অন্ধকারের গল্প

 

নীল রক্ত – আফজাল হোসেন

এক

শাহজাহান ঘটক এসেছে। সোফার উপর পা তুলে আসন করে বসেছে। ভরপুর চা-নাস্তার পর এখন সে পান চিবুচ্ছে। একসঙ্গে দুই খিলি পান। গাড়ির টায়ারের মত মোটা ঠোঁট দুটো পানের রসে জবজবে। কুচকুচে কালো চেহারায় পানের রসে ভেজা লাল টুকটুকে ঠোঁট জোড়া দেখতে ভালই লাগছে। থুতনিতে থাকা এক গোছা ছাগুলে দাড়ি বেয়েও পানের রস নেমেছে।

শাহজাহান ঘটকের দেয়া এক গাদা বায়োডাটা ফটো নেড়ে-চেড়ে দেখছেন সুলতানা বেগম। সব বিবাহযোগ্য মেয়েদের বায়োডাটা আর ফটো।

সুলতানা বেগমের একটিও পছন্দ হচ্ছে না। তিনি একেকটা ফটো দেখছেন আর ভুরু কুঁচকাচ্ছেন। তিনি তাঁর একমাত্র ছেলে সুমনের জন্য পাত্রী খুঁজছেন। যেমন-তেমন মেয়ে হলে চলবে না। রাজকন্যার মত মেয়ে চাই। শুনেছেন সুন্দরী মেয়েদের খোঁজ বের করতে শাহজাহান ঘটকের তুলনা নেই। এজন্যেই শাহজাহান ঘটককে খবর দিয়ে এনেছেন।

সুলতানা বেগম যেসব মেয়ের বায়োডাটা আর ফটো দেখছেন তারা সবাই-ই বেশ সুন্দরী, শিক্ষিত, আর ভাল . পরিবারের। তারপরও আরও কিছু খুঁজছেন তিনি। ছোট পরিবার। তাঁদের যেমন মা-ছেলের ছোট পরিবার, তেমন কোনও পরিবারের একমাত্র মেয়ে পাওয়া গেলে ভাল হত। ছোট পরিবারে ঝামেলা কম থাকে। তাঁর ছেলে সুমন অত্যন্ত নম্র-ভদ্র-লাজুক স্বভাবের। তাঁর একার হাতে মানুষ করা। ঝুট-ঝামেলার মধ্যে কোনও দিনও জড়াতে দেননি। বাইরের মানুষের সঙ্গে মেলামেশাও কম। লেখাপড়া শেষ করে এখন চাকরিতে ঢুকেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার। বাসা-অফিসের মধ্যেই তার জীবন সীমাবদ্ধ। এমন নিরীহ প্রকৃতির ছেলের জন্য তেমন একটা মেয়েই দরকার।

সুমনের বাবার অবর্তমানে সুলতানা বেগম অনেক কষ্ট করে তাঁর এই ছেলেকে মানুষ করেছেন। বলা যায় শরীরের সমস্ত রক্ত পানি করে। সারা দিন-রাত সেলাই মেশিনে ঘটর-ঘটর শব্দ তুলে কোনওক্রমে ছেলের পড়ার খরচ, সংসার খরচ চালিয়েছেন। সেই দিন এখন আর নেই। তাঁদের অবস্থা ফিরেছে। আর্থিক অনটন দূর হয়েছে। ছেলে বড় চাকরি পেয়েছে। যা বেতন পায় তাতে খেয়ে-পরে খুব ভাল আছেন তাঁরা। চব্বিশশো স্কয়ার ফিটের বড় বাসা ভাড়া নিয়েছেন। বাসায় ফ্রিজ, টিভি, আলমিরা, সোফা…অভিজাত সব কিছুই কেনা হয়েছে।

এত কিছুর পরও সুলতানা বেগমের বুকের গভীরে একটা কষ্ট রয়েই গেছে। সুমনের বাবার শূন্যতা। সুখের এই দিনগুলো যেন তাঁর কথা আরও বেশি মনে করিয়ে দেয়।

সুমনের বাবা আমজাদ হোসেন একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে কেরানির চাকরি করতেন। সামান্য ক’টা টাকা বেতন পেতেন। কিন্তু তাতে সুখের অভাব ছিল না। ছোট্ট সুমনকে নিয়ে হাসি-খুশিতে ভরপুর ছিল তাঁদের সংসার।

সেদিনের কথা কখনও ভুলতে পারবেন না সুলতানা বেগম। তাঁদের বিবাহ বার্ষিকীর দিন ছিল ওটা। ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে গোসল করে প্রথমেই বিয়ের শাড়িটা পরেছিলেন। সামান্য একটু সাজগোজও করেছিলেন। চোখে কাজল দিয়েছিলেন। ভুরু এঁকেছিলেন। লিপ লাইনার দিয়ে ঠোঁট এঁকে হালকা গোলাপি লিপস্টিক লাগিয়েছিলেন। একমাত্র কানের দুল জোড়াও পরেছিলেন। হাতে কাচের চুড়ি। এরপর রান্নাঘরে ঢুকে চটপট খিচুড়ি আর ডিম ভাজা করেন। এমনিতে প্রতিদিন নাস্তার জন্য আলু ভাজি আর রুটি করতেন। কিন্তু সেই বিশেষ দিনটার জন্য বিশেষ আয়োজন করেছিলেন।

রান্না শেষে ঘুম থেকে জাগান সুমনের বাবাকে। ঘুম থেকে জেগে ড্যাব-ড্যাব করে তাকিয়ে ছিলেন মানুষটি।

অবাক গলায় বলেছিলেন, ‘কোথাও বেড়াতে যাচ্ছ?’ সুলতানা বেগম রহস্যময় হাসি দিয়ে বলেন, ‘না।’

‘তা হলে এত সেজেছ কেন?’

সুলতানা বেগম মুখ ভার করে বলেন, ‘এমনিতেই সেজেছি।’

তখন বোধহয় মনে পড়ল লোকটার। জিভে কামড় দিয়ে, ‘হায়, হায়, সব ভুলে বসে আছি!’ বলতে-বলতে বিছানা থেকে লাফিয়ে নামলেন। কেমন ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। যেন এখনই তাঁকে কিছু করতে হবে।

সুলতানা বেগমকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলেন। সুলতানা বেগম লাজুক কণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘আরে! এ কী করছ তুমি! ছেলে জেগে উঠে দেখে ফেলে যদি?’

আমজাদ হোসেন বলেন, ‘দেখলে দেখুক। দেখে শিখুক। বড় হয়ে ও যখন বিয়ে করবে, তখন তো ওকেও এসব করতে হবে।’

সুলতানা বেগম হাতের চেটো দিয়ে উল্টো ভাবে স্বামীর গালে ঘষা দিয়ে বলেন, ‘যখন শেখার এমনিতেই শিখে যাবে। তোমাকে আর শেখাতে হবে না। যাও, তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢোকো। শেভ করে গোসল করে এসো। আজ কিন্তু পাঞ্জাবি পরবে।’

আমজাদ হোসেন সুলতানা বেগমের কপালে আর একটা চুমু খেয়ে বলেন, ‘অফিসে যেতে হবে না? পাঞ্জাবি পরলে হবে?’

‘পাঞ্জাবি পরেই যাবে।’

‘পাঞ্জাবি পরে অফিসে যাব?!’

‘হ্যাঁ, আজ পাঞ্জাবি পরেই যাবে।’

‘অফিসের কলিগরা কী বলবে?’

‘কী আবার বলবে! কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে, আজ তোমার বিবাহ বার্ষিকী। তাই পাঞ্জাবি পরে এসেছ। ব্যস। তাড়াতাড়ি বাথরুমে যাও। আমি সুমনকে উঠিয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য রেডি করছি। তাড়াতাড়ি এসো। খিচুড়ি রান্না করেছি। গরম-গরম খাবে।’

সে বছরই সুমনকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। সকালে সুমনের বাবা তাঁর সঙ্গেই সুমনকে নিয়ে বেরোতেন। স্কুলে পৌঁছে দিয়ে তিনি অফিসে চলে যেতেন। স্কুল ছুটির সময় সুলতানা বেগম গিয়ে সুমনকে নিয়ে আসতেন।

সুমনের বাবা খিচুড়ি আর ডিম ভাজা অত্যন্ত তৃপ্তি সহকারে খান। খেতে-খেতে বলেন, ‘সুলতানা, প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি, যখন-তখন চলে যেতে পারে। ভেবে রেখেছি, যদি কখনও সত্যিই চাকরি চলে যায়, তা হলে একটা খিচুড়ির দোকান দেব। তোমার হাতের কয়েক ধরনের খিচুড়ি থাকবে। চাল-ডাল-আলুর সিম্পল খিচুড়ি। সবজি খিচুড়ি। ডিম খিচুড়ি। গরুর মাংসের, খাসির মাংসের, মুরগির মাংসের, হাঁসের মাংসের আলাদা-আলাদা ভুনা খিচুড়ি। পাঁচমিশালি পাতলা খিচুড়ি। দেখবে হু-হু করে চলবে। তোমার হাতের রান্নার যে স্বাদ! লোকজনের লাইন পড়ে যাবে।’

খাওয়া শেষ করে বাপ-বেটায় রওনা দেয়। অবশ্য সুমন সেদিন খিচুড়ি খায়নি। খিচুড়িতে বোম্বাই মরিচ দিয়েছিলেন বলে অনেক ঝাল হয়েছিল। সুমন খেয়েছিল পাউরুটি আর দুধ।

রওনা দেয়ার সময় সুমনের বাবা ছেলেকে এড়িয়ে শেষ বারের মত সুলতানা বেগমের কপালে একটা চুমু খেয়েছিলেন। আর পাঁচশো টাকা সুলতানা বেগমের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘সুমনকে স্কুল থেকে নিয়ে আসার সময় এই টাকা দিয়ে আধ কেজি গরুর মাংস আর একটা বাচ্চা মুরগি কিনে আনবে। পোলাওয়ের চাল বোধহয় ঘরেই আছে? না থাকলে আধ কেজি পোলাওয়ের চালও আনবে। বাচ্চা মুরগির রোস্ট, ভুনা গরুর মাংস আর পোলাও রান্না করবে।’

সুলতানা বেগম জিজ্ঞেস করেন, ‘অফিস থেকে ফিরবে কখন?’

সুমনের বাবা বলেন, ‘রোজ যে সময় ফিরি। অফিস ছুটি হলেই।’

সুলতানা বেগম মুখ বেজার করে বলেন, ‘আজ একটু তাড়াতাড়ি ফেরা যায় না? সন্ধ্যার আগে। তিনজন মিলে কোথাও ঘুরতে যেতাম।’

সুমনের বাবা বলেন, ‘চেষ্টা করে দেখব। তুমি না হয় সুমনকে নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে এসো।’

সুলতানা বেগম আরও মুখ ভার করে বলেন, ‘তোমাকে ছাড়া একা কোথাও যেতে আমার ভাল লাগবে?’

‘একা কোথায়, সুমন থাকবে না সাথে?’

‘সুমন তো থাকবেই, তোমার অভাব কি তাতে পূরণ হবে?’

সুমনকে স্কুল থেকে আনার সময় সুলতানা বেগম গরুর মাংস আর বাচ্চা মুরগি কেনেন। আধ কেজি গরুর মাংস আর বাচ্চা মুরগি কেনার পরও হাতে বেশ কিছু টাকা থেকে যায়। ‘সেই টাকা দিয়ে এক পোয়া মুগ ডাল, গরম মশলা আর টমেটো-ক্ষীরা কিনে ফেলেন। ভাবেন, আর একটা পাইটেম বাড়াবেন। বাচ্চা মুরগিটার পাখনা- চামড়া-গিলা-কলিজা দিয়ে মুগ ডালের ঘণ্ট করবেন। আর ওসব খাবারের সঙ্গে সালাদ না হলে চলে? তাই টমেটো-ক্ষীরা দিয়ে সালাদ বানাবেন।

সুলতানা বেগম দুপুরেই সব কিছু রান্না করে ফেলেন। তবে তিনি ওসব রান্নার কিছুই খান না। সকালের খিচুড়ি খানিকটা রয়ে গিয়েছিল। সেই ঠাণ্ডা খিচুড়িই খেয়ে নেন। দুপুরে খাওয়ার জন্য সুমনের বাবাকেও হটপটে খিচুড়ি দিয়ে দিয়েছিলেন। স্বামী যেখানে সকালের খিচুড়িই খাবেন, সেখানে তিনি কী করে একা ওসব ভাল খাবার খান? সন্ধ্যায় সুমনের বাবা ফিরলে একসঙ্গে খাবেন।

সুমনের বাবা রোস্ট-পোলাও জাতীয় খাবার খুব পছন্দ করতেন। বেচারা স্বল্প বেতনের চাকরি করতেন বলে, কোনও উপলক্ষ ছাড়া সাধারণত ওসব খাবার জুটত না। ছেলেও হয়েছে বাবার মত। রোস্ট-পোলাও খুব পছন্দ করে। সেদিন দুপুরে তিনি ঠাণ্ডা খিচুড়ি খেলেও, সুমনকে চার পিস রোস্টের এক পিস দিয়ে পোলাও খাইয়েছিলেন।

সন্ধ্যার পর পরই শুরু হয় সুমনের বাবার ফেরার অপেক্ষা। সুলতানা বেগম জানতেন সুমনের বাবার ফিরতে কমপক্ষে ন’টা-সোয়া ন’টা বেজে যায়। তারপরও তিনি গভীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকেন। এই বুঝি ফিরবেন। দিনটা অন্যান্য দিনের মত নয়! বিবাহ বার্ষিকীর দিন! নিশ্চয়ই আগে-ভাগেই ফিরবেন। এখনই দরজায় টুক-টুক শব্দ তুলে ক্লান্ত গলায় ডাকবেন, ‘সুলতানা, ও, সুলতানা, দরজা খোলো। সুমন, বাবা, ঘুমিয়ে পড়েছিস? তোর মাকে দরজা খুলতে বল।’

প্রাইভেট কোম্পানির চাকরিতে প্রচুর খাটাত। যে টাকা বেতন দিত তার তিনগুণ খাটিয়ে মারত। লোকটা অফিস থেকে ফিরলে মুখের দিকে তাকানো যেত না। যেন সারাদিন রোদে পুড়ে রিকশা চালিয়ে ফিরতেন।

ন’টা বেজে যায়। আর দেরি নেই, এখনই সুমনের বাবা এসে পড়বেন, এই ভেবে সুলতানা বেগম খাবার গরম করতে লেগে পড়েন। সেই সঙ্গে সালাদ বানাবার জন্য টমেটো-ক্ষীরা কুচাতে থাকেন।

সালাদ বানানো এবং খাবার গরম করা হয়ে গেলে টেবিলে সাজিয়েও ফেলেন। ঘড়ির কাঁটাও সাড়ে ন’টার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু সুমনের বাবা ফেরেন না।

সুলতানা বেগম চিন্তিত মুখে ভাবেন, কী হলো লোকটার-এত দেরি করছেন কেন? আকাশের অবস্থা ভাল নয়। ঘন-ঘন বিজলি চমকাচ্ছে। যে কোনও মুহূর্তে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়ে যেতে পারে। ঝড়বৃষ্টি শুরু হবার আগে ভালয়- ভালয় মানুষটা এসে পৌঁছতে পারবেন তো?

ওদিকে ছোট্ট সুমন ঘুমানোর জন্য ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু করে। না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়তে চায়। সুলতানা বেগম ছেলেকে জাগিয়ে রাখার জন্য মন ভোলানো বিভিন্ন কথা বলতে থাকেন, ‘সুমন, বাবা, আমার লক্ষ্মী সোনা, এখনই তোর বাবা চলে আসবে। তখন সবাই মিলে একসঙ্গে খাব। খেয়েই ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়ব। তুই তোর বাবার হাতে খেতে ভালবাসিস না, বল? তোর বাবা নিশ্চয়ই তোর জন্য কোনও খেলনা কিনতে গিয়ে দেরি করছে। দেখতে চাস না সেই খেলনা? তুই একটা প্লাস্টিকের কচ্ছপ আর ডাইনোসরের কথা বলছিলি মনে আছে? নিশ্চয়ই তোর বারা আজ তোর জন্যে কচ্ছপ আর ডাইনোসর নিয়ে আসবে। একটু সবুর কর না, বাবা!’

রাত সোয়া দশটা বেজে যায়। সুমন ঘুমিয়ে পড়ে। তুমুল ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। বাইরেটা যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে চায়। ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। কিন্তু তখনও সুমনের বাবার দেখা নেই।

সুলতানা বেগম অস্থির হয়ে ওঠেন। ভেবে পান না কী করবেন। আজকালকার মত তখনকার দিনে সবার পকেটে- পকেটে মোবাইল ফোন ছিল না। কী করে সুমনের বাবার খোঁজ নেবেন? সুমনের বাবার অফিসে ফোন ছিল। কিন্তু সেই ঝড়-বৃষ্টির রাতে কোথা থেকে ফোন করবেন? অবশ্য বাড়িওয়ালার বাসায় ফোন ছিল। ভাবেন, বাড়িওয়ালার কাছে গিয়ে একটা ফোন করার জন্য অনুরোধ করবেন। আবার এ-ও ভাবেন, হাড়কিপটে বাড়িওয়ালা কি ফোন করতে দেবেন?

ছলছল চোখে সুলতানা বেগম গিয়ে বাড়িওয়ালাকে একটা ফোন করার জন্য অনুরোধ জানান। কোনও উচ্চবাচ্য না করে বাড়িওয়ালা রাজি হয়ে যান। সুলতানা বেগমের হাতে রিসিভার ধরিয়ে দিয়ে নিজেই ডায়াল ঘুরিয়ে নাম্বার লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকেন।

মাঝবয়সী বাড়িওয়ালার মনে বোধহয় অন্য কিছু কাজ করছিল। সুলতানা বেগমের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ডায়াল ঘুরাতে-ঘুরাতে বার-বার হাতের কনুই সুলতানা বেগমের গায়ে ছুঁইয়ে দিচ্ছিলেন।

বেশ কয়েকবার ফোন করলেন। রিং হয়, কিন্তু কেউ রিসিভার তোলে না। অত রাতে অফিসের ফোনের রিসিভার কারও তোলার কথাও নয়। সুলতানা বেগমের চোখের কোনা বেয়ে পানি নামতে শুরু করে।

বাড়িওয়ালা সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে সুলতানা বেগমের কাঁধে হাত রাখেন। কাঁধে-পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলতে থাকেন, ‘ঝড়-বৃষ্টির রাত। পুরুষ লোকের মন বলে কথা। এমন একটা রাতও কি রোজকার মত নিজের ঘরে স্ত্রীর সঙ্গে কাটাতে ইচ্ছে করে? ঘর কা মুরগা ডাল বরাবর। গিয়ে দেখেন কোনও আবাসিক হোটেলের রুমে বসে কচি মুরগির রান চিবাচ্ছে। ভাবীজান, আপনি চিন্তা না করে গিয়ে শুয়ে পড়ুন। দেখবেন, সকাল-সকাল ঠিকই চোখ জোড়া লাল করে ফিরে আসবে।’ গলার স্বর একটু নামিয়ে, ‘ভাবীজান, ঝড়-বৃষ্টির অন্ধকার রাত, একলা-একলা ভয় লাগলে বলেন-আমি গিয়ে আপনাকে পাহারা দিই। আমি থাকতে আপনার আবার কীসের ভয়!’

সুলতানা বেগমের চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছিল। তার মধ্যেই তিনি কী করে যেন কড়া গলায় বলে ওঠেন, ‘চাচাজান, আমার স্বামী আপনার মত খাটাস নয় যে, হোটেলে বসে কচি মুরগির রান চিবুবে।’ বলেই গট-গট করে চলে আসার সময় বিড়-বিড় করেন, ‘বুড়া খাটাসটার শখ কত, মুরগি পাহারা দিতে চায়!’

সেই রাতটা যে কীভাবে কাটছিল সুলতানা বেগমের! সারা রাত কেঁদে-কেঁদে বালিশ ভেজান। তিনটার পর ঝড়- বৃষ্টি থামে। ঝড়-বৃষ্টি থামলেও ইলেকট্রিসিটি আসে না। আসেন না সুমনের বাবাও। তখনও তিনি অপেক্ষায় থাকেন, এই বুঝি সুমনের বাবা এসে দরজায় নক করবেন।

অবশ্য কিছুক্ষণ পর-পরই দরজায় নক হচ্ছিল। বাড়িওয়ালা দরজা ধাক্কাধাক্কি করে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘ভাবীজান, ভাই কি এসেছেন? ভয় লাগলে বলেন, ভয় দূর করে দিই। আহারে! কী সুন্দর টসটসে চেহারার বউডারে ঘরে একলা ফেলে বাইরে রাত কাটায়! পুরুষ লোকের চরিত্র বলে কিছু নাই। ভাবীজানের উচিত একটা কঠিন শিক্ষা দেয়া। সে যদি বাইরে বসে মোরগ-পোলাও খেতে পারে, ঘরের ঘিতে আগুন লাগলে দোষ কী!’

সকাল হয়ে যায়। সুমনের বাবার কোনও খোঁজ নেই। বেলা বাড়তে থাকে। অফিসে, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি, বন্ধু- বান্ধবদের বাড়ি, সব জায়গায় খোঁজ নেয়া হয়। কোথাও সুমনের বাবা নেই। শেষতক বিকেল নাগাদ থানায় মিসিং ডায়েরি করা হয়। সেই সঙ্গে সবক’টা হসপিটাল-ক্লিনিক সহ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামেও খোঁজ নেয়া হয়। কোথাও সুমনের বাবা নেই। লোকটা যেন একেবারে গায়েব হয়ে গেছেন। না হলে কেউ তাঁকে গুম করেছে।

দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘুরে বছর আসে। একে-একে বাইশটা বছর চলে গেল। ছয় বছরের সুমন এখন আটাশ বছরের। কিন্তু সুমনের বাবা আর ফিরে এলেন না!

সুলতানা বেগম এখনও অপেক্ষায় আছেন। নিশ্চয়ই কোনও এক দিন তিনি ফিরে আসবেন। দরজায় নক করে ডাকবেন, ‘সুলতানা, ও, সুলতানা, দরজাটা খোলো। সুমন, বাবা, সুমন, তোর মাকে দরজাটা খুলতে বল।’

সুলতানা বেগম অপেক্ষায় আছেন সেদিন আবার তিনি রোস্ট, পোলাও আর ভুনা গরুর মাংস রান্না করবেন। গত বাইশ বছরে এই খাবারগুলো তিনি আর মুখে দেননি।

দুই

শেষ পর্যন্ত শাহজাহান ঘটক সুলতানা বেগমের পছন্দসই মেয়ের খোঁজ বের করতে পেরেছে।

মেয়ের নাম ঈশিতা। সমাজ বিজ্ঞানে অনার্স পড়ছে। একমাত্র মেয়ে। শহরতলিতে নিজেদের বাড়ি। বাবা নেই। মা-মেয়ের ছোট্ট সংসার।

ঈশিতার চেহারা অসম্ভব রকমের সুন্দর। মাখনের মত ফর্সা মোলায়েম গায়ের রঙ। গোলগাল আদুরে মুখ। উঁচু নাক। ভাসা-ভাসা বড় চোখ। ঘন আঁখি পল্লব। সবুজাভ চোখের মণি। দিঘল রেশমি চুল। সব সময় বাইরে বেরোয় বোরখা পরে। মুখ ঢাকা থাকে নেকাব দিয়ে। হাতে-পায়েও মোজা পরে। শুধু তার নিষ্পাপ চোখ দুটো বাইরে থেকে দেখা যায়।

অবশ্য ঈশিতাকে সামনা-সামনি দেখা হয়নি। শাহজাহান ঘটক ফটো এনে দেখিয়ে এসব বর্ণনা দিয়েছে। ফটো দেখে শাহজাহান ঘটকের বর্ণনা সঠিক বলেই মনে হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফটোর চেহারার সঙ্গে সত্যিকারের চেহারার অনেক অমিল দেখা যায়। আর ঘটকরা যে হরহামেশাই নয়-ছয় কথা বলে তা-ও সবার জানা।

ঈশিতাকে সামনা-সামনি দেখার দিনক্ষণ ঠিক করতে বলেছিলেন সুলতানা বেগম। সেটি ঠিক হয়েছে। আজ সন্ধ্যায় ঈশিতাদের বাসায় গিয়ে দেখবেন। সুলতানা বেগম চেয়েছিলেন কোনও রেস্টুরেন্ট বা পার্কে গিয়ে দেখতে। কিন্তু তাতে ঈশিতা বা ঈশিতার মা রাজি হয়নি। ঈশিতাকে দেখতে হলে তাদের বাসায় গিয়েই দেখতে হবে। ঈশিতা বাসার বাইরে নেকাব তুলে মুখ বের করে না।

অগত্যা ঈশিতাকে দেখার জন্য সুলতানা বেগম তাদের বাসায় যেতে রাজি হয়েছেন। সঙ্গে সুমনকেও নিয়ে যাবেন। তাঁর পছন্দের চেয়েও সুমনের পছন্দটা বেশি জরুরি। যাকে পছন্দ করে বউ বানিয়ে আনা হবে, তাকে নিয়ে সারা জীবন সুমনকেই ঘর করতে হবে। তাই সুমনের ভাল লাগা-মন্দ লাগাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সুমন যে ধরনের মুখচোরা লাজুক স্বভাবের ছেলে, তাতে সুলতানা বেগমের কথার উপর কোনও দিনও সে টু শব্দটিও করবে না। সুলতানা বেগমের সিদ্ধান্তই সে চূড়ান্ত হিসেবে মাথা পেতে নেবে।

.

সন্ধ্যা সোয়া সাতটা। সুলতানা বেগম তাঁর ছেলে সুমনকে নিয়ে ঈশিতাদের বাসায় এসেছেন। সঙ্গে শাহজাহান ঘটকও রয়েছে। তাঁরা বসার ঘরে বসেছেন। তাঁদের সামনে শরবত থেকে শুরু করে কয়েক ধরনের পিঠা-পায়েস, ফল, মিষ্টি সহ অনেক কিছু পরিবেশন করা হয়েছে। বয়স্কা একজন কাজের মহিলা একটার পর একটা এনে সামনে দিচ্ছে।

সুলতানা বেগম এবং সুমন দু’জনেই হাত গুটিয়ে বসে আছে। এখন পর্যন্ত কিছুই তারা মুখে দেয়নি। পুরানো একটা রীতি আছে, মেয়ে দেখার আগে মেয়ের বাড়ির কিছুই খেতে হয় না। মেয়ে দেখে পছন্দ হলে, প্রথমে মেয়েকে মিষ্টি মুখ করিয়ে খাবার মুখে দিতে হয়। তবে শাহজাহান ঘটক থেমে নেই। সে গপা-গপ চালিয়ে যাচ্ছে।

ঈশিতার মা ইয়াসমিন বেগম তাঁর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বসার ঘরে ঢুকলেন।

ঈশিতার পরনে লাল রঙের শাড়ি। মাথায় ঘোমটা। বেশ লম্বা মেয়েটা। সেই তুলনায় ঈশিতার মাকে খাটই বলা চলে।

ঈশিতাকে দেখে বিস্ময়ে সুলতানা বেগম ঢোক গিললেন। কোনও মেয়ে যে এতটা সুন্দরী হতে পারে তা তাঁর কল্পনায়ও ছিল না। যেন স্বর্গের অপ্সরা! একেবারে নিখুঁত চেহারা। স্বচেয়ে সুন্দর তার চোখ দুটো। ফটোতে চোখের মণি সবুজাভ মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ঘন কালো। ফটোতে তার চেহারা যতটা গোলগাল মনে হয়েছে, এখন ততটা গোল মনে হচ্ছে না। যথেষ্টই মানানসই। ফটোতে গায়ের রঙ শ্বেতী রোগীর মত অতিরিক্ত রকমের সাদা মনে হয়েছে। এখন সেরকম লাগছে না। হালকা গোলাপি আভা রয়েছে। যাকে বলে দুধে-আলতা গায়ের রঙ।

মোদ্দা কথা, ফটোতে তাকে যতটা সুন্দরী মনে হয়েছে, বাস্তবে সে তারচেয়েও হাজার গুণ সুন্দরী।

মা-মেয়ে সুলতানা বেগমদের মুখোমুখি সোফায় বসেছে। সুলতানা বেগম ঈশিতার উপর থেকে চোখ সরিয়ে ঈশিতার মা ইয়াসমিন বেগমের মুখের দিকে তাকালেন। ভদ্রমহিলার চোখে চোখ পড়তেই তিনি ভয়ানক চমকে উঠলেন। মনে হলো ওই চোখ দুটো তাঁর অনেক দিনের চেনা। এর আগেও কোথায় যেন ওই চোখ দুটো দেখেছেন। বহুবার দেখেছেন!

ভদ্রমহিলার চেহারাও সুলতানা বেগমের কাছে খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। যেন বহু বছর পর এক সময়ের অতি পরিচিত কারও দেখা পেয়েছেন।

সুলতানা বেগম গলা খাঁকারি দিয়ে ইয়াসমিন বেগমকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার সঙ্গে এর আগে কি কোথাও দেখা হয়েছে?’

ইয়াসমিন বেগম কিছুটা অবাক গলায় বললেন, ‘আপনাকে দেখার পর আমিও সে কথাই ভাবছি। এর আগে কি আপনার সঙ্গে কোথাও পরিচয় হয়েছিল? খুব পরিচিত মনে হচ্ছে আপনাকে!’

শাহজাহান ঘটক এক গাদা খাবার মুখে হাউ-হাউ করে বলল, ‘দুনিয়ার সব ব্যাটা ছেলেই হইছে ভাই-ভাই আর মেয়ে ছেলেরা হইছে বইন-বইন। এই জন্যেই চেনা-চেনা মনে হইতেছে।’

সুলতানা বেগম বললেন, ‘আপনাদের আত্মীয়-স্বজন কাউকে দেখছি না।’

ইয়াসমিন বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমাদের নিকট আত্মীয় বলতে কেউ নেই। আমি আমার বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে ছিলাম। বাবা-মা গত হয়েছেন বহু বছর আগে। আর ঈশিতার বাবার দিকের কোনও আত্মীয়- স্বজনের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই।’

সুলতানা বেগম বললেন, ‘ঈশিতার বাবার সম্পর্কে তো কিছুই জানলাম না? বায়োডাটায় দেখলাম শুধু লেখা বাবা নেই। বাবার নাম-পরিচয় কিছুই দেয়া নেই। বেঁচে থাকতে তিনি কী করতেন সে বিষয়েও কোনও উল্লেখ নেই।’

ইয়াসমিন বেগম থমথমে মুখে বললেন, ‘বিয়ে-শাদির ব্যাপার বলে কথা, কিছুই লুকাব না। সবই আপনাদের জেনে রাখা ভাল। ঈশিতার বাবা আমাদের থেকে আলাদা থাকতেন। মৃত্যুর খবরটা পর্যন্ত লোক মুখে জানতে পারি। আমাদের বিয়ের শুরু থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার বনিবনা হচ্ছিল না। ঈশিতার জন্মের পর পাকাপাকিভাবে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ঈশিতাকে আমি একাই মানুষ করেছি। ও ওর বাবাকে কোনও দিন দেখেওনি। আমি আমার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় পৈতৃক সূত্রে অনেক ধন-সম্পদ পেয়েছি। তা দিয়ে আমার মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মত মানুষ করতে খুব একটা কষ্ট হয়নি।’

সুলতানা বেগম বললেন, ‘ঈশিতা তো এবার অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে। বায়োডাটায় দেখলাম খুবই ভাল ছাত্রী। এস. এস. সি. এইচ. এস. সি.-র রেজাল্ট অত্যন্ত ভাল। পড়াশোনা শেষ করার আগেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?’

ইয়াসমিন বেগম বললেন, ‘দেখছেনই তো আমাদের মাথার উপর কোনও গার্ডিয়ান নেই। এমনিতেই মেয়ে বড় হলে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। তার ওপর মেয়ে যদি সুন্দরী হয় তা হলে তো কথাই নেই। সুন্দরী মেয়েদের বাবা-মায়েরা মেয়েকে সুপাত্রের হাতে তুলে দেবার আগ পর্যন্ত এক ধরনের অনিশ্চয়তার মাঝে দিন কাটায়। এ ছাড়া ঈশিতা আজকালকার অন্যান্য মেয়েদের মত ততটা চালুও নয়। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকেই বেরোয় না। তা-ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে। আমার যদি কিছু একটা হয়ে যায় তখন ওকে কে দেখবে? তাই আমি থাকতে-থাকতে ওর একটা ব্যবস্থা করে রেখে যেতে চাই।’

সুলতানা বেগম বললেন, ‘আপনার কি বড় ধরনের কোনও অসুখ রয়েছে?’

ইয়াসমিন বেগম সংকুচিত গলায় বললেন, ‘না, তেমন বড় কোনও অসুখ নেই। তবে মাথা যন্ত্রণা আছে। ভয়ানক মাথা যন্ত্রণা। যখন মাথা ব্যথাটা শুরু হয় দিগ্বিদিক জ্ঞান থাকে না। নিজের মেয়েকে পর্যন্ত চিনতে পারি না।’

‘ডাক্তার দেখাননি?’

‘দেখিয়েছি। ডাক্তার বলেছে মাইগ্রেনের ব্যথা। ওষুধ লিখে দিয়েছে। আর বলেছে, মাইগ্রেনের ব্যথা কখনওই পুরোপুরি সারে না। মাঝে-মাঝে ব্যথা উঠবেই। তবে আগে খুব কম উঠত। বছরে একবার কি দু’বার। আজকাল ঘন- ঘন উঠছে।’

সুলতানা বেগম প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার ছেলেকে দেখে আপনার কি পছন্দ হয়েছে?’

ইয়াসমিন বেগম বললেন, ‘চোখের দেখা দেখেই কাউকে কি পছন্দ বা অপছন্দ করা যায়? আপনার ছেলে দেখতে সুন্দর। তাই বলে মানুষ হিসেবে সে কতটা পছন্দসই তা তো আর এক দেখায়ই বোঝা যাবে না। যেমন ঈশিতার বাবার কথাই ধরুন, লম্বা-চওড়া সুপুরুষ ছিল। কিন্তু ভিতরে ভয়ঙ্কর এক কুৎসিত মনের মানুষ!’

সুলতানা বেগম বললেন, ‘তা ঠিক, মানুষকে উপর থেকে দেখে বোঝার কোনও উপায় নেই। তবে আপনি যেমন বললেন না, আজকালকার অন্যান্য মেয়েদের মত আপনার মেয়ে নয়। তেমনই শত ভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, আমার ছেলেও আজকালকার অন্যান্য ছেলেদের মত নয়। এমন একটা ছেলে আপনি লাখে খুঁজে পাবেন না।’

ইয়াসমিন বেগম বললেন, ‘এটা ঠিক, আপনার ছেলেকে দেখে তেমনই মনে হচ্ছে। আমি লক্ষ করেছি এতক্ষণে সে একবারও চোখ তুলে তাকায়নি। এমনকী ঈশিতার দিকেও নয়। তেমন ছেলে হলে এতক্ষণে কয়েকবার ঈশিতার দিকে তাকানোর কথা ছিল।’

সুলতানা বেগম হেসে বললেন, ‘আপনার মেয়েও কিন্তু একবারও চোখ তুলে তাকায়নি।’

শাহজাহান ঘটক চায়ের কাপে বিস্কিট ভিজিয়ে খেতে- খেতে বলে উঠল, ‘খাপে খাপে মিইল্যা গেছে। যেমন ছেলে তেমনই মেয়ে। আর দেরি কীসের!’

সুলতানা বেগম বললেন, ‘সত্যিই আপনার মেয়েকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’ হেসে ফেলে আরও বললেন, ‘আপনাকেও পছন্দ হয়েছে। এখন আপনার কী মত?’

ইয়াসমিন বেগমও হেসে ফেললেন। হাসি মুখে বললেন, ‘আপনাকেও আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’

শাহজাহান ঘটকের যেন আর তর সইল না। সুড়ৎ-সুড়ৎ করে কয়েক চুমুকে কাপের চা শেষ করে, চায়ে ভিজিয়ে খাওয়া বিস্কিটের যে নরম টুকরো কাপের তলায় জমেছে তা আঙুল দিয়ে ঘুঁটে খেতে-খেতে বলল, ‘তাইলে এহনই পাকা কথা হইয়া যাউক।’

সুলতানা বেগম তাঁর হাত থেকে একটা সুন্দর আংটি খুলে ঈশিতার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, ‘দেখি, মা, তোমার হাতটা দেখি।’

ঈশিতা এক মুহূর্তের জন্য তার মায়ের দিকে তাকিয়ে সুলতানা বেগমের সামনে হাত মেলে ধরল। সুলতানা বেগম ঈশিতার অনামিকায় আংটিটা পরিয়ে দিলেন।

শাহজাহান ঘটক মোনাজাত ধরার ভঙ্গিতে দু’হাত তুলে বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, শুকুর আলহামদুলিল্লাহ!’

সুলতানা বেগম হাসি মুখে শাহজাহান ঘটককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘শুকুর আলহামদুলিল্লাহ কীসের জন্য? এনগেজমেন্ট হয়ে গেল এই জন্যে, না সব খাবার খেয়ে শেষ করতে পেরেছেন বলে?’

সুলতানা বেগমের কথা শুনে ইয়াসমিন বেগমও হেসে উঠলেন। শাহজাহান ঘটক দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাতে-খোঁচাতে বলল, ‘এনগেজমেন্ট যহন হইছে, নিশ্চয়ই খাওন-দাওনের আরও ব্যবস্থা হইবে। তহন আবার শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।’

সুলতানা বেগম এবং ইয়াসমিন বেগম দু’জনেই একসঙ্গে হেসে উঠলেন।

শাহজাহান ঘটক বলে উঠল, ‘ছেলে-মেয়েগো নিজেদের মইধ্যে একটু কথা বলার ব্যবস্থা কইরা দেওন উচিত। তাগো নিজেগোও তো একে-অপরের কাছে কিছু জাননের থাকতে পারে।’

সুলতানা বেগম এবং ইয়াসমিন বেগম দু’জনেই গলা মিলিয়ে বলে উঠলেন, ‘ঠিক বলেছেন, শাহজাহান ভাই।’

সুলতানা বেগম বললেন, ‘যান, ভাই, আপনিই ওদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বাইরের বারান্দায় কথা বলার জন্য রেখে আসেন।’

ইয়াসমিন বেগম বললেন, ‘শাহজাহান ভাই, চিন্তার কিছু নাই, আপনার জন্য আবার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আমি আগেই কাচ্চি বিরিয়ানী করে রেখেছিলাম। গরম করেই নিয়ে আসছি।’

শাহজাহান ঘটক জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে বলল, ‘আফা, বিরিয়ানীর লগে আচার হইলে আরও বেশি মজা লাগে।’

ইয়াসমিন বেগম বললেন, ‘চিন্তা করবেন না, সঙ্গে জলপাইয়ের আচার, গরুর মাংসের চপ, কষানো মুরগির মাংস, সালাদ, কোল্ড ড্রিংকস, দই-মিষ্টি এসবও থাকবে। যান, আপনি গিয়ে আগে ওদের দু’জনকে কথা বলার জন্য রেখে আসেন। খাবার গরম হতে-হতে ওরাও কথা বলা শেষ করে এসে একসঙ্গে খেতে বসতে পারবে।’

তিন

ঘরোয়া ছোট্ট পরিসরে সুমন আর ঈশিতার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। ঈশিতার সঙ্গে ওর মা ইয়াসমিন বেগমও সুমনদের বাড়ি চলে এসেছেন। ঈশিতা বিয়ের আগেই সুমনকে বলেছিল, তার মাকেও তার সঙ্গে এনে রাখার কথা। কারণ, ঈশিতা ছাড়া এ জগতে ইয়াসমিন বেগমের আর কেউ নেই। এই বয়সের একজন মহিলা কী করে একা-একা থাকবেন?

সুলতানা বেগমও তাতে কোনও আপত্তি জানাননি। ভেবে দেখেন, সত্যিই তো একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়ে, বয়স্কা, অসুস্থ একজন মহিলার পক্ষে একা থাকা সম্ভব নয়। তাঁদের সঙ্গে থাকলে তাতে তো কোনও সমস্যা নেই। বরং সুলতানা বেগম তাঁর সমবয়সী একজন সঙ্গী পাবেন।

ঈশিতার মাকে নিয়ে সুলতানা বেগমদের চারজনের সংসার অত্যন্ত আনন্দেই কাটছে। ইয়াসমিন বেগম আর সুলতানা বেগম যেন মানিকজোড় হয়ে উঠেছেন। সারা দিনই দু’জনকে একসঙ্গে পাওয়া যায়। হয়তো গুটুর-গুটুর গল্প করছেন, নয়তো টিভিতে সিরিয়াল দেখছেন। না হয় বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে একসঙ্গে চা পান করছেন। না হয় দু’জন মিলে নতুন কোনও আইটেম রান্না করছেন। অথবা পিঠা বানাচ্ছেন। না হয় দু’জন মিলে ঘর গোছাচ্ছেন। একসঙ্গে বাজার করতে চলে যাচ্ছেন। খাওয়ার সময়ও তাঁরা একসঙ্গে খেতে বসেন। একজনকে রেখে অন্যজন কখনওই খান না। রাতে ঘুমানও একসঙ্গে। অথচ দু’জনেরই আলাদা- আলাদা রুম আছে। তিনটি বেডরুমের একটি ঈশিতা আর সুমনের। অন্য দুটো তাঁদের দু’জনের।

সংসারের পুরো দায়িত্ব দুই বেয়ান ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। আর ঈশিতা শুধু মাত্র তাঁদের দু’জনের সাহায্যকারী হিসেবে পাশে থাকে। সুমনের দায়িত্ব শুধু সুবোধ বালকের মত আটটা-পাঁচটা অফিস করা। চারজন মিলে মিশে বেশ সুখেই আছে তারা।

প্রথম দেখায়ই সুলতানা বেগমের কাছে ইয়াসমিন বেগমের মুখটা খুব পরিচিত ঠেকেছিল। তখন তিনি ধরতে পারেননি অমন পরিচিত মনে হওয়ার কী কারণ। পরে ধীরে-ধীরে ব্যাপারটা ধরে ফেলেন। ইয়াসমিন বেগমের চেহারার সঙ্গে সুলতানা বেগমের স্বামী আমজাদ হোসেনের চেহারার অনেক মিল রয়েছে। যেন এক মায়ের পেটের ভাই-বোন। শুধু ভাই-বোন বললেও ভুল হবে, যেন যমজ ভাই-বোন। দু’জনের চেহারায় যতটুকু পার্থক্য তা যেন একজন নারী, অন্যজন পুরুষ হওয়ায়।

সুলতানা বেগম তাঁর স্বামীর সঙ্গে ইয়াসমিন বেগমের চেহারার মিল ধরার পর ভেবেছিলেন, হয়তো ইয়াসমিন বেগম তাঁর স্বামীর দিকের কোনও আত্মীয়া। লতায়-পাতায় পেঁচানো দূর সম্পর্কের কোনও আত্মীয়াও তো হতে পারেন। সে কারণেই হয়তো তিনি চিনতে পারেননি। কিন্তু বিষয়টা সম্পর্কে ইয়াসমিন বেগমকে জিজ্ঞেস করে এবং তাঁর স্বামীর দুই ভাইয়ের কাছ থেকে এমন কোনও তথ্য পাননি যে ইয়াসমিন বেগম তাঁর স্বামীর দিকের কোনও আত্মীয়া। তবে ফটো অ্যালবামে আমজাদ হোসেনের ছবি দেখে ইয়াসমিন বেগম কেমন ভাবনায় ডুবে গিয়ে বলেছেন, এই লোকটিকে তিনি কোথায় যেন দেখেছেন। অনেকবার দেখেছেন। কিন্তু মনে করতে পারছেন না, কোথায় দেখেছেন।

চার

সন্ধ্যা হচ্ছে। চারদিকে শান্ত নীরবতা। সমস্ত আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে থমথম করছে। ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই বোধহয় প্রবল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হবে।

গত কয়েক দিন ধরে খুব গরম পড়ছে। তীব্র তাপদাহে জনজীবন অতিষ্ঠ। আকাশে কালো মেঘ জমতে দেখে সবার মনে এক ধরনের ফুরফুরে ভাব চলে এসেছে।

সুলতানা বেগম আর ইয়াসমিন বেগম বারান্দায় বসে মেঘে ঢাকা আকাশ দেখতে-দেখতে চা পান করছেন। ইয়াসমিন বেগমের মুখটা মেঘে ঢাকা আকাশের মতই ভার হয়ে আছে।

সুলতানা বেগম জিজ্ঞেস করলেন, ‘বেয়ান, আপনার মুখটা অমন ভার কেন? কোনও কারণে কি আপনার মন খারাপ?’

ইয়াসমিন বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আকাশে মেঘ জমতে দেখলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়।’

সুলতানা বেগম অবাক গলায় বললেন, ‘আকাশে মেঘ জমেছে বলে আপনার মন খারাপ হবে কেন? তাতে তো মন আরও ভাল হয়ে যাবার কথা। কত দিন পর স্বস্তির বৃষ্টি আসছে।’

ইয়াসমিন বেগম বললেন, ‘একটা সময় ছিল যখন আকাশে মেঘ জমতে দেখলে আমার চেয়ে বেশি খুশি কেউ হত না। ঝড়-বৃষ্টি মানেই গ্রামের বাড়ির টিনের চালে বৃষ্টির ঝম-ঝম শব্দ। উঠানে নেমে বৃষ্টি-স্নান। বাগানে আম কুড়াতে যাওয়া। পুকুরের পাড় বেয়ে উপরে উঠে আসা ডিমওয়ালা কৈ মাছ ধরা। এসব কারণে মায়ের বকুনি শোনা। ঘরে ফিরে ভেজা কাপড় পাল্টে গরম ধোঁয়া ওঠা আদা চায়ের সঙ্গে ঝাল-ঝাল মুড়ি-চানাচুর ভর্তা খাওয়া। খিচুড়ির আয়োজন করা। আরও কত কী!’

সুলতানা বেগম বললেন, ‘এখন তা হলে বৃষ্টি আসতে দেখে মন খারাপ করছেন কেন?’

‘একটা ঘটনার পর ঝড়-বৃষ্টি আমার কাছে অভিশাপ হয়ে গেছে।’

সুলতানা বেগম অবাক গলায় বললেন, ‘কী এমন ঘটনা! ঝড়-বৃষ্টিকে অভিশাপ মনে হবে কেন?’

‘এক ঝড়বৃষ্টির রাতের কথা। রাত দশটা-সোয়া দশটার মত বাজে। রাত দশটা-সোয়া দশটা মানেই গ্রামে অনেক রাত। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল। সে বছরই আমি এস. এস. সি. পাশ করেছিলাম। এস. এস. সি পাশের পর বাবার কড়া নির্দেশ ছিল, আমি যেন আগের মত আর ঝড়-বৃষ্টি দেখলেই আম কুড়াতে না নেমে পড়ি। তাই বাবার ভয়ে দিনের বেলা আম কুড়াতে যেতে পারতাম না। ভাবলাম, সবাই যখন ঘুমিয়ে রয়েছে-এই সুযোগে আম কুড়াতে যাওয়া যায়। চুপি-চুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। সে কী ঝড়-বৃষ্টি! বিকট শব্দে আশপাশে বাজ পড়ছে। একেকবার বাজ পড়ার শব্দে যেন পুরো পৃথিবী কেঁপে-কেঁপে উঠছিল। আমি সেই ঝড়-বৃষ্টির মাঝেই গুটি-গুটি পায়ে হেঁটে চলে যাই একটু দূরের পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতে। কারণ, ওই বাড়িতে অনেকগুলো বড়-বড় আমগাছ ছিল। অনেক আম পাওয়া যাবে ওখানে।

‘ধারণা সঠিক হয়। সত্যিই জমিদার বাড়ির বাগানে অনেকগুলো আম পাওয়া যায়। সঙ্গে দুটো ঝুড়িও নিয়ে গিয়েছিলাম। দুটো ঝুড়িই ভরে যায়। এত ওজন হয় যে আমার পক্ষে বাড়ি পর্যন্ত বয়ে নেয়া সম্ভব নয়। মাথায় বুদ্ধি আসে, জমিদার বাড়ির কাছারি ঘরটার মাঝে লুকিয়ে রেখে গেলে কেমন হয়। সকালে ধলু কাকুকে পাঠিয়ে আনাব। ধলু কাকু হচ্ছেন আমাদের বাড়ির কামলা। দাদার আমল থেকেই আমাদের বাড়িতে কামলার কাজ করতেন। আমি কিছু বললে তিনি না করবেন না। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আর বাবাকেও জানাবেন না যে, আমি রাতে চুপি-চুপি আম কুড়াতে এসেছিলাম।

‘জমিদার বাড়ির চিহ্ন বলতে একমাত্র ওই কাছারি ঘরটাই ছিল। তা-ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে কোনও মতে কাঠামোটা দাঁড়িয়ে ছিল। ভিতরে রাজ্যের নোংরা। মাকড়সার ঝুল, ইঁদুর-তেলাপোকার নাদ, বাদুড়ের বিষ্ঠা, উড়ে আসা শুকনো পাতা, এমনকী দিনের বেলায় আশ্রয় নেয়া গরু-ছাগলের মলও রয়েছে।

‘ঝুড়ি দুটোকে টেনে-হিঁচড়ে কোনওক্রমে কাছারি ঘরের দিকে নিয়ে যাই। যেই না প্রবেশদ্বার দিয়ে ভিতরে ঢুকতে গেলাম ভয়ানক চমকে উঠি। ভিতরে কারা যেন রয়েছে! গম-গম শব্দ হচ্ছে। প্রবেশদ্বারের পাশে নিজেকে আড়াল করে ভিতরে দেখার জন্য উঁকি মারি। কী আশ্চর্য! ভিতরে তিনজন মানুষ। মানুষ বললে ভুল হবে, তারা মানুষ নয়-অন্য কিছু। অনেক লম্বা। অস্বাভাবিক লম্বা-লম্বা হাত- পা। পিছনে হনুমানের মত লম্বা লেজ। মুখমণ্ডলও হনুমানের মুখের মত লম্বাটে। চোখ দুটো বিড়ালের চোখের মত জ্বলজ্বলে। সমস্ত গা থেকে সবুজাভ দ্যুতি বেরোচ্ছে।

‘প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই। ভয়ে আঁতকে উঠে ‘ও, মা’ বলে চিৎকার দিয়ে ফেলি। আমার মুখ থেকে চিৎকারটা বেরোবার সঙ্গে-সঙ্গে ওই তিনজন চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে যায়। তাতে আমার আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। এক মুহূর্তও দেরি না করে হাত থেকে আমের ঝুড়ি ফেলে ঘুরে দৌড় লাগাই। রুদ্ধশ্বাসে পড়িমরি করে দৌড়তেই থাকি। কিন্তু জমিদার বাড়ির সীমানা পেরোবার আগেই কী যেন হয়। স্পষ্ট মনে নেই। এটুকুই মনে আছে চোখ ধাঁধানো নীলচে আলোর তীব্র ঝলকানি দেখতে পাই। যেন সেই আলোর ঝলকানিতে চোখ দুটো ঝলসে যায়। সেই সঙ্গে কান ফাটানো বিকট ভয়ানক শব্দ। কানে তালা লেগে যায়। নিমিষে সমস্ত অনুভূতি হারিয়ে ফেলি।’

ইয়াসমিন বেগমের বলা থামতেই সুলতানা বেগম অত্যন্ত আগ্রহী গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘তারপর, তারপর কী হলো? আপনার ওপর কি বজ্রপাত হয়েছিল?’

