে মানুষের সময় শেষ হয়ে যায় এবং সেই দৃশ্য থেকে তারা বিদায় নেয়। বিদায়ী আত্মারা তারপর সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পাতালপুরী, ‘শেওলে’ যায়। ‘শেওল’ হচ্ছে সব ভুলে যাবার একটি জায়গা, যেখানে এমনকি ঈশ্বরকেও স্মরণ করা হয় না। ডানিয়েলের বইটি সেই সবকিছুই বদলে দিয়েছিল। তিনি তাদের বলেছিলেন, ইতিহাসে শেষে ঈশ্বর আমাদের এই সময়ের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করবেন এবং যারা ধূলায় ঘুমিয়ে আছেন, তারা জেগে উঠবেন; কেউ অনন্ত জীবনে, কেউ লজ্জা আর অনন্ত ঘৃণায়।

মৃতদের পুনরুজ্জীবন লাভ করার বিষয়টি ইহুদি ধর্মে একটি নতুন ধারণা ছিল এবং সবসময়ই এটি বিতর্কিত ছিল। একটি সময় এসেছিল, যখন ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষকরা, যারা এটি বিশ্বাস করেন এবং যারা বিশ্বাস করেন না, এমন দুটিভাগে বিভাজিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এটি ছিল এমন একটি ধারণা, যা সময়ের সাথে আরো বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল। ডানিয়েল বিশ্বাস করেননি যে, মৃতরা এক-এক করে পুনরুজ্জীবিত হবেন, যখন তারা মারা যান; কিন্তু তিনি মনে করতেন আসলে যা হবে সেটি হচ্ছে একটি সাধারণ পুনরুজ্জীবন। সবাই তাদের কবরে ঘুমাবেন যতক্ষণ-না ঈশ্বর ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটান, তখনতার শেষবিচারের মুখোমুখি হতে সবাই একই সাথে জেগে উঠবেন। এবং ডানিয়েল মনে করতেন খুব দীর্ঘ সময় এর জন্যে আর অপেক্ষা করতে হবে না।

আরো একটি বড় ধারণা ছিল তার। সেটি হচ্ছে ইজরায়েলাইটদের দেখানো যে, শেষ নিকটেই আছে। ঈশ্বর বিশেষ একজন গোপন প্রতিনিধিকে পৃথিবীতে প্রেরণ করবেন, যিনি হবেন ‘মেসাইয়া’; তিনি শেষ আক্রমণের জন্যে সবাইকে প্রস্তুত করবেন। মেসাইয়া মানে যিনি ‘অ্যানয়েন্টেড’ বা ‘যাকে তেল লেপন করা হয়েছে (মানবজাতির পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে যার আবির্ভাব হবে)। তাদের নেতৃত্ব। দেবার জন্যে অতীতে যখন ইহুদিরা কাউকে রাজা হিসাবে নির্বাচিত করতেন, তখন তার মাথায় তেল লেপন করে দেওয়া হতো, তিনি-যে ঈশ্বরের দাস এটি ছিল তারই চিহ্ন। ডানিয়েল তখন ইসরায়েলকে বলেছিলেন খুব শীঘ্রই তাদের সব দুঃখের চির অবসান হবে, এবং শেষ খুব নিকটে এসেছে, তার সংকেত হচ্ছে, পরিত্রাতা মেসাইয়ার আগমন। কিন্তু তিনি পৃথিবীর বাইরে কোথাও থেকে আসবেন না। তাকে স্বর্গ থেকে মর্তে পাঠানো হবে না। তিনি তাদের মধ্যে বাস করেন এমন কেউ হবেন, এবং সব নজরে আসবেন তিনি, তার পরিচয় উন্মোচিত হবে। তিনি হয়তো ইতিমধ্যেই আমাদের মধ্যে আছেন, সুতরাং সতর্ক নজরে থাকুন। এভাবে ডানিয়েল ইজরায়েলকে সেই সময়টি স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যখন তাদের সব দুর্দশা শেষ হবে, ঈশ্বর তাদের অশ্রু মুছিয়ে দেবেন। সুতরাং তারা নজর রাখতে শুরু করেছিলেন, একজন মেসাইয়ার আগমনের জন্যে তারা অপেক্ষা করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনোই আসেননি। সবকিছুই আরো খারাপ হতে শুরু হয়েছিল।

অ্যান্টিওকাসের নিপীড়ন তুচ্ছ মনে হবে যদি সেটি আমরা রোমানদের প্যালেস্টাইন দখলের সাথে তুলনা করি, আর সেটি ঘটেছিল ৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। ১৫০ বছরের বিরামহীন অস্থিরতার একটি পর্ব এরপরে এসেছিল, যার মাঝে বিরতির মতো এসেছিল কিছু সম্মুখযুদ্ধ, পরিশেষে ‘সমাপ্তি’ আসার আগে। জেরুজালেমের মন্দির আবারও সেই সমস্যার কেন্দ্রে ছিল। ইহুদিরা তাদের নিজেদের জীবনের চেয়েও এই মন্দিরটিকে ভালোবাসতেন। এটি ঈশ্বরের জন্য তাদের সেই প্রতীকগুলো ধারণ করে, যিনি মিশর থেকে হাজার বছর আগে তাদের এখানে ডেকে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু ঈশ্বরের প্রতি ইজরায়েলাইটদের অতি তীব্রমাত্রার আবেগ দেখে তাদের নতুন শাসক রোমানরা হতভম্ব হয়েছিলেন। রোমানদের দেবদেবীর কোনো অভাব ছিল না, এবং কোনো বিশেষ দেবতার প্রতি তাদের আবেগের বাড়াবাড়িও ছিল না। কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ সেই দেবতাদের খুব গুরুত্বের সাথেও নিতেন না। কিন্তু এই ঈশ্বরের কী আছে, যা ইহুদিদের এমন আত্মঘাতী ভক্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে?

কিংবদন্তি বলছে, যখন রোমান-সেনাপতি পম্পেই ৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জেরুজালেম জয় করেছিলেন, তিনি ইহুদিদের সেই ঈশ্বরকে খুঁজতে তাদের মন্দিরে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মন্দিরটি তৈরি ছিল ধারাবাহিকভাবে ক্রমশ পবিত্রতর হয়ে ওঠা বেশকিছু চাতাল দিয়ে। পম্পেই সেইসব চাতাল অতিক্রম করে অবশেষে সেই পবিত্রতম আশ্রয়স্থল, ‘হলি অব হলিসে এসে পৌঁছান। এটি মন্দিরের সবচেয়ে পবিত্র অংশ, যেখানে শুধুমাত্র সর্বোচ্চ পুরোহিতের প্রবেশ করার অনুমতি আছে। পম্পেই শ্রদ্ধার সাথে সেই ‘হলি অব হলিসে প্রবেশ করেন ইজরায়েলের ঈশ্বরকে এক পলক দেখতে। কিন্তু এটি ছিল ফাঁকা, সেখানে কিছুই ছিল না।

কারণ ইহুদিরা জানতেন কোনোকিছুই সেই কণ্ঠটির প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না যা তাদের বহু শতাব্দী ধরেই তাড়া করে ফিরেছিল। দ্বিতীয় নির্দেশটি গভীরভাবে তাদের হৃদয়ে প্রবেশ করেছিল। খোদাই করা পাথর, অসংখ্য সাজানো উঠানসহ তারা বিস্ময়করভাবেই বিশাল একটি মন্দিরও নির্মাণ করেছিলেন। এটি তাদের খুব প্রিয় ছিল এবং পুরো ইতিহাসজুড়েই তারা এটি হারানোর জন্যে শোক করা অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু এর ঠিক কেন্দ্রে, সেই পবিত্রতম জায়গাটিতে কিছু ছিল না। পম্পেই সেখান থেকে ফিরে এসেছিলেন খানিকটা হতবাক হয়ে, এই ধর্মটির ঈশ্বরের প্রতীক হচ্ছে একটি শূন্যকক্ষ।

পরের শতাব্দী জুড়ে রোমানদের এই হতভম্ভতা ক্রোধে রূপান্তরিত হয়েছিল, যখন এই একগুয়ে মানুষগুলো আর তাদের অস্পৃশ্য, অদৃশ্য ঈশ্বরকে কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব অনুভূত হয়েছিল। সুতরাং রোমানরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন চিরকালের জন্যে এদের একটা ব্যবস্থা করতে হবে। ৭০ খ্রিস্টাব্দে টাইটাস নামের একজন সেনাপতির নেতৃত্বে, তারা জেরুসালেম শহরটিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন এবং সেই মন্দিরটি ধ্বংস করেছিলেন। ১৪০ বছর আগে সেনাপতি পম্পেইয়ের পরিদর্শন-পরবর্তী সময়ে মন্দিরের আরো ব্যাপক সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছিল। অবশেষে সবকিছুর অবসান হয়েছিল, ভেবেছিলেন টাইটাস, আমি তাদের ধ্বংস করেছি।

কিন্তু অবশ্যই তারা ধ্বংস হয়ে যাননি। আরো একটি দীর্ঘ নির্বাসনে তারা পৃথিবীর নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন, ইহুদিরা তাদের সবকিছুই হারিয়েছিলেন, শুধুমাত্র তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদটি ছাড়া : তাদের ঈশ্বর। তারা জানতেন পাথরের কোনো ভবনই তাদের ঈশ্বরকে ধারণ করতে পারবে না। এছাড়াও তারা ঐসব মানুষগুলোকে সন্দেহ করতেন, যারা ভাবতেন ঈশ্বরকে কোনো শব্দের দালানে তারা বন্দি করে রাখতে পারবেন। তারা যখন এই নতুন নির্বাসন সহ্য করেছিলেন, একই সাথে তারা মেসাইয়ার জন্যেও অপেক্ষা করছিলেন, মানবিক কোনো ব্যাখ্যায় ঈশ্বরকে সংজ্ঞায়িত করার কোনো প্রচেষ্টার সাথে ভিন্নমত প্রকাশের একটি ঐতিহ্য তারা লালন করেছিলেন।

এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ আর বিরক্তিকর চরিত্রও সেই দৃশ্যে আবির্ভূত হয়েছিল : ‘হেরেটিক’ বা ধর্মীয় ভিন্নমতাবলম্বী। হেরেটিকরা বেশ অস্বস্তিকর মানুষ ছিলেন, বিব্রতকর নানা প্রশ্ন করে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাবনাগুলো চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তাদের কাছ থেকে আমাদের অনেককিছুই শেখার আছে। তাদের মধ্যে বিখ্যাত একজনকে আমরা ইহুদি বাইবেলের ঠিক মাঝখানেই খুঁজে পাব।

১২. ভিন্নমতাবলম্বী

যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি পৃথিবীতে পারমাণবিক বোমার সংখ্যা হ্রাস করতে চেয়েছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, সেগুলো পৃথিবীকে আরো বেশি বিপজ্জনক একটি স্থানে পরিণত করেছে, তিনি বেশ শক্তিশালী বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তার সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সমালোচক ছিলেন একজন পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি বিশ্বাস করতেন, আমেরিকায় যত বেশি বোমা থাকবে, এটি তত বেশি নিরাপদ হবে। এই বিরোধিতার বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করার পর, প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, কোনোকিছু নিয়ে কারো চূড়ান্ত বিশ্বাস, বিশেষ করে যদি সেই মানুষটি একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন, সেটি যে-কোনো খোলামনের মানুষকে নাড়িয়ে দিতে বাধ্য। আর সেটাই তিনি বলেছিলেন, একটি আবদ্ধ মন থাকার বড় সুবিধা।

কারণ আবদ্ধ মনের মানুষদের জন্যে যে একটিমাত্র সগ্রাম বাকি থাকে, সেটি হচ্ছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বাকি সবার ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া। আর কোনোকিছু নিয়ে এই ধরনের নিশ্চয়তা’র কারিগরি নাম হচ্ছে অর্থডক্সি’ (বা প্রচলিত বিশ্বাস); এই শব্দটির উৎস গ্রিক, যার অর্থ ‘সত্য অথবা সঠিক বিশ্বাস। প্রেসিডেন্ট কেনেডির মতো কোনো ব্যক্তি, যিনি পারমাণবিক বোমা সংক্রান্ত প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিকে বিরোধিতা করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন একজন ‘হেরেটিক’, আর তাদের মতামতগুলোকে বলা হয় ‘হেরেসি’, আরেকটি গ্রিকশব্দ এর উৎস, যার অর্থ, যারা প্রচলিত ধারণার বিরোধিতা করেন। এই অর্থডক্সি’ আর ‘হেরেসি’ মানবজীবনে সবক্ষেত্রেই দেখা যায়, তবে ধর্মের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে শক্তিশালী। আর এটি কীভাবে কাজ করে সেটি পর্যবেক্ষণ, আমাদের বুঝতে সহায়তা করবে, কেন ধর্মগুলো নিজেদের মধ্যেই সর্বক্ষণ, এবং কখনো কখনো সহিংস ভিন্নমত প্রদর্শন করে থাকে।

অথচ অধিকাংশ ধর্মই প্রচলিত মতামতের বিরুদ্ধে একটি ‘হেরেসি’ বা ভিন্নমত হিসাবে তাদের যাত্রা শুরু করেছিল। একজন নবী তার অভ্যন্তরীণ কণ্ঠস্বরের প্রতি প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছিলেন, যা সমসাময়িক মতামতকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, যেভাবে আব্রাহাম তার বাবার দোকানে বানানো দেবতাদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করেছিলেন। এর পরে যা সাধারণত ঘটে সেটি হচ্ছে, একটি বিভাজন, যেখানে ভিন্নমত পোষণকারী সেই ব্যক্তি পৃথক হয়ে একটি নতুন ধর্ম শুরু করেন অথবা পুরনো ধর্মের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী শাখা সৃষ্টি করেন। কখনো এই ভিন্নমত পোষণকারীরাই তাদের যুক্তিতে বিজয়ী হন এবং তাদের ধারণাগুলো নতুন অর্থডক্সি বা প্রচালিত মতামতে রূপান্তরিত হয়। আবদ্ধ মনগুলো হয় আবদ্ধই থাকে, এবং নতুন ধারণার অনুপ্রেরণাগুলো অন্য কোথাও চলে যায়, অথবা নতুন অন্তদৃষ্টিগুলো সম্পৃক্ত হবার সুযোগ করে দিতে এটি যথেষ্ট পরিমাণ উন্মুক্ত হয়।

অন্য একেশ্বরবাদী ধর্মানুসারীদের তুলনায়, এই প্রক্রিয়ার সাথে বসবাস করতে ইহুদিরাই অপেক্ষাকৃত বেশি অভ্যস্ত ছিলেন। শুরু থেকে বিতর্ক আর ভিন্নমত তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল। অবশ্যই সব ধর্মে বিতর্ক হয়, কিন্তু অধিকাংশ ধর্মই যত দ্রুত সম্ভব সেই বিতর্ক থামিয়ে দেয়, এবং তারা একটি সীমারেখা টেনে দেয়, যা হয় সবাইকে গ্রহণ করতে হবে, নয়তো বের হয়ে যেতে হবে। ধর্মে তর্কের কোনো বিশৃঙ্খলা তারা সহ্য করেন না। ইহুদি ধর্ম কখনোই আসলে তেমন ছিল না। এটি জানত ধর্মের কোনোকিছুই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। এটি বিশ্বাস করত, লোহার বাক্সে মনকে বন্দি করে চাবি দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার চেয়ে যুক্তিতর্ক অব্যাহত রাখা অনেক উত্তম। ইহুদিবাদের পবিত্র বইয়ের ঠিক কেন্দ্রেই আমরা একজন ‘হেরেটিক’ বা ভিন্নমতাবলম্বীর দেখা পাই, যার নাম ছিল জব, যিনি সেই সময়ের প্রচলিত ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে নিজের মতামত প্রস্তাব করেছিলেন।

জবের এই কাহিনিটি দীর্ঘসময় ধরেই লোককাহিনি হিসাবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু ব্যাবিলনে নির্বাসনের সময় একজন অজ্ঞাত কবি কাহিনিটি নিয়ে কিছু কাজ করেছিলেন, এবং এটিকে এমনভাবে ব্যবহার করেছিলেন, যেন এটি দুঃখ আর কষ্ট ভোগ করার সমস্যাটি ব্যাখ্যা করতে পারে। অন্য কোনো জাতি অপেক্ষা ইহুদিদেরই সম্ভবত এই সমস্যাটি মোকাবেলা করার অধিকতর প্রয়োজন ছিল। বড় সাম্রাজ্যগুলোর আগ্রাসনের পরিণতিতে অন্য বহু জাতি আর জনগোষ্ঠী ইতিহাস থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কিন্তু অন্ততপক্ষে তাদের সেই দুর্দশা শেষ হয়েছিল। কিন্তু ইহুদিদের জন্যে এই দুর্দশা স্পষ্টতই মনে হয়েছিল যেন চিরন্তন একটি বিষয়। সত্তর খ্রিস্টাব্দের দিকে জাতি হিসাবে ধ্বংস হবার পর, নিজেদের বলে দাবি করার মতো তাদের আর কোনো দেশ ছিল না, যাযাবরের মতো একটি ইতিহাসের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল তাদের, এবং তারা যেখানেই গিয়েছিলেন সেখানেই প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। কোথাও তারা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার ব্যাপারে কখনোই নিশ্চিত হতে পারেননি, তারা তাদের বাক্স গুছিয়ে রেখেছিলেন, পরবর্তী মহাঅভিপ্রয়াণ, পরবর্তী নির্বাসনের জন্যে সদাপ্রস্তুত।

তারা তাদের দেশ আর মন্দির হারিয়েছিলেন, কিন্তু তারা তাদের বইটি রক্ষা করেছিলেন, এবং এটি তাদের আধ্যাত্মিক বাসভূমিতে পরিণত হয়েছিল, যা তারা অনায়াসে তাদের মালপত্রের স্যুটকেসের মধ্যে গুঁজে দিতে পারতেন, যখন পরবর্তী বহিষ্কারাদেশ তাদের নিয়তিতে আরোপিত হতো। এমনকি যদি এটি তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়, তারা এটির মূলসার তাদের স্মৃতিতে ধারণ করে রেখেছিলেন, পেন্টাটিউখ থেকে কয়েকটি কবিতা, যা তাদের সবারই কণ্ঠস্থ ছিল। তারা এর নাম দিয়েছিলেন ‘শেমা’, হিব্রু যে-শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘শোনা। ‘শোনো, ও ইসরায়েল : আমাদের প্রভু ঈশ্বর হচ্ছেন একমাত্র প্রভু এবং তুমি তোমার প্রভু ঈশ্বরকে ভালোবাসবে সর্বান্তকরণে, পুরো আত্মা দিয়ে, আর শক্তি দিয়ে। ইহুদি ঐতিহ্যমতে ডানিয়েল সিংহের গুহায় এটি আবৃত্তি করেছিলেন এবং .

অক্ষত অবস্থায় তিনি ফিরে এসেছিলেন। আর ডানিয়েলের কাহিনি সব মহাবিপদের সময়ই ইজরায়েলাইটদের অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু ইহুদিদের এখন কী অনুপ্রাণিত করতে পারে, যখন কিনা শক্তিশালী সিংহের চোয়াল তাদের একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছে? ইজরায়েলের জীবনে’ এখন কেন এত দুঃখ?

এই প্রশ্নটির উত্তর দেবার চেষ্টা করেছিল ‘বুক অব জব’। বহু শতাব্দী ধরে তার স্বধর্মীয়দের জিজ্ঞাসা করে আসা প্রশ্নটির কোনো বিশ্বাসযোগ্য উত্তর ছিল না জবের কাছে। তবে জব যা করেছিলেন সেটি হচ্ছে, দুঃখ আর দুর্দশাগুলো হচ্ছে পাপের জন্যে ঈশ্বরের দেওয়া শাস্তি প্রচলিত এই দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি ধ্বংস করেছিলেন। আর ধর্মের ইতিহাসে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। আমাদের সামনে এটি সাধারণ একজন মানুষকে উপস্থাপন করেছিল, যিনি কোনো ভুলধারণাকে অনায়াসেই শনাক্ত করতে পারেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ধর্ম তাকে বলেছিল, এটি ভুল হতে পারে না, কারণ ঈশ্বর বলেছেন এটাই সঠিক। সুতরাং তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন : ঈশ্বর কি কোনো ভুল জিনিসকে সঠিক করতে পারেন শুধুমাত্র সেটি সঠিক’ বলে ঘোষণা দিয়ে? না, ভুল সবসময়ই ভুল, ঈশ্বর যাই বলুক না কেন, অথবা ঈশ্বর বলেছেন, এমন দাবি করে পুরোহিতরা, আমাকে যাই বলুক না কেন। আমি জানি তাদের ব্যাখ্যা ভুল এবং আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও আমি সেটাই বলব। জব ছিলেন একজন হেরেটিক (ভিন্নমতাবলম্বী), যিনি বাইবেলের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছেন এবং এর শিক্ষাকে চ্যালেঞ্জ করছেন।

যখন বুক অব জব শুরু হয়, আমাদের বলা হয়েছিল, তিনি একজন সৎ আর নীতিবান ব্যক্তি ছিলেন, যিনি ঘটনাক্রমে অতিমাত্রায় বিত্তশালীও ছিলেন। সাত পুত্র আর তিন প্রিয় কন্যা ছাড়াও তার সাত হাজার ভেড়া, তিন হাজার উট, পাঁচশো জোয়াল টানা ষাঁড়, পাঁচশো স্ত্রী-গাধা, কর্মচারী ভৃত্য আর প্রচুর পরিমাণে ভূসম্পত্তি ছিল। তার সেই সময় আর স্থানের বিবেচনায় তিনি নিঃসন্দেহে অতীব বিত্তশালী ছিলেন।

কিন্তু একটি পর্যায়ে, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সবকিছু তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তার গবাদিপশুর পাল চুরি হয়ে যায়, তার ভৃত্য আর সন্তানদের হত্যা করা হয় এবং তিনি নিজেই খুব বিশ্রী একটি চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাকে আবর্জনার মধ্যে বসে মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরো দিয়ে নিজের গা চুলকাতে দেখা যায়। তার দুর্গতি আর যন্ত্রণা ছিল চরম। তার স্ত্রী তাকে বলেছিলেন, এখন তার উচিত হবে ঈশ্বরকে ঘৃণা করা আর অভিশাপ দেওয়া এবং মৃত্যুবরণ করা। কিন্তু তার সব দুর্দশা বিষয়ে জবের প্রত্যুত্তর ছিল : নগ্ন হয়ে আমি মায়ের জঠর থেকে এসেছি, নগ্ন হয়েই আমি ফিরে যাব। প্রভু দিয়েছিলেন আবার প্রভু সেটি কেড়ে নিয়েছেন, প্রভুর নামেই আশীর্বাদ’।

পরের দৃশ্যে আমরা দেখি জবের সাথে তিনজন বন্ধু দেখা করতে এসেছেন, এবং তারা বলেছিলেন, তারা তাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে এসেছেন, কিন্তু আসলে তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছিলেন। তারা ছিলেন সেই ধরনের বিশ্বাসী, সবকিছুর জন্যে তাদের কাছে প্রস্তুত থাকত উত্তর, এমনকি সেই ক্ষতির সুনামি, যা জবকে নিমজ্জিত করেছিল, তার জন্যেও তাদের একটি উত্তর ছিল। এলিফাজ দ্য টেমানাইট, বিলডাড দ্য শুহাইট আর জোফার দ্য নামাথাইট, তাদের দুর্ভাগা বন্ধুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে তাদের জেরা শুরু করেছিলেন। ক্রমশ বাড়তে থাকা বিরক্তিসহ তারা একই কথার পুনরাবৃত্তি করতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু এলিফাজ দ্য টেমানাইটই প্রথম জবের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির একটি আনুষ্ঠনিক ব্যাখ্যা দিয়ে শুরু করেছিলেন।

এলিফাজ বলেছিলেন : ‘নিরপরাধীদের কখনোই ক্ষতির মুখে পড়তে হয় না, যখন কিনা খারাপদের নিয়তিতেই আছে কষ্ট। তুমি যেহেতু এখন কষ্ট পেয়েছ, আমাদের বলল, তুমি কী করেছিলে যে, তোমার ওপর এই দুর্দশা পতিত হয়েছে? জব তাদের এই অভিযোগের যুক্তিটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। তার ওপর এই দুর্দশা চাপানোর জন্যে ঈশ্বরের যে কারণই থাকুক না কেন, এটি অবশ্যই জবের পাপের কারণে হতে পারে না, যে পাপ কিনা তার নিজের মাথার ওপর এই শাস্তি নিয়ে এসেছে। জব জানতেন তিনি নীতিবান একজন মানুষ ছিলেন, এবং তিনি কখনোই এমন কিছু করেননি, যার জন্যে এই দুর্ভাগ্যে পতিত হবার মতো কোনো শাস্তি যুক্তিযুক্ত হতে পারে, এটি অবশ্যই তার প্রাপ্য নয়।

জবের বন্ধুরা তাকে খোলামনে প্রশ্ন করতে আসেননি। তাদের কাছে কখনোই মনে হয়নি যে, তাদের প্রচলিত আনুষ্ঠানিক এই তত্ত্বটি ভুল হতে পারে। তারা যদি অন্য কোনো সম্ভাবনার কথা মনে জায়গা দেন, তাহলে তাদের পরিপাটি করে সাজানো ধর্মীয় মহাবিশ্বের সবকিছুরই প্রকৃত স্বরূপ বের হয়ে আসবে। তাই অযথা সন্দেহ করার চেয়ে বরং প্রচলিত চিন্তা আঁকড়ে থাকাই উত্তম। কিন্তু জব তার ব্যাখ্যা থেকে সরে আসতে অস্বীকৃতি জানান। এই মতবাদটি অবশ্যই ভুল, কারণ তিনি জানেন এমন কিছু তিনি করেননি যে, এই সর্বনাশ তার প্রাপ্য হতে পারে, যা কিনা তার সমস্ত পরিবার আর সৌভাগ্যকে মুছে দিয়েছে।

একজন সাধারণ মানুষ, যাকে অসাধারণ একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার ওপর আরোপিত অভিযোগগুলোর কাছে সমর্পণ করার পরিবর্তে, জব একটি হিংস্র নিষ্ঠুর তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহস খুঁজে পেয়েছিলেন। এমনকি যদি তার পক্ষে তিনি যে নিরপরাধ সেটি প্রমাণ করা অসম্ভব ছিল এই জীবনে–কারণ যা নেই তা প্রমাণ করা সবসময়ই অসম্ভব তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে, তার মৃত্যুর পর ঈশ্বর তার সুনাম পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করবেন : ‘কারণ আমি জানি আমার ত্রাণকর্তা আছেন এবং পরিশেষে একদিন তিনি এই পৃথিবীর উপর দাঁড়াবেন, আর আমার চামড়া যদি এভাবে ধ্বংস হয়ে যায়, আমি খালি মাংসের এই শরীর দিয়ে ঈশ্বরকে দেখতে পাব, যাকে আমি আমার পাশেই দেখব, আমার চোখ তাকেই দেখবে আর কাউকে না।

কিন্তু তার সততা প্রমাণ করতে জবকে তার মৃত্যু অবধি অপেক্ষা করতে হয়নি। ঈশ্বর স্বয়ং উপস্থিত হয়েছিলেন এবং নিন্দা করেছিলেন তাদেরকে, যারা জবকে দোষী অভিযুক্ত করে তাকেই অপমানিত করেছিল। ঈশ্বর এলিফাজ দ্য টেমানাইটকে বলেছিলেন : তোমার আর তোমার এই দুই বন্ধুর আচরণ নিয়ে আমি খুবই অসন্তুষ্ট এবং ক্ষুব্ধ হয়ছি, কারণ আমার সম্বন্ধে তোমরা যা বলছিলে তা সঠিক নয়, আমার দাস হিসাবে যে-কাজটি না-করাটাই তোমাদের কর্তব্য ছিল। এখানে একজন প্রচলিত মতামতের সাথে ভিন্নমত পোষণকারী একজন ‘হেরেটিক’ ঈশ্বরের আশীর্বাদ পেয়েছিলেন, সেই প্রচলিত ধারণার শিক্ষকরা নয়, যারা দলের মতামত মেনে চলেন।

কিন্তু এই গল্পের প্রচলিত শিক্ষাকে চ্যালেঞ্জ করার এমনকি ঈশ্বরেরও অনুমতি ছিল না! পরে একজন লেখক, জবের এই ভিন্নমতের জন্যে ঈশ্বরের সমর্থন দেবার কারণে বিচলিত হয়ে, এই কাহিনিতে একটি সুখকর পরিণতি জুড়ে দিয়েছিলেন মূল পাঠ্যাংশে। ঈশ্বর জবকে তার আগে যা ছিল তার চেয়ে দ্বিগুণ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, এবং এভাবে সেই পুরনো তত্ত্বটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সততা পুরস্কৃত হয় আর অসৎ ব্যক্তিরা তাদের কর্মের জন্যে এই জীবনেই শাস্তি ভোগ করেন। এই গল্পের অসাধারণ বিষয়টি হচ্ছে, এখানে আমরা প্রচলিত মত আর ভিন্নমতকে একসাথে কাজ করতে দেখি এবং এটি আমাদেরকে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবার অনুমতি দেয়।

যখন আমরা এই গল্পটি বিবেচনা করি, ঈশ্বরের দ্বিতীয় নির্দেশের মূর্তি প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করা আমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি ঈশ্বরকে ছোট মোড়কে মুড়িয়ে ধর্মীয় বাজারে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করার মতো কোনো কাজ করতে ইজরায়েলাইটদের সতর্ক করে দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও সংগঠিত ধর্মগুলো মূলত সেটাই করে থাকে। তাদের প্রচলিত মতামতের মোড়কে এটি ঈশ্বরকে একটি বাক্সের মতো ঢুকিয়ে রাখে এবং ঠিক সেটাই তারা বাকি সবাইকে জোর করে মানতে বাধ্য করে। জবকে সান্ত্বনা দিতে আসা তার বন্ধুরা এটাই করার চেষ্টা করেছিলেন। সহমর্মিতাসহ তার নিয়তিতে আসা সব হতাশা আর কষ্টের ভাগ না-নিয়ে এই বন্ধুরা তাকে বলেছিলেন, ঠিক কীভাবে তার এই পরিস্থিতিতে ঈশ্বরেরই হাত আছে এবং তারা তাকে এই ব্যাখ্যাটি মেনে নিতে। জোর করেছিলেন। অতিবিকশিত ধর্মীয় মূল ভাবনাগুলো সাধারণত এমন কাজ করতে ভালোবাসে। তারা মানুষকে নির্দেশ দেয়, ঠিক কীভাবে ভাবতে হবে, কোনোকিছুর কী অর্থ, সেটির ব্যাখ্যা দেয় এবং কীভাবে এই পরিস্থিতিতে ঈশ্বর ভূমিকা রাখেন সেটি দাবি করেন। কিছু ধর্ম যেভাবে কাজটি করে থাকে, এই ধরনের ব্যাখ্যার মুষলধারার মুখোমুখি হওয়া অনেকটাই আপনার নিজেকে কোনো দীর্ঘ বাস-যাত্রায় আত্মনিয়ন্ত্রণহীন কোনো ব্যক্তির পাশে বসে কাটানোর মতোই, যে কিনা সারারাত ধরে জোর করে তার সব উন্মত্ত ভাবনা আপনাকে শুনতে বাধ্য করে।

এলিফাজ দ্য টেমানাইট, বিলডাড দ্য শুহাইট আর জোফার দ্য নামাইট হচ্ছেন ধ্রুপদী চরিত্রের ধর্মীয় গোঁড়া মৌলবাদী, যারা মনে করেন তাদের কাছে সবকিছুরই ব্যাখ্যা করা আছে, রেকর্ড করা টেপের মতো এবং যাদের সাথেই তাদের দেখা হয়, তাদেরকেই সেই টেপ বাজিয়ে শোনানোর মতো আর কোননা কাজই করতে তারা এতটা ভালোবাসেন না। বুক অব জবের অসাধারণ বিষয়টি হচ্ছে, এটি তাদের কথা শুনতে গিয়ে চূড়ান্তভাবে ক্লান্তিকর হতে ভয় পায়নি, শুধুমাত্র মূল বিষয়টি ব্যাখ্যা করার লক্ষ্যে। ঈশ্বর কী কিংবা তিনি কী করতে চাইছেন বা তার পরিকল্পনা আর তার বার্তাটি কী, সেটি কেউ নিশ্চিতভাবে জানেন, এমন কোনো দাবি কারোরই করা উচিত নয়। অন্য বহুধরনের বিশ্বাসীদের তুলনায় ইহুদিরা অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন এই ধরনের অনিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচতে। তারা অন্য মানুষদের ওপর তাদের ঈশ্বরকে চাপিয়ে দেবার কোনো চেষ্টা করেন না। তারা নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক করতে সারাক্ষণই ব্যস্ত, সুতরাং তেমন কিছু করার মতো সময়ও তাদের হাতে নেই। এবং তারা এখনো বিতর্ক করে যাচ্ছেন। কিন্তু এখানে তাদেরকে তাদের ঈশ্বর নিয়ে দীর্ঘ তর্কবিতর্কে মগ্ন রেখে এগিয়ে যাব অন্য আরেকটি ধর্ম নিয়ে আলোচনা করতে। জোরোয়াস্ট্রিয়ানিজম বা জরথুস্ত্রীয় ধর্মমত। এটি আমাদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে পারস্যে, কমন এরা (খ্রিস্টপূর্বাব্দে) শুরু হবার ছয়শো বছর আগে বুদ্ধের সমসাময়িক সময়ে, কিন্তু প্রথমে ভারতে আমাদের একটি যাত্রাবিরতি করতে হবে।

১৩. শেষ যুদ্ধ

ভারতের পশ্চিম উপকূলে মুম্বাই শহরের দক্ষিণে মালাবার পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে চোখে রাখলে, অগণিত গাছের সারির উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো হাস্যময় পাথরের একটি স্তম্ভ নজরে পড়তে পারে পর্যটকদের। সেই পাহাড়ে উঠে স্তম্ভটির নিকটে যাওয়া তাদের নিজেদের জন্য নিষিদ্ধ, কিন্তু যদি তারা কোনো ড্রোন ব্যবহার করে ছবি তুলতে পারেন, তাহলে দেখবেন এই স্তম্ভটির একটি সমতল ছাদ আছে, যার প্রান্তসীমা ঘিরে রেখেছে অল্প উচ্চতার একটি প্রাচীর। এবং ছাদটি বিভক্ত করা হয়েছে তিনটি এককেন্দ্রিক বৃত্তে। ক্যামেরা হয়তো শবদেহ-খাদক কোনো পাখিকে সেখানে ব্যস্ত থাকতে দেখতে পারে, যারা সেখানে প্রথম বৃত্তে পুরুষ, দ্বিতীয় বৃত্তে নারী এবং তৃতীয় বৃত্তে সাজিয়ে রাখা ছোট মৃতদেহগুলো সব গোগ্রাসে গিলছে।

ড্রোন এখানে যা উন্মোচন করছে, সেটি কিন্তু মৃতদের প্রতি প্রদর্শিত নিস্পৃহ নির্বিকার কোনো আচরণ নয়, বরং এটি হচ্ছে গভীর শ্রদ্ধাপূর্ণ একটি ধর্মীয় আচরণ, পার্সিদের প্রাচীন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচার, যারা বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। পার্সিরা বিশ্বাস করেন, মৃতদেহ হচ্ছে অপবিত্র, সুতরাং যদি তারা সেটি কবর দেয়, তাহলে সেই শরীরটি পৃথিবীকেও দূষিত করবে, যা এটিকে গ্রহণ করবে, এবং যদি তারা সেটি দাহ করেন, তাহলে সেটি সেই আগুনকে দূষিত করবে, যা এটি দাহন করবে। এছাড়াও তারা মৃতদেহ খেয়ে বেঁচে থাকা প্রাণীদের প্রতি সদয় আচরণ করার ওপর বিশ্বাস রাখেন, যারা কিনা মৃতদেহ খেয়ে পৃথিবীকে পরিষ্কার রাখে; সে-কারণে তারা এইসব টাওয়ার অব সাইলেন্স’ (ডাখমা) নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে তারা তাদের মৃতদেহগুলোকে তীব্র সূর্যের আলোয় কাক আর শকুনের ঠোঁটের কাছে নিবেদন করেন। একবার এই স্তম্ভের উপর মৃতদেহ রাখলে সেগুলো মাংসহীন হাড়ের স্তূপে পরিণত হতে বেশি সময় লাগে না, এরপর শুষ্কতা আর সূর্যের আলোয় এই কংকালগুলো বর্ণহীন আর ক্রমশ ভাঙতে শুরু করে, যতক্ষণ-না সেগুলো স্তম্ভের কেন্দ্রে একটি হাড়ের কক্ষে জমা হয়, যেখানে তারা ধীরে ধীরে ধুলায় পরিণত হয়, মাটি দ্বারা পরিস্রাবিত হয়ে সমুদ্রে ভেসে চলে যায়। সুতরাং মৃত্যুর সময় হারানো দেহটি জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে সেই প্রাণীদের জন্যে খাদ্যে পরিণত হয়। সবকিছুই প্রকৃতিতে ফিরে যায়। কিছুই অপচয় হয় না।

যদিও বহু শতাব্দী ধরেই পার্সিরা, যারা এইসব টাওয়ার অব সাইলেন্স’ নির্মাণ করেছিলেন, ভারতে বসবাস করছেন, কিন্তু তারা মূলত এসেছিলেন পারস্য থেকে, বিষয়টি তাদের নামই ইঙ্গিত করছে। ভারতের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত একটি ভূখণ্ড, ইরান, এই ইরানকে গ্রিকরা যে নাম দিয়েছিল সেটি হচ্ছে পারসিয়া (বা পারস্য)। পার্সিরা যে ধর্মের অনুসরণ করেন তার নাম জোরায়াস্টিয়ানিজম বা জরথুস্ত্রবাদ, যার উদ্ভব হয়েছিল ইরানে, ইজরায়েলাইটদের ব্যাবিলন নির্বাসনের সমসাময়িক কোনো একটি সময়ে, কমন এরা শুরু হবার ছয় শতাব্দী আগে (খ্রিস্টপূর্ব)। ভারতের পার্সিরা ছাড়া আজ পৃথিবীতে জরথুস্ত্রবাদের খুব বেশি অনুসারী নেই, কিন্তু তাদের ধর্মটি ইহুদিদের ধর্মটি সহ অন্য ধর্মবিশ্বাসগুলোর ওপর গভীর একটি প্রভাব ফেলেছিল। এবং যেহেতু ইহুদিবাদই খ্রিস্টধর্ম আর ইসলামের জন্ম দিয়েছিল, পৃথিবীতে বর্তমানে যা এখন সবচয়ে জনবহুল ধর্ম, সে-কারণে আমরা জরথুস্ত্রবাদের প্রতিষ্ঠাতা জরথুস্ত্রকে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তি হিসাবে বর্ণনা করতে পারি। যদিও তারিখগুলো সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়, বিশেষ করে যখন তারিখগুলো এমন একটি সময়ের, যখন খুব সামান্য তথ্যই লিপিবদ্ধ করে রাখা হতো, কিন্তু মনে করা হয় খুব সম্ভবত ৬২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জরথুস্ত্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এবং একজন প্রতিদ্বন্দ্বী পুরোহিত তাকে ৫৫১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হত্যা করেছিলেন।

জরথুস্ত্র যে তার মতোই একজন পুরোহিতের হাতে খুন হয়েছিলেন এই তথ্যটি ধর্মের অন্যতম শক্তিশালী একটি বৈশিষ্ট্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় : এর সহিংস মতানৈক্য সৃষ্টি করার ক্ষমতা। এর কারণ ধর্মের চূড়ান্ত উৎসটি এমন একটি জায়গায়, যা আমরা জরিপ করতে পারি না, বিতর্ক নিরসনে ঠিক যেভাবে কোনো দূরবর্তী দ্বীপ হয়তো আমরা জরিপ করতে পারি। ধর্মের উৎস পৃথিবীর বাইরে এবং এমন একটি বাস্তবতায় যা এই পৃথিবীর বাস্তবতা নয়। এর গোপন তথ্যগুলো আমাদের কাছে প্রকাশ করেন নবীরা, যারা দাবি করেন এর রহস্যময়তায় তারা প্রবেশ করতে পেরেছেন। সেই কণ্ঠস্বরগুলো যা তাদের বলেছে সেটি তারা ঘোষণা করেন এবং একটি নতুন ধর্মের জন্ম হয়। আর প্রতিটি নতুন ধর্মকে যেহেতু পুরনো ধর্মের ওপর একটি প্রতি-আক্রমণ হিসাবে দেখা হয়, তাই বিস্ময়কর নয়, পুরনো ধর্মের পুরোহিতরা সবসময়ই দলবেঁধে নতুন ধর্মের নবীদের উপর আক্রমণ করেছে। আর সে-কারণেই ধর্মীয় ইতিহাসে সেরা চরিত্রগুলো বলেছেন, নবীদের সবসময়ই কষ্টভোগ করতে হয়, এবং তাদের সেই স্বর্গীয় অন্তর্দৃষ্টি পাবার দণ্ড দিতে হয় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে। জরথুস্ত্র পুরনো ধর্মের একজন পুরোহিত ছিলেন, যিনি নতুন ধর্মের নবী হয়েছিলেন, সুতরাং তিনি-যে সমস্যায় পড়বেন সেটি নিশ্চিত ছিল।

বোঝার জন্যে সবচেয়ে সহজ ধর্মীয় বিতর্কটি বহুঈশ্বরবাদ আর একেশ্বরবাদের মধ্যে, যারা বিশ্বাস করেন মহাবিশ্ব বহু দেবতায় পূর্ণ আর যারা বিশ্বাস করেন শুধুমাত্র একজনই ঈশ্বর আছেন, তাদের মধ্যে বিতর্ক। আব্রাহাম ছিলেন প্রথম একেশ্বরবাদী। এবং জরথুস্ত্র অবশ্যই তার পাশে দাঁড়াবার অধিকার রাখেন। কিন্তু যা কিছু তিনি দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিলেন আর শুনেছিলেন, সেটি আব্রাহামের কাছে যা উন্মোচিত হয়েছিল, তারচেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল। এর কারণ, বহু ধর্মীয় স্বপ্নদ্রষ্টার মতো জরথুস্ত্র একটি বিশেষ সমস্যা নিয়ে ধ্যানমগ্ন ছিলেন।

একেশ্বরবাদ হয়তো বহু লক্ষ পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দেবতাদের বিশৃঙ্খলাটি পরিষ্কার করেছিল, কিন্তু এটি এর নিজস্ব কিছু সমস্যা নিয়েও এসেছিল। যেমন, আমরা দেখছি, ইজরায়েলের সমস্যাটি ছিল তাদের নিরন্তর দুর্দশা এবং কষ্ট, পুরো ইতিহাস জুড়েই যার অভিজ্ঞতা তাদের হয়েছিল। কিন্তু ঈশ্বরের জাতি হিসাবে নির্বাচিত হওয়া বিষয়টি কেন তাদের বিরতিহীন দুঃখের কারণ হয়েছিল? তবে জরথুস্ত্রের জন্যে সমস্যাটি ছিল আরো গভীর আর বিশ্বজনীন। যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট মানুষ তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ভালো মানুষের সাথে কেন এই খারাপ জিনিসগুলো ঘটে। জরথুস্ত্র আরো গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন, এবং খুঁজে বের করতে চেয়েছিলেন, কীভাবে ভালো আর খারাপ এই পৃথিবীতে প্রথমে প্রবেশ করেছিল। মানুষের জন্যে জীবনটা বেঁচে থাকার জন্যে যুদ্ধ, আর সেই যুদ্ধটি শুধুমাত্র প্রকৃতির সাথেই না, স্বজাতির বিরুদ্ধেও তাদের যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়, যাদের অনেকেই খুবই নিষ্ঠুর আর অন্যদের ওপর তাদের আরোপিত দুঃখগুলোর প্রতি যারা উদাসীন। আর এই অশুভ জিনিসটি আসছে কোথা থেকে? আর যারা এটি সহ্য করছেন, তারা কি কোনোদিনও এর জন্য ক্ষতিপূরণ পাবেন, আর যারা এই কাজগুলোর জন্যে দায়ী তারা কি কখনো শাস্তি পাবেন?