ইয়াসমিন বেগম আবার বলতে লাগলেন, ‘হতে পারে। গায়ে বজ্রপাত হওয়ার কী অনুভূতি তা তো আমার জানা নেই। যখন আমার জ্ঞান ফেরে তখন নিজেকে পাই আমার শোবার ঘরের বিছানায়। মা আমার কপালে জলপট্টি দিচ্ছেন। আমাকে ঘিরে রয়েছে আত্মীয়-স্বজন সহ আশপাশের প্রতিবেশীরা অনেকেই।

‘চোখ মেলতেই সবাই কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করতে থাকে, কী হয়েছিল আমার? আমি ওই জমিদার বাড়িতে কখন গিয়েছিলাম? জমিদার বাড়ির কাছারি ঘরের মধ্যে কী কাজ ছিল? কী ঘটেছিল ওখানে? ওখানে এত রক্ত এল কোত্থেকে?

‘আমি সব কিছু বললাম। মানে, আম কুড়াতে গিয়ে যা- যা ঘটেছিল সব।

‘অনেকে দেখলাম ভয় পেয়ে বুকে থু-থু দিল। সবাই বলাবলি করতে শুরু করল, জিনের খপ্পরে পড়েছিলাম আমি। কপাল ভাল বলে বেঁচে ফিরতে পেরেছি।

‘একজন চোখ বড় করে বলে উঠল, জমিদার বাড়ির কাছারি ঘরের মেঝেতে এত রক্ত এল কোত্থেকে? যেন ওখানে গরু জবাই দেয়া হয়েছে! অথচ ইয়াসমিনের গায়ে কোনও কাটা ক্ষত নেই। তা হলে ওই রক্ত কার? জিনের রক্ত না তো?

‘কেউ-কেউ আমাকে শাসাতে শুরু করল, কতবার বারণ করা হয়েছে, রাত-বিরাতে যেন আম কুড়াতে না যায়। শুনল না, কোনও কথা শুনল না। শেষ পর্যন্ত জিনের কবলে পড়ল! কপাল ভাল যে বেঁচে ফিরেছে…

‘উপস্থিত সবাই যে যার মত কথাবার্তা বলতে থাকে। আর মা আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে কেঁদে-কেটে ব্যাকুল হয়।’

সুলতানা বেগম বলে উঠলেন, ‘কাছারি ঘরের ভিতরে গরু জবাই দেবার মত রক্ত পড়ে ছিল মানে?’

ইয়াসমিন বেগম বলতে লাগলেন, ‘আমি তো আর দেখিনি, সবার কাছে যা শুনেছি। সেদিন ভোর বেলা আমাকে ঘরে না দেখে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। সারা গ্রামে খোঁজা হয়। শেষতক জমিদার বাড়ির পরিত্যক্ত কাছারি ঘরের ভিতরে গিয়ে অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে পড়ে থাকতে দেখে। পোশাকবিহীন-উলঙ্গ। আমার সারা গায়ে রক্ত মাখা। যেখানটায় পড়ে ছিলাম পুরো জায়গা গরু জবাই দেবার মত রক্তে ভেজা। অথচ আমার গায়ে কোনও কাটা ক্ষত ছিল না। তাই ওই রক্ত কোত্থেকে এসেছে, কীসের রক্ত-সেটা সবার কাছে ভয়ানক রহস্যময় বলে মনে হয়।’

সুলতানা বেগম বললেন, ‘সেদিন ঝড়-বৃষ্টির রাতে আম কুড়াতে গিয়ে অমন একটা ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন বলেই কি আপনার এখন আর ঝড়-বৃষ্টি ভাল লাগে না?

‘সেটা তো আছেই, তার সঙ্গে আরও কিছু ব্যাপার রয়েছে। ওই রাতের ঘটনা ওখানেই শেষ হলে তো আর কোনও কথাই ছিল না। ওই ঘটনার পর আমার জীবনটাই বদলে যায়। আমার চেহারা, কথাবার্তা, আচার-আচরণ সব কিছু বদলে যায়। যেন আমি অন্য মানুষ হয়ে যাই। আমার চেহারায় পুরুষালী ছাপ আসে। মাথা যন্ত্রণার রোগ দেখা দেয়। প্রচণ্ড মাথা যন্ত্রণা! যার কি না আগে মাথা ব্যথা জাতীয় কোনও রোগই ছিল না। যন্ত্রণাটা সব সময় নয়, শুধু ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলেই। ব্যথার তীব্রতা এতই হয় যে আমি পাগলের মত আচরণ করি। উদ্ভট, উল্টো-পাল্টা কথা বলি। যে কথার মানে কেউ-ই বোঝে না। নিজের পরিচয় পর্যন্ত ভুলে যাই। আপনজনদেরও চিনতে পারি না। গলার স্বরও পরিবর্তন হয়ে পুরুষালী হয়ে যায়। নিজেকে নাকি তখন অন্য মানুষ বলে দাবি করি। অবশ্য ওই সময়ের কোনও কিছুই আমার পরবর্তীতে মনে থাকে না। অন্যের মুখ থেকে যেটুকু শুনেছি। এ কারণেই ঝড়-বৃষ্টি আসতে দেখলেই আমার মন খারাপ হয়ে যায়।

সুলতানা বেগম জিজ্ঞেস করলেন, ‘এসব ঘটনা কি. আপনার বিয়ের আগের? না পরের?’

‘বিয়ের আগের। গ্রামে আমার সম্পর্কে বিভিন্ন রটনা রটে যায়। আমার উপর খারাপ জিন ভর করেছে, তাই আমার চেহারা পুরুষালী হয়ে গেছে। ঝড়-বৃষ্টির সময় আমার মধ্যে জিনের অস্তিত্বটা আরও প্রকট রূপে জেগে ওঠে বলে আমি অচেনা পুরুষ কণ্ঠে কথা বলি। আরও কত কী! আমার বাবা-মা চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। জিনে আছর হওয়া মেয়েকে কে বিয়ে করবে? বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে হওয়ায় বাড়ি-ঘর-সহায়-সম্পত্তির লোভে একটা ছেলে জুটে যায়। ওই ঘটনার দুই মাসের মধ্যেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের দশ দিনের মাথায় আমার শাশুড়ি ধরে ফেলে আমি অন্তঃসত্ত্বা। যেন কেয়ামত নেমে আসে! বিয়ের দশ দিনের মধ্যে কারও অন্তঃসত্ত্বা হবার কথা নয়। হলেও তা কারও বোঝার কথা নয়। আমাকে নষ্টা-ভ্রষ্টা বলে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়।

‘গর্ভবতী হওয়ার সাত মাসের মাথায় ঈশিতার জন্ম হয়। বাবা-মা যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন ঈশিতাকে নিয়ে তাদের সাথেই ছিলাম। তাদের মৃত্যুর পর গ্রামের জায়গা-জমি, বাড়ি-ঘর বিক্রি করে মেয়েকে নিয়ে শহরে চলে আসি 1 ঈশিতার বাবা আর কোনও দিনও খোঁজ নেয়নি। সে ঈশিতাকে নিজের সন্তান বলেই স্বীকার করত না।’

সুলতানা বেগম কিছুটা বিরক্ত গলায় বললেন, ‘বিয়ের সাত মাসের মাথায় যে সন্তানের জন্ম হয়, সে সন্তানকে কোনও বাবারই নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকার করার কথা নয়।

ইয়াসমিন বেগম ফোঁত-ফোঁত করে কাঁদতে-কাঁদতে বললেন, ‘বিশ্বাস করুন, বেয়ান, আমার জীবনে একমাত্র পুরুষ ঈশিতার বাবাই এসেছিল!’

সুলতানা বেগম আর কিছুই বললেন না। অপলক চোখে ইয়াসমিন বেগমের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই চোখে খানিকটা · বিস্ময়, খানিকটা অবিশ্বাস আর খানিকটা সহমর্মিতার সম্মিলন।

.

রাত সোয়া এগারোটা।

বাইরে ভীষণ ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। ইয়াসমিন বেগমের মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে। তিনি পাগলের মত আচরণ করছেন। পুরুষালী গলায় একেকবার আবোল-তাবোল চিৎকার দিয়ে উঠছেন। তাঁর সেই পুরুষালী গলার স্বর শুনে সুলতানা বেগম চমকে-চমকে উঠছেন। কারণ, ওই পুরুষালী গলার স্বরটা তাঁর খুবই পরিচিত। তাঁর স্বামী আমজাদ হোসেনের গলার স্বরও এমন ছিল। যেন ইয়াসমিন বেগম নন, তাঁর স্বামী আমজাদ হোসেন চিৎকার করছেন।

পাঁচ

বৈশাখ মাস পেরিয়ে জ্যৈষ্ঠ মাস চলছে। দু’এক দিন বাদে- বাদেই ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইয়াসমিন বেগমের মাথা ব্যথা দেখা দিচ্ছে।

মাথা যন্ত্রণার মুহূর্তে ইয়াসমিন বেগমের কিছু আচরণ সুলতানা বেগমকে চরম ভাবিয়ে তুলেছে। তিনি এর কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছেন না।

এর মধ্যে একদিন ইয়াসমিন বেগমের মাথা ব্যথা শুরু হবার পর সুলতানা বেগম কাছে গেলে পুরুষালী গলায় বলে ওঠেন, ‘সুলতানা, তুমি এতদিন পর আমাকে দেখতে এসেছ?’

সুলতানা বেগম স্থবিরের মত থমকে গিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন। যেন কথাটা বাইশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া তাঁর স্বামী আমজাদ হোসেন বলেছেন।

ইয়াসমিন বেগম আবার পুরুষালী গলায় বলেন, ‘সুলতানা, তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ না? আমি তোমার আমজাদ, ‘আম’। ভুলে গেছ, তুমি দুষ্টুমি করে আমাকে ‘আম’ বলে ডাকতে। আর আমি তোমাকে ‘সু- লতা’ বলে। সে কথা তোমার মনে নেই?’

সুলতানা বেগম কেঁপে ওঠেন। তাঁর হাত-পায়ের তালু, কপাল ঘামতে শুরু করে। সত্যিই তিনি তাঁর স্বামীকে দুষ্টুমি করে মাঝে-মাঝে ‘আম’ বলে ডাকতেন। আর তাঁর স্বামী তাকে ‘সু-লতা’ বলে ডাকতেন। এ ব্যাপারটা তো কোনওভাবেই ইয়াসমিন বেগমের জানার কথা নয়! কারওই জানার কথা নয়।

শুধু তা-ই নয়, মাথা ব্যথার সময় ইয়াসমিন বেগম নিজেকে আমজাদ হোসেন বলে দাবি করেন। এবং আমজাদ হোসেনের সব কথাই গড়-গড় করে বলতে পারেন। খুব গোপন কথাও। মানে যা কিছু শুধু আমজাদ হোসেনের জানার কথা। যেন সেই মুহূর্তে ইয়াসমিন বেগমের উপর আমজাদ হোসেনের আত্মা ভর করে।

সুলতানা বেগম কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারছেন না। ইয়াসমিন বেগম কেন তাঁর স্বামীর মত করে কথা বলবেন? এর পেছনে কী রহস্য?

সুলতানা বেগম ঈশিতাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এর আগেও কি মাথা যন্ত্রণা শুরু হলে তার মা এই একই গলার স্বরে কথা বলতেন? নিজেকে আমজাদ হোসেন বলে দাবি করতেন?

ঈশিতা বলেছে, হ্যাঁ। এই গলার স্বরেই কথা বলতেন। নিজেকে অন্য একজন বলে দাবি করতেন। তবে আমজাদ হোসেন বলে দাবি করতেন কি না তা কখনও সেভাবে খেয়াল করে দেখেনি। তবে এটা তার মনে আছে, মাথা খারাপের মুহূর্তে সে তার মায়ের মুখে বহুবার সুলতানা, সু- লতা নামটা শুনেছে।

ইয়াসমিন বেগম নিজেকে আমজাদ হোসেন দাবি করার এক মুহূর্তে সুলতানা বেগম তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আচ্ছা, সত্যিই যদি আপনি আমজাদ হোসেন হন, তা হলে বলুন তো বাইশ বছর আগে আপনি কোথায় হারিয়ে গেছেন? কীভাবে হারিয়ে গেছেন? সেদিন কত তারিখ ছিল?’

ইয়াসমিন বেগম আমজাদ হোসেনের মত গলার স্বরে জানান, ‘সেদিন ছিল ১১ই বৈশাখ। আমাদের বিবাহ বার্ষিকীর দিন ছিল। ভোরবেলায় বিয়ের শাড়ি পরে সেজে- গুজে আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়েছিলে তুমি। খিচুড়ি রান্না করেছিলে। আমি পাঞ্জাবি পরে অফিসে গিয়েছিলাম। সঙ্গে সুমনকে নিয়ে, ওকে স্কুলে পৌঁছে দেবার জন্য। তোমার হাতে পাঁচশো টাকা দিয়ে গিয়েছিলাম ভাল-মন্দ বাজার করে রান্না করার জন্য। তুমি আমাকে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি আসার অনুরোধ করেছিলে।’

সুলতানা বেগম বিস্ময়ে যেন বোবা হয়ে যান। সেই সঙ্গে বুকের মাঝে মোচড় দিয়ে ওঠে। দু’চোখ বেয়ে টপ-টপ করে অশ্রু ঝরতে থাকে। তিনি চোখ মুছতে-মুছতে বুজে আসা গলায় কোনওক্রমে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি তা হলে সেদিন কেন তাড়াতাড়ি এলে না? আর কোনও দিনই তো ফিরে এলে না!’

ইয়াসমিন বেগম আবার আমজাদ হোসেনের গলার স্বরে বলতে থাকেন, ‘বরাবরের মত সেদিনও অফিসের বস সোয়া ন’টার আগে ছাড়লেন না। অফিস থেকে বেরিয়েই মার্কেটে চলে গেলাম তোমার জন্য একটা শাড়ি আর সুমনের জন্য খেলনা কিনতে। কেনা-কাটা শেষে রাস্তায় বেরিয়ে দেখি দমকা হাওয়া ছেড়েছে। ঘন-ঘন বিজলি চমকাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড়-বৃষ্টি শুরু হবে। রাস্তা-ঘাট একেবারে ফাঁকা। যাওয়ার জন্য একটা খালি রিকশা বা বেবি ট্যাক্সি কিছুই পাওয়া যাচ্ছিল না। জোরে-জোরে পা চালিয়ে হাঁটতে শুরু করি। যে করেই হোক ঝড়-বৃষ্টি শুরু হবার আগে বাসায় পৌঁছতে হবে। কিন্তু পথের মাঝেই হঠাৎ প্রবল ঝড় শুরু হয়ে যায়। রাস্তার সব ধুলো-বালি, পলিথিনের টুকরো, কাগজের টুকরো ঘূর্ণির মত উড়তে শুরু করে। মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে কিছুই দেখতে পাই না। একটু নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় দিগ্বিদিক্ হারিয়ে ছুটতে শুরু করি। এসময় উপর থেকে ইলেকট্রিক তার ছিঁড়ে এসে গায়ে পড়ে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃগী রোগীর মত কাঁপতে-কাঁপতে অনুভূতি হারাই।

‘যখন আবার ক্ষণিকের জন্য নিজেকে ফিরে পাই, তখন দেখি আমি এক অন্ধকার কামরায়। আমাকে ঘিরে অদ্ভুত চেহারার তিনজন মানুষ। অনেক লম্বা। লম্বা-লম্বা হাত-পা। জ্বলজ্বলে চোখ।- পিছনে লম্বা লেজ। তাদের গা থেকে সবুজাভ আলোর বিচ্ছুরণ হচ্ছে। তারা আমার পেটটা চিরে ফেলেছে। বুক থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত লম্বালম্বিভাবে চিরেছে। মাথার খুলিও কেটে ফেলেছে। আমার পাশে আরও একজন শোয়ানো ছিল। একজন মহিলা। তারও আমার মত বুক থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত চিরে ফেলা হয়েছে। মাথার খুলিও কেটে ফেলেছে। সবই দেখছিলাম কিন্তু নড়াচড়া বা কথা বলার মত কোনও ক্ষমতা ছিল না। তারা তিনজন আমাদের দু’জনেরই চেরা পেটের মাঝে হাত ঢুকিয়ে হাতড়াচ্ছিল। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল আমাদের দু’জনের শরীর। ওসব দেখতে-দেখতেই আবার চেতনাশূন্য হয়ে পড়ি। এরপর আর কিছু মনে নেই। সেই থেকে হঠাৎ-হঠাৎ মাঝে-মাঝে নিজেকে খুঁজে পাই, আবার যেন কোথায় হারিয়ে যাই।’

ছয়

সুমনের এক বন্ধু ডা. জাহিদ হাসান। বর্তমানে গৌরীপুর স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার। সুমন তার শাশুড়ি ইয়াসমিন বেগমের মাথা যন্ত্রণার সমস্যা নিয়ে ফোনে জাহিদ হাসানের সঙ্গে কথা বলে। সুমনের বন্ধু জাহিদ হাসান পরামর্শ দেয় প্রফেসর ডা. আতিকুর রহমানকে দেখানোর। তিনি একজন নামকরা নিউরোলজিস্ট। মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নের সময় ডা. আতিকুর রহমান জাহিদ হাসানের শিক্ষক ছিলেন। সেই সুবাদে জাহিদ হাসানের সঙ্গে আতিকুর রহমানের বেশ সুসম্পর্ক রয়েছে। জাহিদ হাসান সুমনকে আশ্বাস দেয়, সে তার স্যর আতিকুর রহমানকে অনুরোধ করবে, তিনি যাতে সুমনের শাশুড়িকে বাড়তি যত্ন নিয়ে দেখেন।

সুমন ইয়াসমিন বেগমকে ডা. আতিকুর রহমানের কাছে নিয়ে যায়। ডা. আতিকুর রহমান ইয়াসমিন বেগমের মাথা ব্যথার সমস্যা বিস্তারিতভাবে শুনে মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান সহ কয়েক ধরনের রক্ত পরীক্ষা করাতে দেন। পরীক্ষাগুলোর রিপোর্ট নিয়ে আবার তাঁর কাছে যেতে বলেন।

মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান এবং রক্ত পরীক্ষাগুলোর রিপোর্ট বেরোবার পর, রিপোর্ট নিয়ে সুমন একা আতিকুর রহমানের চেম্বারে যায়। ডা. আতিকুর রহমান গভীর মনোযোগের সঙ্গে রিপোর্টগুলো উল্টে-পাল্টে দেখেন। বেশ কয়েকবার দেখেন। রিপোর্টগুলো দেখতে-দেখতে তাঁর ভুরু কুঁচকে যেতে থাকে। তাঁকে দেখে মনে হয় তিনি যেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। এক পর্যায়ে চিন্তিত গলায় বলেন, ‘সুমন, তোমার মাদার- ইন-ল-র মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান দেখে আমি সাংঘাতিক বিস্মিত। একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মস্তিষ্কের গঠন যে এমন হতে পারে তা আমার কল্পনায়ও ছিল না। যে ডাক্তার তাঁর সিটি স্ক্যান করেছেন, আমি একটু তাঁর সঙ্গে কথা বলে নিতে চাই। এই রিপোর্টটা কি সঠিক, না কোথাও বড় রকমের ভুল হয়েছে?’

সুমন বলে ওঠে, ‘স্যর, সিরিয়াস কিছু নয় তো?’

ডা. আতিকুর রহমান হতাশ গলায় বলেন, ‘আমি কিছু বুঝতেই পারছি না। সেজন্যেই যে ডাক্তার স্ক্যান করেছেন, তাঁর সঙ্গে আগে কথা বলে নিতে চাই।’

ডা. আতিকুর রহমান ফোনে অনেকক্ষণ কথা বলেন। কথা বলা শেষে তাঁর চেহারাটা কেমন বিধ্বস্ত মনে হয়। তাঁর সামনে পিরিচ দিয়ে ঢাকা এক গ্লাস পানি ছিল। তিনি গ্লাসের উপর থেকে পিরিচটা তুলে এক চুমুকে পানিটুকু শেষ করেন। এরপর চেয়ারে হেলান দিয়ে ধীরে-সুস্থে বলেন, ‘যে ডাক্তার সিটি স্ক্যান করেছেন তিনিও আমার মত স্তম্ভিত। তিনিও প্রথমে মনে করেছিলেন কোথাও বড় রকমের ভুল হচ্ছে। এ কারণে একবারের জায়গায় বেশ কয়েকবার স্ক্যান করেন। কিন্তু প্রতিবারই একই রকম দেখা যায়।’

সুমন বলে ওঠে, ‘স্যর, সমস্যাটা আসলে কী?’

ডা. আতিকুর রহমান বলতে থাকেন, ‘সমস্যাটা কী, তোমাকে ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। বলা যায় ওনার মস্তিষ্কের গঠন মোটেই অন্যসব মানুষের মত নয়। একেবারেই আলাদা। যেন মানুষের মস্তিষ্কের আদলে নাম না জানা ভিন্ন কোনও প্রাণীর মস্তিষ্ক। তাঁর মস্তিষ্কের সেরিব্রাম, থ্যালামাস, হাইপোথ্যালামাস, সেরিবেলাম, পন্‌স, মেডুলা, মিড ব্রেনের সেরিব্রাল পেডাঙ্কল, কর্পোরা কোয়াড্রিজেমিনা, সেরিব্রাল অ্যাকুইডাক্ট, কিছুই অন্যসব মানুষের মত নয়। নার্ভাস সিস্টেম আর সেনসরি অর্গানও সাধারণ মানুষের চেয়ে ভিন্ন। ক্র্যানিয়াল নার্ভ সাধারণ মানুষের থাকে ১২ জোড়া, তাঁর রয়েছে ২২ জোড়া। সবচেয়ে বড় অস্বাভাবিকতা মস্তিষ্কের সেরিব্রাল আর সেরিবেলামে। মস্তিষ্কের দুটো ভাগ আছে। বাদামের মাঝখান দিয়ে বিভক্ত দুই অংশের মত সমানভাবে দুই দিকে বিভক্ত দুটি অংশ। এই বিভক্ত দুই অংশকে দুই বলয় বলা হয়। ডান বলয়, বাম বলয়। দুই বলয় বিভক্ত থাকলেও স্নায়ুতন্তুর গোছা দ্বারা সংযুক্ত থাকে। যেমন সেরিব্রাল অংশ সংযুক্ত থাকে কপার্স কলোসাম নামে স্নায়ুতন্ত্রর গোছা দ্বারা। মস্তিষ্কের বড় অংশ সেরিব্রাম দুই বলয়ে সংযুক্ত থাকে সাদা স্নায়ুর গোছা দ্বারা। সেরিবেলাম নিউক্লি অংশ সংযুক্ত থাকে ভেরমিস দ্বারা। কিন্তু তাঁর মস্তিষ্কের দুই বলয় সংযোগহীন-একেবারে আলাদা। কোনও ধরনের স্নায়ুতন্তুর গোছা দ্বারাই সংযুক্ত নয়। যেন দুই বলয় স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে। এটা আদৌ সম্ভব কি না মেডিকেল সায়েন্সে এমন কোনও প্রমাণ নেই। তাঁর মস্তিষ্কের এই অস্বাভাবিক গঠন দেখে আমার পুরো মাথা ঘুরে গেছে। এমনটা কী কারণে হয়েছে? এমন কি হতে পারে, শরীরের অন্য কোনও সমস্যার কারণে, মস্তিষ্কে প্রভাব পড়েছে? অথবা সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কোনও ভাইরাসের আক্রমণে মস্তিষ্কের গঠনে ওধরনের পরিবর্তন হয়েছে? এক কাজ করি, তাঁর পুরো বড়ির সব ধরনের মেডিকেল চেক-আপ করিয়ে দেখি সমস্যাটা ধরতে পারি কি না।’

.

ইয়াসমিন বেগমের পুরো শরীরের সব ধরনের মেডিকেল চেক-আপ করানো হয়। সেই রিপোর্ট দেখে ডা. আতিকুর রহমান আরও চমকে যান। রিপোর্ট নির্দেশ করছে, ইয়াসমিন বেগমের শরীরের ভিতরের সমস্ত অর্গান কোনও এক সময় ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয়েছিল। লিভার, কিডনি থেকে শুরু করে হার্ট, লাং, গলব্লাডার, প্যানক্রিয়াস-সব! সব কিছু যেন অন্যের শরীর থেকে এনে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। মস্তিষ্কেও অস্ত্রোপচার হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। একেবারেই অবিশ্বাস্য। মেডিকেল সায়েন্স এখনও এতটা অগ্রসর হয়নি যে একজনের দেহের সমস্ত অর্গান আরেকজনের দেহে প্রতিস্থাপন করা যাবে। তবে ইয়াসমিন বেগমের শরীরে কোনও অপারেশনের দাগ পাওয়া যায়নি। যেন অলীক কোনও উপায়ে তাঁর দেহের ভিতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

ডা. আতিকুর রহমান হাল ছেড়ে দেয়া গলায় সুমনকে জানান, ‘তোমার মাদার-ইন-ল-র ব্যাপারটা আমি কিছুই ধরতে পারছি না! সম্ভবত এ দেশের কোনও ডাক্তারই তাঁর রোগ বুঝতে পারবে না। দেশের বাইরে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক অথবা আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে দেখতে পারো। তাদের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আছে। তারা হয়তো বুঝতেও পারে।’

সাত

গত রাতে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। বরাবরের মত ইয়াসমিন বেগমের মাথা ব্যথাও তীব্র রূপ নিয়েছিল। সেই সঙ্গে পাগলামিও। ডা. আতিকুর রহমানের প্রেসক্রাইব করা কড়া ডোজের ঘুমের ইনজেকশন দিয়েও তাঁকে শান্ত করা যাচ্ছিল না। সারা রাত যন্ত্রণাকাতর পশুর মত ছটফট করেন। শেষ রাতের দিকে কিছুটা স্বাভাবিক হন। সেই সুযোগে বাড়ির অন্যরা ঘুমিয়ে পড়েছিল।

সকালে সবার প্রথমে ঘুম ভাঙে সুলতানা বেগমের। ঘুম ভাঙতেই তিনি ইয়াসমিন বেগমের খোঁজ নিতে তাঁর রুমে চলে যান। গিয়ে দেখেন, রুমে ইয়াসমিন বেগম নেই। বাথরুমে, রান্নাঘরে, বসার ঘরে-সব জায়গায় খোঁজ করেন। কোথাও তাঁকে দেখতে পান না। সুলতানা বেগমের চোখ পড়ে বাসার সদর দরজায়। দরজার ছিটকিনি খোলা। দরজা ভেজানো। বুঝতে দেরি হয় না, দরজা খুলে ইয়াসমিন বেগম বাইরে গেছেন। চিন্তিত হয়ে পড়েন, অসুস্থ একটা মানুষ একা-একা কোথায় গেলেন? কখনও তো এভাবে না বলে কোথাও যাননি!

সুলতানা বেগম সুমন আর ঈশিতাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। ইয়াসমিন বেগম যে বাসায় নেই তাদেরকে জানান। দেরি না করে সুমনকে ইয়াসমিন বেগমের খোঁজে বেরিয়ে পড়তে বলেন।

সুমন তাদের পাশের ফ্ল্যাট থেকে শুরু করে সম্ভাব্য সব জায়গায় ইয়াসমিন বেগমের খোঁজ করে। কোথাও তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। রাত নেমে আসে। রাত্রি গভীর হয়। সুলতানা বেগমের কোনও খোঁজ পাওয়া যায় না।

শেষমেশ পরের দিন ভোরে থানায় মিসিং ডায়েরি করা হয়। মাইকিং করে সারা শহরে নিখোঁজ সংবাদ জানানো হয়। খবরের কাগজে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। বিভিন্ন হাসপাতালেও খোঁজ নেয়া হয়।

এত কিছুর পরও ইয়াসমিন বেগমের কোনও খোঁজ পাওয়া যায় না। যেন জলজ্যান্ত মানুষটা একেবারে গায়েব হয়ে গেছেন।

আট

ইয়াসমিন বেগম নিখোঁজ হওয়ার পর তিন মাস পেরিয়ে গেছে।

অফিস থেকে ফেরার পথে সুমনের সঙ্গে তার বন্ধু ডা. জাহিদ হাসানের দেখা হয়ে যায়। দুই বন্ধু একসঙ্গে একটা কফি হাউসে ঢুকেছে। তারা দু’জন গরম ধোঁয়া ওঠা কফির মগে চুমুক দিতে-দিতে গল্প করছে।

জাহিদ হাসান জিজ্ঞেস করল, ‘তোর শাশুড়ির আর কোনও খোঁজই পেলি না?’

সুমন বলল, ‘না, অনেক চেষ্টা করেছি, চেষ্টার কোনও কমতি রাখিনি। কিন্তু কোথাও তাঁর খোঁজ পাওয়া গেল না।’

জাহিদ হাসান সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে বলল, ‘ভেরি স্যাড!’

কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর জাহিদ হাসান আবার বলতে লাগল, ‘তোর শাশুড়ি মেডিকেল সায়েন্সের ইতিহাসে বিরল এক উদাহরণ ছিলেন। আতিকুর রহমান স্যরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তাঁর মত ঘাগু ডাক্তার তোর শাশুড়ির মেডিকেল রিপোর্ট দেখে সাংঘাতিক ভড়কে গিয়েছিলেন। তাঁর মেডিকেল রিপোর্ট যা নির্দেশ করে, বলা যায় এতদিনের অত্যাধুনিক মেডিকেল সায়েন্সকে স্রেফ ভেলকি দেখানো হয়েছে। আতিকুর রহমান স্যর তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহে তোর শাশুড়ির ব্লাড স্যাম্পল দিয়ে আরও একটা পরীক্ষা করিয়েছিলেন। ডি. এন. এ. পরীক্ষা। সেটা তোকে জানানো হয়নি। তাঁর দৈহিক গঠন বৈশিষ্ট্যের মত ডি. এন. এ.-র গঠন বৈশিষ্ট্যও অন্য সব মানুষের চেয়ে আলাদা। প্রত্যেক প্রাণীর ক্রোমোজোমে দ্বি সূত্রক বিশিষ্ট পেঁচানো এই ডি. এন. এ. থাকে। মানে ডি-অক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড। যেটাকে বংশগতি বৈশিষ্ট্যের বাহক বলা হয়। এর প্রধান গাঠনিক উপাদান, ডি-অক্সিরাইবোজ সুগার, অজৈব ফসফেট ও অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন থায়ানিন নামের নাইট্রোজেন বেস। তাঁর ক্রোমোজোমের ডি-অক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিডের গঠন উপাদানে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কিছু রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যা পৃথিবীর অন্যসব মানুষ বা কোনও প্রাণীর ক্রোমোজোমে এর আগে পাওয়া যায়নি। জনন কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা ৪৬ জোড়া, যেখানে সাধারণ প্রতিটি মানবদেহের জনন কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা থাকে ২৩ জোড়া, যার মধ্যে ২২ জোড়া অটোজোম আর এক জোড়া সেক্স ক্রোমোজোম। পুরুষদের থাকে XY সেক্স ক্রোমোজোম। আর নারীদের সেক্স ক্রোমোজোম XX। তাঁর ডি. এন. এ. নির্দেশ করে নারী-পুরুষ দুই ধরনের সেক্স ক্রোমোজোমই তাঁর রয়েছে। বলা যায় কেঁচোর মত। একটি কেঁচোর যেমন নারী-পুরুষ দুই ধরনের সেক্স ক্রোমোজোম থাকে। কেঁচোরা অন্য সব প্রাণীর মত আলাদা-আলাদা ভাবে নারী-পুরুষ হয় না।’

সুমন কিছুটা বিরক্ত স্বরে বলে উঠল, ‘এসব আমাকে বলে কোনওই লাভ হচ্ছে না। তোর ওই সায়েন্সের কচকচানি কিছুই আমি বুঝতে পারছি না। তবে এটা বুঝতে পারছি, আমার শাশুড়ির মধ্যে বড় রকমের কোনও সমস্যা ছিল।’

জাহিদ হাসান বলল, ‘আচ্ছা, বাদ দে, তোর নিজের কথা বল। ভাবী কেমন আছে? তার, মা নিখোঁজ হওয়ায় নিশ্চয়ই সে মানসিকভাবে অনেক ভেঙে পড়েছিল?’

সুমন বলল, ‘হ্যাঁ, অনেক ভেঙে পড়েছিল। এখন অনেকটাই সামলে উঠেছে।’

জাহিদ হাসান বলল, ‘আচ্ছা, তোদের দাম্পত্য জীবন কেমন চলছে?’

সুমন বলল, ‘ভাল। খুব ভাল। ঈশিতা দেখতে যেমন রূপবতী, তেমনি গুণবতীও। রান্না-বান্না সহ সাংসারিক সব কাজেই অত্যন্ত পারদর্শী। তবে ওর কিছু ব্যাপার আছে, যা আমাকে ভীষণ ভাবিয়ে তোলে।’

জাহিদ হাসান কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী সেই ব্যাপার?’

সুমন কিছুটা ইতস্তত গলায় বলতে লাগল, ‘ওর চোখের রঙ পরিবর্তন হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় সবার মত চোখের মণি ঘন কালো রঙের থাকলেও মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের সাথে চোখের রঙও পরিবর্তন হয়। যেমন ধর, ওর যদি খুব মন খারাপ হয়, তখন চোখের মণি নীলচে রঙ ধারণ করে। যদি খুব আনন্দিত হয়, তবে চোখের মণি গোলাপি রঙ ধরে। যদি হতাশ হয়, তবে চোখের মণি সবুজাভ দেখায়। যদি রেগে যায়, তবে গনগনে আগুনের মত লালচে হয়ে যায়। যদি উদাস হয়ে কিছু ভাবে, তবে মেঘের মত ছাই বর্ণ ধারণ করে। যদি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকে, তা হলে ফ্যাকাসে হয়ে যায়।’

জাহিদ হাসান চরম বিস্মিত গলায় বলে উঠল, ‘কী বলছিস! তা-ও আবার সম্ভব নাকি? ভাবী চোখে বিভিন্ন রঙের লেন্স ব্যবহার করে না তো?’

‘না, সে কোনও লেন্স ব্যবহার করে না। শুধু চোখের মাঝেই অস্বাভাবিকতা নয়, আরও কিছু রয়েছে।’

‘সেসব কী?’

ওর মধ্যে চৌম্বকীয় কোনও ব্যাপার আছে। মানে ছোট-খাট ধাতব জিনিসের কাছাকাছি গেলে সেগুলো ছুটে এসে ওর গায়ে লেগে যায়। চুম্বকের আকর্ষণে লোহার জিনিস যেমন চুম্বকের গায়ে লেগে থাকে। যেমন ধর, ও খাবার টেবিলে খেতে বসেছে, একটু দূরেই একটা টি-চামচ বা কাঁটা চামচ। দেখা যাবে চামচটা ছুটে এসে ওর গায়ে আটকে রয়েছে। আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার, অন্ধকারে ওর সমস্ত গা জ্বল জ্বল করে। গা থেকে যেন সবুজাভ আভা বেরোয়। যেমন রেডিয়ামের প্রলেপ দেয়া টিভির রিমোটের বাটন, ইলেকট্রিক সুইচ, তসবি-এসব অন্ধকারে জ্বল-জ্বল করে। চোখের মণিও বিড়ালের চোখের মত জ্বলে। সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছি সেদিন, যেদিন ও আমার সামনে চাকু দিয়ে আপেল কাটছিল। অসতর্কতায় হাত কেটে ফেলে। দর-দর করে রক্ত বেরোতে শুরু করে। রক্তের রঙ দেখে বিস্ময়ে আমার চোখ কপালে ওঠে। রক্তের রঙ অন্য সবার মত লাল নয়, নীল রঙের! ঘন নীল।’

জাহিদ হাসান অবিশ্বাসী গলায় বলে উঠল, ‘এসব তুই কী বলছিস?! অন্ধকারে তার গা জ্বল জ্বল করে! তা হলে কি তার শরীরে অতিমাত্রায় ফসফরাস রয়েছে? ফসফরাস অন্ধকারে জ্বল-জ্বল করে। সেই সঙ্গে শরীরে কি ম্যাগনেটও রয়েছে? যে কারণে ধাতব জিনিস তার গায়ে লেগে যায়! আর রক্তের রঙ নীল কী কারণে? কোনও মানুষের রক্তের রঙই নীল হওয়া সম্ভব নয়। রক্তের রঙ লাল হওয়ায় কারণ, রক্তের ভেতরের হিমোগ্লোবিন নামে একটি উপাদান অক্সিজেনকে ফুসফুস থেকে নিয়ে গিয়ে সরাসরি রক্তের মাধ্যমে কোষে পৌঁছে দেয়। হিমোগ্লোবিনকে ভাগ করলে বিলিরুবিন ও বিলিভারডিন ধরনের উপাদান পাওয়া যায়। সেটার পরিমাণ রক্তকে অন্য রঙে রূপান্তরিত করে ফেলতে পারে। বিলিভারডিনের পরিমাণ বেড়ে গেলে রক্তের রঙ সবুজ হয়ে যায়। যেমন, পাপুয়া নিউ গিনির স্কিঙ্ক নামের এক ধরনের সরীসৃপের রক্ত সবুজ রঙের। আর রক্তে যদি হিমোগ্লোবিনের উপস্থিতির পরিবর্তে কপার সমৃদ্ধ প্রোটিন হিমোসায়ানিন কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেবার কাজ করে, তা হলে রক্তের রঙ নীল হয়। গভীর সমুদ্রে এক ধরনের অক্টোপাসের খোঁজ পাওয়া গেছে যাদের রক্তের রঙ নীল ওই অক্টোপাসগুলোর মত ভাবীর রক্তেও কি অতিমাত্রায় কপার সমৃদ্ধ প্রোটিন হিমোসায়ানিনের উপস্থিতি রয়েছে?’

সুমন ক্লান্ত গলায় বলল, ‘জানি না! এসব কথা আমি আমার মাকেও জানাইনি। তিনি অনেক শখ করে ঈশিতাকে বউ বানিয়ে এনেছিলেন। এসব শুনলে মনে অনেক কষ্ট পাবেন।’

পরিশিষ্ট

বাইশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আমজাদ হোসেন এক ঝড়-বৃষ্টির গভীর রাতে ফিরে এসেছেন।

বাড়ির সবাই তখন গাঢ় ঘুমে মগ্ন ছিল। কলিংবেলের শব্দে প্রথমে সুলতানা বেগমের ঘুম ভাঙে। তিনি অবাক হয়ে ভাবেন, এত রাতে কে এসেছে?! ঘন-ঘন কলিংবেল বাজতেই থাকে। তিনি সুমন আর ঈশিতাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। সবাই মিলে বসার ঘরে ঢুকে দরজা না খুলে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কে? কে এসেছে? এত রাতে আবার কে এসেছে?’

তাদের মনে ভয় কাজ করে, অত রাতে চোর-ডাকাতও তো আসতে পারে।

দরজার ওপাশ থেকে আগন্তুকের গলার স্বর শোনা যায়। সুমনের বাবা আমজাদ হোসেনের গলার স্বর।

‘সুলতানা, ও, সুলতানা। সুমন, বাবা, ঘুমিয়ে পড়েছিস? তোর মাকে একটু দরজাটা খুলতে বল।’

ঘরের ভিতরে তারা তিনজন ভয়ানক চমকে ওঠে। ভাবে, নিশ্চয়ই ইয়াসমিন বেগম ফিরে এসেছেন। কারণ, ইয়াসমিন বেগম তো মাঝে-মাঝে আমজাদ হোসেনের গলায় কথা বলতেন। বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টির সময়। আজও সেই ঝড়-বৃষ্টির রাত!

দেরি না করে সুলতানা বেগম দরজা খোলেন। দরজা মেলতেই দেখতে পান, দরজার সামনে ইয়াসমিন বেগম নয়, আমজাদ হোসেন দাঁড়িয়ে। চেহারায় বুড়োটে ছাপ পড়েছে। চুলে পাক ধরেছে। মুখ ভর্তি খোঁচা-খোঁচা পাকা দাড়ি। কপালে একটা কাটা দাগ। বাইশ বছর আগে কপালে ওই দাগ ছিল না। কী আশ্চর্য! ইয়াসমিন বেগমের কপালেও হুবহু ওরকম একটা দাগ ছিল।

আমজাদ হোসেনকে দেখে সুলতানা বেগমের মাথা ঘুরে পড়ে যাবার মত অবস্থা হয়। তার আগেই সুমন তার মাকে ধরে ফেলে। ধরে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসায়।

আমজাদ হোসেন দরদ মেশানো গলায় ‘সুলতানা, ও, সুলতানা, কী হলো তোমার? কী হলো?’ বলতে-বলতে ঘরের ভিতরে ছুটে আসেন।

সুলতানা বেগম ঢক ঢক করে এক গ্লাস পানি পান করে নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করে বলেন, ‘আমার কিছুই হয়নি। তার আগে বলো তোমার কী হয়েছিল? এতদিন কোথায় ছিলে?’

আমজাদ হোসেন অসহায়ের মত গলায় বলেন, ‘জানি না আমি কোথায় ছিলাম! বিশ্বাস করো, আমার কিছুই মনে নেই। এটুকুই মনে আছে, আমাদের বিবাহ বার্ষিকীর দিন ছিল। রাত সোয়া ন’টার দিকে অফিস থেকে বের হই। তোমার জন্য শাড়ি আর সুমনের জন্য খেলনা কিনতে মার্কেটে ঢুকি। কেনাকাটা শেষে ফেরার পথে ভয়ানক ঝড়- বৃষ্টি শুরু হয়। একটা ইলেকট্রিক তার ছিঁড়ে এসে আমার গায়ে পড়ে। ইলেকট্রিক শকের তীব্র যন্ত্রণায় জ্ঞান হারাই। এরপর কয়েক মুহূর্তের জন্য আবার জ্ঞান ফিরে নিজেকে একটা অন্ধকার ঘরে দেখতে পাই। পাশে আমারই মতন অচেতন আর এক মহিলা। আমাদের ঘিরে অদ্ভুত চেহারার তিনজন মানুষ। তাদের গা থেকে সবুজাভ আলোর বিচ্ছুরণ হচ্ছে। তারা আমাদের দু’জনের বুক থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত চিরে ফেলেছে…

ইয়াসমিন বেগম আমজাদ হোসেনের অনুকরণে যা-যা বলেছিলেন, সেই বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

সুলতানা বেগম আহত গলায় বলে ওঠেন, ‘ওই তিনজন কারা ছিল? তারা তোমাদের দু’জনকে নিয়ে কী করছিল?’

 

 

আমজাদ হোসেন কেমন ভাবনার অতলে হারিয়ে গিয়ে বলতে লাগেন, ‘জানি না তারা কারা ছিল। তবে আমার মনের ভিতর থেকে কেউ যেন বলে উঠছে, তারা এই পৃথিবীর কেউ ছিল না। পৃথিবী থেকে অনেক দূরের কোনও গ্রহ থেকে এসেছিল। তাদের গায়ের রঙ সবুজ। পিছনে বানরের মত লম্বা লেজ ছিল। অন্ধকারে গা থেকে সবুজাভ আলোর দ্যুতি বের হয়। তাদের দৈহিক আকৃতি মানুষের মত হলেও শরীরের ভিতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মস্তিষ্কের গঠন মোটেই মানুষের মত নয়। রক্তের রঙ নীল। ওই নীল রক্তের মানুষেরা জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দিক দিয়ে আমাদের থেকে অনেক-অনেক গুণ এগিয়ে। সেই ঝড়-বৃষ্টির রাতে বজ্রপাতে এবং ইলেকট্রিক শকে মৃতপ্রায় আমাদের দু’জনকে তারা বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা দেখতে পায়, আলাদা- আলাদাভাবে আমাদের দু’জনের একজনকেও বাঁচানো সম্ভব নয়। তাই তারা দু’জনকে মিলিয়ে একজনকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। মানে দু’জনের শরীরের যে-যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার উপযোগী মনে হয় সেগুলোকে প্রতিস্থাপন করে একটি শরীর গড়ে তোলে। হাত-পা থেকে শুরু করে শরীরের ভিতরের লিভার-কিডনি সবই। বলা যেতে পারে দুটো নষ্ট গাড়ির যন্ত্রাংশ মিলিয়ে যেমন একটি সচল গাড়ি বানানো হয়। দু’জনকে মিলিয়ে বাঁচানোর চেষ্টায় সফল হয় তারা। তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শেষ মুহূর্তে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। তাই উপায় না পেয়ে তাদের শরীরের নীল রক্ত স্থানান্তর করে সম্পূর্ণ রূপে বাঁচিয়ে তোলে। তারা শুধু দুটো দেহকে মিলিয়ে একটি দেহ বানিয়েই শেষ করেনি, দুই দেহের দুই সত্তাকেও নতুন বানানো দেহতে প্রতিস্থাপন করে। যাতে দু’জন মানুষই ওই এক দেহে ভাগাভাগি করে বেঁচে থাকতে পারে।’

সুলতানা বেগম কাঁদতে-কাঁদতে বলেন, ‘ওসব কথা বাদ দাও! আর শুনতে ইচ্ছে করছে না! অত-শত বুঝি না, তুমি যে বেঁচে ফিরেছ, তাতেই লাখ-লাখ শুকরিয়া! তুমি আমাদের এই ঠিকানা পেলে কোথায়?’

‘ঠিকানা কোথাও পাইনি। নিজ থেকেই চলে এসেছি। মনে হয়েছে এই ঠিকানা আমি আগে থেকেই চিনতাম।’

ঈশিতা ইয়াসমিন বেগমের একটা ফটো এনে আমজাদ হোসেনকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি এনাকে চেনেন?’

আমজাদ হোসেন অনেকক্ষণ ধরে ফটোটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন, ‘হ্যাঁ, চিনি। কোথায় যেন দেখেছি। বহুবার দেখেছি। কিন্তু মনে করতে পারছি না, কোথায় দেখেছি!’