এই প্রশ্নগুলোই জরথুস্ত্রকে পারস্যের প্রাচীন বহুঈশ্বরবাদী ধর্মের পুরোহিত হিসাবে তার শান্তিপূর্ণ জীবন থেকে টেনে বের করে এনেছিল। অতীতের বহু আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানকারীর মতো, অশুভের প্রকৃতি নিয়ে ধ্যান করে বেশকিছু বছর কাটাতে এটি তাকে প্ররোচিত করেছিল। তারপর একটি সমাধান তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন। ধারাবাহিক কিছু স্বর্গীয় অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে সত্যটি তার কাছে উন্মোচিত হয়েছিল: ভালো আর খারাপের এই যুদ্ধটি মানব-ইতিহাসের চেয়েও প্রাচীন। এটির সূচনা হয়েছে একেবারে ঈশ্বরের হৃদয়ে। আসলেই একজন সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আছেন, যাকে তিনি ডেকেছিলেন ‘আহুরা মাজদা’ (জ্ঞানী প্রভু বা সর্বজ্ঞানস্বামী) নামে, কিন্তু সেই একজন ঈশ্বরের জীবনেও তিনি জটিলতা আবিষ্কার করেছিলেন। একেবারে শুরুতে আহুরা মাজদা দুটি ভিন্ন যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, এবং তিনি তাদের দুজনকেই তাদের নিজস্ব পথ বেছে নেবার অনুমতি দিয়েছিলেন। একজন ভালোত্বকে আর অন্যজন এর বিপরীত অশুভকে নির্বাচিত করেছিলেন। একজন সত্যকে, আর অন্যজন মিথ্যাকে বেছে নিয়েছিলেন। সুতরাং এই পৃথিবী, এখানে বাস করা প্রতিটি সত্তার অন্তর, ভালো আর খারাপের মধ্যে সেই সংগ্রামের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে আহুরা মাজদার পুত্ররা পরস্পরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, এবং তারা দুজনেই আমাদেরকে স্বপক্ষে টেনে এনে জয়ী হতে চেষ্টা করে। এবং আহুরা মাজদার পুত্রদের মতো আমাদেরও সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কাকে সমর্থন করব।

ভালো আর খারাপের এই দ্বন্দ্বটি ঈশ্বরের জীবনের কেন্দ্রে নিয়ে যাবার মাধ্যমে জরথুস্ত্র আসলেই যে-সমস্যাটির উত্তর খুঁজতে এতদিন সংগ্রাম করেছিলেন, সেটি সমাধান করতে পারেননি। পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যার জন্যে দরকার ছিল আহুরা মাজদার একটি বক্তব্য, যেখানে তিনি বলবেন, কী কারণে তিনি আদৌ অশুভ জিনিসটির সৃষ্টি করেছিলেন এবং তার সন্তানদের এর শিকার হবার সুযোগ করে দিয়ে এর দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু জরথুস্ত্র যা করেছিলেন সেটি হচ্ছে, অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি সেই পরিস্থিতিটির নাটকীয় একটি মাত্রা দিয়েছিলেন, যে-পরিস্থিতিতে আমরা প্রায়শই আমাদের নিজেদের আবিষ্কার করি। প্রতিভাবান ঔপন্যাসিকের মতে, তিনি মানুষের জীবনকে বর্ণনা করেছিলেন ধারাবাহিকভাবে ঘটমান যুদ্ধের একটি সমষ্টি হিসাবে। এবং আমাদের নৈতিক সংগ্রামটি এখানে যুদ্ধের মাত্রা পেয়েছিল। আমরা আমাদের আসক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি, আমরা প্রলোভনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করি। এই ব্যাখ্যায় এমনকি আসলেই একটি অশুভ শক্তির ধারণাও সেখানে অর্থবহ হয়ে ওঠে। অনেক ধারণা আছে যা মানুষের মনকে ভাইরাসের মতো সংক্রমণ করতে পারে, এবং ভয়ানক সব কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারে যা অনুপ্রাণিত করতে পারে। বর্ণবাদ যেমন সবচেয়ে সুস্পষ্ট একটি উদহারণ, কিন্তু আরো অনেক উদাহরণই আছে।

কিন্তু জরথুস্ত্র একজন নাট্যকারের চেয়ে অনেক বেশিকিছু ছিলেন, যিনি মানব অভিজ্ঞতার সামনে একটি আয়না তুলে ধরেছিলেন। ডানিয়েলের মতো তিনিও একজন ‘অ্যাপোক্যালিপটিক’ বা মহাপ্রলয়ের আগাম বার্তাবাহক ছিলেন, যিনি ইতিহাসের সীমানা ছাড়িয়ে সেই সময়টি দেখেছিলেন, যখন ঈশ্বর এই পৃথিবীর কাহিনিটির উপসংহার টানবেন। ভালো বইগুলোর একটি চূড়ান্ত অধ্যায় থাকা দরকার, যেখানে অমীমাংসিত বিষয়গুলো বোধগম্য করে তোলা হয় এবং একটি সন্তোষজনক পরিণতি অর্জন করা সম্ভব হয়। এই তাগাদা সব ধর্মেই প্রবল, যেগুলো ইতিহাসকে একটি চক্র নয় বরং ধনুক থেকে ছুটে চলা একটি তীর হিসাবে দেখেছে : একটি কাহিনি যার একটি শুরু আছে, একটি মধ্যমপর্ব আর একটি শেষ আছে, কোনো চাকা নয়, যা চিরন্তন আবর্তনশীল।

জরথুস্ত্র বিশ্বাস করতেন, ভালো আর খারাপ চিরকালই চূড়ান্ত একটি যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া থেকে এড়িয়ে থাকতে পারবে না। একটি শেষ বোঝাপড়া হবেই। আহুরা মাজদার এই ভালো আর খারাপ সৃষ্টি পরিকল্পিত হয়েছে নিজেদের নিয়তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমাদের স্বাধীনতা আর সময় দেবার জন্যে, যেন আমরা সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারি। আর আমরা কী নির্বাচন করি সেটির প্রতি তিনি উদাসীন নন। যারা অশুভ আর খারাপ কোনোকিছুকে নির্বাচন করেন, সেই মানুষগুলোর ট্র্যাজেডি হচ্ছে তারা তাদের কাজের পরিণতি কী হতে পারে সেই বিষয়ে খুব বেশি দূরদৃষ্টির পরিচয় দেন না। প্রতিটি নির্বাচন আর সিদ্ধান্ত তাদের চরিত্রটি গড়তে সহায়তা করে এবং পরিশেষে নিজেদের তারা যে-ধরনের মানুষে পরিণত করেছেন তার ভিত্তিতেই তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। মৃত্যুর পর প্রতি আত্মাকে ‘চিনভাত’ সেতু (বা হিসাব-নিকাশের সেতু) পার হতে হবে সেই নিয়তিতে প্রবেশ করার জন্যে, যা এটি এর নিজের জন্যে তৈরি করেছে। এই সেতুটি ক্ষুরের ধারালো প্রান্তের মতো সংকীর্ণ। এর অপরপ্রান্তে আছে স্বর্গ, কিন্তু এর নিচে আছে নরক। যা ঘটে তা হচ্ছে, হয় আত্মা নিজেকে অশুভ বিষয় দিয়ে এতটাই ভারী করে ফেলবে যে, এর ওজন এটিকে নরকের দিকে টেনে নিয়ে যাবে, অথবা এতটাই হালকা থাকে শুভশক্তিতে, যা এটি খুব অনায়াসেই সেই সেতু পেরিয়ে স্বর্গে প্রবেশ করে।

এমনকি এটাও জরথুস্ত্রের সেই শেষ-সংক্রান্ত অন্তদৃষ্টিতে সবচেয়ে নাটকীয় উপাদান ছিল না। অশুভ কোনোকিছুর অস্তিত্বের সমস্যাটিকে সমাধান করতে হবে, সেই অশুভ শক্তি, যা সেতু-অতিক্রমরত কোনো আত্মাকে নরকে টেনে নিয়ে যায়। জরথুস্ত্রের সমাধান এসেছিল সেখানে, যাকে তিনি বলেছেন সৃষ্টির শেষ পর্যায়। যখন আহুরা মাজদা অবশেষে দুষ্ট যমজটিকে ধ্বংস করবেন, অশুভের যে মূল উৎস। পৃথিবী পুর্নবায়িত হবে এবং কল্যাণময়তা আর ন্যায়বিচার অবশেষে রাজত্ব করবে। এবং একজন ত্রাণকর্তা, একজন ‘সাওশয়ন্ত’ অথবা যিনি তাদের জন্যে উপকার নিয়ে আসবেন, আবির্ভূত হবেন। তার মাধ্যমে অশুভ পরিশেষে পরাজিত হবে এবং এর পরেই পৃথিবীর পুনর্নবায়ন ঘটবে।

জীবন্ত এবং ভীতিকর হওয়া ছাড়াও জরথুস্ত্রের শিক্ষা খুবই প্রভাবশালী ছিল। এবং পৃথিবীর ধর্মগুলোয় এটি বেশকিছু নতুন ধারণা যুক্ত করেছিল। এখানেই আমরা একক ব্যক্তির পুনর্জন্মের ধারণা পাই, যা হতে পারে স্বর্গের পরমানন্দে অথবা নরকের অনন্ত নির্যাতনে। এবং এখানেই আমরা প্রথম খুঁজে পাই সেই শেষ মহাযুদ্ধের ধারণাটিকে, সময়ের শেষে যে-যুদ্ধে অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করে ন্যায়বিচার আর নৈতিকতার একটি পৃথিবী পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে ঈশ্বর একজন ত্রাণকর্তাকে পাঠাবেন। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি কীভাবে ডানিয়েল এইসব একই ধরনের কিছু ধারণা দুর্দশায় আক্রান্ত ইসরায়েলকে সান্ত্বনা দেবার প্রচেষ্টায় ব্যবহার করেছিলেন। যে-ধারণাগুলো হয়তো ইহুদিরা আত্তীকৃত করেছিলেন পারস্যে তাদের নির্বাসনের সময়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মগুলো পরস্পর থেকে চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল না এবং যথেষ্ট পরিমাণ পারস্পরিক নিষিক্তকরণ সেখানে ঘটেছিল।

জরথুস্ত্র বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন কিন্তু একই সাথে তিনি সমর্থন এবং সফলতাও অর্জন করেছিলেন। তার শিক্ষাগুলো একত্র করে একটি পবিত্র ধর্মশাস্ত্র সংকলিত করা হয়েছিল, সেটির নাম ‘আবেস্তা’। এবং সেই প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ভিন্নমতটি মূলধারার বিশ্বাসে রূপান্তরিত হবার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল। জরথুস্ত্রের অনুসারীরা সবসময়ই যে- কোনো ধরনের ছবি অবিশ্বাস করে এসেছেন, কিন্তু তাদের প্রভু সর্বজ্ঞানস্বামী বা আহুরা মাজদার জন্যে তাদের নিজস্ব প্রতীক আছে–আগুন। তাদের মন্দিরে তারা এই পবিত্র আগুন সবসময় জ্বালিয়ে রাখেন, আর সে-কারণে ভ্রান্তভাবে তাদের অগ্নি-উপাসক হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আগুন অবশ্যই তাদের কাছে পবিত্র, কিন্তু শুধুমাত্র সর্বজ্ঞানস্বামী মাজদার একটি প্রতীক হিসাবে।

যখন তারা বেঁচে আছেন, এর অনুসারীদের ভালো চিন্তা, ভালো শব্দ উচ্চারণ এবং ভালো কর্ম করার উপদেশ দেওয়া হয়, যেন ‘চিনভাত’ সেতুর উপর দিয়ে দ্রুত তাদের আত্মা অতিক্রম করতে পারে, যখন তারা মারা যাবেন এবং তাদের শবদেহ টাওয়ার অব সাইলেন্সের (ডাখমা বা চিলঘর) ছাদের উপর ছড়িয়ে রাখা হবে আকাশের পাখিদের জন্যে একটি উপহার হিসাবে। এখনো এই টাওয়ার অব সাইলেন্সগুলো ইরানে পাহাড়ের উপর দেখা যায়, যা অতীতের স্মারকচিহ্ন হয়ে আছে সেই দেশে, যে-দেশে এটাই একসময় প্রধান ধর্ম ছিল। কিন্তু জরথুস্ত্রের মতবাদ একই নিয়মের শিকার হয়েছিল, যে-নিয়মে এটি একদিন পূর্বতন অন্য একটি ধর্মবিশ্বাসকে প্রতিস্থাপিত করেছিল। এবং সময়ের সাথে এর সমাপ্তিও নিকটবর্তী হয়ে উঠেছিল। বহু শতাব্দী ধরে এটি এর জন্মস্থান ইরানে টিকে ছিল, কিন্তু ১৩০০ বছর আগে এটিকে প্রতিস্থাপিত করে আরো দৃঢ়প্রত্যয়ী একটি নতুন ধর্ম, ইসলাম। এই সময় জরথুস্ত্রীয়রা ভারত-অভিমুখে একটি দীর্ঘ অভিপ্রয়াণ শুরু করেছিলেন, যেখানে পবিত্র আগুন জ্বালানো, টাওয়ার অব সাইলেন্স (ডাখমা) নির্মাণ এবং ভালো চিন্তা, শব্দ আর কর্ম সম্পাদন করার স্বাধীনতা আবার ফিরে পেয়েছিলেন। এবং সেখানে, যদিও সংখ্যায় কম, তারা এখনো বসবাস করছেন।

নতুন একটি অধ্যায় শুরু করার আগে, এতক্ষণ আমরা যা কিছু শিখলাম সেখান থেকে কিছু উপসংহারে পৌঁছানোর আগে, আমি পেছনের দিকে একটু দৃষ্টি ফেরাতে চাই, সেই সময়ের দিকে, যার বিবরণ আমি এতক্ষণ দিয়েছি। হাতি আর অন্ধ মানুষদের নিয়ে সেই জৈনদের নীতিগর্ভ রূপক কাহিনিটি এই আলোচনা শুরু করার একটি আদর্শ জায়গা হবে। এর বার্তাটি ছিল, সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে চূড়ান্ত বাস্তবতা সম্বন্ধে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করতে মানুষ অক্ষম, সুতরাং তারা যেসব ধর্মীয় দাবিগুলো করে থাকেন সেই বিষয়ে তাদের আরো বি আর সহিষ্ণু হওয়া উচিত।

এই সতর্কবাণী সত্ত্বেও, ধর্মের নবী ও সাধু ব্যক্তিরা তাদের বিশ্বাস নিয়ে কদাচিৎ সন্দেহ পোষণ করে থাকেন, কারণ মানুষ আর চূড়ান্ত সেই বাস্তবতার মাঝখানে ঝুলে থাকা সেই পর্দার নেপথ্যে কী আছে, তারা সেটি দেখেছেন এবং ‘শুনেছেন বলে তারা দাবি করে থাকেন। আমি সতর্কসূচক কমা দিয়ে ‘দেখেছেন’ আর ‘শুনেছেন’ ক্রিয়াপদগুলো চিহ্নিত করেছি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যে, আমাদের নিজেদেরই সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কীভাবে সেই অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে তাদের প্রস্তাবিত দাবির প্রতি আমরা প্রতিক্রিয়া দেখাব। কারণ তারা সবাই ভিন্ন ভিন্ন জিনিস দেখেছিলেন অথবা একই জিনিস ভিন্নভাবে দেখেছিলেন!

হিন্দু ঋষিরা কার্মার সেই চক্রের ঘূর্ণন এবং পুনর্জন্ম আর সময়ের অনন্ত আবর্তন দেখেছিলেন। এবং এই ধারণাগুলোই ভারতীয় এই ধর্মটির কেন্দ্রীয় মতবাদে রূপান্তরিত হয়েছিল।

ইহুদি নবীরা শুধুমাত্র একজন সত্যিকারের ঈশ্বরকে দেখেছিলেন, যিনি যখন সময় হবে, তার মেসাইয়াকে প্রেরণ করবেন এই পুরো ইতিহাসটির সমাপ্তি করতে, যে-আশা আজো বহু বিশ্বাসী ইহুদিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

জরথুস্ত্র সময়ের শেষে ভালো আর খারাপের মধ্যে একটি চূড়ান্ত যুদ্ধ দেখেছিলেন, যে যুদ্ধ ভালোর জয় হবে।

যদিও প্রত্যেকেই এটি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, এইসব ধর্মের প্রতিষ্ঠাতারা বর্তমানের এই সময়ে কী ঘটছে তার চেয়ে বরং ইতিহাসের অন্যপ্রান্তে যা কিছু ঘটতে তারা দেখেছিলেন সেই বিষয়ে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন।

কিন্তু আমাদের পরের যাত্রাবিরতিতে যখন আমরা চীনের দিকে তাকাব, আমরা আবিষ্কার করব যে, এই দেশটির সাধুরা মৃত্যুপরবর্তী জীবনের চেয়ে বরং কীভাবে এই জীবনটি আরো ভালো জীবন কাটানো যায়, সেটি নিয়ে অনেক বেশি আগ্রহী ছিলেন। সুতরাং এবারে আসুন পূর্বদিকে যাওয়া যাক, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন আর দীর্ঘতম বাণিজ্যপথ, দ্য সিল্ক রোড ধরে, আরো বেশিকিছু জানতে। এটি আমাদের নিয়ে যাবে সুদূর চীন অবধি, এবং জীবন সম্বন্ধে কনফুসিয়ানিজম নামে একটি কৌতূহলোদ্দীপক দৃষ্টিভঙ্গির কাছে।

১৪. পার্থিব ধর্ম

ভারতের উত্তর সীমানা ধরে অগ্রসর হয়ে চীনের মধ্যে প্রবেশ করেছিল রেশম পথ, ‘দ্য সিল্ক রোড’ আর কমন এরা শুরু হবার প্রায় ২০৬ বছর আগে এটি তার জীবন শুরু করেছিল, যখন একজন চীনা সম্রাট তার দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি দ্রব্য রেশম ভারতীয়দের কাছে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে কিছু ব্যবসায়ীকে পশ্চিমে পাঠিয়েছিলেন। এবং একটি সময় এই সিল্ক রোড প্রায় চার হাজার মাইল দূরে ইউরোপের সীমানায় ভূমধ্যসাগরের উপকূল অবধি সম্প্রসারিত হয়েছিল। ঘোড়সওয়ারদের ক্যারাভানগুলো এই পথে যাতায়াত করত, পূর্ব থেকে পশ্চিমে নিয়ে যেত রেশম আর অন্য দ্রব্য, কাপড় আর উল নিয়ে সেগুলো পূর্বে ফিরে আসত। কিন্তু এই বিখ্যাত পথ ধরে শুধুমাত্র রেশম আর অন্যান্য পণ্যসামগ্রী বহন করেই পশ্চিমে নিয়ে যাওয়া হয়নি। ধারণাও হস্তান্তর হয়েছিল, ধর্মও আমদানি হয়েছিল। বৌদ্ধবাদকে ভারত থেকে চীনে নিয়ে এসেছিলেন ব্যবসায়ীরা, যা পরে তিনটি প্রধান চীনাধর্মের একটি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

কিন্তু ধর্ম নিয়ে চীনের অধিবাসীদের নিজস্ব কিছু ভাবনাও ছিল, আর সেটি বর্ণনা করার সবচেয়ে প্রায়োগিক আর ব্যবহারিক শব্দ হচ্ছে ‘প্রাথম্যাটিক’, আরেকটি গ্রিকশব্দ যার সুস্পষ্ট একটি অর্থ আছে। এটি এসেছে সেই শব্দ থেকে, যার অর্থ হচ্ছে কোনো কর্ম বা কাজ, এখান থেকে ইংরেজি ‘প্র্যাকটিকাল’ শব্দটি এসেছে। এর অর্থ প্রায়োগিক আচরণ, তত্ত্ব নয়, এর বিপরীত এটি অনুশীলন, সেই কাজটি করা, সঠিক বিশ্বাস করার চেয়ে এখানে গুরুত্বপূর্ণ সঠিক কাজ করা।

এমনকি চীনের আদি বহুঈশ্বরবাদও ছিল ব্যবহারিক এবং বাস্তবতাপূর্ণ একটি জীবনাচরণের সূত্র। প্রকৃতির শক্তিগুলো কিংবা আবহাওয়ার খামখেয়ালিগুলো চীনে দেবতাদের প্রতিনিধিত্ব করত। এবং তাদের আচার-অনুষ্ঠানে চীনারা তাদের দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করতেন, অনুকূল পরিস্থিতি দিয়ে যেন তারা আশীর্বাদ করেন, এবং যা-কিছু তাদের ক্ষতি করতে পারে সেগুলো যেন তারা জীবন থেকে নির্মূল করেন। তাদের সবচেয়ে বড় দেবতা, স্বর্গের দেবতাদের যিনি দেবতা, বৃষ্টি পাঠাতেন, যা শস্যক্ষেতে পানি সরবরাহ করে এবং যা তাদের জীবনধারণে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক। কিন্তু যখন বৃষ্টি হতো, তখন বন্যাও হয়। বন্যার জন্যে যে দেবতা দায়ী, তিনি ছিলেন ‘গং গং’। আর যেখানে মাঝে মাঝে বন্যা হয় সেখানে অনাবৃষ্টিও হয়। বা ছিলেন এই অনাবৃষ্টির দেবতা। আর মানুষের কাছে খাদ্যের চেয়ে আর কী এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা তাদের বাঁচতে সহায়তা করত? মিলেট বা জওয়ারের দেবতা ‘হু জি’, যা ক্ষেতের শস্যবহনকারী ঘাসের গুরুত্ব ইঙ্গিত করত তাদের জীবনে।

এইসব শক্তিগুলোকে একটি ভারসাম্যে ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি করাই বুদ্ধিমানের মতো ব্যবহারিক একটি কাজ। ধর্ম কোনো একটি মতবাদের ওপর বিশ্বাস করার বিষয় ছিল না বরং কিছু করার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। এইসব শক্তিগুলোকে ব্যবস্থাপনা করার জন্যে এটি যথেষ্ট বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন একটি উপায় ছিল, যেন সেই শক্তিগুলো মানবসমাজের জন্য ভালো কিছু দিতে পারে।

প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী এই দেবতাদের ব্যবস্থাপনা করা ছাড়াও, চীনারা একগুচ্ছ দুষ্ট আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন, যাদের তারা এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করতেন : ড্রাগন, দৈত্য, পরী, ভ্যাম্পায়ার, নোম, গবলিন ইত্যাদি। আর এইসব দুষ্ট আত্মাগুলোকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেবার জন্যে তারা মূলত আতশবাজি আবিষ্কার করেছিলেন, আজও চীনদেশের মানুষরা চোখ-ধাঁধানো আতশবাজি পোড়ানোর প্রদর্শনী দেখতে ভালোবাসেন।

এইসব অতিপ্রাকৃত শক্তিদের মোকাবেলা করার জন্যে চীনাদের হয়তো তাদের নিজস্ব ব্যবহারিক উপায় ছিল, কিন্তু সেই বহুঈশ্বরবাদে খুব অল্পকিছুই মৌলিক ছিল। তাদের ঈশ্বরগুলো মানবজাতির গভীর ইতিহাসের সাধারণ কল্পনারই অংশ ছিল, সেই মনগুলো যাদের একসময় কল্পনা করেছিল যে, মন অদ্ভুত বিস্ময়ে এই মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়েছিল, যেখানে তারা নিজেদের আবিষ্কার করেছিল। কমন এরা শুরু হবার পরে, পঞ্চম আর ষষ্ঠ শতাব্দীতে এসে আমরা জীবনের প্রতি চীনাদের এই ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গিটিকে একটি নতুন স্পষ্টতা আর দিকনির্দেশনা অর্জন করতে দেখি। যে-সময়ে বৌদ্ধ আর জৈনরা ভারতীয় ধর্মের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করছিলেন এবং ব্যাবিলনে ইহুদি নির্বাসিতরা তাদের ঈশ্বরের প্রকৃতি নিয়ে আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিলেন, তখন চীনের চিন্তাবিদদের মধ্যে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মেজাজ লক্ষ করতে পারি। বর্তমানের এই পৃথিবীর সমস্যা সমাধানে চীনের প্রাজ্ঞ এই ঋষিরা তাদের সৃজনশীল মন ব্যবহার করেছিলেন। যে জীবনটি আসছে সেই মৃত্যুপরবর্তী জীবন নিয়ে তারা ভাবেননি। এইসব চিন্তাবিদদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটিকে আমরা এখন কনফুসিয়াস নামে চিনি।

কনফুসিয়াস নামটি হচ্ছে কং ফুজি বা মাস্টার বা দার্শনিক কং নামটির নতুন একটি সংস্করণ। এই কং ফুজি নামটি দেওয়া হয়েছিলে কং কিউ নামের একজন চিন্তাশীল কর্মকর্তাকে, যিনি সেই সময়ে চীনকে বহুবিভক্ত করা রাজ্যগুলোর কোনো একটি রাজ্যে সরকারি চাকরি করতেন। তার জীবন সম্বন্ধে খুব সামান্য কিছু আমাদের জানা আছে। কিন্তু তার লেখায় আমরা একজন প্রাজ্ঞ আর উদারমনা ব্যক্তির সাক্ষাৎ পাই, মৃত্যুর বহুদিন পরেও যিনি তার সর্বোচ্চ প্রভাব বজায় রেখেছেন। তার জন্ম হয়েছিল চীনের খুব বিশৃঙ্খল একটি সময়ে, কমন এরা শুরু হবার ৫৫১ বছর আগে। যখন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ্যগুলোর রাজারা পরস্পরের সাথে বিরতিহীন যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর চিন্তাবিদ আর রাজনীতিবিদরা যেমন এই সময়ে মানবতাকে সমস্যায় রাখা প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার সংগ্রাম করেন, তাদের সময়ে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরাও চীনের সমস্যা থেকে উত্তরণে বেশকিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। আর যে-সমাধানগুলো তারা প্রস্তাব করেছিলেন সেগুলো আমাদের সময়ের রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আমরা যা শুনি তার থেকে খুব-একটা ভিন্ন। কিছু নয়। সহিংসতার জবার দাও সহিংসতা দিয়ে, আগুনের উত্তর আগুন। শত্রুরা আমাদের যতটা তীব্রভাবে আঘাত করে, তার চেয়ে আরো তীব্রভাবে তাদের প্রতি আক্রমণ করো। আরো বড় বন্দুক আর প্রাণঘাতী বোমা বানাও। এবং কঠোর সাহসী নেতাদের খুঁজে বের করো, যারা খারাপ লোকগুলোকে শায়েস্তা করতে পারেন। পুরো ইতিহাস জুড়েই, রাজনৈতিক কৌশলগুলো সাধারণত পড়তে সাম্প্রতিক সময়ের হলিউড ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের মতোই মনে হবে।

কনফুসিয়াসের ভাবনা ছিল ভিন্ন। তিনি যুদ্ধবাজ রাজাদের বলেছিলেন, শুধুমাত্র জনগণের কল্যাণ করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। আর সেটি অর্জন করতে হলে তাদের সেই ধরনের মন্ত্রীদের নির্বাচন করতে হবে, যারা নৈতিকতায় শিক্ষিত এবং সহিংসতা পর্যন্ত যাওয়ার আগেই দ্বন্দ্ব নিরসনে দক্ষ। নেতারা তার কথা শুনেছিলেন এবং কনফুসিয়াসের প্রজ্ঞাকে সম্মান করেছিলেন, তার ভাবনাগুলোকে নীরবে সমর্থন করে। কিন্তু কেউই তার ধারণাগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। কনফুসিয়াসের যেমন প্রজ্ঞা ছিল, তেমনি ছিল ধৈর্য। তিনি তার বাকি জীবনটি তার অনুসারীদের কাছে ধারণাগুলো ব্যাখ্যা করে ব্যয় করেছিলেন, এবং তিনি আশা করেছিলেন, একজন প্রকৃতভাবে শিক্ষিত শাসক এই সবকিছুই একদিন ব্যবহারিক স্তরে প্রয়োগ করবেন। তিনি ৪৭৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মারা যান। কিন্তু তার অনুসারীরা তার শিক্ষাকে বই হিসাবে সংকলিত করেছিলেন, সুতরাং তার ধারণাগুলো টিকে ছিল। আর সেই ধারণাগুলোর সময়ও একদিন এসেছিল। কমন এরা শুরু হবার ১০০ আগে একজন সম্রাটের আবির্ভাব হয়েছিল, যিনি এই ধারণাগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করেছিলেন, এবং সেগুলোই চীনের প্রধান দর্শন ছিল, ১৯১২ সালে সাম্রাজ্যপ্রথার চূড়ান্ত বিলুপ্ত হবার আগ অবধি। এমনকি বর্তমানের চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে কনফুসিয়াসের মূলনীতিগুলোর শক্তিশালী একটি অবস্থান আছে।

কনফুসিয়াসের মূল ধারণাটি ছিল কর্কশ ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের বিরুদ্ধে অথবা একক স্বার্থপর মানুষগুলোর বিরুদ্ধে, যারা সমাজ ও এর বিধিনিষেধগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কনফুসিয়াস শিখিয়েছিলেন, জন্মের মুহূর্ত থেকেই আমরা বহু সম্পর্কের জালে আটকে থাকি, আর আমরা এই সম্পর্কগুলো ছাড়া বেঁচে থাকতে অক্ষম। সমাজের জন্যে যা ভালো সেটি একক ব্যক্তির জন্যে ভালো। এমনকি কখনো এর অর্থ হচ্ছে, কোনো একক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে অস্বীকার করা। জীবন সম্বন্ধসূচক, সমাজ হচ্ছে একটি শরীর, আমরা প্রত্যেকেই এর সদস্য-অঙ্গ। একক কোনো অঙ্গ টিকে থাকতে পারে না, যদি শরীর থেকে সেটি পৃথক হয়ে যায়।

এবং সহমর্মিতা হচ্ছে সেই আঠা, যা সবাইকে একসাথে যুক্ত করে রাখে। এই সহমর্মিতা মানে হচ্ছে ‘একত্রে দুঃখভোগ করা’। সহমর্মীরা অন্যদের অভিজ্ঞতার মধ্যে প্রবেশ করতে পারেন, তাদের নিজেদের অনুভূতি অনুসরণ এবং তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখার চেষ্টা করে। কনফুসিয়াসের কাছ থেকেই। আমরা সেই অভিব্যক্তিটি, যা পরিচিত ‘গোল্ডেন রুল’ নামে, তার প্রাচীনতম প্রকাশটি পেয়েছিলাম। এটি ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক দুটি রূপেই আসতে পারে : অন্যদের সাথে ঠিক সেভাবেই আচরণ করুন, আপনি যেমন চান অন্যরা আপনার সাথে করুক; অথবা অন্যদের সাথে এমন কিছু করবেন না যা আপনি চাইবেন না কেউ আপনার সাথে করুক।

অন্যদের প্রতি সহমর্মিতা আর সহানুভূতির সেই প্রাণশক্তির ধারণাটি বোঝাতে কনফুসিয়াস যে-শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন সেটি ছিল ‘রেন। চীনাদের প্রয়োগবাদী মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তত্ত্ব হিসাবে রেনকে বোঝার চেষ্টা না করে বরং এটি কর্মে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। আপনি যদি অন্য কারো জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন বিসর্জন দেন, আপনি তাহলে ‘রেন অনুশীলন করছেন। আপনি কোনো ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট কিনতে দোকানে যাচ্ছেন, যা কেনার জন্যে আপনি বহু মাস ধরে সঞ্চয় করেছেন, এবং আপনি সেটি না-কিনে একজন শরণার্থী ব্যক্তিকে তা দান করে দিলেন, তখন আপনি ‘রেন’ অনুশীলন করছেন। ‘রেন’ হচ্ছে সবচেয়ে মহৎ আচরণ, যা কিনা কোনো মানুষের পক্ষে করা সম্ভব হতে পারে। এটি হচ্ছে নিজের আগে অন্যকে গুরুত্ব দেওয়া। এবং এই ‘রেন’ প্রাণশক্তিটি কনফুসিয়াস রাজনীতিবিদ আর নেতাদের মধ্যে খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তারা যেন নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয় বরং জনগণের কল্যাণ কীভাবে হবে সেই বিষয়ের ওপর সর্বাগ্রে মনোযোগ দেন। এবং তিনি আশা করেছিলেন যে, সাধারণ নাগরিকরা সেই একই উদারতার প্রাণশক্তির উদাহরণ অনুসরণ করবেন, যখন তারা কোনো নেতাকে বিচার করবেন, যিনি খুব কঠিন সময়ে রাজ্য শাসন করার জন্যে সংগ্রাম করছেন।

পারস্পরিক ভিন্নমত বা বিতর্ক আর সংঘর্ষ ব্যবস্থাপনায় কনফুসিয়াসের দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় প্রতিপক্ষকে কীভাবে ধৈর্য আর সহমর্মিতার সাথে বিবেচনা করতে হয়। একারণে, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে, এটি একটি সুনির্দিষ্ট শৈলীর শিষ্টাচারের সাথে সংশ্লিষ্ট। শিষ্টাচার আর ধৈর্য হচ্ছে এমন মনের পরিচয়, যা মানব সম্পর্কগুলোর জটিলতা এবং সেটি পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা বিষয়ে সচেতন। পাশ্চাত্যের ব্যস্ত মন অপেক্ষা আজও পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় শিষ্টাচার অনেক বেশি উপস্থিত ধৈর্যশীল কোনো প্রাচ্য মনে।

কিন্তু কনফুসিয়াসের এই শিক্ষাগুলোকে কি একটি ধর্মের চেয়ে বরং একটি দর্শন হিসাবেই বোঝার জন্যে উত্তম ছিল না? এই দুটি শব্দের মধ্যে পার্থক্য সংজ্ঞায়িত করলে, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের সুবিধা হবে। ‘ফিলোসফি’, আরো একটি গ্রিক-শব্দ, এর মানে হচ্ছে জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা, এর সব সম্ভাব্য রূপে। এবং যে-রূপটি নৈতিক দর্শন হিসাবে জানি, সেটি এই পৃথিবীতে বাস করার সেরা আর প্রাজ্ঞতম উপায় কী হতে পারে সেটি অধ্যয়ন করে। অন্যদিকে ধর্ম মূলত আগ্রহী এই পৃথিবীর ওপারে যে-জগৎ আছে সেই বিষয়ে, এবং আমাদের জন্যে এটি কেমন হবে, যখন আমাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু এই প্রশ্নগুলো কনফুসিয়াসের মতাদর্শের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটির মূলত ঘনীভূত মানবসমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করে, কীভাবে আমরা এই পৃথিবীতে আমাদের জীবন ব্যবস্থাপনা করতে পারি, অনাগত জীবনের জন্যে পুণ্য সঞ্চয়। কিংবা শাস্তি এড়াতে, পাপ এড়িয়ে বাঁচার উপরে নয়। জীবনে ভালোভাবে বাঁচতে হবে শুধুমাত্র এই জীবনের খাতিরেই, মরার পরে আমাদের সাথে কী হতে পারে তার একটি ভূমিকা হিসাবে নয়।

তবে কনফুসিয়াসের মতাদর্শটির একটি দিক আছে, যা এটিকে ধর্মীয় জগতের বলয়ে নিয়ে এসেছিল : মৃত্যুর প্রতি এর দৃষ্টিভঙ্গি এবং পূর্বপুরুষদের প্রতি এটির গভীর শ্রদ্ধাপ্রদর্শনের আচার। কিন্তু এই দিকটিকেও সেই দর্শনের সম্প্রসারিত একটি রূপ হিসাবে বোঝা সম্ভব হতে পারে, যে-দর্শনটি সমাজের পরস্পর সংযুক্ত সদস্য হিসাবে মানুষকে বিবেচনা করে। এমনি মৃত্যুও আমাদের সেই সম্পর্ককে ছিন্ন করতে পারে না। সেকারণে কনফুসীয় সমাজে মৃতদের জন্যে বেশ তীব্রভাবেই শোক অনুভব করা হয় এবং তাদের স্মৃতি নিরন্তরভাবে লালন করা হয়। একটি মৃত্যুর পর শোকপর্বটি এর স্থায়িত্বে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মৃতের সন্তানের জন্যে এটি দুই বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে, যে-সময়ে তারা কোনো কাজ করেন না, যৌনমিলন করেন না, সাধারণতম খাওয়া ছাড়া আর কোনোকিছু খাওয়া, ভালো কোনো কাপড় পরেন না বা সাধারণভাবে জীবনকে উপভোগ করেন না।

কিন্তু কনফুসিয়াস মনে করতেন, পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা আর তাদের। মৃত্যুপরবর্তী শোক প্রকাশ করা ছাড়াও আরো অনেক কিছু করার আছে। মৃতের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়নি। ঠিক তেমন আমরা তাদের সাথে কোনো সংযোগও হারায়নি। তারা হয়তো জীবনের এই দৃশ্য ত্যাগ করেছেন এবং জীবনের অন্যপ্রান্তে কোথাও চলে গেছেন কিন্তু আমাদের জীবনে তাদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি তারা ধরে রাখেন। চোখের আড়ালে তারা আছেন, এর মানে এই না যে, তারা আমাদের মনের আড়ালেও আছেন। আর সে-কারণে একটি জনপ্রিয় কনফুসীয় বসন্তকালীন ছুটি হচ্ছে ‘ক্লিয়ার অ্যান্ড ব্রাইট ফেস্টিভাল’, যখন পরিবারের জীবিত সদস্যরা তাদের পূর্বসূরিদের সমাধিতে যান তাদের সাথে সংযোগ করতে, পরস্পরের সান্নিধ্য আবার উপভোগ করতে। শিষ্টাচার আর সবার জন্যে শ্রদ্ধা, এমনকি যদি তারা মৃতও হয়ে থাকেন, ছিল কনফুসিয়াসের মতাদর্শটির একটি স্বাতন্ত্র বিধায়ক বৈশিষ্ট্য (কিংমিঙ্গ অথবা চিং মিং ফেস্টিভাল, এছাড়াও এটি পরিচিত ইংরেজিতে টম্ব-সুইপিং ডে বা কবর পরিষ্কার করার দিন, কখনো চাইনিজ মেমোরিয়াল ডে অথবা অ্যানসেস্টর ডে)।

কিন্তু চীনে কখনো এই মতাদর্শটি শুধুমাত্র এককভাবে এর পূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারেনি। এটি জীবনের প্রতি পারস্পরিক প্রতিস্থাপনযোগ্য তিনটি দৃষ্টিভঙ্গির একটি ছিল। অপর দুটি ছিল, তাওইজম এবং বুদ্ধধর্ম। পরের অধ্যায়ে আমরা তাওবাদ নিয়ে আলোচনা করব এবং বৌদ্ধধর্মের দিকে আবার একবার আমরা নজর দেব জানতে, কী হয়েছিল এই ধর্মটির সাথে, যখন প্রথম শতাব্দীতে এটি অবশেষে চীনে পৌঁছেছিল।

১৫. সবচেয়ে ভালো উপায়

কনফুসিয়াসের মতবাদ হয়তো বুঝতে সহজ মনে হতে পারে, কিন্তু এটি বেশ গুরুতর একটি বিষয় ছিল। খুব একটা আনন্দ করার কিছু সেখানে ছিল না। আরেকটি চীনা মতাদর্শ, তাওইজম বা তাওবাদের (ডাওইজম) ক্ষেত্রে এটি ঠিক এর উল্টো। তাওবাদ বুঝতে আপনাকে বেশ সংগ্রাম করতে হবে কিন্তু একবার যখন আপনি বুঝতে পারবেন, এটি বেশ উপভোগ্য মনে হবে। অন্য ধর্মের ঋষিদের মত, তাও’ মতাদর্শ যারা উদ্ভাবন করেছিলেন, তারা কিছু একটা খুঁজে পেয়েছিলেন, আর তারা সেটি কোথায় খুঁজে পেয়েছিলেন সেই বিষয়টি তাদের স্বতন্ত্র করেছিল। হিন্দু ঋষিরা দেখেছিলেন, পৃথিবী আর সেখানে আমাদের জীবন হচ্ছে একটি বিভ্রম বা মায়া, আর মুক্তি পেতে সেই মায়াটিকে আমাদের মন থেকে দূর করতে হবে। ইহুদি নবীরা দেখেছিলেন, ঈশ্বর এই পৃথিবীর সবকিছুরই ইতি টানবেন একদিন, এবং এর বাসিন্দাদের পৃথিবীতে তাদের অস্তিত্ব থাকাকালীন কৃতকর্মের জন্যে বিচার করবেন। কারণ এই দুটি ধর্মের জন্যে পৃথিবী এবং সেখানে মানুষের অবস্থানটি ছিল একটি সমস্যা, আর সেই সমস্যাটিকে সমাধান করতে হবে। এবং তারা এই পৃথিবীর বাইরে গিয়েছিলেন এর উত্তর খুঁজতে।

তাওবাদীরা এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন। তাদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তারা পৃথিবীর দিকে তাকিয়েছিলেন। আর তারা যা কিছু দেখেছিলেন সেটাই ভালোবেসেছিলেন। এই মহাবিশ্বের সংঘটন, সংহতি আর পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, যেভাবে এটি একত্রে সবকিছু ধারণ করে আছে, তাদের আলোড়িত করেছিল। অবশ্যই এর মানব-অংশটি ছাড়া! কারণ শুধুমাত্র মানুষই এই মহাবিশ্বের সাথে একীভূত বা সমকালীন হয়ে নেই, কারণ আত্মসচেতন মন মানুষকে প্রাকৃতিক সব ছন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। আর প্রকৃতির সাথে এই সংহতি এবং এর ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে জীবন কাটানোর প্রক্রিয়াটির পুনরুদ্ধার করার মধ্যেই আছে প্রকৃত শান্তি। কিন্তু বিষয়টি তারা যেভাবে প্রকাশ করেছিলেন, সেটি অনুসরণ করা অনেকের জন্যেই বেশি কঠিন প্রমাণিত হয়েছিল। মানুষকে মহাবিশ্বের তাও’ অনুসারে বাঁচার জন্যে তারা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু এই ‘তাও কী, সেটি তারা ব্যাখ্যা করেননি। এটি আরো বেশি জটিল হয়ে উঠেছিল যখন তারা অন্যদের বলেছিলেন, তারা তাও’ শিখতে পারবেন না, যদি-না তারা ইতিমধ্যেই জানেন তাও’ আসলে কী। এবং বিষয়টি আরো কঠিন হয়ে ওঠে, যখন তারা বলেছিলেন, যারা জানেন তাও’ কী, তারা সেই বিষয়ে কোনোকিছু উচ্চারণ করেন না, এবং যারা এটি নিয়ে কথা বলেন তারা তাও’ কী সেটি আসলেই জানেন না। এটি পড়ে তাও’ আসলে কী, সেটি বুঝতে আপনি সম্ভবত গভীর চিন্তায় পড়ে গেছেন। যে-কোনো যৌক্তিক মানুষের মতো আপনি কোননা বিষয়ের ব্যাখ্যা চান। বিষয়টি সম্বন্ধে আপনি একটি স্বচ্ছ ধারণা পেতে চান। আপনার মন সেটাই দাবি করে। তবে তাওবাদীরা দয়ালু হাসি হেসে এবং কোনোকিছু না বলে শুধুমাত্র আপনার বিরক্তিটাই বাড়িয়ে দেবে!

সুতরাং আপনার জীবনের সেই সময়গুলো স্মরণ করা এখানে মূল্যবান প্রমাণিত হতে পারে, যখন কোনো একটি কাজ কঠোর পরিশ্রমের সাথে করার কারণেই সেই কাজটি করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু যখনই সেটি করার চেষ্টায় হাল ছেড়ে দেবেন, এটি তখনই সম্ভব হয়ে ওঠে। একটি ভালো উদাহরণ হচ্ছে, সুইমিংপুলের সেই মুহূর্তটি, যখন প্রথমবারের মতো আপনি সাঁতার কাটতে শুরু করেছিলেন। অথবা কোনো গ্রীষ্মের বিকালে, যখন আপনি ভারসাম্য খুঁজে পেয়েছিলেন এবং বুঝতে পেরেছিলেন, আসলেই আপনি রাস্তা দিয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে ভারসাম্য হচ্ছে মুখ্য বিষয়। শুধুমাত্র তারাই, যাদের ইতোমধ্যেই এটি আছে, আসলেই জানেন এটি কী। আমরা হয়তো এটিকে বলতে পারি তাও অব সাইক্লিং’। তাওবাদ কামনা করে, যেভাবে আমরা বাঁচি আর সবকিছুর সাথে সম্পর্কিত থাকি, সেখানে যেন আমরা সেই ভারসাম্যটি খুঁজে পাই, আর এটি শুধুমাত্র অন্য মানুষের সাথেই না, পুরো মহাবিশ্বের সাথে।

আর জীবনের প্রতি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারের নেপথ্যের ব্যক্তিটি ছিলেন কনফুসিয়াসের চেয়ে বয়সে খানিকটা বড় সমসাময়িক একজন, যার নাম লাওজি অথবা লাওৎ সে। কমন এরা শুরু হবার ৬০০ বছর আগের (খ্রিস্টপূর্বাব্দ) আশেপাশে কোনো একটি সময়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে তিনি চীন সম্রাটদের কোনো একজনের লাইব্রেরিতে কাজ করতেন। জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিটি কী, সেটি ব্যাখ্যা করতে যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি ধর্ম আর দর্শনের ইতিহাসে অন্যতম সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত আর শ্রদ্ধেয় বইটি লিখেছিলেন, যার নাম লাওৎ সু (বুক অব দ্য ওয়ে’)।

এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলো হচ্ছে ভারসাম্য’ আর ‘সম্পূরকতা। লাওৎ সে দেখেছিলেন প্রকৃতি, সবকিছুরই এর সম্পূরক একটি বিপরীত আছে। তিনি এইসব পরস্পরের বিপরীতদের নাম দিয়েছিলেন, ইয়াং’ এবং ‘ইন’। প্রতিটি ইনের সম্পূরক ইয়াং আছে এবং প্রতি ইয়াং-এর তেমন-এর পরিপূরক ইন আছে। এই পার্থক্যটিকে স্পষ্ট করতে, তাও মতাদর্শের অনুসারীরা একটি বৃত্ত এঁকে সেটিকে সমান দুটি অংশে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন একটি বক্ররেখা এর মধ্যে দিয়ে এঁকে। একটি সাদা, অপরটি কালো। এবং প্রতিটি স্বতন্ত্র অর্ধাংশ একটি বিন্দু ধারণ করে যা এর বিপরীত, কালো বিন্দু সাদা অর্ধাংশে এবং সাদা বিন্দু কালো অর্ধাংশে। এটি অন্যদের মাঝে আমাদের নিজেদের খুঁজে পেতে উপদেশ দেয়, কালোর মধ্যে সাদা আর সাদার মধ্যে কালো, পৌরুষে রমণীয়তা আর রমণীয়তায় পৌরুষ; শত্রুর মধ্যে বন্ধু আর বন্ধুর মধ্যে শক্র, আমার ধর্ম আপনার ধর্মের মধ্যে, আপনার ধর্ম আমার ধর্মের মধ্যে; এটি কনফুসিয়াসের ধারণাগুলোর সাথে খুব একটা ভিন্ন নয়, এটি যখন আমাদেরকে অন্যদের জায়গায় কল্পনা করতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু লাওৎ সে এখানে একটি আনন্দপূর্ণ নিজস্ব স্পর্শ রেখে গেছেন। তিনি চাননি যে আমরা শুধুমাত্র বৈচিত্র্য সহ্য করি, তিনি চেয়েছিলেন আমরা যেন এই বৈচিত্র্য উপভোগ করি। এই পৃথিবী হচ্ছে একটি বিশাল অর্কেস্ট্রা, যেখানে শত শত ভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র সম্মিলিতভাবে সুন্দর সংগীত সৃষ্টি করছে। ভারসাম্য, সময় আর ঐক্যতান, এই সবকিছুই তাও-এর চিহ্ন।

লাওৎ সে লক্ষ করেছিলেন, আরেকটি উপায়ে মানুষ তাদের ভারসাম্য হারায় সেটি হচ্ছে, যখন তারা অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন বোধ করে। নিজস্ব ছন্দে বাঁচতে না দিয়ে তারা সারাক্ষণই তাদের জীবনে হস্তক্ষেপ করে। আর এর সবচেয়ে চূড়ান্ত একটি উদাহরণ হচ্ছে সেই মানুষটি, যার কাছে তার নিজের উপায়টি হচ্ছে সবকিছু করার জন্যে একমাত্র শ্রেষ্ঠ উপায়; ডিশওয়াশারে বাসন। ঢোকানোর উপায় থেকে দেশ পরিচালনা অবধি। এই ধরনের মানুষগুলো সারাক্ষণই বিরক্তির মধ্যে থাকেন, কারণ বাস্তবতা সেই বিশেষ নিয়মের কাছে আত্মসমর্পণ করে না, যে-নিয়মটি তারা এর ওপর জোর করে আরোপ করতে চান। লাওৎ সে তাদের বলেছিলেন, উদ্বিগ্ন না হয়ে শরীর আর মন শিথিল আর দুশ্চিন্তামুক্ত করতে, এবং একটি গাছের জীবন থেকে কিছু শিখতে। গাছকে কারো বলতে হয় না, কীভাবে কোন কাজ করতে হবে। এটি এর প্রকৃতিকেই অনুসরণ করে। তাহলে মানুষরা কেন সেই একই কাজ করতে পারছে না। এত উৎকণ্ঠিত হওয়া থেকে কেন তারা নিজেদের থামাতে পারছে না, আর সবকিছুকে তাদের নিজস্ব গতিতে চলতে দিচ্ছে না? লাওৎ সে জীবনের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গিটিকে বলেছিলেন ‘উ-ওয়ে’, ‘কিছু করা–কোনোকিছু না করে’, সবকিছুকে তাদের মতো থাকতে দিয়ে, সবকিছুকে তাদের নিজস্ব গতিতে ঘটতে দিয়ে। তিনি সব নিয়মকানুন অপছন্দ করতেন এবং যেভাবে অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণকামী কোনো সংগঠক সবাইকে জীবন-চক্রে তাদের নিজস্ব বিন্দুতে নিয়ে আসেন, তাদের ভিন্নতাকে উদযাপন করার বদলে।

জীবনের প্রতি এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেন এমন কেউ হচ্ছেন একজন অ্যানার্কিস্ট (নৈরাজ্যবাদী), আরেকটি গ্রিকশব্দ যার অর্থ, যে সরকারের বিরুদ্ধে। তাওবাদীদের জন্য এটি চূড়ান্তভাবে সরকারের বিরোধিতা নয়, এটি মূলত সরকারের ভারসাম্য আর ক্ষমতার সমন্বয় দেখতে চায়। সমাজে আইনপ্রণেতাদের প্রাধান্যবিস্তারকারী ভূমিকার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া, এবং তাদের সেই উপায়গুলোকে অপছন্দ করা, যার মাধ্যমে তারা সবাইকে একই ছাঁচে গড়ে তুলতে চান। অ্যানার্কিস্টের বিপরীত হচ্ছে ‘লিগালিস্ট’, এমন কেউ যিনি বিশ্বাস করেন, মানবপ্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে আইন। কোনোকিছু সমাজের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? বেশ, সেটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক। সবসময় লিগালিস্টদের এটাই স্লোগান।

কনফুসিয়াসের ব্যতিক্রম, সার্বিকভাবে সমাজের মঙ্গল কামনায় যিনি মানুষের প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন, লাওৎ সে সমাজের মধ্যে প্রতিটি মানুষকে যতটা সম্ভব ততটাই স্বাধীনতা দিতে চেয়েছিলেন। জীবনের প্রতি দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দৃষ্টিভঙ্গি, আবারও ইন এবং ইয়াং, প্রত্যেকটিরই কিছু আছে এর সমর্থনে বলার জন্যে। কিন্তু যেহেতু তারা ইতিহাসের সেরা সংগঠক আর কদাচিৎ তারা বিশ্রাম নেন, লিগালিস্টরাই সাধারণত ধর্ম আর সমাজে প্রাধান্য বিস্তার করেন, এবং অন্যদের ওপর তাদের ইচ্ছাগুলো চাপিয়ে দিতে থাকেন। এবং যদি তাদের প্রয়োজন হয় সেটি করার জন্যে তারা এমনকি যুদ্ধ শুরু করতেও প্রস্তুত থাকেন। লাওৎ সে ঘুদ্ধ ঘৃণা করতেন, মানব সংহতি যা ধ্বংস করে। হয়তো যদি মানুষ তার কথা শুনত, তাহলে পৃথিবীতে যুদ্ধ কম হতো আর জীবন আরো উপভোগ্য হতো।

সুস্পষ্টভাবে এর ধর্মীয় ধারণাগুলো গ্রহণ না করেও তাওবাদ থেকে আপনি অনেক কিছু শিখতে পারবেন, কিন্তু আমাদের ভুল হবে যদি আমরা এর ধর্মীয় ধারণাগুলোর অস্তিত্ব উপেক্ষা করি। ৫২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লাওৎ সে’র মৃত্যুর পরেও তাওবাদের বিকাশ অব্যাহত ছিল। আর তাও শেখানো ছাড়াও তাওবাদে বহু দেবতারা ছিলেন। এর সবচেয়ে প্রধান দেবতারা, যাদের স্বর্গীয় গণ্যমান্য বলা হয়, বিশ্বাস করা হয় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাদের সৃষ্টি হয়েছিল যখন পৃথিবী অস্তিত্বশীল হয়েছিল। এইসব প্রধান দেবতাদের রাজসভা বসে স্বর্গে, তাদের সাহায্য করার জন্যে আছে অপেক্ষাকৃত নিম্নমর্যাদার দেবতাদের দিয়ে তৈরি গৃহস্থালী কর্মচারীরা। মহাবিশ্বের সাথে আসা দেবতারা ছাড়াও, মানুষও দেবতা বা ‘অমর’ হতে পারে। অমরত্বের এই মর্যাদা পেতে হলে প্রথমে তাদের ভেতর থেকে সব ত্রুটি বের করে দিতে হবে ধ্যান আর কামনা প্রশমনের নিয়মমাফিক অনুশীলন করে, পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া বুদ্ধের কঠোর অনুশীলনের মতো। পার্থক্যটি হচ্ছে তাওবাদীরা মহাবিশ্বে বিশ্বাস করেন, তাদের জন্যে আত্মার বিজয় মানে নির্বাণের মহাসাগরের উপর এক ফোঁটা বৃষ্টির মতো অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নয়, বরং দেবতা হিসাবে ব্যক্তিগত অমরত্ব লাভ করা। আরেকটি বৈশিষ্ট্য যা তাওবাদকে অন্যসব ধর্ম থেকে পৃথক করেছে সেটি হচ্ছে এটি নারীদের অবস্থান দিয়েছে। দেবীসহ, তাওবাদের নারী যাজক এবং বিদ্বান ছিলেন, যারা এর বিবর্তনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। এর প্রস্তাবিত দর্শনের প্রতি সততা প্রদর্শন করে তাওবাদ টিকে আছে ‘ইন’-এর রমণীয় এবং ইয়াং’-এর পৌরুষের মূলনীতির দ্বারা।

কনফুসিয়াসের মতাদর্শ আর তাওবাদ দুটোই চীনের স্থানীয়, কিন্তু তৃতীয় ধর্মটি, বৌদ্ধধর্ম, এটি ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছিল। বুনো অশ্বখগাছের নিচে বুদ্ধের বোধিলাভের সেই মুহূর্ত থেকে তার শিক্ষা প্রচারিত হতে শুরু করেছিল তর বিস্তার লাভ করেছিল ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন, কোরিয়া, জাপান ও আরো অনেক দেশে। যখন এর পরিধিতে এটি বিস্তৃত হয়েছিল, একই সাথে এটি বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত হতেও শুরু করেছিল বুদ্ধের বাণীর প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাখ্যাগুলোর সূত্র অনুসরণ করে। থেরাভাদা বৌদ্ধবাদ-এর মূল আন্দোলনের কঠোরতার প্রতি আনুগত্য ধরে রেখেছে এখনো। এই ধারায়, মোক্ষলাভের সবচেয়ে দ্রুততম পথ হচ্ছে সন্ন্যাসী হওয়া। এটি পরিচিত হীনযান বৌদ্ধবাদ নামে। এটি আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিদের বোধিসত্ত্ব লাভের লক্ষ্যে ছোটা রেসিং গাড়ির মতো। মহায়না (মহাযান) বৌদ্ধবাদ হচ্ছে বাসের মতো, সাধারণ মানুষদের জন্যে, বোধিসত্ত্ব অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে যারা তাদের নিজস্ব গতিতে অগ্রসর হন।

আর এই দুটি ধারার মধ্যে দ্রুততাই শুধুমাত্র পার্থক্য নয়। আমরা ইতিমধ্যে লক্ষ করেছিলাম, ধর্মে একটি মহাবিভাজন হচ্ছে সেই দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে, যারা ছবি বা মূর্তি ভালোবাসেন এবং যারা সেটি ঘৃণা করেন। বুদ্ধ স্বয়ং সেটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কিন্তু লোকপ্রিয় ধর্মগুলো ভালোবাসে কোনোকিছুর দিকে শ্রদ্ধা নিয়ে তাকাতে আর বৌদ্ধদের জন্যে স্বয়ং বুদ্ধ ছাড়া আর কী ছবি মূর্তিই বা থাকতে পারে তাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্যে? বুদ্ধের মূর্তিগুলো, প্রায়শই বিস্ময়করভাবেই সুন্দর, মহায়নাধারার অনুসারীদের মন্দিরে প্রধান মূর্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর বৌদ্ধধর্মের এই রূপটিই ‘সিল্ক রোড’ ধরে চীনে প্রবেশ করেছিল প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে। এটি চীনে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং চীনা ধর্মগুলোকে পরিবর্তিত করেছিল। এবং সেইসাথে এগুলোর প্রভাবে এটি নিজেও পরিবর্তিত হয়েছিল।

ধর্মের প্রতি চীনারা তাদের ব্যবহারিক প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গিটি অব্যাহত রেখেছিল। ভিন্নধারাগুলোর সেরা অংশগুলোর সংমিশ্রণ নিয়ে তারা কোনো অস্বস্তি বোধ করেনি। এভাবে তারা একটি একক বিশ্বাসের প্রতি কঠোরভাবে আনুগত্য প্রকাশেও কোনো বাড়াবাড়ি করেনি। সুতরাং যখন বৌদ্ধবাদের সাথে তাওবাদের দেখা হয়েছিল, আর সেই সাক্ষাতে উভয়েই পরিবর্তিত হয়েছিল। একটি পরিণতি হচ্ছে ‘জেন বৌদ্ধবাদ, ‘জেন’ শব্দটির উৎস ধ্যান বা মেডিটেশন বোঝাতে ব্যবহৃত চীনা শব্দটি। মনে আছে, তাও বোঝা বা পাওয়া কত কঠিন একটি কাজ? ‘জেন’ এর সেই ঠাট্টাসুলভ দৃষ্টিভঙ্গিটি ঋণ করেছিল।

.

‘কীভাবে আমি শান্তি পেতে পারি, আর এইসব কামনাগুলোকে দমন করতে পারি? আমাকে শেখাও। আমাকে বলল, কীভাবে পবিত্র বইগুলো আমার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছে এবং কীভাবে আমি এখান থেকে মুক্তি পেতে পারি?

‘বাহির…ভিতর….বাহির…ভিতর’।

‘কী’?

‘স্থির হয়ে বসুন, খুব স্থির… আপনার শ্বাসপ্রশ্বাস লক্ষ করুন : শ্বাস বাহিরে ফেলুন, ভেতরে নেন, আবার শ্বাস বাহিরে ফেলুন, আবার ভিতরে নেন…’।

আমি আমার সমস্যা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি আর আপনি আমাকে শ্বাস নেবার অনুশীলন শেখাচ্ছেন! আমার অন্যকিছু দরকার, যা দিয়ে আমার মনটাকে আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব…

বেশ, ঠিক আছে, এই ডেইজি ফুলটির দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকুন, ভালো করে লক্ষ করুন…।

কী?

.

জৈন বৌদ্ধবাদে তাওবাদের কৌতুকপ্রবণতা আছে, এবং যে সংস্কৃতিগুলোতে যুক্তিবাদের প্রাধান্য খুব বেশি, তারা সেখান থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবে।

বৌদ্ধবাদ থেকে তৃতীয় যে-ধারাটির উদ্ভব হয়েছিল সেটি গভীর একটি প্রভাব ফেলেছিল পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় একটি দেশের ওপর। তান্ত্রিক বৌদ্ধবাদ (বজ্রযান), বোধি অর্জন করার এই ধারাটি ব্যাপকভাবে একজন শিক্ষকের সহায়তা নিবেদন করে এবং এই ধরনের বৌদ্ধবাদ তার শিকড় গেড়েছিল তিব্বতে। হিমালয়ের অন্যপ্রান্তে, চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত তিব্বত পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম একটি এলাকা। এটিকে বলা হয় পৃথিবীর ছাদ, কারণ দেশটি মূলত সুবিশাল পর্বতমালা আর মালভূমির উপর অবস্থিত। এর এই দুর্গম্য এমন একটি বৌদ্ধবাদকে অনুপ্রাণিত করেছিল, যা এই পুরো দেশটিকে রূপান্তরিত করেছিল একটি বিশাল সন্ন্যাস-আশ্রমে। শিক্ষক সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে, যারা পরিচিত ‘লামা’ নামে, তিব্বত এমন একটি জাতিতে পরিণত হয়েছিল, যার কেন্দ্রে ছিল বৌদ্ধবাদের আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলাগুলো।

এবং তিব্বতের লামারা বৌদ্ধবাদের একটি বিশেষ ধারার স্বতন্ত্র আর বৈশিষ্ট্যসূচক ব্যবহার করেছিলেন। যখন কোনো একজন সন্ন্যাসী বোধি অর্জন করেন, তিনি তার নির্বাণ পাবার সেই সুযোগটি বিনিময় করতে পারেন, এবং অন্যদেরকে তাদের মোক্ষলাভে সহায়তা করতে ‘জীবন্ত বুদ্ধ’ হিসাবে পৃথিবীতে আবার ফিরে আসতে পারেন। তিব্বতের বৌদ্ধধারায় কিছু উচ্চপর্যায়ের লামাদেরকে তাদের নিজেদের পুনর্জন্ম নির্বাচন করার জন্যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই মানুষটি, যাকে তারা তাদের উত্তরসূরি হিসাবে নির্বাচন করবেন, তাকে খুঁজে বের করতে হবে। লামার মৃত্যুর পর তার বদলি কাউকে খুঁজে পেতে কখনো বেশ কয়েক বছর ব্যয় করতে হয়। যখন শনাক্ত করার পর, তিনি বেশ কিছুসংখ্যক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, তাকে লামার পুর্নজন্ম নেওয়া রূপ হিসাবে কোনো একটি সন্ন্যাসাশ্রমে প্রতিস্থাপিত করা হয়। এই উত্তরাধিকারের ধারার সবচেয়ে পরিচিত বর্তমানের দালাই লামার ঘটনাটি। যার হাসিমুখ পশ্চিমে এখন খুব পরিচিত রূপ পেয়েছে, যিনি পঞ্চাশের দশকে চীনাদের তিব্বত আগ্রাসনের পর সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

তিনি প্রথম দালাই লামার তেরোতম পুনর্জন্ম এবং হয়তোবা শেষ। এর মানে এই না যে, তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের অবসান হয়েছে। ধর্মের নানা উপায় আছে, এর নির্যাতনকারীদের চেয়েও বেশিদিন টিকে থাকার। এটি হচ্ছে কামারের নেহাই, যা বহু হাতুড়ির ক্ষয়ের কারণ হয়েছে। কিন্তু বৌদ্ধবাদ থেমে থাকেনি, যখন এটি চীনে প্রবেশ করেছিল। এটি আরো পূর্বদিকে এর যাত্রা অব্যাহত রেখেছে যতক্ষণ-না এটি জাপানে পৌঁছেছিল, যেখানে এটি আমাদের আলোচনার পরবর্তী ধর্মটির সাক্ষাৎ পেয়েছিল, সেই ধর্মটি হচ্ছে ‘শিন্টো’।

১৬. কাদা মন্থন

যখন আগের অধ্যায়ে তিব্বত নিয়ে আমি আলোচনা করছিলাম, তখন এটিকে দূরবর্তী আর দুর্গম দেশ হিসাবে বর্ণনা করেছিলাম। আমি অসতর্কভাবেই কথাটা বলেছিলাম। অন্ধ মানুষ আর হাতিদের সেই নীতিগর্ভ গল্পটি, পৃথিবীটাকে আমরা যেভাবে দেখি, সেটি তেমনই, এমন কিছু অনুমান করে নেবার ব্যাপারে আমাদের। সতর্ক করে দিয়েছিল। আমার কাছে তিব্বত বহু দূরবর্তী হতে পারে। কোনো তিব্বতীয়দের এটি তাদের মাতৃভূমি, এবং তাদের জন্যে স্কটল্যান্ড বহু দূরের একটি দেশ। জাপান নিয়ে আমি প্রায় সেই একই ভুলটি করতে যাচ্ছিলাম। এটি চীন থেকে বহুদূরে, সাগরের মধ্যে অবস্থিত একটি দ্বীপপুঞ্জ। এমনকি চীনের অধিবাসীরা, তাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিবেশী, ৬০০ খ্রিস্টাব্দের আগে এই। দেশে পা রাখেনি। সুতরাং জাপান বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন, এমন কিছু ভাবতে আমরা প্রলুব্ধ হতে পারি। তাহলে কেন আমরা ভাবছি না, বাকি পৃথিবীটাই বরং জাপান থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল? বহু দীর্ঘ সময় ধরেই জাপানের অধিবাসীদের জানা ছিল না যে, একটি পৃথিবী আছে যেখান থেকে তাদের দেশটি বিচ্ছিন্ন। তারা ভেবেছিলেন জাপানটাই হচ্ছে সম্পূর্ণ পৃথিবী। শুধুমাত্র জাপান তাদের দেশই নয়, জাপান তাদের ধর্মও ছিল। এবং তারা তাদের দেশটিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। সুতরাং জাপানের ধর্ম বোঝার আগে, তাদের স্বদেশ সম্বন্ধে জাপানিদের অনুভূতিটি কেমন সেটি আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে।

‘জাপান’ শব্দটির মধ্যেই এই রহস্যটির সমাধানের খানিকটা ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই নামটি এসেছে দেশটিকে চীনারা যে নাম দিয়েছিল, সেই নামটি উচ্চারণ করার ইউরোপীয় প্রচেষ্টা থেকে। স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের দেশটিকে ‘নিপ্পন’নামেই ডাকেন, যার অর্থ, উদিত সূর্যের দেশ, যে বর্ণনাটি যথার্থ। পূর্বদিকে তাকালে প্রশান্ত মহাসাগরে ঝলমলে শূন্যতাই প্রথমে তাদের চোখে পড়ত, যেখান থেকে প্রতিদিন সূর্য ওঠে, এই দ্বীপপুঞ্জের ৬৮৫২টি দ্বীপে এর সোনালি আলো ঢেলে দিতে। সুতরাং আদৌ বিস্ময়কর নয়, নিপ্পনবাসীদের সৃষ্টিকাহিনিতে সূর্যের প্রধান একটি ভূমিকা ছিল। প্রতিটি ধর্মেরই একটি সৃষ্টিতত্ত্বের কাহিনি আছে, যেগুলো পৃথিবী কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, কীভাবে এটি এর অস্তিত্ব পেয়েছে, সেই বিষয়ে নিজস্ব একটি সংস্করণ প্রস্তাব করেছে। জাপানের আলোচনায় আবার ফিরে আসার আগে, সেই সৃষ্টিতত্ত্বের কাহিনিগুলোর কয়েকটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার এখন সময় হয়েছে।

ভারতের বহু সৃষ্টিপুরাণ আছে। এদের একটি দাবি করে যে, সময় অস্তিত্বশীল আর পৃথিবী সৃষ্টি হবার আগে একটি বিশাল সত্তা ছিল, যার নাম পুরুষ, যিনি বিস্ফোরিত হয়েছিলেন এবং চারিদিকে ছড়িয়ে পড়া এর উপাদানগুলো দিয়েই সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে, এমনকি হিন্দু জাতপ্রথার সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি বিষয়গুলোও।

আব্রাহামের জন্মস্থান, মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরা বলতেন, একেবারে শুরুতে দুটি বিশালাকৃতির দানব ছিল, ‘আপসু বা মিষ্টি পানি আর ‘টিয়ামাট’ বা লবণাক্ত পানি। তারা পরস্পরের সাথে মিলিত হয়েছিল এবং অন্য দেবতাদের আর সমুদ্র দানবদের জন্ম দিয়েছিল। এবং যেভাবে মাঝে মাঝে সাগর শুষ্ক সমতল এলাকা প্লাবিত করে, নারীসঙ্গী টিয়ামাটও সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন। তার নিজের পরিবারই তার বিরোধিতা করে এবং তাকে যুদ্ধে পরাজিত করেছিল। তারা তার মৃতদেহকে দ্বিখণ্ডিত করে স্বর্গ আর পৃথিবী সৃষ্টি করে। স্বর্গ নির্মিত হয়েছিল দেবতাদের বাসস্থান হিসাবে। আর তাদের সেবা করার জন্যেই মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং নিচে পৃথিবীতে দেবতারা তাদের সেই ভূত্যদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

মিশরে একই ধরনের কাহিনি আছে, যেখানে আবারও পানির গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা আছে। একেবারে শুরুতেই ছিল শুধুমাত্র সাগর। তারপর, যখন এই মহাপ্লাবনের নিমজ্জন ক্রমশ সরে যেতে শুরু করেছিল, একটি পাহাড় পানির উপরে জেগে উঠেছিল। একটি বর্ণনায় বলা হচ্ছে, তখন সূর্যদেবতা ‘রা’, সেই দৃশ্যে এসে অন্য দেবতাদের এবং পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। আরেকটি সংস্করণে পৃথিবীর দেবতা পিটাহ, যিনি প্রথমে এসেছিলেন, এবং সবকিছুর সূচনা করেছিলেন।

আমরা যদি উত্তরে স্ক্যানডিনেভিয়ার দিকে যাই, সেই একই পানির কাহিনি পাব। একেবারে শুরুতেই ছিল শূন্যতার একটি অতল গহ্বর। এটি পানি দিয়ে পূর্ণ। হয়েছিল, তারপর পানি জমে বরফে রূপান্তরিত হয়েছিল। তারপর আবার এটি গলতে শুরু করেছিল, আর গলিত পানি থেকে একটি বিশাল দানব ইমিয়ারের আবির্ভাব হয়েছিল। তারপর তার বগল থেকে একজোড়া নারী ও পুরুষ বেরিয়ে এসেছিলেন। যখন এইসব ঘটনা ঘটছিল, একটি গরু বরফ স্তর চেটে খুব পাতলা করে দেবার কারণে আরো একটি দানব সেখান থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ পেয়েছিল। এই দানব থেকেই দেবতা ওডিনের জন্ম হয়েছিল। এইসব দেবতাদের পেশাগত জীবনে সাধারণত যা হয়ে থাকে, প্রচুর যুদ্ধ আর হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। ওডিন ও তার ভাই ইমিয়ারকে হত্যা করে তার শরীর থেকে পৃথিবী সৃষ্টি করেছিল। তার মাথার খুলি দিয়ে স্বর্গ এবং রক্ত থেকে সাগর সৃষ্টি করা হয়েছিল। আর তার শরীরর হাড়গুলো হয়েছিল পাহাড়, চুল থেকে সৃষ্টি হয়েছিল গাছ। ইত্যাদি আরো নানা খুঁটিনাটি বিষয় আছে, কিন্তু আপনি মোটামুটি বুঝতে পারছেন। আমি কী বলতে চাইছি।

এইসব দাঙ্গাহাঙ্গামার গল্প থেকে ইহুদি বাইবেলের সৃষ্টিকাহিনির দিকে তাকালে আমরা খানিকটা স্বস্তি অনুভব করতে পারি, এটির সূচনা কমন এরা শুরু হবার ৯০০ বছর আগের কোনো একটি সময়। জেনেসিসের দুটি সংস্করণ আছে, প্রতিটি খুব দৃঢ়ভাবে একেশ্বরবাদী, এবং দুটিতেই সমুদ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জেনেসিসে বর্ণিত সেই ‘দ্য ডিপ’, যা নিয়ে ঈশ্বর খুব উৎকণ্ঠিত চিন্তায় মগ্ন ছিলেন এবং এখান থেকেই তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি এই কাজটি করেছিলেন ছয়দিনে এবং সপ্তম দিনে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সপ্তম দিনে কিছু না করাও ছিল তার জন্যে একটি সৃজনশীল কাজ, যা সবার জন্যে সাবাথকে একটি ছুটির দিন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

জাপানের এই কাহিনিটি এসেছে জেনেসিসের সমসাময়িক সময় থেকে এবং আবারো সাগর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। একেবারে শুরুতে ছিল শুধু সমুদ্র। তারপর দেবতা ইজানাগি এবং দেবী ইজানামি তাদের দীর্ঘ বর্শা দিয়ে সাগরের নিচে কাদা মন্থন করেছিলেন এবং সেই কাদা থেকেই জাপানের বহুসংখ্যক দ্বীপগুলো সৃষ্টি হয়েছিল। এই স্বর্গীয় দম্পতি তিন সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন : সূর্যের দেবী, তার দুই ভাই, চাঁদ দেবতা আর ঝড়ের দেবতা। সূর্যদেবীর নিজেরও সন্তান হয়েছিল, তার নাতি নিপ্পনের প্রথম সম্রাট হয়েছিলেন।

কিছুক্ষণের জন্য এই গল্পগুলো নিয়ে ভাবা যুক্তিযুক্ত হতে পারে, কারণ ধর্ম কীভাবে কাজ করে সেটি বুঝতে এই গল্পগুলো আমাদের সহায়তা করে। এগুলো সত্য, নাকি মিথ্যা? এটি নির্ভর করবে এই গল্পগুলোর উদ্দেশ্য কী সেটি নিয়ে আপনি কী ভাবেন তার ওপর। নবী নাথান রাজা ডেভিডকে যে-গল্পটা বলেছিলেন, সেটি কি মনে আছে? সেটি কি সত্য, নাকি মিথ্যা ছিল? বাস্তবিক তথ্যবিচারে সেটি মিথ্যা একটি গল্প ছিল। কোনো ধনী ব্যক্তি ছিলেন না, যিনি কিনা গরিব সেই অসহায় ব্যক্তির ভেড়াটি চুরি করেছিলেন। কিন্তু নৈতিকতার অর্থে এটি সত্য। গল্পটি উদ্ভাবন করা হয়েছে ডেভিডকে তার অপকর্মটি সম্বন্ধে ভাবাতে, এবং এটি কাজ করেছিল। এর শৈল্পিক সত্যতা আছে, বৈজ্ঞানিক সত্যতা নেই। বিজ্ঞান বাস্তব তথ্য বা ফ্যাক্ট নিয়ে আগ্রহী, যেভাবে কোনোকিছু কাজ করে। শিল্পকলার আগ্রহ হচ্ছে নিজেদের জীবনে সেই সত্যটাকে আমাদের কাছে অনাবৃত করে তোলা। আর সে কারণে কোনো কাহিনি আপনাকে কাঁদাতে পারে, যখন আপনি এটিকে নিজের অভিজ্ঞতার সমরূপ হিসাবে শনাক্ত করতে পারবেন : এটাই তো আমি! ধর্ম একটি শিল্পকলা, এটি বিজ্ঞান নয়।

সুতরাং কোনো সৃষ্টিপুরাণ সত্য বা মিথ্যা কিনা, সেই প্রশ্নটি করা উচিত নয়, বরং যে-প্রশ্নটি করতে হবে, সেটি হচ্ছে এটি আসলে কী বোঝাতে চাইছে, এটি আমাদের কী বলতে চাইছে, এই বিভাজনটি বহু ধর্মীয় মানুষই পুরোপুরি কখনোই বুঝে উঠতে পারেন না। এবং আমরা পরে দেখব, তাদের কেউ কেউ নিজেদেরকে নির্বোধ হিসাবে উপস্থাপন করেন, যখন তারা বাইবেলে বর্ণিত সৃষ্টিকাহিনি শিল্পকলার কাজ নয়, বরং বিজ্ঞানের একটি কাজ হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন।

যেসব সৃষ্টিকাহিনির কথা উপরে আলোচনা করেছি তার কোনোটাই বাস্তবতার অর্থে সত্য নয়, কিন্তু এগুলো প্রত্যেকটি কোনো-না-কোনো একধরনের অর্থ ধারণ করে। বাইবেলের গল্পটি বোঝা অপেক্ষাকৃত সহজ, এমনকি যদি আপনি তার সাথে একমত নাও হতে পারেন : এই মহাবিশ্ব নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি, এটি সৃষ্টি করেছেন ঈশ্বর। এবং মেসোপটেমিয়া আর স্ক্যান্ডিনিভিয়ার কাহিনির সেই সহিংস সংঘর্ষ পৃথিবীর নিরন্তর সহিংসতা আর নিষ্ঠুরতারই প্রতিনিধিত্ব করে।

এই গল্পগুলো এসেছে মানুষের মন থেকে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই গল্পগুলো কি ঈশ্বর নিজেই মানুষের মনে স্থাপন করেছিলেন, নাকি মানুষই এটি পুরোপুরিভাবে সৃষ্টি করেছে। যেভাবেই আপনি এই প্রশ্নটির উত্তর দেবার চেষ্টা করুন না কেন, এই কাহিনিগুলো কাহিনি হিসাবেও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। এবং সেখানে কিছু অংশ থাকে যেগুলো প্রাচীন কোনো সময়ের ঘটনার স্মৃতি হিসাবে বহন করে আনা হয়েছে : একটি বিস্ফোরণ, যা সব পরিবর্তনের সূচনা করেছিল, একটি সমুদ্র যা সব প্রাণীর জন্ম দিয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞানের সৃষ্টিকাহিনি বলছে, মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে প্রায় চোদ্দ বিলিয়ন বছর আগে ঘটা একটি ‘বিগ ব্যাং’ থেকে। এবং আমাদের গ্রহে কীভাবে জীবনের সূচনা হয়েছিল সেই বিষয়ে এর সেরা অনুমানটি হচ্ছে, এটির সূচনা হয়েছিল সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগে কোনো একটি সময়ে। তরুণ পৃথিবীকে আবৃত করে থাকা সমুদ্রগুলো ছিল নানা রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণ, যা সৃষ্টি হয়েছিল আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাতের সময়, এবং এই রাসায়নিক দ্রব্যগুলো ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ায় প্রথম প্রাণের আবির্ভাব হয়েছিল। কয়েক বিলিয়ন বছর পর আমরা ধীরে ধীরে এই দৃশ্যে প্রবেশ করেছি। পৃথিবীর নিজের ইতিহাসের স্মৃতি ঐসব শিল্পীদের মনের মধ্যে চুঁইয়ে প্রবেশ করেছিল, যারা সময়ের মধ্যে দিয়ে সেই অতীতের দিকে তাকিয়েছিলেন সবকিছুর অর্থ খুঁজতে? আমার কাছে বিষয়টি অসম্ভব মনে হয় না। এর কারণ হতে পারে পুরো মহাবিশ্বই খুব অদ্ভুত এবং প্রায় যে-কোনোকিছুই এখানে কল্পনা করা সম্ভব।