সুলতানা বেগম চোখ মুছতে-মুছতে বলেন, ‘তোমাকে আর কিছুই মনে করতে হবে না। সাবান মেখে ভালভাবে গোসল করে এসো। তোমার জন্য পোলাও, রোস্ট, ভুনা গরুর মাংস রান্না করছি। সবাই মিলে একসঙ্গে খাব। গত বাইশ বছরে এই খাবারগুলো আমি ছুঁয়েও দেখিনি।’

 

শুকপক্ষ – নাফিস অলি

দু’পা সামনে ছড়িয়ে তার ওপর মুখ রেখে কুকুরটা শুয়ে ছিল। ওরা যখন হল গেট থেকে বেরোল, ওদের জুতোর তলার খসখস আওয়াজে কুকুরটা চোখ মেলে পিটপিট করে চাইল। এক মুহূর্ত কী যেন ভেবে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ততক্ষণে ওরা হলের সামনের ঘাসে ছেয়ে যাওয়া শুঁড়িপথে পা রেখেছে। কুকুরটা শরীর টানটান করে আলস্য ভেঙে ধীরেসুস্থে ওদের পিছু নিল। জহির প্রথমে দেখল কুকুরটাকে। কয়েকবার ‘হুস হাস’ জাতীয় শব্দ করে হাত নেড়ে তাড়িয়ে দিতে চাইল। কুকুরটা আগ্রহ নিয়ে জহিরের কাণ্ড দেখল, কিন্তু নড়ল না। ওরা যখন চলতে শুরু করল, লেজ নেড়ে নেড়ে কুকুরটা আবার ওদের পিছু নিল। কিছুদূর গিয়ে জহির আবার ‘হুস! হুস যাহ!’ করে উঠল। নাইম বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আহা, কুকুরটা তোর কী ক্ষতি করল? নিরীহ প্রাণীটার পেছনে লাগলি কেন, জহির?’ বারেক ওর স্বভাবসুলভ হো হো করে হেসে উঠল, যেন মস্ত কোন হাসির কৌতুক বলা হয়েছে। বারেকের হাসি এবার নাইমের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, নাইম থেকে জহির। ওরা তিনজনেই হাসছে। অকারণ হাসি। অবোধ কুকুরটা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে মানুষের কর্মকাণ্ড দেখছে আর বিভ্রান্ত না হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

শরতের রাত। পরিচ্ছন্ন আকাশে বিশাল চাঁদ। রূপালী জ্যোৎস্নায় ঝলমল করছে প্রকৃতি। এমন সব রাতে ওরা তিনজন হল ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। ঘুমন্ত ক্যাম্পাসের শূন্য পথে হেঁটে বেড়ায়। কখনও স্টেডিয়ামের পাশে, কখনও আমীর আলী হলের মাঠে, আবার কখনও স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। ঝড়ের মত ছুটে আসা নিশাচর ট্রেনের আচমকা হুইসেলের শব্দে পার্শ্ববর্তী সোহরাওয়ার্দী হলের ছেলেরা যখন পাশ ফিরে শোয়, ওরা তখন বিপজ্জনকভাবে লাফিয়ে উঠে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ায়। ছুটে আসা দ্রুতগামী ট্রেনটা ওদের চোখেমুখে বাতাসের ঝাপটা মেরে শহরের স্টেশনের দিকে হারিয়ে গেলে ওরা ওটাকে অভিশাপ দিতে দিতে আবার পা ঝুলিয়ে বসে যায়। এভাবে কাটিয়ে দেয় রাত। ওদের অবাক লাগে, একটু রাত বাড়লেই সমস্ত ক্যাম্পাস ঘুমিয়ে পড়ে। রাতের ক্যাম্পাসের এই অপার্থিব সৌন্দর্যের কথা কেউ জানেই না! এই সৌন্দর্য না দেখেই একজন শিক্ষার্থী কেবল ডিগ্রী হাতে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়। আহা!

হাঁটতে হাঁটতে ওরা সোহরাওয়ার্দী হলের সামনে চলে এল। নাইম বলল, ‘চল, আজ সোহরাওয়ার্দীর পুকুরপাড়ে বসি।’

ওরা তিনজন পুকুরপাড়ের সিমেন্টের পাকা বেঞ্চিতে বসে। কুকুরটা ওদের সামান্য দূরত্বে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ে। জহির শিস বাজিয়ে একটা গান ধরার চেষ্টা করে। নাইম বেঞ্চির ওপর আঙুল দিয়ে তবলা বাজায়। হঠাৎ বারেক বলল, ‘চল, আজ পুকুরে নেমে বসে থাকি। দেখ, পুকুরের জলে কী মায়াবী জ্যোৎস্না। চল, গায়ে মাখি!’

নাইম আঙুল বাজানো থামিয়ে বলল, ‘খারাপ বলিসনি। এই রাতে পুকুরে না নামলে রীতিমত অন্যায় হবে। কিন্তু কাপড় আনতে রুমে যাবে কে?’

‘কাপড়ের জন্য ভাবছিস কেন? কাপড় খুলেই নেমে পড়ব। এত রাতে দেখবে কে?’ বলে হেসে উঠল বারেক। হেসে ফেলল নাইমও।

এতক্ষণে মুখ খুলল জহির, ‘কী সব বলছিস বেহায়ার মত! তা ছাড়া এত রাতে আমরা কেউ পুকুরে নামছি না।’

‘আমরা বলছিস কেন? বল আমি নামছি না। তোর না নামাই ভাল রে। পানিতে হঠাৎ জলবুড়ি ঠ্যাঙ টেনে ধরবে।’ বলে বারেক আবার হো হো করে হেসে উঠল। কুকুরটা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। বারেকের বিশ্রী হাসির শব্দে ঘুম ভেঙে দুইবার ঘেউঘেউ করে প্রতিবাদ জানিয়ে আবার পায়ের ওপর মুখ নামিয়ে আনল।

‘চল, রুমে গিয়ে কাপড়চোপড় নিয়ে আসি। এমন চমৎকার একটা রাতে পুকুরে নামার লোভ সামলাতে পারছি না।’ নাইম উঠে দাঁড়াতেই জহির খপ করে ওর কব্জি চেপে ধরল। এভাবে আচমকা আঁকড়ে ধরায় নাইম ভয় পেয়ে এক রকম লাফিয়ে উঠল। রাতের বেলা মানুষ কেবল ভয় পেতে পছন্দ করে। অহেতুক লাফিয়ে ওঠে। আর হঠাৎ খপ করে কেউ কব্জি চেপে ধরলে তো কথাই নেই।

জহির কঠিন গলায় ঘোষণা করল, ‘আমরা কেউ পানিতে নামছি না।’

‘কিন্তু কেন? তুই বরাবর ভিতুর ডিম। তুই চোখ বন্ধ করে বসে মনে মনে এক দুই গুনতে থাক, আমরা কাপড় খুলে নেমে পড়ি।’ বারেকের গলায় ঝাঁজ।

‘আমার ভয়ের একটা কারণ আছে,’ প্রায় শোনা যায় না এমন গলায় বলল জহির।

‘তাই নাকি? তোর চমৎকার গল্পটা নাহয় পানিতে গলা ডুবিয়ে শুনব।’ একদলা থুতু ফেলল বারেক।

নাইম এতক্ষণে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বলল, ‘ব্যাপারটা কী বল তো!’

জহির ইতস্তত করছে। ‘গল্প নাহয় পরে শুনলি, তবে এখন পানিতে নামিস না।’

‘তুই যেভাবে মিনমিন করছিস তাতে এদিকে নয়, তোকে পশ্চিম পাড়ায় মেয়েদের হলের দিকে থাকতে হত। একটা চামচিকা দেখলেও সবাই গলা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করতে পারতি।’ চরম বিরক্তি বারেকের গলায়।

ওরা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। নীরবতা ভাঙল বারেক, ‘নামলাম আমি। তোরা বসে থাক।’

‘খবরদার নামবি না!’ হাহাকার করে উঠল জহিরের গলা।

এবার বিরক্তি চেপে রাখতে পারল না নাইমও, ‘ব্যাপারটা বলবি তো!’

‘আমার সাথে ছোটবেলায় একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমি আসলে বলতে চাইছিলাম না, নিচের দিকে তাকিয়ে বলল জহির।

‘বলতে তো তোকে হবেই। এবং এখনই!’ ফোঁস ফোঁস করে উঠল বারেক।

এখন ওরা ভাঙা ঘাটলায় বসে আছে। অকৃপণ চাঁদ তার অফুরন্ত জ্যোৎস্নায় ভিজিয়ে দিচ্ছে ওদের। অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে থেকে মুখ খুলল জহির। চাঁদের আলোয় ওর গলা বড় রহস্যময় শোনাল। ক্ষণিকের জন্য বারেকও অবাক হলো ওর রহস্যময় গলা শুনে।

‘তখন আমি স্কুলে পড়ি। এখন যেমন দেখছিস আমায়, তখন ছিলাম ঠিক তার উল্টো। বাউণ্ডুলে আর খেপাটে ধরনের। একবার আব্বার সাথে তুমুল ঝগড়া হলো। আব্বার একটা অভ্যাস ছিল, সামান্য কিছুতেই বলতেন, ‘আমার বাড়িতে জায়গা হবে না। বাড়ি ছেড়ে চলে যাও।’

‘সেবার একটু বেশিই জেদ করেছিলাম। ভাবলাম বাড়ি ছেড়ে গিয়ে আব্বাকে একটু বোঝাই। কিন্তু যাব কোথায়? খাব কী? হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এল। তখন আমাদের এলাকার মসজিদে একটা তাবলীগ জামাত এসেছে। এদের সম্পর্কে ধারণা আছে?’

‘হুঁ, আছে। তুই বল।’ কপাল কুঁচকে বলল বারেক। ওর ক্রুদ্ধ চাহনি দেখে মনে হলো না ও গল্প শুনে মজা পাচ্ছে। জহির ওকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে আবার শুরু করল।

‘ঠাণ্ডা মাথায় বুদ্ধিটা পাকা করে ফেললাম। তাবলীগ জামাতের সাথে চলে যাব। দু’দিন থাকলেই আব্বার কিছু জ্ঞানলাভ হবে। এক সকালে তাঁরা তল্পিতল্পা গোছাতে শুরু করলে আমি তাঁদের সঙ্গে জুটে পড়লাম। তোরা জেনে থাকবি, তাঁরা একটা মসজিদে তিন দিন থাকে। তিন দিন থেকে দীনের দাওয়াত দিয়ে অন্য মসজিদে চলে যায়। তো আমরা যে মসজিদটায় তিন দিনের জন্য উঠলাম তার সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন।

‘আধপাকা দীর্ঘ রাস্তাটার দু’পাশে নিচু ধানখেত। রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে একপাশের ধানখেতের মধ্যে হঠাৎ একটা ঝোপের মত। আধপাকা রাস্তা থেকে একটা সরু কাঁচা পথ ধানখেতের মধ্য দিয়ে চলে গেছে ঝোপ পর্যন্ত। তল্পিতল্পা নিয়ে আমরা কাঁচা রাস্তায় নেমে পড়লাম। ঝোপের মত জায়গাটার কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়ল বহু পুরনো এক মসজিদ। মসজিদের পাশে বাঁধানো লম্বা একটা কবরস্থান। যখন মসজিদের কাছে পৌছলাম, দেখলাম পাশের ওটা আসলে কবরস্থান নয়, ঈদের নামাজের জায়গা। ঝকঝকে পরিষ্কার ঈদগাহ। মসজিদের চারপাশে জায়গা কম। সামনে বড় একটা পুকুর। বলে নেয়া ভাল, এমন পুকুর আমার জীবনে দেখিনি। কাচের মত স্বচ্ছ টলটলে জল। হালকা নীলাভ জলে পুকুরের পাড় ছুঁইছুঁই। মসজিদের দরজা বরাবর বহু পুরনো একটা ঘাটলা। সেই ঘাটলার শেষ ধাপটা পর্যন্ত পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখা যায়। আমি তখনও সুইমিংপুল দেখিনি। তাই অবাক হয়ে ভাবছিলাম এমন স্বচ্ছ পানি কীভাবে হয়! এখন আমার মনে হয় ওটা ছিল প্রকৃতির তৈরি একটা সুবিশাল সুইমিংপুল, যা পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাদু পানি দিয়ে পূর্ণ করা হয়েছিল। চমৎকার সেই পুকুরপাড়ে ঘাটলায় বসেই আমার চোখ জুড়িয়ে গেল। নিমিষে মুছে গেল দিনের ক্লান্তি। পুকুরের দু’পাশে ঘন বাঁশবন। বিশাল বাঁশের আগা পুকুরের জলে মাথা ডুবিয়ে আছে। যেন তৃপ্তি ভরে তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। পুকুরের অন্য পাশটায় কিছু বুনো গাছগাছালি। তার মধ্যে একটা বয়স্ক হিজল গাছ। হিজল গাছটাও পানি ছুঁইছুঁই অবস্থায় পুকুরের ওপর শুয়ে আছে। গাছের নিচের দিকের দু’-একটা ডাল বাতাসের ভারে নুয়ে কখনও-কখনও আলতো করে পানি ছুঁয়ে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে এমন একটা ছবি-মনে হলো এই ছবির দিকে তাকিয়ে আমি বহুকাল কাটিয়ে দিতে পারব।

‘আমি মসজিদের চারপাশটা ঘুরে দেখতে লাগলাম। মসজিদের ডানপাশে সেই ঈদগাহ মাঠ, আর বাম পাশে অরক্ষিত কবরের সারি। প্রায় কবরের মাঝেই বৃত্তাকার গর্ত খোঁড়া। বাইরে রান্না করার জন্য যেমন চুলা খোঁড়া হয় তেমন। কবরস্থানের পাশ দিয়ে প্রায় হারিয়ে যাওয়া একটা রাস্তা ধরে কিছুদূর সামনে জঙ্গলের মধ্যে টয়লেট। রাস্তার চেহারা দেখেই বুঝলাম বহুকাল এতে কেউ পা রাখেনি। মসজিদের সাথে টিনের ছাপরা দেয়া এক চিলতে বারান্দা। চারপাশটা দেখে নিয়ে বারান্দায় বসতে না বসতেই হঠাৎ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। থামার লক্ষণ নেই। এই বৃষ্টিতে ভিজে কিছুক্ষণ পর রোগা মত লিকলিকে একটা লোক হাজির হলো। কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘ইমাম সাব অসুস্থ। আপনেরা নামাজ পইরা নিয়েন।’ এতটুকু বলে সে আমাদের হাতে মসজিদের চাবি দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে হারিয়ে গেল।

‘পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন যেন লাগল। সারা দিনে ওই ঠ্যাঙার মত মানুষটা ছাড়া আর কারও দেখা পেলাম না। যাই হোক, আমরা ক্লান্ত ছিলাম, তাই সিদ্ধান্ত হলো আগে গোসল করে বিশ্রাম নেব। গোসলের কথা বলতেই আমার মন ভাল হয়ে গেল। দৌড়ে গিয়ে পুকুরে নামলাম। আহ, তোদের বলেছিলাম পানির রঙ, কিন্তু এর স্পর্শও যে অপূর্ব তখন টের পেলাম। পানির মধ্যে মাছ ছুটোছুটি করছে, আমরা তা স্পষ্ট দেখছি। পানিতে অনেক দাপাদাপি করলাম। যখন ডুব দিয়ে গভীরে গেলাম, তখন দেখলাম পানির তলায় নিজের হাত-পা সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পুকুরের পানিতে সাধারণত এমন হয় না। তাই ব্যাপারটায় কেমন ভয় ভয় লাগল। পানির গভীরে আর গেলাম না সেবার। কিন্তু ওপরে ভেসে ভেসে বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মাখলাম।

‘এভাবে কেটে গেল পরের দিনও। এর মধ্যে দ্বিতীয় কোন মানুষ মসজিদের আশপাশে দেখিনি। আমাদের দলে লোক ছিল ছ’জন, আমি সহ সাত। ওই ছ’জনের মধ্যে হঠাৎ অসন্তোষ দেখা দিল…’

‘এই, থাম!’ জহিরকে হাত তুলে থামাল বারেক। ‘তুই যে দলটার কথা বলছিস তাতে মাত্র ছ’জন লোক হয় কী করে?’ বারেকের কথা শুনে বোঝা গেল এতক্ষণ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।

 

 

‘হ্যাঁ, হয়তো বেশি থাকার কথা। কিন্তু তারা ছ’জন ছিল। আমি কী করব?’ হাত নেড়ে এমনভাবে বলল জহির, যেন বোঝাতে চাইল আসলেই ওর কিছু করার ছিল না।

নাইম তাড়া দিল, ‘তুই আগে বাড়…’

জহির আবার শুরু করল…

‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম। দলের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিল। তাদের নিয়ম হলো নতুন কোথাও যাওয়ার আগে একজন সেখানকার খোঁজখবর নেয়। কিন্তু এখানে এসে দেখা গেল নানান প্রতিবন্ধকতা। পুরো দলটার হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না। এভাবে তৃতীয় দিনে এসে পৌছলাম। আগামীকাল সকালে দলটা অন্যত্র যাত্রা করবে। আর আমি চলে যাব বাড়ি। কেননা ইতিমধ্যে মশার কামড় আর টয়লেট সমস্যায় আমার জেদ পুরোপুরি উবে গেছে। সেদিন আমি একাকী এলাকাটা ঘুরে এলাম। সন্ধ্যায় যখন ফিরলাম তখন তাদের মধ্যে ছোটখাটো একটা ঝগড়া হয়ে গেছে। থমথমে ভাব। মাগরিবের নামাজের পর সবাই যে যার মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। আমি পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে রইলাম। ধীরে ধীরে রাত বাড়ছে। আমি ঘাটলায় বসে একমনে পানির দিকে তাকিয়ে আছি। আকাশে শুক্লপক্ষের চাঁদ। স্বচ্ছ পানিতে তলিয়ে যাওয়া পাকা ঘাটের ওপর চাঁদের আলো রূপালি ঢেউয়ের সৃষ্টি করছে। ঘাটের একপাশ থেকে দুলতে দুলতে অন্য পাশে চলে যাচ্ছে সেই ঢেউ। আমি তাকিয়ে আছি চৈতন্য হারিয়ে।

‘“চলেন, একটা গোসল দেই।”

‘চমকে পেছন ফিরে দেখি আমাদের একজন সদস্য। বয়সে আমার কিছু বড়।

‘“এমন চমৎকার পানি! কাল সকালে তো চলেই যাব। তাছাড়া শরীরটাও কেমন ম্যাজম্যাজ করছে,” সে ব্যাখ্যা করল।

‘আসলে আমার মন এমন কিছুই চাইছিল। তাই রাজি হয়ে গেলাম। তাছাড়া সেদিন ছিল প্রচণ্ড গরম। ভাদ্র মাসের গরম যাকে বলে। ঘাটলায় কাপড়চোপড় রেখে আমরা নেমে পড়লাম। আহ, কী শান্তি! আমাদের দেখাদেখি আরও দু’জন মুরুব্বি ধরনের লোক নেমে গেল। আমি ভাবলাম, দিনের আলোয় তো পানির তলায় দেখা যায়; এখন ডুব দিয়ে দেখি চাঁদের আলোয় কতটা দেখা যায়। অবশ্য বেশি দেখতে পাওয়ার কথা নয়। তবু আমি লম্বা দম নিয়ে পানির গভীরে ডুব দিলাম।’

এ পর্যন্ত বলে জহির থামল। চারদিকে সুনসান নীরবতা। ওরা দু’জন তন্ময় হয়ে জহিরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। জহির লম্বা দম নিয়ে আবার শুরু করল। মনে হলো ও যেন সেদিনের মত গভীরে ডুব দিচ্ছে।

‘ডুব দিয়ে যখন পানির গভীরে গেলাম আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না। পানির তলায় তাকিয়ে মনে হলো পুরো পুকুরটা যেন কাঁচের তৈরি। আমি সমস্তটা দেখতে পাচ্ছি দিনের চেয়েও স্পষ্ট! পানির মধ্যে ডুবে থাকা বাঁশের আগা, পানির উপরের হিজলগাছ, একটু দূরে যারা গোসল করছে তাদের হাত, পা, দূরের শাপলা গাছের মূল, এমনকী পুকুরের তলার ঝিকমিকে বালুরাশি। চাঁদের আলো এসে পড়ছে সেই বালুর পিঠে। পানির দোলায় বালুরাশি নড়ছে আর ঝিকমিক করছে। আমি কতক্ষণ এভাবে ছিলাম জানি না। হঠাৎ হুঁশ হলো। আমি এতক্ষণ পানির নিচে কীভাবে! এমন সময় শুনতে পেলাম বাচ্চা কণ্ঠের একটা কান্নার আওয়াজ। ঠিক তাই। প্রথম ভেবেছিলাম বুঝি পানির ওপর থেকে শব্দ আসছে। সাথে সাথে মনে হলো তা সম্ভব নয়। পরে আবিষ্কার করলাম শব্দটা পানির তলায় একপাশ থেকে আসছে।

‘তখন আমার এই বোধ ছিল না যে পুকুরের তলায় একটা বাচ্চা কীভাবে আসবে, আর কীভাবেই বা কাঁদবে। আমি কান্নার উৎসের দিকে এগোলাম। দু’পাশের পানি কেটে একটু সামনে যেতেই দেখলাম ওকে।

এক বছর বয়সী উলঙ্গ এক শিশু। পুকুরের তলায় উপুড় হয়ে বসে আমার দিকে পেছন ফিরে কাঁদছে। আমি ওর কাছাকাছি যেতেই ও হামাগুড়ি দিয়ে সামনে ছুটল। তখনও কাঁদছে বাচ্চাটা। আমি স্থান-কাল ভুলে ওর পেছনে ছুটলাম। কতক্ষণ ছুটলাম মনে নেই। ছুটতে ছুটতে মনে হলো বহুদূর চলে এসেছি; কিন্তু পথ শেষ হয় না। ক্লান্ত হয়ে গেলাম। তবু ছুটলাম আমি। আর প্রাণপণ চেষ্টা করলাম বাচ্চাটাকে চোখে চোখে রাখতে। কিন্তু একসময় ঠিকই হারিয়ে ফেললাম। ওকে হারিয়ে ফেলে উদ্‌ভ্রান্তের মত হয়ে গেলাম। এতক্ষণে আমার খেয়াল হলো দম ফুরিয়ে আসছে, আমি পানির তলায়! ক্লান্তিতে আমার চোখ বুজে এল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

‘যখন ঘুম ভাঙল দেখলাম হ্যাজাকের তীব্র আলো। আমি মসজিদের বারান্দায় শুয়ে আছি। চারদিকে লোকজন ছুটোছুটি করছে, চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। এত আলো, এত মানুষ দেখে ক্লান্তিতে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।

‘পরবর্তীতে জেনেছি, আমি ডুব দেয়ার সময় কেউ একজন লক্ষ করেছিল। লোকটা প্রথমে আমার দমের তারিফ করছিল। কিন্তু অনেক সময় পরেও যখন দেখল উঠছি না তখন ভয় পেয়ে সে অন্যদের ডাকল। প্রথমত সবাই ডুবাডুবি করে খুঁজল। না পেয়ে এলাকার লোকজন জড় করল। অনেক লোক মিলে পুকুর চষে ফেলল, কিন্তু আমার পাত্তা নেই। ততক্ষণে বড় মাছ ধরা জাল নিয়ে জেলে এসে গেছে। ওরা অনেকবার টান দিয়ে আমায় তুলল। আশ্চর্য ব্যাপার, আমার পেটে কোন পানি ছিল না।

‘ওদিকে আমাদের বাড়িতে খবর গেলে আব্বা সহ লোকজন ছুটে এল। আসলে আমার আব্বা শুরু থেকেই জানতেন আমি এখানে আছি। কিন্তু তিনি চাচ্ছিলেন আমি যেন নিজের থেকেই ঠিক হয়ে বাড়ি ফিরে আসি। সে রাতেই আব্বা আমায় নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।

‘বাড়ি ফেরার পর ভয়াবহ জ্বর পেয়ে বসল আমায়। বিছানায় পড়ে রইলাম অনেকদিন। হুঁশে-বেহুঁশে কেবল একটা ব্যাপার ঘটে। সেদিনের বাচ্চাটাকে দেখতে পাই। আবার মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসে কচি কণ্ঠের পরিচিত কান্নার আওয়াজ। এভাবে কতদিন ছিলাম মনে নেই। একসময় সুস্থ হয়ে উঠলাম। এতদিনে ক্ষণিকের জন্যও সেই অদ্ভুত পুকুরের কথা আমি ভুলিনি। সেই আশ্চর্য পুকুর আমায় প্রবল আকর্ষণে টানছিল। ওখানে কিছু একটা ব্যাপার আছে। আমায় জানতে হবে ওটার সব ঘটনা 1

‘একদিন আব্বাকে নিয়ে গেলাম ওই এলাকায়। একজন বয়স্ক লোকের কাছে শুনলাম সব ঘটনা। ওই মসজিদে অনেককাল আগে একজন ইমাম ছিলেন, যিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে মসজিদের পাশেই একটা ছাউনি দিয়ে থাকতেন। ইমাম সাহেবের স্ত্রী যখন সন্তানসম্ভবা তখন হঠাৎ করে এক সন্ধ্যায় তার ওপর খারাপ আছর পড়ল। অল্প বয়সী মেয়ের মাথা পুরোপুরি আউলা হয়ে গেল। গায়ে মাথায় কাপড় রাখে না, অশ্রাব্য গালিগালাজ করে। ইমাম বেচারা পড়লেন মহা মুসিবতে। স্ত্রীকে ঘরের মধ্যে বেঁধে রাখেন। এরই মধ্যে তাদের ছাউনি ঘর আলোকিত করে একটা ফুটফুটে মেয়ে জন্ম নিল। মেয়ে জন্ম নেয়ার পর ইমাম সাহেবের স্ত্রী পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেল। ইমাম সাহেবও নিশ্চিন্ত হলেন। তাঁর সংসারে সুখ যেন উপচে পড়ে। মেয়েটা যখন হামাগুড়ি দিতে শুরু করল একরাতে স্ত্রীর কান্নার শব্দে ইমাম সাহেব লাফিয়ে উঠলেন। দেখলেন তাঁর আদরের মেয়ে নেই! বেচারা ইমাম সাহেব পাগলের মত হয়ে গেলেন। চারদিকে খুঁজলেন। কোথাও বাচ্চা নেই। এমন মুহূর্তে হঠাৎ তাঁর স্ত্রী পানিতে ঝাঁপ দিল। এতক্ষণে ইমাম সাহেব বুঝতে পারলেন, স্ত্রীই তাঁর মেয়েকে পানিতে ফেলেছে।

‘ইতিমধ্যে লোকজন জড় হয়েছে। জাল টান দেয়া হলো। ইমাম সাহেবের স্ত্রীকে পাওয়া গেল-মৃত। বাচ্চাটার কোন হদিস পাওয়া গেল না। ইমাম সাহেব বেচারা অর্ধ- উন্মাদ হয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেলেন। সেই থেকে ভরা পূর্ণিমারাতে পুকুর পাড়ে একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে অন্য কোন ইমাম ওখানে স্থায়ী হতে পারেননি।’

নাইম দীর্ঘক্ষণ চেপে রাখা নিঃশ্বাসটা আস্তে করে ছাড়ল। ওরা তিনজন চুপচাপ বসে আছে। কারও মুখে কোন কথা নেই। যেন কোন কালে ছিলও না। সহসা জহির বলল, ‘আমি মাঝে মধ্যে সেই কান্না শুনতে পাই।’

‘মানে? তুই এখনও শুনতে পাস?’ বারেক নিশ্চিত হতে চাইল।

‘হ্যাঁ, এখনও। প্রথম শুনি যখন আমার বৃদ্ধ দাদা পানিতে ডুবে মারা যান। শেষ বয়সে তেমন হাঁটাচলা করতে পারতেন না; কিছুটা মাথা খারাপের মত হয়ে গিয়েছিল। তাঁকে গোসল করিয়ে দিতে হত। আমার ছোটচাচা কাজটা করতেন। কেউ গোসল করিয়ে দিলে দাদার তৃপ্তি হত না। তিনি বলতেন, ‘পুহইরে নাইম্মা গোসল দিতে পারলে শ‍ইলডায় আরাম অইত। এই, ছালেক, এট্টু নামাইয়া দে না, বাজান!’ এভাবে চাচার কান ঝালাপালা করে দিতেন। একসময় ছোটচাচা আমাদের বাড়ির অগভীর পুকুরে দাদাকে নামিয়ে দিতেন। ইচ্ছেমত কাদাপানি খেয়ে দাদার পেট ভরে গেলে তাঁকে তোলা হত। এরপর কিছুদিন তিনি ঠাণ্ডা থাকতেন। আবার শুরু হত, ‘পুহইরে নাইম্মা গোসল দিতে পারলে শইলডায় আরাম অইত।’ এরপর আবার তাঁকে পুকুরে ছেড়ে দেয়া। ব্যাপারটা আমার কাছে অমানবিক লাগত। কিন্তু আমার দাদা এতেই শান্তি পেতেন।

‘একরাতে সেই কান্নার শব্দে আমার ঘুম ভাঙল। বিছানায় জড়সড় হয়ে জেগে জেগে আমি সেই শব্দ শুনলাম অনেকক্ষণ। কিন্তু দিনের আলোয় সব ভুলে গেলাম। সেদিন সকালেই ক’দিনের জন্য খালাবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। দুপুরের দিকে আমাকে খবর দিয়ে আনা হলো, দাদা নেই! পুকুরে নামানোর কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁর মৃত্যু।

‘এরপর আমাদের পাশের বাড়িতে তিনটা বাচ্চা পানিতে ডুবে মারা গেল। সেবারও আগের রাতে আমি সেই কান্নার শব্দ শুনলাম। এভাবে আরও একবার। এরপর আমি বুঝতে পারলাম আমার চারপাশে পানিতে ডুবে মরার ব্যাপারটা আমি কীভাবে যেন আগে থেকেই টের পেয়ে যাই।’

‘দাঁড়া, এখন নিশ্চয়ই বলবি আজও তুই তেমন কিছু শুনতে পেয়েছিস?’ কিছুটা ব্যঙ্গ করে বলল বারেক।

জহির মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইল। অনেক সময় পর মুখ খুলল ও, ‘ঠিকই বলেছিস। গতরাতে আমি সেই কান্না শুনতে পেয়েছি।’

চারপাশে হুট করে অসহ্য নীরবতা নেমে এল। কিছু রাতজাগা পতঙ্গ ডাকছিল, সেগুলো হঠাৎ একসাথে থেমে গেল। যেন ওরাও অবাক হয়েছে জহিরের কথা শুনে; এখন ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করছে পরবর্তী ঘটনার জন্য। ঘাটলার পাশেই একটা কদম গাছে কিছু বাদুড় ঝুলছিল, সেগুলো ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। অসহ্য নীরবতা ভাঙল কুকুরটা। দুইবার করুণ সুরে ডেকে উঠল। নাইমের দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। হঠাৎ বারেক উঠে দাঁড়াল; দেখে নাইম আর জহির দু’জনেই ভয় পেল। ওরা বারেককে চেনে। এবার ও পুকুরের পানিতে নামার জন্য আগের চেয়েও বেশি বেঁকে বসবে। ওকে ফেরানোর উপায় নেই। ওরা দু’জন ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে রইল। দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে ওদের দু’জনকে অবাক করে দিয়ে বারেক বলল, ‘অনেক রাত হয়েছে। চল, রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ি।

 

সাপ ভয়ঙ্কর – মিজানুর রহমান কল্লোল

 

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা ‘মহানগর গোধূলি’ ট্রেন রাত আটটার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে পৌছলে হুড়মুড় করে ‘ছ’ বগিতে উঠে পড়লাম আমি। আমাকে টিকেট কেটে দেয় যে ছেলেটি, রুবাইয়েত, একটি ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ, সে উঠবে ভৈরব থেকে। সব টিকেট তার কাছে। আমাকে মোবাইলে মেসেজ পাঠানোর পরেও ফোন করে জানিয়েছে, ‘স্যর, আপনি উঠবেন ছাগলের ছ-তে।’

আমি বললাম, ‘বুঝেছি, ছ।’

সে আবার চিৎকার করে বলল, ‘স্যর, ছ। ছাগলের ছ। চোরের চ না কিন্তু।’

আমি বললাম, ‘আচ্ছা।’

সে চিৎকার করে বলল, ‘চিন্তা করবেন না, স্যর। আমি ভৈরব থেকে উঠব। ৩১ আর ৩২ নম্বর সিট আমাদের। সেকেন্দার স্যরকে ফোনে পাচ্ছি না। আপনি একটু কাইগুলি তাকে ফোন করে বলবেন, তার বগি জ। স্যর, জানোয়ারের জ।’

আমি বললাম, ‘আচ্ছা, বলব।’

রুবাইয়েত আবার চিৎকার করল, ‘স্যর, বেলাল স্যরের টিকেট ম্যানেজ করতে পারিনি। ওনাকে বলবেন, উনি যেন কিছু মনে না করেন। একটা স্ট্যাণ্ড টিকেট কেটে উঠে পড়তে বলেন। পরে সিট দেখা যাবে। আসলে, স্যর, ওনার টিকেট আমি ইচ্ছা করেই কাটি নাই। উনি আমার ওষুধ লেখেন না।’

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। ট্রেন চলে এসেছে, আর কথা বলা যাচ্ছে না।’

‘ওকে, স্যর। ছাগলের ছ।’

ট্রেনের সিটে বসতেই আমার ঝিমুনি এল।

ট্রেন বা গাড়িতে চলার সময় কখনওই আমি চোখ খুলে রাখতে পারি না।

ঝিমুনির মধ্যেই বুঝতে পারলাম ট্রেন ভৈরব স্টেশনে থেমেছে, রুবাইয়েত এসে বসেছে আমার পাশে। ঝমঝম করে ট্রেন আবার চলতে শুরু করেছে। আমি রুবাইয়েতের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।

হঠাৎ ঝাঁকি দিয়ে ট্রেন থেমে গেল।

আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম।

‘কী হয়েছে?’ আচমকা ঘুম ভেঙে গিয়ে বুঝতে পারলাম না এভাবে ট্রেন থামল কেন।

মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। রুবাইয়েত বলল, ‘স্যর, আপনি থাকেন। আমি দেখে আসি ব্যাপারটা কী।’

ট্রেন থেকে নেমে গেল সে। প্রায় দশ মিনিট পর ফিরে এল। ‘খুব বেশি মারাত্মক অবস্থা না, স্যর। তবে মালবাহী ট্রেনটা হাইগা দিছে। লাইন থেকে আউট। আমাদের শুধু সামনের বগিটা পড়ছে। মরে নাই কেউ।’

‘কীভাবে?’

‘কোন্ বানচত যেন ফিশপ্লেট খুলে ফেলেছে। কাল অবরোধ আছে, তাই। ভাগ্য ভাল যে ড্রাইভারের চোখে পড়ছিল। তাই বাঁইচ্যা গেছি। শুধু খবিশের খ বগিটা—’

‘পড়ে গেছে?’

‘পুরা পড়ে নাই। কাত হয়ে আছে। গরুর গ. বগিও।’

‘আচ্ছা, চুপ করো। এখন, ঠিক হবে কখন?’

‘মেলা দেরি হবে। ঢাকা থেকে উদ্ধার কর্মীরা আসবে, তারপর।’

‘সে তো ভোর হয়ে যাবে। কিছুদিন আগে সিলেটের পারাবত ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়েছিল, দশ ঘণ্টা লেগেছিল লাইন ক্লিয়ার হতে।’

‘জানি, স্যর, কুত্তার ক বগি এক্কেরে উল্টে গেছিল।’

আমি চোখ বুজলাম।

কিছুক্ষণ পর রুবাইয়েত বলল, ‘এক কাজ করলে কেমন হয়, স্যর? আমরা বরং নেমে যাই। ট্রেন লাইন বাদ দিয়া রাস্তায় ঢুকি। রাত বেশি হয় নাই। বাসে করে ঢাকায় ফিরব।’

‘মন্দ নয়,’ আমি বললাম। ‘সকালে আবার শালার সেমিনার আছে। এখন কোথায় আমরা, বলো তো?’

ট্রেনের জানালা দিয়ে মাথা বের করল রুবাইয়েত। বাইরে কাকে যেন জিজ্ঞেস করল। তারপর মাথা টেনে এনে বলল, ‘মেথিকান্দা। মনে হয় নরসিংদীর মধ্যে।’

‘হুম, নরসিংদীর রায়পুরা থানার থানার একটা গ্রাম মেথিকান্দা।’

‘স্যর, চিনেন নাকি?’ রুবাইয়েত তাকাল আমার দিকে।

‘ঠিক চিনি না। তবে ডা. দীপুর কাছে নাম শুনেছি। ওর বাড়ি নরসিংদী।’

‘এই জন্য বলতে পারছে। নইলে কার ঠেকা অন্য জায়গার নাম মনে রাখার?’

আরও একটু অপেক্ষা করে ট্রেন থেকে নামলাম আমরা। আমার ব্যাগটা রুবাইয়েত হাতে নিয়েছে। ওরটা বাম কাঁধে। আমি বললাম, আমার ব্যাগটা আমিই নিতে পারব। কিন্তু সে কথা শুনল না। দু’জনে সামনে এগোলাম। অনেকদিন পর ঝিঁঝি পোকার ডাক শুনলাম।

হাঁটছি আমরা। ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে আলো।

আমি বললাম, ‘কই, আমি তো কোন রাস্তা দেখি না। এখনও বিলের মধ্যেই আছি।’

রুবাইয়েত বলল, ‘বিল কই দেখলেন, স্যর? ওই যে বাম পাশে গ্রাম। গ্রামে ঢুকব, নাকি সামনে এগিয়ে যাব বুঝতে পারছি না। মেথিকান্দা কি শেষ হয়েছে?’

‘আমি কীভাবে বলব?’ অনেকটা পথ হেঁটে হাঁপিয়ে উঠেছি আমি। আকাশে মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল চাঁদ। বিরান এক এলাকা। মানুষের কোন চিহ্ন নেই। ‘এভাবে না চিনে না বুঝে ট্রেন থেকে নেমে আসাটা আমাদের ঠিক হয়নি,’ আমি কিছুটা হতাশার সুরে বললাম। ‘কোন জীবজন্তু সামনে এসে পড়লে পালাতেও পারব না।’

‘স্যর, খারাপ চিন্তা করবেন না। এখানে একটা বড় রাস্তা থাকার কথা। বাস চলাচলের।’ রুবাইয়েত বলল।

আমি বললাম, ‘বাস কেন, অন্য কোন বাহনেরও চিহ্ন কোথাও দেখছি না। আদৌ কোন রাস্তা আছে কিনা কে জানে। আমরা কি ভুল পথে এলাম?’

‘স্যর, সামনে মনে হয় বাজার। কয়েকটা ঘর দেখা যাচ্ছে। বাজারের মতই তো মনে হচ্ছে।’

চাঁদের আলোয় দেখলাম, আসলেই তাই। চার-পাঁচটা ছোট-ছোট ঘর। সামনে ফাঁকা জায়গা।

‘স্যর, বাজার যেহেতু একটা আছে, রাস্তাও তাহলে আছে।’ বলল রুবাইয়েত।

‘অনেকদিন এতটা পথ হাঁটিনি,’ আমি বললাম। ‘একেবারে ঘেমে গেছি।’

‘আরেকটু পথ, স্যর।’

বাতাসের ছিটে ফোঁটা নেই।

চাঁদের ঘোলাটে আলোয় কেমন এক ভৌতিক পরিবেশ।

গুনে দেখলাম ছয়টা ঘর একই লাইনে।

ভেতরে আলো নেই।

মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে, অথবা দোকান বন্ধ করে সবাই বাড়ি চলে গেছে।

নেহায়েত সাধারণ ঘর। টিনের চাল। কাঠের দেয়াল।

সামনে ছোট্ট বারান্দা।

সবগুলোর কাঠামো একই।

তবু কেন জানি না আমার শরীর কেঁপে উঠল।

মনে হলো ওগুলোর ভেতর ভয়ঙ্কর কিছু একটা আছে!

রুবাইয়েত বলল, ‘চলেন, স্যর, ওই বারান্দায় বসে একটু বিশ্রাম নিই।’

আমি বললাম, ‘না। ওখানে আমি বসব না। চলো সামনে যাই।’

‘স্যর, আমরা কি পথ হারাইছি?’

‘বুঝতে পারছি না।’

‘অদ্ভুত!’

‘কী?’

‘স্যর কি জায়গাটার নাম খেয়াল করেছেন? ওই দেখেন ভাঙা সাইনবোর্ড।’

আমি একটা খুঁটিতে টানানো সাইনবোর্ডটা পড়লাম: সাপমারা বাজার।

‘হুম, নামটা অদ্ভুত।’ আমি বললাম।

‘স্যর, এখন কী করব? বাঁয়ের রাস্তাটায় যাব? নাকি এখানে বসে থাকব? নাকি রেললাইন ধরে সামনে হাঁটতে থাকব?’

হঠাৎ আমার মনে পড়ল আমার পকেটেই তো মোবাইল ফোন রয়েছে, আমি কাউকে ফোন করছি না কেন?

আমি দ্রুত প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফোন করতে যাব, দেখি নেটওয়র্ক নেই।

রুবাইয়েতকে বলতে সে-ও তার মোবাইল বের করল।

‘স্যর, আমারটায়ও নেটওয়র্ক নেই। মনে হয় এদিকে মোবাইলের টাওয়ার নেই।’

‘একেবারে অজপাড়া গাঁ।’

‘জি, স্যর।’

‘নাম সাপমারা বাজার।’

‘জি, স্যর, খুবই অদ্ভুত নাম।’

ঘরগুলো পেছনে রেখে সামনে এগোলাম।

আমার পাশে-পাশে হাঁটছে রুবাইয়েত।

আমরা একটা বাগানের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।

চারপাশে সুনসান নিস্তব্ধতা। কেবল আমাদের হেঁটে যাবার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।

নীল আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। কোন মানুষজনের চিহ্ন চোখে পড়ছে না। অজপাড়া গাঁ, হয়তো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শেয়াল কিংবা কুকুরের ডাকও নেই। এ ধরনের গ্রামে অন্য কোন প্রাণী না হোক, শেয়াল বা কুকুরের ডাক শোনা যাবেই। অবশ্য এমনও হতে পারে, যে গ্রামের মানুষ সন্ধ্যার পরেই ঘুমিয়ে পড়ে সে গ্রামে শেয়াল বা কুকুরও তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যায়। এমনকী ঝিঁঝি পোকারাও।

‘আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি?’ নীরবতা ভঙ্গ করে আমি বললাম।

‘রাতটা কাটাতে হবে কোথাও,’ বলল রুবাইয়েত। ‘আসলে, স্যর, এখন বুঝতে পারছি ট্রেন থেকে নামাটাই আমাদের ভুল হইছে। দেখি সামনে কোন বাড়ি-ঘর পাই কিনা।’

‘অথবা চায়ের দোকান,’ আমি বললাম। ‘টায়ার্ড লাগছে।’

‘জি, স্যর, টায়ার্ড লাগছে। বাতাস কেমন যেন।’ রুবাইয়েত বলল।

হাঁটতে-হাঁটতে কাঁধের ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করল রুবাইয়েত। ‘স্যর, পানি খান, ভাল লাগবে।’

আমি বললাম, ‘তুমি খেয়ে তারপর দাও।’

রুবাইয়েত বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি খেল। তারপর আমার দিকে বাড়িয়ে দিল সেটা। আমি ধরার আগেই মনে হলো সেটা ছোঁ মেরে কেউ নিয়ে চলে গেল। ঠিক এক সেকেণ্ডেরও কম সময়। একটা ছায়া যেন সরে গেল। কেমন গন্ধ লাগল নাকে।

আমরা হতভম্বের ভাব কাটিয়ে ওঠার আগেই প্রায় দশ ফুট দূরে বোতলটি আছড়ে পড়ল। পেছনে শোঁ-শোঁ একটা শব্দ শুনলাম। তারপর সড়াৎ করে কিছু চলে যাবার শব্দ। ঝট করে পেছনে তাকালাম। কিছু নেই। মনে হলো দূরে ছায়ার মত কিছু একটা হঠাৎ অদৃশ্য হলো। দৌড়ে বোতলের কাছে গেলাম। নিচু হয়ে ওঠাতে যাব, রুবাইয়েত আচমকা চিৎকার করে বলল, ‘স্যর, ধরবেন না ওটা।’

 

 

আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘কেন?’

‘দেখুন, স্যর,’ বলল সে। ‘ভাল বোতল, অর্ধেকটা পানিতে ভরা ছিল। এখন দোমড়ানো, মোচড়ানো। মনে হচ্ছে গরম পানিতে সেদ্ধ করা হয়েছে। দেখুন গলে গেছে কিছুটা। আমার ভয় লাগছে। কী হয়েছিল, স্যর, একটু আগে? বোতলটা থাবা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল কে? চলুন, স্যর, আমরা পালাই।’

আমিও যে অবাক হইনি তা নয়। ভয় আমারও কিছুটা লাগছে। যদিও মাথার ওপরে চাঁদ জ্যোৎস্না বিলাচ্ছে অকাতরে। তবু কেমন ভৌতিক পরিবেশ। মনে হচ্ছে জনমানবশূন্য পরিত্যক্ত এক গ্রাম এটা।

‘ট্রেন থেকে আমাদের নামাটাই ঠিক হয়নি,’ বিড়বিড় করে বলল রুবাইয়েত। ‘খুব ভুল হয়ে গেছে।’

আমি বললাম, ‘চলো, ফিরে যাই।’

পেছনে পথের দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, ‘ওই পথেই তো এসেছি। ওদিক দিয়ে গেলে নিশ্চয়ই রেললাইনটা খুঁজে পাব। রেললাইন পেলে আর চিন্তা নেই। ‘

‘ওদিক দিয়ে?’ অনিশ্চয়তার সুরে বলল রুবাইয়েত। ‘কতবার বাঁক নিয়েছি, পথ আর খুঁজে পাব কিনা কে জানে? রাত, স্যর, দুটো বাজতে চলল। সকাল পর্যন্ত যে এখানে অপেক্ষা করব, সে উপায়ও নেই।’

‘তবু তো এখান থেকে যেতে হবে।’

‘জি, স্যর। যেতে হবে।’

‘চলো, ফিরতি পথই ধরি।

‘জি, স্যর। সেটাই ভাল হবে।’

ঘুরে আবার হাঁটতে শুরু করলাম আমরা। কিন্তু মনে হলো এটা ভিন্ন কোন পথ। কারণ গাছপালা বেশ ঘন হয়ে আসছে ধীরে-ধীরে। চাঁদের আলো ক্রমে ম্লান হচ্ছে। হঠাৎ‍ কোন শিশুর গুঙিয়ে ওঠার শব্দ শুনলাম। থেমে পড়লাম আমরা। আবার নিস্তব্ধতা। তাকালাম সামনে। একসাথে অনেকগুলো ছায়া যেন সরে গেল।

‘আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি,’ একটু কাঁপা গলায় বললাম আমি।

‘জায়গাটা ঠিক স্বাভাবিক না,’ প্রত্যুত্তরে বলল রুবাইয়েত।

‘চুপ, কে যেন আসছে!’

আমি আর রুবাইয়েত একে অপরের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইলাম।

রাস্তাটা ঠিক সোজা নয়, তাই দেখা যাচ্ছে না কে আসছে। শুধু হালকা পায়ের ছুটে আসার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। এবং দেখলাম তাকে।

একটা কিশোর!

আটকে রাখা নিঃশ্বাস ছাড়লাম।

চাঁদের আলোয় তার মুখ দেখা যাচ্ছে। ভীত, শংকিত এক মুখ। আমাদেরকে খেয়াল করেনি সে। দৌড়ে আসছে। যেন পেছনে তাড়া করছে কিছু।

কাছে আসতেই আমি খপ করে তার একটা হাত ধরে ফেললাম। সে ‘বাবাগো’ বলে এক চিৎকার দিয়ে আমার বুকের ওপর আছড়ে পড়ল।

আমি বললাম, ‘ভয় পেয়ো না। কে তুমি?’

‘আমি…আমি…’ সে তোতলাতে লাগল। ‘আপনারা কারা? এখানে কী করেন?’

‘তুমি কে সেটা বলো!’

আমাদের দিকে তাকাল সে। এখনও হাঁপাচ্ছে।. হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, ‘মানুষই তো মনে হচ্ছে আপনাদের। চলেন এখান থেকে। একটুও দেরি করবেন না।’

‘আগে বলো তুমি কে!’ ধমক দিলাম আমি। ‘কোত্থেকে আসছ? যাচ্ছই বা কোথায়?’

‘আমি রবিন।’ মনে হচ্ছে রীতিমত কাঁপতে শুরু করেছে সে। ‘ওইখানে আমাদের বাড়ি-’ দূরে অন্ধকারের দিকে হাত তুলে দেখাল। ‘আমি আমার দাদাকে রেখে পালিয়ে এসেছি। দৌলতকান্দি-মামাদের বাড়ি চলে যাব।’

‘কিন্তু এত রাতে কেন? দৌড়াচ্ছই বা কেন? আর দাদাকেই বা রেখে কেন? তুমি তো অনেক ছোট। একা- একা এভাবে-’

‘ওরা-ওরা আমার দাদাকে খেয়ে ফেলবে এখন। আমার বাবাকে যারা খেয়েছে-’

‘তোমার কথা বুঝতে পারছি না আমি, কী বলছ!’