নিপ্পন দেশের মানুষদের এই সৃষ্টিপুরাণের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী বিষয়টি হচ্ছে যখন দেবতারা সাগরের নিচে তাদের বর্শার ফলা দিয়ে কাদা ঘেঁটেছিলেন, তারা একটি পৃথিবী তৈরি করেননি, তারা শুধু জাপান সৃষ্টি করেছিলেনঅথবা তারা একটি জগৎ বানিয়েছিলেন, যেখানে জাপান ছাড়া কিছু ছিল না। আর এভাবেই তাদের সুন্দর দ্বীপপুঞ্জের প্রতি যে-ভালোবাসাটি তারা অনুভব করেন সেটি ব্যাখ্যা। করেছিলেন। দ্বীপ জাতিগুলো নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে থাকার বিষয়টি এড়াতে পারে না। তাদের এমন কোনো স্থলসীমানা ছিল না যার মধ্যদিয়ে মানুষের আনাগোনা হতে পারে, সুতরাং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দেবতাদের দ্বারা তাদের ধর্মীয় তাড়নাগুলো কদাচিৎ প্রভাবিত হবার সুযোগ পেয়েছে। আদি জাপানি ধর্ম সম্বন্ধে আমরা যতটুকু জানি, সেটি এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এবং আমরা যদি স্মরণ করি, ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ছাড়া আর কখনোই জাপান কারো পরাধীন হয়নি, তাহলে আমাদের বিস্মিত হবার কোনো কারণ নেই এমন কিছু। যদি আবিষ্কার করি : তাদের দ্বীপ জাতিকে জাপানিরা যে তীব্রভাবে ভালোবাসে শুধুমাত্র সেটাই নয়, তারা বিশ্বাস করতেন এটি অদ্বিতীয়। আর খুব দূর-অতীতে সম্ভবত তারা ভেবেছিলেন, জাপানের বাইরে আর কিছুরই অস্তিত্ব নেই।

দেবতারা জাপান শুধু সৃষ্টিই করেননি, এটি তাদের নির্বাচিত বাসভূমিও ছিল। অন্য ধর্মগুলো বিশ্বাস করে, দেবতারা ইচ্ছা হলেই পৃথিবীতে আসতে পারেন, কিন্তু তাদের মূল বাসস্থান, আকাশের বহু উপরে একটি বিশেষ এলাকা, যাকে স্বর্গ বলা হয়। আর জাপানিদের কাছে তাদের সুন্দর দ্বীপপুঞ্জটি ছিল সেই বিশেষ এলাকা, তাদের কাছে স্বর্গ আর পৃথিবী ছিল একই জায়গা। স্বর্গ পৃথিবীর মধ্যে আর পৃথিবী স্বর্গের মধ্যে। কিছু ধর্ম যেভাবে মানুষের শরীরকে অমর আত্মার শারীরিক বাসস্থান। হিসাবে দেখে থাকে, ঠিক সেভাবেই জাপানিরা তাদের দেশ সম্বন্ধে ভাবতেন। জাপানের দ্বীপপুঞ্জটি ছিল কামি’ নামের পবিত্র আত্মাদের বাস্তব অভিব্যক্তি, যারা প্রকৃতিতে সর্বত্র বিরাজমান। প্রাণীদের মধ্যে তাদের বসবাস, জাপানের পর্বতমালাতেও তারা অবস্থান করেন, যার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর আর পবিত্রটি হচ্ছে মাউন্ট ফুজি। এই কামি আত্মাদের দেখা মেলে গাছ আর নদীতেও।

আমি বলেছিলাম যে, এটাই ছিল তাদের ধর্ম, কিন্তু সেটি পুরোপুরি সঠিক নয়। এটি পৃথক একটি ধারণা প্রস্তাব করেছিল, একটি বিশ্বাস যা তারা তাদের চিন্তায় ধারণ করে। আপনি নিজস্ব সত্তা-সংক্রান্ত বোধ, আপনি কে সেটি নয় বরং নিজের সম্বন্ধে আপনি চিন্তায় যা ধারণ করেন অথবা যা বিশ্বাস করেন, সেটিকে ধর্ম হিসাবে বর্ণনা করলে ঠিক যেমন ভুল হবে। জাপানিরা অনুভব করেছিল যে, তারা একটি মহান সত্তার জালে আবৃত হয়ে আছেন, যার গঠনগত উপাদান হচ্ছে তাদের দেশটির ভূখণ্ড, তারা নিজেরা এবং সেই আত্মারা, যা সবকিছুই জীবন্ত করে তোলে। এটি এমন কিছু না যে তারা বিশ্বাস করতেন। এটি শুধুমাত্র তারা যেমন ছিলেন।

জীবনের প্রতি এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির কারিগরি নাম হচ্ছে ‘অ্যানিমিজম’ বা। সর্বপ্রাণবাদ। এটি ‘গাইয়া’ নামের একটি আধুনিক তত্ত্ব থেকে খুব একটা দূরে নয়, যা এই গ্রহটিকে ধ্বংস আর স্বার্থপর ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট বস্তু হিসাবে নয়, বরং একটি জীবন্ত সত্তা হিসাবে দেখে, যাকে পরিবারের সদস্য আর বন্ধুদের মতোই যত্ন। করতে হবে একই ভালোবাসা দিয়ে। এর মানে প্রকৃতি এর নিজস্ব প্রাণশক্তিতে জীবন্ত এবং মানুষের মতোই এটি গুরুত্বপূর্ণ। জাপানিরা এটি তাদের হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন। ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসাবে কিন্তু তাদের এই নির্দেশ দেওয়া হয়নি, প্রকৃতিকে তাদের অবশ্যই ভালোবাসতে হবে। তাদের এমন কিছু বলা হয়নি যে, পৃথিবী এরকম, সেটি তাদের বিশ্বাস করতেই হবে। পৃথিবীর এই প্রকৃতি আবিষ্কার করা উপলক্ষ্যে তারা কোনো একটি দিন বিশেষভাবে উদ্যাপনও করেন না। এই বিষয়ে তাদের কোনো বিশ্বাস নেই। শুধুমাত্র দেশটির সেই প্রবিত্র আত্মা বা কামি’র জন্য ভালোবাসা, যে-ভালোবাসাটি তারা সুন্দর জায়গাগুলোয় বিশেষ মন্দির নির্মাণ করে প্রকাশ করেছিলেন। প্রতিটি মন্দিরের ছিল বৈশিষ্ট্যসূচক একটি প্রবেশপথ, যা নির্মিত হয়েছিল দুটি উল্লম্ব আর দুটি আড়াআড়িভাবে সংযোগকারী খুঁটি দিয়ে। আজও জাপানে এধরনের মন্দিরের সংখ্যা এক লক্ষেরও বেশি। এবং সেগুলো এখনো সযত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।

৬০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোনো একটি সময় চীনের অধিবাসীরা জাপানে–আসার আগ পর্যন্ত, পৃথিবীর প্রতি তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গিটির এমনকি কোনো নামই ছিল না। চীনারা দেশ-দখল বা ধর্মপ্রচার করার মতো কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে জাপানে আসেননি, তবে তারা কনফুসিয়াসের মতাদর্শ, তাওবাদ এবং বৌদ্ধবাদ সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। আর এই ধর্মগুলোর প্রতিটি পরবর্তীতে জাপানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হয়তো এর কারণ ছিল যে-বিশ্বাস আর আচারগুলোর সংস্পর্শে চীনারা আসতেন, তারা সেগুলোকে শ্রেণিবিন্যস্ত করতে ভালোবাসতেন। অথবা, দেশে যে নতুন ধর্মগুলো তারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেগুলো থেকে এটি পৃথক করতে হয়তো জাপানিরা ভেবেছিলেন এই পবিত্র আত্মপূর্ণ দেশটির প্রতি যে ভালোবাসা তারা অনুভব করেন, সেটি সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে এমন একটি নাম তাদের প্রয়োজন। সুতরাং তারা এটির নাম দিয়েছিলেন ‘শিন্টো’, ‘শিন’ মানে দেবতারা, ঘেটা এসেছে তাওবাদের শব্দ, পথ বা উপায় থেকে। শিনের টাও। দেবতাদের পথ, শিন্টো। ভালোবাসা’ শব্দটিও এটি ভালোভাবে প্রকাশ করার জন্যে যথেষ্ট ছিল।

শিন্টো ধারণাটি দ্বারা মুগ্ধ হতে, যে দেবতারা আদিম কাদা ঘেঁটে নিপ্পনের দ্বীপগুলো সৃষ্টি করেছিলেন, তাদের বিশ্বাস করার কোনো প্রয়োজন নেই। এটি পৃথিবীর মধ্যদিয়েই আরো গভীরতর কিছু দেখে, কখনো খুব সূক্ষ্মভাবে সৃষ্ট মর্মস্পর্শী চিত্রকর্ম দেখলে যা অনুভব করে, এটি তা প্রকাশ করে। সাধারণত পৃথিবীর প্রতি এর ভালোবাসা উদ্যাপনের জন্যে এর যা দরকার সেটি হচ্ছে হাইকুর মাত্র তিনটি পঙক্তি।

গ্রীষ্মে একটি নদী অতিক্রম করছি
কত সুখকর,
হাতে স্যান্ডেলগুলো নিয়ে!

১৭. ধর্ম যখন ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছিল

মানব-ইতিহাসে ধর্ম বহু উদ্দেশ্যপূরণে সহযোগিতা করেছে। আধুনিক বিজ্ঞান সৃষ্টিরহস্য ব্যাখ্যা করার আগে, ধর্মীয় স্বপ্নদ্রষ্টারা তাদের ব্যাখ্যাগুলো প্রস্তাব করেছিলেন, তার কয়েকটি আমরা ইতিমধ্যে খানিকটা আলোচনা করেছি। কিন্তু কীভাবে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল সেটি ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা ছাড়াও, ধর্ম ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে কেন’ এটি যেভাবে আছে সেভাবে সংগঠিত হয়েছে। যদি প্রশ্ন করা হয়, মানুষ কেন এই গ্রহের প্রাধান্য বিস্তারকারী প্রজাতি এবং এটি নিয়ে যা খুশি তারা তাই করেছে, বাইবেল তাদের বলেছে, এর কারণ হচ্ছে ঈশ্বরই এই সবকিছু ঠিক এভাবেই সাজিয়েছেন। ঈশ্বরই আমাদের এই পৃথিবীর দায়িত্বে স্থাপন করেছেন এবং এটি জয় আর নিয়ন্ত্রণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছে কেন চামড়ার রঙের নানা মাত্রার ওপর ভিত্তি করে মানবতাকে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভাজিত করা হয়েছে, হিন্দুশাস্ত্র উত্তর দিয়েছে, এই মহাবিশ্বের নেপথ্যে বিরাজমান বুদ্ধিমত্তা একটি উদ্দেশ্যে সবকিছুই এভাবে সাজিয়েছেন। এটি হচ্ছে কার্মা।

এই উত্তরগুলো পরিস্থিতি আসলে কেমন শুধুমাত্র সেটি বলছে না, এছাড়াও আমাদের এইসব কিছু মেনে নিতেও নির্দেশ দিয়েছে। পৃথিবী যেভাবে সংগঠিত, সেটি যথার্থ দাবি করে সেখানে এটি স্বর্গীয় অনুমোদনের সিলমোহরও বসিয়ে দিয়েছে : এভাবেই স্বয়ং ঈশ্বরই সব পরিকল্পনা করেছেন। আর সে-কারণেই এই জীবনে তাদের ভাগ্যকে মেনে নিতে মানুষকে প্ররোচিত করতে ধর্ম খুবই দক্ষ, সেই ভাগ্যটি যতই দুর্বিষহ হোক না কেন, বিশেষ করে যখন এটি তাদের এই জন্মের পরবর্তী জন্মে, অথবা পরবর্তী জন্মেরও পরবর্তী জন্মে, আরো উত্তম কোনো জীবন পাবার আশা দেয়।

এবং এছাড়াও সমাজের আরোপিত নিয়মনীতিগুলো যেন মানুষ মেনে নেয়, সেটি নিশ্চিত করতেও ধর্ম দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আপনি যদি চান সবাই পরস্পরের সাথে সৌহাদ্যপূর্ণ সংহতির সাথে বসবাস করবেন, তাহলে তাদের একগুচ্ছ রীতিনীতি আর আচার থাকতে হবে, যা তারা সবাই মেনে চলবেন– একটি নৈতিকতা’। মিথ্যা কথা না বলা, চুরি না করা, হত্যা না করা। এইসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মাধ্যমে যে-কোনো বুদ্ধিমান সমাজ নিজেকে রক্ষা করে।

আর ধর্মের ভূমিকা হচ্ছে এই আইনগুলোকে আরো দৃঢ়তর করে তোলা, আর। সমর্থন করা, এমন কিছু দাবি করে যে, এই আইনগুলো মানব-সৃষ্ট নয়, এগুলো। স্বয়ং ঈশ্বরের নির্দেশ। লোকালয় থেকে দূরে মরুভূমিতে ইজরায়েলাইটরা কিন্তু সেই টেন কমান্ডমেন্ট (দশটি নির্দেশ) তাদের স্বপ্নে আবিষ্কার করেননি। এটি তাদের ওপর আরোপ করেছিলেন স্বয়ং ঈশ্বর। সুতরাং ইতিহাসে ধর্মের আরেকটি বড় ভূমিকা ছিল : নৈতিকতার অভিভাবক।

এখন অবশ্যই আমাদের একটি পরিবর্তনের দিকে নজর দিতে হবে, যখন। ধর্ম আরো ব্যক্তিগত একটি দিকে মোড় নিতে শুরু করেছিল। গোষ্ঠীগত একটি কর্মকাণ্ড আর মানবসমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি উপায় ছাড়াও, ধর্ম ব্যক্তি’ পর্যায়ে পরিত্রাণের (সালভেশন) প্রতিশ্রুতি দিতে শুরু করেছিল। সালভেশন’ (পাপ ও পাপের পরিণাম থেকে পরিত্রাণ) শব্দটির উৎস ল্যাটিন, যার অর্থ স্বাস্থ্য, একটি স্মারক যে মানুষ প্রায়শই অসুস্থতা আর দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হতো। এই জীবনে তারা সুখ কিংবা ভালো অনুভব করতেন না, এমনকি নিজেদের নিজেদের সাথেও তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধও করতেন না। আর পরবর্তী জীবনে তাদের জন্যে কী অপেক্ষা করছে সেটি নিয়েই তারা দুশ্চিন্তা করতেন। যখন ধর্ম আরো বেশি ব্যক্তিগত দিকে মোড় নিয়েছিল, এটি তাদের অস্থির জীবনে এমন প্রশান্তি নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল যে, বিশ্বাসীরা এই অভিজ্ঞতাটি মরে যাওয়া এবং আবার জন্ম নেওয়া, অন্ধ হওয়া এবং আবার দেখতে পাওয়া, পক্ষাঘাগ্রস্ত হয়ে পঙ্গু হওয়া এবং আবার হাঁটতে পারার মতো অলৌকিক কোনো অভিজ্ঞতার সাথে। তুলনা করে বর্ণনা করতে শুরু করেছিলেন। ধারণা করা হয় বিচিত্র ধর্মগুলোর পারস্পরিক সম্মিলন মূলত এই পরিবর্তনগুলোর সূচনা করেছিল।

আর এটিকে যতই অসম্ভাব্য মনে করা হোক না কেন, মূলত রোমসাম্রাজ্যের সৈন্যরাই এই পরিবর্তনের দিকে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দিয়েছিলেন। কমন এরা শুরু হবার ত্রিশ বছর আগেই, রোমের সংস্কৃতি পারস্য আর গ্রিক সংস্কৃতির প্রভাবে অভিভূত হয়েছিল। রাজনৈতিকভাবে রোমানরা বিজয়ীপক্ষ ছিল, কিন্তু তারা যে দেশগুলো দখল করেছিল সেখানকার সংস্কৃতি তারা এত বেশিমাত্রায় আত্তীকৃত করেছিলেন যে, পরিশেষে কখনো কখনো বলা কঠিন হয়ে পড়ে, এখানে আসলে বিজয়ী কারা। গ্রিক আর পারস্যের প্রজাদের কাছে শোনা পুরাণকাহিনি তাদের এতই পছন্দ হয়েছিল, তাদের জীবনে তারা সেগুলোকে এমনভাবে গ্রহণ করেছিলেন যে, সেটি ধর্মের ভবিষ্যতের ওপর গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রভাব ফেলেছিল।

ঠিক যেভাবে চীনারা বৌদ্ধবাদকে, তারা যেভাবে সবকিছু করেন এবং তাদের জীবনের সাথে সংগতিপূর্ণ করে নিয়েছিলেন, সেভাবে রোমানরা গ্রিক পুরাণকে আত্তীকৃত করে নিয়েছিল তাদের সংস্কৃতিতে। রোমানরা খুব প্রয়োগবুদ্ধিসম্পন্ন একটি জাতি ছিলেন, কর্মপাগল মানুষ। সুতরাং তারা এইসব প্রাচীন পুরাণগুলোকে। নিয়ে এটিকে রূপান্তরিত করেছিল, যা আমরা এখন বলব, রোল প্লে’ বা সেই ভূমিকায় অভিনয় করা। এই গল্পগুলোর চরিত্র অনুযায়ী কাজ করার মাধ্যমে তাদের নিজেদের জীবন বদলে গিয়েছিল। এটি প্রাচীন কোনো পুরাণকে বিশ্বাস করার উদাহরণ ছিল না, যা তারা গ্রিকধর্ম থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। বরং আবেগীয় আর মনোজাগতিক একটি অভিজ্ঞতায় সেগুলো রূপান্তরিত করাই তাদের জন্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কিন্তু গ্রিকদের একটি ধর্ম ‘ছিল’ এমন কিছু ভাবলে আসলে ভুল হবে, যেমন, ইহুদিদের ছিল জুডাইজম বা পারস্যের অধিবাসীদের ছিল জরাথুস্ট্রবাদ।

তাদের ধর্মটি জাপানিদের শিন্টোর সাথে যেমন সম্পর্ক ছিল সেরকমই ছিল, রোমানদের সাথে যতটা সদৃশ্যতা ছিল তারচেয়েও বেশি। অবশ্যই তারা বহুঈশ্বরবাদী ছিলেন, কিন্তু তাদের দেবতারা ভূখণ্ডের অংশও ছিল, যেমন, তাদের পর্বত, সাগর আর সূর্য, যা তাদের উপর উজ্জ্বল আলো ছড়াত। আর দেবতারা তাদের কাজ করতেন অনেকটাই আবহাওয়া যেমনটা কাজ করে। এবং আবহাওয়ার মতোই দেবতারা শান্ত আর অনুকূল যেমন হতে পারতেন, আবার বিপজ্জনক ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারতেন। আর ঠিক এভাবেই সবকিছু ছিল। একজন প্রধান দেবতা ছিলেন, যার নাম জিউস, আকাশের দেবতা, যার দুইজন ভাই ছিলেন, সাগরের দেবতা পসাইডন আর পাতাল নরকের দেবতা হেডিস, যেখানে মৃতদের বাস। এছাড়াও বহুসংখ্যক অন্য দেবতারাও ছিলেন, তাদের কেউ কেউ প্রকৃতির নিয়মিত নানা কর্মকাণ্ডের ছন্দের সাথে যুক্ত ছিলেন। পুরাণের এই বিশাল ভাণ্ডার থেকে একটি গল্প, স্বর্গীয় একটি অভিযানের কাহিনি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হয়েছিল রোমান সাম্রাজ্যে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল।

এই গল্পটি শুরু হয়েছিল প্রকৃতি-সংক্রান্ত একটি পুরাণ দিয়ে, কিন্তু যখন রোমানরা এটি সংগ্রহ করেছিল, তারা এটিকে একটি ধর্মে রূপান্তরিত করেছিল, যাকে আমরা রহস্যময় ধর্ম’ বলতে পারি, একগুচ্ছ গোপন আচার আর অনুশীলন, যা এর অনুসারীদের হৃদয়ে গভীর আবেগপূর্ণ একটি অভিজ্ঞতার উদ্রেক করতে সক্ষম হয়েছিল। হেডিসের গ্রিক পুরাণে, যিনি পাতালপুরীর দেবতা ছিলেন, মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন একজন স্ত্রীর জন্যে, যিনি কিনা তার সাথে তার বিষণ্ণ পাতালপুরীতে বাস করবেন। সুতরাং তিনি পার্সিফোনকে অপহরণ করেছিলেন, পার্সিফোন ছিলেন ডেমেটারের মেয়ে, যিনি ছিলেন ফল, শস্য আর বৃক্ষের দেবী। মেয়েকে হারিয়ে তিনি এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন, সব দায়িত্ব অবহেলা করে তিনি। গভীর একটি শোকে প্রবেশ করেছিলেন। পরিণতিতে খাদ্যশস্যের ফলন হয়নি, গাছ থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল ফল, দুর্ভিক্ষ আর মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে গিয়েছিল। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে জিউস নিজেই হস্তক্ষেপ করেন এবং দুই পক্ষ যা চেয়েছিলেন তার অর্ধেকটা নিশ্চিত করে তিনি তাদের একটি সমঝোতায় নিয়ে আসেন। পার্সিফোন পৃথিবীর উপরে অর্ধবর্ষ কাটাবেন, আর বাকি অর্ধেক বছর। পাতালপুরীতে সে তার বিরক্তিকর স্বামীর সাথে কাটাবেন। যখন গ্রীষ্ম শেষ হবে, পাতালপুরীতে তার জন্য নির্দিষ্ট সময় কাটাতে তিনি হেডিসের কাছে যাবেন, তার মা ডেমেটার তখন আবার তার অনুপস্থিতির জন্যে শোক করবেন। শীত নামবে তখন, কোনোকিছুই জন্মাবে না। পাতা পড়ে যাবে গাছ থেকে, শস্যক্ষেত খালি থাকবে। কিন্তু বসন্তে পার্সিফোন আবার পৃথিবীর উপরে উঠে আসবেন, তার প্রত্যাবর্তনে মা ডেমেটার আনন্দিত হবেন, আর আবার সবকিছু তাদের জীবন ফিরে পাবে।

প্রকৃতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তনগুলো ব্যাখ্যা করতে কীভাবে একটি পুরাণ সৃষ্টি করে নেওয়া যেতে পারে এটি তার সুন্দর একটি উদাহরণ, সেটি একই সাথে মানবজীবনের উত্থান আর পতনের বিষয়টি প্রকাশ করতেও ব্যবহার করা যেতে পারে। মানব অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা, আর পুনরায় সেটি ফিরে পাওয়া, ব্যর্থতা আর সফলতা, মৃত্যু আর পুনর্জন্মের একটি ছন্দ আছে। একটি মরে-যাওয়া আর নতুন করে জেগেওঠা দেবতার ধারণাটি মানুষের আত্মার গভীরে একটি প্রয়োজনীয়তার সাথে সংগতিপূর্ণ হয়েছিল। এই কাহিনিটির আর এর অর্থ অনুসন্ধান করার জন্য আচারগুলো রোমসাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি রহস্যময় ধর্মে রূপান্তরিত হয়েছিল। রহস্য বা মিস্ট্র’ শব্দটি এসেছে একটি গ্রিকশব্দ থকে, যার অর্থ নীরব থাকা অথবা নিজের মুখ বন্ধ করে রাখা, কারণ এই ধর্মের সদস্যরা তাদের পালিত আচার আর উৎসব নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করতেন।

কমন এরা শুরু হবার প্রায় ১৪০০ বছর আগে এই কাল্ট বা গোপন ধর্মীয় গোষ্ঠীটির উদ্ভব হয়েছিল এথেন্সের কাছে এলেউসিসে, একটি ছুটির উৎসবকে কেন্দ্র করে, যেদিন পৃথিবীর মানুষকে ফল উপহার দেবার জন্যে দেবী ডেমেটারকে উপাসনা করা হতো। কিন্তু রোমসাম্রাজ্যে এর আচারে আবৃত রূপটি পরিচিত ছিল এলেউসিনিয়ান কাল্ট নামে, ব্যক্তিক পর্যায়ের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার ওপর এর মতাদর্শের মূল তাগাদাটি ছিল, যারা দেবতার মৃত্যু আর তার পুনরায় জেগে ওঠার রহস্যটিকে গভীরভাবে অনুভব করতেন। এই কাল্টে যে-ব্যক্তিকে সদস্য করে নেওয়া হতো, তার একটি কমিউনিয়ন বা সংযোগ করতে হতো দেবীর সাথে এবং তাকে তার মৃত্যুর সেই শীতকাল এবং বসন্তে পুনর্জাগরণ অনুভব করতে হতো, আর এটি অর্জন করা হতো ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে, যা প্রথমে কোনো অন্ধকার এলাকায় নেমে যাওয়া, তারপর আবার নতুন দিনের আলো বা নতুন জীবনে ফিরে আসার অভিজ্ঞতাটি অনুকরণ করত। মূলত আবেগের ওপরে এই আচারের আবেদন ছিল। এটি এমন কিছু না যে তারা সেটি ‘শিখেছিল’, এটি ছিল এমন কিছু যা তারা অনুভব করতেন। আর এই কমিউনিয়নের অভিজ্ঞতাটি তাদের মধ্যে একটি পরিবর্তনের সূচনা করত। মনে রাখতে হবে : এই সবকিছুই মানুষের মনের ভিতরে ঘটত। আর আমরা জানি মন খুবই অদ্ভুত একটি জায়গা। এখানে স্বর্গ আর নরক, উচ্চতা আর গভীরতা, অন্ধকার আর আলো থাকে। এলেউসিনিয়ানদের যাজকরা মানব-মন বিষয়ে খুবই দক্ষ ছিলেন। তারা জানতেন কীভাবে তাদের অনুসারীদের নানা নাটকীয়তার মধ্যে দিয়ে পরিত্রাণের সূর্যালোকিত প্রান্তরে নিয়ে আসতে হয়।

ডেমেটার আর পার্সিফোনের মতো শুধুমাত্র গ্রিকদেবতারাই রোমসাম্রাজ্যে। রহস্যময় ধর্মগুলোয় তাদের নতুন জীবন খুঁজে পাননি, পারস্য থেকে একজন প্রাচীন জরথুস্ত্রীয় দেবতা, মিথরাস আরেকটি রোমান ধর্মীয় কাল্টের কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন। গুহায় জন্ম নেওয়া মিথরাস ছিলেন একজন সূর্যদেবতা, যিনি একটি পবিত্র ষাঁড়কে হত্যা করেছিলেন, যার রক্তে পৃথিবী আর এর সব প্রাণীদের জন্ম হয়েছিল। রোমের সৈন্যরা পূর্বে তাদের সামরিক অভিযানের সময় মিথরাসের গল্প শুনেছিলেন। তাদের এর রক্ত আর তরবারির মূলধারণাটি ভালো লেগেছিল। তারা সেই সাহসকে প্রশংসার সাথে দেখেছিলেন, যে-সাহসে ভর করে মিথরাস একাই পবিত্র ষাঁড়কে হত্যা করেছিলেন। এবং তাদের সেই ধারণাটিও পছন্দ হয়েছিল যে, হত্যা এবং রক্তপাত ঘটিয়ে অন্যদের জন্য নতুন আর উত্তম জীবনের উদ্ভব ঘটানো সম্ভব। সুতরাং তারা অনেকেই এই পুরাণটিকে আত্তীকৃত করেছিলেন তাদের নিজেদের লক্ষ্যপূরণে, এবং এটি তাদের প্রিয় একটি রহস্যময় ধর্মীয় গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল।

এলেউসিনিয়ান গোষ্ঠীর চেয়ে মিথরাইজম আরো বেশি রক্তাক্ত ছিল, কিন্তু এদের মূল ধারণা খুব একটা ভিন্ন ছিল না। এটিও নতুন জীবন অভিমুখে দরজা হিসাবে মৃত্যুর উদ্যাপন করত। এর আচারগুলো হতো গোপনে, কোনো গুহায়, এবং শক্তিশালী আবেগীয় অভিজ্ঞতা এর অংশ ছিল। এটিও ‘শেখার বিষয় না, ‘অনুভব’ করতে হতো। এমনি গুহা ভীতিকর একটি জায়গা, সুতরাং এরকম কোনো একটি জায়গায় জমায়েত হবার বিষয়টি এই কাল্টের অনুসারীদের মনে একটি অস্বস্তিকর প্রভাব ফেলত। একজন রোমান-সৈন্য প্রতিদিনই মৃত্যুর মুখোমুখি হতো, সুতরাং কোনো একটি ধর্ম বিসর্জনের উদ্দেশ্য মৃত্যু এবং এর থেকে প্রবাহিত হওয়া নতুন জীবনটিকে, যা নাটকীয়তার মোড়কে উপস্থাপন করত, সেটি নিশ্চয়ই তার ভক্তি আদায় করে নিতে পারত। মিথরাইজম শুধুমাত্র পুরুষদের ধর্ম ছিল। আর এটাই রোমান সেনাবাহিনীর মতো পৌরুষ প্রদর্শনীর একটি সমাজে এই ধর্মটির বিশেষ আবেদনময়তার আরেকটি অংশ ছিল। গোপন আচার আর ব্যক্তিগত ভাষাসহ এই গোপন গোষ্ঠীগুলো এর সদস্যদের নিজেদের বিশেষ কিছু ভাবতে প্ররোচিত করত, যা আর সবার থেকে ভিন্ন এবং অবশ্যই সেরা। আর শুধুমাত্র একটি বিশেষ সমাজের সদস্য হবার বিষয়টি কিছু বিশেষ ধরনের মানুষদের মনে আবেদন রেখেছিল। এইসব আবেদন সৃষ্টির মূল কৌশলগুলো মিথরাইজমের দখলে ছিল।

রোমসাম্রাজ্যে এইসব রহস্যময় ধর্মগোষ্ঠীগুলোর আবির্ভাব ধর্মীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পরিবর্তনের মুহূর্ত ছিল। এর আগে, ধর্ম মূলত ছিল সামাজিক পরিচয়ের সাথে যুক্ত একটি সামষ্টিক কর্মকাণ্ড। কারণ ইহুদিদের জন্যে ধর্ম ছিল, যে-ধর্মে তাদের জন্ম হয়েছে, এবং তার নির্বাচিত জাতি হিসাবে ঈশ্বর যাদের এই ধর্ম অনুসরণ করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাদের নৈতিক দৃঢ়তা, ইহুদি জাতির বাইরে অন্য সমব্যথীদের আকৃষ্ট করত, কিন্তু অন্য ধর্মের সদস্যরা তাদের জন্মের সেই দুর্ঘটনাকে পরিবর্তন করতে পারেন না। হিন্দুধর্ম এমন কিছু যে-ধর্মে আপনার জন্ম হতে হবে, সেই জাতপ্রথা অবধি, যা আজীবন আপনার সাথে যুক্ত হয়ে থাকবে। সেই সময় অবধি এর ব্যতিক্রম ছিল শুধুমাত্র একটি : বৌদ্ধধর্ম। এটি গোষ্ঠীর নিয়তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল এবং একক সদস্যদের পরিত্রাণের জন্যে তাদের কাছে একটি সংস্করণ প্রস্তাব করেছিল। এবং সেই সময় নাগাদ পুরো এশিয়াজুড়ে একটি বিশ্বজনীন ধর্ম হবার পথে ছিল, যে-কোনো জায়গায়, যে কোনো সময়ে, যে-ধর্মটি সবার জন্যে উন্মুক্ত।

একটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, যে-ধর্মগুলো ব্যক্তিগত স্তরে এর অনুসারীদের সহায়তা করে, সেই ধর্মগুলোর দ্রুত বৃদ্ধি এবং বিশ্বজনীন হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল। কারণ, পৃথিবী পূর্ণ এমন বহু মানুষ দিয়ে, যারা পরিত্রাণ খুঁজছেন। আর রহস্যময় এই ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো দেখিয়েছে মানবসমাজে এই প্রবণতা কাজ করছে। বহু ব্যক্তিই সেখানে স্বেচ্ছায় যোগ দেন। আর এটি ‘গোষ্ঠীগত পরিচয় হিসাবে ধর্মধারণাটিতে একটি পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল এবং ব্যক্তিগত ধর্মান্তরিতকরণের ধারণাটি এটিকে প্রতিস্থাপিত করেছিল। আর তাদের অনুসারীদের পরিত্রাণ পাবার আবেগীয় অভিজ্ঞতা দিতে যে-উপায়গুলো এই গোষ্ঠীগুলো ব্যবহার করত, তা বিশেষ একটি ছক সরবরাহ করেছিল, তখনও জন্ম হয়নি এমন বহু ধর্মই, যা পরবর্তীতে অনুকরণ করেছিল। একটি দেবতার ধারণা, যিনি কিনা মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তারপর আবার বেঁচে উঠেছেন, সেটি মানবপ্রকৃতির কোথাও-না কোথাও আবেদন রাখে, বিশেষ করে যদি এটি তাদের নিজেদের সমাধি থেকে বের হয়ে আসার একটি উপায় প্রস্তাব করে।

এইসব নতুন ধারণা আর প্রবণতাগুলো ধর্মের ইতিহাসে তাদের সবচেয়ে শীর্ষ অভিব্যক্তিটিকে স্পর্শ করতে আরো কয়েক শতাব্দী সময় লেগেছিল। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল আর প্রাধান্যবিস্তারকারী ধর্মটির আবির্ভাবের জন্য দৃশ্যপটটি ততদিনে প্রস্তুত হয়েছিল। যখন খ্রিস্টধর্ম এর সবচেয়ে সফলতম পর্বে ছিল, এটি নিজেকে চিহ্নিত করেছিল ক্যাথলিক’ নামে। ‘ক্যাথলিক’ শব্দটি এসেছে গ্রিকভাষা থেকে, এর মানে বিশ্বজনীন’। এবং এর ভিত্তিমূলক বিশ্বাস ছিল একজন ঈশ্বরের মৃত্যু আর আবার তার পুনর্জাগরিত হওয়া। পরের কিছু অধ্যায়ে আমরা সেই বিষয়গুলো অনুসন্ধান করব, কীভাবে এই ধর্মটি, যা খুব ক্ষুদ্র একটি ইহুদি উপগোষ্ঠী হিসাবে এর যাত্রা শুরু করেছিল, সেটি আসলেই পৃথিবীর প্রথম সত্যিকারের বিশ্বজনীন ধর্মে রূপান্তরিত হয়েছিল– ক্যাথলিক চার্চ-আর কীভাবে এটি এর নিজের জন্যে এই খেতাবটি অর্জন করেছিল।

১৮. ধর্মান্তরিত

ধর্মান্তরিত ব্যক্তি ধর্মের নাটকে আরো একটি নিয়মিত বৈশিষ্ট্যসূচক চরিত্র। ‘কনভারসন’ (ধর্মান্তরিতকরণ) শব্দটির মানে উলটো ঘুরে যাওয়া এবং বিপরীত দিকে তাকানো। অধিকাংশ মানুষই জীবদ্দশায় তাদের মতামত পরিবর্তন করেন, কিন্তু সাধারণত সেটি একটি ধীর প্রক্রিয়া, ক্রমশ সময়ের সাথে একটি ধারণা থেকে সরে আসা। কিন্তু ধর্মীয় রূপান্তর কদাচিৎ এমন হয়ে থাকে। ধর্মান্তরিত ব্যক্তি চোখের পলকেই রূপান্তরিত হতে পারেন। খুব দ্রুত তারা সম্পূর্ণভাবে বদলে যেতে পারেন। এটি এতই আকস্মিক একটি ব্যাপার যে, তারা বলেন এটি অনেকটাই আবার নতুন করে জন্ম নেওয়ার মতো একটি ব্যাপার।

এই জন্ম নেওয়ার সাদৃশ্য উদাহরণটি যথাযথ, কারণ এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় প্রসব যতই দ্রুত হোক না কেন, একটি শিশুর ভূমিষ্ঠ হবার উপযোগী হতে সময় লাগে। একই সাথে ধর্মান্তরিত হবার সেই মুহূর্তটি আকস্মিক মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে প্রায়শই এটি দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি, যা আসলেই বহুবছর ধরেই চলমান ছিল। ধর্মান্তরিতের আত্মা বিভাজিত, তারা এমন কিছুর বিরুদ্ধে সগ্রাম করছেন, যার প্রতি তাদের অনুভূত সেই আকর্ষণটি তারা স্বীকার করতে পারেন না। যদি তারা পরাজয় মেনে নেন, এটি তাদের জীবনকে এমন একদিকে নিয়ে যাবে, যা তারা চান না। সুতরাং তারা যুদ্ধ করেন, সেই জিনিসটির বিরুদ্ধে, যে-জিনিসটির কাছে তারা আত্মসমর্পণ করতে কামনা করছেন।

খ্রিস্টধর্মে বহু ধর্মান্তরিতদের মধ্যে যাদের জীবন সম্পূর্ণভাবেই বদলে গিয়েছিল তাদের সাথে যা ঘটেছিল সেই কারণে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন সল নামের একজন ইহুদি ব্যক্তি। সল পরবর্তীতে একজন খ্রিস্টান হয়েছিলেন এবং পল নামে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তার ধর্মান্তরিতকরণের ঘটনাটি এতই বিখ্যাত যে, ঘটনাটি যেখানে ঘটেছিল সেটি, আকস্মিকভাবে মন পরিবর্তন করা বোঝাতে একটি শব্দ-সংকেত হিসাবে আমাদের ভাষায় প্রবেশ করেছে। আমরা যখন জীবনের এমন কোনো মুহূর্তের বর্ণনা দিতে চাই, যখন এটি সম্পূর্ণ বিপরীতে এর দিক পরিবর্তন করেছিল, তখন একটি ‘দামাস্কাস রোড’ অভিজ্ঞতার কথা বলি, কারণ দামাস্কাসগামী রাস্তার উপরেই সল অবশেষে খ্রিস্টধর্মের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন, যে-বিশ্বাসটির অনুসারীদের তিনি নিজেই বহুবছর ধরে নিপীড়ন করে আসছিলেন।

আমরা সঠিকভাবে জানি না সল কখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু ধারণা করা হয় এটি খ্রিস্টযুগ শুরু হবার দ্বিতীয় বছরের শুরুর কোনো একটি সময় ছিল। তার মৃত্যুর সঠিক তারিখ নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের একটি ধারা বলছে ৬২ আর ৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনো একটি সময়, তিনি রোমে তার ধর্মবিশ্বাসের জন্যে শহীদ হয়েছিলেন। আমরা জানি তিনি বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কে অবস্থিত তৎকালীন রোমান প্রদেশ সাইলিসিয়ার একটি শহর টারসাসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আমাদের বলা হয়েছিল, তিনি ছিলেন ইহুদি এবং তার পিতার কাছ থেকেই তিনি রোমের নাগরিকত্ব উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন। সম্ভবত তার রোমান নাম ছিল পল। পেশায় তিনি তাঁবু-নির্মাতা ছিলেন, তবে তিনি শিক্ষিত ছিলেন এবং খুব ভালো গ্রিক পড়তে আর লিখতে পারতেন। তিনি যে চার্চগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই চার্চগুলোর উদ্দেশ্যে লেখা তার চিঠিগুলো সবচেয়ে প্রাচীনতম খ্রিস্টীয় ডকুমেন্ট, যা আমাদের কাছে আছে। সম্ভবত জেরুজালেম শহরের একজন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক গামালিয়েলের তত্ত্বাবধানে তিনি তার শিক্ষার একটি অংশ পেয়েছিলেন। এবং তিনি বলেছিলেন তার এই শিক্ষক ছিলেন একজন ‘ফারিসি’।

নিজেদেরকে যতই ঐক্যবদ্ধ দাবি করুক না কেন, সব ধর্মই হচ্ছে বিভিন্ন দল-উপদলের একটি জোট, যারা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে তাদের বিশ্বাসের প্রতি অনুগত। কখনো খুবই ভিন্ন উপায়ে। সলের সময় জুডাইজম বা ইহুদিবাদও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ধর্মের সবচেয়ে সাধারণ বিভাজনটি মূলত রক্ষণশীল আর প্রগতিশীলদের মধ্যে থাকে। তারা যেহেতু জানেন, তাদের ধর্মটি এসেছে সেই নবীদের কাছ থেকে, যারা ঈশ্বরের কণ্ঠ শুনেছেন, এবং তারপর যিনি তার নির্দেশনাগুলো মানুষকে জানিয়েছিলেন, রক্ষণশীলরা তাদের বিশ্বাসকে মূল ঐশী প্রত্যাদেশের প্রথম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করে রাখেন। কিন্তু প্রগতিশীলরা পরবর্তীতে আসা নতুন ব্যাখ্যা, পরিবর্তন আর ধারণাগুলো গ্রহণ করতে চান। প্রথম শতাব্দীতে জুডাইজমে এইসব পরস্পরবিরোধী প্রবণতাগুলো প্রতিনিধিত্ব করতেন সাডুসি বা রক্ষণশীলরা আর ফারিসি বা প্রগতিশীলরা, সে-দলেরই একজন সদস্য ছিলেন সল।

তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি মূলত ছিল মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের ওপর বিশ্বাস সংক্রান্ত ধারণায়, যে-বিষয়টি ইহুদিবাদের সূচনাপর্বে আলোচনায় আসেনি। আব্রাহামের আবিষ্কার ছিল, শুধুমাত্র একজনই ঈশ্বর আছেন। মোজেসের আবিষ্কার ছিল ঈশ্বরের সেই নির্বাচন আর চুক্তি : ইহুদিরা তার বিশেষভাবে চিহ্নিত জনগোষ্ঠী এবং তার প্রদত্ত আইনগুলোর সংরক্ষক। এটাই ছিল ইহুদিবাদের মূল সার, যার প্রতি সাডুসি বা রক্ষণশীলরা কঠোরভাবে অনুগত ছিলেন। তারা সেই ধারণাগুলোকে অবিশ্বাস করতেন, ব্যাবিলনের নির্বাসিত থাকার সময় যে-ধারণাগুলো তারা আত্তীকৃত করেছিলেন বলে মনে করা হয়, যেমন, মৃতদের পুনর্জন্ম এবং শেষবিচারের দিনে তাদের মধ্যে শাস্তি অথবা পুরস্কার বিতরণ। ব্যাবিলন থেকে আরেকটি আমদানি রক্ষণশীলরা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, সেটি হচ্ছে ফেরেশতাদের অস্তিত্বের ওপর তাদের বিশ্বাস। দাবি করা হয়, ফেরেশতারা ঈশ্বর আর মানবজাতির মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন। পৃথিবীতে তাদের সন্তানদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেবার জন্যে অশরীরী বুদ্ধিমত্তা অথবা অশরীরী মন হিসাবে বর্ণিত ফেরেশতাদের ঈশ্বর ব্যবহার করেন। সাভুসি বা রক্ষণশীলরা ছিল আরেকটি অপ্রয়োজনীয় আমদানি। তার খবর পৌঁছে দেবার জন্যে ঈশ্বরের কোনো বার্তাবাহকের দরকার নেই। তিনি ইতিমধ্যে সর্বত্র বিরাজমান এবং তাদের নিশ্বাসের চেয়েও যিনি আরো বেশি তাদের নিকটবর্তী।

তবে ফারিসিরা বিষয়টি এভাবে দেখেননি। তারা প্রগতিশীল ছিলেন, ঈশ্বর তার অস্তিত্বের রহস্যময়তা আর তার পৃথিবী-সংক্রান্ত উদ্দেশ্যগুলো নিয়ে তার সন্তানদের শিক্ষা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন এমন প্রস্তাবনাটি তারা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কেন? তারা প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, কেন তাদের বিশ্বাস করা উচিত হবে, ঈশ্বর তার নির্বাচিত মানুষগুলোকে যা জানাবার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, শতবছর আগেই তিনি সেইসব জ্ঞান বিতরণ করার কাজটি শেষ করে ফেলেছেন? তাহলে তিনি কি একজন জীবন্ত ঈশ্বর নন, যিনি এখনও নতুন নবীকে আহ্বান করতে সক্ষম, যাকে তিনি তার মানুষদের জানাতেন নতুন সত্য শিক্ষা দিতে পারেন?নবী ডানিয়েল কি তাদের বলেননি যে, ঈশ্বর ইজরায়েলের সুরক্ষার দায়িত্ব দিয়েছেন ফেরেশতা মাইকেলকে এবং তাদের জন্য অভূতপূর্ব। একটি খারাপ সময়ের পর, তারা মুক্তি পাবেন, এবং মৃতরা তাদের কবর থেকে জেগে উঠবে, কেউ অনন্ত জীবনে আর কেউ অনন্ত লজ্জায়? এবং রোমানদের শাসনের অধীনে যে দুর্দশার অভিজ্ঞতা তাদের হচ্ছে, সেটাই কি ডানিয়েলের বর্ণনার সাথে মিলে যাচ্ছে না? তারা কি সবাই ডানিয়েলের প্রতিশ্রুত চূড়ান্ত সমাপ্তি আর পৃথিবীতে এইসব ঘটনাগুলো ঘটাতে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী একজন ‘মেসাইয়া’র আগমনের জন্য অপেক্ষা করছেন না?