‘বলছি, আমার দাদাকে ওরা এখন খেয়ে ফেলবে। আমি জানি। আমার বাবারও ঠিক এরকম হয়েছিল। আহ্, কী যন্ত্রণা ছিল তার মাথায়। পাগল হয়ে গিয়েছিল! দাদারও এখন একই অবস্থা। ছাড়েন আমাকে।’

‘না, আমি বললাম। ‘চলো, তোমাদের বাড়ি যাব। তোমার দাদাকে দেখব।’

অবাক হয়ে ছেলেটি তাকাল আমার দিকে। বারো কি তেরো বছর বয়স ওর। খালি গা। পরনে হাফপ্যান্ট। পা দুটোও খালি। টিপিক্যাল গ্রামের ছেলেরা যেমন হয়।

‘আপনি কি পাগল নাকি?’ ছেলেটা বলল।

আমি বললাম, ‘না, আমি ডাক্তার। চলো, তোমার দাদার কী রোগ হয়েছে, দেখি।’

‘কোন রোগ হয় নাই,’ একটু শান্ত হলো সে। ‘এটা লোভের ফল। আমি কইছিলাম, দাদা, লোভ কইরেন না। বাবা মরছে, আপনিও মরবেন। আমার কথা শোনে নাই দাদা। এতক্ষণে মনে হয় তারে খাইয়া ফেলাইছে।’

‘তাকে কে খাবে?’ বিরক্ত না হয়ে পারলাম না তারা কথায়।

‘তারা খাবে…যারা আমার বাবারে খাইছিল।’

‘কারা তারা?’

ছেলেটা এবার গলা বাড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর ফিসফিস করে বলল, ‘সাপগুলা!’

আমি এবার স্পষ্ট বিরক্ত হলাম। বললাম, ‘সাপে কখনও মানুষ খায়? দেখেছ? আহাম্মক কোথাকার!’

‘হ্যাঁ, দেখেছি,’ সে বলল। ‘আমার সামনে আমার বাবাকে সাপগুলা পুরা খাইয়া ফেলছিল।’

এবার গায়ে কাঁটা দিল আমার। মনে হলো ছেলেটা মিথ্যা বলছে না। এ বয়সী একটা ছেলের মিথ্যা বলার কোন কারণ নেই, তবু আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘আমি থাকতে তোমার ভয় নেই। চলো, তোমার দাদাকে দেখে আসি। একটা মানুষকে এভাবে ফেলে রেখে যেতে নেই।’

‘কিন্তু ওরা টের পেলে-’

‘কারা?’

‘সাপগুলা!’

‘শোনো, ছেলে, তুমি হয়তো কোথাও কোন সাপের গল্প পড়েছ বা শুনেছ। বাস্তবের সাথে তাকে গুলিয়ে ফেলছ। এধরনের কোন সাপ পৃথিবীতে নেই।’

ছেলেটি এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে ওই ঘরগুলা?’

‘কোন্ ঘরগুলো?’

‘ওই যে রাস্তার পাশে, এখানে ঢোকার মুখে। ছয়টা ঘর।’

কেন জানি না আমি একটু কেঁপে উঠলাম। বললাম, ‘কী হয়েছে ঘর নিয়ে? ঘর তো যেখানে খুশি থাকতেই পারে।’

‘না, ওইগুলা সাপেদের ঘর। ইয়া বড়, তালগাছের মত সব সাপ থাকে ওখানে। মানুষ খায়।’

আমি ছেলেটার দিকে ভাল করে তাকালাম। বললাম, ‘তোমার মায়ের কথা এখনও বলো নাই। ওনাকেও কি সাপে খেয়েছে? নাকি অন্য কোথাও বেড়াতে গেছেন?’

আমার রসিকতাটুকু বুঝল না সে। বলল, ‘আমার জন্মের সময় মা মারা গেছে। ‘

পুরো পথ একটা কথাও বলল না রুবাইয়েত। শুধু মাঝে-মাঝে ছেলেটার দিকে তাকাতে লাগল। আমি ছেলেটার একটা হাত ধরে আছি, পাছে সে দৌড় দেয়, তাই।

সে এমনভাবে এগোচ্ছে যেন পুরো পথ তার মুখস্থ। একসময় হাঁটার গতি থামাল সে। আঙুল তুলে বলল, ‘ওই যে-’

চাঁদের আলোয় দেখলাম একটা কাঠের ঘর। ভেতরে আলো জ্বলছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না।

‘আপনারা যান, আমি যাব না।’ ছেলেটি বলল।

আমি বললাম, ‘মনে হয় ঘরে কেউ নেই। আলো জ্বলছে না।’

‘তাহলে এতক্ষণে দাদাকে খাইয়ে শেষ করে ফেলছে,’ নির্বিকার গলায় বলল ছেলেটি।

ঠিক তখনই চিৎকারটি শুনতে পেলাম। ঘরের মধ্য থেকে আসছে।

‘আমার দাদা…আমার দাদাজানকে হারামিগুলা খাইয়া ফেলতেছে…’ ছেলেটি আমার কাছ থেকে তার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। ‘বাঁচান, আমার দাদারে বাঁচান। ভুল করছিল সে। লোভে পড়ছিল, কিন্তু মানুষটা ভাল…

আমি সজোরে ছেলেটার গালে চড় মারলাম। সে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ল।

আমি রুবাইয়েতকে বললাম, ‘ওকে ধরে রেখো, আমি আসছি।’

দৌড়ে ঘরের কাছে গেলাম।

কান পাতলাম দরজায়। ভেতরে কোন সাড়া-শব্দ নেই।

ছেলেটা কি তাহলে বানিয়ে বলেছে সব?

সবটাই শিশু মনের কল্পনা?

উঁকি মারার চেষ্টা করলাম।

ভেতরটা এত অন্ধকার যে কিছুই দেখা যায় না। হঠাৎ মনে হলো পকেটে তো মোবাইল আছে, মোবাইলের টর্চটা তো জ্বেলে দেখতে পারি।

পকেট থেকে মোবাইল বের করে টর্চ জ্বাললাম।

নাহ, আশপাশটা খুব শান্ত, খুব নিশ্চুপ।

দরজায় ফুটো খুঁজতে লাগলাম, ওখান দিয়ে টর্চের

আলো ফেলে ভেতরটা দেখা যায় কিনা।

কোন ফুটো পেলাম না। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ।

আস্তে কয়েকবার ঠেলাও দিলাম। না, দরজা বন্ধ। ঘরের পেছনের দিকটায় চলে গেলাম।

কাঠের দেয়াল মেঝে থেকে চাল পর্যন্ত।

একটা জানালাও কি নেই?

আমি প্রতিটা কাঠে আলো ফেলছি। খুব মনোযোগের সাথে ফাঁক-ফোকর খুঁজছি।

এতক্ষণ খেয়াল করিনি যে ঘরের পশ্চিম পাশে একটা ছোট জানালা রয়েছে! মাটি থেকে দাঁড়ালে আমার গলা সমান উঁচুতে। আমি এগিয়ে গিয়ে জানালাটা আস্তে ঠেলা দিতেই খুলে গেল। মোবাইল উঁচু করে আলো ফেললাম ভেতরে এবং একই সাথে উঁকি দিলাম। আমি চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম কিনা মনে নেই। যে দৃশ্য ভেতরে দেখলাম তা আমাকে মৃত্যু পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে। এর চেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য আমি আমার জীবনে দেখিনি। মুহূর্তের মধ্যেই ‘আমার সব দেখা হয়ে গেল।

মনে হয় ওরা জানত! তাই এত নিশ্চুপ ছিল। ওদের সবক’টা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একেকটার সারিবদ্ধ দাঁত। হাঁ করে আছে সবাই। লালা ঝরছে মুখ দিয়ে। এমন বীভৎস, কুৎসিত সাপ পৃথিবীতে আছে আমার জানা ছিল না। আমার বুক সমান উঁচুতে ফণা তুলে সবক’টা দাঁড়িয়ে আছে। কালো, কুচকুচে, ভয়ঙ্কর। বিশাল মুখ। সামনে পড়ে আছে অর্ধেকের বেশি খাওয়া ক্ষত-বিক্ষত একটি লাশ! আমি মোবাইল ফেলে রেখেই দৌড় দিলাম।

পেছনে শিশুদের গোঙানির মত শব্দ। আমি দৌড়চ্ছি প্রাণপণে। দেখলাম, আমাকে দৌড়তে দেখে ওই ছেলেটা আর রুবাইয়েতও দৌড়নো শুরু করেছে। পেছনে তাকানোর সাহস নেই। প্রাণপণে ছুটছি। চারদিকে হিসহিস শব্দ আর শিশুর গোঙানি। দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ মনে হলো পায়ের নিচে আর মাটি নেই, আমি বাতাসে ঝাঁপ দিয়েছি।

পড়ে যাচ্ছি আমি। কতক্ষণ জানি না।

ধপ করে পানিতে পড়লাম।

পড়েই পানির অনেক নিচে তলিয়ে গেলাম। দম বন্ধ হয়ে এল আমার। মনে হচ্ছে বুক ফেটে যাবে। আর সম্ভব নয়। মুখটা খুলতে যাব, ভুস করে ভেসে উঠলাম।

শরীরে শক্তি নেই এক বিন্দু।

শুধু ভেসে থাকার চেষ্টা করলাম পানির ওপর।

মনে হয় কোন মাছ ধরার নৌকা যাচ্ছিল।

আমাকে দেখতে পেয়ে কাছে এগিয়ে এল।

কয়েকটা হাত টেনে তুলল আমাকে।

আমি জ্ঞান হারালাম।

.

যখন জ্ঞান ফিরল, মুখের ওপর রোদ এসে পড়েছে। উঠে বসলাম আমি। সারা শরীরে ব্যথা। দেখলাম আমাকে ঘিরে বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ।

যুবক মত একজন বলল, ‘আমি আপনাকে প্রথমে দেখেছিলাম। আপনি, স্যর, নদীর মাঝখানে আসলেন কোত্থেকে? কী স্রোত, বাপরে বাপ।’

‘হুম,’ আরেকজন বলল। ‘আমি তো দেইখ্যাও বিশ্বাস করি নাই যে ওইটা কোন মানুষ। আপনারে আমরা না দেখলে আপনার বাঁচন লাগত না। মেঘনায় এখন যা স্রোত!’ আমি দুর্বল গলায় বললাম, ‘আমার সাথে আরও দুইজন ছিল। ওদের কি দেখেছ?’

‘না, আমরা শুধু আপনারেই পাইছি।’

‘আমি ঢাকা যাব। আমাকে একটা মাইক্রোবাস ঠিক করে দিলে হবে।’ চট করে নিজের দিকে তাকালাম। একটা লুঙ্গি পরা।

‘স্যর, আপনার প্যান্ট শুকাতে দেয়া হয়েছিল। সব ঠিক আছে।’ একজন বলল।

আমি প্যান্ট-শার্ট পরে নিলাম।

আমার মানিব্যাগটা একজন বাড়িয়ে দিল।

আমি বললাম, ‘ওটা আপনার কাছেই থাকুক।’

‘না, স্যর। আপনার জিনিস আপনি নেন। মেলা টাকা আপনার ব্যাগে। আমাদের অত লোভ নাই।’

লোভ! মাথার ভেতর সেই ছেলেটির কথা বাড়ি খেল।

কী যেন নাম ছেলেটির?

রবিন? হ্যাঁ, রবিন।

ওর আর রুবাইয়েতের জন্য দুশ্চিন্তা হলো আমার। ওরা ভাল আছে তো?

.

এ ঘটনার পর তিন মাস কেটে গেছে। এর মধ্যে রুবাইয়েতের সাথে আমার আর যোগাযোগ হয়নি। সে-ও ফোন করেনি আমাকে। এখন অন্য একজন আমাদেরকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসা-যাওয়ার টিকেট দেয়। প্রতি শুক্রবার সকাল ৬:৩৫ মিনিটের পারাবত ট্রেনে উঠি, ফিরি বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে মহানগর এক্সপ্রেসে। শুধু আমি নই, অনেক ডাক্তার এদিন প্র্যাকটিস করতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যায়। এখন যে ছেলেটি আমাদেরকে ট্রেনের টিকেট দেয়, তাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম রুবাইয়েতের কথা। সে মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘ওর কথা আর বলবেন না, স্যর। পিপীলিকার পাখা গজিয়েছে। ছিল ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ, এখন এলিয়নে চড়ে। হাইফাই অবস্থা। কথা কয় না। ফোন নম্বর পাল্টিয়েছে। দেখা হলে চেনে না। আমার মনে হয় স্মাগলিঙের সাথে জড়িত।’

আমি বললাম, ‘মানুষ বদলাতেই পারে।’

‘তাই বলে এমন বদলানো, স্যর? কুত্তা যদি ঘি খায়, পেটে সইবে? সইবে না বলে দিলাম।’

আমি বললাম, ‘সবাই যে যার মত ভাল থাকুক—এটাই তো কাম্য হওয়া উচিত, তাই না?’

সে বলল, ‘ছুঃ। একই সাথে দু’জন এই কোম্পানিতে ঢুকেছিলাম। আমি শালা এখনও ডাক্তারদের ট্রেনের টিকেট কেটেই চলেছি, আর ওই হারামজাদা এলিয়নে চড়ে। বলে, বাপের টাকা। বাপ যেন আর কারও নাই।’

আমি ট্রেনে ফেরার সময়, ট্রেন যখন মেথিকান্দা ঢোকে, আমি খুব আগ্রহ নিয়ে রেললাইনের বাঁ দিকে তাকিয়ে থাকি, সাপমারা বাজারের কোন সাইনবোর্ড আমার চোখে পড়ে না। যে ছয়টি ঘর আমি দেখেছিলাম সেরকম কোন ঘরও দেখতে পাই না। আমি কয়েকজন ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেছি, তারা উত্তরে বলেছে গ্রামগঞ্জে এধরনের অনেক বিচিত্র নাম থাকে-সব চেনা বা জানার কথা নয়। একসময় আমি নিজেও এসব ভুলে যাই।

একদিন বিকেলে আমি শাহবাগ কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে যাচ্ছিলাম একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। বারবার একটা নাম্বার থেকে আমার মোবাইলে কল আসছিল। আমি সাধারণত অপরিচিত নম্বর থেকে কল এলে ধরি না। তাই এ কলটিও কেটে দিচ্ছিলাম। কিন্তু এতবার কল আসছে যে শেষ পর্যন্ত আমি ধরতে বাধ্য হলাম। বেশ বিরক্ত স্বরে বললাম, ‘হ্যালো।’

‘আপনি কি স্যর বলছেন? নাকি তার পিয়ন?’ একটা মেয়েলি কণ্ঠ।

‘স্যর বলছি।’

‘স্যর, আমি রুবাইয়েতের স্ত্রী।’ দ্রুত গলায় বলল ওপাশ থেকে। ‘আপনাকে ক’দিন ধরে ট্রাই করছি। পাচ্ছি না। রুবাইয়েত খুব অসুস্থ। আপনাকে কী যেন বলতে চায়। আপনি আসুন, স্যর।’

‘কী হয়েছে ওর? ও তো আমার সাথে যোগাযোগই করে না।’

ওকে মাফ করে দিন, স্যর। আপনি কোথায় আছেন? আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি। ও খুবই অসুস্থ।’

‘ও কোন্ হাসপাতালে আছে বলো। গাড়ি পাঠানো লাগবে না। আমি যাব দেখতে।’

‘হাসপাতালে না, স্যর। বাসায়। উত্তরা ১৪ নং সেক্টর। আমি, স্যর, ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি। গাড়ি, স্যর, গুলিস্তানে আছে।’

‘আমি তো শাহবাগে। তুমি তাহলে পাবলিক লাইব্রেরিতে পাঠাও। আমার নম্বর দিয়ে দিয়ো।’

‘ঠিক আছে, স্যর। অনেক ধন্যবাদ।’

পাবলিক লাইব্রেরির অনুষ্ঠানে আমার আর যাওয়া হলো না। আমি গেটের কাছে পৌঁছতে গাড়িও চলে এল। নতুন ঝকঝকে গাড়ি। ড্রাইভার আমাকে চিনল। গাড়িতে তুলেই আর দেরি করল না। হর্ন বাজিয়ে চলতে শুরু করল।

‘একটু আস্তে চালাও,’ আমি তাকে মাঝে-মাঝে সতর্ক করে দিলাম। কিন্তু সে আমার কথা শুনছে বলে মনে হলো না। তার ইচ্ছামত সে গাড়ি চালাচ্ছে।

এসির মধ্যে ঠাণ্ডায় ঘুম চলে এসেছিল প্রায়। ড্রাইভারের ডাকে তন্দ্রা ছুটল। ‘স্যর, চলে এসেছি। নামেন।’

সুন্দর, দোতলা বাড়ি। সামনের লনে সবুজ ঘাস আর বিভিন্ন ধরনের ফুলের গাছ। আমি গাড়ি থেকে নামতেই এক তরুণী দৌড়ে এল। ‘স্যর, আমি আপনাকে ফোন করেছিলাম। রুবাইয়েত দোতলার ঘরে আছে, চলুন।’

আমি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে-উঠতে ভাবলাম, ব্যাটা ভালই কামিয়েছে।

ঘরে ঢুকলাম আমি। চমকে গেলাম রুবাইয়েতকে দেখে। এ কাকে দেখছি আমি! প্রাণচঞ্চল এক যুবক যেন রাতারাতি বৃদ্ধে পরিণত হয়েছে।

চোখে শূন্য দৃষ্টি। এলোমেলো চুল। অর্ধেকের বেশি পেকে গেছে। চোখের নিচে কালি। মনে হয় কতদিন ঘুমায় না। আমাকে দেখে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ‘স্যর, আমাকে মাফ করে দেন। আপনার পায়ে পড়ি, স্যর, আমাকে মাফ করেন।’

সে সত্যি-সত্যি আমার পা ধরতে এল। আমি দ্রুত পেছনে সরে গেলাম। ‘কী হয়েছে, রুবাইয়েত?’

‘পাপের ফল, স্যর। লোভ করেছিলাম। উফ…’ রুবাইয়েত দু’হাতে তার মাথা চেপে ধরল।

‘যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি।’ মাথার চুল টানতে-টানতে বলল সে। ‘সারাক্ষণ যন্ত্রণা।’

‘ওষুধ খাও না?’

‘ওষুধ!’ হিস্টিরিয়া রোগীর মত হাসল সে। ‘ওষুধ বাইটা খাইলেও কিছু হবে না। আমার মাথা, স্যর, ছিঁড়ে যাচ্ছে।’

‘রুবাইয়েত, শান্ত হও।’ আমি বললাম।

‘কীভাবে শান্ত হব, স্যর। ঘুমাতে পারি না। মাথার মধ্যে খসখস শব্দ হয়। মনে হয় কী যেন নড়ছে। কখনও মনে হয় আমার মাথার মধ্যে, স্যর, সাপ জন্মাইছে।’

‘কী আবাল-তাবোল চিন্তা তোমার!’

‘আমি সত্যি বলছি। হঠাৎ মোচড় দিয়ে নড়ে ওঠে। ব্যথায় আমি প্রায় মরে যাই। কেন যে লোভ সামলাতে পারলাম না।’

‘কীসের লোভ?’

ওই পোলাডারে চাইপা ধরতেই আমারে কইছিল, স্যর, ওই পোলা, যার দাদাকে সাপে খাইছিল!’

‘বলো, শুনছি।’

কথা বলতে রীতিমত কষ্ট হচ্ছে রুবাইয়েতের। ঘন-ঘন শ্বাস নিতে-নিতে বলল, ‘আপনাকে তো, স্যর, খুঁজে পেলাম না। মনে করছিলাম সাপের পেটে গেছেন। আমরা ওই রাতেই দৌলতকান্দি চলে আসি। ওই পোলা শোনাল তার দাদার মরার কাহিনি। সাপদের আক্রোশের কথা। একটা কুয়া আছে ওখানে। বিষ ভর্তি কুয়া। সাপেরা ওখানে তাদের বিষ ঢালে। ওর দাদা ওই বিষ নিয়ে বেচত। জানেন তো, স্যর, কোটি টাকা দাম। আমিও শুনে লোভ সামলাতে পারিনি। এই দেখেন, স্যর, কী দামি বাসায় থাকি। সাপের বিষের টাকায় কেনা। ওই পোলারে সাথে নিয়ে আমি দিনের বেলা গিয়েছিলাম। পানির বোতলে কইরা বিষ নিয়ে আসি। যদি জানতাম ওগুলো সাধারণ সাপ না-’

দু’হাতে জোরে মাথা চেপে ধরল রুবাইয়েত।

‘স্যর, মরে যাচ্ছি, স্যর। এত যন্ত্রণা-মাথাটা, স্যর, ফাইটা যাচ্ছে।’

দেখলাম যন্ত্রণায় মোচড় খাচ্ছে রুবাইয়েতের শরীর। ভাল করে তাকালে মনে হবে যেন একটা সাপ।

ঘাড় বাঁকিয়ে-বাঁকিয়ে সে অদ্ভুত শব্দ করছে। আমি কী করব বুঝতে পারছি না।

তার দিকে এগোতেই সে হাত নেড়ে নিষেধ করল। ‘স্যর-স্যর-স্যর…’ শেষ একথাটাই শুধু বলতে পেরেছিল সে। ঠাস করে একটা শব্দ হলো।

একই সময়ে তার ভেতরে যেন একটা শিশু গুঙিয়ে উঠল।

পড়ে গেল সে।

তার মাথার খুলি চুরমার হয়ে গেছে।

আমি চোখ বড় করে তাকিয়ে রইলাম। যেখানে মগজ থাকার কথা সেখানে মগজ নেই।

একটা কুণ্ডলী পাকানো সাপ!

ফোঁস-ফোঁস শব্দ করতে-করতে সে রুবাইয়েতের মাথার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। কালো, কুৎসিত। লেজ নাড়ছে। জিভ বের করছে মাঝে-মাঝে। মুখটা হাঁ করল একটু। সারি-সারি দাঁত! আমি পাথরের মত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

বিশাল ফণা তুলেছে সাপটা।

হিসহিস শব্দ হচ্ছে।

মনে হচ্ছে শব্দের পরিমাণ আরও বেড়ে যাচ্ছে। এখন পুরো ঘর জুড়ে শুধু হিসহিস শব্দ।

আমি দৌড়নোর শক্তি হারিয়ে ফেললাম।

রুবাইয়েত পড়ে আছে মেঝেতে।

সাপটা তার পায়ের কাছে গেল। ছোবল মারার মত ঊরুতে কামড় বসাল। টেনে এক খাবলা মাংস নিয়ে এল। চিবোতে লাগল। আমি বমি করে ফেললাম।

সাপটা ঘুরে তাকাল আমার দিকে। কী বীভৎস দেখতে! জ্বলজ্বল করছে তার চোখ। ঠোঁট গোল করে মনে হলো শিস দিল!

হিসহিস শব্দে ভরে উঠল ঘর। অবাক হয়ে দেখি জানালা দিয়ে ওরা ঢুকছে!

আমি গোনার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। কালো, মাংসল সাপ।

যেন আমার দিকে খেয়াল নেই ওদের।

এগোতে লাগল দল বেঁধে।

তারপর এক যোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল রুবাইয়েতের লাশের ওপর!

 

ছায়া – রাজীব চৌধুরী

স্যর, ভীষণ বিপদে পড়ে আপনাকে লিখতে বসেছি। আমার কিছু করার ছিল না। চাইনি আপনাকে এভাবে বিরক্ত করতে। কিন্তু আমার অন্য কোনও উপায় খোলা ছিল না। সমস্যাটার উৎস হচ্ছে আপনার দেয়া নতুন পাণ্ডুলিপিটি, যেটা গত ১৯ তারিখ আপনি আমাকে দিয়েছিলেন। আপনার অনুমতি পেয়ে সেই পাণ্ডুলিপি আমার বাসায় নিয়ে গিয়েছিলাম, আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই। হাতে লেখা সেই পাণ্ডুলিপি ত্রিশ মিনিটের মাথায় পড়ে শেষ করেছিলাম। গল্পটা পড়ে অবাক হয়েছিলাম যে একজন নতুন লেখক এত সুন্দর শব্দ চয়ন কী করে করল, আর কী করেই বা এত গুছিয়ে লিখল।

কিন্তু গল্পটা পড়ার পর থেকেই সমস্যার শুরু। এই গল্পটিতে শিলা নামের এক চরিত্র আছে। গল্পে প্রেমিক শিলাকে খুন করে এবং তার পরের সব ঘটনা লেখা ছিল। অসাধারণ জীবন্ত লেখা, পড়ে মনে হচ্ছিল যেন আমি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এই গল্পটা পড়ে আমি ঘুমাতে গেলাম রাত দেড়টার দিকে। কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ করে ঘুমটা ভেঙে গেল, চোখ খুলে মনে হলো আমার ঘরে কেউ আছে। উঠে বাতি জ্বেলে পিছনে ফিরতেই দেখি একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রচণ্ড চমকে গেলাম, এত রাতে এই মেয়ে কোথা থেকে এল, কোনওভাবেই মাথায় ঢুকছিল না। মেয়েটা লাল শাড়ি পরেছিল, হাতে একগাছি লাল রঙের রেশমি চুড়ি, সঙ্গে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। মেয়েটা কাঁদছিল। হঠাৎ করেই মনে পড়ল সেই পাণ্ডুলিপির ‘শিলা’ চরিত্রের কথা। লেখকের বিবরণ অনুযায়ী যখন শিলাকে তার প্রেমিক খুন করে, তখন শিলার সাজপোশাক এমনই ছিল!

অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে মেয়েটিকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলাম, সঙ্গে এটাও জানতে চাইলাম যে, আমার ঘরে সে কীভাবে ঢুকেছে। প্রত্যুত্তরে সে যা বলল, তা হলো: তার নাম শিলা, তাকে যে খুন করেছে, সে আর কেউ নয়, স্বয়ং এই পাণ্ডুলিপির লেখক।

মনে হলো, গল্পের রেশটা আমার মাথায় রয়েই গেছে-এই জন্য আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। তা ছাড়া, সারাদিন অনেক পরিশ্রম হয়েছিল। হ্যালুসিনেশনের এটাও একটা কারণ হতে পারে। মেয়েটাকে কিছু না বলেই সোজা বিছানায় গিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, টের পাইনি।

 

 

পরদিন অফিস থেকে বাসায় গিয়ে দেখি সেই মেয়েটা আমার খাটে শুয়ে আছে। তখন ভয় পেলাম। কারণ সকালেও মেয়েটিকে দেখিনি। আমাকে দেখেই উঠে বসল। শুধু তাই নয়, আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, সে নাকি আসলেই মারা গেছে।

বিশ্বাস করিনি বলে সে আমার দিকে তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে বলল, আমি না চাইতেও বাধ্য হলাম তাকে ছুয়ে দেখতে।

আপনি বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, মেয়েটাকে আমি কোনওভাবেই ছুঁতে পারিনি। যেন সে হলোগ্রাফিক প্রতিবিম্বের মত, দেখা যায়, কিন্তু ধরা যায় না।

খুব কান্নাকাটি করল মেয়েটা। আমার কাছে আবদার করল, যেন আমি তার খুনের অভিযোগে সেই লেখককে পুলিসে দিই। কিন্তু আমার কাছে কোনও প্রমাণ নেই, তাই কিছু করতে অস্বীকৃতি জানাই।

এবার সে আমাকে বিরক্ত করতে শুরু করল।

সেই রাতেই আমার বাসায় তাণ্ডব চালিয়ে সব জিনিসপত্র ভেঙে চুরমার করল। কীভাবে ভেঙেছে তাও জানি না। আমি সেই মেয়েটাকে বেঁধে রাখার চেষ্টাও করেছি, কিন্তু পারিনি। অবশেষে না পেরে এক হুজুরকে ডেকেছিলাম। সেই হুজুরকেও ঝাড়ু দিয়ে পিটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে ওই মেয়েটা।

এখন ওর বক্তব্য হলো, বুড়িগঙ্গায় তার লাশ ফেলেছে লেখক। আমাকে তার লাশ উদ্ধার করে সঠিক উপায়ে সৎকার করে দিতে হবে। কিন্তু আমি এই মেয়ের লাশ কোথায় খুঁজব-কীভাবেই বা জানাজা পড়ে কবর দেব, জানি না। মাথা ভীষণ এলোমেলো হয়ে গেছে, স্যর। আমি এখন একজন মানসিক ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করাচ্ছি, তাতে যে খুব একটা উপকার হচ্ছে, তাও নয়। ‘কারণ শিলা প্রতিদিনই আমাকে এসে মনে করিয়ে দিচ্ছে তার কাজের কথা।

এখন কেবল আপনিই এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন।

বিশ্বাস করুন, স্যর, আমি একটুও মিথ্যা বলছি না আপনাকে। নরকের মত হয়ে গেছে আমার জীবনটা। আপনি দয়া করে এই চিঠিটাকে একটু গুরুত্ব সহকারে নেবেন। দয়া করে এই মেয়ের লাশটা খুঁজে বের করে জানাজা পড়িয়ে কবর দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। এবং এই মেয়ের আত্মার যেন শান্তি হয়, সেই ব্যবস্থা করবেন।

বিনীত

শান্ত সরকার

.

চিঠিটা পড়ে হাসান সাহেব বেশ গম্ভীরভাবে টেবিলের সামনে বসা মেয়েটার দিকে তাকালেন। যদিও চিঠিটা ডাকযোগে সকালে এসেছে, তিনি চিঠিটা পড়লেন সন্ধ্যায়, কারণ কাজের চাপে সারাদিন চিঠি পড়ার সুযোগ পাননি। কিন্তু মেয়েটা কী করে একদম সঠিক সময়েই অফিসে এল, এটা তিনি মেলাতে পারছেন না। যেই তিনি চিঠির খামটা খুলেছেন, অমনি রুমে ঢুকল মেয়েটা। লাল শাড়ির সঙ্গে লাল চুড়ি পরেছে। লাল লিপস্টিকও লাগিয়েছে। ঠিক যেমন করে চিঠিতে লেখা আছে। একটা ব্যাপার হতে পারে যে, পিওনকে কিছু টাকা খাইয়ে আগেই চিঠি পৌঁছানোর সময়টা জেনে নিয়েছে। কিন্তু তিনি কখন চিঠিটা পড়বেন, সেটা কী করে জানল!

‘দেখে তো ভদ্র ঘরের বলেই মনে হচ্ছে। এই ধান্ধায় কত দিন আছেন?’

এতক্ষণ মাথা নিচু করে ছিল মেয়েটা। হাসান সাহেবের কথা শুনে মেয়েটা চোখ তুলে তাকাল তাঁর দিকে। চোখদুটো লাল, পানিতে ভিজে গেছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মেয়েটা বলল: ‘স্যর, প্লিয, আমাকে বিশ্বাস করেন। আমি আসলেই একজন মানুষ ছিলাম’। কিন্তু এখন আমি মৃত। কিন্তু এ জগতে শান্তি পাচ্ছি না, আবার মৃতদের জগতেও পাচ্ছি না। আপনি দয়া করে আমার লাশের একটা ব্যবস্থা করে দিন।’ বলে আবারও কেঁদে ফেলল মেয়েটা।

এবার বেশ রেগে গেলেন হাসান সাহেব। সেবা প্রকাশনীতে আজকে তিনি চল্লিশ বছর ধরে আছেন। হাজার মানুষ দেখেছেন। অনেক ঘাটের জল খেয়েছেন। তিনি যে- কোনও মানুষকে দেখে তাকে চিনে ফেলতে পারেন। এই লাইনে মানুষ কম দেখেননি তিনি। রাগত স্বরে বললেন, ‘এই, মেয়ে, এই মুহূর্তে তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও। নইলে কিন্তু পুলিস ডাকব!’ রাগে ফোঁসফোঁস করতে লাগলেন তিনি।

‘আপনাকে কীভাবে বোঝাব যে মিথ্যা বলছি না। আচ্ছা, আপনি আমার হাতটা একবার ছুঁয়ে দেখুন,’ বলেই মেয়েটা তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল হাসান সাহেবের দিকে।

হাসান সাহেব সেই হাত ধরতে গিয়ে থতমত খেয়ে গেলেন। সঙ্গে-সঙ্গে তিনি বুকের বাম দিকে খানিকটা ব্যথা অনুভব করলেন যেন। এরপরই তিনি বুঝতে পারলেন তিনি জ্ঞান হারাতে চলেছেন। শুধু জ্ঞান হারানোর আগে তিনি বুঝলেন: এই মেয়েটা এখনও তাঁর সামনে বসে আছে। সে ছায়া ছাড়া কিছুই নয়। তার হাতে হাসান সাহেব হাত রাখতেই পারেননি! ছায়াদের যে ছোঁয়া যায় না সেই কথাটা চিন্তা করতে-করতে তিনি চেয়ারে বসা অবস্থাতেই জ্ঞান হারালেন।

 

শ্বাপদতন্ত্র – সৈয়দ অনির্বাণ

এক

ক্ষুধা! বয়স হয়ে গেছে তার, আগের মত উদ্যম আর শক্তি নেই আর। নেই আগের সেই দুর্দমনীয় ক্ষমতা, গতিবিধির স্বাধীনতাও অনেকটাই খর্ব হয়েছে। এক কালের পরাশক্তি এখন পরিণত হয়েছে অতীত গৌরবের ছায়াতে। অক্ষমতার হাত ধরে সঙ্গে জুটেছে খাদ্যের অভাব। আগের মত সাবলীল ঢঙে শিকার করতে পারে না সে আর তাই প্রায় সময়ই অভুক্ত থাকতে হয়। ফলস্বরূপ বুকে তার সব সময়ই দাউ-দাউ করে জ্বলতে থাকে আগুন-তীব্র ক্ষুধার আগুন!

.

বিশাল অরণ্যের কোলে কেউ বহুকাল আগে পত্তন করেছিল এই বসতির। ক্রমে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে বিশাল এক জনপদ। তার করাল আগ্রাসনে বনভূমি আজ হুমকির মুখে। তবে হারানো দিনের মহিমা আজও কিছুটা অবশিষ্ট আছে।

বিশাল বিশাল মহীরুহ আর তার ছায়াতে বেড়ে ওঠা ঘন ঝোপঝাড়ে ছাওয়া গহীন বন এবং গ্রামের মাঝে রয়েছে এক চিলতে ঘেসো জমি। সেখানে চরে বেড়ায় গরু-মোষের পাল। স্থানীয় অনেকেরই জীবিকা নির্ভর করে এই চারণভূমির উপর।

পশুপালন নির্ভর জনপদ, আর তাই বাঘ বা চিতাবাঘের কবলে গরু-মোষের মৃত্যু ঘটলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায় পশুপালকের। এমনি একটা গরু অসুস্থ হলে আর কিছু না হোক, জবাই করে ওটার মাংস খাওয়া যায় কাজে আসে চামড়াটাও। কিন্তু বাঘে নিলে লবডঙ্কা। তা ছাড়া, শুধু পশুই না, জানেরও তো ভয় আছে। যদিও মানুষখেকোর দেখা কদাচই মেলে। কিন্তু তবু ঝুঁকি কম নয়।

গবাদি-পশু চরানোর সময় প্রত্যেকেই একটা শিঙ্গা রাখে সঙ্গে। কেউ বিপদে পড়লে ওটা বাজিয়ে অন্যদের সংকেত দেয়া যায়। পর পর তিনবার শিঙ্গা ফুঁকলে সবাই বুঝবে বাঘ এসেছে! ওটাই এই এলাকায় বিপদের সর্বোচ্চ সীমা।

চারণভূমিটা এমনিতে সমতল হলেও উত্তর ধারে একটা ছোট্ট টিলা মত আছে, সেটা পেরিয়ে অন্যপাশে গেলে পাওয়া যাবে অর্ধবৃত্ত আকৃতির ঢালু একটা জমি। ওটা আকারে একর দশেকের মত। চমৎকার ঘাস হলেও সাধারণত কেউ পশু চরাতে যায় না ওদিকে। কারণ টিলার পেছনে বলে গ্রাম থেকে একটু বেখাপ্পা রকমের আড়ালে জায়গাটা। তা ছাড়া, বড় বেশি বনের গা ঘেঁষা। যে-কোনও সময় হিংস্র কোনও শ্বাপদের আগমন ঘটার সম্ভাবনাটাও বেশি ওদিকে।

হাঁটু সমান বয়স থেকেই গরু চরায় নুরু। এখন ও সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণ। চমৎকার স্বাস্থ্য আর সুদর্শন চেহারার সঙ্গে মানানসই অমায়িক ব্যবহারের কারণে গ্রামের ছেলে-বুড়ো সবার প্রিয় পাত্র ও। তা ছাড়া, অল্প বয়সে এতিম হয়েছে বলে গ্রামের সবাই সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখে ওকে। অন্যসব দিনের মত আজও গরু চরাতে বেরিয়েছিল ও। দুপুরের পর হঠাৎ আবিষ্কার করল, অন্যমনস্কভাবে ঘুরতে ঘুরতে ওর পালটা চলে গেছে টিলার অন্যপাশের ঢালু জমিটাতে। প্রথমেই যে চিন্তাটা ওর মাথায় এল, তা হচ্ছে—এদিকে আসাটা কি ঠিক হলো? বিপদ-আপদ হলে সাহায্য পেতে সমস্যা হবে। কিন্তু একটু পরেই চিন্তাটাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিল ও মাথা থেকে। গত বেশ কয়েক মাসে একবারও হামলা চালায়নি বাঘ বা চিতা জাতীয় কোনও প্রাণী। গ্রামে দু’চারবার শিয়ালে মুরগি নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই খোয়া যায়নি। খামোকাই চিন্তা করে মরে বুড়োরা! মনে মনে পল্লী-সমাজের নীতি নির্ধারকদের প্রতি তাচ্ছিল্য মিশ্রিত বিরক্তি বোধ করল ও।

কেউ না আসায় এদিকের ঘাসগুলো ইচ্ছামত বেড়ে উঠেছে। এই ঘাস পেলে অচিরেই হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠবে ওর পালের গরু। এখন থেকে এদিকেই আসতে হবে, ভাবল ও।

পশুগুলোকে ইচ্ছামত চরে খেতে দিয়ে একটা মোটা গাছের গুঁড়িতে পিঠ দিয়ে বসল নুরু। কোমরে গোঁজা থলে থেকে তামাকের সরঞ্জাম বের করে বিড়ি বাঁধতে শুরু করল। গুনগুন করে একটা সুর ভাঁজছে মনের সুখে। ধূমপান আর আলস্য করে বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত করল ও। তারপর আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াল। পশ্চিম আকাশ দেখে অনুমান করল, আর দেড় কি দুই ঘণ্টা পর অস্ত যাবে সূর্য। মানে কিছুক্ষণের মধ্যেই গরু-মোষগুলো জড় করে ফিরতি পথ ধরা উচিত।

তামাকের সরঞ্জাম গুছিয়ে কোমরে গুঁজতে গিয়েই ওর হাতে ঠেকল শিঙ্গাটা। এবং হুট করে মাথায় খেলে গেল একটা দুষ্ট বুদ্ধি। আচ্ছা, একটা মস্করা করলে কেমন হয়?

মাথায় চাপা দুর্বুদ্ধিটাকে মনে মনে উল্টে পাল্টে দেখল নুরু। যতই ভাবল, শয়তানিটা করার ইচ্ছা ততই চাগিয়ে উঠল ওর মনে। যেন ওর মাথার ভেতর বসে দুষ্ট বুদ্ধি দিচ্ছে কোনও তৃতীয় পক্ষ!

সব সময়ই দেখা যায় যে সুবুদ্ধি সহজে না খেললেও শয়তানি খুব দ্রুতই খেলে মানুষের মাথায়। বিশেষ করে অল্পবয়সীদের মাঝে মস্করা করার প্রবণতা প্রকট হয়ে থাকে। নুরুও তার ব্যতিক্রম নয় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেল ওর। এমন তো না যে কারও ক্ষতি করতে যাচ্ছে-সামান্য একটু মজা করবে মাত্র! যেই ভাবা, সেই কাজ—একটু আগে যে গাছটার গোড়ায় বসে ছিল, সেটা বেয়েই বেশ কিছুটা উপরে উঠে গেল ও। মোটা একটা ডালে আয়েস করে পা ঝুলিয়ে বসে প্রস্তুত হয়ে নিল, তারপর গলায় ঝুলানো শিঙ্গাটা ঠোঁটে তুলে জোরে জোরে ফুঁ দিল তাতে। পর পর তিনবার!

দুই

শিঙ্গার তীব্র, তীক্ষ্ণ আওয়াজ খানখান করে দিল শান্ত বিকেলের নীরবতা। এ ধরনের শিঙ্গা তৈরিই করা হয় বহুদূর থেকে সংকেত দেবার জন্য। তাই এর শব্দ যে জোরালো হবে, সে তো জানা কথা। স্থানীয় লোকজন এই শব্দের সঙ্গে সুপরিচিত। এবং এটা মোটেই তাদের প্রিয় কোনও সুর নয়। বিপদ সংকেত পেলে কারও মন উৎফুল্ল হয় না, বরং শঙ্কাই জাগে। তার উপর নুরু ফুঁ দিয়েছে তিনবার। এর অর্থ এলাকার সবাই জানে। মহা বিপদ সংকেত-বাঘ এসেছে!

বাঘ! হলুদের উপর কালো ডোরাকাটা ভয়ঙ্কর সুন্দর ওই জানোয়ারটাকে সমীহ করে চলে সবাই, ভয়ও পায়। প্রকৃতিপ্রদত্ত অমিত শক্তির অধিকারী ওই শ্বাপদ আক্রমণ করলে প্রাণ নিয়ে ফেরা কঠিন। শিঙ্গাটা তিনবার বেজেছে। তার মানে, হয় খুব কাছে-পিঠেই আগমন ঘটেছে বাঘের। অথবা কপাল খারাপ হলে হয়তো গরুর পালে ঝাঁপিয়েই পড়েছে ওটা। ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়ার চিন্তা বাদ, কারণ তা হলে আর শিঙ্গা বাজানোর সুযোগ হত না বাদকের।

সে যা-ই হোক, শব্দটা এসেছে টিলার অন্যপাশ থেকে। এদিকে যারা ওই দিন পশু চরাচ্ছিল, তাদের মাঝে খেলে গেল একটা চাঞ্চল্য। রাখালদের নেতা রহিম সরদার মোষ চরানোর পাশাপাশি লাঠি খেলাতেও পারদর্শী। বিশালদেহী, শক্তিশালী লোক সে। সাহসেরও কমতি নেই। প্রথমে সে-ই করিতকর্মা হলো। হাঁক-ডাক করে নিমিষের মধ্যেই জনা বিশেক লোক জড় করে ফেলল রহিম। উত্তেজনায় বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে, আর সমানে শাপ-শাপান্ত করছে। ‘ওই চুলোয় মরতে গেছে কোন্ ব্যাটা?’ মাটিতে পা দাপিয়ে জব্বার আলী নামের শুকনো মত চেহারার এক বুড়োকে জিজ্ঞেস করল রহিম, ‘জানে না ওই দিকটা ভালা না! মামা ঘোরাফেরা করে ওই দিকে, এইডা কি নতুন খবর?’

স্থানীয়ভাবে বাঘকে মামা নামেই ডাকে ওরা, বাঘ শব্দটা পারতপক্ষে উচ্চারণ করতে চায় না।

পিচিক করে পানের পিক ফেলে মুখ বিকৃত করল জব্বার, ‘এহন কি আর ওইসব চিন্তা করনের সময় আছে? আগে চল গিয়া দেইখা আসি অবস্থাডা কী?’

‘কইলেই কি যাওয়া যায়, মামা বইলা কথা!’ ভীতু প্রকৃতির হারুন মিয়া অন্য পাশ থেকে ফোড়ন কাটে।

‘মামা হইছে তো কী হইছে? আমরা এত্তগুলান লোক-হুদাই ভয় খাইস না!’ বলতে বলতে এক সাগরেদের কাছ থেকে লম্বা একটা বল্লম লুফে নেয় রহিম সরদার, ‘চল, ভাইরা, গিয়া দেখি কার কপাল পুড়ল!’

.

ওদিকে গাছের ডালে আয়েস করে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল নুরু। একটু আগে যে বিড়িগুলো বেঁধেছিল, তারই একটা ধরিয়ে মনের সুখে টানতে টানতে নিজ মনেই হাসছিল। টিলার ঢাল বেয়ে শোরগোল করতে করতে নেমে আসা লোকজন দেখে গাছের গায়ে ঘষে বিড়িটা নিভিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলল ও। দলের মাঝে মুরুব্বি কিসিমের লোক থাকবেই। মস্করা করা এক জিনিস আর বেয়াদবি আরেক। তরতর করে গাছ থেকে নেমে অগ্রসরমান দলটার দিকে এগিয়ে গেল ও।

দূর থেকে ওকে দেখে হেঁকে উঠল রহিম সরদার, ‘ক্যাডারে? নুরা নাকি? ঠিক আছোস তুই?’

‘হ চাচা, ঠিকই আছি।’ একটু ইতস্তত করে উত্তরটা দিল নুরু, মনে মনে একটু ঘাবড়ে গেছে। রহিম সরদারকে দলের পুরোভাগে আশা করেনি ও, কারণ কয়েক দিন আগে শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিল লোকটা। ফিরেছে যে, তা নুরু জানত না। বদমেজাজি লোকটাকে একটু ভয়ই পায় ও। রহিম সরদার ভালর ভাল, খারাপের যম। রেগে গেলে দু’চারটা চড়- থাপ্পড়ও দিয়ে বসতে পারে। ওই লোকের পেল্লায় হাতের চড় খেলে আর দেখতে হবে না। একবার ওর ঝোঁক চাপল যে সত্যিই বাঘ এসেছিল দাবি করে বসে। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নাকচ করে দিল চিন্তাটা। অভিজ্ঞ লোক রহিম সরদার, আর সঙ্গে জব্বার আলী বুড়োও আছে। বাঘের চিহ্ন খুঁজে না পেলে ও যে মিথ্যা বলছে, ঠিকই তা বুঝে যাবে ওরা। আরও বেশি রেগে যাবে। তখন আর শুধু চড়-থাপ্পড় দিয়ে রেহাই দেবে না। কে জানে, গ্রামে নিয়ে হয়তো সালিশই ডেকে বসবে!

বিষয়টা নিয়ে বেশি ভাবনা-চিন্তা করার সুযোগ মিলল না নুরুর। দ্রুতই ওর কাছাকাছি চলে এল দলটা। ‘কী ব্যাপার, নুরা? মামা আইছিল? কিছু নিছে নাকি?’ হাঁপাতে হাঁপাতে প্রশ্ন করল হারুন মিয়া। এই মুহূর্তে বাঘের মুখোমুখি হতে হবে না বুঝতে পেরে হম্বিতম্বি বেড়ে গেছে তার।

‘হ, নুরু ভাই, কিছু খোয়া গেছে নি?’ ওর বছর দুয়েকের ছোট আউয়ালও কৌতূহল প্রকাশ করল।

রহিম সরদার অবশ্য প্রশ্ন করার ধার ধারছে না। দলের লোকজনকে নুরুর গরু-মোষগুলো জড় করতে বলল সে। গোটা বারো পশু চরায় নুরু। ও একাই ওগুলোকে সামলাতে পারে। এতগুলো লোকের পক্ষে ওই কটা জন্তু পাকড়াও করা কোনও কাজই নয়। তবু বাঘের উপস্থিতি বলে কথা।

‘আসলে, কাকা,’ রহিমকে অন্যদিকে মন দিতে দেখে হালে পানি পেয়েছে নুরু, জব্বারকে উদ্দেশ্য করে বলল ও, ‘হইছে কী জানেন…

‘কী?’ বকের মত গলা বাড়িয়ে ওর দিকে ঝুঁকে এল বুড়ো। কৌতূহল তারও কম নেই।

‘আসলে…’ আমতা আমতা করতে লাগল নুরু, ঠিক কী বলবে সাজিয়ে নিতে চেষ্টা করছে।

‘ধুর, মিয়া, তাত্তারি কও তো, কোন্ দিকে গেছে মামাডা?’ পাশ থেকে তাড়া লাগাল একজন।

‘আসলে মামা আসেই নাইক্কা!’ হড়বড় করে বলে ফেলল নুরু।

তিন

দিন তিনেক পরের কথা। মেজাজ খারাপ করে সেদিনের ওই গাছটার নিচে বসে আছে নুরু। আসলে গত তিন দিন ধরেই মাথাটা গরম হয়ে আছে ওর। সামান্য একটা মজাও বোঝে না এই গাঁয়ের লোকগুলি। ছেলেবেলায় একবার দূরের এক গঞ্জে বেড়াতে গিয়েছিল নুরু। ওখানে দেখেছে যে মানুষ গাঁটের পয়সা খরচ করে ভাঁড়ামি দেখে। ঠকার জন্য ইচ্ছা করে টাকা ফেলে শহুরে বাবুরা! আর ওর নিজের গ্রামের গেঁয়ো ভূতের দল! একটু তামাশা করেছে বলে ওই দিন ওকে কান ধরে ওঠা-বসা করিয়েছে রহিম সরদার। বলেছে ফের এমন হলে মেরে হাড় গুঁড়ো করে দেবে! ব্যাটার যেমন মোষের মত শরীর, মারলে হাড় গুঁড়ো হয়ে যাবারই কথা।

বেগতিক দেখে অবশ্য যুক্তি দিয়ে ব্যাটাদের বোঝাতে চেয়েছিল ও। কিন্তু সেকথাও কেউ কানে তোলেনি। তুলবেই বা কেন? কতক্ষণে সাহায্য আসে এটা যাচাই করার জন্য ‘বাঘ এসেছে’ এহেন মিথ্যা সংকেত দেবার যুক্তি ধোপে টেকার কথা নয়।

তবে ওর নামও নুরু! শোধ না নিয়ে ছাড়বে না। আর কিছু না হোক, ওই রহিম সরদার আর তার চেলাদেরকে বেগার খাটাবে ও। তার জন্য যদি নিজের বিপদ হয়, তাও সই! অবশ্য ধরা না পড়লে আবার বিপদ কী! যেমন ভাবা, তেমন কাজ। আজ আটঘাট বেঁধেই এসেছে ও। গরু-মোষ আনেনি আজ। আগের দিন ওগুলো এক বন্ধুকে বুঝিয়ে দিয়ে বলছে, ও দূরের এক গাঁয়ে বেড়াতে যাবে আজ। তারপর ঘুরপথে এদিকে এসে ঘাপটি মেরে বসে আছে। উদ্দেশ্য আর কিছুই না। সন্ধ্যার আগে আগে শিঙ্গা ফুঁকে বাঘ আসার সংকেত দেবে ও। ওই সংকেত পেলে খোঁজ নিতে না এসে উপায় থাকবে না রহিম সরদারের। তবে এইবার আর দেখা দেবে না নুরু। গাছের মগডালে উঠে লুকিয়ে থাকবে। দেখবে, ব্যাটাদের নিষ্ফল ঘোরাঘুরি করে গলদঘর্ম হবার দৃশ্য। ওটাই হবে ওদের জন্য উচিত শিক্ষা!

যেমন ভাবা তেমন কাজ। গাছটার উপরের দিকে ঘন পাতার আড়ালে নিজেকে ভাল মত লুকিয়ে বসল নুরু। তারপর যথারীতি ফুঁকল শিঙ্গাটা পর পর তিনবার!

.

রহিম সরদার বা অন্য যারা মাঠে গরু চরায়, তারা স্বপ্নেও ভাবেনি যে সেদিনের ঘটনার পর আবার কেউ এই বিষয় নিয়ে ফাজলামি করতে পারে। তাই শিঙ্গার আওয়াজ কানে যেতে সেটাকে স্বাভাবিক গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করল সবাই। এবং লাঠিসোটা নিয়ে তেড়ে গেল শব্দ লক্ষ্য করে।

দলটা যখন হাঁপাতে হাঁপাতে নেমে এল টিলা পেরিয়ে, পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন অস্ত যেতে বসেছে। কিন্তু কীসের কী! খাঁ-খাঁ করছে গোটা তল্লাট। কোথাও কেউ নেই। থতমত খেয়ে গেল ওরা।

তবে কি কেউ ছিল, কিন্তু বাঘে ধরে নিয়ে গেছে বেচারাকে?

ফিসফাস করে জল্পনা-কল্পনা শুরু করল সবাই।

বল্লমে ভর দিয়ে ভুরু কুঁচকে দাঁড়াল রহিম সর্দার। কী যেন ভাবছে।

‘কী চিন্তা করো, রহিম ভাই?’ জানতে চাইল দলের একজন।

‘শিঙ্গাডা বাজাইল কেডা?’ আপন মনে মাথা নাড়ল রহিম সরদার। তারপর সবাইকে বলল এলাকাটা তল্লাশি করার জন্য। বাঘের পায়ের ছাপ বা অন্য কোনও চিহ্ন চোখে পড়ে কি না দেখতে হবে।

‘ভালা কইরা দেখ, ভাইয়েরা, মামায় নিয়া থাকলে রক্তের দাগ থাইকবো!’ সবাই যাতে শুনতে পায় তাই চেঁচিয়ে বলল জব্বার আলী।

গাছের উপর থেকে ওদের কাণ্ড দেখে দাঁত কেলিয়ে হাসছে তখন নুরু। ও যতটা

ও যতটা ভেবেছিল, বিষয়টাকে তারচেয়েও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে জনতা। দেবেই তো, তারা তো আর জানে না যে বাঘের আগমনের ব্যাপারটা ভুয়া। অবশ্য ওদের ছুটোছুটি করাটাই সার হবে, কারণ বাস্তবে তো আর কোনও বাঘ আসেনি!

‘এইবার মজা বুঝ!’ নিজের মনেই বিড়বিড় করল নুরু। ‘ওই দিন মজা করছিলাম হেইডা ভাল্লাগে নাই, এখন?’ পুরো ব্যাপারটার সার্থকতা চিন্তা করে পারলে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিত ও।

ওদিকে সবাই খোঁজাখুঁজিতে ব্যস্ত হলেও রহিম সরদার কিন্তু তাতে যোগ দেয়নি। সন্দেহ দানা বেঁধেছে তার মনে। এমনিতেই কেউ আসে না এদিকটায়, তাও ধরা যাক কেউ এসেছে, কিন্তু তা হলে তার গরু-মোষ কোথায় গেল? রাখাল ছাড়া অন্য কারও তো শিঙ্গা নিয়ে চলাফেরার করার কথা না। আর গরু চরানো ছাড়া অন্য কী কাজ থাকতে পারে বিজন জায়গাতে?

ওই দিন নুরুর ভাবগতিক ভাল ঠেকেনি তার, হয়তো আবার মস্করা করেছে ছোকরা। যদিও সেই সাহস ওর হবার কথা না, কিন্তু বলা যায় না। নুরু বা অন্য কেউ যদি শয়তানি করে ওই শিঙ্গা ফুঁকে থাকে, তা হলে খুব সম্ভব এদিকেই কোথাও লুকিয়ে আছে সে। কারণ গাঁয়ে ফেরার পথে গেলে দলের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়ে যেত। আর এই ভর সন্ধ্যায় বনের মধ্য দিয়ে ঘুরপথে বাড়ি ফেরাটা যে কারও জন্য অস্বাভাবিক। আর এদিকে যদি কেউ লুকিয়েই থাকে, তার জন্য আদর্শ জায়গা হচ্ছে ওই বড় ঝাঁকড়া গাছটা। সাতপাঁচ ভেবে সিদ্ধান্ত নিল রহিম সরদার। যেই ভাবা, সেই কাজ, বল্লমটা মাটিতে গেড়ে গাছ বেয়ে ওঠা শুরু করল সে।

এদিকে এমন কিছু ঘটতে পারে, সেটা হিসাব করেনি নুরু। ও ভেবেছিল, কাউকে না দেখে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ গজগজ করে বিদায় নেবে দলটা। তার বদলে এমন আতিপাতি করে পুরো এলাকা খুঁজে দেখবে, এমনকী গাছেও চড়বে, তাও আবার রহিম সরদার স্বয়ং, এমনটা ওর মাথায় খেলেনি। নুরু যতটুকু চিনত, তাতে করে ভেবেছিল পেশিসর্বস্ব বোকা কিসিমের লোক রহিম সরদার। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বাস্তবে ঘটে যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে লোকটা 1

আর লুকিয়ে থেকে লাভ নেই বুঝতে পেরে পাতার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ও। মনে মনে নিজেকেই গাল দিচ্ছে। উচিত ছিল শিঙ্গাটা বাজিয়েই ঘুরপথে চম্পট দেয়া। তা হলে আর এই বিপদে পড়তে হত না।

গতবারের সাক্ষাতে যেখানে ছিল উদ্বেগ, এবার সেখানে জায়গা করে নিল রাগ। নুরুকে দেখেই গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচিয়ে সবাইকে ডাকল রহিম সরদার। ওরা গাছ থেকে নামার আগেই নিচে জড় হলো সবাই। হতাশ চোখে লক্ষ্য করল নুরু, একটা মুখও বন্ধুভাবাপন্ন নয়। মনে মনে আবার নিজের বোকামির জন্য শাপশাপান্ত করল ও নিজেকে।

এদিকে রাগে ফেটে পড়েছে জনতা। এই মিথ্যা সংকেত দেয়াটা কী ধরনের ফাজলামি, সেই কৈফিয়ত চাইছে সবাই। নুরু মাটিতে স্থির হয়ে দাঁড়াতেই ওর গালে কষে এক চড় বসিয়ে দিল রহিম সরদার। নুরুর মনে হলো মুগুর দিয়ে বাড়ি মারা হয়েছে ওকে। চোখের কোণ দিয়ে পানি বেরিয়ে এল ব্যথার চোটে। অনুভব করল ফেটে গেছে ঠোঁটের একপাশ।

তবু ওর কপাল ভালই বলতে হবে। ওই একটা চড়ই যা, এরপর আর কেউ গায়ে হাত তুলল না ওর। তবে তাই বলে ভর্ৎসনা করার বেলায় কেউ কারও থেকে কম গেল না। বিষয়টা নিয়ে শীঘ্রিই সালিশ বসবে গাঁয়ে, এই মর্মে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দল বেঁধে বিদায় নিল সবাই। ততক্ষণে পেরিয়ে গেছে সন্ধ্যা। কিন্তু তবু একবারের জন্যও নুরুকে সঙ্গে যেতে বলল না কেউ।

স্তব্ধ হয়ে বনের প্রান্তে একা দাঁড়িয়ে রইল নুরু। চড় খেয়ে ব্যথায় মুখের বাম পাশ টনটন করছে ওর। কিন্তু মনের মাঝে যে জ্বলুনি হচ্ছে, তার তুলনায় ওটা কিছুই না। নিজের দোষটা সহজে চোখে পড়ে না মানুষের, কথাটা নুরুর বেলাতেও সত্যি। ওর সঙ্গে কী করা হয়েছে, সেটাই নজর কাড়ছে ওর। কিন্তু নিজে কী করেছে, সেটা বেমালুম ভুলে গেছে। আরও বেশ কিছুক্ষণ পর ও যখন গাঁয়ের পথ ধরল, ততক্ষণে আকাশের কোণে দেখা দিয়েছে চাঁদ। তার ম্লান আলোয় পথ চলতে চলতে জেদের সঙ্গে ভাবল নুরু, এখানেই শেষ নয়! আরও নিখুঁত কায়দা করে কাজ সারবে পরের বার। খাটিয়ে রহিম সরদারের হাড় কালো না করলে ওর শান্তি হবে না! কিন্তু এইসব ভাবতে ভাবতে পথ চলার সময় ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করল না, অদূরেই বনের প্রান্তে ঝোপের মধ্য থেকে ওর উপর নজর রাখছে জ্বলজ্বলে একজোড়া চোখ।

প্রচণ্ড ক্ষুধা সেই চোখের মালিকের পেটে!

চার

দুই দিন পরের কথা। আগামীকাল নুরুর বিচারের জন্য সালিশ বসবে। এর আগেই ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলতে হবে ওকে। যদিও এবার আর ধরা পড়ার ঝুঁকি নেবে না। তবুও কোনও কারণে যদি আবার ধরা পড়েও যায়, সালিশের আগে হলেই ভাল সেটা। কারণ একবার রায় দিয়ে দিলে এটা গোটা গ্রামের মাথাব্যথা হয়ে যাবে। এখন ওর এই ‘বাঘ এসেছে! বাঘ এসেছে!’ খেলার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে উত্তম-মধ্যম দেয়ার থেকে বেশি আর কিছু করতে পারবে না রহিম সরদার বা তার দলের লোকেরা, কিন্তু সালিশের কথা ভিন্ন। তাই যা করার আগেই করে নিতে চাইছে নুরু। হয়তো এবারেও ধরা পড়লে শাস্তি কিছু বাড়বে, কিন্তু তাতে এমন কিছু ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। এত কিছু ভাবতে পারল অথচ ওই হঠকারী কাজটা করা থেকে বিরত থাকার চিন্তা একবারও এল না ওর মাথায়। সত্যিই মানুষের মতিগতি বোঝা দায়!

 

 

আজও সন্ধ্যার কিছু আগে সেই গাছের নিচে এসে দাঁড়াল নুরু। ‘দেখি আজ কে আমাকে ধরে! যত্তসব বেরসিকের দল!’ বিড়বিড় করে কথাটা আউড়ে, অভ্যস্ত ভঙ্গিতে শিঙ্গা ফুঁকল ও। তারপর ঘুরেই দ্রুত পা চালাল বনের দিকে। উদ্দেশ্য: কেউ আসার আগেই বনে ঢুকে যাবে। তা হলে আর ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকবে না। খুঁজতে এসে খামোকাই হয়রান হবে রহিম সরদার আর তার চেলারা। কাজের কাজ কিছুই হবে না। তারা সন্দেহ করতে পারলেও প্রমাণ করতে পারবে না, তা ছাড়া ওর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নতুন করে তেমন কিছু যোগও করবে না। বিচারে তেমন কিছু হবে না ওর। কারণ এই ঘটনার আগ পর্যন্ত গ্রামে বেশ একটা সুনাম ছিল ওর, তার উপর এতিম বলে এমনিতেই মানুষের সহানুভূতি আছে ওর উপর। হয়তো কিছু জরিমানা করা হবে। তা হোক গে। কিন্তু ব্যাটাদের তো খাটিয়ে মারা যাবে!

বনের সীমানার কাছে পৌঁছে একবার ফিরে দাঁড়িয়ে পেছন পানে চাইল নুরু। নাহ্, এখনও কারও টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য যাবার কথাও না। লোকজন জড় হয়ে আসতে যতটা সময় লাগে, ততক্ষণ পার হয়নি এখনও। তবে আর বেশি দেরি করাটাও ঠিক হবে না। ভেবে যেই আবার বনের দিকে ঘুরেছে, অমনি জায়গায় বরফের মত জমে গেল নুরু। অস্ফুট একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল ওর গলা চিরে। ভয়ে, বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছে মুখটা।

গজ পঞ্চাশেক সামনে চোখে পড়ছে একটা ঝোপ। সেই ঝোপের ভেতর থেকে ধীর গতিতে বেরিয়ে আসছে কী ওটা!

‘মামা!’ মৃদু কণ্ঠে উচ্চারণ করল নুরু। সমস্ত শরীর যেন জমে গেছে ওর।

বিশালদেহী হলদে জানোয়ারটা পুরোপুরি বেরিয়ে এল ঝোপ ছেড়ে। শেষ বিকেলের রক্তিম আলোয় অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে ওটার ডোরাকাটা দেহটাকে। সবুজাভ চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে নুরুর উপর। সন্তর্পণে ওর দিকে এক পা এগোল ওটা। তারপর আরেক পা।

নুরুর পায়ে যেন শেকড় গজিয়ে গেছে! চেষ্টা করেও নড়তে পারছে না ও। বনের ধারে বাস হলেও আগে কখনও এরকম সামনা-সামনি ৰাঘ দেখেনি ও। বাঘে খেয়ে যাওয়া গরু দেখেছে কয়েকবার। পায়ের ছাপও চোখে পড়েছে। গঞ্জে গিয়ে একবার সার্কাসের খাঁচায় বন্দি বাঘও দেখেছিল। কিন্তু বনের বাঘের সামনে এই প্রথম। কিংকর্তব্য স্থির করতে পারছে না নুরু। এমন সময় হঠাৎ গলায় ঝুলানো শিঙ্গাটা হাতে ঠেকল ওর।

তাই তো! একটু আগেই তো তিনবার ফুঁকেছে ওটা। এতক্ষণে তো চলে আসার কথা রহিম সরদার আর তার দলবলের। একটু আগেই যাদের কাছ থেকে পালাতে যাচ্ছিল, এই মুহূর্তে সেই তাদেরই আগমনের জন্য কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা শুরু করল ও। আর কতক্ষণ লাগবে ওদের পৌঁছতে? আবার শিঙ্গা ফুঁকে দেখবে নাকি, যদি তা হলে তাড়াতাড়ি আসে?

বাঘটা এখনও স্থির দাঁড়িয়ে আছে। কেন যে ওটা সময় নিচ্ছে, তা নুরু জানে না। কিন্তু দেরি করছে বলে মনে কিছুটা আশা জাগছে ওর। হয়তো সময় মত এসে পড়বে রহিম সরদার। খুব ধীরে ধীরে শিঙ্গাটাকে আবার মুখের কাছে তুলল ও। মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্যেও বাঘটার উপর থেকে চোখ সরাচ্ছে না।

.

পর পর তিনবার শিঙ্গা বাজার মানে বাঘ এসেছে। এই তল্লাটে এটা এক অলিখিত নিয়ম। কিন্তু গত কয়েক দিনে নিয়মের ব্যতিক্রম কম হয়নি। তাই এবারও যখন টিলার অপর পাশ থেকে বেজে উঠল শিঙ্গা, দেখতে যাবার কোনও দরকার নেই বলে সিদ্ধান্ত দিল রহিম সরদার। ‘ওই নুরু ছ্যামড়ার কাম এইডা!’ জোর গলায় ঘোষণা করল সে। ‘হালার বাইচলামি কাইলকা সালিশের সময় বাইর করুম! তোমাগো ওই দিক কান দেওনের কাম নাই!’

অন্য সবাই সমর্থন জানাল তার এই সিদ্ধান্তকে।

কিছুক্ষণ পর একই দিক থেকে আবারও শোনা গেল শিঙ্গার শব্দ। তবে এবারে মাত্র একবার।

‘ওই দ্যাখ, আমরা কেউ যাই নাই দেইখা হালায় আবার বাজায়! বদমাইশ জানি কোনেকার!’ মুখ খিঁচিয়ে গাল দিল সাদেক নামের একজন।

‘কান দিস না!’ অন্য একজনের সংক্ষিপ্ত জবাব।

যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল রাখালেরা। সন্ধ্যায় সব গরু-মোষ জড় করে গুনতে হয়, তারপর বাড়ি ফেরার পালা। সেদিকে মন দিল সবাই।

.

শিঙ্গার শব্দ কানে যেতেই ভয়ানক বেগে নুরুর দিকে ধেয়ে এল বাঘটা। আঁতকে উঠে প্রাণপণে উল্টো দিকে ছুট দিল নুরু। শিঙ্গায় দ্বিতীয় ফুঁ দেবার আর সুযোগ পেল না।

কথায় আছে জানের মায়া বড় মায়া। এমনিতেই বেশ ভাল দৌড়াতে পারে ও, তার উপর এখন ভয় আর জীবনের প্রতি টান বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ওর গতি। কিন্তু, বাঘের সঙ্গে দৌড়ের পাল্লায় মানুষের কোনও আশা থাকে না। ওর বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হলো না। ক্রমশ কমে আসতে লাগল দুইয়ের মাঝের দূরত্ব।

বাঘটা যখন আর মাত্র গজ দশেক পেছনে, আর দুই লাফেই ওর নাগাল পেয়ে যাবে, তখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মত ঘাসের সঙ্গে পা জড়িয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল নুরু। আগের গতিবেগের কারণে বেশ কিছুদূর পিছলে গেল দেহটা। হাঁচড়েপাঁচড়ে ওঠার চেষ্টা করল ও, কিন্তু পারল না। বেকায়দায় পড়ে বাজেভাবে মচকে গেছে ওর ডান পা। কিন্তু এতক্ষণে তো বাঘটার ওর ওপরে এসে পড়ার কথা!

শরীর মুচড়ে বহু কষ্টে চিত হলো নুরু। এবং মুখোমুখি হলো এমন এক দৃশ্যের, যার কোনও ব্যাখ্যা দাঁড় করানো ওর পক্ষে অসম্ভব।

পাঁচ

ক্ষুধা! ইদানীং ক্ষুধার জ্বালায় বড্ড কষ্ট হয় মনসা তান্ত্রিকের। ব্রত গ্রহণের ফলে এবং নিজের অলৌকিক শক্তি ধরে রাখার জন্য একমাত্র মাংসাশী জন্তুর কলজে ছাড়া আর কিছু খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ তার জন্য। কিন্তু মাংসাশী জীব টাকায় ষোলোটা মেলে না! এটা ঠিক যে সাধারণ মানুষের তুলনায় তার চাহিদা বহুগুণে কম। সাধনা করে অল্প খাদ্যে জীবন ধারণের ক্ষমতা অর্জন করেছে সে। কিন্তু কমেরও তো একটা সীমা আছে! আগে, বয়সকালে দেহে শক্তি ছিল অফুরান, এখন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তন্ত্রমন্ত্রের শক্তি বাড়লেও দৈহিক শক্তি কমে গেছে তার। আর তার খাবার জোগাড়ের পথে সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান অন্তরায়।

আগে বাঘ-চিতাবাঘ শিকার করা তার কাছে কোনও ঘটনাই ছিল না। বনে ঢুকে খুঁজে বের করাই যা কঠিন, তারপর মেরে নিলেই হলো। কিন্তু এখন আর ওই ভয়াবহ জীবগুলোর সঙ্গে হাতাহাতি লড়াই করার ভরসা পায় না। শক্তি আর ক্ষিপ্রতা কমে গেছে, শিকার করতে গিয়ে নিজেকেই হয়তো শিকারে পরিণত হতে হবে! তাই ইদানীং ছোটখাট জীব-জানোয়ার, যেমন শিয়াল, খাটাস অথবা পাখি, যেমন চিল, শকুন, এমনকী ঠেকায় পড়লে কুকুর, বিড়াল বা কাকের কলজে পর্যন্ত খেতে হয় তাকে। এই লজ্জা সে কোথায় রাখবে? আর ওইসব পুঁচকে প্রাণীর কলজেতে না আছে স্বাদ, আর না ভরে পেট! তবু, বাঁচতে তো হবে!

আসলে সমস্যাটা পাকিয়ে তুলেছে বনের এক উপদেবতা। বছর দুই আগে তার পেয়ারের একটা বাঘিনীকে মেরে আয়েস করে ওটার কলজে খাচ্ছিল মনসা তান্ত্রিক। সে কি আর ছাই জানত ওটা উপদেবতার প্রিয় জানোয়ার? রেগে গিয়ে তাকে অভিশাপ দিয়েছে ওই দেবতা। বনের মধ্যে এখন আর ওই জাদুশক্তি কাজ করে না। আর তাই হাতাহাতি করতে হয় হিংস্র শ্বাপদের সঙ্গে!

কত দিন হয়ে গেল পেট পুরে খায় না সে!

শুকিয়ে প্যাকাটি মেরে গেছে একদা হৃষ্টপুষ্ট দেহটা!

ক্ষুধা, বড্ড ক্ষুধা।

ওই দিন নুরু ছেলেটার কীর্তি দেখে হঠাৎই একটা চিন্তা মাথায় এসেছে মনসা তান্ত্রিকের। এদিকের বনের ধারে একটা বাঘ থাকে। বেশ বড় একটা মদ্দা বাঘ। ওটার কলজেটা নিশ্চয়ই বিরাট হবে আকারে। ভাবলেই জিভে পানি এসে যায়! কিন্তু বনে ঢুকে ওটাকে মারার মুরোদ নেই মনসার। তবে কোনওভাবে ওটাকে বন থেকে বের করে আনতে পারলে হয়। জাদুশক্তি ব্যবহার করতে পারলে তাকে আর পায় কে? নুরু এদিকে ঘোরাফেরা করে, ওকে দেখে বাঘটা যদি শিকার করতে আসে, তা হলেই হবে। কেল্লা ফতে!

কপালটা ভালই বলতে হবে মনসার। বাঘটা খুব সম্ভব আগেও মানুষ শিকার করেছে। ওটার হাবভাবে মানুষের প্রতি পশুদের সহজাত যে ভয়, তার নজির দেখেনি মনসা তান্ত্রিক। অন্যদিকে নুরু ছোকরা সেদিন খামোকা শিঙ্গা বাজিয়ে নিজের একমাত্র অস্ত্রটা হারিয়ে ফেলেছে।

এই শিঙ্গা নিয়েও চিন্তিত ছিল মনসা। সে জানে যে ওটা বাজালেই এসে ভিড় জমাবে রাজ্যের লোকজন। তখন আর কিছুই তার পরিকল্পনা মাফিক সারা যাবে না। কিন্তু আটঘাট বাঁধা আছে। প্রথম দিন শিঙ্গা বাজিয়ে মস্করা করার পর কাজটা অব্যাহত রাখার জন্য নিজের অশুভ ক্ষমতা খাটিয়ে বারবার নুরুকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ‘ প্ররোচিত করেছে মনসা তান্ত্রিক। আর তাই অবচেতন মনের তাগিদে নুরুও চালিয়ে গেছে ওই হঠকারিতা। ফলে এবারে আর কেউ আসবে না।

.

বাঘটা খুব সম্ভব ঝাঁপ দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এমন সময় পেছন থেকে আক্রান্ত হয়েছে ওটা। আধশোয়া অবস্থায়, বিস্ফারিত চোখে, পায়ের অসহ্য ব্যথা ভুলে নুরু দেখল, বাঘটার পিঠের ওপর লেপটে আছে মানুষ সদৃশ এক জীব।

অশুভ কী যেন একটা আছে ওটার মাঝে। কঙ্কালসার শুকনো ওটার দেহ। সন্ধ্যার ম্লান আলোতেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে চামড়ার নিচ থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসা হাড়ের সমষ্টি। চার হাত-পায়ে তীক্ষ্ণ নখ ওটার। আর সেই নখ দিয়ে খামচে ঝুলছে আছে বাঘটার পিঠে। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, বাঘটা এই অযাচিত সওয়ারকে তাড়ানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করছে না। কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে বিশাল, ভয়াবহ ওই জন্তুটা; ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে আসছে ওটার সবুজাভ চোখ দুটো।

‘হিশ্! হিশ্!’ করে জান্তব একটা ধ্বনি বের হচ্ছে বাঘের পিঠের ওই বীভৎস সওয়ারটার মুখ থেকে। টপ-টপ করে ঝরে পড়ছে লালা। দেখা যাচ্ছে টকটকে লাল এবং অস্বাভাবিক লম্বা একটা জিভ! কাঁচাপাকা, জট পড়া লম্বা চুল তার বাতাসে উড়ছে। নখগুলো যেখানে আঁকড়ে আছে বাঘের শরীর, সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে কালো, ঘন ধোঁয়ার মত কী যেন! চামড়া ভেদ করে বাঘটার শরীরেও ঢুকছে ওই জিনিস! তার প্রভাবেই কি না কে জানে, দেখতে দেখতে একেবারেই নিভে গেল বাঘটার চোখের জ্যোতি। ভারসাম্য হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল ওটা ঘাসের মধ্যে।

কয়েক মুহূর্ত পর উঠে দাঁড়াল বাঘের পিঠে সওয়ার থাকা সেই বিভীষিকাময় জিনিসটা।

হ্যাঁ, মানুষই ওটা। আবার মানুষও নয়! ওটার দিকে তাকিয়ে একটু আগে বাঘের কবলে পড়ার চেয়েও অনেক বেশি অসহায় বোধ করল নুরু। কাঁপা কাঁপা হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল গলা থেকে বুকে ঝুলন্ত শিঙ্গাটা।

কেউ এখনও আসছে না কেন?

উত্তরটা জানা থাকলেও ওর উত্তপ্ত, ভীত মস্তিষ্ক বিষয়টা অস্বীকার করছে। মনে আশা, ঠিক যেভাবে খড়কুটো ধরে বাঁচতে চায় ডুবন্ত মানুষ!

.

ঠোঁট চাটল মনসা তান্ত্রিক। ল্যাঠা চুকে গেছে। বিরাট এক বাঘ মেরেছে সে। আজ অনেক দিন পর পেট ভরে খাওয়া যাবে। খাবার নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না আগামী বেশ কিছু দিন। তবে একটা কাজ বাকি আছে। উপদেবতার মন পাওয়ার জন্য তুলা রাশির জাতকের একটা খুলি দরকার তার। লোকালয়ে হানা দিয়ে মানুষ শিকার করাটাকে নীতিগতভাবে ঘৃণা করে বলে এত দিনেও জোগাড় হয়নি জিনিসটা। গোটা দুই ডাকাত আর এক ভবঘুরে অবশ্য তার কবলে পড়েছিল। কিন্তু তাদের কারওই রাশি ঠিক ছিল না।

এই ছেলে কী রাশির, কে জানে!

একটাই উপায় আছে। দেবতার কাছে নৈবেদ্য দিতে হবে খুলিটা। সে অভিশাপ তুলে নিলে বুঝবে রাশি ঠিক ছিল। কোমর থেকে ভোজালিটা টেনে নিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল সে ভূপাতিত নুরুকে লক্ষ্য করে।

.

বাড়ি ফেরার পথে রহিম সরদার আর তার দলের লোকেরা শুনল, বহুদূরে বাজছে শিঙ্গা।

একবার, দু’বার, তিনবার, চারবার…

 

নীল চোখের রহস্য – নূরুন নিসা মুন্নি

শীতের সন্ধ্যা, চারদিকে নামছে অন্ধকার। দূর দিগন্তে শেষ আলোর রেশটুকু মিলিয়ে যাচ্ছে কুয়াশার মাঝে। প্রকৃতির এই পরিবর্তন বা সৌন্দর্য দেখার মত সময় ঢাকা শহরের ব্যস্ত মানুষের নেই। ইফা দশতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতি এবং শহর দেখে সময় কাটাচ্ছে। ওর একা-একা ভাল লাগে না, তাই সবসময় পছন্দ করে হইচই করতে। কিন্তু কার সঙ্গে হইচই করবে? তাকে সময় দেবার মত কেউ তো নেই! সারাদিন থাকে বাসায় একা। সময় কাটাতে হয় শুয়ে-বসে। বেশিরভাগ সময় কেটে যায় অতীত ভেবে। বাবা-মায়ের আদরের মেয়ে, ভাই-ভাবী, ছোট বোন অন্তু, পুকুর ঘাট, টিনের বাড়ি, উঠানের ফুলগাছ, আরও কত কিছু! কিন্তু এখন, বিয়ের পরে, উঁচু বিল্ডিং-এ ফ্ল্যাট, একাকী সংসার, মস্ত শহর, ব্যস্ত মানুষজন আর ব্যস্ত একজন স্বামী। জুয়েলের সঙ্গে ইফার বিয়ে হয়েছে ছয় মাস আগে। যেদিন বিয়ে হলো, তার পরদিনই ওরা চলে এসেছে ঢাকা শহরে। সেই থেকে ইফার একাকীত্ব শুরু…

জুয়েল খুব করিৎকর্মা মানুষ, পেশা ব্যবসা আর নেশা হলো টাকা রোজগার করা। সবসময় নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে পড়ে আছে। তাই ইফাও সুযোগ পায় না স্বামীর সঙ্গে গল্প করতে। এভাবেই দূরে রয়ে গেছে ওরা, চেনা আর হয়ে ওঠেনি একজন আরেকজনকে। জুয়েলের কথা মনে হতেই ইফা ভাবল, ওকে একবার কল করি।

দেরি হলো না মোবাইল ফোনে কল দিতে।

একবার, দুইবার, তিনবারেও কল রিসিভ করল না জুয়েল।

তার দশ মিনিট পর কল এল ইফার মোবাইলে।

‘হ্যালো!’

‘হ্যালো, হ্যাঁ, কল করেছিলে?’

‘হ্যাঁ।’

‘কেন? কোনও প্রবলেম?’

‘না।’

‘তা হলে?’

‘এমনিতেই কল করেছি।’

‘ও, আচ্ছা। আমি এখন একটু ব্যস্ত, পরে…’

‘তুমি কখন আসবে?’

‘ঠিক নেই, তুমি খেয়ে নিয়ো।’

‘আচ্ছা।’

‘ঠিক আছে, রাখি।’

স্বামী-স্ত্রীর কথা শেষ।

মন আরও বেশি খারাপ হয়ে গেল ইফার।

.

রাত বারোটায় কলিংবেলের শব্দে ঘুম ভাঙল ইফার। তাড়াতাড়ি গিয়ে খুলে দিল দরজা। জুয়েল এসেছে। সে ঘরে ঢুকতে নাকে বাজে একটা গন্ধ পেল ইফা। দেখল জুয়েলের চোখদুটো লাল। তাই জিজ্ঞেস না করে পারল না, ‘তোমার চোখ লাল কেন? আর এত বিচ্ছিরি গন্ধ কীসের?’

যেন ইফার কথা শুনতেই পেল না জুয়েল, সোজা বেডরুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়।

‘কই, বললে না যে? তোমার এ অবস্থা কেন?’

জুয়েল এবারও কোনও উত্তর দিল না।

‘আশ্চর্য! কথা বলছ না কেন? তা হলে কি তুমি…এ আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’

খুব বিরক্তির সঙ্গে জুয়েল বলল, ‘কী বিশ্বাস হচ্ছে না?’

‘তুমি কি…মদ খেয়েছ?’

খুব জোরে হেসে উঠল জুয়েল, যেন ইফার প্রশ্নটা হাস্যকর। হেসে বলল, ‘হ্যাঁ।’

এ কথা শুনে মাথায় বাজ পড়ল ইফার। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইল। নড়াচড়ার শক্তি পাচ্ছে না। বুঝতে পারছে না, এখন কী করবে। বিয়ের পর এই প্রথম জুয়েলকে এ অবস্থায় দেখছে।

.

সকাল দশটা।

জুয়েল জেগে উঠে দেখল, গতকালকের পোশাক এখনও পরনে। গতকাল রাতের কথা মনে পড়ল ওর। রুমে নেই ইফা। আওয়াজ আসছে রান্নাঘর থেকে। জুয়েল রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। ওকে দেখে সঙ্গে-সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল ইফা।

‘সরি, আই অ্যাম রিয়েলি সরি,’ বলল জুয়েল।

কিছুই বলল না ইফা। নিজ কাজে মন।

‘আসলে কালকে কিছু লোকের সাথে পরিচয় হয়েছে। তারাই জোর করে খাওয়াল। আমিও কিছু বলতে পারিনি। বোঝোই তো ব্যবসার খাতিরে অনেক কিছুই করতে হয়।’ গিয়ে পিছন থেকে ইফাকে জড়িয়ে ধরল জুয়েল।

ইফাও কোনও বাধা দিল না।

‘সরি…’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে। কিন্তু আর কখনও যেন এমন না হয়।’

‘তুমি কষ্ট পেয়েছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘আর এমন হবে না।’

‘তুমি সারাদিন থাকো না, রাতেও আসো দেরি করে। আমার একা-একা খুব কষ্ট হয়।’

‘আসলে একটা নতুন কাজ পেয়েছি। তাই একটু বেশি সময় দিতে হচ্ছে।’

‘যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো, নাস্তা দিচ্ছি।’

নাস্তা খেতে বসে জুয়েল বলল, ‘ওহো, তোমাকে তো একটা কথা বলাই হয়নি।’

‘কী কথা?’

‘আজ রাতে ঢাকার বাইরে যাচ্ছি।’

এ কথা শুনে দু’চোখ বেয়ে অশ্রু নামল ইফার।

‘আরে, তুমি কাঁদছ নাকি!’

‘কই, না তো!’ ইফা তাড়াতাড়ি মুছে ফেলল চোখের পানি। ‘কেন যাচ্ছ? ব্যবসার কাজে?’

‘হ্যাঁ।’

‘কোথায়?’

‘চিটাগাং-এ, সেখানে কিছু কাজ চলছে, সেগুলো দেখতে হবে।’

‘কাদের কাজ?’

‘কাল যাদের সাথে পরিচয় হলো।’

‘ক’দিন লাগবে?’

‘এই ধরো, তিন-চার দিন।’

‘ঠিক আছে, তোমার ব্যাগ গুছিয়ে দেব।’

.

ইফা গুছিয়ে দিল স্বামীর ব্যাগ, মনটা খারাপ। কিন্তু রাত নয়টায় যখন জুয়েল চলে গেল, আর পারল না মনটাকে সামলে নিতে। কান্নায় ভেঙে পড়ল ও। একসময় ঘুমিয়ে গেল কাঁদতে-কাঁদতে।

হঠাৎ একটা শব্দে ঘুম ভাঙল ইফার।

ঘড়িতে রাত সাড়ে বারোটা।

অস্বস্তি লাগছে ইফার। চারপাশ কেমন নিস্তব্ধ, নিশ্চুপ। ঘরটাতে যেন বহু দিনের ভাপসা, গুমট একটা ভাব। দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল ওর। মনে হলো, খোলা জায়গায় যেতে না পারলে এক্ষুণি মারা পড়বে। ঘরটাতে যেন অক্সিজেনের অভাব। কিন্তু এত রাতে কোথায় যাবে? তা ছাড়া জুয়েলও তো নেই!

হঠাৎই মনে হলো যেতে পারে ছাদে।

কিন্তু এই অন্ধকারে কি যাওয়া সম্ভব?

তা ছাড়া, ও এর আগে কখনওই ছাদে যায়নি।

আরও বাড়তে লাগল ইফার অস্বস্তি। খুব অস্বাভাবিক লাগছে সবকিছু।

নাহ্! আর থাকা যায় না গুমট ঘরে।

বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলে বেরিয়ে এল ইফা। এত রাতেও জ্বলছে সিঁড়ির লাইট। একা-একা ছাদে যেতে একটুও সমস্যা হলো না। পুরোপুরি অন্ধকার নয় ছাদ। মোটামুটি দেখা যাচ্ছে সবকিছুই। ছাদে এসে কমল অস্বস্তির ভাবটা। ফুরফুরে বাতাসে হালকা হলো মন। রেলিং-এর পাশে দাঁড়িয়ে দেখল শহরটাকে। এখন কোনও ব্যস্ততা নেই। মনে পড়ল জুয়েলের কথা। আনমনে স্বামীর কথা ভাবতে-ভাবতে চলে এল ছাদের আরেক প্রান্তে। এখানে সারিবদ্ধভাবে আছে অনেকগুলো পানির ট্যাংক। ইফা ঘুরে আরেক দিকে যাবে, এমন সময় দেখল দুই ট্যাংকের ফাঁকে সাদা কী যেন। আরেকটু কাছে যেতেই দেখল, নীল জিন্স প্যান্ট এবং সাদা ফতুয়া পরে রেলিঙে শুয়ে আছে একটা ছেলে।

ইফা ভাবল, চলে যাওয়া উচিত, কিন্তু এমন এক জায়গায় শুয়ে আছে ছেলেটা, যে-কোনও মুহূর্তে অ্যাকসিডেন্ট হবে। তাই এগিয়ে গেল ও। ‘এই যে, শুনছ?’

নারীকণ্ঠ শুনে ইফার দিকে চাইল ছেলেটা।

ইফা দেখল, সে বাচ্চা ছেলে নয়। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের যুবক।

একবার ওর দিকে তাকিয়ে আবারও আকাশে নিষ্পলক চেয়ে রইল।

ইফা দেখল, যুবকটির চোখের মণি নীল রঙের। আগের চেয়ে জোরে বলল ইফা, ‘এই যে, আমি তোমাকে বলছি তুমি কি শুনতে পাও না?

‘জী, ভালভাবেই শুনতে পাই। আপনি আমাকে তুমি করে বলছেন কেন? আমি তো আপনার পরিচিত কেউ নই।

‘তাতে কী? পরিচিত হব। আর তুমি করে বলেছি, কারণ ভেবেছি আপনি আমার থেকে ছোট। রেলিং-এর ওপর শুয়ে আছেন কেন? আপনার ভয় করছে না?’

‘না। বরং ভালই লাগছে।’

ইফা চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। এক পা বাড়াতেই পিছন থেকে যুবকটি বলল, ‘চলে যাচ্ছেন?’

রেলিং-এর ওপর উঠে বসেছে যুবকটি। ইফা বলল,

‘হ্যাঁ। কেন?’

এখানে ভাল লাগছে না?’

‘নাহ্।’

‘আকাশ ভাল লাগছে না?’

‘না।’

‘খোলামেলা এই মুক্ত বাতাস ভাল লাগছে না?’

‘না।’

‘আমাকে ভাল লাগছে না?’

‘আশ্চর্য, আপনি এত প্রশ্ন করেন কেন?’

‘আপনি যে এত প্রশ্ন করছিলেন, আমি কি তখন এত

প্রশ্ন করেছি?’

‘এত প্রশ্ন করেন কেন? আপনি কে?’

‘আবারও প্রশ্ন করছেন?’ হাসল যুবক। এ কথা শুনে হেসে ফেলল ইফা।

.

সকাল আটটা।

প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙল ইফার। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর মনে পড়ল গতকাল রাতের ঘটনা। বুঝল না ওটা সত্য না স্বপ্ন। সারাদিন নিজেকে ব্যস্ত রাখাল ইফা। কিন্তু গতকাল রাতের ঘটনাটা দ্বিধায় ফেলেছে ওকে। মনে জমছে হাজারো প্রশ্ন। সব প্রশ্নের শেষ প্রশ্ন হলো, সত্য না স্বপ্ন?

রাত বারোটায় আপনা-আপনি ভাঙল ইফার ঘুম। বিছানায় বসে অস্বস্তিতে ভুগতে লাগল। আবারও গতকাল রাতের মতই মনে হলো, ঘরটা বড় গুমট। লাগছে ভাপসা গরম। বন্ধ হয়ে আসছে দম। শ্বাস নিতে পারছে না। ঘেমে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। একটু ঠাণ্ডা বাতাসের জন্য বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় গেল ইফা। কিন্তু তাতে কোনও লাভ হলো না। দেখল বাইরে ভারী কুয়াশা, তবুও লাগছে গরম। কিছুক্ষণ বারান্দায় থাকার পর বুঝল, এখানে থাকলে স্রেফ দম বন্ধ হয়ে মরবে ও। তাই তাড়াতাড়ি রওনা দিল সিঁড়ির উদ্দেশে।

ছাদে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর কমে গেল ইফার অস্বস্তি। কিছুক্ষণ পর ফিরবে, এমন সময় মনে হলো, যা-ই গিয়ে দেখি সেই যুবক আজকেও ওখানে আছে কি না!

হ্যাঁ, আছে। আগের রাতের মতই শুয়ে আছে রেলিং-এ। ইফা চুপচাপ চলে যাচ্ছিল, পিছন থেকে যুবকটি বলল, ‘চলে যাচ্ছেন নাকি?’

চমকে উঠল ইফা। ‘আপনি কীভাবে জানলেন আমি এসেছি?’

‘আকাশের তারা দেখে।’

‘মানে?’

‘মানে, এখন আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, ঠিক তার ওপরের তারাটিতে আপনার ছায়া পড়েছে।’

ইফা একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি কি পাগল?’

‘পাগল হতে যাব কেন? পাগলের কি এই ক্ষমতা থাকে?’

‘তা হলে কী? ম্যাজিশিয়ান?’

‘অনেকটা তা-ই বলতে পারেন,’ এ কথা বলে রেলিং-এ উঠে বসল যুবক। ‘দূরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন, কাছে আসুন। আপনার সাথে একটু কথা বলি। আচ্ছা, আপনি কি আমাকে ভয় পাচ্ছেন?’

‘সম্ভবত।’

‘কেন?’

‘আমার মনে হচ্ছে আপনি অদ্ভুত টাইপের মানুষ। রেলিং-এ শুয়ে থাকেন, তা-ও আবার নিশ্চিন্ত মনে। কারও আসার খবর পান, তা-ও আবার আকাশের তারা দেখে।’

এ কথা শুনে হেসে ফেলল যুবক। ‘কাছে আসতে পারেন। কোনও ভয় নেই।’

ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেল ইফা। ‘আপনি কে?’

‘আমি? আমি…হয়তো আপনার, কাছের কেউ, কিংবা হয়তো কেউ ছিলাম না।’

‘মানে?’

‘মানে তো বুঝবেন না। আমাকে পলাশ বলে ডাকতে পারেন।’

‘কী করেন আপনি?’

‘যখন মন যা চায়, তা-ই খুঁজে বেড়াই।’

‘আপনি খুব জটিল কথা বলেন। আচ্ছা, আপনি কি প্রতি রাতে এখানে আসেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘কেন আসেন?’

‘বন্ধুদের সাথে মনের দুঃখ শেয়ার করতে।’

‘বন্ধু? কোথায় আপনার বন্ধুরা?’

‘এই যে তারা ভরা রাতের আকাশ, খোলা বাতাস, নির্জন রাত-এরাই তো বন্ধু। তা-ই তো ভাল।’

‘আচ্ছা, আপনার দুঃখটা কী?’

‘সরি, এটা পার্সোনাল সাবজেক্ট।’

‘আকাশ, বাতাস, নির্জন রাত-এদের সাথে দুঃখ শেয়ার করলে তারা কি বোঝে?’

‘হ্যাঁ, খুব ভালই বোঝে। জানেন, ইফা, একটা মানুষের দুঃখ একটা মানুষের চাইতে প্রকৃতিই ভাল বুঝতে পারে।’

‘আচ্ছা, আপনি কী করে জানলেন আমার নাম ইফা?’

‘ওই যে বললাম, সম্ভবত আমি ম্যাজিশিয়ান।’

‘হাউ ইন্টারেস্টিং! আপনি আর কী-কী জানেন কিংবা কী-কী পারেন?’

‘বলুন এখন আপনার কী মনে হচ্ছে?’

‘আপনি তো ম্যাজিশিয়ান, আপনিই বলুন দেখি?’

‘আপনার এখন মন চাচ্ছে…’ চুপ হয়ে গেল যুবক। ‘হ্যাঁ, বলুন আমার মন এখন কী চাচ্ছে?’

‘আপনার মন চাচ্ছে…আকাশে উড়তে।’

রীতিমত অবাক হয়ে গেল ইফা। বলল, ‘আপনি কী করে বলতে পারলেন? আপনি সত্যি-সত্যি বলেছেন। পারলেন কী করে? আপনি সত্যি আমাকে আকাশে ওড়াতে পারবেন?’

‘হ্যাঁ, না পারার কী আছে?’

‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’

‘ঠিক আছে, চলুন, আপনাকে নিয়ে ঘুরে আসি।’

‘আপনি ফান করছেন।

‘আপনি এসে হাত ধরেই দেখুন না।’

‘না, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’

পলাশ এগিয়ে যেতেই দু’পা পিছিয়ে গেল ইফা।

 

 

‘আরে, পিছিয়ে যাচ্ছেন কেন?’

‘আমার ভয় করছে।

‘ভয়ের কিছু নেই। আমার হাতটা ধরুন।’

ইতস্তত করতে লাগল ইফা।

‘কী হলো, ধরুন আমার হাত।’

খুব সংকোচের পর হাতটা ধরল ইফা।

ইফাকে নিজের কাছে টেনে নিল পলাশ। পিছনে দাঁড়িয়ে নিজের দু’হাতে ধরল ইফার দু’হাত। ‘এবার চোখ বন্ধ করুন,’ ফিসফিস করে বলল ইফার কানে।

কিছু বলতে গিয়েও বলল না ইফা। ভয়ে-ভয়ে চোখ বন্ধ করল। দুই সেকেণ্ড পর অনুভব করল, পায়ের নিচ থেকে যেন সরে গেল ছাত। পায়ের নিচে এখন কিছুই নেই! চোখ খুলতে গিয়েও ভয়ে খুলতে পারল না ইফা। নিজেকে কেমন যেন ওজনশূন্য লাগছে। চোখ বন্ধ করেই বুঝতে পারছে, ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।

‘ইফা?’

‘হুঁ?’

‘কেমন লাগছে?’

‘জানি না।’

‘চোখ খুলুন।

‘ভয় লাগছে।’

‘ভয় পাবেন না। আমি আছি আপনার সাথে। এই মুহূর্তে আমি আপনার সবচেয়ে আপন।

ধীরে-ধীরে চোখ খুলল ইফা। যা দেখল, সত্যিই অবাক হলো। অনেক নিচে কুয়াশার স্তর এবং তারও অনেক নিচে ঘুমন্ত পৃথিবী! ওপরে আকাশের তারা অনেক কাছে। যেন আরেকটু উঠলে ছুঁয়ে দিতে পারবে হাত দিয়ে। আজ আকাশে কোনও চাঁদ নেই।

‘ইফা, কেমন লাগছে?’ ফিসফিস করে জানতে চাইল পলাশ।

‘ভয় লাগছে, যদি পড়ে যাই।’

এ কথা শুনে ইফাকে জড়িয়ে ধরল পলাশ। ‘এখন কেমন লাগছে? পড়ে যাবার ভয় পাচ্ছেন?’

‘না। আশ্চর্য রকম ভাল লাগছে।

‘কী মনে হচ্ছে এখন নিজেকে? ‘

‘মনে হচ্ছে পাখির মত স্বাধীন, যার মনে কোনও দুঃখ নেই। যার জীবনে কোনও বাধা নেই। পলাশ, নিজেকে মুক্ত মনে হচ্ছে আমার।’

‘চলুন, এখান থেকে আমরা চলে যাই।’

চোখ বন্ধ করল ইফা। নেমে আসছে আস্তে-আস্তে। কতক্ষণ লাগল জানে না, যখন চোখ খুলল, দেখল ওকে জড়িয়ে ধরে রেলিং-এ বসে আছে পলাশ।

নিজেকে ছাড়াতে গিয়েও পারল না ইফা। কিছু বলতেও পারল না। যেন ও-ও চাইছে ওকে ধরে রাখুক পলাশ। চাইল অসহায়ের মত পলাশের দিকে।

চোখ বন্ধ করে আছে পলাশ। ধীরে খুলল চোখের পাতা। ঝিকঝিক করছে নীল মণি।

.

সকালে নাস্তা খেতে-খেতে হঠাৎ গত রাতের কথা মনে পড়ল ইফার। আবারও পড়ে গেল দ্বিধার মধ্যে। একবার মনে হয় স্বপ্ন, কিন্তু এত বাস্তব লাগে, স্বপ্ন বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর ওসব সত্যি ভাবতে গেলেই শিউরে ওঠে গা। আকাশে উড়ে বেড়ানো কী করে সম্ভব?

যাই, দিনের বেলায় গিয়ে দেখে আসি ছাদটা আসলে দেখতে কেমন, ভাবল ইফা। ছাদে যাবে এমন সময় বেজে উঠল মোবাইলটা।

জুয়েলের ফোন।

‘হ্যালো?’

‘হ্যালো, ইফা; কেমন আছ?’