ইজরায়েলে তখন সময়টি ছিল ধর্মীয় আর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। জেরুজালেম বহু গোষ্ঠীর মানুষ দিয়ে অতিমাত্রায় জনবহুল হয়েছিল, যারা সেই মানুষটিকে খুঁজছিলেন, যিনি সেই মেসাইয়ার যুগটি তাদের পরিত্রাণের উদ্দেশ্য নিয়ে আসবেন। কিন্তু সবার প্রতিশ্রুত মেসাইয়া হিসাবে দাবি করা এমন কারোর জন্য সেখানে একটি ত্রিমুখী বিপদ অপেক্ষা করেছিল। তখন ইসরায়েল শাসন করছিল রোমসাম্রাজ্যের খুবই অধৈর্য একগুচ্ছ কর্মকর্তা, যারা বিদ্রোহের সামান্যতম সম্ভাবনা খুব নিষ্ঠুরভাবে দমন করতে প্রস্তুত ছিলেন। অন্তত তাদের কাছে এই মেসাইয়া হচ্ছে রোমশাসনের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহীর পোশাকি নাম। এবং তারা জানতেন কীভাবে বিদ্রোহীদের দমন করতে হয়।

আর যে যাজক-পুরোহিতরা মূল মন্দিরটি পরিচালনা করতেন, তারাও এই প্রতিশ্রুত মেসাইয়া দাবি করা এমন কারোর জন্যে ভীতিকর আরেকটি প্রতিপক্ষ ছিলেন। রোমানদের কাছে তিনি হয়তো রাজনৈতিক বিদ্রোহী হতে পারেন, কিন্তু ইহুদি পুরোহিতদের কাছে তারা ছিলেন ঈশ্বরবিরোধী একজন ধর্মদ্রোহী, যিনি ঈশ্বরের ইচ্ছা কী সেই বিষয়ে তাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। এবং তারা জানতেন কীভাবে ধর্মদ্রোহীদের শায়েস্তা করতে হয়।

হেরড রাজপরিবারের সদস্যরা, রোম-কর্তৃপক্ষ ইজরায়েলকে চারটি এলাকায় বিভাজিত করে সেগুলো দেখাশুনা করার জন্যে যাদের দায়িত্ব দিয়েছিল, তারাও এই নিজেকে প্রতিশ্রুত দেবতা হিসাবে দাবি করা এমন মেসাইয়ার জন্য সমানভাবে বিপজ্জনক আরেকটি প্রতিপক্ষ ছিলেন। তাদের ক্ষমতার সামান্য অবশিষ্টাংশ আঁকড়ে বেঁচে থাকা এইসব ছোটখাটো রাজপরিবারের সদস্যদের নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্যে এমন কোনো মেসাইয়া অবশ্যই একটি হুমকি ছিল। এবং তাদের জীবনযাত্রার প্রতি হুমকি হতে পারে এমন কাউকে কীভাবে শায়েস্তা করা যায় তারা সেটি জানতেন।

এক পাসওভারের সময় এমনই একজন মেসাইয়া দাবিকৃত ব্যক্তি যিশুকে, ‘ধর্মদ্রোহী’ হিসাবে দণ্ডিত করা ইহুদি মন্দিরের প্রধান পুরোহিত আর ‘অনাকাঙিক্ষত সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা গ্যালিলির শাসক হেরড অ্যান্টিপাসের সমর্থনে রোম কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। কিন্তু সেই সমস্যাটি যিশুখ্রিস্ট বা মেসাইয়া যিশু নামে পরিচিত এই ব্যক্তিটিকে ক্রুশবিদ্ধ করার পরে শেষ হয়ে যায়নি। আর সেই সময়ে এই কাহিনিতে প্রবেশ করেছিলেন সল।

যিশুর অনুসারীরা তার মৃত্যুর পর তাদের মেসাইয়াকে নিয়ে কথা বলা বন্ধ করেননি। বরং তারা আরো সাহসী হয়ে উঠেছিলেন। তারা বলেছিলেন তাদের কাছে প্রমাণ আছে যে, ঈশ্বরই এই মেসাইয়াকে পাঠিয়েছিলেন চূড়ান্ত ইতিহাস পরিসমাপ্তি হবার সেই দিনটির জন্যে ইজরায়েলকে প্রস্তুত করতে। তার মৃত্যুর পর, তিনি তাদের কাছে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন এলাকায় ‘আবির্ভূত হয়েছিলেন, এবং তিনি তাদের একতাবদ্ধ থাকতে এবং তার শেষ চূড়ান্ত আগমনের জন্যে অপেক্ষা করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। এটি সেই মন্দিরের ইহুদি যাজকদের ভীষণ ক্ষুব্ধ করেছিল, তারা ভেবেছিলেন যিশুকে হত্যা করার মাধ্যমে এই বিপজ্জনক সমস্যাটিকে চিরকালের জন্যে তারা উৎপাটন করতে পেরেছেন। সুতরাং মন্দির পুলিশের একটি বিশেষ শাখার নেতৃত্ব দেবার জন্য তারা সল দ্য ফারিসিকে নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন তিনি আরো বড় কোনো ঝামেলা সৃষ্টি করার আগেই এই তথাকথিত খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের আটক করতে খুঁজে বের করেন। এমন কাজের জন্যে সল মরিয়া হয়ে অপেক্ষায় ছিলেন, এবং তিনি অতি উৎসাহের সাথে খ্রিস্টান-নিপীড়নে নেমে পড়েছিলেন।

এই সময়ে তার একটি বর্ণনা আমাদের কাছে আছে। তিনি আকারে ছোটখাটো ছিলেন, তার মাথায় টাক ছিল, পা দুটি খানিকটা ধনুকের মতো বাঁকা ছিল। তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, শারীরিকভাবে তিনি অনাকর্ষণীয় ছিলেন। কিন্তু তার মধ্যে বিশেষ কিছু একটা ছিল। আর তার চোখে সেটি দেখা যেত। তীব্র আবেগময় কোনো অনুসন্ধানীর গভীরতা ছিল তার চাহনিতে। অস্থির প্রাণশক্তিতে তিনি বলীয়ান ছিলেন। এবং তিনি বিতর্ক করতে পারতেন। এই সেই মানুষ যিনি এখন খ্রিস্টান-শিকারির ব্যাজ পরে আছেন। কিন্তু স্মরণ করুন, তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল ফারিসি। যখন কিনা রক্ষণশীল সাডুসিরা বিশ্বাস করতেন না। যে, মৃত্যুর পর আবার জীবিত হয়ে কারো ফিরে আসা সম্ভব হতে পারে, সুতরাং খ্রিস্টানদের এই দাবি উদ্ভট অবাস্তব বলে তারা আগেই প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল খুব স্পষ্ট : কোনো মানুষই মৃত্যুর পর আবার প্রাণ ফিরে পেয়ে উঠে দাঁড়াতে পারে না, আর খ্রিস্টানদের এই মেসাইয়া যিশুও মানুষ ছিলেন, যিশুও মৃত্যুর পর জীবিত ফিরে আসেননি।

তবে ফারিসিরা এভাবে বিষয়টি নিয়ে যুক্তি দেবেন না। তারা বিশ্বাস করতেন সত্যিই একদিন ঈশ্বর শেষবিচারের জন্যে মৃতদের জাগিয়ে তুলবেন। তারা শুধু বিশ্বাস করতে পারেননি যে, তিনি ইতিমধ্যে যিশু-নামক এই ব্যক্তিকে মৃত্যু থেকে

জাগিয়ে তুলেছেন। এবং সলও এমন কিছু বিশ্বাস করতেন না। আর সে-কারণেই। তিনি সেইসব ধর্মদ্রোহীদের পেছনে তাড়া করে খুঁজেছিলেন, যারা এমন কিছু বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তার মনে কি বিষয়টি নিয়ে খানিকটা সংশয় ছিল? আর সে-কারণেই তিনি এত প্রবলভাবে খ্রিস্টান-বিরোধী ছিলেন? সারা দেশ ঘুরে খ্রিস্টানদের তাড়া করে বেড়ানোর অর্থ কি তাহলে তার নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানোরই একটি প্রচেষ্টা ছিল?

এবং আসলেই তিনি দৌড়েছিলেন। তিনি খবর পেয়েছিলেন জেরুজালেম থেকে একশো মাইল উত্তরে দামাস্কাস শহরে যিশুর অনুসারীরা ইতিমধ্যেই অবস্থান করছেন। এরপর তারা কোথায় গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবেন? দামাস্কাসে এদেরকে খুঁজে বের করতে প্রধান-যাজকের কাছে তিনি অনুমতি নিয়েছিলেন। যখন তিনি দামাস্কাসের পথে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ করে খুব উজ্জ্বল একটি আলো তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল, তিনি মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিলেন। তারপর তিনি একটি কণ্ঠ শুনতে পান, যে-কণ্ঠটি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন তুমি আমাকে নির্যাতন করছ?’ আতঙ্কিত পল এর উত্তরে আর্তনাদ করে বলেছিলেন, কে তুমি’? আমি যিশু, যাকে তুমি নির্যাতন করছ’, কণ্ঠটি তাকে বলেছিল। তারপর সেই কণ্ঠটি তাকে উঠে দাঁড়াতে বলেছিল, এবং তাকে দামাস্কাসে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেছিল, পরবর্তীতে তাকে কী করতে হবে সেটি যথাসময়েই জানানো হবে। যখন সল দাঁড়াতে পেরেছিলেন তখন তিনি তার চোখ দিয়ে কিছুই দেখতে পারছিলেন না। তার এই অন্ধত্বকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন মিথ্যা বলে এখনই বাতিল করে দেবেন না, স্মরণ করুন মানুষের মন কী করতে পারে। একটি কথা আছে, তাদের মতো এত অন্ধ আর কেউ নেই, যারা ইচ্ছা করেই কিছু দেখেন না। সলের এই অন্ধত্ব ছিল, এখন যে-বিষয়টি সত্য বলেই তিনি জানেন, সেটিকে দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকার করারই একটি উপসর্গ। তার সহকারীদের সহায়তায় তিনি দামাস্কাসে পৌঁছান, এবং সেখানে তার থাকার জন্যে একটি ঘর ভাড়া করে দেওয়া হয়েছিল। অন্ধ আর সংশয়গ্রস্ত, সেখানে তিনি তিনদিন ছিলেন, যখন তিনি কিছু খেতে বা পান করতেও পারেননি, এরপরে কী হবে তার জন্যই শুধু অপেক্ষা করছিলেন।

যিশুর একজন স্থানীয় অনুসারী আনানিয়াস, সল যে-ঘরে উঠেছিলেন সেখানে তার দেখাশুনা করার জন্যে এসেছিলেন। তার দৃষ্টিশক্তি আবার ফিরে এসেছিল। এবং সাথে সাথেই তিনি একটি বিপজ্জনক কাজ করেছিলেন, তিনি স্থানীয় একটি সিনাগগে যান এবং উপস্থিত প্রার্থনাকারীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করে জানান যে, যিশুই ছিলেন ঈশ্বরের পুত্র, সেই মেসাইয়া, যার জন্যে তারা অপেক্ষা করছেন। তিনি তাদের জানান, এটি তিনি জানতে পেরেছেন কারণ স্বয়ং যিশু তার সামনে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

কল্পনা করুন যিশুর অনুসারীদের ওপর এই ঘটনাটির প্রভাব কেমন ছিল। তাদের সবচেয়ে বড় একজন নির্যাতনকারী, এখন তাদেরই একজন বলে নিজেকে দাবি করছেন। এটি কি তার চালাকির কোনো কৌশল? সল কি তাদের সংগঠনে প্রবেশ করতে চাইছেন ছদ্ম-বিশ্বাসীর পরিচয়ে, যেন এর সদস্যদের চিহ্নিত করতে তার সুবিধা হয়? তারা স্পষ্টতই এই নতুন ধর্মান্তরিতকে নিয়ে বেশ অস্বস্তি অনুভব করেছিলেন।

এরপর তার করণীয় নিয়ে সল নিজেও খুব একটা নিশ্চিত ছিলেন না। তবে তিনি যে-সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেটি তার জন্যে বৈশিষ্ট্যসূচকই ছিল। তাদের বিশ্বাস সম্বন্ধে জানতে ও সদস্য হতে চার্চের নেতাদের মুখাপেক্ষী না হয়ে বরং তিনি একাই আরবের মরুভূমির দিকে চলে গিয়েছিলেন, তার সাথে যা ঘটেছিল সেটি নিয়ে ভাবতে এবং প্রার্থনা করতে। খ্রিস্টীয় ধর্মবিশ্বাসের ওপর তার আর কোনো প্রশিক্ষণের দরকার ছিল না, তিনি ভেবেছিলেন, দামাস্কাস রোডে তার সামনে উপস্থিত হয়ে যিশু তার যা দরকার সবকিছুই তাকে দিয়েছেন। যিশুর এই পুনরুত্থান একটি বার্তা ছিল। সেটি ভালো করে বোঝার চেষ্টা করুন, গুরুত্বপূর্ণ সবকিছুই আপনি বুঝতে পারবেন।

যিশু আন্দোলনের নেতাদের, বা তিনি যেভাবে বলেছিলেন, অন্য নেতাদের সাথে দেখা করতে জেরুজালেমে আসতে সলের আরো তিনবছর সময় লেগেছিল, ততদিনে তিনি পল নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। কারণ তিনিও নিজেকে যিশুর একজন সহচর হিসাবে দাবি করেছেন, অর্থাৎ তার বার্তা ছড়িয়ে দেবার জন্যে যাকে যিশু ‘প্রেরণ’ করেছেন। এবং বিষয়টি নিয়ে সবার মধ্যে দ্বন্দ্ব দ্রুত নিরসন হওয়াই ভালো।

যিশুর ঘনিষ্ঠ অন্য সহচররা ভেবেছিলেন, বিষয়টি বেশ অদ্ভুত নয় কি, এই ভুইফোঁড়, যে কিনা যিশুর সাথে কখনোই সাক্ষাৎ করেননি, এই পৃথিবীতে তার জীবন সম্বন্ধে যিনি কিছুই জানেন না, তারপরও তিনি কিনা যিশুখ্রিস্টের পুনরুত্থানের ঘোষণা প্রচার করছেন? আমরা ঈশ্বরপুত্র যিশুকে চিনতাম, যদিও তিনি আমাদের হতবুদ্ধি করেছিলেন। এভাবে কাউকেই আমরা তার মতো করে এর আগে কখনোই কথা বলতে শুনিনি। তিনি কি সেই মেসাইয়া, আমরা তাঁর কথা শুনে ভেবেছিলাম? সেটি জানতে আমরা তার অনুসারী হয়েছিলাম। কিন্তু আমরা যেমন প্রত্যাশা করেছিলাম তেমন কিছু ঘটেনি।

বেশ, তাহলে এই যিশু নামের মানুষটি কে ছিলেন? আর আসলেই তার সাথে কী ঘটেছিল?

১৯. মেসাইয়া

জিসাস (ইয়েসুস) ক্রাইস্ট বা যিশুখ্রিস্ট সম্বন্ধে প্রথম জানার বিষয়টি হচ্ছে যে খ্রিস্ট বা ক্রাইস্ট তার কোনো পদবী নয়। এটি একটি খেতাব। ‘ক্রিস্টোস’ শব্দটি হচ্ছে ‘মেসাইয়া’ শব্দটির হিব্রু প্রতিশব্দের গ্রিক অনুবাদ। তিনি ছিলেন জিসাস দ্য মেসাইয়াহ বা যিশুখ্রিস্ট। তবে সবাই যেহেতু বিষয়টি নিয়ে একমত ছিলেন না, তার নামটি বেশ বিতর্কিত ছিল, আর সেই বিতর্কটি তাকে তার মৃত্যু অবধি অনুসরণ করেছিল। যখন রোমানরা তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করেছিল, তারা এই নাটকটি অব্যাহত রেখেছিলেন। তার মাথার উপর ক্রুশে একটি পরিহাস-সূচক চিহ্ন খোদাই করে দেওয়া হয়েছিল : ইহুদিদের রাজা, ইয়েসুস নাজারেনাস, রেক্স জুডাইওরাম, নাজারেথের ইয়েসুস (ইহুদিদের রাজা)। তিনি তাদের কাছে শুধুমাত্র ঠাট্টার পাত্র ছিলেন মাত্র, আরেকজন পাগল ইহুদি যে-কিনা পৃথিবী পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছেন।

একেবারে শুরু থেকে তাকে নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত ছিল : কোথা থেকে তিনি এসেছেন, তার পিতামাতা কারা ছিলেন, তিনি নিজে কী, সেটি নিয়ে কী ভাবেন, তার মৃত্যুর পর তার সাথে কী ঘটেছিল। বিতর্ক এখনো চলমান। তাকে নিয়ে বহু হাজার কোটি শব্দ রচনা করা হয়েছে। সবচেয়ে প্রাচীনতমটি আছে খ্রিস্টীয় বাইবেল বা নিউ টেস্টামেন্টে (নতুন নিয়ম), নামটি এভাবে দেওয়া হয়েছিল ইহুদি বাইবেল বা ওল্ড টেস্টামেন্ট (পুরাতন নিয়ম) থেকে এটিকে পৃথক করতে। আর এই পার্থক্যটি ইঙ্গিত দেয় কীভাবে তার প্রথম অনুসারীরা তাকে দেখেছিলেন। তাদের কাছে তিনি কোনো নতুন ধর্ম শুরু করতে আসেননি, তিনি ইহুদিদের পুরনো ধর্মটিকে পূর্ণ করতে এসেছিলেন। ঈশ্বর আব্রাহাম আর মোজেসকে আহ্বান করেছিলেন প্রথম অঙ্গীকার বা টেস্টামেন্ট বা নিয়মটি প্রতিষ্ঠা করতে। এরপর তিনি যিশুকে একটি নতুন অঙ্গীকারপত্র প্রতিষ্ঠা করতে এবং সেটাকেই মেসিয়ার যুগে সম্পূর্ণতার চূড়ান্ত সীমানায় নিয়ে যাবার জন্যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

তার জীবন সম্বন্ধে জানতে হলে আমাদের নিউ টেস্টামেন্টের আশ্রয় নিতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যেভাবে এটি সংকলিত আর সংগঠিত করা হয়েছে সেটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এটি শুরু হয়েছিল চারটি বই দিয়ে, যাদের বলা হয় ‘গসপেল’, যে-শব্দটির অর্থ শুভসংবাদ বা সুসমাচার। আর এই গসপেলগুলোর ধারাবাহিক ক্রমবিন্যাস হচ্ছে এরকম : ম্যাথিউ বা মথি, মার্ক, লুক এবং তারপর জন অনুসারে সুসমাচার (মথি, মার্ক, লুক ও জনের লেখা নতুন নিয়মের চারটি শাস্ত্রীয় সুসমাচার)। তারপরে আরেকটি বই, যার নাম ‘দ্য অ্যাক্টস অব দ্য আপোস্টোলস’, এরপরে আছে বেশকিছু চিঠি, যেগুলোর অধিকাংশেরই লেখক ছিলেন পল, ধর্মান্তরিত যে-ব্যক্তির সাথে আগের অধ্যায়ে আমাদের দেখা হয়েছিল। বেশ, তাহলে কেন আমি আগের অধ্যায়টি ম্যাথিউ’র লেখা দিয়ে শুরু করিনি, খ্রিস্টীয় বাইবেলে যা হচ্ছে প্রথম লিখিত অংশ?

কারণ এটি প্রথম লেখা নয়। প্রথম বা সবচেয়ে পুরনো যে লেখার বিষয়ে আমরা নিশ্চিত, সেটি হচ্ছে একটি চিঠি, ৫৫ খ্রিস্টাব্দে, যিশুর মৃত্যুর পঁচিশ বছর পরে যে-চিঠিটি পল গ্রিক শহর করিন্থের নতুন খ্রিস্টান ধর্মান্তরিতদের উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন। এখানে যিশুর জীবনে কী ঘটেছিল সেটি নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখানো হয়নি, শুধুমাত্র তার মৃত্যুর পর তার সাথে কী ঘটেছিল সেটি ছাড়া। এর বার্তাটি ছিল, মৃত্যু তাকে শেষ করে দেয়নি। এটি তাকে নিয়ে গেছে ঈশ্বররূপে তার একটি নতুন জীবনে, যেখান থেকে এই পৃথিবীতে তার ফেলে-যাওয়া সহচরদের সাথে তিনি যোগাযোগ রাখতে সক্ষম। পল বহুশত মানুষের একটি তালিকা করেছিলেন, মৃত্যুর পর যিশু যাদের সামনে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যার মধ্যে অবশ্যই দামাস্কাসের পথে তার নিজের অভিজ্ঞতাটিও ছিল।

সুতরাং নিউ টেস্টামেন্ট প্রথমেই যিশুখ্রিস্ট সম্বন্ধে আমাদের যা জানায়, সেটি হচ্ছে মৃত্যু তাকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়নি। তার আবির্ভাবগুলোই প্রমাণ করেছে যে, মৃত্যু তার জন্যে কোনো পরিসমাপ্তি ছিল না। এটি ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত নতুন যুগের একটি সূচনা ছিল মাত্র, পৃথিবীতে নতুন একটি রাজত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঈশ্বরের অভিযানের প্রথম পদক্ষেপ। এবং যিশুর অনুসারীদের জন্যেও তাদের মৃত্যুই চূড়ান্ত পরিণতি হবে না। যদি তারা মারা যান, তারাও তাদের মৃত্যুর পর একটি নতুন জীবন অর্জন করবেন। তাদের এমনকি নাও মরতে হতে পারে। যিশুর পুনরুত্থান প্রমাণ করেছে যে, অবশেষে ঈশ্বর দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। ঈশ্বরের ক্রটিহীন নতুন রাজ্য, যার বর্ণনা যিশু দিয়েছেন, সেটি খুব শীঘ্রই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এবং তখন সবকিছুই বদলে যাবে। এমনকি মৃত্যুও।

৫৫ খ্রিস্টাব্দে করিন্থবাসীদের উদ্দেশ্যে লেখা পলের সেই চিঠিতে আমরা প্রথম যিশুর একটি চিত্র দেখতে পাই। এটি তার মৃত্যুপরবর্তী সময়ে কী ঘটেছে, শুধু সেই সময়টাকেই বর্ণনা করেছিল। তবে তার আগের জীবন সম্বন্ধে জানতে হলে আমাদের গসপেলের কাহিনিতে প্রবেশ করতে হবে, যেগুলো লেখা হয়েছিল আরো পরে। প্রথম যেটি লেখা হয়েছে সেটি লিখেছিলেন মার্ক, ৬০ খ্রিস্টাব্দের শেষে অথবা ৭০ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে। ম্যাথিউ আর লুকের সুসমাচার এসেছে ৮০ আর ৯০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোনো সময়ে। আর জনের শেষ সুসমাচার লেখা হয়েছিল ১০০ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে কোনো একটি সময়ে। এই সময়গুলো লক্ষ করা দরকার। আপনি সময়ের হিসাবে যতই কোনো একজন নবীর জীবনকালের সময় থেকে বেশি দূরে চলে যাবেন, ততই তার কাহিনিতে নানা বাড়তি বিষয় যুক্ত হবে, এটি আরো বেশি বানানো আর অলংকৃত হয়ে উঠতে থাকে। যিশুর সাথেও এমনই ঘটেছিল। আমি সেই বিতর্কে প্রবেশ করতে চাই না। যে, তিনি কোথায় এবং কত সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, ঠিক কীভাবে মৃত্যুর পর তার পুনরুত্থানের ঘটনাটি ঘটেছিল। অথবা ঠিক কয়জন ফেরেশতা বেথলেহেমে তার জন্মের সময় আর জেরুসালেমে তার পুনরুত্থানের সময় উপস্থিত ছিলেন। আমি তার সম্বন্ধে সাধারণভাবে গৃহীত কিছু বাস্তব তথ্যের সাথেই কেবল নিজেকে যুক্ত রাখব। আর বিশ্বাস করানোর জন্য সেগুলো যথেষ্ট পরিমাণে শক্তিশালী।

মার্ক সরাসরি মহাপ্রলয়ের কোনো নাটকের একটি দৃশ্যের সামনে আমাদের হাজির করেছিলেন। একজন বন্যমানুষ, যিনি লোকাস্ট বা পঙ্গপাল আর বন্যমধু খেয়ে বাঁচতেন আর উটের পশমে নির্মিত কাপড় পরিধান করতেন, একদিন মরুভূমি থেকে বাইরে এসে তিনি ধর্ম প্রচার করতে শুরু করেছিলেন। তাকে তারা। নাম দিয়েছিলেন জন দ্য ব্যাপটাইজার’, কারণ তিনি মানুষকে জর্ডান নদীর পানিতে নিমজ্জিত করতেন, পাপের জন্যে যারা অনুতপ্ত ও একটি নতুন সূচনা চান। তারই একটি চিহ্ন হিসাবে। তারা তাদের ফেলে-আসা জীবনটি পানিতে নিমজ্জিত করে, নতুন জীবনে ভেসে উঠতেন। জন নিজেকে মেসাইয়া হিসাবে কখনোই দাবি করেননি। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, যিনি আসল মেসাইয়া, তার প্রত্যাবর্তনের পথ প্রস্তুত করতেই তার আগমন। মার্ক তারপর আমাদের জানান, জনের হাতে ব্যাপটাইজ হতে গ্যালিলির নাজারেথ থেকে একজন ব্যক্তি জর্ডানে এসেছিলেন। ইতিহাসে এখানেই আমরা প্রথম যিশুর দেখা পাই। ততদিনে তার বয়স হয়েছিল। ত্রিশ। এরপরে যা ঘটেছিল সেটাই ছিল তার কাহিনির সত্যিকার সূচনা।

যখন জন তাকে পানির নিচে কয়েকটি দীর্ঘ সেকেন্ড নিমজ্জিত করে আবার তাকে পানির উপর টেনে তুলেছিলেন, যিশু চোখ-ধাঁধানো একটি আলো দেখতে পেয়েছিলেন এবং শুনেছিলেন ঈশ্বর তাকে তার প্রিয় ‘পুত্র’ নামে সম্বোধন করছেন। যদিও আমরা নিশ্চিত নই সেটাই সেই বিশেষ মুহূর্ত ছিল কিনা, যখন এই ইয়েসুস বা যিশু জানতে পেরেছিলেন যে, তিনি হচ্ছেন সেই প্রতিশ্রুত মেসাইয়া। তবে অবশ্যই সেই মুহূর্ত থেকে তার লক্ষ্য বাস্তবায়নের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল। আবার স্মরণ করে দেখুন, নবীরা আসলে কী করে থাকেন। তারা একটি কণ্ঠ শোনেন যখন ঈশ্বর তাদের সাথে কথা বলেন এবং তারা বাকি সবাইকে তারা যা কিছু শুনেছিলেন সেটি জানান। আর অপরপক্ষের সাথে এটাই তাদের সাংঘর্ষিক একটি অবস্থানে নিয়ে আসে, যারা দাবি করেন ঈশ্বর সম্বন্ধে ইতিমধ্যে যা কিছু জানার আছে তার সবকিছুই তারা জানেন। তারা হলেন ধর্মবিশেষজ্ঞ। গ্যালিলির গ্রামের কোনো এক ছেলের কাছ থেকে তারা এ বিষয়ে শিক্ষা নেবার কথা ভাবতেই পারেন না। যিশু আর ইহুদিবাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিদের মধ্যে সংঘর্ষের তিনটি অবস্থান আমাদের এইসব ক্ষমতাবান গোষ্ঠীগুলো সম্বন্ধে যা কিছু জানা প্রয়োজন সবই জানাচ্ছে, যারা তাকে তার মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

প্রথমটি আমরা পাই মার্কের সুসমাচারে। তিনি আমাদের বলেন তার ব্যাপটিজম শেষ হবার পর তিনি দরিদ্র আর অসহায়দের মধ্যে তার ধর্ম প্রচার করতে শুরু করেছিলেন। পাপের দণ্ড হিসাবে দুঃখ পাবার শাস্তির ধারণাটি তাকে ক্ষুব্ধ করেছিল এবং সেইসাথে এই দুঃখভোগের বাস্তব বিষয়টিও তাকে বিচলিত করেছিল। তার মতে, এই দুর্দশার কারণ ঈশ্বর যেভাবে পৃথিবী বিন্যাস করেছেন সেটি নয়, বরং এর কারণ হচ্ছে ধর্ম আর রাজনীতির ক্ষমতাবানরা যেভাবে সবকিছুকে একটি সাংগঠনিক রূপ দিয়েছেন। তারা এই পৃথিবীকে নিয়ে যা কিছু করেছেন সেটি ঈশ্বর ঘৃণা করেন, আর সে-কারণেই তিনি যিশুকে পাঠিয়েছেন, যখন এটি পৃথিবীর ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে, তার প্রতিশ্রুত রাজ্যটি কেমন দেখতে হবে, সেটি সবাইকে জানাতে। দরিদ্রদের জন্যে এটি হবে একটি সুসংবাদ। এবং ধর্মবাদী আইনপ্রণেতাদের সেই দড়ির ফাঁস থেকে এটি ঈশ্বরের সন্তানদের মুক্ত করবে, যা দিয়ে তাদের জীবন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের সাথে তার প্রথম উন্মুক্ত সংঘর্ষ হয়েছিল সাবাথকে বিশ্রামের দিন হিসাবে চিহ্নিত করে রাখার নির্দেশটি নিয়ে। যিশু একদিন একটি গমক্ষেতের মধ্যে দিয়ে তার কিছু অনুসারীদের নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হাঁটার সময় মুখে দিয়ে চেবানোর জন্যে তারা অল্পকিছু গম তুলেছিলেন এবং সেটি দেখে ফারিসিরা তাদের উপর সাবাথের দিনে আইন অমান্য করার অভিযোগ এনেছিলেন, কারণ তারা শস্য তুলেছেন। এখানে যিশুর উত্তরটি ছিল বৈপ্লবিক। তিনি বলেছিলেন, সাবাথ মানবতার জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, সাবাথের জন্যে মানবতাকে সৃষ্টি করা হয়নি। সমাজের জন্যে আমাদের আইন এবং নিয়মের প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেগুলো আমাদের ভৃত্য, অবশ্যই মনিব নয়। আমরা যদি সেগুলো কঠোরভাবে আরোপ করার চেষ্টা করি সেগুলো যে-মানুষগুলোকে সাহায্য করার জন্যে পরিকল্পিত, সেই মানুষগুলোর চেয়েও আইন আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে। আইনের বিধানের চুলচেরা অনুসরণ বা লিগালিজমকে এর ছয়শো বছর আগেই তাওবাদীরা যেভাবে শনাক্ত করেছিলেন, সেই বাস্তব সত্যটি প্রমাণ করে, এই আইনের প্রতি অন্ধত্ব কত শক্তিশালীভাবেই সমাজের অংশ হিসাবে টিকে গেছে। এখন যিশুকে এটি আমরা চ্যালেঞ্জ করতে দেখছি। মানবতার অধীনস্থ হবে আইন, মানবতা আইনের অধীনস্থ নয়। তাই অবাক হবার কোনো কারণ নেই যে, আইন-সমর্থকরা তাকে ঘৃণা করতেন। তার বিরুদ্ধে এটি ছিল প্রথম গুরুতর অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে এটি জায়গা পেয়েছিল।

দ্বিতীয় সংঘর্ষ, ‘সার্মন অন দ্য মাউন্ট’, যার বিবরণ আছে ম্যাথিউর সুসমাচারে, এবং এটি আরো বিপজ্জনক। ক্ষমতাবানরা যে তত্ত্ব দিয়ে পৃথিবীর সবকিছু পরিচালনা করছিলেন, যিশু এখানে সেটি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তত্ত্বটি ছিল এমন, মানুষ মূলত উচ্ছঙ্খল জনতার দল, যাদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। তাদের জন্যে সামান্য একটু ছাড় দিলে, তারা আরো অনেক বেশিকিছু দাবি করে সেটি কেড়ে নেবে। সুতরাং তাদের সারাক্ষণই শক্তহাতে দমন করতে হবে। চোয়ালে মুষ্ঠি আর ঘাড়ের পেছনে বুট হচ্ছে একমাত্র ভাষা, যা তারা বুঝতে পারে। কিন্তু তারপরও ম্যাথিউ আমাদের দেখান যে, একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে, যেভাবে মোজেস তার টেন কম্যান্ডমেন্ট নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, যিশু যখন ঈশ্বরের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হবে তখন পরিস্থিতি কেমন হবে তার বর্ণনা দিয়েছিলেন।

যদি কেউ আপনাকে এক গালে একটি থাপ্পড় মারে, আপনি অন্য গালটি এগিয়ে দেবেন যেন সেখানেও সে থাপ্পড় মারতে পারে। কেউ যদি আপনার গায়ের উপরের আবরণটি চায়, আপনি তাকে পুরো কাপড়টাই নেবার প্রস্তাব করবেন। আপনি আপনার শত্রুদের ভালোবাসবেন, ঘৃণা করবেন না। যারা আপনার সাথে খারাপ কিছু করবে, তাদের জন্য ভালো কাজ করবেন। আপনি ক্ষমা এবং ক্ষমা এবং ক্ষমা এবং ক্ষমা করবেন… অন্তহীনভাবে। স্বর্গে এমনভাবেই সব হয়, পৃথিবীতেও তেমন হওয়া উচিত। যিশুর বর্ণিত এই পুরোপুরি উল্টো। ধরনের রাজ্যটির মূল চাবিকাঠিটি আছে সেই শব্দে, যা তার ব্যাপটিজমের সময় তাকে বলা হয়েছিল, তুমি আমার প্রিয় পুত্র। ঈশ্বর কোনো শাসক নন, মনিব নন, মানব জেলখানার ওয়ার্ডেন নয়, ক্রীতদাসের মালিক নন, বরং তিনি হচ্ছেন ‘পিতা’। এবং মানবজাতি পুরোটাই একটি পরিবার। বৈপ্লবিক কথাবার্তা! সুতরাং সেই সময়ের শাসকরা তার ওপর সতর্ক নজর রেখেছিলেন। এটি তার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অপরাধের অভিযোগ ছিল। এটি তার অভিযোগপত্রে জায়গা নিয়েছিল।

তৃতীয় সংঘর্ষটি বর্ণনা করা হয়েছে লুকের সুসমাচারে। যিশু কখনোই কীভাবে চিন্তা করতে হবে এই বিষয়ে কাউকে পরামর্শ দেননি। ইজরায়েলের নবীদের মতো তিনিও গল্প বলেছিলেন, যেন মানুষরা নিজেরাই তাদের হয়ে ভাবার কাজটি করতে পারেন। এক বন্ধুসুলভ শ্রোতা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইহুদিদের ধর্মীয় আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাটি পুনরাবৃত্তি করতে। যিশু উত্তরে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরকে তাদের সমস্ত হৃদয়, আত্মা আর শক্তি দিয়ে ভালোবাসতে হবে। এটাই প্রথম নির্দেশ। দ্বিতীয় নির্দেশটি হচ্ছে নিজেদের যেভাবে তারা ভালোবাসেন, প্রতিবেশীকেও সেভাবে ভালোবাসতে হবে। ‘ঠিক’, উত্তর দিয়েছিলেন সেই শ্রোতা, ‘কিন্তু আমার প্রতিবেশী কারা? গুড সামারিটানের সেই নীতিগর্ভ গল্পটি ছিল যিশুর উত্তর।

একবার একজন ব্যক্তিকে একদল ডাকাত আক্রমণ করেছিল, যারা তার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়ে তাকে নগ্ন আর অচেতন অবস্থায় খুব বিপজ্জনক আর নির্জন একটি রাস্তার উপর ফেলে রেখে চলে যায়। একজন যাজক তার সহকারীকে নিয়ে সে-পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা দুজনেই ভালোমানুষ ছিলেন, যারা সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাদের ধর্ম সেটি করতে বাধা দিয়েছিল। রাস্তার পাশে পড়ে-থাকা মানুষটি হয়তো মৃত হতে পারে। এবং সেই আহত ব্যক্তিটি, হয়তো এমন একটি জাতের ইহুদি, যাদের সাথে তার সম্পর্ক রাখার অনুমতি নেই। সুতরাং স্পর্শ করলেই তারা হয়তো অপবিত্র হয়ে যেতে পারেন। তাকে রাস্তার পাশে সেভাবে ফেলে রেখেই তারা অন্য পাশ দিয়ে সেখান থেকে দ্রুত চলে গিয়েছিলেন। এরপর সেখানে এসেছিলেন একজন সামারিটান, এটি সেই বর্ণগুলোর মধ্যে একটি, যে বর্ণের সদস্যদের সাথে ইহুদিদের সম্পর্ক করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তার নিজের ধর্মেও তাদের মতো একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আছে, কিন্তু সেই মানুষটির কষ্টের প্রতি সহমর্মিতা তার ধর্মের নিষেধাজ্ঞাকে অতিক্রম করতে সহায়তা করেছিল। তিনি সেই মানুষটির সাহায্যে এগিয়ে যান, এবং তার জীবন। রক্ষা করেন। যিশুর মতে, এই প্রতিবেশী এমন কেউ নয়, যাকে অবশ্যই আপনার ধর্মের কেউ হতে হবে। একজন প্রতিবেশী যে-কেউই হতে পারেন, আপনার সহায়তা যার দরকার আছে। যদি ঈশ্বর আমাদের পিতা হয়ে থাকেন আর আমরা তার সন্তান হয়ে থাকি, তাহলে সবাই আমার প্রতিবেশী, আমার ভাই আর আমার বোন।

এই গল্পটির মূল নিশানাটি কী, সেটি বুঝতে ব্যর্থ হওয়া বেশ সহজ একটি ব্যাপার। আইন হচ্ছে নিশানা, মার্ক যখন সাবাথের ঘটনাটি বর্ণনা করেছিল। ক্ষমতার রাজনীতি ছিল নিশানা, যখন ম্যাথিউ সামন অন দ্য মাউন্ট বর্ণনা করেছিলেন। আর গুড সামারিটানের গল, যা লুকের সুসমাচারে আমরা পাই, সেটির নিশানা ছিল ‘ধর্ম’। যিশু বলেছিলেন, যে-প্রতিষ্ঠানগুলো ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করছে, সেগুলো খুব সহজেই ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হতে পারে। কারণ এটি ঈশ্বরের ভালোবাসার চেয়ে নিজের শাসন আর ক্ষমতাকেই বেশি মূল্য দেয়। সুতরাং, খুব বিস্ময়কর নয়, যাজক-পুরোহিতরা যিশুকে ঘৃণা করতেন এবং তার বিরুদ্ধে তারা একটি ষড়যন্ত্র করতে শুরু করেছিলেন। এটি ছিল তার বিরুদ্ধে তৃতীয় অপরাধের অভিযোগ। এটিও তার অভিযোগের তালিকায় যুক্ত হয়, এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার জন্যে প্রয়োজনীয় অভিযোগপত্র প্রস্তুত হয়েছিল। অতএব তাকে গ্রেফতার করা সময়ের ব্যাপার ছিল মাত্র।

যিশু তার শিষ্যদের একটি প্রার্থনা শিখিয়েছিলেন। এটি সংক্ষিপ্ত তবে এই অল্পকিছু বাক্যের মধ্যে ঠাসা ছিল তার সব শিক্ষা, যা তিনি এতদিন ধরে প্রচার করে আসছিলেন : ‘আমাদের পিতা, যিনি স্বর্গে বাস করেন, এটি এভাবে শুরু হয়েছিল, আপনার ইচ্ছাই পূর্ণ হবে, স্বর্গে যেমন, তেমনি পৃথিবীতেও আপনার রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে। এই প্রার্থনাটি এতদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে যে, এমনকি খ্রিস্টানদের জন্যে এটি এর মূলশক্তিটি হারিয়ে ফেলেছে, যারা এটি এখনো ব্যবহার করেন। কিন্তু এর সেই প্রভাবটির কথা কল্পনা করুন যদি আপনি একজন যাজক হতেন, যিনি ভাবেন পৃথিবীতে তিনি ইতিমধ্যে ঈশ্বরের সেবা করছেন। অথবা আপনি যদি রাজনৈতিক কোনো নেতা হয়ে থাকেন, যিনি কোনো বিদ্রোহী উপনিবেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন? এটি ছিল যুদ্ধ ঘোষণার বার্তা। মানুষ হত্যা হবার জন্যে যা যথেষ্ট হতে পারে।

২০. যিশু এলেন রোমে

গভীর রাতে তারা যিশুকে গ্রেফতার করতে এসেছিলেন। গোপন পুলিশ সবসময়ই যে-সময়টিকে এই ধরনের কাজ করার জন্যে বেছে নেয়। যখন পুরো শহর শান্ত থাকে, মানুষের শক্তি যখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে, তখনই তারা আক্রমণ করেন। ব্যক্তিগত মালিকাধীন একটি বাগানে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যেখানে তার গোপন অবস্থান চিনিয়ে দিয়েছিলেন তারই ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি।

প্রতীকী আচরণ করার ক্ষেত্রে যিশু অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। যখন তিনি তার আধ্যাত্মিক মুক্তির আন্দোলনটি শুরু করেছিলেন, তিনি ইহুদি জনগোষ্ঠীর কাননে প্রবেশ করার সেই ঘটনাটির প্রতিধ্বনি করেছিলেন। বাইবেল আমাদের বলেছে যে, তাদের প্রতিশ্রুত ভূমির জন্যে মিশর থেকে সংগ্রাম করে যে-ইহুদিরা পালিয়ে এসেছিলেন তারা মোট বারোটি গোত্রে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, যারা পরিচিত ইজরায়েলের ‘টুয়েলভ ট্রাইবস’ নামে। সুতরাং যিশু তার অনুসারীদের মধ্যে থেকে বারো জনকে নির্বাচন করেছিলেন, যারা তার এই খুব ভিন্নধরনের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে সহায়তা করতে পারবেন। তিনি তাদের বলতেন ‘আপোস্টল’, গ্রিক যে-শব্দটির অর্থ হচ্ছে বার্তাবাহক। তাদের বার্তাটি ছিল সুসংবাদ, ঈশ্বরের ন্যায় এবং শান্তির রাজ্য খুব শীঘ্রই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হবে।

কিন্তু এই অ্যাপোস্টলরা কেউ নজরে পড়ার মতো তেমন কোনো বিশেষ ব্যক্তি ছিলেন না। তাদের মধ্যে বিখ্যাত দুইজনই ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছিলেন, পিটার এবং জুডাস। পিটার হৃদয়বান ছিলেন, কিন্তু দুর্বল। যিশু বন্দি হবার পরই তিনি তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন, আর জুডাস রোমের পুলিশদের নিয়ে এসেছিলেন সেই বাগানে, যেখানে যিশু লুকিয়ে ছিলেন। আমরা নিশ্চিত নই, কেন তিনি এমন একটি বিশ্বাসঘাতকতার কাজ করেছিলেন! বিশ্বাসঘাতকতার জন্য যাজকরা তাকে ত্রিশটি রুপার মুদ্রা দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি কাজটি শুধুমাত্র টাকার জন্যে। করেছিলেন, এমন সম্ভাবনা বেশ কম। হয়তো তিনি হতাশ হয়েছিলেন, তিনি যেমন মেসাইয়া প্রত্যাশা করেছিলেন, যিশু তেমন ছিলেন না। ইজরায়েলে দরিদ্র আর নিপীড়িতদের মধ্যে তার বিস্ময়কর সংখ্যক অনুসারী ছিল, কিন্তু তারপরও তিনি রোমানদের বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নেননি। এই ধরনের একটি ধাক্কা কি তাকে প্ররোচিত করতে পারত প্রতিশ্রুত সেই রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্যে সবাইকে স্বশস্ত্র হয়ে উঠতে? সেটাই কি জুডাসের উদ্দেশ্য ছিল? আমরা জানি না। হয়তো তিনি নিজেও সেটি জানতেন না।

ম্যাথিউ আমাদের বলেছিলেন গেথসেমানে বাগানে আটক হবার হবার যিশুর সাথে যা কিছু ঘটেছিল সেটি জুডাসের হৃদয় ভঙ্গ করেছিল, এবং তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। তবে তার সেই কাজটির প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। ততক্ষণে যিশু রোমের সৈন্যদের হাতে বন্দি।

রোমের সৈন্যরাও খুব দক্ষ ছিল প্রতীকী আচরণে। রোমান-কর্তৃপক্ষ যখন জিসাসকে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, সৈন্যরা তার মাথার উপর একটি কাঁটার মুকুট পরিয়ে দিয়েছিল এবং তার গায়ে রাজকীয় বেগুনি রঙের একটি চাদর জড়িয়ে দিয়েছিল। সবাই দেখো, ইহুদিদের রাজা’, তারা উপহাস করেছিলেন যখন তারা সেই পাহাড়ের উপর তাকে নিয়ে গিয়েছিল ক্রুশবিদ্ধ করার স্থানে। কুশের সাথে পেরেক দিয়ে বিদ্ধ করে ধীরমৃত্যু, রোমের সবচেয়ে হিংস্রতম শাস্তি ছিল। এই শাস্তিতে দণ্ডিতরা মরে যাবার আগে বেশ কয়েকদিন ধরে তীব্র যন্ত্রণায় এভাবে ঝুলে থাকতে পারতেন। ৭৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যখন স্পার্টাকাস ক্রীতদাসদের বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রোমে, খুব হিংস্রভাবে দাসদের সেই বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিল। এবং বিদ্রোহ দমন করা হয়ে গেলে, রোমান সেনাপতি ক্রাসাস, ছয় হাজার বিদ্রোহী দাসকে ক্রুশবিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, এবং রোম থেকে কাপুয়া যাবার মহাসড়কের পাশে ক্রুশের উপর তাদের বহু মাস ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। যিশুর জন্যে মৃত্যু বেশ দ্রুত এসেছিল। তিনি ক্রুশের উপর মাত্র ছয়ঘণ্টা বেঁচেছিলেন, এর কারণ সম্ভবত সৈন্যরা তাকে এত হিংস্রভাবে চাবুক দিয়ে পিটিয়ে ছিল, তিনি অর্ধমৃত ছিলেন যখন তারা তাকে ক্রুশের কাঠের উপর পেরেক দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছিল।

ক্রুশবিদ্ধ হয়ে ঝুলে থাকার সময় তিনি কী ভাবছিলেন? ঈশ্বর তাকে যা বলেছিলেন বলে তিনি মনে করেছিলেন, তিনি কি তার সেই ভাবনায় প্রতারিত হয়েছিলেন? নাকি, তিনি তার মৃত্যুকে মেনে নিয়েছিলেন ঈশ্বরের পরিকল্পনার একটি অংশ হিসাবে? দুটি প্রস্তাবনাই করা হয়েছে। একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, যিশু খুব স্থিরবিশ্বাসে পৌঁছেছিলেন, যখন তিনি কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করার প্রক্রিয়ায় তীব্রতম বিপদের মুহূর্তে পৌঁছাবেন, ঈশ্বর কেবল তখনই হস্তক্ষেপ করবেন। এটি সেই তত্ত্ব থেকে খুব একটা ভিন্ন নয়, যা দাবি করেছে যিশুকে কোনো একটি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতেই জুডাস চেষ্টা করেছিলেন। যিশুও কি ঈশ্বরকে এই পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য করতে চাইছিলেন? তিনি কি ভেবেছিলেন, এমন একটি রাজ্যের দাবি করার মাধ্যমে, যে-রাজ্য এই পৃথিবীতে অভূতপূর্ব, এবং এর জন্যে মরতে প্রস্তুত হবার মাধ্যমে, ঈশ্বর স্বয়ং ইতিহাসে তার সমস্ত শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হবেন, সব শাসকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিবেন? যদি সেটাই তিনি প্রত্যাশা করে থাকেন, এমন কিছু ঘটেনি। রোমানদের শোষণ থেকে তাদের কেউ উদ্ধার করেনি। তার সেই যন্ত্রণা লাঘব করার জন্যে কোনো পদক্ষেপ নিতে ইতিহাসে ঈশ্বর হঠাৎ করে প্রবেশ করেননি। শুধুমাত্র সেখানে কুশই ছিল এবং নিশ্চয়তা ছিল যে, তিনি এর উপরেই মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছেন। তিনি কী অর্জন করতে পেরেছিলেন? কিছুই না। মার্ক আমাদের বলেন, তার শেষনিশ্বাস ত্যাগ করার আগে তিনি হতাশ হয়ে বলেছিলেন, ‘আমার ঈশ্বর, আমার ঈশ্বর, কেন তুমি আমাকে পরিত্যাগ করলে?’

অন্য গসপেল লেখকরা এই ক্রুশবিদ্ধ হবার ঘটনাটিকে খানিকটা ভিন্নরূপে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন। তারা প্রস্তাব করেছিলেন, সবসময়ই পরিস্থিতিটি যিশুর নিয়ন্ত্রণেই ছিল। তার মৃত্যু শুরু থেকেই ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ ছিল। তিনি জানতেন এটাই তার সাথে ঈশ্বরের যে সমঝোতা হয়েছিল তারই একটি অংশ। এবং যখন জনের গসপেলটি লেখা হয়েছিল, এটাই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত কাহিনিতে পরিণত হয়েছিল। জনের বিবরণে যিশুর শেষ উচ্চারণটি হতাশ কোনো আর্তনাদ নয়, বরং বিজয়ের উল্লাস : ‘কাজটি সম্পন্ন হয়েছে’!

এমন কিছু অনুভূত হয়নি যে তার কোনো অনুসারীরা এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে সেটি প্রত্যাশা করতে পেরেছিলেন। অনুগত নারীদের একটি ছোটদল ছাড়া, তারা সবাই তাকে পরিত্যাগ করেছিল, যখন রোমের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে এসেছিল। কারণ তারা ভয় পেয়েছিল পরবর্তীতে এই শাস্তি হয়তো তাদেরকেও দেওয়া হবে। ভোর হবার আগে আশাহীন ঘণ্টাগুলোয় তারা দরজায় পুলিশের টোকা শোনার জন্যে অপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু সেটি কখনোই আসেনি। তবে যা এসেছিল সেটি তাদের বিস্মিত করেছিল। স্বয়ং যিশু এসেছিলেন, যদিও তাদের হয়তো বলার কোনো ক্ষমতাই ছিল না, ঠিক কীভাবে তারা জেনেছিলেন যিশু এসেছে। করিন্থবাসীদের প্রতি লেখা পলের চিঠিতে তিনি এই বিস্ময়টির বিবরণ দিয়েছিলেন। এবং তিনি পূর্ণ একটি তালিকা দিয়েছিলেন সেইসব মানুষদের নামসহ, যাদের সামনে যিশু আবির্ভূত হয়েছিলেন তার মৃত্যুর পর। সবশেষে, তিনি বলেছিলেন, ‘যিশু আমার সামনে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এবং আমরা দামাস্কাস অভিমুখে সেই রাস্তায় ফিরে যাই, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছিল। এটি ছিল পরবর্তী বিস্ময়, যা তার অ্যাপোস্টলদের হতবাক করে দিয়েছিল।

যিশুর এই আবির্ভাবগুলো পিটার ও অন্যান্য অ্যাপোস্টলদের ক্রমশ আরো সাহসী করে তুলেছিল। যিশুর গ্রেফতারের পর তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু পরে তারা আবার একত্রিত হয়েছিলেন এবং তাদের নেতা হিসাবে পিটার আবার তার সাহসিকতার পরিচয় দিতে শুরু করেছিলেন। যদিও তারা নিশ্চিত ছিলেন না ভবিষ্যতে কী হবে, তবে তারা স্বদেশি ইহুদিদের বলতে শুরু করেছিলেন যে কী ঘটেছিল। আরো বেশি সাহসিকতার সাথে তারা তাদের সেই বিশ্বাসটির পুনরাবৃত্তি করেছিলেন, যিশু, যদিও তিনি এমন একটি মৃত্যুর শিকার হয়েছিলেন, বাইবেল যাকে বলে অভিশপ্ত, কিন্তু তিনি ছিলেন তাদের সেই প্রতিশ্রুত মেসাইয়া। মৃত্যুর পর তার ফিরে আসার এই ঘটনাগুলোই ছিল তার প্রমাণ।

কিন্তু পৃথিবীতে যে নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে তারা এখন বিশ্বাস করছেন, সেটি ঘটবার সময়সূচি তাহলে কী? এটিকে আর বেশি দীর্ঘায়িত করা যাবে না, তারা ভেবেছিলেন। তারা সবাই তাদের জীবদ্দশায় সেটি দেখতে পারবেন। এবার আর আগের মতো কোনো ভুল হবে না। যখন যিশু ফিরে আসবেন, এটি তার মৃত্যুর পর আবির্ভূত হবার মতো গোপন কিছু হবে না। পরের বার তার রাজ্যে পূর্ণ রাজকীয়তা নিয়েই তিনি আসবেন। পল এটি প্রকাশ করার সবচেয়ে সেরা উপায়টি খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মৃত্যুর পর যিশুর পুনরুত্থান ছিল সেই একটি বিশাল ফসলের ফলনের প্রথম আঁটি, যে ফসল আমরা খুব শীঘ্রই ঘরে তুলব।

যিশুর মূল অনুসারীরা তখনো সল থেকে ধর্মান্তরিত হওয়া পলকে ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেননি। তাদের সবচেয়ে বড় নিপীড়নকারী থেকে, সল যে এখন পল নামে পরিচিত, এখন তাদের সবচেয়ে বিরক্তিকর ঝামেলায় রূপান্তরিত হয়েছিল। তার এই ধর্মান্তরিত হবার ঘটনার প্রথম ধাক্কাটি সামলে নেবার পর, দামাস্কাসের রাস্তায় যিশু তাকে আহ্বান করেছিলেন বলে নিজেকে যিশুর আরেকজন অ্যাপোস্টল বলার দাবিটির ব্যাপারে সম্মতি দেবার পরেও, তার সাথে কাজ করা তাদের বেশ কঠিন প্রমাণিত হয়েছিল। যিশুর মতোই, তার অনুসারীরা সবাই ইহুদি ছিলেন, এবং চেয়েছিলেন সবকিছুই সেভাবেই থাকুক। তার ফিরে আসার সাথে যা কিছুই সংশ্লিষ্ট থাকুক না কেন, আর যখনই সেটি ঘটুক না কেন, তারা নিশ্চিত ছিলেন তেমন কিছু শুধু জেরুজালেমেই ঘটবে, ঈশ্বরের এই পবিত্র শহর হবে সেই পরিবর্তনের সূচনাবিন্দু। আর সে-কারণেই যেখানে তারা ছিলেন, সেখানেই তারা যিশুর জন্য অপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন। আর তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেখানে বসেই তারা, যিশু একজন মেসাইয়া ছিলেন এবং তিনি খুব শীঘ্রই আবার ফিরে আসবেন, সেটি প্রচার করা অব্যাহত রাখবেন, তবে তারা শুধুমাত্র ইহুদিদের মধ্যে সেটি করবেন।

‘না’, হুঙ্কার করে বলেছিলেন পল। তোমরা কি বুঝতে পারোনি ঈশ্বর সেই পুরনো চুক্তি ছিঁড়ে ফেলেছেন এবং নতুন একটি চুক্তি প্রকাশ করেছেন? পুরনোটি তার প্রয়োজন মিটিয়েছে, এবং এটির মহান একটি উদ্দেশ্য ছিল, কিন্তু এটির সময় শেষ হয়েছে। সেটি ছিল শৈশবে স্কুলে যাবার মতো। খুবই জরুরি যখন আমরা ছোট, কিন্তু এটি শেষ হয়ে যায়, যখন আমরা প্রাপ্তবয়স্ক হই। এবং এখানে আরো কিছু বিষয় আছে। এই নতুন প্রতিশ্রুতি শুধুমাত্র ইহুদিদের জন্যে নয়। এটি সবার জন্যে। সারা পৃথিবীর জন্যে।

এভাবে একসাথে জেরুসালেমে বসে, নিষ্ক্রিয়ভাবে যিশুর জন্য অপেক্ষা করা উচিত না তোমাদের, পল তাদের বলেছিলেন, তোমাদের বাইরে বের হয়ে পুরো পৃথিবীকে জানানো উচিত, যিশুর পথ অনুসরণ করতে আপনার ইহুদি হবার দরকার নেই। আমরা অবশ্যই আমাদের আচারে বিশ্বাসী ইহুদির মতো জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখব। কারণ এটাই আমাদের ঐতিহ্য। কিন্তু নিশ্চয়ই তোমরা ইহুদি নয় এমন কাউকে বলবে না যে, তারা যদি যিশুকে অনুসরণ করতে চায়, তাহলে তাদের খত্না করাতে হবে, কারণ বহু শতাব্দীব্যাপী খত্না করানোর মাধ্যমে ইহুদি বালকদের ঈশ্বরের বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেটি, যা ঘটেছে আগে, কিন্তু বর্তমান ভিন্ন। যা এখন দরকার সেটি লিঙ্গের ত্যা করা না বরং হৃদয়ের খত্তা করা। আধ্যাত্মিক খনা। ইহুদি নয়, এমন ব্যক্তিরা তাদের জীবনযাপনের পুরনো পদ্ধতি কেটে ফেলে দেবে তাদের জীবন থেকে এবং যিশুর দেখানো পথে নতুন করে তারা বাঁচতে শুরু করবেন। আর এই বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দেবার মতো অনেক বেশি সময় আমাদের হাতে নেই। আপনারা যেভাবে ভাবছেন তার আগেই তিনি ফিরে আসবেন। ইতিমধ্যেই বহু মানুষ মারা যাচ্ছেন, যারা তার সেই বার্তাটি শোনেননি। আমাদের খুবই দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে, নষ্ট করার মতো কোনো সময় আমাদের হাতে আর নেই।

এভাবেই পল তাদের কাছে বারবার এই আহ্বান নিয়ে গিয়েছিলেন, যতক্ষণ তাদের প্রতিরোধের দেয়ালটি ভেঙে পড়ে। কিন্তু পুরোপুরিভাবে তারা তার কথা মেনে নিতে পারেননি। সুতরাং তারা জোড়াতালি দিয়ে একটি সমঝোতায় এসেছিলেন। যিশুর মূল অনুসারীরা জেরুজালেমেই থাকবেন। সেখানেই তারা তার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকবেন। এবং তারা সব ইহুদি-আচার আর ঐতিহ্যের প্রতি অনুগত থাকবেন। তারা পুরো বিষয়টি এখানেই ধরে রাখবেন। কিন্তু ইহুদি নয় এমন কাউকে যিশুর বার্তা জানাতে পল যেতে পারেন। এবং তিনি যাদের ধর্মান্তরিত করবেন তাদের ইহুদিবাদের আচার মানার প্রয়োজনীয়তা নেই। এবং পল তার লক্ষ্য নিয়েই পথে বের হয়েছিলেন। ভূমধ্যসাগরের পূর্বপ্রান্তে রোমের সব প্রদেশগুলোয় ধর্ম প্রচার করার মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছিলেন, যেখানে ইহুদি নয় এমন বহু মানুষকে তিনি যিশুর অনুসারী বানিয়েছিলেন এবং যেখানেই গিয়েছিলেন সেখানেই তিনি চার্চ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আর সে-কারণে বলা হয় যিশু নয় বরং পলই খ্রিস্টধর্মের সত্যিকারের প্রতিষ্ঠাতা। তাকে ছাড়া এই ‘যিশু’-আন্দোলনটি ইহুদিবাদের মধ্যে আরেকটি ব্যর্থ মেসিয়ানিক আন্দোলন হিসাবে ম্লান হয়ে হারিয়ে যেত। পলই এটিকে ইতিহাসে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সত্যি, কিন্তু তার সাথে যিশুকেও তিনি এনেছিলেন। তিনি যিশুর কথাই প্রচার করতেন : যে যিশুর সাথে দামাস্কাস যাবার রাস্তায় তার একদিন দেখা হয়েছিল; সেই যিশু যিনি পৃথিবীর জন্যে ঈশ্বরের ভালোবাসার সুসংবাদ দিয়েছিলেন, সেই যিশু যিনি শীঘ্রই আবার ফিরে আসবেন, তাই নষ্ট করার মতো আর কোনো সময়ই নেই।

তবে, যিশু আর ফিরে আসেননি, আর যিশু এখনো ফিরে আসেননি, যদিও তিনি একদিন ফিরে আসবেন এই প্রত্যাশাটিরও কোনোদিন মৃত্যু হয়নি। এটাই খ্রিস্টধর্মের আনুষ্ঠানিক ধর্মবিশ্বাসের অংশ, যেখানে এই দিনটি সম্বন্ধে বলা হয়, তিনি তার সব মহিমা নিয়ে ফিরে আসবেন জীবিত এবং মৃত সবাইকে বিচার করতে।

পল অন্য অ্যাপোস্টলদের কাছ থেকে অনিচ্ছাসূচক একটি শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছিলেন এবং তাকে অনুপ্রাণিত করা হয়েছিল, ইহুদি নয় এমন মানুষের কাছে তার ধর্ম প্রচার এবং তার চার্চ প্রতিষ্ঠা করতে। ইহুদিবাদের আনুষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষের কাছে এই পরিস্থিতি খুব ভিন্ন ছিল। তারা তাদের দলের যোগ্য একজন মানুষ ও যিশুর অনুসারীদের নির্যাতনকারী এক দক্ষ ব্যক্তিকে হারিয়েছিল খ্রিস্টধর্মের কাছে। তারা তার ওপর দায়িত্ব দিয়েছিল তাদের শত্রুকে অকার্যকর করতে, কিন্তু তিনি তার আনুগত্য বদলে তাদের সাথেই যুক্ত হয়েছিলেন। এখন তিনি হচ্ছেন তাদের শত্রু। সুতরাং তারাও তার ওপর একই তীব্রতার সাথে প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে এসেছিল, যে তীব্রতা একদিন তাকে দামাস্কাস বরাবর রাস্তায় নিয়ে গিয়েছিল। তাকে প্রায় নিরন্তরভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে আরো নানা মেয়াদে তাকে শাস্তি খাটতে হয়েছিল। পাঁচবার তিনি উনচল্লিশটি বেতের বাড়ির আনুষ্ঠানিক শাস্তি পেয়েছিলেন। তিনবার তাকে লোহার দণ্ড দিয়ে প্রহার করা হয়েছিল। একবার তাকে পাথর ছুঁড়ে মারার চেষ্টা করাও হয়। অবশেষে, এসব তার পক্ষে সহ্য করা কঠিন হয়ে উঠেছিল, রোম-কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি আবেদন করেছিলেন : সর্বোপরি তিনি একজন রোমান নাগরিক, আর সে-কারণে তার বিরুদ্ধে আনীত যিশুর সুসংবাদ প্রচার করার অভিযোগটির সঠিক বিচার করা হোক।

রোম-কর্তৃপক্ষ অবশেষে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল, রোমের একজন নাগরিক হিসাবে তার এই দাবি বৈধ, সুতরাং তারা তাকে রোমে নিয়ে এসেছিলেন বিচার করতে। সেখানে পৌঁছানোর পর তারা তাকে বন্দি করে রেখেছিল। কিন্তু যিশুর নামে ধর্মান্তরিত করার কাজ থেকে তারা কেউই তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। পল এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি তার বিশ্বাসের পক্ষে মানুষকে ধর্মান্তরিত করার কাজটি কোনোভাবে থামাতে পারত না। এমনকি কারাগারেও। তার মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম রোমে প্রবেশ করেছিল। এটি ঘটেছিল নীরবেই, চোখের অন্ত রালে, যখন এই ক্ষুদ্রাকৃতির, ধনুকের মতো বাঁকা পায়ের মানুষটি, যার চোখে গভীর একটি চাহনি ছিল, রোমসাম্রাজ্যের রাজধানীতে বসতি গড়েছিলেন।

অনেক ঘটনা, যা চুপিসারে আসে, প্রায়শই সেগুলো পৃথিবী বদলে দেয়। এটি ছিল তেমন ঘটনাগুলোর একটি। এবং এটি ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

২১. চার্চ যখন দায়িত্ব নিয়েছিল

পল পৌঁছাবার আগেই রোমে সম্ভবত খ্রিস্টানরা ছিলেন। সাম্রাজ্যের রাস্তা আর সমুদ্রপথ সৈন্যদের সাথে নানা মতামত আর ধারণার চলাচল সুগম করেছিল, সুতরাং সম্ভাবনা আছে যে, খ্রিস্টানরা ইতিমধ্যেই রোমানজগতের রাজধানীতে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু তখন তাদের প্রতি খুব একটা বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়নি। পল বর্ণনা করেছিলেন, প্রথম খ্রিস্টানরা ঘৃণ্য আর অগুরুত্বপূর্ণ। ছিলেন, সেইসব অসহায় মানুষগুলোর মতোই, যারা ইজরায়েলে যিশুকে অনুসরণ করেছিলেন। এবং তাদের মধ্যে বেশকিছু ক্রীতদাসও থাকতে পারেন। ঘোড়া বা যে আস্তাবলে ঘোড়ারা দাঁড়িয়ে, সেগুলোর মতো ক্রীতদাসরাও কোনো মালিকের। ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিলেন। দাসপ্রথা সেই জীবনে সর্বজনীন একটি সত্য ছিল। এমনকি বাইবেলও এটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছে। পানির সিক্ততা আর বালির শুষ্কতার মতো-খুব স্বাভাবিক একটি বিষয় ছিল এটি। রোমে তার আটকাবস্থায় পলের ধর্মান্তরিত করা ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন পালিয়ে যাওয়া একজন ক্রীতদাস, ওনেসিমাস, যিনি তার মালিকের কিছু অর্থ ছিনতাই করে শহর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পল তাকে ভালোবেসেছিলেন কিন্তু তাকে দাসত্ব থেকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করেননি। তিনি তাকে তার মালিক ফিলেমনের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কুড়িয়ে-পাওয়া মানিব্যাগের মতো, এবং তার সাথে দয়াশীল আচরণ করতে ফিলেমনের কাছে অনুনয় করে প্রার্থনা করেছিলেন, এখন যখন সে তার স্বধর্মীয় একজন খ্রিস্টান।

পল কেন দাসপ্রথাকে চ্যালেঞ্জ করেননি এটিকে খ্রিস্টধর্মের বিশ্বজনীন ভালোবাসার পরিপন্থি দাবি করে? এখন যেহেতু তার দাসকে ফিরে পেয়েছেন মালিক, শুধুমাত্র তার সাথে ভালো আচরণ করার অনুনয় করা ছাড়া, তার ক্রীতদাসকে মুক্তি দিতে তিনি কেন ফিলেমনকে প্ররোচিত করেননি? সম্ভবত এর কারণ হতে পারে, পৃথিবী সেই মুহূর্তে যেমন ছিল সেটি বেশিদিন স্থায়ী হবে এমন প্রত্যাশা তিনি করেননি। যিশু খুব শীঘ্রই ফিরে আসছেন পৃথিবীতে ঈশ্বরের ন্যায়বিচার আর ভালোবাসার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতেন আর সে-কারণে, কী দরকার এমন একটি পদ্ধতি পরিবর্তন করা, যার কিনা বিলুপ্তি আসন্ন? আপনি যদি কোনো একটি বাড়ি ভাঙতে শুরু করেন, নিশ্চয়ই সেই বাড়ির পয়ঃপ্রণালী কিংবা পানির লাইন ঠিক করে অযথা সময় আর অর্থ নষ্ট করবেন না। এর মানে প্রথম খ্রিস্টানরা এই জগতে পুরোপুরিভাবে আর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননি। খুব দ্রুত এই পৃথিবী সমাপ্তি হতে যাচ্ছে, খ্রিস্টানদের এই প্রত্যাশাটি মূলত তাদের বিরুদ্ধে রোমানদের মনে সন্দেহ জাগিয়ে তুলেছিল। এই মানসিকতাটি তাদের এমন একটি ধারণা দিয়েছিল যে, খ্রিস্টানধর্মাবলম্বীরা বাকি মানবজাতিকে ঘৃণা করে। কিন্তু তাদের ব্যাপারে আরো একটি বিষয় লক্ষ করার পরেই কেবল রোম-কর্তৃপক্ষ খ্রিস্টানদের তাদের ক্রোধের একটি নিশানা বানাতে শুরু করেছিল।

ধূপ হচ্ছে গাছের নিঃসৃত একধরনের রস বা রেজিন, যার সাথে নানা সুগন্ধী ভেষজ মিশ্রিত করা হয় এবং যখন এটি পোড়ানো হয় তখন বেশ মিষ্টি গন্ধসহ একটি ধোয়া চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। প্রাচীন ধর্মগুলোয়, কোনো দেবতার উদ্দেশ্যে এই ধূপ জ্বালানো খুব জনপ্রিয় একটি উপাসনাপদ্ধতি ছিল। তারা সম্ভবত একসময় ভাবতেন, যখন এই ধূপদানি থেকে ধোঁয়া উপরে উঠবে, এর সুবাস স্বর্গের দেবতাদের তৃপ্ত করবে এবং তাদের সমর্থন বা আজ্ঞা নিশ্চিত করবে। রোমের নাগরিকদের জন্যে তাদের সম্রাটের ছবির নিচে ধূপদানিতে কিছু ধূপ পোড়ানো একটি আবশ্যিকতা ছিল, ঠিক যেন তারা তাকে একজন দেবতা হিসাবে উপাসনা করছেন। এটি আনুগত্যের একটি পরীক্ষায় রূপান্তরিত হয়েছিল, অনেকটাই পতাকার প্রতি সম্মানপ্রদর্শন আর জাতীয় সংগীতের সময় উঠে দাঁড়ানোর মতো। তারা তাদের সম্রাটকে আসলেই দেবতা হিসাবে দেখতেন কিনা সেটি নিয়ে সংশয় আছে, তবে এই আচারটি অবশ্যই সেদিকে ইঙ্গিত করছে। কিন্তু খ্রিস্টানদের জন্যে এমন কিছু মেনে নেওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার প্রমাণিত হয়েছিল। তারা প্রতিবাদ করেছিলেন, যদিও তারা সম্রাটের অনুগত প্রজা, তারপরও তারা তাকে কোনো দেবতার মতো ভক্তিপ্রদর্শন করে ধূপ জ্বালাতে পারবেন না।

এটাই কর্তৃপক্ষকে ভীষণ খেপিয়ে তুলেছিল। সেই গুজবটি, খ্রিস্টানরা পৃথিবীর পরিসমাপ্তির জন্যে গোপনে পরিকল্পনা করছেন, সেইসাথে সম্রাটের প্রতি তাদের ধূপ জ্বালাতে অস্বীকৃতি প্রকাশ, ধারাবাহিকভাবে খ্রিস্টানদের উপর নির্যাতন-নিপীড়নের ভয়ংকর পর্বগুলোর সূচনা করেছিল, যা পরবর্তীতে কদাচিৎ বিরতিসহ কয়েক শতাব্দী ধরে অব্যাহত ছিল। এটি শুরু হয়েছিল ৬৪ খ্রিস্টাব্দে যখন নিরো রোম-সম্রাট ছিলেন। একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড রোম শহরকে প্রায় ধ্বংস করেছিল, সেই সময় একটি গুজবও রটেছিল যে, কাজটি স্বয়ং সম্রাট করেছেন তার প্রাসাদ সম্প্রসারণের জন্যে জায়গা পরিষ্কার করতে। এবং বলা হয়েছিল তিনি তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেহালা বাজাচ্ছিলেন যখন নিচে পুরো শহরটি আগুনে পুড়ছিল।

বিপদ হতে পারে এমন হুমকির মুখে আতঙ্কিত হয়ে নিরো এই দোষটি পুরোপুরিভাবে খ্রিস্টানদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। প্রত্যেকেই জানতেন, তারা সম্রাটকে ঘৃণা করেন এবং এই পৃথিবীর পরিসমাপ্তি ঘটুক, এটাই তারা আশা করেন। সুতরাং তারাই দোষী। কুৎসিত গণনির্যাতনের একটি পর্ব শুরু হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, নিরো কয়েকজন খ্রিস্টান ব্যক্তির সারা শরীর তেল দিয়ে আবৃত করে তার প্রাসাদের বাগানে মোমবাতির মতো প্রজ্বলিত করেছিলেন। আমরা এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারব না, কিন্তু সম্ভাবনা আছে পলের শিরশ্চেদ করা হয়েছিল চার্চের উপর রোম-কর্তৃপক্ষের প্রথম আনুষ্ঠানিক নিপীড়নপর্বে। একটি বিশ্বাসের ধারা আছে, যেটি দাবি করে এরপর অ্যাপোস্টল পিটার রোমে এসেছিলেন, এবং তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিংবদন্তি বলছে পিটার উল্টো করে তাকে ক্রুশবিদ্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কারণ তিনি তার প্রভু যিশুকে ত্যাগ। করেছিলেন যখন রোমানরা তাকে গ্রেফতার করেছিল।

এই নির্যাতন খ্রিস্টধর্মের সম্প্রসারণকে মন্থর করার জন্যে কিছুই করতে পারেনি। বরং এর বিপরীতটাই একটি সত্য ছিল। আর এমনটা প্রায়শই ঘটে যখন কর্তৃপক্ষ এমন কোনোকিছুকে দমন করে বিলুপ্ত করতে চেষ্টা করেন, যার প্রতি এর সম্মতি নেই। নির্যাতিত খ্রিস্টানরা দাবি করেছিলেন শহীদের রক্তই হবে চার্চের বীজ। এবং এরপরের প্রায় আড়াই শতাব্দীতে পুরো সাম্রাজ্য জুড়েই চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আলোচনা আরো অগ্রসর করার আগে একটি তথ্য জানানো ভালো, ‘চার্চ’ শব্দটির দুটি অর্থ আছে। এটি একটি গ্রিকশব্দকে অনুবাদ করেছিল, যার অর্থ শুধুমাত্র একটি সমাবেশ’ বা ‘এক গোষ্ঠী মানুষ। সুতরাং খ্রিস্টীয় চার্চের অর্থ হচ্ছে সেই মানুষগুলো, যারা খ্রিস্টকে অনুসরণ করেন। অনিবার্যভাবে যে দালানগুলোয় তারা মিলিত হতেন সেটিও পরিচিত হয়ে উঠেছিল চার্চ’ নামে। আর সবচেয়ে ভালো উপায়, যার মাধ্যমে আমরা এই দুটি অর্থকে পৃথক করতে পারি, সেটি হচ্ছে একটি বড়হাতের ‘সি’ ব্যবহার করা, বড় হাতের ‘সি’ সহ চার্চ মানে জনগোষ্ঠী অথবা সমাবেশ –চার্চ (Church), ছোট হাতের ‘সি’ হচ্ছে সেই ভবনটি যেখানে তারা একত্র হয়, চার্চ (church)।

প্রথম খ্রিস্টানরা যখন তাদের নির্যাতনকারীদের কাছে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে বেড়াবার চেষ্টা করতেন না, তখন তারা বহু সময় ব্যয় করেছিলেন তাদের বিশ্বাস নিয়ে পরস্পরের সাথে তর্ক-বিতর্ক করে। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি চার্চের প্রথম বিতর্কটি ছিল, যারা ইহুদি নয় এমন কেউ যারা ধর্মান্তরিত হবেন, তারা কি ইহুদিদের অনুশাসনগুলো মেনে চলবেন কিনা। পল সেই বিতর্কে জিতেছিলেন, এবং ইহুদি অনুসারীদের বাইরে খ্রিস্টধর্ম আর চার্চের ব্যাপক সম্প্রসারণে তিনি স্মরণীয় ভূমিকা রেখেছিলেন। এবং এটি ভবিষ্যতে আরো বহু জটিল বিতর্কের একটি সূচনাপর্ব ছিল। এরপরের সবচেয়ে বড় বিতর্কটি ছিল, যিশু কে ছিলেন, সেই বিষয়ে। তারা জানতেন, তিনি একজন মানব-পুরুষ ছিলেন। তারা জানতেন, তিনি নাজারেথ থেকে এসেছিলেন। তারা জানতেন, জেরুজালেমে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এবং তারা জানতেন, ঈশ্বর তাকে তার প্রিয়পুত্র হিসাবে সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু কীভাবে তিনি একই সাথে একজন মানব-পুরুষ আর ঈশ্বরপুত্র হতে পারেন? পল এই বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন এমন কিছু বলে যে, ঈশ্বর তাকে পালকপুত্র হিসাবে ‘দত্তক’ নিয়েছিলেন। সুতরাং এর অর্থ কি এমন হতে পারে যে, কোনো একটি সময় ছিল যখন তিনি ঈশ্বরের পুত্র ছিলেন না? তারা বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করা পছন্দ করেননি। তারা এর বিপরীত একটি ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন। তিনি সবসময়ই ঈশ্বরপুত্র ছিলেন। এবং খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৪ সালের আশেপাশে কোনো একটি সময় এই পৃথিবীতে ছদ্মবেশে তিনি এসেছিলেন তার সন্তানদের উদ্ধার করতে। পুনরায় ঈশ্বরের কাছে প্রত্যাবর্তনের আগে, ত্রিশ বছর ধরে তিনি মানব-পুরুষের জীবন কাটিয়েছিলেন। সুতরাং তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ মানুষ এবং সম্পূর্ণ ঈশ্বর। কিন্তু ঠিক কীভাবে বিষয়টির বোধগম্য একটি ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হতে পারে? তারা বিষয়টি নিয়ে বহু শতাব্দী ধরে বিতর্ক করেছিলেন, এবং এটি বহু উপদল আর ধারার জন্ম দিয়েছিল।

অবশ্যই যিশুর স্বর্গীয় পরিচয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্ক ছাড়াও তারা অনেক কিছুই করেছিলেন। তারা দরিদ্র অসহায়দের সেবা করেছিলেন। রোমান সাম্রাজ্যে প্রশাসনিক কাঠামো অনুকরণ করে দক্ষতার সাথে তারা নিজেদের সংগঠিত করেছিলেন। তারা নিজেদের ভৌগোলিক সীমানায় ভাগ করেছিলেন, যে ভৌগোলিক এককগুলোর তারা নাম দিয়েছিলেন ‘ডাইওসিস’, যেখানে প্রশাসক হিসাবে একজন তত্ত্বাবধায়ক অথবা বিশপকে নিয়োগ দেওয়া হতো। বিশপের অধীনে থাকতেন যাজকরা, যারা স্থানীয় খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর দেখাশুনা করতেন। সমাজকল্যাণের জন্যে তৃতীয় একটি স্তর ছিল, সেই কর্মীদের বলা হয় ডিকন, যারা দরিদ্র আর অসহায়দের দেখাশুনা করতেন। খুব কার্যকরী দক্ষ একটি সংগঠন তারা তৈরি করেছিলেন, এবং মসৃণভাবে এটি কাজ করেছিল। খুব শীঘ্রই বড় শহরগুলোর যেমন, রোম, বিশপরা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, এমনকি সাম্রাজ্যের কর্তৃপক্ষের কাছেও। নির্যাতন অব্যাহত ছিল খানিকটা মাত্রায়, কিন্তু সেটি চার্চকে আরো শক্তিশালী করেছিল। এবং শেষ নির্যাতনপর্বটি প্রমাণিত হয়েছিল রাতের শেষ আঁকড়ে ধরার মতো, যার পরেই এসেছিল নতুন আর বিস্ময়কর একটি ভোর।

যখন খ্রিস্টীয় চার্চ নিজেকে গড়ে তুলেছিল শক্তিশালী একীভূত একটি সংগঠন হিসাবে, রোম সাম্রাজ্য ঠিক বিপরীত দিকে অগ্রসরমান ছিল। নিজেকে বহুখণ্ডে খণ্ডিত করার মাধ্যমে ক্রমশ এটি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এর সেনারা সাম্রাজ্য রক্ষা করতে দেশের সীমানায় হামলে-পড়া আগ্রাসনকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বদলে বরং নিজেদের মধ্যেই বেশিরভাগ সময় যুদ্ধ করে কাটাতে শুরু করেছিল। কিন্তু অনিয়মিতভাবে শক্তিশালী কয়েকজন নেতার আবির্ভাব হয়েছিল, যারা সাম্রাজ্যের ধ্বংস ঠেকাতে চেষ্টা করেছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিলেন ডাইক্লেশিয়ান। ২৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি সম্রাট হয়েছিলেন, সাম্রাজ্যকে একত্রিত করার প্রচেষ্টায় খ্রিস্টান চার্চের উপর তিনি সর্বশেষ এবং হিংস্রতম নির্যাতনপর্বটি পরিচালনা করেছিলেন। কারণ তিনি তাদেরকে মিত্র না ভেবে বরং তার লক্ষ্য অর্জনে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছিলেন। এই ভয়াবহ নির্যাতনের পর্বটি শুরু হয়েছিল ৩০৩ খ্রিস্টাব্দে এবং যতদিন এটি চলেছিল, পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ, কিন্তু এর আগে যত নির্যাতনপর্ব এসেছিল, এটি তার কোনোটির চেয়ে বেশি সফল হতে পারেনি। এর দশ বছরের মধ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত হয়েছিল যখন চার্চ আর সাম্রাজ্য এক হয়ে গিয়েছিল।