‘ভাল। তুমি কেমন আছ?’

‘ভাল। তোমার কোনও প্রবলেম হচ্ছে না তো?’

‘না, তবে খুব বেশি একা লাগে।’

‘আর ক’টা দিন ধৈর্য ধরো, তারপর তো আমি চলে আসছি।’

‘আর ক’টা দিন মানে? তুমি দু’দিনের মধ্যে আসতে পারবে না?’

‘অবশ্যই আমি চেষ্টা করব। তোমার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো?’

‘না, অসুবিধে হচ্ছে না। ‘

‘আচ্ছা, আমি তা হলে এখন রাখি।’

‘তুমি ভাল হয়ে থেকো কেমন?’

‘আচ্ছা।’

সারাদিন জুয়েলের কথা ভেবে কাটল ইফার। কিন্তু রাতে শোবার আগে মনে পড়ল পলাশের কথা। ভয়ে বুক দুরুদুরু কাঁপতে লাগল ওর। ভাবল, নাহ্, আজ বুঝতেই হবে, যা কিছু ঘটছে, তা স্বপ্ন না সত্যি!

ঘরের দরজায় তালা মেরে চাবিটা পানির বোতলে রেখে তা রাখল ফ্রিজে। সহজে মনে পড়বে না ওটার কথা।

.

রাত প্রায় বারোটা বেজে পাঁচ মিনিট

এসময় কিছু একটা পড়ে যাবার শব্দে ঘুমটা ভাঙল ইফার। উঠে বসল বিছানায়। বাইরের বাতির আলোতে ঘরটা পুরোপুরি অন্ধকার নয়। দেখল শোকেস থেকে পড়ে গেছে ফ্লাওয়ার ভাস।

উঠে ভাঙা টুকরো তুলতে গিয়ে শুনল বাতাসে দুলছে বারান্দার দরজাটা। ওটা দেখে খুব ভয় পেল ইফা। ঘুমানোর আগে ওই দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে শুয়েছে। তা হলে কীভাবে খুলল দরজা?

আজ শোবার ঘরে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। ইফা উঠে দরজাটা বন্ধ করবে, এমন সময় কে যেন বারান্দা থেকে ওকে ডাকল।

প্রচণ্ড ভয় পেল ইফা। খাড়া হয়ে গেল শরীরের সমস্ত রোম। কাঁপতে লাগল হাত-পা। অনেক কষ্ট করে সাহস জোগাড় করল ইফা, তারপর ভয়ে ভয়ে উঁকি দিল বারান্দায়। দেখল, পলাশ গ্রিল ছাড়া বারান্দার ওপ্রান্তে বসে আছে রেলিং-এ। খুব অবাক হলো ইফা এবং দ্বিগুণ বাড়ল ওর ভয়।

‘ইফা, ভয় পেয়েছেন?’

ইফা কাঁপতে-কাঁপতে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’

‘ভয় পাবেন না। আমি পলাশ, কাছে আসুন।’

ইফা বারান্দায় বেরোল, কিন্তু কাছে গেল না।

‘ইফা, আপনি ঘেমে যাচ্ছেন কেন? আজ ভীষণ কুয়াশা পড়েছে।’

ইফা টের পেল, সত্যি-সত্যি ঘেমে গেছে। ‘আপনি জানলেন কেমন করে যে আমি ঘেমে যাচ্ছি? আপনি তো বাইরে তাকিয়ে আছেন। আমার দিকে তো একবারও তাকাননি!’

‘অনেক কিছু না দেখেও বলে দেয়া যায়। আর অনেক কিছু বুঝে নিতে হয়।’

‘আমি সত্যি খুব অবাক হচ্ছি, আপনি এখানে এলেন কীভাবে? এ-ও কি সম্ভব?’

‘আকাশে ভেসে বেড়ানো যদি সম্ভব হয়, তা হলে এখানে আসাটা কি সম্ভব হতে পারে না?’

‘যা ঘটছে, তা কি আমার স্বপ্ন নাকি সত্যি?’

‘দেখুন, যা কিছু ঘটছে, তা হোক না স্বপ্ন কিংবা বাস্তব-এতে কী যায় আসে? যা ঘটছে ঘটতে দিন। হয়তো অনেক কিছু দেখবেন, হয়তো অনেক কিছু পাবেন কিংবা অনেক কিছু হারাবেন।’

ওর দিকে চাইল পলাশ।

ইফা দেখল নীল চোখদুটো কী সুন্দর, কী অপূর্ব! চঞ্চল করে মনকে। মনে হয়, কী যেন বুঝতে চাচ্ছে ওই নীল চোখদুটো। কিংবা কী যেন বুঝে নিচ্ছে! কী যেন বিনিময় করছে নীরব ভাষায়!

পলাশ তার নীল দু’চোখ দিয়ে ওকে সম্মোহন করছে মনে হলো ইফার। ধীরে-ধীরে ওর পরিচিত জগৎকে ভুলে অজানা এক নতুন জগতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ও।

‘ইফা, ইফা…’

‘হুঁ?’

‘এখনও কি ভয় পাচ্ছেন আমাকে?’

‘না।’

‘কাছে আসুন, ইফা।’

সম্মোহিতের মত পলাশের কাছে গেল ইফা।

‘ইফা, আপনার কেমন লাগছে?’

‘জানি না। আচ্ছা, আপনি কি সত্যি ম্যাজিশিয়ান?’

‘সম্ভবত।’

‘আপনি কি পারবেন আমার মনের দুঃখ দূর করে দিতে কিংবা ভুলিয়ে দিতে?’

‘আপনি তো এখনি অনেক দুঃখ থেকে দূরে সরে গেছেন। জানি, ইফা, আপনার মনে অনেক দুঃখ, অনেক কষ্ট এবং এ-ও জানি, আপনার দুঃখটা কীসের। আপনি আমার আরও কাছে আসুন, আমি আপনার দুঃখ ভুলিয়ে দেব।’

ইফার দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিয়েছে পলাশ। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না ইফা। পলাশকে জড়িয়ে ধরল, পলাশও জড়িয়ে ধরেছে ইফাকে।

ইফা উপলব্ধি করছে, অনেকখানি কমে গেছে মনের দুঃখের ভার। অস্থির দেহ-মনে এল পরম এক শান্তি। যেন এই শান্তি খুঁজে বেড়াচ্ছিল বহুকাল থেকে।

.

কিছুক্ষণ পর…

‘পলাশ, তুমি স্বপ্ন হয়ে আমার কাছ থেকে চলে যাবে না তো?’

‘না।’

‘তুমি কি…তুমি কি আমাকে…. ভালবাস?’

‘হ্যাঁ।’

ইফা দেখল, ওর দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে পলাশ। নীল অপূর্ব চোখদুটিতে ভালবাসা ও আবদার। চোখ বন্ধ করে নিজেকে পলাশের কাছে সঁপে দিল ইফা।

পলাশ বুঝে নিল ভালবাসায় সাড়া দিচ্ছে ইফা। ওকে কোলে তুলে নিল পলাশ।

ইফা অনুভব করল, ভেসে-ভেসে ওকে নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে পলাশ। এই অনুভব শেষ হতে না হতেই বিছানা স্পর্শ করল ওর শরীর। নিচে নরম তুলতুলে বিছানা ও শরীরের ওপরে পলাশের ঠাণ্ডা শরীরটাকে টের পেল ইফা।

.

সকালে উঠে গত রাতে কী ঘটে গেছে, বুঝতে পারল ইফা। সব মনে পড়তেই ইচ্ছা করল লজ্জায়, অপমানে আত্মহত্যা করতে। ভাবল, আমি তো প্রতারণা করেছি আমার স্বামীর সঙ্গে। অথচ ও আমাকে কত ভালবাসে, বিশ্বাস করে। না হয় সে আমাকে সময় দিতে পারে না, তাই বলে কি আমি তার বিশ্বাস ভঙ্গ করব? আমি কেন নিজেকে এভাবে সঁপে দিলাম? কেন নিজের সম্মান রক্ষা করতে পারলাম না? কেন? কেন? কেন?

সারাদিন কিছু না খাওয়াতে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ল ইফা। লাইট নিভিয়ে শুয়ে আছে পলাশের অপেক্ষায়। হঠাৎ দমকা বাতাসে খুলে গেল বারান্দার দরজা। টেবিল থেকে পড়ে ভাঙল পানির গ্লাসটা। ইফা দেখল, দরজায় দাঁড়িয়ে আছে পলাশ। ভালবাসার তৃপ্তি ও রহস্যময় অদ্ভুত কিছু খেলা করছে তার অপূর্ব নীল চোখে।

‘ইফা, তোমাকে আজ এমন দেখাচ্ছে কেন? তুমি কি অসুস্থ?’

কোনও জবাব দিল না ইফা। কাঁদছে মাথা নিচু করে।

এগিয়ে এল পলাশ।

‘তুমি কে? কেন তুমি স্বপ্নের মত শুধু রাতে আসো? তুমি কী? বাস্তব না অবাস্তব?’

‘তুমি কি দুঃখ পেয়েছ? আমি কি এমন কিছু করেছি, যাতে তোমার দুঃখ, লজ্জা, অপমান হওয়া উচিত? আমার মনে হয় তুমি তেমন কিছুই করোনি।’

‘মানে! কী বলতে চাও তুমি?’

‘আমি শুধু এটুকু বলতে চাই, যে অপরাধ জুয়েল তোমার সঙ্গে দিনের পর দিন অহরহ করে যাচ্ছে, তা কেবল একবারই করেছ তুমি। যেটাকে আমার মতে অপরাধ বলা যাবে না।’

মুহূর্তে কেঁপে উঠল ইফা। যেন ওর মাথার ওপর ভেঙে পড়েছে সমস্ত পৃথিবীটা। বুকে অনুভব করল প্রচণ্ড ব্যথা। কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘তুমি…তুমি…এসব কী বলছ? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’

খুব শান্ত কণ্ঠে পলাশ বলল, ‘ইফা, তুমি জানতে চাও আমি কে কিংবা কী। আমি বাস্তব না অবাস্তব। শুধু এটুকু বলব, তোমার পৃথিবী বড়ই রহস্যময়। বড়ই অদ্ভুত এক জায়গা। দৃশ্য-অদৃশ্যের মাঝে বা বাস্তব-অবাস্তবের মাঝে আছে একটা আজব তরঙ্গ, যা আমাদেরকে কমবেশি প্রবাহিত করে। হয়তো বা সেই তরঙ্গই তোমার আর আমার মাঝে সৃষ্টি করেছে ভালবাসার বন্ধন। জন্ম দিয়েছে রহস্যময় এক ভালবাসার। মনে হচ্ছে, তুমি কিছুই বুঝতে পারছ না। চল, আজ তোমাকে একটা দৃশ্য দেখাষ, যা ছিল আমার অনেক দিনের প্রত্যাশা।

ইফাকে আস্তে করে জড়িয়ে ধরল পলাশ। বাধা দিতে চাইল ইফা, কিন্তু পারল না। খুব কাছ থেকে পলাশের নীল চোখদুটো সম্মোহিত করে ওকে। আজও তা-ই হলো। ইফা ধীরে-ধীরে চোখ বন্ধ করে মাথা রাখল পলাশের বুকে। অনুভব করল, কোথায় যেন যাচ্ছে ভেসে-ভেসে।

এভাবে প্রায় মিনিট পাঁচেক যাওয়ার পর পলাশ বলল, ‘ইফা, চোখ খুলে দেখো জানালা দিয়ে তোমার দেখা সেরা দৃশ্য।’

ধীরে-ধীরে চোখ খুলল ইফা। দেখল অনেক নিচে রাস্তা। এখন ফাঁকা। তারা দাঁড়িয়ে আছে কোনও এক বিশাল বিল্ডিং-এর পাশে। ওটা সম্ভবত বড় কোনও হোটেল। সামনে একটা জানালা দেখতে পেল ইফা। তারা ভাসছে জানালার পাশেই।

জানালার একপাশের পর্দা সরানো। ইফা উঁকি দিতে দেখল, একটা বিছানা এবং একটু দূরে একটা বড় টিভি। টিভিতে সম্ভবত ইংলিশ কোনও সিনেমা চলছে। বিছানায় বসে আছে এক লোক। যদিও তাকে দেখছে সে পিছন থেকে, তবুও একটু ভাল করে দেখতেই চিনল লোকটা কে। সে অপরিচিত কেউ নয়। তার স্বামী জুয়েল। জুয়েলকে দেখতে পেয়ে খুশিতে চিৎকার করে ডাক দিল ইফা। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝল, ওর গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরোচ্ছে না। হঠাৎ জুয়েলের পাশে এসে দাঁড়াল অপূর্ব সুন্দরী এক মেয়ে। পরনে কিছুই নেই। শুধু একটা তোয়ালে দিয়ে ঢেকে রেখেছে শরীর। মেয়েটি জুয়েলের সামনে দাঁড়িয়ে, তাই টিভি দেখতে পাচ্ছে না জুয়েল। মেয়েটিকে বলল, ‘জান, সরে দাঁড়াও। দেখতে পাচ্ছি না তো।’

মেয়েটি কিছুই বলল না। শুধু ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। জুয়েল আবারও বলল, ‘ডেইজি, লক্ষ্মী মেয়ে, সরে দাঁড়াও। ইন্টারেস্টিং জিনিসটাই দেখতে পাচ্ছি না।’

এবার মেয়েটি আদরমাখা মধুর কণ্ঠে বলল, ‘সিনেমাটি কি তোমার কাছে আমার চেয়েও ইন্টারেস্টিং?’

এ কথা শুনে দুষ্টু হেসে মেয়েটির তোয়ালে ধরে টান দিল জুয়েল।

তোয়ালে খুলে পড়তেই লজ্জায় জুয়েলের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল মেয়েটি।

জুয়েলও মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগল।

আর এ দৃশ্য দেখে জ্ঞান হারাল ইফা।

.

ওর জ্ঞান ফিরল দুপুর বারোটায়। এতই দুর্বল, কিছুতেই উঠতে পারল না বিছানা ছেড়ে। খুব কষ্ট করে উঠে প্রথমেই খেল এক গ্লাস পানি। ওর মনে ছিল না কালকে রাতে কী দেখেছে। কিছুক্ষণ পর মনে পড়ল জুয়েলের কথা। ঘৃণায় ঘিনঘিন করে উঠল গা-টা। বিষিয়ে গেছে মন। ইফা সিদ্ধান্ত নিল, আত্মহত্যা করবে। এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল। চোখ মুছতে-মুছতে ছাদে উঠবে বলে সিঁড়ি বেয়ে উঠল ইফা। কিন্তু ছাদের দরজায় ঝুলছে ইয়া বড় এক তালা। ওটার ওপর মাকড়সার জাল। দেখলে মনে হয় যেন বহুদিন ধরে এ তালা ঝুলছে।

কিন্তু …

‘কে তুমি, মা?’ হঠাৎ পিছন থেকে জানতে চাইল এক মহিলা।

সিঁড়িতে এক ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে, দেখল ইফা।

‘আমি ইফা। দশতলার ডানপাশের ফ্ল্যাটে থাকি।’

‘ও, আচ্ছা।’

‘দিনের বেলায় কি ছাদের দরজা বন্ধ থাকে, আণ্টি?’

মহিলাটি বলল, ‘হ্যাঁ। দিনে-রাতে সবসময় এ তালা বন্ধ থাকে। দেখছ না তালার কী দশা হয়েছে?’

এ কথা শুনে মাথা ঘুরে উঠল ইফার। পড়ে যাবে, এমন সময় এসে ধরল মহিলা।

তার বাসা বারোতলায়, নিয়ে গেল ইফাকে নিজের ফ্ল্যাটে। ঠাণ্ডা পানি খেতে দিল ওকে।

ঢকঢক করে পানি খেল ইফা। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘আণ্টি, ওই সময় আপনি কী যেন বলেছিলেন? ছাদের দরজা কি সবসময় বন্ধ থাকে?’

‘হ্যাঁ, আজ প্রায় এক বছর থেকে।’

‘কিন্তু…আমি যে…আচ্ছা, কেন বন্ধ থাকে?’

‘তুমি কি এখানে নতুন?’

‘জী, আমি এসেছি ছয় মাস হবে।’

‘ও, আচ্ছা, তার মানে ঘটনাটা তোমার জানা নেই?’

ইফা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ঘটনা? কীসের ঘটনা?’

‘ঘটনাটা আমার ছেলের, আমার একমাত্র ছেলের ঘটনা,’ এ কথা বলতে-বলতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল মহিলা। ‘প্রায় এক বছর আগের কথা। আমার একটি ছেলে ছিল। ও লেখাপড়া শেষ করে ব্যবসা শুরু করেছিল। পরিবার বলতে আমি, আমার এক ছেলে আর এক মেয়ে। আমার স্বামী মারা গেছেন অ্যাক্সিডেন্টে। কিন্তু আমরা কোনওরকম বিপদে পড়িনি। কারণ আমার স্বামী ব্যাঙ্কে রেখে যান অনেক টাকা। লেখাপড়া শেষে আমার ছেলে সেই টাকা দিয়ে শুরু করে ব্যবসা। এবং অল্প দিনের মধ্যে খুব উন্নতিও করে। যে পরিমাণ টাকা ছিল, তার তিনগুণ লাভ হলো। এরপর ভাবলাম এবার ছেলেকে বিয়ে দেয়া দরকার। বিয়ের প্রসঙ্গ তুলতেই ছেলে খুব লজ্জার সঙ্গে বলল, একটি মেয়েকে খুব পছন্দ করে। তো বললাম মেয়েটিকে একদিন নিয়ে আসতে। কিছু দিন পর মেয়েটিকে নিয়ে এল। মেয়েটি ছিল খুব সুন্দরী। দেখলে মায়া হয়। বিয়ের কথা বলতে মেয়েটি বলল, এখন নয়, সে আরও কিছু দিন সময় চায়। তো মেনে নিলাম। এর কিছু দিন পর আমার ছেলেটা কেমন যেন বদলাতে লাগল। ঠিকমত খায় না, ঘুমায় না, সারাক্ষণ টেনশন করে। তারপর একদিন এল সেই ভয়ঙ্কর দিন, যা এখনও…’ বলতে গিয়ে কেঁদেই ফেলল মহিলা। ‘সেদিন ভোর পাঁচটায় বাসায় এল পুলিস। এসে আমার ছেলের নাম, আমার নাম জানার পর, আমাকে জানাল নিচে পড়ে আছে আমার ছেলের লাশ… এ কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়ল মহিলা।

সাধ্যমত সান্ত্বনা দিল ইফা।

মহিলা ফুঁপিয়ে কাঁদতে-কাঁদতে বলল, ‘বিশ্বাস করো, মা, আমি আজও জানি না কেন আমার শান্ত ছেলেটা আত্মহত্যা করল। এর কিছু দিন পর জানলাম, আমাদের ব্যাঙ্কে আর কোনও টাকা নেই। আজও জানি না ছেলেটা এত টাকা কী করল বা কোথায় রাখল।’

ইফা জিজ্ঞেস করল, ‘আর মেয়েটি?’

‘মেয়েটিকে আর কখনও দেখিনি।

‘মেয়েটিও আসেনি? আচ্ছা, আন্টি, আপনার ছেলের কোনও ছবি আছে?’

‘হ্যাঁ, আছে। তুমি একটু বোসো, আমি নিয়ে আসছি।’

কিছুক্ষণ পর ছেলের ছবি নিয়ে এল মহিলা।

সেই ছবি দেখতেই কেঁপে উঠল ইফা। চমকে গিয়ে ভাবল: ‘আশ্চর্য, আমি এ কী দেখছি? এসব কী হচ্ছে আমার সাথে? আমাকে এসব কী শুনতে হচ্ছে? এ কি আমার কোনও দুঃস্বপ্ন? এ কি বাস্তব না অবাস্তব!’

ভেবে কিছুই কূল করতে পারছে না ইফা। ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আন্টি, আপনার ছেলের নাম কী?’

মহিলা বলল, ‘আমার ছেলের নাম পলাশ।’

.

শীতের সন্ধ্যা, কুয়াশায় ঢাকা চারদিক। বারান্দায় বসে আছে ইফা। এখন আর কিছু ভাবছে না। ভাবতে-ভাবতে ক্লান্ত। ভাবনাগুলোর কোনও যুক্তি নেই। সে বাস্তবে যা দেখছে, তাতে বাস্তবতার কোনও চিহ্ন নেই। মনে যেসব প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর কোনও জবাব নেই। যা কিছু এখন দৃশ্য, তা অদৃশ্য, আবার যা কিছু অদৃশ্য, তাই এখন দৃশ্য। বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝে পাকিয়ে গেছে জট। যে পলাশকে চিনত, সে ছিল এই পৃথিবীর বাসিন্দা। কিন্তু সে এখন মৃত। এই পৃথিবী যে পলাশকে চিনত, সে মৃত। কিন্তু ইফার কাছে সে দৃশ্যমান। পলাশ কাছে এসেছে, ভালবেসেছে। কিন্তু সে তো মৃত! তা হলে?

ইফা ভাবছে, শুনেছি যারা আত্মহত্যা করে, অতৃপ্ত হয়ে পৃথিবীতে ঘোরে তাদের আত্মা। আত্মহত্যা করেছে পলাশও। ওর অতৃপ্ত আত্মা এল কেন আমার কাছে? এর সঙ্গে আমি জড়িত কীভাবে? পলাশ আত্মহত্যা করল কেন? সে আমাকে কখনও তার জীবন সম্পর্কে বলেনি। ও কি আসলেই কোনও অতৃপ্ত আত্মা? নাকি সবকিছু আমার দুঃস্বপ্ন?

কলিংবেলের আওয়াজে বাস্তবে ফিরল ইফা। দরজা খুলে দেখল দাঁড়িয়ে আছে জুয়েল। বাসায় ঢুকতে-ঢুকতে প্রশ্ন করল, ‘কেমন আছ? নিশ্চয়ই রাগ করে আছ আমার ওপর?’

ঘৃণায় শরীর ঘিনঘিন করে উঠল ইফার। কোনও জবাব দিল না।

কিন্তু এসব লক্ষ্য করল না জুয়েল। বলেই যাচ্ছে, ‘কী যে করব, বল? কাজের এতই চাপ, তোমাকে ঠিকমত ফোনও করতে পারিনি। জানি, সেজন্য তুমি রাগ করে আছ।’ কথাগুলো বলে ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাথরুমে ঢুকল জুয়েল।

বিছানায় মাথা নিচু করে বসে আছে ইফা।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে ইফাকে খেয়াল করল জুয়েল। ওর পাশে গিয়ে বসল সে। হাত ধরতে চাইলে সরিয়ে নিল ইফা। খুব অবাক হয়ে জানতে চাইল জুয়েল, ‘ইফা, কী হয়েছে তোমার? কেন এমন করছ?’

‘তার আগে বল, তুমি এমন কেন করলে আমার সাথে?’ কান্না জড়ানো কণ্ঠে জানতে চাইল ইফা।

‘কী করলাম তোমার সাথে?’ জুয়েল উদ্বিগ্ন।

‘এই যে তুমি আমাকে একদম ভুলে গেলে?’

‘ওহ্, এ কথা?’ হাসতে-হাসতে ইফাকে জড়িয়ে ধরল জুয়েল।

এবার বাধা দিল না ইফা। তবে ঘৃণায় এল বমি।

জুয়েল আদর মাখানো কণ্ঠে বলল, ‘লক্ষ্মীসোনা, প্লিজ রাগ কোরো না। এই যে আমি এসে গেছি। আর কখনও তোমাকে ফেলে যাব না।’

‘হ্যাঁ, আর তোমাকে যেতে দেব না,’ বলল ইফা।

রাতে খুব তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল ওরা।

মাথাব্যথার অজুহাত দেখিয়ে পাশ ফিরে শুয়েছে ইফা।

.

ইফার ঘুম ভাঙল রাত বারোটা ত্রিশ মিনিটে। নিঃশব্দে বিছানা থেকে উঠে পড়ল। দরজা খুলে সম্মোহিতের মত চলল ছাদে। আজ খোলা ছাদের দরজা। ইফা সোজা চলেছে পানির ট্যাংকের দিকে।

হ্যাঁ, প্রথম দিনের মতই আজও রেলিং-এ শুয়ে আছে পলাশ। ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল ইফা।

এসো, ইফা, তোমার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম।’ উঠে বসল পলাশ।

পলাশের নীল চোখ দেখল ইফা। অপূর্ব নীল চোখে হাজারো রহস্যের খেলা। পলাশের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি। ইফার চোখেও হাজারো প্রশ্ন।

‘জানি, অনেক কিছু জানতে চাও। কিন্তু কিছুই বলতে পারছ না। তুমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এখন একটা দৃশ্য দেখবে তুমি। ওটা থেকে হয়তো পেতেও পার তোমার প্রশ্নের জবাব।’ ইফার চোখদুটো বন্ধ করে দিল পলাশ।

কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে ইফা দেখল, পলাশের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। দেখতে কেমন চেনা-চেনা লাগছে। হ্যাঁ, এবার ইফার মনে পড়ল: মেয়েটিকে সে দেখেছে গত রাতে একবার। মেয়েটির কী যেন নাম? কী যেন নাম? হ্যাঁ, মনে পড়েছে! মেয়েটিকে ডেইজি বলে ডেকেছিল জুয়েল। মেয়েটির পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে পলাশ। মেয়েটিকে দেখাচ্ছে অত্যন্ত শান্ত। কিন্তু খুবই অস্থির পলাশ। খুব আকুল হয়ে মেয়েটিকে প্রশ্ন করল: ‘কেন তুমি আমার সাথে প্রতারণা করলে?’

মেয়েটি বলল, ‘প্রতারণা? কে করেছে? এই আমি? অসম্ভব!’

‘এখনও মিথ্যা বলছ, ডেইজি, ছি! আমি কখনও কল্পনাও করিনি তোমাকে অন্য এক পুরুষের সাথে বিশ্রী অবস্থায় দেখব!’

‘দেখো, পলাশ, তুমি যাকে অন্য পুরুষ বলছ, সে আমার ভালবাসার মানুষ।’

‘তবে আমি কী? তবে কেন ভালবাসার অভিনয় করলে? বল, জবাব দাও!’ রাগী কণ্ঠে জানতে চাইল পলাশ।

ডেইজি হাসতে লাগল। সে হাসি যেন গায়ে আগুন ধরিয়ে দিল পলাশের। সামনে বেড়ে ডেইজির গলা টিপে ধরল ও। ‘তুমি আমার ব্যাঙ্কে যত টাকা-পয়সা ছিল, সব মিথ্যা কথা বলে হাতিয়ে নিয়েছ! তার চেয়েও বড় কষ্টের বিষয়, তুমি ভালবাসার অভিনয় করে ভেঙে দিয়েছ আমার মন! তুমি চুরমার করেছ আমার হৃদয়টা! আমি তোমাকে ছাড়ব না!’ জেদের সুরে বলছে পলাশ।

হঠাৎ দৃশ্যপটে এল তৃতীয় এক লোক। পেছন থেকে দেখেও ইফা ঠিক চিনল না মানুষটা কে। কয়েক সেকেণ্ড পর বুঝল, মানুষটা তার স্বামী-জুয়েল।

জুয়েল?

সে এখানে কী করছে?

ডেইজির ভালবাসার মানুষটা সে?

জুয়েল?

দাঁড়িয়ে আছে জুয়েল। হাতে সিগারেট। খুব শান্ত দেখাচ্ছে তাকেও। মনে হচ্ছে যেন জানত এখানে কী ঘটছে। হাতের সিগারেটটা ফেলে দিয়ে বলল জুয়েল, ‘বন্ধু, পলাশ, যা করছ, তাতে এত তাড়াতাড়ি কেন? তাড়াহুড়োর কিছুই নেই। ডেইজিকে তুমি ছেড়ে দাও। ওর কোনও দোষ নেই। ও যা কিছু করেছে, আমাকে খুশি করার জন্য করেছে।’

ডেইজির গলা ছেড়ে দিল পলাশ। সরে গিয়ে জুয়েলকে জড়িয়ে ধরে চুমো দিল ডেইজি।

অবাক হয়ে চেয়ে আছে পলাশ। ‘তার মানে কী? আমার সাথে এতসব নাটক করলে কেন?’ খুব অবাক হয়ে জানতে চাইল সে।

‘কারণ তুমি আমার শত্রু,’ বলল জুয়েল।

‘আমি তোমার শত্রু? আমি তো তোমাকে কালকের আগে চিনতামও না। আমার সাথে তোমার শত্রুতা কীভাবে?’ আরও বেশি অবাক হলো পলাশ।

‘ব্যবসা করতে গিয়ে আমার অনেক ক্ষতি করেছ,’ বলল জুয়েল। ‘আর তারচেয়েও বড় কথা, তুমি খুব অল্প সময়ে আমার চেয়েও ধনী হয়ে গেছ। বলো, এসব কীভাবে সহ্য করি? চাই না আমাকে টপকে কেউ ওপরে উঠুক। তাই আমার সুন্দরী প্রেমিকাকে কিছু দিনের জন্য তোমাকে দিতে হলো।’

‘আর এ সুযোগে আমার সবকিছু হাতিয়ে নিয়ে আমাকে নিঃস্ব করলে, তাই না?’

‘কারেক্ট, সবকিছু আমার প্ল্যানের ভেতর ছিল, বন্ধু, হাসতে লাগল জুয়েল।

রাগে পাগলের মত জুয়েলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল পলাশ। দু’জনের মধ্যে শুরু হলো ধস্তাধস্তি। এক পর্যায়ে পানির ট্যাংকের সঙ্গে খুব জোরে পলাশের মাথা ঠুকে দিল জুয়েল। কয়েকবার বাড়ি দেয়ার পর জ্ঞান হারাল পলাশ। তখন পলাশকে তুলে রেলিং-এর দিকে নিয়ে যেতে লাগল জুয়েল ও ডেইজি।

এ দৃশ্য দেখে খুব অস্থির হয়ে উঠল ইফা।

রেলিং-এ পলাশকে শুইয়ে দিল জুয়েল ও ডেইজি।

ইফা বুঝল, কী করতে যাচ্ছে ওরা। চিৎকার করে মানা করতে চাইল, কিন্তু কেউই শুনল না ওর চিৎকার।

ডেইজিকে রলতে শুনল, ‘জুয়েল, আমি তোমার সাথে নতুন জীবন শুরু করতে চাই। শুধু তুমি আর আমি।’

‘সে তো তোমার হাতে ডার্লিং। এসো, নিজ হাতে উদ্বোধন করো তোমার নতুন জীবন।’

‘হ্যাঁ,’ এই বলে পলাশকে ধাক্কা মেরে রেলিং থেকে ফেলে দিল ডেইজি।

এ দৃশ্য দেখে চিৎকার করে উঠল ইফা, কিন্তু শুনল না কেউই।

জুয়েলকে বলল ডেইজি, ‘দেখলে, জান, তোমাকে কত ভালবাসি? নিজ হাতে সরিয়ে দিলাম তোমার শত্রুকে পৃথিবী থেকে! এমন ভালবাসা তুমি পৃথিবীর কোথাও পাবে না। হ্যাঁ, ভালবাসা, তার সাথে কোটি-কোটি টাকাও।’

হাসতে লাগল দু’জনই।

জুয়েল ও ডেইজিকে দেখার জন্য তাকাল ইফা, কিন্তু আর দেখতে পেল না কাউকে। রেলিং-এর ওদিকে তাকাল। অনেক নিচে ওখানে কোনও লাশ নেই। আবার ফিরে দেখল, দাঁড়িয়ে আছে পলাশ। অপূর্ব চোখদুটোতে এখন নীলের চিহ্ন নেই। তার বদলে লাল রঙের খেলা। সেই নীল চোখদুটোতে এখন জ্বলছে প্রতিশোধের লাল আগুন।

থমথমে গলায় পলাশ বলল, ‘এতক্ষণ যা কিছু দেখলে, তা এক বছর আগে ঘটে যাওয়া কোনও এক রাতের ঘটনা। ওরা আমাকে এভাবে শেষ করেছিল। সে রাতের পর থেকে আমি অপেক্ষায় আছি আজকের এই রাতের জন্য।’

পরিশিষ্ট

ডেইজিকে পাওয়া গেল তার ঘরে মৃত অবস্থায়। কে যেন তার বুকে বসিয়ে দিয়েছে ছোরা। ওটার বাঁটে পাওয়া গেল জুয়েলের হাতের আঙুলের ছাপ।

দরজা ভেঙে জুয়েলের ঘরে ঢুকতে হলো পুলিসকে। দেখল, বিছানায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে ইফা আর জুয়েল আছে বারান্দায় মৃত। তার বুকেও গেঁথে আছে ছোরা।

এবং বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, ছোরায় পাওয়া গেল ডেইজির আঙুলের ছাপ।

এই দুটি মৃত্যুর রহস্য তদন্ত করে কিছুই বের করতে পারল না পুলিস।

দু’দিন পর জ্ঞান ফিরল ইফার। কিন্তু বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে ও। ইশারায় পুলিসকে বলল: সে কিছুই জানে না। এরপর থেকে ইফা কখনও পলাশ নামের নীল মণির আত্মাকে আর দেখেনি।

 

টিকটিকি – নাশমান শরীফ

এক

এক টিক্-টিক্-টিক্, ডেকে উঠল টিকটিকি। ‘স্বর্ণা, চলো নিচে যাই,’ শোয়া থেকে এক ঝটকায় উঠে বসে বলল তানি।

ভয় পেয়ে বলল স্বর্ণা, ‘এই, কী দেখেছ তুমি? আমার কিন্তু ভয় করছে।’

তানি তর্জনীটা বাড়িয়ে দেখাল, ‘ওই যে দেখো, শুটিংস্টার।’

দেখতে পেল না স্বর্ণা। তার আগেই পড়ে গেছে ওটা।

‘ছাদটা এখন কিন্তু ভুতুড়ে লাগছে আমার,’ বলল স্বর্ণা।

‘চলো যাই, রাতও হয়ে গেছে অনেক।

পাটি, বালিশ গুছিয়ে নিচে নেমে এল দুই বন্ধু।

একই তলায় মুখোমুখি ফ্ল্যাটে বাস, প্রায় সমবয়সী দু’জন। ওদের বন্ধুত্বের বয়স চলছে দুই বছর। স্বর্ণা এখানে আসার আগে কেউ কাউকে চিনত না। শুরুতে প্রতিবেশী হিসেবে সৌজন্য সম্পর্ক ছিল। এরপর দেখল বহুদিকে ভাললাগা মিলে যায় দু’জনের। যেমন, দু’জনই কবিতা লেখে, গান শুনতে ভালবাসে, একই রকম প্রকৃতিপ্রেমী। আরও অনেক মিল…। আর কী বাধা, ব্যস, হয়ে গেল আপনি থেকে তুমি। সারাক্ষণ দু’দরজা হাট করে খোলা। এক ঘরের মতই বসবাস ওদের। ঘরের দুয়ার খোলা মানে আসলে ওদের মনের দুয়ারটাই খোলা।

‘স্বর্ণা, তুমি কি ছাদে টিকটিকির ডাকটা শুনেছিলে?’ তানি জিজ্ঞেস করল।

স্বর্ণা বলল, ‘আচ্ছা, টিকটিকির সাথে তোমার কী বলো তো? এর আগেও একদিন ছাদে টিকটিকির ডাকে অমন ভয় পেয়েছিলে। মনে হয় কোন রহস্য আছে। তোমার তো আবার মেলা অলৌকিক ব্যাপার-স্যাপার ঘটে।’

‘জানতে পারবা, বন্ধু, আমার কিছুই অজানা থাকবে না তোমার।’ রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল তানি।

রুপোর থালার মত বড় চাঁদ উঠেছে আকাশে। রাত প্রায় দশটা বাজে। মোবাইলে সময় দেখল তানি। ঠিক তখনই টিক্-টিক্-টিক্-টবের পাশ থেকে ডেকে উঠল টিকটিকিটা।

‘স্বর্ণা, চলো নেমে যাই, একটা পোড়া গন্ধ নাকে আসছে,’ নাক টেনে বলল ও।

‘হায় সর্বনাশ,’ লাফ দিয়ে উঠল স্বর্ণা। ‘আমি তো চুলায় ভাত দিয়ে এসেছিলাম।’

.

দুই বন্ধু বসে আছে তানির ডাইনিং টেবিলে। ছাদ আর ঘরের টেবিলটাই ওদের আড্ডার স্থান। শফিক জানিয়েছে ফিরতে রাত একটাও বেজে যেতে পারে। স্বর্ণা আরাম করে দুই চেয়ার নিয়ে বসল।

ও বলল, ‘তানি, তোমার টিকটিকি রহস্যটা শুনতে চাই। আজ আমি খেয়াল করেছি তুমি টিকটিকির ডাক শুনেই নিচে নামতে চাইলে, ভাত পোড়ার গন্ধটা পেলে। যে হারে আমরা গল্পে মজে ছিলাম ছাদে, এতক্ষণে কী হত ভাবতেই শিউরে উঠছি। আচ্ছা, বলো তো, তুমি কি কোন বিপদের সিগন্যাল পেয়েছিলে?’

তানি বলল, ‘তোমার মতই আরেকটা দোস্ত আছে আমার। কোন কিছুই তার অজানা নয়।’

‘প্লিজ, তানি, এত রং ঢং না করে বলোই না ঘটনাটা।’

দুই

দশ বছর আগের কথা।

টিক্-টিক্-টিক্!

ট্রিকটিকির এই ডাকটা যেন ওর মনে মুহূর্তেই একটা প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে গেল। যাক, কাজটা তাহলে হচ্ছে, তানি আশ্বস্ত হলো। দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে জায়নামাজ থেকে উঠল ও। টুবুনের কাশিটা মনে হলো কমে আসছে।

বিছানায় এসে মেয়ের মাথাটা বুকের মধ্যে নিয়ে তানি বলল, ‘মাগো, ইনশাল্লাহ্ আর কখনও তোমার ওরকম কাশিটা হবে না। আল্লাহ্ আমাকে ইঙ্গিত দিয়েছেন।’

মায়ের কথা পাঁচ বছরের টুবুন কিছু বুঝল বলে মনে হলো না। তবে সত্যিই কিছুক্ষণ আগে যেভাবে কাশছিল, সেটা কমে গেল।

ছোটবেলা থেকেই এরকম সাংঘাতিক কাশি বাচ্চাটার। কোনভাবে ঠাণ্ডা লাগলে আর রক্ষে নেই। কাশতে কাশতে লাল টকটকে হয়ে যায় চোখ দুটো। যেন ফুটে বেরিয়ে আসবে। মুখ দিয়ে লালা ঝরে অনবরত। খাওয়া-দাওয়া একেবারে বন্ধ। টোটকা, কবিরাজি, হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি কিছুতেই কাজ হয় না। দেশের নাম করা শিশু বিশেষজ্ঞ, অগুনতি অর্থ ব্যয়, সব বেকার। বড় মেয়ে বুবুনের অসুখ হলে আরও আজব ঘটনা ঘটে তানির। ওর যে অসুখ হবে দেখা যায় তানিরও ঠিক সেটা শুরু হয়। যেমন, বুবুন বমি করলে তার মায়েরও বমি শুরু হবে, জ্বর হলে জ্বর…! সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল যখন বুবুনের চোখে ‘আই ড্রপ’ দেয়া হলো। তানি কাশতে-কাশতে বলল, ‘আমার গলা তেতো হয়ে গেছে, হায়, খোদা, বুবুনের চোখে ওষুধ দিলে আমার গলা তেতো হচ্ছে কেন?’

প্রতি এক-দেড় মাস পরপরই মেয়েদের এত কষ্ট তানিকে সহ্য করতে হয়। যতবারই এমন হয়, ও জায়নামাজে বসে যায়। সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজের জীবন থেকে শুরু করে সব সম্পদ বিনিময় করেও দুই সন্তানের সুস্থতা চায়।

তবে বাইরের কেউ তানির মোনাজাত দেখলে পাগল ভাববে নিশ্চিত। ওর দোয়াটা এরকম হয়—’হে, আল্লাহ্, আমার জানটা তুমি নিয়ে নাও, আমার সব গয়নাগাটি তুমি নিয়ে নাও, আমার জমা-জমি, ধন-সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য সব তুমি নিয়ে নাও, আমাকে পথের ফকির করে দাও। আমি আমার সুস্থ মেয়ে দুটোকে নিয়ে গাছতলায় বাস করব। তবু রোগ চাইনে, আল্লাহ্।’ এরপর চলে অঝোরে কান্না।

আর কেনইবা এমন পাগলামি করবে না ও? মাত্র বাইশ বছরেই দুই বাচ্চার মা হয়ে গেছে। দুটো বাচ্চা নিয়ে ধরতে গেলে একেবারে একা। কাছে তো সাহস দেয়ার মত আপনজন, বন্ধু বা ওরকম কেউ থাকে না। আর যদিওবা আপনজন কেউ আসে, তো বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ওর কাণ্ডকারখানা দেখে বিরক্ত হয়ে দ্রুত কেটে পড়ে।

শফিক খুবই ব্যস্ত মানুষ। গার্মেন্টস্ ব্যবসা। রাত নেই, দিন নেই শুধু কাজ আর কাজ। মেয়েরা অসুস্থ হলে সব রাগ গিয়ে পড়ে তানির ওপর। বলে, ‘তোমার নির্বুদ্ধিতার, কারণেই ওদের রোগ হয়। এমনি কি নেপোলিয়ন বলেছেন, ‘আমাকে একটা যোগ্য মা দাও’’…ইত্যাদি, ইত্যাদি। অকারণেই বকা শুনতে হয় বেচারি তানিকে। একে সন্তানের অসুস্থতা তার উপর স্বামীর ভয়ানক আচরণ। বাচ্চাদের সব রকম অসুখের দায় ওদের বাবা নির্দ্বিধায় তানির ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। অসুখ-বিসুখ তাই ওর নিজের মৃত্যুর চাইতেও ভয়ঙ্কর মনে হয়।

আজও ঠিক ওভাবেই মোনাজাত শেষ করেছিল ও। ব্যতিক্রম ঘটল, হাতটা নামাতেই যখন টিকটিকিটা ডেকে উঠল, টিক্-টিক্ করে। টিকটিকি সে তো ডাকতেই পারে। এর মাঝে সন্তানের সুস্থ হবার কী ইঙ্গিত রয়েছে, সেটা তানি ছাড়া কেউ জানে না।

তিন

‘আপু, মশারিটা একটু খুলে দে না,’ পায়ের উপর পা উঠিয়ে বলল তানি।

তাসমি বিরক্ত হয়ে বলল, ‘পারব না, সেই কখন থেকে উঠতে বলছি তোকে। কাল না অঙ্ক পরীক্ষা তোর?’

বোনের কথায় কান দিল না তানি। বরং জোরে-জোরে গাইতে লাগল, ‘সাত ভাই চম্পা জাগোরে জাগোরে, ঘুম ঘুম থাকে না ঘুমেরই ঘো…আপুরে-কী গেল আমার মুখে,’ বলে চেঁচিয়ে উঠল ও।

 

 

তাসমি মশারিটা খাটের আড়ায় ভাঁজ করে রেখে বলল, ‘চুপ কর, ফাজিল, তোর মুখে রসগোল্লা গেছে।’

‘না রে, আপু, আমি ফাজলামো করছি না, সত্যি বলছি, আমার মুখে ডিম-ডিম স্বাদ লাগছে।’

‘এই, তোর মুখে টিকটিকির ডিমের খোসা, ও, মা, দেখে যাও, তানি টিকটিকির ডিম খেয়েছে,’ চেঁচিয়ে উঠল তাসমি।

গোসলখানায় কল ছেড়ে দিয়ে মা তানিকে বহুবার কুলকুচি করালেন। সাবান দিয়ে মুখ ধুয়ে দিতে-দিতে বললেন, ‘টিকটিকি বিষাক্ত প্রাণী, এর ডিম তোমার মুখে গেল কী করে?’

‘মনে হয় খাটের আড়ায় ছিল, মশারি খুলতে গিয়ে তানির মুখে পড়েছে,’ বলল তাসমি।

খাটের আড়ার ফাটলে আরও তিনটা ডিম খুঁজে পাওয়া গেল। তানি এর আগে কখনও টিকটিকির ডিম দেখেনি। মা ওগুলো ফেলে দিতে গেলে তানি চেঁচিয়ে বলল, ‘সত্যি বলছি, মা, জীবনেও আমি টিকটিকির ডিম খাব না, আমার মুখে পড়লে থুহ-থুহ করে ফেলে দেব। তুমি ওগুলো কালকে ফেলো, আজকে একটু আমার কাছে রাখি?’

ক্লাস সেভেনে পড়লেও তানিটা একেবারে শিশুদের মত। সারাদিন ডিমগুলো সাবধানে নিয়ে বেড়াল। অঙ্ক করতে গিয়ে বইয়ের উপর রেখেই অঙ্ক করল। আগামীকাল ওর অঙ্ক পরীক্ষা। অনেক খাটল এর পেছনে। অঙ্কটা ওর কাছে যমের মত। ছোটবেলা থেকেই, যে ওকে অঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন করবে, ও মনে-মনে তাকে অভিশাপ দেবে, ‘ধ্বংস হোক, তার চোদ্দ গুষ্টি নিপাত যাক।’

এই হলো অবস্থা। প্রথম সাময়িক পরীক্ষাতে চৌত্রিশ পেয়েছিল। মানে টেনেটুনে পাশ। এবার মোটামুটি ভাল না করতে পারলে আর মান-ইজ্জত কিছু থাকবে না। বাদশা স্যর সপ্তাহে চারদিন বাসায় এসে অঙ্ক করিয়ে যান। স্যরের কাছে আজ প্রায় ঘণ্টা তিনেক অঙ্ক করছে। মনে-মনে বলল তানি, ‘এবার মনে হচ্ছে অঙ্ক পরীক্ষাটা ভালই দেব। অনেক খেটেছি…

‘টিক্-টিক্-টিক্,’ সাথে-সাথে একটা টিকটিকি ডেকে উঠল। সেটা অবশ্য তানির খেয়াল করার কথা নয়। এমন কোন ঘর আছে, যেখানে টিকটিকি নেই? সারাদিন কতই তো ডাকছে ঘরময়। আশ্চর্য! এই ডাকটা কিন্তু ওর কানে লাগল। মনে হলো টিকটিকিটা ওকে বিদ্রূপ করল। অবচেতন মনেই দেয়ালের এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে লাগল। যেন টিকটিকির হাসি মুখের চেহারাটা দেখতে পাবে ও।

চার

প্রশ্নপত্র হাতে পেল তানি। মুহূর্তে পুরোটাতে চোখ বুলিয়ে খুশিতে আটখান হয়ে গেল।

সব অঙ্ক কমন পড়েছে! খাতা নিয়ে অস্থির হলো দ্রুত লেখার জন্য। ফিসফিস করে পাশের বেঞ্চে বসা বিউটিকে বলল, ‘বুঝলি? স-অ-ব কমন পড়েছে, হেল্প লাগলে বলিস।’ গর্বে বুকটা ভরে গেল ওর। এমনটাই তো কল্পনা করেছিল। পাজি বিউটিটা গত পরীক্ষায় ওর

ওর দিকে ফিরেও তাকায়নি-হেল্প তো দূরের কথা। সাহায্য না করার অবশ্য অন্য কারণ আছে। ক্লাসের সবচেয়ে চটপটে মেয়ে তানি। তার উপরে, গান, নাচ, ছবি আঁকা, কবিতা লেখা সব কিছুতেই সে ওস্তাদ। তাই অঙ্কে ডাব্বা মারাতে মনে-মনে ও খুশি।

যাই হোক, শান্ত মাথায় লেখা শুরু করল তানি। ক’সেটের সব অঙ্কই দেখল পারে। এক নম্বরটা কোনভাবেই মিলল না ওর। এবার একটু ঘাবড়ে গেল। কেন মিলছে না? এবার অন্যগুলোর দিকে নজর দিল। হায়, খোদা! সব গুলিয়ে গেছে। নিজেকে বোঝাতে লাগল, ‘সব পারি, তবে কেন মিলছে না?’ বাদশা স্যরকে ডেকে বলল, ‘স্যর, আমি একটা অঙ্কও পারছি না।’

স্যর বললেন, ‘তোর মানসিক রোগ আছে। অঙ্কের সিলেবাস তো সব গুলিয়ে খাইয়েছি।’ বলে স্যর চলে গেলেন। তানি প্রাণপণ চেষ্টা করে চলল। কিন্তু একটা অঙ্কও মেলাতে পারল না। প্রায় সাদা খাতা জমা দিয়ে কাঁদতে- কাঁদতে বাড়ি ফিরল বেচারি।

কেবলই ওর মনে হতে লাগল এই লটখটের জন্য ওই টিকটিকির ডিম আর টিকটিকিই দায়ী।

ওর কান্না দেখে বাসার কেউ কিছুই বলল না। বরং আব্বা ওকে সান্ত্বনা দিলেন-’যাক, আর কাঁদিসনে, ভাল করে চেষ্টা কর যেন ফাইনালে গিয়ে ফেল না করিস।’

তানি বলল, ‘আমি কি কখনও ফেল করেছি? আমি তো টি-টি-পি, মানে, টেনেটুনে পাশ। ওই শয়তান টিকটিকিটাই এবার আমাকে ফেল করাল।

পাঁচ

ক’দিন বাদে তাসমির এস. এস. সি. পরীক্ষা। সারাদিন দুই বোন খুনসুটি করে। অতিষ্ঠ হয়ে মা একদিন বললেন, ‘ফাজলামো করে বহু সময় নষ্ট করেছ দুই বোন। এখন থেকে দু’জন আলাদা ঘরে পড়বা।’

তানি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল বাইরের ঘরে। কোথাও একটা টিকটিকি ডেকে উঠল।

‘আপু, এই ঘরে আয়, এক্ষুণি কারেন্ট চলে যাবে, ‘ চেঁচিয়ে উঠল তানি। মুহূর্তে সব অন্ধকার।

দু’বোন জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে ওদের রুমে। টেবিলের ওপর টিপটিপ করে মোমের আলো জ্বলছে। তাসমি বলল, ‘তুই তো দেখি অলৌকিক শক্তিওয়ালা হয়ে গেছিস। কী করে বুঝলি যে কারেন্ট চলে যাবে?’

‘আমাকে সিগন্যাল দিয়েছে টিকটিকি। জানিস, আপু, তুই বিশ্বাস কর, আমার পরীক্ষাটা খারাপ হলো ওই পাজি টিকটিকির জন্যে। সেদিন ডিম মুখে যাওয়ার পর থেকে দেখছি, টিকটিকির পাল আমার পিছু নিয়েছে। ভালমন্দ যা- ই ঘটছে, উজবুকগুলো আমাকে টিক্-টিক্ করে জানান, দিচ্ছে!’

‘দূর, বোকা, আমাদের ঘরে তো সারাক্ষণই টিকটিকি…..’

টিক্-টিক্-টিক্।

‘এই দেখ, এখনই ডাকল,’ বলে ছোট বোনের দিকে তাকিয়ে হাসল তাসমি।

তানি কান খাড়া করে বলল, ‘দেখিস কিছু একটা ঘটবে এখন…’ দপ করে আলোগুলো জ্বলে উঠল। ভয়ে তাসমি জড়িয়ে ধরল তানিকে।

তানিদের বাড়িটা শহরতলীতে। দিনরাত এখানে বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার খেলা চলে। ওদের বাড়ির কয়েক গজ দূরেই রাস্তা। সন্ধ্যা লাগার কিছুক্ষণ পরেই জায়গাটা কেমন সুনসান নীরব হয়ে যায়। একটু এগিয়ে রাস্তাটা বামে মোড় নিয়েছে। ওই মোড়ের কাছেই আছে একটা উইয়ের ঢিবি।

বিদ্যুৎ গেলে যখন পুরো এলাকাটা অন্ধকারে ঢেকে যায়, তখন আশপাশের বাড়ি থেকে লোকজন বেরিয়ে ঢিবিটার কাছে এসে দাঁড়ায়। কিছু বুনো ফুলের গাছ আর বিশাল একটা খেজুর গাছ জায়গাটাকে মোহময় করে রেখেছে। তানিদের বাড়ির সবার পছন্দের জায়গা ওটা।

কিন্তু তানির বাবা মুহিব সাহেব, সন্ধ্যার পর ও জায়গাটায় যাওয়া একদম পছন্দ করেন না। বলেন, ‘ওখানে কেউ অন্ধকারে যাবে না। সাপ-পোকা থাকতে পারে।’

যদিও এ এলাকায় কখনও সাপ-টাপ দেখা যায়নি।

তানিদের চার ভাই-বোনের প্রিয় জায়গা ওটা। বিদ্যুৎ যাওয়ার সাথে-সাথেই বড় ভাইয়া বাঁশি নিয়ে চলে যায় ঢিবির উপর খেজুর গাছটার তলে। ওরা কয় ভাই-বোনও যায় ভাইয়ার পিছু-পিছু। বাবার নিষেধ অমান্য করে প্রায় প্রতিদিনই।

সেদিনও যথারীতি বিদ্যুৎ চলে গেল। আবছা আলোতে বড় ভাইয়া বাঁশি নিয়ে চলল ঢিবির দিকে। পিছু-পিছু তানি। কাছাকাছি যেতেই লম্বা খেজুর গাছটার মাথায় টিক্-টিক্ করে ডেকে উঠল টিকটিকি।

‘ভাইয়া, সামনে দেখো,’ চেঁচিয়ে উঠল তানি।

‘এই-সাপ-সাপ, তানি, বাড়ি থেকে শিগির একটা লাঠি নিয়ে আয়,’ বলল বড় ভাইয়া।

জীবনে প্রথম জ্যান্ত সাপ দেখল তানি। বিশাল কালো কুচকুচে সাপ।

পরে ভাইয়া সবাইকে বলল, ‘ওটা জাত সাপ ছিল। ভাগ্যিস তানি দেখেছিল। না হলে আমি তো ওটার গায়ে পাড়া দিয়েই ফেলেছিলাম প্রায়।’

সাপ-দুর্ঘটনা হতে বাঁচানোর পুরো কৃতিত্বটা সবাই তানিকেই দিল। শুধু তানি জানে, কৃতিত্বটা ওর নয়, টিকটিকির।

রাতে শুয়ে তানি তাসমিকে বলল, ‘জানিস, আপু, অদ্ভুত ব্যাপার, আমার না ভয় অনেক কমে গেছে। টিকটিকি এখন আমার বন্ধু আবার শত্রুও।’

‘তুই দেখছি ইদানীং টিকটিকি নিয়ে বেশি গবেষণা করছিস!’ তাসমি কৌতুকের স্বরে বলল। ‘জানো, মা, তানিকে না টিকটিকিতে পেয়েছে, সত্যি বলছি, আমি ব্যাপারটা খেয়াল করেছি,’ বলে হাসতে লাগল।

মা কিন্তু মোটেও হাসলেন না। গম্ভীর হয়ে তানিকে বললেন, ‘তোমাকে আয়াতুল কুরসিটা শেখাতে হবে।’

তানি ভয়ঙ্কর ভীতু। এ জগতে তার ভয় পাওয়ার অগণিত উপকরণ রয়েছে। জিন-ভূত, পোকামাকড়, মানুষ, গরু, কুকুর সব কিছুকেই তার ভয়। অদ্ভুত ব্যাপার, শুধু টিকটিকি নামের প্রাণীটিকে তার কখনওই ভয় লাগেনি। শুধু ওর ডাকটা এখন…

মনে-মনে মেলাতে চেষ্টা করে তানি, টিকটিকি কি ওর বন্ধু না শত্রু? কারণ ভাল-মন্দ যা-ই ঘটছে তারই সঙ্কেত দিচ্ছে।

অবশ্য দুই বোনই এখন আয়াতুল কুরসি শিখে নিয়েছে। মায়ের কথামত তিনবার দোয়াটা পড়ে বুকে ফুঁ নেয় ওরা। তবুও তানির ঘটেই চলেছে অদ্ভুত কিছু। যেমন, কাল যখন ও গোসল করছিল, কোথাও একটা টিকটিকি ডেকে উঠল। সাথে-সাথে সতর্ক হলো। যা সন্দেহ করেছিল, গোসলখানার এক কোনায় নাদুস নুদুস একটা কেঁচো। আর যায় কোথায়, এক চিৎকার দিয়ে দরজা খুলে ভোঁ-দৌড়। টিকটিকির সাথে তানির যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বাড়ির সবাই তা জেনে গেছে। ওটা নিয়ে বড় ভাইয়া খুব মজা করে বলে, ‘চোখে তিল তানি, গজ দাঁত তানি, খেংরা কাঠি তানি, টিকটিকির দোস্ত তানি।’ আর তানি কেঁদেকেটে অস্থির।

মা বললেন, ‘তুমি এখন থেকে আর টিকটিকি বিষয়ক কোন কথা কাউকে বলবে না। এটা মনে রেখো, তোমার যা ঘটছে তা শুধু হাসি-ঠাট্টার ব্যাপার না। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক।’

তানি বুঝতে পারল, মা এটাকে মোটেও স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন না। আর বিষয়টাকে গুরুত্বও দিচ্ছেন যথেষ্ট।

ছয়

শফিকের ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল। এটা ওর প্রতিদিনের রুটিন। তবু তানি স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে সেই সন্ধে থেকেই। বাচ্চাদের দায়িত্ব সেরে যেটুকু সময় পায়, ওর পছন্দের কাজগুলো করে। তবে আজ আর অপেক্ষা করে বসে নেই ও। ভীষণ ক্লান্ত। গত কয়েক রাত টুবুনের কাশিতে একটুও ঘুম হয়নি। শফিক এসে দেখল, দুই মেয়েকে দু’পাশে নিয়ে তানি বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। এমনিতে সব সময়ই কোন অসুস্থতার পর বুবুন-টুবুন যখন সুস্থ হয়, তানি তখন পরম শান্তি অনুভব করে।

ফোনে শফিক জেনেছিল, টুবুনের কাশিটা কমে গেছে। বাসায় সে-ও এল খুব ফুরফুরে মেজাজে। খাওয়া সেরে বিছানায় যেতে ওদের রাত দুটো বেজে গেল। যদিও শফিক কখনওই বউয়ের বন্ধু নয়, কিন্তু ঘুমের সময় বউকে তার চাই। তানির গায়ের উপরে হাত না দিলে তার ঘুম হয় না।

শফিক বউকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘জানো, মজিদ ভাই না খুব বিপদে পড়েছে। আজ ফ্যাক্টরিতে এসে আমার কাছে খুব কান্নাকাটি করছিল। সামান্য কিছু টাকার জন্য তার বিশাল একটা পেমেণ্ট আটকে গেছে। আমার কাছে টাকা চায়। কত করে বললাম, আরে, আমি অত টাকা কই পাব এখন!’

‘আহা রে, বেচারা! সত্যি যদি সেরকম টাকা থাকত তাহলে তো দেয়াই যেত। তুমি তাকে বলেছ না, ক’দিন আগে এক কোটি টাকার মেশিন নগদ টাকায় এনেছ। এখন কোন টাকাই তোমার নেই। এই জন্য ব্যবসা জিনিসটাই ভাল্লাগে না আমার। এত বড় গার্মেন্টসের মালিক, তাকেও টাকার জন্য হাত পাততে হয় অন্যের কাছে।’

তানি মজিদ সাহেবকে চিনেছে কিছুদিন হলো। ক’দিন আগে তার পরিবারের সাথে বেড়িয়ে এসেছে ওরা কক্সবাজার, রাঙামাটি। তখনই ভাল করে পরিচয় হয়েছিল ওদের সঙ্গে। এর আগে শফিকের কাছে শুধু ব্যবসায়ী হিসেবে নাম শুনেছিল মজিদ সাহেবের। এই ভদ্রলোকের সাথে বেশ ভাল ব্যবসায়িক সম্পর্ক তার। ব্যবসার শুরু থেকেই দু’জনের বেশ অন্তরঙ্গতা।

.

ফোন বাজছে। শফিক ফোন করেছে। ‘শুনেছ? এই মজিদ ভাইয়ের জ্বালায় তো মরে গেলাম।’ খুব বিরক্ত হয়েই শফিক বলল। ‘তুমি কি কিছু করতে পারবা?’

‘সে আবার কী? আমার কোন টাকা আছে নাকি?’ তানির জবাব শুনে শফিক ফোনটা রেখে দিল।

রাতে শফিক আবার বলল, ‘তুমি কি মজিদ ভাইকে কোন সাহায্য করতে পার? আটাশ কোটি টাকা আটকে দিয়েছে ব্যাংক। তার ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। মহা ফাঁপরে পড়ে গেছে লোকটা। মাত্র সপ্তাহ খানেকের জন্য বিশ লাখ টাকা লাগবে।’

‘বুঝতে পারছিনে আমি কী করতে পারি, আমাকেই বারবার বলছ কেন?’ একটু ঝাঁঝাল স্বরে বলল তানি।

‘তোমার গয়নাগুলো তো লকারেই পড়ে আছে,’ দ্বিধা করে বলল শফিক। ‘মাত্র সাত দিনের জন্য দিলে তো এমন কোন ক্ষতি হবে না। পঁয়তাল্লিশ ভরি মত দিলেই হবে।’

এতক্ষণে বুঝল তানি শফিকের মনোভাব। গয়নার বিষয়টা ওর মাথাতেই ছিল না। কারণ ছোটখাট ব্যবসায়িক বিপদে শফিক অনেকই পড়ে। কিন্তু কখনও সে গয়নার কথা বলেনি। এই প্রথম, তাও অন্যের বিপদে স্ত্রীকে ওগুলো দিতে বলল।

তানি বুঝল, সত্যি খুব কঠিন অবস্থা মজিদ সাহেবের। আর শফিক যে লোকটার প্রতি দরদী হয়ে উঠেছে, সেটা তানির কাছে খারাপ লাগল না। অনুভূতিশীল মানুষ ওর ভীষণ পছন্দ। তানি সবসময় মানুষকে সাহায্য করতে পছন্দ করে। সম্পদ জমিয়ে রাখা ওর সবচেয়ে অপছন্দ।

একটু ভেবে বলল ও, ‘ঠিক আছে, দেব, কিন্তু আমি যে সাত দিনের মধ্যে ওগুলো ফেরত পাব, তার গ্যারান্টি কত পার্সেন্ট?’

‘একশো পার্সেন্ট,’ শফিক বলল।

তানি উঠে গিয়ে একটা কলম আনল, তারপর দরজায় লিখল, সাত দিনের মধ্যে মজিদ ভাইকে দেয়া আমার পঁয়তাল্লিশ ভরি গয়না ফেরত পাব, একশো পার্সেন্ট গ্যারান্টি।

সকাল বেলা কলিং বেল শুনে দরজা খুলল তানি। অবাক হয়ে বলল, ‘মজিদ ভাই, আপনি?’

অনেকগুলো প্যাকেট তানির হাতে দিয়ে সে বলল, ‘আপনি আমার ছোট বোনের মত, রাতে শফিক ভাই জানাল আপনি বিপদ থেকে আমাকে বাঁচাচ্ছেন। জীবন দিয়ে আপনার এ উপকারের সম্মান রাখব আমি ইনশাল্লাহ্!’

তানি কিছুই না বলে তৈরি হয়ে এল লকার থেকে গয়নাগুলো তুলে আনার জন্য।

‘মজিদ ভাইয়ের গাড়িতেই চলো,’ শফিক বলল।

ফলগুলো টেবিলে রাখতেই টিকটিকি ডেকে উঠল: টিক্- টিক্-টিক্। তানি একটা অদ্ভুত ম্লান হাসি দিয়ে বেরিয়ে গেল।

সাত

টুবুনের বয়স এখন পনেরো বছর। পড়ে ক্লাস নাইনে, বুবুন বিশ। পড়ে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে। সেই পাঁচ থেকে পনেরো। মাঝে দশটি বছর চলে গেছে। অদ্ভুত ব্যাপার, এ দশ বছরে, একটিবারও দু’মেয়ের অসুস্থতার জন্য চোখের পানি ফেলতে হয়নি তানির। আর কখনও শ্বাসকষ্ট হয়নি টুবুনের।

শফিকের ব্যবসাতেও এখন আর অমন জাঁকজমক নেই। যে শফিক এক সময় বউকে দশ ভরি গয়না একসাথে কিনে সারপ্রাইজ দিয়েছে, এখন কেনা সম্ভব নয় আর। এটা শুধু ওর একার অবস্থা নয়, সমগ্র গার্মেন্টস শিল্পেই নেমেছে এই ধস। ওর সমসাময়িক যে প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল অধিকাংশই বন্ধ হয়ে গেছে। অসম্ভব পরিশ্রমী আর আত্মবিশ্বাসী শফিক আজও ধরে আছে তার ধসে যাওয়া ব্যবসার হাল। তবুও তানির কোন আক্ষেপ নেই খুইয়ে ফেলা গয়না নিয়ে। যদিও বড় হয়ে উঠছে দু’মেয়ে। দেখতে-দেখতেই ওরা হয়ে উঠবে বিয়ের যোগ্য। তানির বিশ্বাস ওর মন্দ কিছু ঘটবে না। হয়তো অত গয়নাগাটি মেয়েদের দিতে পারবে না, তবু ওদের অমঙ্গল হবে না।

আট

দুই মেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ। কিছুক্ষণ আগে স্বর্ণা গেল। ওর স্বামী জহির সাহেব ব্যাঙ্কার। পোস্টিং হয়েছে ঢাকার বাইরে। ছেলে সাদ, ঘুমিয়ে পড়ে সকাল-সকাল। দুই বন্ধু এখন অনেকটা সময় নির্ভেজাল কাটাতে পারে। তানির টিকটিকি বিষয়ক গল্পটা শুনে স্বর্ণা বিনা মন্তব্যে উঠে চলে গেল। তানি বুঝল, স্বর্ণাও হয়তো মনে-মনে ওকে বলল, ‘হুম, ভারি দিলদরিয়ার কাজ করেছ তুমি!’

.

তানি বই পড়ছিল। মাঝরাত্রি পর্যন্ত স্বামীর জন্য অপেক্ষা আগের মতই। শফিক ফিরল রাত একটায়। খেতে-খেতে সব সময়ের মতই বলল ও, ‘বুঝলে, বউ, গয়নাগুলো তুমি একদিন না একদিন ফেরত পাবেই। শুনেছি যাকাত না দিলে ওসব মানুষের থাকে না। আমি সব সময় হিসাবের টাকার চেয়েও বেশি যাকাত মানুষকে দিইনি, বলো? ওগুলো আমার রক্ত পানি করা পরিশ্রমে কেনা জিনিস। মজিদ ব্যাটা একদিন না একদিন দেখবে ঠিকই আমার হাতে ধরা খাবে। কতদিন আর ও চোরের মত লুকিয়ে চলবে? আর তুমিও কেমন মেয়েলোক, সারাজীবন শুনলাম মেয়েরা স্বামীকে ছেড়ে দিলেও গয়না ছাড়তে চায় না। সবাই তো দেখি আমার চাইতে তোমাকেই বেশি দোষ দেয়। ও, ভুলেই গেছি তুমি তো আবার মহিলা হাতেম তাই, মহিলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহা দার্শনিক!’,

দশটি বছর এই কথাগুলোই বলে চলেছে শফিক। তানির খুব খারাপ লাগে। ও একটা অপরাধবোধ নিয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকে। সাথে-সাথে একটা টিকটিকি ডেকে ওঠে, ‘টিক্-টিক্-টিক্।’

শফিক বলল, ‘নাহ্, তোমার দোস্ত টিকটিকিগুলোর জ্বালায় দেখি কথা বলেও শান্তি নেই। আর অদ্ভুত ঘটনা! সারা ঢাকা শহর খুঁজলেও মনে হয় এরকম গুইসাপ সাইজের টিকটিকি দেখা যাবে না কোথাও। ওরা কেমনে তোমাকে খুঁজে পেল? –

তানি হাসতে থাকে জোরে-জোরে। রাতে হাসির শব্দে ঘুম থেকে উঠে আসে টুবুন আর বুবুন। বলে, ‘কী হয়েছে, মা? এত জোরে-জোরে হাসছ কেন?’

এবার তানি মেয়েদেরকে জড়িয়ে ধরে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

টিক্-টিক্-টিক্-টিকটিকি ডাকছে। তানি হেসেই চলেছে। শফিক বলল, ‘তোদের মা খেপেছে রে, এত রাতে মান-ইজ্জত আর থাকল না। দরজা-জানালা বন্ধ কর।’

তানি কী করে বলবে শফিককে, মজিদ মিয়া আর। জীবনেও তোমার হাতে ধরা পড়বে না। গয়নাগুলোর সাথে যে বিনিময় করা হয়েছে সন্তানদের সুস্থতা। তানি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে, এ গয়না তার এমনিতেই যেত। মজিদ মিয়া উছিলা হয়ে এসেছিল মাত্র। টিকটিকির সাথে তানির সম্পর্ক সত্যি এক ব্যাখ্যাহীন বাস্তবতা-যা ঘটেই চলেছে…!

 

পোর্ট্রেট – ধ্রুব নীল

এক

রাত সাড়ে দশটা।

বছর দশেক হবে মেয়েটার বয়স। মায়াবি চোখ। কোঁকড়া চুল। চোখে ঘুম ঘুম ভাব। ঘুণে ধরা টেবিলের সামনে নড়বড়ে এক চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছে কারও জন্য। ছোট্ট ঘরটায় অল্প পাওয়ারের বাতির মিটমিট আলো তার ঘুমটা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে যেন। যে করেই হোক জেগে থাকতে হবে।

অপেক্ষার পালা শেষ হলো আধঘণ্টা পর। দরজা খোলার শব্দ শুনেই বুঝল, চুপিসারে ঢুকেছে কেউ একজন। মেয়েটা সচকিত। ড্রয়ার খুলে পেনসিল আর খাতা নিয়ে টেবিলে রাখল ঝটপট। পেনসিলের ডগাটা পরখ করে নিল। একদম তৈরি ওটা। শার্পনার আর ইরেজারও হাতের নাগালে। মেয়েটার পেছনে এসে দাঁড়াল লুঙ্গি আর পুরনো সোয়েটার পরা মধ্যবয়সী লোকটা। যে কিনা একটু আগেই ঘরে ঢুকেছে। কোনও কথা না বলে হাতের মোবাইল ফোনটা রাখল মেয়েটার সামনে। স্ক্রিনে এক যুবকের ছবি। ঘাড় বাঁকিয়ে ছবির দিকে তাকাল মেয়েটা। তাকিয়েই রইল। চোখ আর ফেরাল না। খাতার ওপর চলতে শুরু করল পেনসিল। কখনও খসখস শব্দ, কখনও আলতো করে ঘষছে পেনসিল আর ইরেজার। আলো-ছায়ায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে অবয়ব। মিনিট দশেকের মধ্যেই শেষ হলো আঁকা। দুটো ছবি মিলিয়ে দেখল পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা। মুখের হাসিই বলে দিল, একদম নিখুঁত হয়েছে পোর্ট্রেটটা। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘এইবার হারামি বুঝব কব্বরের আযাব কারে কয়।’

মেয়েটা হাসল না। তার চোখে ঘুম।

‘আমি ঘুমাই, চাচাজি?’

‘ঘুমা রে, মা, ঘুমা। কাইল তোরে এক প্যাকেট চকলেট কিনা দিমু। এখন আরাম কইরা ঘুম দে।’

দুই

‘তুই রহস্য গল্প লিখিস বলে ঘটনা তোরে কইলাম। খুব বেশি লোকে কিন্তু জানে না। জানলে বিশাল ঘটনা বেধে যাবে।’

‘গুড। ভাল করেছিস আমাকে বলে। এখন এটা নিয়ে একটা গল্প লিখি আর বলে বেড়াই, সত্য ঘটনা অবলম্বনে। তখন গোটা দেশ জেনে যাবে। হা-হা-হা।’

রহস্য গল্প লেখক তুষার ইশতিয়াক এসেছে তার বন্ধু মিলনের গ্রামের বাড়ি নিশিন্দাপুরে। মাথায় ঘুরছিল একটা থ্রিলারের প্লট। কিন্তু মিলন নাছোড়বান্দা। সে তার গল্পটা নিয়েই আছে। নিশিন্দাপুরে তিনকোনার মাথা বলে একটা জায়গা আছে। সেখানে আসমা নামের বছর দশেকের এক মেয়ের কী এক গোপন রহস্য জেনে ফেলেছে ও। এসেই বলে বসল অদ্ভুত কথাটা: ‘মেয়েটার ভয়ানক ক্ষমতা আছে। ছবি এঁকে মানুষ মেরে ফেলতে পারে।’

‘শুধু মানুষ? গরু-ছাগল এসব মারতে পারে না?’

‘তোদের মত অতি শিক্ষিতদের নিয়ে এই এক সমস্যা। আমিও দু’চার কলম বিজ্ঞান পড়েছি। স্কুলে বাংলা পড়াই বলে যে ফিজিক্স কিস্তু বুঝব না এমন ভাবার কারণ নাই। তুই দেখতে যাবি কি না বল! আর হ্যাঁ, যার ছবি আঁকে, সে-ই মারা যায়। এটা ওপেন সিক্রেট। সবাই জানে, কেউ ভয়ে কিছু বলে না। যদি আবার তার ছবি এঁকে ফেলে?’

‘কী দেখব? মেয়েটা ছবি আঁকছে আর মানুষ মরে যাচ্ছে?’

‘দেখ, ঘটনা কিছু আছে এর মধ্যে। মেয়েটা স্কুলে যায় না। কেউ তার সঙ্গে মেশেও না। ওর হাতে কাগজ-কলম দেখলে লোকে এক শ’ হাত দূর দিয়ে হাঁটে।’

‘কী ভয়ানক!’

‘অবশ্যই ভয়ানক!’

‘আমি মেয়েটার কথা বলছি না! সবাই ওর প্রতি যে আচরণ করছে, সেটা ভয়ানক।’

‘তোর মাথা! আগে দেইখা আয় নিজের চোখে।’

মিলনের চেহারা দেখে আর কথা বাড়াল না তুষার। মনের খচ-খচানিও আছে বৈকি। ভুতুড়ে রহস্য ছাড়া গ্রামে ঘোরাঘুরিটা ঠিক জমে না।

দুপুরে খেয়ে বের হলো দুই বন্ধু। মাইলখানেকের হাঁটাপথ। পথে যেতে কানে এল কান্নার রোল। আশপাশে মারা গেছে কেউ।

‘মোটরসাইকেল অ্যাক্সিডেন্ট। লোকাল এক নেতার ছেলে,’ বলল মিলন। ‘চৌধুরী সাবের পোলা। নাম বকুল। বদের হাড্ডি ছিল। যদিও মারা গেছে, তারপরও না বইলা উপায় নাই। ওর যন্ত্রণায় গ্রামের কয়েকটা মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আরও অনেক কেস। চল, একটু দেখে আসি।’

‘নাহ, আমার ইচ্ছা নাই।’

‘আরে, ভয়ের কারণ নাই। ধাক্কা লেগে শুধু মাথার খুলি খানিকটা ফেটেছে। ভয়ানক কিছু না।’

তুষার জানে, বাধা দিয়ে লাভ নেই। মিলনের সব কিছুতেই অতি আগ্রহ।

লাশের চেহারা স্বাভাবিক। বয়স ত্রিশের ঘরে। লাশ দেখা শেষে দু’জনে চলে গেল তিনকোনার মাথার একপ্রান্তে পড়ে থাকা ছোট টিনের চালার বাড়িটায়। উঠোন ভর্তি গাছগাছালি। কলতলার আশপাশে ঝোপঝাড়। ভুতুড়ে আবহ তৈরির জন্য যথেষ্ট।

‘রইসু ভাই আছেন?’

অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর এক নারীকণ্ঠ শুনতে পেল দু’জন। ‘উনি বাড়ি নাই। পরে আসেন।’

‘আমার সঙ্গে ঢাকা থেকে সাংবাদিক এসেছেন। তিনি আসমার আঁকা ছবি দেখতে চান। শহরের পত্রিকায় ছাপবেন। আমরা উঠোনে বসলাম।’

মিলনের অবলীলায় মিথ্যে বলার ক্ষমতা দেখে অবাক হলো না তুষার। এসব না বললে সম্ভবত দেখাই হবে না।

‘আপনারা পরে আসেন। আসমার শরীর ভাল না।’

‘আমরা হাজিপাড়া থেকে আসছি। দুই মাইলের হাঁটাপথ। এখন কেমনে কী করি?’

কিছুক্ষণ নীরবতা। এরপর উঠোনে দুটো চেয়ার পেতে দিল ওই নারী।

‘রইসু ভাই আমার পরিচিত। আপনার লগে আমার খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হয় নাই।’

‘আমি আসমার চাচী।’

তুষার চুপচাপ চেয়ারে বসে পড়লেও মিলন বারবার উঁকি দিচ্ছে ভেতরে। আসমার মুখটা এক ঝলক দেখেওছে।

‘আমি জানি আপনারা কেন আসছেন।‘

আসমার চাচীর গলার ক্ষোভটা কান এড়াল না তুষারের।

তবে উনি আর কথা বললেন না।

রইসু নামের মধ্যবয়সী লোকটা এল একটু পর। মিলন ও তার বন্ধুকে দেখে চমকে উঠল। নিজেকে স্বাভাবিক করে নিতে সময় নিল না।

‘কী চান আপনেরা?’

‘আসমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।’

‘কী কাম তার লগে?’

এবার মুখ খুলল তুষার। ‘তার ছবি আঁকার বিষয়টা নিয়ে গ্রামে একটা গুজব রটেছে। এটা ভেঙে দেয়া জরুরি। তা না হলে…’

রইসু স্থির। ঢিলটা জায়গামত লেগেছে দেখে খুশি তুষার। মিলনও আমতা আমতা করে বলল, ‘হুম। আসলে এটা যে একটা গুজব, সেটা না জানলে পরে আসমা গ্রামেই থাকতে পারবে না। ওর ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এ নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি দরকার।’

রইসু কিছু বলতে যাবে, তার আগেই স্ত্রীর ইশারায় ভেতরে গেল। সম্ভবত আসমার চাচী তাকে বুঝিয়ে দিল যে তুষারদের কথাই ঠিক।

‘আইচ্ছা, ঠিকাছে। এখন কী চান?’

তুষার বলল, ‘আমি শুনলাম, আসমা যার ছবি আঁকে, সে নাকি মারা যায়। হে-হে, তো, আমার একটা ছবি আঁকুক না?’

‘ফাইজলামি করেন?’

স্ত্রীর চোখে চেয়ে আবার শান্ত হয়ে গেল রইসু। ওদিকে দরজার আড়ালে দাঁড়ানো আসমাকে ইশারায় ডাক দিল মিলন। আসমার হাতে পেনসিল ও খাতা।

তিন

গ্রামে খবর ছড়াতে সময় লাগে না। এর জন্য অবশ্য মিলনের দোষ নেই। চালাকিটা তুষারেরই। রইসুর সঙ্গে তাদের কথাবার্তা শুনছিল পাশের কয়েকজন ছেলে আর বয়স্ক মহিলা। তুষার তাদের শুনিয়ে শুনিয়েই বলেছে, আসমা তার ছবি আঁকবে ভরা মজলিসে। গ্রামের অনেকেই থাকবে। এবং সে দেখিয়ে দেবে আসমাকে নিয়ে ঘটনাটা গুজব ছাড়া কিছুই নয়।

আসমাকে নিয়ে এরমধ্যে বেশ ক’টি গল্প শোনা হয়ে গেছে তুষারের। গ্রামের লোকজনই বলেছে।

‘আসমার বয়স যখন পাঁচ। তখন থেকে আচমকা ছবি আঁকা শুরু। যা দেখে হুবহু আঁইকা ফালায়। আমরা তো খুশি। এমুন এক গুণবতী আমাদের গেরামে! কিন্তুক, একবার সে আমার ছাগলটার ছবি আঁইকা ফেলল। ওই দিন রাতেই তড়পাইতে তড়পাইতে ছাগলটা আমার মইরে গেল।’

আরেকজন বলল, ‘ক্যান! আসমার বাপের কথা কও!’

নড়েচড়ে বসল তুষার। বেড়েছে মনের খচ খচানি। -’ওর বাপও আপনার মত বাজি ধরসিল। গেরামে সবাই কয় আসমার উপরে একটা কিছু ভর করসে। কিন্তুক, হের বাপে বিশ্বাস করত না। আসমারে ধমকাইয়া-টমকাইয়া কইল, বেটি, তুই এখন হগ্গলের সামনে আমার ছবি আঁকবি! হুবহু আঁকবি!’

‘তারপর?’

‘তারপর আর কী! রাইত না পার হইতেই বেডা কাইত!’

‘কীভাবে মারা গেলেন উনি?’

‘রাইতে মসজিদ থেইকা আসার পথেই সাপে কাটল। আহা রে, জোয়ান মানুষটা। মা তো আগেই গেছে। এরপর বাপ। তারপর থেইকা রইসুর কাছে থাকে আসমা। কেমুন জানি চাচা লাগে তার।’

‘আচ্ছা।’ হাঁফ ছাড়ল তুষার। কাকতালীয় শব্দটাকে বেশ ক্ষমতাধর মনে হচ্ছে।

মিলনের আগ্রহের কমতি নেই। সে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আরও গল্প আদায় করে নিতে ব্যস্ত।

.

সময় ঠিক হলো বিকাল চারটা।

গ্রামের অনেকেই এসেছে। সবার মাঝে উৎসবের আমেজ। এর মধ্যে চা-মুড়ি পর্বও হয়েছে। আসমা সেজেগুজে বসে আছে উঠোনে। তার হাতে পেনসিল আর ড্রয়িং বোর্ডে লাগানো সাধারণ একটা কাগজ। মুখোমুখি চেয়ারে সটান বসে আছে তুষার। এরমধ্যে নিজের ক্যামেরায় আসমার একটা ছবিও তুলে নিল।

শুরু হলো ছবি আঁকা। বসে আছে তুষার। দশ মিনিটের মধ্যেই আঁকা শেষ। সবাই তাকাল তুষারের দিকে। পিনপতন নীরবতা। আচমকা বুকে হাত দিয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল তুষার।

লাফিয়ে উঠল মিলন। ‘তুষার! তুষার!’

হই-হই রব উঠল দর্শকদের মধ্যে।

আসমা মাটির দিকে তাকিয়ে আছে চুপচাপ। কেমন যেন রাগে ফেটে পড়ছে তার চোখ। বোর্ড থেকে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল কাগজটা।

অভিনয়টা বেশিক্ষণ জারি রাখল না তুষার। বাচ্চা মেয়েটা কষ্ট পেয়েছে বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে তিরস্কার করল। সবার দিকে তাকিয়ে সলজ্জ হেসে বোঝানোর চেষ্টা করল, আসমার বিষয়টা কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু আসমার রাগী চেহারাটা কিছুতেই তাড়াতে পারছে না মন থেকে। কুড়িয়ে নিল ছবি আঁকা কাগজটা। অবাক হলো। মেয়েটা অসাধারণ আঁকে। একদম যাকে বলে ফটোরিয়েলিস্টিক। ছবিটা ভাঁজ করে বুকপকেটে রেখে দিল তুষার।

সন্ধ্যা ঘনাতেই খালি হয়েছে রইসুর উঠোন। কাউকে তেমন অবাক বা হতাশ হতে দেখা গেল না। মিলন অস্থির চিত্তে পায়চারি করছে আর বারবার একই কথা আওড়াচ্ছে, ‘সঙ্গে সঙ্গে কেউ মারা যায়নি। চব্বিশ ঘণ্টার মামলা আছে। এখন মাত্র একঘণ্টা গেছে। তুই কাজটা ঠিক করিস নাই! আমি এখন তোরে কই নিয়া যাই রে, বন্ধু!‘

‘কোথায় নিয়ে যাবি?’

‘ঢাকা এখান থেকে দশ ঘণ্টার পথ। তোর এখন কিছু হলে হাসপাতালে নিতে হইব।’ আহত দৃষ্টি মিলনের। যেন চোখের সামনে জলজ্যান্ত বন্ধুটাকে মরতে দেখছে।

হাসি খেলে গেল তুষারের চোখে। ‘তুই আমার অভিনয়টাকে সত্যি ভেবেছিলি! হা-হাহ্-হা! আর ছবি আঁকলে যদি মারাই যাব, তো হাসপাতাল আমাকে বাঁচাতে পারবে?’

‘শোনেন! এদিকে আসেন!’

ধমকের সুরে কথাটা বলল আসমা। তার সঙ্গে মাথায় আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে আছে রইসুর স্ত্রী।

‘আসমা, আমি সরি! মানে দুঃখিত। তুমি কষ্ট পেয়েছ। তবে আমি যে বেঁচে আছি, এটা মনে হয় ভালই হলো, নাকি!’

তুষারের কণ্ঠে কৌতুকের ছাপ ধরতে পেরেছে কি না বোঝা গেল না। তবে আসমা তার সামনে আরেকটা কাগজ বাড়িয়ে ধরল। ছবিটা দেখল তুষার ও মিলন। চেনা চেনা মনে হলো।

চলে গেল আসমা ও তার চাচী।

সুনসান নীরবতা।

একে অন্যের দিকে তাকাল তুষার আর মিলন। চিনতে পেরেছে ওরা ছবির মানুষটাকে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া বকুল!

চার

‘ছবিটা পুড়িয়ে ফেলা দরকার।’ মিলনের গলা কাঁপছে।

‘অবশ্যই না। সুন্দর পোর্ট্রেট।’ নির্বিকার তুষার।

‘তুই এখনও বিশ্বাস করছিস না?’

‘কাকতাল বলে একটা ব্যাপার আছে। না হয় অ্যাক্সিডেন্টের পরেই এঁকেছে ও। অবশ্য, এটার কথা জানানো ঠিক হবে না কাউকে। মেয়েটা বিপদে পড়বে। গ্রামের মানুষ তো।’

‘গ্রামের মানুষ তো কী? আমিও তো গ্রামের মানুষ। তো?’

‘না কিছু না। তুই একটু বাড়াবাড়ি করছিস, মিলন। ছেলেটা ওই ছাগলের মত ছটফট করে মরেনি। মদ খেয়ে নিশ্চয়ই বাইক চালাচ্ছিল।’

‘কিন্তু আসমা সেটা আগেই জানে, এবং সে ছবিও এঁকে ফেলেছে।’

‘হুম। সেটাই কাকতাল। কে জানে, হয়তো গ্রামের সবার পোর্ট্রেট সে আগেই এঁকে রেখেছে। যখন মারা যাবে, তারটা বের করে দেখাবে।’ তুষারের কঠিন যুক্তি।

পাল্টা জবাব দিতে পারল না মিলন। তুষারের লেখক মগজের যুক্তি মেনে নিয়ে আপাতত চুপ থাকার সিদ্ধান্ত নিল। তবে বারবার বন্ধুকে পরখ করে নিতে ভুল করছে না। সেটা দেখে বিরক্ত হলেও কিছু বলল না তুষার। তার আচমকা মরে যাওয়া নিয়ে মিলন যে টেনশনে আছে, এটা ভাবতে বরং ভালই লাগছে তার।

বাড়ির পথ ধরল দু’জন। ছবিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে তুষার। গ্রামের সবার পোর্ট্রেট আগেই করে রেখেছে মেয়েটা, নিজের কানেই কথাটা অবিশ্বাস্য লেগেছে তার। ছবিটা দেখেই মনে হয় সামনাসামনি নয়, কোনও একটা ছবি দেখেই এটা এঁকেছে আসমা।

অর্ধেকটা পথ এগিয়েছে সবে, এমন সময় দুই বন্ধুর পথ আগলে দাঁড়াল রইসু।

‘ভাইজানেরা, একটু দাঁড়ান।’

খানিকটা ভড়কে গেলেও সামলে নিল দু’জন।

‘আসমা মাইয়াডা একটু অইন্যরকম। একটু আলাভোলা। লোকে নানান কথাবার্তা কয়। আমগো শত্রুও অনেক। অনেকেই ডরায়। তয়, বাবাজি, আপনে শহর থেইকা আসছেন। মিলনের বন্ধু। আপনের কাছে অনুরোধ, আপনে এইডা নিয়া কিসু লিখতে যাইয়েন না।’

‘না-না, প্রশ্নই আসে না! গুজবে ঘি ঢালব কোন্ দুঃখে?’

কথাটা শুনে কেমন যেন আহত দেখাল রইসুকে।

‘তয়, বাবাজি, ছবিটা আমারে দিয়া দেন। আসমা যেটা দিসে।’

‘এই নিন।’

আবারও সেই খচ-খচে অনুভূতি। তুষার স্পষ্ট বুঝতে পারল, ছবিটা নিতেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছিল রইসু। তার সঙ্গে নিহত ওই যুবকের কোনও সম্পর্ক নেই তো?

বাসায় ফিরেই আবার বেরিয়ে গেল মিলন। তার চলাফেরা এখন অনেকটা দুদে গোয়েন্দাদের মত। তুষারকে একটা কিছু বিশ্বাস করিয়ে ছাড়া পর্যন্ত থামবে না ও। গ্রামের মানুষের কাছ থেকে কথা বের করতে সময় লাগল না তার। রাতের মধ্যেই জেনে নিল ঘটনা। নিহত যুবকের নাম বকুল। বেশ ক’দিন ধরেই নাকি রইসুর স্ত্রীকে বিরক্ত করে আসছিল সে।

পাঁচ

হাই তুলতে গিয়ে মাঝপথে আটকে গেল তুষার। বিছানার পাশে বড় বড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে মিলন। বন্ধুকে হাই তুলতে দেখে হাঁফ ছাড়ল।

‘সারারাত ঘুমাসনি?’ ভ্রূ কুঁচকে জানতে চাইল তুষার।

‘না, অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে বসে ছিলাম,’ খুশি হলেও বিরক্তির ভান করল মিলন।

‘তুই কি হতাশ? আমি মরিনি দেখে?’

মিলন কিছু বলল না। নাস্তার টেবিলেও কথা হলো না খুব একটা। ঘুরতে বের হলো দু’জন। কথাবার্তা বিশেষ হচ্ছে না। তুষারের মনে হলো আসমাকে দিয়ে নিজের ছবি আঁকানোটাই ভুল হয়েছে।

‘চব্বিশ ঘণ্টা এখনও পার হয় নাই,’ বিড়বিড় করে বলল মিলন। একটা শাখা নদীর কাছে চলে এসেছে। তুষার কিছু বলতে যাবে, এমন সময় হই-চই কানে এল। আসমাদের বাড়ির দিক থেকে। ছুট লাগাল দু’জন।

তুষারের আশঙ্কাই সত্যি হলো। রইসুর বাড়ির সামনের রাস্তা ও পাশের খালি জমিতে গ্রামবাসীর ভিড়। মুখে কাপড় পেঁচানো লাঠি হাতে একদল লোকও আছে। ঘটনা পরিষ্কার হলো মুখে কাপড় পরা একজনের কথায়।

‘ওই পিশাচিনীরে আমি মাইরা ফালামু। তুই আমারে চিনস নাই। ঘরে দুধকলা দিয়া তুই পিশাচ পালতেছিস, রইসু! সাবধান! এই গেরামের কাউরে সে বাঁচতে দিব না। তুই মাইয়াডারে বাইর, কর, আইজকাই শেষ কইরা দিমু! আমার পোলারে মারছস তুই! আমার পোলারে!’

‘বকুলের বাপ! খবর ফাঁস হয়ে গেছে রে।’ ফিসফিস করে বলল মিলন।

‘ওরা মুখোশ পরে আছে কেন?’ জানতে চাইল তুষার। ‘বুঝলি না! ওদের ছবি যদি আবার আসমা এঁকে ফেলে!’

‘উফ্। কী থেকে কী! পুলিশ ডাক দে। মেয়েটার তো ভালই বিপদ!’

এদিকে নিহত যুবক বকুলের বাবা চেঁচিয়েই যাচ্ছে। ‘তোকে মোবাইল হাতে ঘুর-ঘুর করতে দেখসে আমার লোক। তুই আমার পোলার ছবি তুলছস। তোর ঘর তল্লাশি করুম আমরা।’

রইসুও কম যায় না, ‘আপনে কিন্তু বাড়াবাড়ি করতাসেন। আমি মামলা করুম কইলাম! পোলা মরসে দেইখা কিছু কইলাম না। কিন্তু গেরামের দশজনরে জিগান, আপনের পোলা কেমুন আছিল। সে যাউকগা। অ্যাক্সিডেন্টে মরসে, এটা সবাই জানে। ক্যান শুধু শুধু আমার মাইয়ারে দোষ দেন!’

ও তোর মাইয়া কেডা কইসে! তুই ওর পাতাইন্না চাচা। ওই মাইয়া তার বাপরে মারসে! এখন তুই কালসাপ পুষতেছিস! খবরদার! আমি ওরে দেইখা লমু!’

এরপর হুট করে ঘটল কতগুলো ঘটনা। বাড়ির ভেতর থেকে সামনের রাস্তায় হুড়মুড় করে বের হলো আসমা। হাতে পেনসিল আর কাগজ। তাকে এভাবে ছুটে আসতে দেখে হম্বিতম্বি করতে থাকা লোকগুলো আচমকা পিছিয়ে গেল। ভয় জিনিসটা দারুণ ছোঁয়াচে। সঙ্গে সঙ্গে ভিড় জমানো লোকগুলোও চলে গেল। বকুলের বাবা ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা কাপড় দিয়ে মুখ-চোখ ঢাকতে ব্যস্ত। পড়ে গেছে কারও কারও হাতের লাঠি। শাসাতে শাসাতে একপর্যায়ে চলে গেল প্রত্যেকে। আসমাও হনহন করে আবার ঢুকে পড়ল ঘরে। সবাই চলে যাওয়ায় এগিয়ে গেল তুষার। অনিচ্ছাসত্ত্বেও পিছু নিল মিলন।

‘রইসু ভাই। একটু আসমার সঙ্গে কথা বলব।’

‘না, কোনও কথা নাই। আপনে যান! বাইর হন!’

মিলন ইশারায় কী যেন বোঝাতে চাইল রইসুকে। সাংবাদিক শব্দটা শুনে ঘাবড়ে গেল।

‘দেখেন, মেয়েটা বহুত পেরেশানিতে আছে,’ বলল রইসু।

‘হুম। কিন্তু মোবাইলে ছবি তোলার বিষয়টা তো সত্য। পেরেশানি তো আপনিই তৈরি করেছেন!’ এবার উল্টো রইসুকে শাসাল তুষার।

মুহূর্তে মিইয়ে গেল লোকটা। মিনমিন করে কী যেন বলতে চাইল। কিন্তু অনেকটা জোর করেই ঘরে ঢুকে গেল তুষার। পিছু নিল মিলন। সোজা চলে গেল আসমার ঘরে। রাগ নয়, মেয়েটার চোখে কেমন যেন হতাশার ছাপ।

‘আসমা, শোনো।’

‘আমি জানি আপনি কী কইবেন।’

‘কী বলব?’

‘আমি ঠিক আছি। পিশাচিনী না। তয় আমি কারও ছবি আঁকতে চাই না।’

‘তুমি অবশ্যই আঁকবে। সবার ছবি আঁকবে।’

‘আমি কাউরে মারতে চাই না। চাচায় আমারে বলসে লোকটা বদ। চাচী আর আমারে মাইরা ফেলবে কইসে। এইজন্য আঁকসিলাম।’

‘আমি সেটা বলিনি। তুমি আঁকলে মানুষ মারা যাবে, এটা ডাহা মিথ্যে কথা। তুমি এসব বিশ্বাস করবে না। তুমি চমৎকার ছবি আঁকো। তোমার উচিত বেশি বেশি আঁকা।’

আসমাকে এবার আহত দেখাল। মনে হচ্ছে যেন তুষারের কথা সত্য হলেই সে খুশি হত।

তুষার বলল, ‘তা হলে আমাকে বলো, তুমি আমার ছবি এঁকেছ, আমি মারা যাচ্ছি না কেন? আমাকে তুমি পছন্দ করো, তাই?’

আসমা নীরব।

‘আচ্ছা, তোমার চাচা কি তোমাকে মাঝে মাঝেই ছবি আঁকায় নাকি?’ প্রশ্নটা নিজের কানে বেখাপ্পা শোনালেও না জিজ্ঞেস করে পারল না তুষার।

পেছনে ততক্ষণে রইসু এসে দাঁড়িয়েছে।

‘ভাইজান, আপনেরা যান। বহুত পেরেশানিতে আছি। আর না। আমরা ভিটা ছাইড়া ভাগব।’

‘কেন! আপনার হাতে তো ব্যাপক ক্ষমতা। কেউ কিছু বললে তার ছবি আঁকিয়ে নেবেন আসমাকে দিয়ে, হা-হা-হা! পালাবেন কেন?’