৩০৫ খ্রিস্টাব্দে যখন ডাওক্লেশিয়ান অসুস্থ হবার পর সম্রাটের পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। খুব দ্রুত নেতৃত্বের ওপর দাবি করা প্রতিদ্বন্দ্বীরা আবার পরস্পরের সাথে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এবং এই প্রতিদ্বন্দ্বীদের সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং যোগ্যতম ব্যক্তি ছিলেন কনস্টান্টিন। ৩১২ খ্রিস্টাব্দে, রোমের উপকণ্ঠে একটি যুদ্ধের আগের রাতে, যে যুদ্ধটি নির্ধারণ করবে, কে রোমের পরবর্তী সম্রাট হবেন, কনস্টান্টিন তার তাঁবুতে ঘুমিয়েছিলেন, তিনি খুব জীবন্ত একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নে তিনি দেখেছিলেন খ্রিস্টীয় চিহ্ন ‘ক্রুশ’ তার সামনে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে, এবং তিনি একটি কণ্ঠ শুনতে পেয়েছিলেন, যা তাকে নির্দেশ দিচ্ছে, এই প্রতাঁকের নিচে তুমি জিতবে।

পরের দিন সকালেই তিনি সেই ব্যানার তৈরি করেন, এবং সেটি উজ্জ্বলভাবে ক্রুশের চিহ্ন দিয়ে অলংকৃত করেন, এবং যুদ্ধে যান, এবং তিনি সেদিন তার প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেছিলেন। পরের বছরই তিনি খ্রিস্টানদের নির্যাতন করার ডিক্রিটি বাতিল করে দেন এবং সাম্রাজ্য জুড়েই ধর্মপালনে অসীম স্বাধীনতা প্রদান করেন। ৩১৫ সালে তিনি ক্রুশবিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ডের প্রথাও বাতিল করেছিলেন, যা খ্রিস্টানরা তীব্রভাবেই ঘৃণা করে আসছিলেন। এবং ৩২৪ সাল নাগাদ, যদিও অন্য ধর্মগুলোর প্রতি সহিষ্ণু ছিল রোম, তিনি খ্রিস্টান ধর্মকে সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র বিশ বছরের মধ্যে নির্যাতিত অস্পৃশ্য একটি ধর্ম থেকে সম্রাটের প্রিয় ধর্মে রূপান্তরিত হবার ঘটনাটি ছিল আসলেই বিস্ময়কর একটি রূপান্তর।

কিন্তু খুব সরল হবে যদি কনস্টান্টিনের যিশুর ধর্মে ধর্মান্তরের বিষয়টিকে আধ্যাত্মিক হিসাবে দেখা হয়। তিনি খুবই ধূর্ত রাজনীতিবিদ ছিলেন, এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, একমাত্র খ্রিস্টধর্মই তার সাম্রাজ্যকে একীভূত করে রাখার ক্ষেত্রে আঠার মতো কাজ করবে : একটি বিশ্বজনীন চার্চ একটি বিশ্বজনীন সাম্রাজ্যের উপর মূদ্রিত করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন যখন আবিষ্কার করেছিলেন, মানুষ আর ঈশ্বর হিসাবে যিশুখ্রিস্টের প্রকৃতি সংজ্ঞায়িত করার শ্রেষ্ঠ উপায় নিয়ে চার্চ নিজেই বহু প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আছে। এই বিতর্কের সমাধানের পরিণতি এত ক্ষুদ্র একটি বিষয় ছিল, এটি আসলেই একটি মাত্র অক্ষরের ওপর নির্ভর করে ছিল, সেটি হচ্ছে আইয়োটা, আই (i) অক্ষরটির গ্রিক সংস্করণ। এই বিতর্ক সমাধান করার প্রত্যয়ে, ৩২৫ সালে কনস্টান্টিন বর্তমান তুরস্কের একটি শহর নাইসিয়ায় তার সাম্রাজ্যের সব বিশপ আর ধর্মতাত্ত্বিকদের ডেকে নিয়ে এসেছিলেন। এরপর তিনি তাদের একটি ঘরে বন্ধ করে রেখেছিলেন, এবং যতক্ষণ-না তারা এই সমস্যাটির সমাধান করতে পারেন ততক্ষণ তাদের মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। ‘আয়োটা’ কি বাদ যাবে, না গ্রহণ করা হবে? (সিজারিয়ার ইউসেবিয়াস যে-শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন সেটি হচ্ছে homoiousios বা ‘একই ধরনের উপাদানে তৈরি, এটি নাইসিয়ার কাউন্সিলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত, যিশু এবং ঈশ্বর পিতা হচ্ছেন homoousios বা একই উপাদানে তৈরি, তার থেকে ভিন্ন ছিল। সেই সময়ের খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করতেন যে, তারা একই ধরনের উপাদানে তৈরি, এর মানে হচ্ছে একজন যিশু তিনি পরিত্রাণকারী ঈশ্বর পিতার হুবহু নয়, যা ওল্ড টেস্টামেন্টের ঈশ্বর। উপরন্তু, যদি তারা একই ধরনের স্বর্গীয় উপাদানে তৈরি হয়ে থাকেন, তাদের মূল একেশ্বরবাদের মতবাদেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সৃষ্টি হয়। এভাবেই কাউন্সিল অব নাইসিয়া প্রস্তাব করেছিল যে, যিশু ও স্বর্গীয় পিতা একই উপাদানে তৈরি। আর homoiousios আর homoousios শব্দদুটির মধ্যে পার্থক্য ছিল একটি গ্রিক অক্ষর, আইওটা (i), আর এখান থেকেই সেই অভিব্যক্তিটি এসেছে, এক আইওটা পার্থক্য। অবেশেষে তারা আইওটাটি সেই শব্দ থেকে বাদ দিয়েছিলেন যা বিতর্কের মূলে ছিল। এই সমস্যাটির সমাধান হয় এবং পুরোপুরি ঈশ্বর আর পুরোপুরি মানুষ হিসাবে যিশুখ্রিস্টের প্রকৃতিটি অবশেষে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়েছিল।

কনস্টান্টিন এই ফলাফল নিয়ে এতই তৃপ্ত হয়েছিলেন যে, তিনি সব বিশপদের রাজকীয় একটি ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি তার দেহরক্ষীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তার প্রাসাদের দরজার সামনে তাদের তলোয়ারগুলো রেখে আসতে এবং বিশপরা আড়ম্বরের সাথে তার রাজকীয় কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন, সেখানে তারা রাজকীয় ভোজসভায় অংশ নেন পুরো কক্ষে চমৎকারভাবে সজ্জিত কাউচের উপর শুয়ে। একজন বিশপ এতটাই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন যে, তিনি এই অনুষ্ঠানটিকে বর্ণনা করেছিলেন যেন পৃথিবীতে অবশেষে খ্রিস্টের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু এমন কোনো দৃশ্য অবশ্যই যিশু তার নিজের বলে শনাক্ত করতে পারতেন না। যে শক্তি একদিন তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করেছিল সেটি এখন এর নিজের উদ্দেশ্যপূরণের লক্ষ্যে তাকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

ইতিহাসবিদরা এই ঘটনাটি চার্চের চুড়ান্ত বিজয় হিসাবে দেখেছেন, এর নির্যাতনকারীদের ওপর এবং ইউরোপীয় ইতিহাসে তাদের দীর্ঘ প্রাধান্য বিস্তারকারী পর্বের সূচনা হিসাবে। এটি নিজেকে ক্যাথলিক চার্চ (বিশ্বজনীন) নামে চিহ্নিত করতে শুরু করেছিল। কারণ এটি সারা রোমসাম্রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত ছিল। সাম্রাজ্যের ক্ষমতা যখন পড়তির দিকে, চার্চের ক্ষমতা তখন ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যতক্ষণ-না এটি সেই পর্যায়ে যেতে পেরেছিল, যখন এটি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল, এবং রাজারাও আতঙ্কিত থাকতেন এর কর্তৃত্বের সামনে। পার্থিব রাজনৈতিক শক্তির সাথে এর অংশীদারিত্ব পরিচিতি পেয়েছিল ক্রিসেনডম বা খ্রিস্টরাজ্য নামে। আর এই খ্রিস্টীয় রাজ্য এতই শক্তিশালী ছিল এর চূড়ান্ত শীর্ষে, গরিমার মেঘে আবৃত থাকা এর এই নতুন রূপের মধ্যদিয়ে তখন গ্যালিলি থেকে আসা সেই কৃষকটির রক্তাক্ত শরীরকে দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল, যিনি এই সবকিছুরই সূচনা করেছিলেন। প্রায়, তবে একেবারে অসম্ভব নয়। কারণ যদিও এখন একটি সত্যিকারের রাজমুকুট তার মাথার উপর শোভা পাচ্ছে এবং সত্যিকারের রাজকীয় বেগুনি চাদরে তিনি আচ্ছাদিত, যখন তারা চার্চে প্রার্থনা করতে আসত, খ্রিস্টানরা নিউ টেস্টামেন্ট থেকে সেই অন্য খ্রিস্টের বর্ণনা শোনা অব্যাহত রেখেছিলেন। তবে তিনি তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আর কখনোই ফিরে আসেননি। কিন্তু চার্চে সবসময়ই সেই মানুষগুলো ছিলেন যারা ভেবেছিলেন, এর কারণ হচ্ছে তিনি আসলেই কখনো চলে যাননি।

খ্রিস্টানদের গল্প শেষ হওয়া এখনো অনেক বাকি। এর শ্রেষ্ঠতম বছরগুলো এখনো আসা বাকি। তবে আমরা সেই কাহিনি ছেড়ে যাব পরের কয়েকটি অধ্যায়ে আরেকটি ধর্মের উত্থানের বিষয়টি দেখতে, যে-ধর্মটিও অতীতের আব্রাহামকে তাদের পিতা হিসাবে দেখেছিল : ইসলাম।

২২. শেষ নবী

তিনটি ধর্ম আব্রাহামকে তাদের পূর্বসূরি পিতা হিসাবে দাবি করে। আর এই দাবিটিকে বোঝার দুটি উপায় আছে। একধরনের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের রূপ হিসাবে এটিকে গ্রহণ করা যেতে পারে। আব্রাহাম তার একেশ্বরবাদের ধারণাটি প্রথমে হস্তান্তর করেছিলেন ইহুদিদের এবং তাদের মাধ্যমে খ্রিস্টানদের কাছে। তারপর সপ্তম শতাব্দীতে ইসলাম এটিকে পুনরায় দাবি করেছিল, যা এটিকে দেখেছিল এই ধর্মদুটির দ্বারা এর লঘুকরণ হিসাবে। কিন্তু এছাড়াও শারীরিক অর্থে আব্রাহামের উত্তরাধিকারের ধারণাটিকে বোঝা সম্ভব হতে পারে। আব্রাহামের ছেলে আইজাক ছিলেন ইজরায়েলের জনক, যার মধ্যে দিয়ে ইহুদি আর খ্রিস্টানরা তাদের বংশঐতিহ্য খুঁজে পায়। কিন্তু আব্রাহামের আরো একটি ছেলে ছিল। আর সেখানে একই কাহিনির সূচনা।

আব্রাহামের দুইজন স্ত্রী ছিলেন, সারা এবং তার মিশরীয় ভৃত্য হাজার। সারা হাজারকে ঈর্ষা করতেন। তিনি ভয় পেতেন যে আব্রাহাম হাজারের পুত্র ইসমায়েলকে তার উত্তরাধিকার হিসাবে ঘোষণা করবেন। সুতরাং দুজনকে নির্বাসনে পাঠাতে তিনি তার স্বামীকে প্ররোচিত করেছিলেন। হাজার তার শিশুপুত্রকে নিয়ে লোহিত সাগরের নিকটবর্তী মরুভূমিতে দিভ্রান্ত হয়ে ঘুরেছিলেন, সেখানে একটি পাথরের উপর বসে তিনি কাঁদছিলেন, কারণ তিনি নিজেকে খুব অসহায় আর দুঃখী অনুভব। করছিলেন। কিন্তু ইসমায়েল আদৌ বিষণ্ণ ছিলেন না। তিনি ক্ষুব্ধ, খুবই ক্ষুব্ধ ছিলেন। ইসলামের ঐতিহ্যমতো তিনি ক্ষুব্ধ অবস্থায় বালির উপর লাথি মারতে শুরু করেছিলেন। তিনি এত জোরে লাথি মেরেছিলেন যে, তিনি একটি ঝর্নার অস্তিত্ব উন্মোচন করেছিলেন, পানির যে ঝর্নাগুলো মরুভূমির সবুজ এলাকায় দেখা যায়, যাদের মরূদ্যান বলে। যখন আব্রাহাম শুনেছিলেন যে ইসমায়েল একটি মরূদ্যান সৃষ্টি করেছেন, তিনি তার পরিত্যক্ত স্ত্রী এবং সন্তানকে দেখতে আসেন, এই ঝর্নার কাছেই একটি উপাসনালয় নির্মাণ করেন, যে ঝর্নাটি তাদের জীবন রক্ষা করেছে। এই মন্দিরে তিনি একটি পবিত্র কালো পাথর স্থাপন করেছিলেন। আর সেই পাথরের সাথে সংশ্লিষ্ট আছে আরো একটি কাহিনি।

জেনেসিস, যে বইটি ইহুদি বাইবেলের প্রথম বই, আমাদের জানাচ্ছে, প্রথম পুরুষ ছিলেন আদম এবং তার স্ত্রীর নাম ছিল ইভ বা হাওয়া। আদম আর হাওয়া একটি বিস্ময়কর সুন্দর বাগানে বাস করতেন, যার নাম ইডেন, যেখানে তাদের কোনোকিছুরই অভাব ছিল না। বাগানের সব ফলের গাছের মধ্যে শুধুমাত্র একটি তাদের জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। এটাই ছিল ভালো আর খারাপ বোঝার সেই জ্ঞানবৃক্ষ। আদম এবং হাওয়া অপরিবর্তনশীল শিশুসুলভ একটি জীবন কাটাচ্ছিলেন, তাদের প্রতিটি চাহিদা পূরণ করেছিলেন ঈশ্বর। পিতামাতারা প্রায়শই তাদের সন্তানদের চিরকালই শিশু করেই রাখতে চান। কিন্তু শিশুরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে বড় হয়ে ওঠার জন্যে, ভালোমন্দের জ্ঞান অর্জন করার জন্যে। এই তাড়নাই আদম আর হাওয়াকে প্ররোচিত করেছিল সেই নিষিদ্ধ ফলটি খেতে। এবং সাথে সাথেই তাদের মন প্লাবিত হয়েছিল সেই জ্ঞানে, জীবন আর আগের মতো সরল নেই।

আর যখন আদম আর হাওয়া তাদের শিশুসুলভ সরলতা হারিয়েছিলেন, ঈশ্বর তাদের এই পৃথিবীতে নির্বাসিত করেছিলেন প্রাপ্তবয়স্কতার সব জটিলতাসহ। কিন্তু ইসলামে বর্ণিত এই কাহিনির বিবরণে, তিনি আদম আর হাওয়াকে সেই বাগান থেকে স্মারক হিসাবে কিছু একটা নিয়ে যাবার অনুমতি দিয়েছিলেন, যা কিনা চিরকাল তাদের সাথে থাকবে। তারা ইডেন হারিয়েছেন ঠিকই কিন্তু ঈশ্বরকে হারাননি। তাদের জন্যে স্বর্গের বাগানের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও ঈশ্বর তখনো তাদের সাথে ছিলেন। আর তারা স্বর্গ থেকে যে-জিনিসটি তাদের সাথে নিয়ে এসেছিলেন সেটি হচ্ছে একটি কালো পাথর, যা তাদের সাথে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে এসেছিল। আব্রাহাম সেই পাথরটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন, আর সেটাই তিনি সেই কাবায় স্থাপন করেছিলেন, যা তিনি নির্মাণ করেছিলেন ইসমায়েলের আবিষ্কৃত সেই মরূদ্যানে। এই কাবা ও এর বিখ্যাত পৌরাণিক কালো পাথরটিকে ঘিরেই একটি শহর গড়ে উঠেছিল। সেই শহরটির নাম মক্কা।

মক্কা (যা এখন সৌদি আরবের একটি শহর) আরব উপদ্বীপে লোহিত সাগরের পূর্বতীরে মোটামুটি মাঝামাঝি একটি জায়গায় অবস্থিত। আরব পৃথিবীর অন্যতম একটি রহস্যময় আর আকর্ষণীয় একটি এলাকা। আরব একটি বিশাল উপদ্বীপ, ১২০০ মাইল দীর্ঘ আর ১৩০০ মাইল প্রশস্ত পশ্চিমে লোহিত সাগর, দক্ষিণে আরব সাগর আর পূর্বে পারস্য উপসাগর এটিকে ঘিরে রেখেছে। এর অভ্যন্তরের বিশাল মরুভূমিতে বাস করত যাযাবরদের নানা গোত্র অথবা বেদুইনরা, যারা খুবই দৃঢ়সংকল্প এবং তীব্রভাবেই স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের দল, জেনেসিস সঠিক বিবরণ দিয়েছিল, যখন এটি ইসমায়েলকে বর্ণনা করেছিল, বন্য গাধার মতে, প্রতিটি মানুষের সাথে তার শত্রুতা, আর তার সাথে শক্রতা প্রতিটি মানুষের’। যদিও প্রতিদ্বন্দ্বী বেদুইন গোত্রগুলো পানির কুয়া আর মরূদ্যানের মালিকানা নিয়ে পরস্পরের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকত, কিন্তু সবাই মক্কা নামের এই পবিত্র শহরটিকে শ্রদ্ধা করতেন, এবং সেখানে তারা তীর্থে যেতেন সেই কালো পাথরটিতে চুমু খেতে, যা আদমের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে আব্রাহাম পেয়েছিলেন, এবং তারা সেই কুয়ায় পানি পান করেন, যা ইসমায়েল আবিষ্কার করেছিলেন। তাদের পিতামহ আব্রাহাম ছিলেন একজন আবেগময় একেশ্বরবাদী, কিন্তু তাদের সম্বন্ধে সেটি বলা সম্ভব ছিল না। যদিও তারা সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের ঈশ্বর আল্লাহর উপাসনা করতেন, কিন্তু তারা তাদের মূর্তিগুলোকে ভালোবাসতেন, বছরের প্রতিটি দিনের জন্যে তাদের একটি করে মূর্তি ছিল। এই তীর্থযাত্রীদের কাছ থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ী বেশ ভালোই উপার্জন করতেন, যারা কালো পাথরে চুমু এবং পবিত্র কুয়া থেকে পানি পান করতে আসতেন, তারা তাদের দোকান থেকে মূর্তি কিনতেন, যা কাবার চারপাশ ঘিরে বহুগুণে বেড়ে গিয়েছিল।

আব্রাহাম–যেমন প্রাচীন হিব্রু কাহিনি আমাদের বলেছে– জানতেন কত সহজে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা যায়। তিনি দেখেছিলেন পারিবারিক দোকানে বিক্রয় করতে তার বাবা দোকানে বসেই নানা দেবতাদের মূর্তি গড়তেন। যে মূর্তিগুলোকে তিনি প্রতারণা হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন, দরিদ্রদের থেকে অর্থ শুষে নেওয়ার ধূর্ত একটি কৌশল। মক্কায় যা হচ্ছিল সেটি দেখে তিনি নিশ্চয়ই আরো বেশি রেগে যেতেন, যেখানে ব্যবসায়ীরা তীর্থযাত্রীদের প্রয়োজনীয়তাগুলো বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করেছিল, যারা কিনা আধ্যাত্মিক সান্ত্বনার জন্যে সেখানে উপস্থিত হতেন। আর ধর্ম সময় নির্বিশেষে পবিত্র সব শহরেই এমন কিছু ঘটতে দেখা যায়। প্রয়োজন আছে এমন অভাবী মানুষের কাছে আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা বিক্রয় করে খুব দ্রুত আয় করা যায়। যিশু নিজেও এর বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ করেছিলেন, যখন জেরুজালেমে তিনি দেখেছিলেন কীভাবে পুরোহিতদের পরিবারগুলো গরিবের অর্থে বিত্তশালী হয়ে উঠেছে। এ কারণে তিনি মন্দিরে মূদ্রা রূপান্তকারীদের টেবিল উল্টে দিয়েছিলেন এবং তাদের বলেছিলেন তারা ঈশ্বরেরে ঘরকে ‘ডাকাতের’ আস্তানায় পরিণত করেছেন। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে একজন মানুষ মক্কায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যিনি যিশুর মতোই আব্রাহামের একেশ্বরবাদকে তার জন্মশহরে হকার, ফেরিওয়ালা আর দোকানি ব্যবসায়ীদের দ্বারা কলুষিত হতে দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তিনি মুহাম্মদ নামেই পরিচিত ছিলেন।

মুহাম্মদের জীবন আদৌ সহজ কোনো জীবন ছিল না, জন্মের আগেই তার বাবা মারা গিয়েছিলেন, আর ছয় বছর বয়সে তিনি তার মাকেও হারিয়েছিলেন। এতিম এই শিশুটিকে দেখাশুনা করেছিলেন তার দাদা, যতদিন-না তার চাচা, একজন সফল ব্যবসায়ী, আবু তালিব তাকে দত্তক নিয়েছিলেন। তিনি তরুণ মুহাম্মদকে উটচালক হিসাবে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। পণ্যবোঝাই উটের ক্যারাভান আরব-অর্থনীতির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। মরুভূমির মধ্যদিয়ে সেগুলো উত্তরে সিরিয়া, পশ্চিমে মিশর, প্যালেস্টাইন আর পূর্বে পারস্যে যাতায়াত করত। এই ক্যারাভানগুলো সুগন্ধী আর মশলা নিয়ে যেত, আর রেশম আর সুতির কাপড়ের বিনিময়ে সেগুলো বাণিজ্য করত তাদের দীর্ঘ যাত্রাশেষে দেশে ফিরে আসার আগে। নবী ইসাইয়া বর্ণনা করেছিলেন দক্ষিণ আরবের শেবা থেকে অসংখ্য মালবাহী উটের কাফেলা জেরুজালেমে সোনা আর ফাঙ্কিনসেন্স (ধূপ) নিয়ে আসত। আর এই ধরনের বাণিজ্যে মোহাম্মদ শিক্ষানবিশ হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন।

খুব দ্রুত তিনি শিখতে পারতেন এবং তার যোগ্যতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং সুনামের কারণে একজন ধনী বিধবা খাদিজা সিরিয়াগামী তার একটি ক্যারাভানের দায়িত্ব তাকে দিয়েছিলেন। মুহাম্মদ আর খাদিজা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে, তখন তার বয়স ছিল পঁচিশ আর খাদিজার চল্লিশ। তাদের মোট ছয়টি সন্তান হয়েছিল। চারটি মেয়ে এবং দুটি ছেলে, যে ছেলেদুটি শৈশবেই মারা গিয়েছিল। ফাতিমাই তার কন্যাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি আলীকে বিয়ে করেছিলেন, এবং হাসান ও হুসেইন, মুহাম্মদের প্রিয় দুই নাতির মা হয়েছিলেন।

মুহাম্মদ খুব সফল একজন ব্যবসায়ী ছিলেন, তার সততা আর নীতিপরায়ণতা তাকে একধরনের সামাজিক নেতা হিসাবে সুপরিচিত করে তুলেছিল, যার কাছে মানুষ নানা সমস্যার সমাধান খুঁজতে, ব্যবসা এবং পারিবারিক কোন্দল মীমাংসা করতে আসতেন। কিন্তু মুহাম্মদের মধ্যে আরো কিছু ছিল। তিনি একটি বিশেষ গ্রুপের সদস্য ছিলেন, যারা সর্বক্ষণই এই পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্বের কারণ আর লক্ষ্য খুঁজতে এর সীমায় এবং সীমানার বাইরে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছিলেন।

তারা মানবসমাজকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা এর কদর্যতার আর অবিচার নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। যদিও তারা শ্রদ্ধা করতেন, যেভাবে ধর্ম সংগ্রামরত মানুষকে তাদের সীমানার বাইরে আধ্যাত্মিক একটি বাস্তবতার সংস্পর্শে নিয়ে আসে, কিন্তু তারা জানতেন কত সহজে ক্ষমতাবানরা ধর্মকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারেন, তাদের নিজেদের লক্ষ্যপূরণে এবং সেইসব মানুষের কল্যাণের বিরুদ্ধে যাদের এটি সহায়তা করার কথা ছিল।

মক্কার কাবাকে ঘিরে থাকা ব্যবসায়ীদের বাজার দেখে বিরক্ত মুহাম্মদ তার চল্লিশ বছর বয়সে মক্কার বাইরে একটি গুহায় প্রায়শই প্রার্থনা আর ধ্যান করতে চলে যেতেন। আর এখানেই তিনি তার প্রথম দৈবদৃশ্যটি দেখেছিলেন, এবং প্রথমবারের মতো তার কণ্ঠ শুনতে পেয়েছিলেন, যে ঐশী দর্শন আর কণ্ঠ শোনা তার বাকি জীবন জুড়ে অব্যাহত ছিল। তিনি জানতেন, এই কণ্ঠটি সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে আসেনি, এটি এসেছে ফেরশতা জিব্রাইলের মাধ্যমে। তাকে উদ্দেশ্য করে উচ্চারিত জিবরাইলের প্রথম শব্দগুলো ছিল : ‘পড়ো, তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। ভ্রণ থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন’। মুহাম্মদ প্রথমে বুঝে উঠতে পারেননি আসলেই কী ঘটছে। তিনি কি কোনো অশুভ আত্মার কথা শুনলেন, যে তাকে প্ররোচিত করতে চাইছে? নাকি তিনি পাগল হয়ে যাচ্ছেন? যারা কণ্ঠ শোনেন বা কোনো দৃশ্য দেখেন, তাদেরও এই নামেই চিহ্নিত করা হয়? সুতরাং সংশয়ে আচ্ছন্ন মুহাম্মদ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই কণ্ঠ অসাধারণ সৌন্দর্যপূর্ণ শব্দসহ তার সাথে কথা বলা অব্যাহত রেখেছিল। এবং তিনি অবশেষে এটির ওপর বিশ্বাসস্থাপন করেছিলেন, এবং অনুধাবন করেছিলেন এই কণ্ঠটি তাকে নবী হবার আহ্বান জানাচ্ছে।

আর নবী হবার ক্ষেত্রে মূল বিষয়টি হচ্ছে, তারা যা কিছু শুনেছেন সেটি তারা নিজেদের মধ্যে চেপে রাখতে পারবেন না। সবাইকে সতর্ক করতে আর ঈশ্বর তাদের যা নির্দেশ দিয়েছেন সেটি অনুসরণ করতে তাদের প্ররোচিত করার দায়িত্ব দিয়েই নবীদের পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়। সুতরাং কয়েক বছর ফেরেশতা জিব্রাইলের কাছে ঐশী নির্দেশনা শোনার পর যে নির্দেশনাগুলো তিনি মুখস্থ করেছিলেন–এবং তার স্ত্রী খাদিজার উষ্ণ সহায়তা আর উৎসাহে, ৬১৩ খ্রিস্টাব্দে মক্কাবাসীদের কাছে মুহাম্মদ সেটি প্রচার করতে শুরু করেছিলেন। তার মূল বার্তাগুলোর মধ্যে একেবারে নতুন বা মৌলিক কিছু ছিল না এবং তিনি কখনো সেটি দাবিও করেননি। তারা যা কিছু ভুলে গেছেন এটি সেটাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল। এটি নবী আব্রাহামের বার্তা : মূর্তিগুলো সব মিথ্যা আর একমাত্র একজন আল্লাহ আছেন, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ঈশ্বর নেই।

মুহাম্মদের এই বার্তাটি বিশেষ করে দরিদ্রদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল, কারণ তাদেরকে ঠকিয়েই ব্যবসায়ীরা, যারা পবিত্র স্থানটি দেখাশুনা করত আর নানা ধরনের মূর্তি বিক্রয় করত, তারাই শুধু লাভবান হয়ে উঠেছিলেন। শীঘ্রই তিনি মক্কায় অনুসারীদের একটি দল পেয়েছিলেন, যারা, নিজেদের আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেছেন। আর এটাই ‘মুসলিম’ শব্দটির অর্থ। সবকিছুই ঠিকমতো চলছিল যতক্ষণ তিনি শুধুমাত্র ‘একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ঈশ্বর নেই এবং মুহাম্মদ হচ্ছেন তার শেষ নবী’ –এই বার্তাটি প্রচারের মধ্যেই নিজের কাজ সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। তখন ধর্মের সংখ্যা ছিল অনেক এবং আধ্যাত্মিকতার বাজারে সবসময়ই আরো একটি ধর্মের জায়গা থাকে। তবে বিষয়টি অন্যদিকে মোড় নেয়, যখন এই নতুন বিশ্বাসটি প্রতিষ্ঠিত স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যবসা আর সেই ব্যবসা থেকে অর্জিত লভ্যাংশ আদায়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার মতো আশঙ্কা সৃষ্টি করে। আর সেখানে সেটাই হয়েছিল। মুহাম্মদ এইসব ব্যবসায়ীদের সমালোচনা করেছিলেন, যারা কাবার পাশেই মূর্তির বাজারে মূর্তি বিক্রয় এবং পবিত্র কুয়া থেকে পানি পান করতে তীর্থযাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতেন। এরপর যা ঘটার সেই অনিবার্য ঘটনাগুলো ঘটতে শুরু করেছিল। সমগ্র মক্কাজুড়ে মুসলমানদের উপর নির্যাতন-নিপীড়নের পর্ব শুরু হয়েছিল।

সৌভাগ্যক্রমে, ইয়াথরিব শহরের একটি কূটনৈতিক দল, যারা মুহাম্মদকে ধর্মপ্রচার করতে শুনেছিলেন, তারা তাকে তার অনুসারীদের নিয়ে ইয়াথরিবে চলে আসার জন্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ইয়াথরিব থেকে আসা সেই জনপ্রতিনিধির দলটি জানত যে তাদের শহরে একজন নেতার দরকার, আর তারা ভেবেছিলেন, এই মানুষটি সেই দায়িত্বের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। মক্কা থেকে দুইশো মাইলের চেয়ে খানিকটা বেশি দূরে অবস্থিত ইয়াথরিব শহরে তার অনুসারীদের নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পুরো ব্যাপারটি ঘটেছিল খুব গোপনে। মুহাম্মদ, তার চাচাত ভাই আলী এবং বন্ধু আবু বকর সবার শেষে মক্কা ত্যাগ করেছিলেন। রাতের অন্ধকারেই তারা মক্কা ছেড়েছিলেন, ৬২২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে, যা এখন ‘হেজিরা’ (হিজরত) (অভিনিষ্ক্রমণ) নামে পরিচিত। এটি ছিল সেই মুহূর্ত যখন থেকে মুসলমানদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জিতে প্রথম বছরটি শুরু হয়েছিল। ইয়াগরিব নামের যে-শহরে তারা পালিয়ে গিয়েছিলেন, সেটির একটি নতুন নাম দেওয়া হয়েছিল, মদীনা বা নবীর শহর।

তবে এই হিজরত সব সমস্যার সমাধান করতে পারেনি, কারণ এর পরের দশ বছরে মক্কা আর মদিনার মধ্যে বেশকিছু যুদ্ধ হয়েছিল, অবশেষে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে তার জন্ম-শহরের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। আর কোনো উপায় নেই অনুধাবন করে, মক্কা আত্মসমর্পণ করেছিল এবং নবী শহরে প্রবেশ করেছিলেন। এর বাসিন্দার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধমূলক হামলা করা হয়নি, কিন্তু মুহাম্মদ কাবা থেকে সব মূর্তি অপসারিত করেছিলেন এবং মক্কাবাসীদের মুসলিম হবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এরপর তিনি মদীনায় ফিরে যান।

কিন্তু তার মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হয়েছিল। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মক্কায় শেষবারের হজ করতে গিয়েছিলেন এবং তার বিদায়ী ভাষণটি দিয়েছিলেন। কালো পাথরের কাবা আর পবিত্র ঝর্নার শহরে মোহাম্মদের এই শেষ ভ্রমণটি বিশেষভাবে উদযাপিত হয় এবং মক্কায় হজ বা তীর্থযাত্রা করার বিষয়টি পাঁচটি একান্ত কর্তব্যের ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ-একটিতে পরিণত হয়, যা মুসলমানরা তাদের জীবদ্দশায় পূর্ণ করবেন, এমন প্রত্যাশা করা হয়। কিন্তু নবী বিদায় হজের পর আর বেশিদিন বেঁচেছিলেন না। তিনি একটি জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুন মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তিনি একটি ধর্মবিশ্বাসকে রেখে গিয়েছিলেন যা বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম এবং এখনো ইতিহাসের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে যাচ্ছে। পরের অধ্যায়ে আমরা এর ধর্মতত্ত্বের সমৃদ্ধতা আর এর আচারগুলো নিয়ে আলোচনা করব।

২৩. সমর্পণ

‘ইসলাম’–একটি আরবি শব্দ, যা মুসলিম শব্দটির উৎস শব্দ, এবং এর সবচেয়ে ভালো অনুবাদ হতে পারে, আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি সমর্পণ”। এই ধর্মটির মূল বিশ্বাস আর ধর্মীয় আচারগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগে, এর নিকটতম সম্পর্কযুক্ত দুটি ধর্ম, ইহুদি এবং খ্রিস্টধর্মের সাথে এই ধর্মটির পার্থক্যটি কী, সেটি চিহ্নিত করা আমাদের উচিত হবে। একেশ্বরবাদী কোনো ধর্মের প্রথম মূলনীতি হচ্ছে ঈশ্বরের বাস্তবতা। আমরা এটিকে আরো সম্প্রসারণ করে বলতে পারি একেশ্বরবাদের জন্যে একমাত্র বাস্তবতাটি হচ্ছে ঈশ্বর।

এই মহাবিশ্বের কথা ভাবুন : বহু মিলিয়ন ছায়াপথ এবং হয়তো বহু মিলিয়ন মহাবিশ্ব যা আমাদের কাছে অদৃশ্য। একটা সময় ছিল যখন এসব কিছু সেখানে ছিল না। তাহলে কী ছিল সেখানে একেশ্বরবাদের মতে, ঈশ্বর ছিলেন সেখানে। এরপর যা কিছুই অস্তিত্বশীল হয়েছে সেগুলো এসেছে ঈশ্বরের কাছ থেকে, ঠিক যেভাবে কোনো উপন্যাসের পাত্রপাত্রীরা তাদের অস্তিত্ব পায় এর লেখকের মন থেকে। যখন হিন্দুধর্ম নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, মানুষকে উপন্যাসের চরিত্র হিসাবে ভাবার ধারণাটি আমি ব্যবহার করেছিলাম। আমি আবার এটি ব্যবহার করতে চাই, যখন আমি একেশ্বরবাদ নিয়ে চিন্তা করব, কিন্তু খানিকটা ভিন্ন কৌশলে। হিন্দুধর্মে কৌশলটি ছিল, সেখানে উপন্যাসের পাত্রপাত্রীরা আবিষ্কার করেছিলেন, তাদের আসলে সত্যিকারের কোনো অস্তিত্ব নেই। তারা মূলত একটি মায়া। আব্রাহামীয় ধর্মে চরিত্রগুলোর অস্তিত্ব আছে ঠিকই, কিন্তু তারা সেই একক ঈশ্বর সম্বন্ধে আরো কিছু জানতে চান, সেই লেখক যিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন, তাদের সৃষ্টিকর্তা।

মনে রাখবেন, এই সবকিছু আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে বা মেনে নিতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু আপনি যদি ধর্মকে বুঝতে চান, তাহলে এটি যেভাবে চিন্তা করে আপনার মনকেও একইভাবে চিন্তা করার প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসতে হবে, যদিও শুধুমাত্র এই অধ্যায়টি পড়তে যতটা সময় লাগে, ততক্ষণ। একেশ্বরবাদী ধর্মগুলো কোনো বইয়ের সেই চরিত্রগুলোর মতো, যারা এর লেখকের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। এমনকি এভাবে ভাবতেই আপনার মাথা ঝিমঝিম করে ওঠার কথা। তাই কি করছে না? এই মহাবিশ্বের বইয়ের কিছু চরিত্র বলছে এটি স্পষ্ট যে, কেউ আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি সেই কাজটি করেছেন, তার সাথে আমাদের যোগাযোগ স্থাপন করার ইচ্ছাটা খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। অন্যরা বলেন, বোকার মতো কথা বলবেন না, কোনো লেখক নেই, শুধু বইটাই আছে, এই মহাবিশ্ব বা যে নামই আপনি এটিকে দেন না কেন, এটি এমনিই ঘটেছিল। এটি নিজেকে নিজেই লিখেছিল। সুতরাং আপনাদের কল্পিত সেই লেখকের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা বন্ধ করুন।

কিন্তু যারা এই সৃষ্টিকর্তার সাথে সংযোগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন, তাদের জন্যে এই প্রক্রিয়াটি অন্য যে-কোনো সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মতোই। নবী এবং ঋষিরা অপেক্ষা করেন এবং শোনেন এবং দূরদর্শিতা আছে তাদের, ভবিষ্যতে কী ঘটবে সেটি সম্বন্ধে তারা ধারণা করতে পারেন। তারা নিজেদের উন্মুক্ত করেন, যেন তাদের অস্তিত্বের উৎসটি তাদের মধ্যে দিয়ে নিজেকে উন্মোচিত করতে পারে। এবং এর বাস্তবতাটাই তাদের মনে তৈরি হয়, যেভাবে কোনো একটি চরিত্র নিজেকে এর লেখকের মনে বাস্তবায়িত করে তোলে। শুধুমাত্র ব্যতিক্রম, এটি আগের উপায়টির বিপরীত দিক বরাবর। একটি চরিত্র যা এর লেখককে বাস্তব একটি রূপ দেয়। খুব ধীরে ঈশ্বরের একটি চিত্র আবির্ভূত হয় যেন একটি আলোকচিত্র, যা কোনো একটি ডার্করুমে প্রস্ফুটিত করা হচ্ছে। ধর্মতাত্ত্বিকরা এই কর্মকাণ্ডকে বলেন, ইমার্জিং রিভিলেশন বা আবির্ভূত হতে থাকা কোনো উন্মোচন। এবং তারা সাধারণত দাবি করেন, ঈশ্বরের ছবি যা তাদের ধর্ম সমর্থন করে, সেটি এর বিকাশ প্রক্রিয়ায় অনেক বেশি অগ্রসর এর যে কোনো আদি সংস্করণ থেকে। ইহুদিবাদে সৃষ্টিকর্তার সাথে সাদৃশ্য বহুঈশ্বরবাদ অপেক্ষা বেশি। খ্রিস্টধর্ম ইহুদিবাদ থেকে অনেক উত্তমভাবে সংজ্ঞায়িত। কিন্তু ইসলাম দাবি করে তাদের কাছে এর সবচেয়ে নিখুঁত প্রতিকৃতিটি আছে, যা এর আগের যে-কোনোটির চেয়ে অনেক বেশি শ্ৰেষ্ঠ। সুতরাং আসুন, সেই জিনিসটি দিয়ে আমরা ইসলাম সম্বন্ধে আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রাখি, যা এটিকে ইহুদিবাদ আর খ্রিস্টধর্ম থেকে সবচেয়ে বেশি পৃথক করেছে : কুর’আন।

কুর’আনকে ইসলামের বাইবেল হিসাবে চিন্তা করবেন না। এখানে তিনটি বড় ধরনের পার্থক্য আছে। প্রথমটি হচ্ছে বাইবেল বিভিন্ন লেখক আর সম্পাদকের হাতে বহু শতাব্দী ধরে খুব ধীরে একত্রে একটি বইরূপে সংকলিত হয়েছিল। দ্বিতীয় পার্থক্যটি হচ্ছে, বাইবেল একটি লাইব্রেরি, এটি একক বা একটি মাত্র বই নয়। এবং তৃতীয় পার্থক্যটি, যদিও এটি ঈশ্বরের ঐশীবার্তা ধারণ করে, কিন্তু বাইবেল ‘মানবসৃষ্ট, মানুষের হাতে এটি এর রূপ পেয়েছে। কুর’আন সম্বন্ধে এধরনের কোনো বিবরণ ইসলাম ধর্মে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। ক্রমাগতভাবে আসা ঐশী প্রত্যাদেশের ধারারূপে এটি কেবল একজন মানুষের কাছেই এসেছিল তার জীবদ্দশায়। এবং যদিও এটির মাধ্যম ছিল একজন মানুষ, এটি মানবসৃষ্ট নয়। ঠিক যেমন করে বৈদ্যুতিক তার কোনো ভবনে বিদ্যুৎ বহন করে আনে, মুহাম্মদ কুর’আনের বাহক ছিলেন, এটির প্রবাহিত হবার পথ ছিলেন, কিন্তু সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে এর মূল ক্ষমতাটি এসেছে। কুর’আন হচ্ছে আল্লাহর মনের পার্থিব একটি রূপ, পৃথিবীতে আল্লাহর উপস্থিতি।

বাস্তবিকভাবে কুর’আন মুসলমানদের কাছে সেটাই, যিশুখ্রিস্ট খ্রিস্টানদের কাছে ঠিক যেমন। খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করেন যিশু হচ্ছেন পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি। মানুষরূপে ঈশ্বর নিজেকে লভ্য করেছিলেন এই পৃথিবীর কাছে। বেশ, মুসলমানদের কাছে কুর’আন সেরকমই। এটি তাদের কাছে ঈশ্বরের সমান। কুর’আন শব্দটির মানে হচ্ছে আবৃত্তি। এটি ফেরেশতা জিবরাইল আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন নবীর কানে। এরপর এটি নবী তার অনুসারীদের জন্যে আবৃত্তি করেছিলেন, তার মৃত্যুর পর এর একটি লিখিত রূপ অর্জন করেছিল। আর ধর্মনিষ্ঠ মুসলমানরা এখনো এটিকে সম্পূর্ণরূপে মুখস্থ করেন, যেন তারা এর ১১৪টি অধ্যায় বা সুরা, প্রথম থেকে এর শেষ অবধি তাদের স্মৃতি থেকেই আবৃত্তি করতে পারেন।

মুহাম্মদ বিশ্বাস করতেন, যা শুরু হয়েছিল ইহুদিদের মাধ্যমে এবং আরো অনেকটা বিবর্তিত হয়েছিল খ্রিস্টানদের সাথে, সেটি পূর্ণতা পেয়েছে তার নবুয়তের অধীনে। কুর’আন তাকে বর্ণনা করেছে নবীদের সিলমোহর’ বা শেষ নবী হিসাবে। তারপরে আর কোনো নবীই আসবেন না। নবীদের এই ধারাবাহিকতা সমাপ্ত হয়েছে। এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এবং ইসলাম হচ্ছে এর ক্রটিহীন চূড়ান্ত রূপ।

ইহুদি আর খ্রিস্টানরা যখন বিষয়টি সেভাবে দেখেননি, মুহাম্মদ হতাশ হয়েছিলেন। যদিও তাদের এই প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। পুরনো ধর্মের রক্ষকরা, তাদের দিন শেষ এবং তাদের উচিত নতুনের জন্য পথ ছেড়ে দেওয়া, এমন কিছু স্বীকার করতে সবসময়ই অনিচ্ছুক থাকেন। মুহাম্মদ আশা করেছিলেন যে, তিনি মদিনার ইহুদি আর খ্রিস্টধর্মীয়দের প্ররোচিত করতে পারবেন যে, আসলে তিনি তাদের শত্রু নন বরং তিনি তাদের ধর্মের পরিপূর্ণ রূপ, সেই পরিণতি, যার জন্যে তারা অপেক্ষা করছিলেন। কুর’আনে যেমন বলা হয়েছে, তিনি আপনার কাছে সত্যের সেই বইটি পাঠিয়েছেন, ইতিপূর্বে যা ছিল এটি সেটাই নিশ্চিত করেছে, এর আগে তিনি ‘তোরা’ আর ‘গসপেল পাঠিয়েছেন। আর সে-কারণে মুহাম্মদ প্রথমে তার অনুসারীদের জেরুজালেমের দিকে ফিরে উপাসনা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। শুধুমাত্র যখন ইহুদি আর খ্রিস্টানরা তাকে তাদের নবী হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তখন তিনি এর পরিবর্তে মক্কার দিকে ফিরে প্রার্থনা করতে তার অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন, নবী হিসাবে তাদের এই প্রত্যাখ্যানটি, যদিও দুঃখজনক তবে, তাদের পূর্বের সব আচরণের সাথে সংগতিপূর্ণ। ইহুদিরা সবসময়ই সেই নবীদের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, ঈশ্বর যাদের প্রেরণ করেছিলেন। তাদের শেষ প্রত্যাখ্যান ছিল নবী যিশু (ইয়েসুস বা ইসা)। তাকে ঈশ্বরে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে এমনকি খিস্টানরাও যিশুকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। একজন মাত্র আল্লাহর একত্ববাদে গভীরভাবে বিশ্বাসী, মুহাম্মদ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, খ্রিস্টানরা শুধুমাত্র ঈশ্বরকে একটি পুত্রই দেয়নি, স্বর্গে ঈশ্বরের পাশে বসানোর জন্যে তারা একই সাথে দুটি অন্য স্বর্গীয় সত্তাকেও সৃষ্টি করেছেন। এর কারণ খ্রিস্টানরা ‘ট্রিনিটি’রূপে ঈশ্বর সম্বন্ধে একটি তত্ত্ব বিবর্তন করেছিলেন, অথবা যেখানে একজন ঈশ্বর তিনটি ভিন্ন উপায়ে প্রকাশিত হয়েছে : মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরুতে সেই সৃষ্টিকর্তা পিতা, পৃথিবীতে তার জীবনে যিশুখ্রিস্টের মধ্যে পুত্র, এবং সেই স্পিরিট বা পবিত্র আত্ম হিসাবে, যা ইতিহাসের মধ্যদিয়ে মানবতাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সময়ের শেষ অবধি। এই জটিলভাবে পরিকল্পিত ধর্মতাত্ত্বিক প্রকৌশলের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ গর্জে উঠেছিলেন : ‘লা ইলাহা ইল্লা আল্লাহু ওয়া-মুহাম্মদ রাসুল আল্লাহ’।

তাদের ধর্মবিশ্বাসের অংশ হিসাবে ইসলামের অনুসারীদের পাঁচটি প্রধান কর্তব্য পালন করতে হবে, কখনো যেগুলোকে ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ’ বলা হয়। প্রথম কর্তব্যটি হচ্ছে আন্তরিক সমর্পণের সাথে শাহাদা পাঠ বা আরবি ভাষায় আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ঘোষণা, যে-বাক্যটি দিয়ে আমি আগের অনুচ্ছেদটি শেষ করেছি : আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ঈশ্বর নেই, আর মুহাম্মদ হচ্ছেন তার নবী। একেশ্বরবাদের এই অভিব্যক্তির উচ্চারণ হচ্ছে একটি রূপ, যার মাধ্যমে মুসলমানরা তাদের বিশ্বাস ঘোষণা করেন এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতরা এটি ব্যবহার করে তাদের স্বীকারোক্তি প্রদান করেন।

দ্বিতীয় স্তম্ভটি হচ্ছে, মক্কার দিকে মুখ করে সর্বশক্তিমান আল্লাহর উদ্দেশ্যে দিনে পাঁচবার প্রার্থনা করা, যাকে বলা হয় সালাত (বা নামাজ), আর সালাতের এই প্রার্থনা করা হয় ভোরে, দুপরে, বিকালের মাঝখানে, সূর্যাস্তে এবং সূর্যাস্ত আর মধ্যরাত্রির মধ্যবর্তী একটি সময়ে। পৃথিবীর হৃদয়স্পর্শী শব্দগুলোর একটি হচ্ছে মুয়াজ্জিনের (বা যিনি সবাইকে প্রার্থনা করতে ডাকেন), সেই আহ্বান : আজান। কোনো মসজিদের মিনারের উঁচু ব্যালকনি থেকে যা বিশ্বাসীদের প্রার্থনা করতে আহ্বান জানায়। তিনি পালাক্রমে কম্পাসের চারটি দিকের প্রতিটি দিকে মুখ ফিরিয়ে চিৎকার করে বলেন : ‘আল্লাহ হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ হচ্ছেন আল্লাহর নবী। নামাজ পড়তে আসুন, মুক্তি পেতে আসুন। আল্লাহ হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ’। বর্তমানে প্রার্থনায় ডাকার এই আহ্বান মূলত আধুনিক শহরের নানা শব্দের মধ্যে অমসৃণভাবে বাজানো আজানের কোনো রেকর্ডিং। কিন্তু কোনো নীরব আফ্রিকার গ্রামে মুয়াজ্জিনের সেই ছড়িয়ে পড়া আহ্বানটি ভোরবেলা শোনা, আকুল আকাঙ্ক্ষার একটি তীরে বিদ্ধ হওয়ার মতো অনুভূত হতে পারে।

ধর্মটির তৃতীয় স্তম্ভটি হচ্ছে জাকাত, অথবা দান করা, যেহেতু সব সম্পদই এসেছে আল্লাহর দয়ায়, ধার্মিক মুসলমানদের জন্যে দান করা মানে আল্লাহর কাছে সেই সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া, তিনি একাই যে সম্পদের একমাত্র মালিক। এটি আরো একটি উপায়, যার মাধ্যমে সেই সম্পদের দ্বারা সমাজের দরিদ্র ও অসহায়রা উপকৃত হতে পারেন, এবং একই সাথে ইসলাম ধর্ম প্রচারেও ব্যবহৃত হতে পারে। ইসলাম একটি মিশনারি বা প্রচারের ধর্ম, যার লক্ষ্য পুরো পৃথিবীকে এর দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তর করা, একটি একক সংঘ অথবা উম্মা, যেখানে বিশ্বাস ও জীবন একীভূত হয় পূর্ণাঙ্গ একটি রূপে। উম্মাহতে এমন কোনো বিন্দু থাকবে না যেখানে ধর্ম শেষ হবে আর সমাজের সূচনা হয় অথবা যেখানে সমাজের শেষ হয় আর ধর্মের সূচনা হয়। এটি একই জিনিস হবে।

চতুর্থ স্তম্ভটি হচ্ছে, রমজান (বা রামাদান) মাসে মাসব্যাপী রোজা রাখা, যে মাসটি ইসলামি ক্যালেন্ডারের নবম মাস। ত্রিশ দিন ধরে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অবধি এই রোজা পালন করা হয়। এই সময়ে কোনো খাদ্য গ্রহণ অথবা পানীয় পান করা যাবে না। কিন্তু এটি শুধুমাত্র খাদ্য আর পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকা নয়। রমজানের শেষের দিকে মসজিদে বিশেষ কিছু অনুষ্ঠান পালন করা হয়, যেগুলো বিশ্বাসীদের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা-সংক্রান্ত জ্ঞান বৃদ্ধি করার জন্যে পরিকল্পিত হয়েছে। এবং রমজানের সাতাশতম দিনটি বিশেষ মর্যাদার সাথে পালন করা হয়, শবে-ই-কদর বা শক্তির রাত, এটি সেই প্রথম রাতটিকে চিহ্নিত করে, যখন মক্কার বাইরে একটি গুহায় মুহাম্মদ প্রথম আল্লাহর নিকট থেকে ঐশী প্রত্যাদেশ বা ওহী পেয়েছিলেন, যা পরৈ কুর’আন হয়েছিল। রমজান শেষ হয় ঈদ-উল-ফিতর উৎসবের মাধ্যমে। রোজা শেষ হবার পর একটি আনন্দোৎসব। ঈদ হচ্ছে আনন্দের একটি সময় যখন পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের সাথে দেখা করেন এবং উপহার বিনিময় করেন।

পঞ্চম কর্তব্য আমি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি, মক্কায় হজ করতে যাওয়া। প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ পড়া আর রমজান মাসে রোজা রাখার চেয়ে মক্কায় হজ করতে যাওয়া বেশ বড় একটি ব্যাপার। সুতরাং মুসলমানদের কাছে প্রত্যাশা করা হয় যে, তারা তাদের জীবনে মাত্র একবার এই কাজটি করবেন। হাজিরা আব্রাহামের কাবা প্রদর্শন করেন, যা এখন মক্কার বিশাল মসজিদ, আল-মাসজিদ আল-হারামের মধ্যে অবস্থিত বিশাল কিউব বা ঘণক্ষেত্র আকৃতির একটি ভবন। হাজিরা কাবার চারপাশে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতদিকে সাতবার প্রদক্ষিণ করেন। তারপর তারা সাফা আর মারওয়া নামের দুটি ছোট পাহাড়ের কাছে যান। সেখানে দুটি পাহাড়ের মধ্যে হয় তারা দৌড়ান অথবা দ্রুত হাঁটেন হাজারের সেই নিদারুণ যন্ত্রণাকে স্মরণ করে, যখন তিনি তার পুত্র ইসমায়েলের জন্যে তপ্ত শুষ্ক মরুভূমিতে পানির জন্যে ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করেছিলেন, যে পানির স্রোতধারা ক্ষুব্ধ ইসমায়েলের পায়ের লাথির মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছিল। হজের আরো একটি নাটকীয় উপাদান হচ্ছে তিনটি স্তম্ভের প্রতি লক্ষ করে যখন হাজিরা পাথর নিক্ষেপ করেন, যেগুলো পৃথিবীর অশুভ সবকিছুকেই প্রতিনিধিত্ব করে। মুসলমানদের জন্যে হজের অভিজ্ঞতা এত তীব্র আর জীবনরূপান্তরকারী হতে পারে যে, তারা এই অর্জনটিকে তাদের নামের সাথে একটি পদবী হিসাবে ব্যবহার করতে পারেন। পুরুষদের জন্যে হাজি এবং মহিলাদের জন্যে হাজা।

এই পাঁচটি কর্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এর অনুসারীদের অনুসরণ করার জন্যে ইসলামকে খুব স্পষ্ট আর জটিলতামুক্ত একটি ধর্মে পরিণত করেছিল। কিন্তু এর ব্যবহারিক স্তরে এর দুটি খুবই শক্তিশালী আবেগ-উদ্রেককারী বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথমটি হচ্ছে নবী মোহাম্মদের প্রতি ভক্তি, যা প্রায় সত্যিকারের উপাসনার। কাছাকাছি যায়, তবে কখনোই সেই বিন্দুতে পৌঁছায় না। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য ঈশ্বর নেই, আর মুহম্মদ হচ্ছেন আল্লাহর শেষ নবী, মুহম্মদকে উপাসনা করা যাবে না–কারণ তিনি ঈশ্বর নন–কিন্তু তিনি এত বেশি শ্রদ্ধেয় যে, যখনই তার নাম উচ্চারিত হয় প্রচলিত নিয়ম হচ্ছে তার পরে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সা.) (যার অর্থ হলো তার ও তার পরিবারের ওপর আল্লাহর দয়া-করুণা ও শান্তি বর্ষিত হোক)। আর সে-কারণেই মুসলমানরা খুবই উত্তেজিত এবং ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন, যখন তাদের নবীকে ব্যঙ্গ বা অবিশ্বাসীরা তার চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করেন।

কিন্তু আল্লাহর প্রতি মুসলিমদের সমর্পণ আরো অনেকটাই উচ্চস্তরের, তাদের নবীর প্রতি শ্রদ্ধার চেয়েও যা অনেক বেশি। ইসলামের একেশ্বরবাদ খুবই তীব্র এবং আবেগীয়, যা সারাক্ষণই আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয় এই ধারণাটির ওপর গুরুত্বারোপ করে। কুর’আন বেশ কাব্যিক হয়ে ওঠে যখন এটি আল্লাহর সৌন্দর্য বর্ণনা করে। কুর’আনের হৃদয়স্পর্শী অধ্যায়গুলোর একটি হচ্ছে ১৩ নং সুরা, যে অধ্যায়টি আল্লাহর সবচেয়ে সুন্দর নিরানব্বইটি নামের ঘোষণা দিয়েছে। নিচে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।

আল্লাহ, যে নামটি’ সব নামের উপরে…
দয়াময়, যারা দয়া প্রদর্শন করে তাদের সবার চেয়ে যিনি দয়ালু…
সহমর্মী, যিনি কোমল এবং সহমর্মিতায় পূর্ণ…
পর্যবেক্ষণকারী, যিনি তার সৃষ্টির ওপর লক্ষ রাখেন…
ক্ষমাশীল, যিনি সবসময়ই ক্ষমা করতে প্রস্তুত …

কুর’আনের ভাষার মাধুর্য আর সান্ত্বনা আছে। কিন্তু সেখানে শুধুমাত্র সেটাই আমরা পাই না, এমনকি সুরা ১৩য় সেই সতর্কবাণীও আছে, আল্লাহর সাথে পৃথিবীর সম্পর্কে সান্ত্বনা যেমন আছে, তেমন ভয়ের ব্যাপারও আছে আরো দুটি নাম যেমন:

পীড়াদানকারী, যিনি কষ্ট দেন এবং আশীর্বাদও দেন…
প্রতিহিংসক, যিনি পাপীদের ওপর তার প্রতিহিংসার প্রকাশ ঘটান…

কুর’আন আল্লাহর সৌন্দর্যের প্রশস্তিতে পূর্ণ। এছাড়াও এটি পাপী আর অবিশ্বাসীদের প্রতি তার ক্ষোভে বজ্রকণ্ঠের কথাও বলে। সুতরাং আল্লাহর সেই দিকটি এবং বহু মানুষের জন্যে এর পরিণতিটি কী, সেটি অনুসন্ধান করার এখন সময় হয়েছে।

২৪. সংগ্রাম

একজন নবী ছাড়াও মুহাম্মদ একজন যোদ্ধা ছিলেন, যিনি ইসলামের প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তার অনুসারীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর এই দুটি ভূমিকার মধ্যে। তিনি কোনো স্ববিরোধিতাও লক্ষ করেননি। যুদ্ধগুলো তিনি যুদ্ধ করার উত্তেজনা কিংবা লুটতরাজ করার লক্ষ্যে পরিচালনা করেননি, যদিও কোনো সন্দেহ নেই তার বহু অনুসারী দুটোই উপভোগ করেছিলেন। তার আধ্যাত্মিক লক্ষ্য অর্জনে যুদ্ধ একটি উপকরণ ছিল, আর আমরা যদি তাকে বুঝতে চাই–অথবা ইতিহাসে যে কোনো ধর্মীয় নেতা, যারা তাদের লক্ষ্য অর্জনে সহিংসতা ব্যবহার করেছিলেন– আমাদের তাহলে অবশ্যই তার মনের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করতে হবে।

প্রথম যে-জিনিসটি বুঝতে হবে সেটি হচ্ছে নবীর মতো ভবিষ্যতের স্বপ্নদ্রষ্টা কোনো মানুষের জন্যে এই পৃথিবীর জীবনটি মূল লক্ষ্য ছিল না, এটি এমন কিছু ছিল যা মূল লক্ষ্যটি অর্জনের খাতিরেই উপভোগ করতে হয় মাত্র। এটি ক্ষণস্থায়ী এবং দুঃখের, মোয়াজ্জিনের আজানের মতো বিষণ্ণ। এটি শুধুমাত্র শুরু, সংগীতের আবেগগাদ্দীপক সূচনা অনুচ্ছেদ, একটি ভূমিকা, আর নাটকের মূল অঙ্কটি, যা মৃত্যুর পর আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে, যেখানে আসল কাহিনিটি মঞ্চস্থ হবে। আর এই পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান করার উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্ধারণ করা কীভাবে আমরা সেই অনন্ত জীবনটি কাটাব, যা মৃত্যুর পরে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে।

ধরুন আপনাকে ইস্পাত-কঠিন একটি নিশ্চয়তা দেওয়া হলো, যদি আপনি কয়েক মিনিটের জন্যে তীব্র যন্ত্রণাপূর্ণ একটি পরীক্ষা সহ্য করতে পারেন তাহলে আপনাকে এক বিলিয়ন ডলার দেওয়া হবে, যা ইতিমধ্যে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে গেছে, শুধুমাত্র সক্রিয় হবার জন্যে আপনার সম্মতি দরকার। আপনি কীভাবে জবাব দেবেন? আপনি কি সেই কয়েক সেকেন্ডের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করবেন, সেই সম্পদ জয় করতে, যা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে, যখন এটি শেষ হবে? সম্ভাবনা আছে আপনি হয়তো এই সুযোগটা নিতে রাজি হবেন।

আর এটাই হচ্ছে সহিংসতার নেপথ্যে থাকা যুক্তিপ্রক্রিয়াটি, যা প্রায়শই ধর্মকে চিহ্নিত করে। শল্যচিকিৎসকদের নিষ্ঠুরতাই আমাদের কেটে উন্মুক্ত করে, তবে আমাদের কষ্ট দিতে নয়, বরং আমাদের জীবন বাঁচাতে। কিছু বিশ্বাসী শহীদ হিসাবে তাদের জীবন বিসর্জন দেয় সেই পরমানন্দের জন্যে, যা মৃত্যুর অন্যপাশে তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। আর অন্যরা, বন্ধু কিংবা আগন্তুকদের শরীরের উপর যন্ত্রণা আর মৃত্যু আরোপ করাটাকেই তাদের আক্রমণ থেকে নিজেদের বিশ্বাসকে রক্ষা করার লক্ষ্যে তাদের কর্তব্য বলে মনে করেন। পছন্দ করুন বা না করুন, এটাই পবিত্র যুদ্ধ আর নিষ্ঠুর জাতিগত বিশোধনের নেপথ্যে থাকা যুক্তি, যা ধর্মের ইতিহাসে অপরিবর্তনীয় একটি বৈশিষ্ট্য।

নিকটবর্তী এলাকা এবং তারপর জানা পৃথিবীর সর্বশেষ প্রান্ত অবধি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্যে যে মুসলমানরা প্রথম লড়াই করেছিলেন, পবিত্র যুদ্ধ-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে তাদের মতো এত দক্ষ আর কেউ ছিলেন না। মুহাম্মদের মৃত্যুর একশো বছর পরেই উত্তরে সিরিয়া আর পশ্চিমে মিশরের নিয়ন্ত্রণ দখলে নিয়েছিল ইসলাম। মিশর থেকে উত্তর-আফ্রিকার অন্য দেশগুলোয় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একটি সময় প্যালেস্টাইন ও পারস্যের একটি বড় অংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল ইসলামি যোদ্ধারা। ইসলাম ভারত এবং চীনে পৌঁছেছিল। এবং এটি স্পেন বিজয় করেছিল, যেখানে এটি খ্রিস্টান এবং ইহুদিদের কর্মকাণ্ডের প্রতি সীমিত আকারে সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেছিল। একটি সময় ছিল যখন মনে হচ্ছিল এটি পুরো ক্যাথলিক ইউরোপই দখল করে নেবে, তবে তাদের সেই আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এটি যত যুদ্ধ লড়েছে বা যে-পরিমাণ এলাকা জয় করেছিল সেগুলো বর্ণনা করার চেয়ে বরং যে ধর্মতাত্ত্বিক যৌক্তিকতা ধর্মটি প্রস্তাব করেছিল, সেই বিষয়টি অনুসন্ধান করতেই বরং আমি আরো বেশি আগ্রহী। এবং তাদের একটি এখনো বর্তমান সময়ের এই পৃথিবীতে খুবই প্রাসঙ্গিক। এটি হচ্ছে ‘জিহাদ’ বা সংগ্রামের ধারণা।

মুসলমানদের একটি অংশ জিহাদকে ইসলামের অনানুষ্ঠানিক ষষ্ঠ স্তম্ভ হিসাবে বিবেচনা করে থাকেন। আসলেই, ইসলামের পাঁচটি কর্তব্য পালন করার সংকল্পবদ্ধ প্রচেষ্টাকেই ‘জিহাদ’ হিসাবে দেখা হয়। শব্দটির অর্থ সংগ্রাম অথবা প্রচেষ্টা। হতে পারে এটি ধর্মবিশ্বাসকে ধরে রাখা এবং একটি ন্যায্য সমাজপ্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম অথবা ইসলামকে এর শত্রুদের থেকে সুরক্ষা করার সংগ্রাম। বহু শতাব্দী ধরেই এই দুটি অর্থেই জিহাদের চর্চা করে আসা হচ্ছে, এবং এর হিংস্রতম রূপে এমনকি মুসলমানরা এটি মুসলমানদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন। একই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সহিংস মতানৈক্য ইতিহাসে বেশ সাধারণ একটি ঘটনা। নবীন, সদ্যপ্রতিষ্ঠিত ইসলামি সমাজের মধ্যে ফাটল ধরা শুরু হবার জন্য শুধুমাত্র মুহাম্মদের মৃত্যুই যথেষ্ট ছিল। আর যে রূপ এটি নিয়েছিল সেটি ধর্ম কীভাবে নিজেকে সংগঠিত করে এবং নিজেদের মধ্যে বিভেদের কারণগুলো মীমাংসা করে সে-বিষয়ে আমাদের অনেক কিছুই বলে।

এই প্রসঙ্গে প্রশ্নটি ছিল, নবীর উত্তরাধিকার কার হওয়া উচিত আর কোন নীতির ওপর ভিত্তি করে এই নিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যা ঘটেছিল তা হলো মুহাম্মদের বন্ধু এবং অনুগত সহকর্মী আবু বকর প্রথম খলিফা’ বা উত্তরসূরি হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সমস্যাটি শুরু হয়েছিল চতুর্থ খলিফা হিসাবে মুহাম্মদের নিজের চাচাত ভাই এবং জামাতা আলীকে যখন নির্বাচিত করা হয়েছিল, যিনি নবী-কন্যা ফাতিমার স্বামী ছিলেন। আলীকে খলিফা হিসাবে নিয়োগ করা ব্যাপারটি অনেকেই সমর্থন করতে পারেননি। এটি ইসলামকে বিভাজিত করেছিল, যা এখনো টিকে আছে। একটি গোষ্ঠী নবীর নিজের আত্মীয় আলী নয়, বরং তৃতীয় খলিফার একজন জ্ঞাতিভাই, মুয়াবিয়াকে চতুর্থ খলিফা হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন। এর পরবর্তীতে যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সূচনা হয়েছিল, সেখানে আলীকে হত্যা করা হয় এবং মুয়াবিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। আলীর সমর্থকরা এরপর দাবি করেছিলেন আলীর পুত্র হুসাইনকে এরপর খলিফা হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হোক। কিন্তু ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে একটি যুদ্ধে হুসাইন নিহত হয়েছিলেন।

এই সংঘর্ষের পরিণতিতে ইসলামে একটি বিভাজন ঘটেছিল, ধর্মতত্ত্বে যার কারিগরি নাম ‘স্কিজম’ (ধর্মবিচ্ছেদ), ধর্মের ইতিহাসের যে-কোনো ছাত্রের জানার জন্যে বেশ উপযোগী একটি শব্দ, যা তাদের কারিগরি শব্দভাণ্ডারে থাকা দরকার। উপযোগী অন্য বহু শব্দের মতো, ‘স্কিজম’ শব্দটিও এসেছে গ্রিকভাষা থেকে, যার মানে কাটা বা ছেদ করা। একটি স্কিজম হচ্ছে একটি গোষ্ঠী, যা মূল দলের শরীর থেকে নিজেদের ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে পৃথক করে নেয়, এবং নিজেদের স্বতন্ত্র একটি গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করে। এই ধরনের বিচ্ছেদের নেপথ্যে সাধারণত ধর্মীয় মতানৈক্য থাকে। আর এই ক্ষেত্রে একটি খুব সাধারণ মতানৈক্য হচ্ছে, কীভাবে তাদের আধ্যাত্মিক নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হবে। খ্রিস্টধর্মে করা যিশুর সেই বারোজন অ্যাপোস্টলের সত্যিকার উত্তরসূরি কে হবেন, সেই মতানৈক্যটি একসময় খ্রিস্টীয় চার্চেও ধর্মবিচ্ছেদের কারণ হয়েছিল, যা এখনো অব্যাহত আছে, ঠিক ইসলামের ধর্মবিচ্ছেদের মতো।

ইসলামের ভাঙন সুন্নী এবং শিয়া নামে দুটি গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছিল। সুন্নীরা ছিল অপেক্ষাকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ, শিয়ারা মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজেদের পৃথকভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। সুন্নী অর্থ হচ্ছে সেই মানুষ যারা মূল সুন্না বা নবীর পথের অনুসারী। শিয়া মানে আলী’র দল, যারা বিশ্বাস করে নবীর উত্তরসূরিকে একজন ইমাম বা নবীর বংশধর হতে হবে। মূল দুটি দলের প্রত্যেকটির মধ্যেই এখন অসংখ্য বিভাজন আছে, এই বাস্তব তথ্যটি আমাদের ধর্ম আসলে কতটা ভঙ্গুর হতে পারে সেই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়, বিশেষ করে যখন নেতৃত্বের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে সেই বিতর্কটির মুখোমুখি হতে হয় তাদের।

ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোতে নেতৃত্ব নিয়ে সংগ্রামকে আমরা অন্যদের ওপর প্রভুত্ব করার মানবিক দুর্বলতার একটি উদাহরণ হিসাবে বাতিল করতে পারি। সেগুলো। ধর্মের পার্থিব দিকটির প্রতিনিধিত্ব করে। সেই ঘটনাগুলো দুঃখের, তবে অবশ্যম্ভাবী। ঈশ্বরের ঐশী প্রত্যাদেশের মাধ্যমে সৃষ্ট ধর্মগুলো, অন্যদিকে, সরাসরি আমাদেরকে ঈশ্বরের মনের মধ্যে আর স্বর্গের জীবনের দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা। সুতরাং খুবই অস্বস্তিকর যখন আবিষ্কার করতে হয় যে, পৃথক আর বিভাজিত হবার সেই একই তাড়না সেখানে উপস্থিত থাকে। এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবন অনেকটাই মৃত্যুর আগের জীবনের মতোই মনে হয়। স্মরণ করুন, কুরআন দাবি করে, যখন পার্থিব এই দৌড়-প্রতিযোগিতার সমাপ্তি হবে, তখন অন্যদিকের সেই। জীবনটি কেমন হবে, এটি আমাদের তা প্রদর্শন করে। দুটি সম্ভাব্য পরিণতি যা প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটি আমাদের কারো কারো মনে শঙ্কার সৃষ্টি করতে পারে।

এটি আমাদের বলে, অন্যপাশে প্রত্যেকের জন্যই চূড়ান্ত গন্তব্য ইতিমধ্যেই সুনির্দিষ্ট করা আছে। সেখানে যাবার টিকিটও ইতিমধ্যে বিতরণ করা হয়ে গেছে। বাস্তবিকভাবেই এমনকি আমাদের জন্মের আগেই সেটি বিতরণ করা হয়েছে। এটাকেই বলে ‘প্রিডেস্টিনেশন’ বা অদৃষ্টবাদের মতবাদ (নিয়তিবাদ বা দৈববাদ)। আর ধারণাটি খ্রিস্টধর্মসহ অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসেও আমরা খুঁজে পাই। যেখানেই ধারণাটিকে পাওয়া গেছে, সেখানেই সেটিকে নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, আর বিতর্কের কারণ আপাতদৃষ্টিতে এই মতবাদটির নিষ্ঠুরতা এবং অবিচারের বিষয়টি। কিন্তু আসুন ধারণাটিকে এর শর্তগুলো দিয়েই আমরা বিশ্লেষণ করি। অধিকাংশ ধর্মই এই পৃথিবীর জীবনকে মৃত্যুপরবর্তী অনন্ত জীবনের একটি প্রস্তুতি হিসাবে দেখে থাকে। তত্ত্বটি হচ্ছে যে, যদি আমরা সততার সাথে এই জীবনটি কাটাই এবং আমাদের ধর্মবিশ্বাসের অনুশাসনগুলো মেনে চলি –যেমন, ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ –ঈশ্বর আমাদের পুরস্কৃত করবেন এবং স্বর্গে আমাদের স্বাগত জানাবেন। কিন্তু অদৃষ্টবাদ মতবাদটির একধরনের পাঠ অনুযায়ী, পরীক্ষায় বসার আগেই ঈশ্বর সবার পরীক্ষার খাতা দেখে সেখানে নম্বর দিয়ে রেখেছেন। তাহলে ঈশ্বর কেনই বা অযথা সব নবীদের পাঠিয়েছেন আমাদের সতর্ক করে দিতে, যেন আমরা আমাদের জীবনাচরণ পরিবর্তন করি আর তার অনুশাসনগুলো মেনে চলতে আরো কঠোরভাবে পরিশ্রম করি? কেন এত সংগ্রাম করতে হবে, কেন জিহাদের জন্য আত্মত্যাগ করতে হবে, যদি আমাদের নিয়তি ইতিমধ্যেই পূর্বনির্ধারিত হয়ে থাকে? আমরা আবার ফিরে আসি আমাদের সেই পুরনো বন্ধুর কাছে, ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে থাকা সেই লেখক, যে তার নিজের ইচ্ছামতোই তার চরিত্রদের নিয়তি নির্ধারণ করছেন, কারো জন্য সুখ আর সফলতা আর কারো জন্যে দুঃখ আর ব্যর্থতা।

যে-কণ্ঠটি মুহাম্মদের সাথে কথা বলেছিল, সেটি কুর’আনে এভাবে প্রকাশ করেছে : ‘আমি তাদের গলায় চিবুক পর্যন্ত বেড়ি পরিয়ে দিয়েছি, ফলে তারা উধ্বমুখী হয়ে আছে। তাদের সামনে একটি প্রাচীর ও তাদের পিছনে একটি প্রাচীর স্থাপন করেছি, অতঃপর আমি তাদেরকে ঢেকে দিয়েছি, ফলে তারা দেখতে পায় না। আর আপনি তাদের সতর্ক করেন বা না করেন, তাদের কাছে দুটোই সমান, তারা ঈমান আনবে না’। আরো সুস্পষ্টভাবে বললে পুরো বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত, ইসলামে আরো পবিত্র কিছু লেখা আছে যেখানে এটি সত্যায়িত করা হয়েছে।

কুর’আন ছাড়াও মুসলমানদের কাছে আরো একগুচ্ছ লেখা আছে, যাকে বলা হয় ‘সুন্নাহ’ অথবা পথ। মুহাম্মদ জিবরাইল ফেরেশতার কাছ থেকে যা শুনেছিলেন সেটি হচ্ছে কুর’আন আর ‘সুন্নাহ’ হচ্ছে যা কিছু মুহাম্মদের ঘনিষ্ঠ সহচররা আর তার পরিবারের সদস্যরা তার কাছ থেকে সরাসরি শুনেছিলেন। এর মধ্যে আছে ‘হাদিস’, অথবা নবীর উপদেশ, শিক্ষা ও কথপোকথনের নানা বিবরণ। এবং এরকমই একটি হাদিসে আমরা অদৃষ্টবাদের সবচেয়ে সুস্পষ্ট বিবরণ পাই, ‘আপনাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, জন্ম নিয়েছে এমন কোনো আত্মা নেই, স্বর্গ অথবা নরকে, যার জন্য ইতিমধ্যেই জায়গা নির্দিষ্ট করে রাখা নেই, অথবা, অন্যভাবে যদি বলা হয়, দুঃখ বা সুখের নিয়তি তার জন্যে পূর্বনির্ধারিত। ঢোক গিলতে হলো, কিন্তু এটি কীভাবে সংগতিপূর্ণ হয় আল্লাহর ঐসব সুন্দর নামের সাথে, যেমন, পরম দয়ালু আল্লাহ, সবচেয়ে বেশি সহমর্মী এবং ক্ষমাশীল, যিনি সবসময়ই ক্ষমা করতে প্রস্তুত?

না, বিষয়টি সেভাবে সংগতিপূর্ণ মনে হয় না, আর সে-কারণে এই শিক্ষাটি নিয়ে ইসলামের পণ্ডিতরা বিতর্ক করে আসছেন সেই সপ্তম শতক থেকে, যখন এটি লেখা হয়েছিল। যদি আল্লাহ ন্যায়বিচারক হয়ে থাকেন, পণ্ডিতরা ঘোষণা করেছিলেন, তাহলে অদৃষ্টবাদের এই মত তার প্রকৃতির সাথে স্ববিরোধী। ধর্মীয় সগ্রামের যুক্তি, যেমন, ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ অনুসরণ করা, ইঙ্গিত দিচ্ছে মানুষের অবশ্যই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে। তাহলে কেনই বা আল্লাহ, নবীদের পাঠাবেন, যদি তার নির্দেশ শোনা, অনুশোচনা করা এবং পরিত্রাণ পাবার পথ অনুসরণ করার কোনো স্বাধীনতাই না থাকে? এভাবেই যুক্তিটি অগ্রসর হয়েছিল।

এই বিতর্ক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রথম দৃষ্টিতে যতটা মনে হয়, কুর’আনের ব্যাখ্যা তাহলে হয়তো ততটা সরল নয়। ধর্ম-গবেষকদের এটি আরেকটি সমস্যার উৎসের দিক নির্দেশ করে। প্রতিটি ধর্মেই একটি গোষ্ঠী থাকে, যারা ‘লিটারেলিস্ট বা যারা কুর’আন কিংবা ধর্মশাস্ত্রে লিখিত বাক্য যা বলছে, সেটিকে তারা আক্ষরিকভাবেই গ্রহণ করেন। অন্যদিকে ধর্মতাত্ত্বিকরা, যারা গ্রন্থের আধেয় আর শব্দগুলো সম্বন্ধে এইসব আক্ষরিকতাবাদীদের চেয়ে আরো বেশিকিছু জানেন, এবং সেগুলো পাঠ করার সময় আরো সূক্ষ্ম অর্থগুলো তারা বিশ্লেষণ করতে পারেন। তারা প্রায়শই রূপক হিসাবে ধর্মগ্রন্থ পড়েন, আক্ষরিকতাবাদীরা যা গলাঃধকরণ করেন বাস্তব সত্য হিসাবে। ধর্মশাস্ত্রগুলোর ইতিহাস হচ্ছে এইসব প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবনাগুলো অনুসরণকারীদের পরস্পরের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্কের একটি ইতিহাস। প্রায়শই এটি গুরুত্বপূর্ণ নয় কারণ বিতর্কের বিষয়টি আমাদের জীবনকে সরাসরি স্পর্শ করে না। তবে কখনো কখনো এটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আমাদের জীবনে, কারণ সাধারণ মানুষের জীবনে এটি অস্বাভাবিক পরিমাণ ভয় আর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অদৃষ্টবাদের মতবাদটি এমনিতেই যথেষ্ট পরিমাণ দুশ্চিন্তার কারণ, কিন্তু এটি কিছুই নয়, যদি এটিকে স্বর্গ আর নরকের অস্তিত্ব-সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট মতবাদটির সাথে তুলনা করা হয়।

কুর’আনে বহু সুরা আছে, যেখানে স্বর্গ আর নরকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আমি সবচেয়ে বিখ্যাতটির বর্ণনা দেব। সুরা ৫৬ য়, ‘শেষ বিচারের দিনে বেহেশত বা স্বর্গকে বর্ণনা করা হয়েছে আনন্দ আর সুখের একটি বাগান হিসাবে, যার বিবরণ শুনলে মনে হয় যেন সেটি মানবপ্রজাতির শুধুমাত্র পুরুষ-সদস্যদের জন্যই বিশেষভাবে পরিকল্পিত হয়েছে। সেখানে সারাক্ষণ মদের ঝর্না বহমান, যে মদ পান করলে কেউ যেমন মাতালও হবে না, তেমনি মদ্যপান-পরবর্তী অসুস্থতায় আক্রান্তও হবেন না। পৃথিবীতে তারা যে কষ্ট সহ্য করেছেন তারই পুরস্কার হিসাবে সেখানে আগত নতুন অতিথিদের উপভোগের জন্য থাকবে সুন্দরী, আয়তলোচনা তরুণীরা। আরো আকর্ষণীয় ব্যাপার, স্বর্গে কোনো অযথা বাদানুবাদ থাকবে না, শুধুমাত্র শান্তি, শান্তি!’ উচ্চারণ ছাড়া। আর এটাই অপেক্ষা করছে সেই মানুষদের জন্যে, যাদের কুরআন বলেছে ডানদিকের সঙ্গী বা কম্পানিয়ন অব দ্য রাইট। আর যারা বামপাশে থাকবেন, কম্পানিয়ন অব দ্য লেফট, তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে ভিন্ন নিয়তি। তাদের জন্যে আছে নরক, দাবদাহের বাতাস, ফুটন্ত পানি, জ্বলন্ত শিখার ছায়া…’।

স্বর্গ আর নরককে রূপক হিসাবে ব্যাখ্যা করে যেতে পারে, সদগুণের পুরস্কার আর অনাচারের পরিণতি নিয়ে কথা বলার একটি উপায় হিসাবে। আবার এগুলোকে আক্ষরিকভাবেই সত্য হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। যদি নরকের অস্তিত্ব থাকে, এর মানে ঈশ্বর তার কিছু সন্তানের নিয়তিতে অসহনীয় যন্ত্রণা নির্ধারণ করে রেখেছেন। আমরা ইতিমধ্যেই অন্য ধর্মগুলোয় নরকের ধারণাটি আবির্ভূত হতে দেখেছি, সুতরাং, আমরা এখানে কুরআন নিয়ে আলোচনা বন্ধ করব। পরের অধ্যায়ে, আমরা মানবতার বিষণ্ণ একটি আবিষ্কার নিয়ে চিন্তা করব এবং আগুনের কুণ্ড আর ফুটন্ত পানির জগতে একবার ঢু মারব। আমরা নরক। সম্বন্ধে জানব।

২৫. নরক

নরক কী? নরক হচ্ছে নিরন্তর যন্ত্রণা ভোগ করা একটি জায়গা, যেখানে যারা তাদের কৃতকর্মের জন্যে কোনো অনুশোচনা করেননি, মৃত্যুর পর তাদেরকে সেখানে প্রেরণ করা হয়। খ্রিস্টধর্ম আর ইসলামে যেভাবে নরকের ধারণাটি আবির্ভূত হয়েছে সেটি সম্বন্ধে যে পূর্ণ ধারণাটি পাওয়া যায় তা হলো, এটি এমন একটি জায়গা যেখান থেকে মুক্তি পাবার কোনো সম্ভাবনা নেই। যদি একবার সেখানে আপনি নিজেকে আবিষ্কার করেন, সেখানে অনন্তকাল আপনাকে থাক