 

 

মিলন অনেকটা জোর করেই তুষারকে টেনে বের করল আসমার রুম থেকে। এরপর একটা ভ্যানে করে দু’জনে চলে এল বাড়িতে।

শীতের রাত। কুয়াশাও বেশ। এর মধ্যে কোথা থেকে যেন খই জোগাড় করেছে মিলন। গুড় দিয়ে ওটা চিবিয়ে চলেছে দু’জনে। তুষারের পোর্ট্রেট আঁকার চব্বিশ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। মিলনকে বেশ নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছে। বলা যায় নিজের আগের রূপে ফিরে গেছে ও।

‘চল, দোস্ত, খেজুরের রস চুরি করি। এই অ্যাডভেঞ্চার তুই আর কখনও পাবি না।’

‘হুম। চুরি করব ভাবছি। তবে রস নয়। আরেকটা জিনিস।’

মিলন সতর্ক।

‘আসমার টেবিলের নিচে রাখা একটা বাক্সে একটা স্কেচ খাতা দেখেছি। আমরা যাব ওটা চুরি করতে।’

ছয়

শীতের রাতে গ্রামে আটটা বাজতেই লেপমুড়ি দেয় সবাই। তবে রিস্ক নিল না দুই বন্ধু। দশটা বাজতেই রাতের গ্রাম দেখার নাম করে চাদর মুড়ি দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। উত্তেজনার কারণে গায়ে লাগছে না হাড়কাঁপানো শীত। রইসুর বাড়িতে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সবাই ঘুমিয়ে। মিলনের চালচলনে জেমস বণ্ডের ভাব। চিকন তার দিয়ে দরজার খিল খুলতে গিয়ে দু’বার শব্দও করেছে। তবে তাতে ভাঙেনি কারও ঘুম। ধরা পড়লে কী করবে, সেটাও ঠিক করে আসেনি তুষার। একটাই ভরসা: রইসুর টাকা-পয়সা বিশেষ নেই। তাই তুষার আর মিলনকে ছিঁচকে চোরও দাবি করতে পারবে না। এতসব আপাতত ভাবছে না দু’জন। খিল খুলতেই আলতো করে দরজায় ধাক্কা দিল। নিজেরা সেঁধিয়ে গিয়ে টেনে দিল দরজা। খিল লাগাল না। পাছে আবার যদি জলদি পালাতে হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমেই বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দিল রইসুর ঘরের। আসমা সামনের দিকে একটা ঘরে চৌকিতে একা ঘুমায়। রইসুর নাক ডাকার হালকা শব্দ পাচ্ছে ওরা। সেলফোনের টর্চের আলো ফেলল আসমার পড়ার টেবিলের নিচে। স্কেচের খাতাটা দেখতে পেল না। মিলন দাঁড়িয়ে আছে অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে। কেউ জেগে গেলে যেন তাকে ধাক্কা দিয়ে পালানো যায়। কিন্তু আপাতত সেই আশঙ্কা নেই মনে হচ্ছে।

তুষার খুঁজেই চলেছে।

মিলন তাকিয়ে আছে সদর দরজার দিকে। খসখস শব্দ শুনে কান খাড়া। তুষারের খেয়াল নেই। মিলন ইশারা করল। পাত্তা দিল না তুষার। ক্যাচ-ক্যাঁচ করে খুলে গেল সদর দরজা। সাহস উবে গেল মিলনের। তুষারকে ইশারা করায় সে-ও চুপ। টর্চ নিভিয়ে দু’জন আসমার চৌকি ঘেঁষা দেয়ালে একেবারে সিঁটিয়ে রইল। কেউ একজন ঢুকেছে। এবং সে-ও যে চুরি করতেই ঢুকেছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু রইসুর ঘরে চুরি! মুহূর্তে মাথা খেলে গেল তুষারের। বুঝে ফেলল ঘটনা। মুখে কাপড় পেঁচানো লোকটা সতর্ক চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। চাঁদের আলোর প্রতিফলনে হাতের রামদাটা ক্ষণিকের জন্য চকচক করে উঠল।

ভয় প্রথমে কাবু করে। পরে মগজ তার নিজের মত করে বানিয়ে নেয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দুই বন্ধুর মগজেই চালু হয়ে গেছে ডিফেন্স মেকানিজম।

ঘুমিয়ে থাকা আসমার দিকে এগিয়ে আসছে রামদা ধরা লোকটা।

স্ট্যাচু হয়ে আছে তুষার আর মিলন। সামান্য ভুলচুক হলে নিজেদেরও কোপ খাওয়ার আশঙ্কা। এদিকে কোনও শব্দ না হলেও নড়েচড়ে উঠল আসমা।

ঘুমের ঘোরে বিপদও টের পায় না তো মেয়েটা?

শুকিয়ে গেছে মিলনের মুখ। একটা কিছুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তুষার তাকিয়ে আছে আসমার পায়ের কাছে থাকা লেপটার দিকে।

দ্রুতই ঘটে গেল ঘটনাগুলো। লোকটা রামদা উঁচু করেছে কোপ দেয়ার জন্য। এমনসময় চোখ মেলে তাকাল আসমা। চিৎকার দিল না মেয়েটা।

তুষার এক ঝটকায় লেপটা তুলে ঝাঁপ দিল রামদা ধরা লোকটার ওপর। লেপ থাকায় ধারাল দা নিয়ে ভাবতে হলো না তাকে। তবে আলগোছে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ভ্যাবাচেকা খাওয়া লোকটা। পরের কাজটা করল মিলন। লাইটটা অন করে দিয়েই পেছন থেকে গলা আঁকড়ে ধরল লোকটার। আসমা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। তুষার নিজেকে সামলে নিয়ে লোকটার মুখে আনাড়ি হাতে ঘুষি বসাল। বিশেষ সুবিধা হয়নি। তাগড়া লোকটা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে দুদ্দাড় করে। একপর্যায়ে হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে দিল মিলনকে। আসমা ততক্ষণে উঠে চৌকির অন্যপাশে চলে গেছে। মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিল একটা স্কুলব্যাগ। তুষার ক্ষণিকের জন্য আসমার দিকে তাকাতেই অঘটনটা ঘটল। তুষারের কপালের ডানপাশে দড়াম করে ঘুষি বাগাল লোকটা। মাথা দুলে উঠল তুষারের। কাজ করছে না মাথা। কপালে হাত রেখে চৌকিতে বসে পড়ল ও। লোকটা এদিক-ওদিক তাকিয়ে রামদাটা খুঁজছে। মিলন তার সর্বশক্তি দিয়ে আবারও পেছন থেকে ঝাপটে ধরল। তুষার চিৎকার দিয়ে রইসুর ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করল। কিন্তু গলা দিয়ে বেরোচ্ছে না শব্দ। আর ঘুম ভাঙলেও লাভ নেই। বাইরে থেকে সে নিজেই ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়েছে। আসমার ওপর রাগ হলো খুব। সে-ও শব্দ করছে না। এরকম ভয়াবহ সময়ে হাতে খাতা আর পেনসিল নিয়ে করছেটা কী মেয়েটা!

’তুষার, ওঠ! শালারে মার!’

‘রইসুকে ডাক দে!’

‘আগে শালারে সাইজ কর্। পরে! নইলে পুলিশি ঝামেলা!’

আততায়ীকে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারবে না মিলন। তুষার উঠে গিয়ে আরেকটা ঘুষি পাকানোর চেষ্টা করল। তবে পারল না।

কানে আসছে আসমার পেনসিলের খসখস শব্দটা। হঠাৎ পুরো শরীর দুলে উঠল তার। বসে পড়ল মেঝেতে। শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি যেন। লোকটার মুখে ক্রূর হাসি। মিলন তার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। রামদাটা দেখতে পেয়েছে ওরা দু’জন। টেবিলের পায়ার সঙ্গে লেগে আছে। ছাড়া পেলে নিশ্চিত কাউকে আস্ত রাখবে না আততায়ী। পেরে উঠল না মিলন। এক ঝটকায় তাকে ছুঁড়ে ফেলল লোকটা। চোখের কোনায় তুষার সব দেখছে। সামনে এগোতে যাবে, অমনি মেঝেতে পিছলে দড়াম করে পড়ল লোকটা। থরথর করে কিছুক্ষণ কাঁপল বিশাল দেহটা। এরপর কোনও নড়চড় নেই। কসরত করে ফের উঠে দাঁড়াল দুই বন্ধু। নিচে ভেজা ভেজা কী যেন। রক্ত!

রামদাটার চোখা মাথা লোকটার চোখ এ-ফোঁড় ও- ফোঁড় করে ঢুকে গেছে!

চৌকির ওপাশে ভয়ার্ত চোখে চেয়ে থাকা আসমা। ওর হাতের কাগজে চোখ পড়ল দু’জনের। আততায়ীর পোর্ট্রেট!

সাত

অনেকগুলো ফোনকল, বানানো গল্প আর শেষমেশ আসমার জবানবন্দি; এসবের কারণে এ যাত্রা বেঁচেই গেল তুষার ও মিলন। তাদের গল্পটাও বিশ্বাসযোগ্য। রইসুর কাছেই এসেছিল আসমার গল্প শুনতে। এসে দেখে দরজা খোলা। ভেতরে ঢুকে দেখে রামদা হাতে এক লোক আসমাকে মারতে যাচ্ছে। কিন্তু নিজেই চিৎপটাং হয়ে পড়ে যায় রামদার ওপর। ওরাই গিয়ে পরে রইসুর দরজা খুলে দেয় আর পুলিশকে খবর দেয়। এদিকে নিহত লোকটা ছিল তিন-চারটা খুনের মামলার পলাতক আসামী। পুলিশের খাতায় দুইয়ে-দুইয়ে চার। তবে ছাড় দেয়ার পাত্র নয় বকুলের বাবা। ক্ষমতার পুরো দাপট কাজে লাগানোর চেষ্টায় আছে। যথারীতি ঘটনাস্থলে এসেছে মাংকি টুপি পরে। তুষার আর মিলনকেও একহাত দেখে নেয়ার কথা বলেছে এক ফাঁকে।

আসলে ঝামেলা পাকিয়ে দিয়েছে আসমার আঁকা ছবিটা। এত কিছুর মধ্যে আততায়ীর পোর্ট্রেট আঁকল কখন? রইসুর উত্তর, ‘ছবি মরার পরেই এঁকেছে ও। চোখের সামনে যাকে দেখে, তাকে আঁকে। মাইয়াডার একটু মাথায় সমস্যা আছে, স্যর।’

পুলিশের ওসি আমুদে লোক। কুখ্যাত আসামীকে এভাবে ঘায়েল হতে দেখে ভেতরে ভেতরে তিনিও খুশি। আসমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তা, মামণি, আমার একখান ছবি আঁইকা দাও তো দেখি।’

তুষারের একবার ইচ্ছা হলো বলে, না থাক দরকার নেই। কিন্তু চুপ মেরে রইল। আততায়ীর মৃত্যুটা দুর্ঘটনাই। বাধা দিল বকুলের বাবাও। ‘খবরদার, আঁকবি না। আঁকলে তোরে…না মানে… ওসি সাব, ও যার ছবি আঁকে, সে মারা যায়। আপনে ভুলেও আঁকাইয়েন না। আর নাটের গুরু হইল ওই রইসু। সে এই মাইয়াডারে ব্যবহার করে। সে এই মাইয়ারে দিয়া অনেকরে মারসে। সে একটা খুনি।’

‘তাই নাকি! হো-হো-হো! আচ্ছা, আচ্ছা। কিন্তু গতরাতের খুনের চেষ্টার মোটিভ তো পাচ্ছি না। তা, চৌধুরী সাহেব, আপনার ছেলে না ক’দিন আগে মারা গেল? আপনি এখানে কেন? আপনার তো বাড়িতে থাকার কথা। যান, যান, রেস্ট নেন।’

‘শোন, আসমা! তুই বহুত মানুষরে মারছস! তুই আমার পোলার খুনি! আমি তোর এই চাচা-চাচীরে খতম কইরা দিমু!’

লোকটার কথাগুলোকে পাত্তা দিল না পুলিশ। ওসি ইশারা করতেই কয়েকজন কনস্টেবল বকুলের বাবাকে নিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দিল।

আপাতত বাড়ি যাওয়ার অনুমতি পেল তুষার আর মিলন। রাতেই থানায় খবর দিয়েছিল তারা। এ কারণে পুলিশের সুনজরে আছে দু’জন। তবে থানা আর আদালতে ডাক পড়তে পারে, এমনটাও জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

যাওয়ার সময় আসমার সঙ্গে দেখা করতে চাইল তুষার। মিলনের বাধা ডিঙিয়ে সোজা চলে গেল ঘটনাস্থলে। রক্তের দাগ তখনও শুকায়নি। স্কেচ খাতা বুকে জড়িয়ে একপাশে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আসমা। তুষারকে দেখে মুখ তুলে তাকাল। এরপর তাকে অবাক করে স্কেচ খাতা বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘আফনে এটা লইয়া যান। আফনেরে দিলাম এটা। ছাপাইয়া দিয়েন পত্রিকায়।’

আসমার কথাগুলো বুকের মধ্যে খচ করে বিধলেও স্বাভাবিক থাকল তুষার। ‘আচ্ছা, আপাতত নিয়ে গেলাম। পরে আবার ফেরত দেব তোমাকে।’

মিলন হ্যাঁচকা টানে তুষারকে নিয়ে রীতিমত হনহন করে হাঁটা দিল।

রইসুও স্ত্রীকে ইশারা করল।

পুলিশের কাজ শেষ হলেই তারা চলে যাবে কোনও এক আত্মীয়ের বাড়ি।

.

বিকেল।

জমেছে বেশ কুয়াশা।

আসমার স্কেচ খাতার একটা করে পাতা ওল্টাচ্ছে তুষার, আর হড়বড় করে বর্ণনা করছে মিলন।

‘আসমার সঙ্গে পড়ত। অনেক আগের ঘটনা। মাইয়াটা পানিতে ডুইবা মরসে।’

তুষার পাতা ওল্টাচ্ছে। কোনওটা সামনা-সামনি আঁকা পোর্ট্রেট। কোনওটা আবার গ্রামের পরিবেশে।

‘এটা খুড়ুম মিয়া। আসল নাম জানি না। লোকটাও বদের হাড্ডি। ডাকাত দলে যোগ দিসিল। মরসে ডাকাতি করতে গিয়া। আর এইটা নিতুনের মা। ওর একটা রোগ হইসিল। সারা গায়ে পচন ধরছিল। আমি শুনছিলাম ও-ই নাকি আসমার কাছে গিয়া বলছিল, তার যেন একটা ছবি আঁইকা দেয়।’

‘উনি মারা গেলেন কী করে? পচন ধরেই?’

‘আরে, নাহ্। ছবি আঁকছে কি সাধে! মহিলা রাস্তা পার হইতেছিল, সোজা বাসের চাকার তলে। এক সেকেণ্ডে শেষ।’

‘হুম। ব্যতিক্রম তা হলে আমি। হা-হা-হা। ভাল কথা, সবাই কি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই মারা গেছে? নাকি আমার হাতে এখনও মরার মত সময় আছে?’

মিলনের কঠিন চেহারা দেখে হাসি থামাল তুষার।

‘আমি আরেকটা পরীক্ষা নিতে চাই। ব্যবস্থা করে দে।’

‘কোনও কাম নাই। বহুত বড় বিপদ থেকে বাঁচছি। এখন তুই ভালয় ভালয় ঢাকা যা।’

‘উঁহুঁ। এর একটা বিহিত করতে হবে।’

‘কীসের বিহিত করবি! তুই বাঁইচা গেছস, এটাই বড় কথা। এখন এসব বাদ দে।’

‘ওর খাতাটা ফেরত দেব। এত সুন্দর সব পোর্ট্রেট। আমি এমনি এমনি নিয়ে যেতে পারি না।’

‘ফেরত দিয়া দে। আমারও তাই মনে হয়। এসব অলক্ষুণে জিনিসপত্র….

‘একমিনিট!’

তুষারের গলায় ভয় আর বিভ্রান্তির মিশেল।

উবু হয়ে দেখল মিলন। ঘাবড়ে গেল ভীষণ।

শেষ পৃষ্ঠায় নিজের একটা ছবি এঁকেছে আসমা!

আট

আসমাদের বাড়ির সামনে ভিড়। কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যেও গ্রামবাসীর ভিড়। সবাই কেমন যেন ভয়ে ভয়ে আছে। রইসুকে দেখা গেল না। এক কোনায় আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে দেখা গেল আসমার চাচীকে। ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল মিলন। জানল, আসমাকে পাওয়া যাচ্ছে না। কাউকে না বলে বের হয়ে গেছে। গতরাতের ঘটনার পর গ্রামবাসীদের যারা বিশ্বাস করেনি এতদিন, তারাও বলাবলি করছে, ‘এইবার না জানি কার ছবি আঁইকা ফালায়, গো! আল্লাহ গো, কী পিশাচিনীর কবলে পড়ল নিশিন্দাপুর!

তুষারের মাথা কাজ করছে না। স্কেচ খাতাটা নিয়ে কী করবে বুঝতে পারছে না। এটা দেখলেই একটা হই-চই কাণ্ড ঘটবে।

হুট করে খাতাটা কেড়ে নিল মিলন। তারপর এগিয়ে গেল আসমার চাচীর দিকে।

‘এই যে দেহেন, ভাবী।’

গ্রামবাসীও দেখল। রব উঠল, আসমা তা হলে মরে গেছে!

এবার আফসোসের কমতি নেই কারও গলায়।

‘আহারে! ফালাইল।’

মাইয়াটা। শেষতক নিজেরেই মাইরা

এমনসময় ছুটে এল রইসু। পায়ে কাদার ছোপ। নদীর দিকে গিয়েছিল সম্ভবত। শীতেও গায়ে চাদর নেই। এসেই চিৎকার জুড়ে দিল। ‘চান্দুয়ে দেখসে ওরে। নদীর ধারে যাইতে! মাইয়া আমার নদীতে ডুইবে গেল না তো!’

সবার সঙ্গে ছুট লাগাল তুষার ও মিলন। চান্দু নামের লোকটা নদীর যে প্রান্তে আসমাকে দেখেছে, সেখানেই শেল সবাই। কিন্তু খোঁজার সুযোগ নেই। দু’পাশে ধু-ধু চর। আর একদিকে পানি। অন্ধকারে পানিতে লাশ থাকলেও তা দেখার উপায় নেই। টর্চের আলোয় তুষারই খুঁজে পেল পায়ের ছাপ। গুটি গুটি গেছে পানির দিকে। বুক কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল তুষারের। একসময় ইস্তফা দিল খোঁজাখুঁজিতে। দুই বন্ধু ফিরে এল নিজেদের ঘরে।

নয়

ঢাকার ফ্ল্যাটে নিজের রুমে বসে আসমার স্কেচবুকটা বুকে রেখে চোখ বুজে আছে তুষার। গল্পটা লিখবে কি লিখবে না, ভাবছে।

শুরুটা করবে কী করে?

মেয়েটার মায়াবি দু’চোখ আর কোঁকড়া চুল দিয়ে?

ভাবতেই হুট করে কী যেন ধরা পড়ল মনের রেইডারে। কোথায় যেন একটা খটকা। সেই পুরনো খচ-খচে অনুভূতি। ড্রয়ার থেকে নিজের স্কেচটা বের করল তুষার। ভাল করে খুঁটিয়ে দেখল ওর পোর্ট্রেটটাকে। ডান চোখের নিচে কালো একটা তিল। বাম কানের লতিও নেই আসমার আঁকা ছবিতে। আয়নায় দেখল নিজেকে। কানের লতি ঠিকই আছে। ডান চোখের নিচে কোনও তিলও নেই তার। এবার দ্রুত আসমার স্কেচবুকটার শেষ পাতা ওল্টাল। নিজের ক্যামেরায় তোলা আসমার ছবিটা জুম করল কম্পিউটারের মনিটরে। খুঁটিয়ে দেখল স্কেচ আর ক্যামেরায় তোলা ছবি। ধীরে-ধীরে হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলাচলের মাঝে এক রহস্য ঘেরা আনন্দের অনুভূতিতে ছেয়ে গেল তুষারের মন।

ক্যামেরায় তোলা ছবিতে আসমার ডান চোখের নিচে তিল দেখা যাচ্ছে।

স্কেচে নেই!

 

দুঃস্বপ্ন – অরুণ কুমার বিশ্বাস

লেখাটা প্রায় শেষ করে এনেছি, আর মাত্র দুটো অধ্যায় বাকি। বিষয় মনস্তত্ত্ব, কাহিনীতে অস্পষ্টভাবে হলেও ‘প্যারানরমাল’ কিছু ব্যাপার আছে। সামনে ঈদ, সময়মত ম্যানুস্ক্রিপ্ট জমা দেবার জন্য প্রকাশক বেশ চাপে রেখেছেন। বয়স হচ্ছে, এখন আর আগের মত এক সিটিঙে দু’চার ফর্মা নামানো যায় না। মন ও মগজ দুটোরই যথেষ্ট অধঃপতন ঘটেছে, ও বস্তু আগের মতো ক্রিয়াশীল নয়। এখন অল্পতেই টায়ার্ড হয়ে পড়ি। সত্যি, বয়স কাউকে ক্ষমা করে না।

সন্ধে উতরেছে। ক্ষণিক অবকাশে কফির সঙ্গে টোস্ট নিয়ে বসেছি। কফির নেশা আমার অনেক দিনের। কফিতে পৌরুষের গন্ধ পাই। তাই ওটা ছাড়তে পারছি না। ডাক্তার অবশ্য বলেছেন, মাত্রা না ছাড়ালে চা বা কফিতে হার্টের তেমন ক্ষতি হয় না।

হঠাৎ সেলফোন বেজে উঠল।

লিখেটিখে সামান্য পরিচিতি হওয়ায় ইদানীং লোকে বেশ জ্বালায়। নতুন লেখকরা তালিম নেবার অজুহাতে যেমন আসে, তেমনি অনেকে আসে স্রেফ গুল ঝাড়তে বা আড্ডা মারতে। ‘প্যারানরমাল’ লেখক হিসেবে আমার বেশ খ্যাতি। তাই কেউ কেউ স্রেফ ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’ হয়ে ছুটে আসে আমার কাছে। এমনই কারও ফোন এল সন্ধের মুখে।

ফোনের এপারে আমি কি না নিশ্চিত হয়ে ওপার থেকে বলল, ‘স্যর, আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে পারি? খুব জরুরি।’

যে বা যিনি আমাকে স্মরণ করেছেন, তিনি নারী, বয়স সম্ভবত পঁয়ত্রিশের ওধারে নয়, সুন্দর কি অসুন্দর সেটা অবশ্য স্বচক্ষে না দেখে আন্দাজ করা কঠিন। তবে বেশ গুছিয়ে কথা বলে সে। প্যারানরমালের পাশাপাশি গোয়েন্দা ধাঁচের লেখাও লিখি। সেই সুবাদে অজানা বিষয়ে বা ব্যক্তি সম্পর্কে প্রাথমিক অনুমান করার বিদ্যেটা খানিক রপ্ত হয়েছে আমার। নেপথ্যে বলি, ইদানীং লেখকরা খানিক জাতে উঠেছেন। লোকে এঁদেরকে সম্মানসূচক ‘স্যর’ সম্বোধন করে।

‘কেন, বলুন তো?’ কফির মগে আয়েশি ঢঙে ঠোঁট ছুঁইয়ে অম্ল-মধুর স্বরে জানতে চাইলাম।

কেমন ফ্যাসফেঁসে গলায় মেয়েটি বলল, ‘শুনলে বুঝবেন, ব্যাপারটা সত্যি সিরিয়াস। আপনি দয়া করে একটু সময় দিলে হয়তো বেঁচে যাবে একটি লোকের জীবন।’ ওর নাম রিয়া, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগে পড়ছে। রিয়া আরও জানাল, গত ন’ রাত সে ঘুমোতে পারছে না। ভয়ে, কষ্টে, আতঙ্কে।

 

 

রিয়ার কথা শুনে মনটা খানিকটা নরম হলো আমার।

আসুক না, কথাটথা বলে ওর মন যদি খানিক নির্ভার হয়, তো ক্ষতি কী!

তা ছাড়া, রিয়া আরও বলল, সে নাকি আমার লেখার খুব ভক্ত। রহস্যপত্রিকায় নিয়মিত আমার মনস্তত্ত্ব বিষয়ক উপন্যাসিকা পড়ে। শুনে বেশ ভাল লাগল। পাঠ্যসূচির বাইরে সাহিত্যটাহিত্য পড়ার অভ্যেস তো এখন বলতে গেলে উঠেই গেছে।

‘কখন আসতে চাও? আমি কিন্তু বিশেষ রাত জাগতে পারি না,’ প্রশ্রয়ের সুরে বললাম।

রিয়া বলল, এক্ষুণি রওনা দিচ্ছে সে সাভার থেকে। আসতে যতক্ষণ লাগে। আমি হিসেব করে দেখলাম, রাত ন’টা, সাড়ে ন’টার কম বাজবে না। বললাম, ‘কাল এলে হয় না! আজ একটু ব্যস্ত। লেখাটা শেষ হয়নি। তা ছাড়া, একটা মেয়ের পক্ষে এত রাতে আসাটা নিরাপদ নয়।’

আমার কথা শুনে কষ্ট পেল রিয়া। আবেগমথিত সুরে বলল, ‘লেখক হয়ে আপনি জেণ্ডার ডিসক্রিমিনেশনে বিশ্বাস করেন! আমি কিন্তু আপনাকে আরও অনেক উচ্চতায় দেখি।’

বোকা মেয়ে! আকাশের দিকে মুখ করে চলে! ওদের কী দোষ, বয়সটাই এমন! মনে মনে হাসি পেল। মুখে বললাম, ‘আমি কী ভাবলাম তাতে কিচ্ছু এসে যায় না, রিয়া। তুমি নিশ্চয়ই আমাকে ডিসেন্ট করবে না, আমরা বড় বড় সব সার্টিফিকেট অর্জন করলেও আদতে শিক্ষিত হচ্ছি না। মেয়েদেরকে আমরা এখনও প্রাপ্য সম্মান দিতে শিখিনি। আমাদের দেশে ওরা এখনও পণ্য। স্রেফ বিজ্ঞাপন সামগ্রী বা ওপরে ওঠার মই।’

রিয়া জেদি গলায় বলল, ‘আমি আসছি। এক্ষুণি। ঠিকানাটা একটু বলুন, প্লিজ। ঢুকতে দিলে দেবেন, নইলে ফিরে যাব। মাঝরাত হলেও আটকাবে না।’

এরপর আর কথা চলে না। আফটার অল, শি’য মাই ভ্যালুড রিডার! একজন লেখকের কাছে এর মূল্য অপরিসীম।

পরে ভীষণ আপসোস হলো। বোকামোর জন্য নিজেই নিজেকে ভর্ৎসনা করলাম। এতক্ষণে খেয়াল হলো, বাসায় আমি একা। স্ত্রী গেছে সন্তানদের নিয়ে মামাবাসায় গিয়ে দুধ-দই সাঁটাতে। ছুটা বুয়া রান্না শেষ করে চলে গেছে অনেকক্ষণ। এমন নাজুক পরিস্থিতিতে এক যুবতী মেয়েকে বাসায় ডাকার পেছনে আর যাই হোক, যুক্তিগ্রাহ্য কোনও কারণ থাকতে পারে না। তা ছাড়া, সময়টা যখন রাত।

আমি ধন্ধে আছি। কারও মনের ভার লাঘব করতে গিয়ে নিজের ঘর আবার না ভাঙে! মনে বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে। বলতে নেই, এরপর আর লেখা চলে না। কারণ লেখালেখিটা করপোরেশনের পানির নল নয়, শুধু পড়তেই থাকবে। ইদানীং অবশ্য কেউ কেউ ফরমায়েশি লেখা লেখেন, যার আগামাথা কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই। অর্ডারি মাল কি না! মুফতে জাস্ট দুটো পয়সা পাওয়া যায়। অথচ লেখকদের লোভী হলে চলে না।

আমি অপেক্ষমাণ। রিয়া আসবে। বুকে চিনচিনে অপরাধবোধ প্রমাণ করে আমি লোকটা তত স্বচ্ছ নই। মনে গ্লানিবোধ আছে। পাপবোধও।

রিয়া এল বেশ খানিকটা দেরি করেই। রাস্তায় হেভি জ্যাম, এ কথা টপ্পাগানের ধুয়োর মত বারবার না বললেও চলে।

কলিংবেল চাপার শব্দে আগন্তুকের অস্থিরতা স্পষ্ট।

দরজা খোলা মাত্র ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকল রিয়া। অবিন্যস্ত কেশদাম, চোখে-মুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা পরিষ্কার।

‘কফি চলবে?’

‘আপত্তি নেই। না হলেও ক্ষতি নেই। আমি নাশ্তা করেই এসেছি।’ রিনরিনে গলায় বলল মেয়েটা।

রিয়া সুন্দরী, হাল আমলের চুনকাম ছাড়াও।

আমি শুরুতে খানিক চাতুর্যের পরিচয় দিলাম। সেটা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের প্রয়াস। রিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললাম, ‘বাসায় স্রেফ আমরা দু’জন। তবে এমন মনে করার কোনও কারণ নেই, তুমি আসবে, তাই বাসা খালি! আমার বয়স হয়েছে, আমাকে তুমি ভরসা করতে পারো। বার্ধক্যের ভীমরতি এখনও চেপে বসেনি।’

রিয়া লজ্জা পেল।

আমি সেটুকু উপভোগ করলাম। যদিও মনে করি না যে লজ্জা কেবল নারীরই ভূষণ। ওটা সবার থাকা উচিত। লজ্জা পাওয়া মানে বিবেকবোধ এখনও পুরোপুরি উবে যায়নি।

রিয়া আমার কথা শুনে ক্লিষ্ট হাসল।

নিজ হাতে ওকে কফি করে দিলাম। সময় দিলাম, যাতে আরেকটু সুস্থির হয়ে বসতে পারে। একটু পর বললাম, ‘নাও, এবার শুরু করো। তোমার জরুরি কথাটা কী, সেটা শুনি। ইনফ্যাক্ট, লেখার পাট চুকিয়ে তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম।’

ওর পরনে জলপাই রঙ সালোয়ার, পায়ে হাওয়াই চপ্পল। তার মানে, একদম ঘরোয়া পোশাকেই চলে এসেছে। বেশ বদলের সময় পায়নি।

শুরুতেই ভয়ানক এক কথা দুম করে বলল রিয়া, ‘বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, তবে আমার কারণে মৃত্যু ঘটেছে আটজন মানুষের। এরা সবাই আমার পরিচিত। দু’একজন নিকটাত্মীয়ও।’

‘মানে? তোমার কারণে মারা গেছে! কীভাবে! তোমার মত মেয়ে কারও ক্ষতির কারণ হতে পারে?’ আমি বিস্মিত।

‘আপনি আমাকে কতটুকু চেনেন, স্যর? আমি একটা অপয়া!’

ব্যস, হয়ে গেল। মাথায় রক্ত উঠে গেল। কুসংস্কার আমার ভারি অপছন্দ। এখনও কেউ পয়া-অপয়ায় বিশ্বাস করে, তা মেনে নিতে আপত্তি আছে। কো-ইনসিডেন্স বা কাকতাল হতে পারে। তাই বলে কেউ কারও জন্য মারা যায়, এ কথা মেনে নেয়া কঠিন।

আমার কৌতূহল মেটাতে কথার ঝাঁপি মেলে ধরল রিয়া। একে একে বলে গেল সবগুলো ঘটনা।

‘১৩ জুন, ২০১০। মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠলাম। আমার চিৎকার শুনে আব্বু-আম্মু, বড় আপু, সবাই ছুটে এল। ওরা জানতে চাইল কী হয়েছে। আমি ঠিক বুঝলাম না। তবে আবছা মনে পড়ল আমি কোথাও বন্দি। বুকে বড্ড চাপ। আব্বু তক্ষুণি ডাক্তার ডাকতে যাচ্ছেন। আপু বললেন, অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করতে। আমি ওদের বিরত করলাম। তখনও হাপরের মত বুকের ভেতরটা ধড়াস ধড়াস করছে। আমি কুলকুল করে ঘামছি। বেশ বুঝতে পারছি, জ্ঞান হারাচ্ছি। কান্না জুড়ে দেন আম্মু। আব্বু হতভম্ব! আপু চোখেমুখে পানি ছিটাতেই জ্ঞান ফেরে আমার। তারপর একটু একটু করে সিনেমার রিলের মত চোখের পাতে ভেসে উঠল পুরো ঘটনা।’

‘স্বপ্নে কী দেখলে?’ প্রচণ্ড কৌতূহল বোধ করছি আমি।

এখনও পষ্ট মনে আছে, দেখলাম কোনও এক হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছি। চারপাশে ছোটাছুটি করছে ডাক্তার ও নার্স। নার্সের হাতে ইঞ্জেকশন সিরিঞ্জ, গজ-তুলোর উৎকট গন্ধ। ওরা সব এমন কাণ্ড করছে, যেন তক্ষুণি মারা যাচ্ছি আমি।’

‘তারপর?’

‘আমি আসলে মরিনি। পরের দৃশ্য আরও ভয়ঙ্কর। পথ হারিয়ে ফেলেছি। কেউ যেন তাড়া করছে আমাকে। খুঁজে পেলাম না হাসপাতাল থেকে বেরোবার পথ। ছোট্ট করিডোরের মত প্যাসেজ পেরিয়ে যেখানে গেলাম, সেটা একটা মর্গ। অন্ধকার কুঠরিতে সারে সারে শুয়ে আছে লাশ। সব লাশের চেহারা বীভৎস। অথচ যদ্দূর জানি, মুর্দাখানায় লাশেরা সাদা কাপড়ে ঢাকা থাকে, কারও মুখ দেখতে পাবার কথা নয়। দেখলাম, মোট দশখানা খাট মর্গে। একটা ফাঁকা। কে বা কারা যেন জোর করে আমাকে সেখানে শুইয়ে দিতে চাইল।’

‘সত্যি ভয়ঙ্কর! অবিশ্বাস্য!’ অস্ফুটে বললাম আমি। এমন অদ্ভুতুড়ে ঘটনা জীবনে শুনিনি।

‘এখানেই শেষ নয়, আরও আছে, স্যর। শুনবেন?’

‘শুনব, তবে তার আগে তোমাকে ওই ‘স্যর’ শব্দটি ভুলতে হবে। আমি তো তোমাকে ধরে রাখিনি, রিয়া, যে, বারবার ছাড়তে বলছ!’ হাসার চেষ্টা করলাম। আসলে ওর দুঃস্বপ্নের কথা শুনে বিপন্ন বোধ করছি। হাসি-কান্নার মত ভয়ের ব্যাপারটাও বোধ হয় সংক্রামক।

‘ওকে, স্যর, তাই হবে।’

‘আবার স্যর! দেখো, রিয়া, আমাকে তুমি বন্ধু ভাবতে পারো। অসম বয়সে কি বন্ধুত্ব হয় না! বন্ধু ভাবলে মনের কথা খুলে বলাটা আরও সহজ হবে।’

‘ওকে, তাই হবে।’ রিয়া আবার শুরু করে। ‘আমার স্বপ্নে খুন, মৃত্যু, রক্তারক্তি নিয়মিত ব্যাপার। আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না, প্রতিটা রাত যেন শুরু হয় দোজখের কষ্ট নিয়ে। মানুষ ঘুম না পেলে সিডেটিভ বা ট্রাঙ্কুলাইযার খেয়ে ঘুমায়। আর আমি চাই এমন কোনও ওষুধ, যা খেলে জীবনে আর ঘুম আসবে না। আমি ঘুমোতে চাই না। ঘুম আমাকে ক্রমশ খুনির পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।’

‘বুঝলাম না। তুমি স্বপ্নে কী দেখলে, তাতে দুনিয়ায় কার কী এসে যায়!’

‘এসে যায়, স্যর। আমার প্রতিটা দুঃস্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক-একটা মর্মন্তুদ ঘটনা। আমি যে রাতে হাসপাতাল আর মর্গের স্বপ্ন দেখলাম, এর ঠিক পরের দিন রোড অ্যাকসিডেন্ট করে হাসপাতালে ভর্তি হন আমার সবচে’ কাছের বন্ধুর বাবা হাসমত আঙ্কেল। আপনি হয়তো বলবেন, এর সঙ্গে আমার স্বপ্নের কী যোগসূত্র!’

‘তুমি আমার মনের কথাই বললে, রিয়া!’ সম্মতিসূচক মাথা নাড়লাম। ‘সত্যিই তো! এমন নয় যে তুমি দুঃস্বপ্ন না দেখলে হাসমত সাহেব অ্যাকসিডেণ্ট করতেন না!’

‘এর ঠিক আগের দিন হাসমত আঙ্কেলকে নিয়ে আমাদের বাসায় বেড়াতে এল বন্ধু রুবি। সবচে’ ভয়ঙ্কর ব্যাপার কী জানেন, স্বপ্নের সেই মর্গে যাদের চেহারা দেখেছি, তাদের একজনের সঙ্গে হাসমত আঙ্কেলের চেহারার দারুণ মিল।’

‘কী রকম?’

‘হাসমত আঙ্কেলের বাঁ চোখের নিচে আছে কালচে মত আঁচিল। আকারে অনেকটা পেঁপের বিচির মত। আঙ্কেলের কপালটা একটু উঁচু, চোখদুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার মত স্ফীত। ঠিক এ চেহারার একজন লাশ হয়ে শুয়ে ছিল আমার স্বপ্নের মুর্দাখানায়।’

‘বলো কী! এ-ও কি সম্ভব?’

‘এরপরও আপনি বলবেন আমার স্বপ্নের কোনও মাজেজা নেই?’

মুখে কিছু বললাম না। সন্ত্রস্ত বোধ করলাম। এমনভাবে কথাগুলো বলছে রিয়া, বিশ্বাস না করে উপায় নেই। ‘তারপর বলো, হাসমত সাহেবের কী হলো? উনি দ্রুত সেরে উঠে বাসায় ফিরলেন?’ আমার কৌতূহল ক্রমশ সীমা ছাড়াচ্ছে।

‘নো, স্যর, তা হয়নি। চিকিৎসকের ভুলে হোক বা ওষুধে ভেজালের কারণে, হাসমত আঙ্কেলের পায়ে শুরু হলো পচন। সারা শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল ইনফেকশন। ঠিক পনেরো দিনের মাথায় তিনি মারা যান।’

‘সো স্যাড!’ পাঞ্জাবির খুঁটে চোখ মুছলাম। লোক দেখানো নয়, লেখক হিসেবে আমার সমবেদনা অন্য যে কারও চেয়ে বেশি। জানি, এই অনিশ্চিত দুনিয়ায় গর্ব বা অহঙ্কার করার কিছু নেই। আমরা স্রষ্টার হাতে পুতুল মাত্র।

‘আরেকটু কফি খাবে, রিয়া? গলাটা কেমন শুকনো লাগছে!’

‘না, এর পরের ঘটনাটা শুনুন, আবারও শুরু করল রিয়া। এত সুন্দর গুছিয়ে বলে, চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই উঁচু মানের লেখক হতে পারবে। নিখুঁত ওর বর্ণনা, শব্দচয়নেও লালিত্য আছে।

‘শীতের ছুটিতে কক্সবাজার বেড়াতে গেছি। সঙ্গে বন্ধুরা, কয়েকজন বন্ধুর অভিভাবকও আছেন। মায়েরা ওদের একা ছাড়তে চাননি। খুব শান্তশিষ্ট (!) মেয়ে কি না! তারিখটা…’ রিয়া মনে করে বলল, ‘ডিসেম্বরের ৭, ২০১১। বন্ধুরা সবাই মিলে বেশ হৈ-হুল্লোড়, হাসি-ঠাট্টা চলছে। কলাতলি চ্যানেলে হোটেল ঝাউবনে টাটকা তাজা রূপচাঁদা আর লইট্টা ভাজা খাচ্ছি। কথা ছিল কক্সবাজারে দু’দিন কাটিয়ে আমরা যাব টেকনাফ। তারপর দ্বীপসুন্দরী সেন্ট মার্টিন। কিন্তু আমার আর যাওয়া হলো না। মাঝপথে ফিরতে হলো।’

‘কেন, আবার কোনও বিপদ?’

রিয়া স্কুলগামী মেয়েদের মত ওপরে-নিচে মাথা দোলাল। ‘সেদিন বিকেল থেকেই মনটা ভীষণ কু গাইছিল। বুঝতে পারলাম কিছু একটা ঘটবে। সতর্ক হলাম। বন্ধুদের বললাম, আমার বোধ হয় যাওয়া হবে না। তোরা ভাল করে ছবি তুলে আনিস, পরে দেখব। বন্ধুরা খেপে লাল। আমি নাকি সব কিছুতেই বাগড়া দিই। আমি একটা অপয়া! সব অশুভ ঘটনার বার্তাবাহক। মনে খুব কষ্ট পেলাম। অথচ ওরা মিছে কিছু বলেনি। বিকেল থেকেই প্রচণ্ড মাথাব্যথা, দুঃস্বপ্ন পর্বের আগের স্টেজ। চোখে ঝাপসা দেখলাম আমি। ভাবতে চেষ্টা করলাম, পরিচিত কারও অসুখ করেছে কি না, বা কেউ হাসপাতালে ভর্তি আছে কি না। প্রচণ্ড ভয় পেলাম, না জানি কাকে এবার হারাতে হবে!’

রিয়ার কথা শুনে ভীষণ ঘামতে শুরু করেছি আমিও। সম্মোহকের মত কথা দিয়ে আমাকে যেন বেঁধে ফেলেছে ও। অবাস্তব, অযৌক্তিক, অথচ সত্যি। রিয়া যা বলার, বলছে সত্যি।

‘সে রাতে আর কিছু খাইনি, মানে খেতে পারিনি। মাথাব্যথার তীব্রতা এত বাড়ল যে বমি পেয়ে গেল। দুটো অ্যাসপিরিন খেয়ে আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়লাম। তবে চোখ বন্ধ করিনি, পাছে ঘুম এসে যায়, স্বপ্ন দেখি!’

রিয়ার কণ্ঠে কান্না।

ওর তখনকার অসহায়ত্ব বুঝতে পারছি। অপরের কান্না নিজের চোখে ধরতে না পারলে কীসের লেখক আমি!

রিয়া বলল, ‘শত চেষ্টা করেও ঘুম আটকাতে পারিনি। তন্দ্রা মানেই দুঃস্বপ্ন। এবারের স্বপ্ন একটু অন্যরকম। দেখলাম, আমি ভাসছি সাগরে। ভেলা নাকি কোনও সাম্পান টাইপ নৌকো, ঠিক মনে নেই। ঢেউয়ের দোলায় ভীষণ দুলছি। কোথাও কেউ নেই, আমি একা। এমনকী দাঁড় বা বৈঠাও নেই যে কূলে ফিরব। কাঁদছি ভয়ে, সহসাই শাঁ-শাঁ শব্দে এল ঝোড়ো বৃষ্টি। একাকার হয়ে গেল আমার চোখের জল-বৃষ্টি আর সমুদ্রের লোনা পানিতে। বাতাসে উল্টে গেল ভেলা, হাবুডুবু খেতে লাগলাম আমি।’

‘তারপর? তোমার কী হলো, রিয়া!’ ওর বয়ান শুনে রুদ্ধশ্বাস হয়ে গেছি।

‘রাত তখন বারোটার কম নয়। ভাসছি সাগরে। ঢেউয়ের দোলায় দুলতে দুলতে ভেঙে গেল ঘুম।

এটুকু বলে রিয়া একটু থামল। পরক্ষণে বলল, ‘না-না, একটু বাকি রয়ে গেছে। সাগরে যখন হাবুডুবু খাচ্ছি, হঠাৎ দেখি দুটো লাশ ভেসে যাচ্ছে আমার পাশ দিয়ে। সাদা কাফনে মোড়া, সম্ভবত বাচ্চার। কফিনের আকার আড়াই ফুটের বেশি নয়। বিশ্বাস করবেন না, স্যর, মুহূর্তে বুঝলাম কারও খারাপ কিছু হয়েছে। সবার আগে মনে এল সুমন আর ছোটনের কথা। ওরা আমার খালাত বোন ঈষিকার দুই ছেলে। গাঁয়ে থাকে। আমি চটজলদি ফোন করলাম ওদের বাসায়। জানতে চাইলাম, ভাল আছে তো সুমন-ছোটন? গাঁয়ে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। তাই মোবাইলে চার্জ থাকে না। বাসা থেকে কিছু জানাতে পারল না। বোন ঈষিকার ফোন সুইড্ অফ। তাতে সন্দেহ বদ্ধমূল হলো আমার।’

‘তারপর? বলো, রিয়া, আমি পুরোটা শুনতে চাই।’

‘আর কী! পরদিন সকালেই কক্সবাজার থেকে ফিরলাম ঢাকায়। বাসায় গিয়ে দেখি সবার মুখ থমথমে। ওরা আমাকে দোষ দিল। তত দিনে সবাই জেনে গেছে আমার স্বপ্নতত্ত্ব। মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘ওরে, সর্বনাশী, সুমন-ছোটন আর নেই রে! তুই স্বপ্নে কী দেখেছিস বল্! ওরা দু’ভাই মাছ ধরতে গিয়ে ডুবে মরেছে বিলের পানিতে।’’ দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকল রিয়া। ওর কষ্টের যেন অবধি নেই। ওর মা-ও দোষারোপ করছেন। রিয়া অপয়া!

‘হুম!’ এবার কী বলা উচিত বুঝলাম না। তা-ও জানতে চাইলাম, ‘তোমার বোনের ছেলেদের বয়স কত? উচ্চতা?’

‘আট আর দশ বছর। উচ্চতা আড়াই ফুটের মত, যেমনটা উত্তাল সাগরের সেই ভেসে যাওয়া সাদা কাফনে দেখেছি আমি।’

রিয়া কাঁদতে থাকল।

টের পেলাম, ওর বুকটা ভেঙে যাচ্ছে কষ্টে নুড়ি-পাথরের মত। খুব কাছের লোকেরা রিয়াকে ‘অপয়া’ মনে করে ওর স্বপ্নের জন্য। আমার ভেতরে শীতটা আরও জেঁকে বসল। অথচ এখন মিডসামার! গরমে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ!

রিয়া ফোঁৎ-ফোঁৎ করে কাঁদছে। কান্নার বেগ কমলেও আবেগে কমতি নেই।

ওর কষ্ট আমার বুকেও বাজল। বেচারি রিয়া, ওর কী দোষ! আমি কফি বানালাম। দার্শনিকের মত নিরাসক্ত গলায় বললাম, ‘ছি, রিয়া, কাঁদে না। এই নাও কফি। খেয়ে দেখো ঠিক আছে কি না চিনি। আর কিছু? ওহ্! ডিনার খাবে আমার সঙ্গে? যা আছে, বেশ হয়ে যাবে দু’জনের। কোরালের কোপ্তা, বেগুনভাজা আর ঝো-ঝা-চি।’

‘ঝো-ঝা-চি?’ বিস্ময়ভরা চোখে রিয়া তাকাল।

যাক, থেমেছে বেচারির কান্না।

‘ঝো-ঝা-চিটা আমার অবিষ্কার। লণ্ডনে পড়ার সময় এক হাতে সব করতে হত। ওখানে সবচে’ সস্তায় পাওয়া যায় গমের রুটি, মুরগির ডিম আর ফার্ম-কক্। ঝো-ঝা-চি মানে ঝোল-ঝাল চিকেন। একবারে মশলা দিয়ে কষিয়ে বসিয়ে দিই সসপ্যানে। ব্যস, দশ মিনিটে রান্না শেষ। গরম ভাতের সঙ্গে ঝাঁঝাল চিকেন। আর কী চাই!’

‘আপনি রান্নাও জানেন?’ রিয়ার বিস্ময়ের অবধি নেই।

‘কেন, যে চুল বাঁধে, সে কি রাঁধে না! লেখক বলে কিন্তু কুঁড়ে নই। আই’ম আ সেল্‌ফ-মেড ম্যান, বুঝলে? তুমি বরং এক কাজ করো, মুরগি আর কোরালটা মাইক্রোওভেনে গরম করে আনো। দু’জনে বসে খাই।’

আমার একদম খেয়াল ছিল না, রাত প্রায় একটা। রিয়া ফিরবে কী করে! বয়স যত হোক, বদনামের সময় এখনও পেরোয়নি। লোকে শুনলে বলবে কী! আমি শিহরিত হলাম, শঙ্কিতও। রিয়া অবশ্য আমার কোনও কথাই কানে তুলল না। কফিতে একবার মাত্র চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করল তার তৃতীয় ঘটনা।

আরও একবার আতঙ্কিত হবার জন্য মনটাকে প্রস্তুত করলাম।

‘এই তো সেদিন। তারিখটা ১৫ এপ্রিল, ২০১২। আমার সেকেণ্ড ইয়ার ফাইনাল এক্যাম চলছে। পড়াশুনোর খুব চাপ। রাত জেগে পড়ছি। অনেক দিন দুঃস্বপ্নের ব্যাপারটা ছিল না। ভাবলাম, স্রেফ কাকতালীয়। ওটা কেটে গেছে। কিন্তু জানি, আমি অভিশপ্ত।’ এটুকু বলেই কান্নার পাঁয়তারা শুরু করল রিয়া।

আমি ওর কাঁধে আলতো হাত রাখলাম বড় ভাইয়ের মত। ‘তোমাকে আর ওসব বলতে হবে না। চলো, খেয়ে নিই।’

রিয়া নাক টানল। স্কার্ফে চোখ মুছে নিজেকে সামাল দিল। তারপর আবার শুরু করল বলতে: ‘আমাদের ইউনিভার্সিটির ভেতরটা একটু জঙ্গুলে, আপনি জানেন। বেশ তপোবনের মত মনে হয়! সেবার মাঝরাতেরও পরে শুরু হলো আমার মাথাব্যথা। তারপর বিবমিষা। ব্যথার তীব্রতা এত বেশি, একবার মনে হলো কিছু একটা খেয়ে মরে যাই। আর সহ্য হয় না।’

বাংলা ভাষাকে ভালবাসি, তাই ‘বিবমিষা’ শব্দের মানে জানা ছিল। বমির ভাব। মেয়েটা সত্যি বাংলা জানে। ওর লেখক হওয়া উচিত। ইদানীং অশিক্ষিত লেখকের প্রাদুর্ভাব বেশ দেখছি। বইমেলায় ফি-বছর চার হাজার বই বেরোয়, যার অধিকাংশ পাঠের অযোগ্য। ভাব ও ভাষা দুটোরই আকাল। প্রকাশকেরও যেন দায় নেই। লেখকের টাকায় ভুলে ভরা বইয়ের এক শ’ কপি ছেপেই তিনি প্রকাশক। পত্রিকায় সচিত্র সাক্ষাৎকার ছাপে! লেখকের পকেটের টাকা নেন, প্রকাশকের তাই লেখার গুণগত মান দেখা বা বোঝার সুযোগ থাকে না।

জটিল ভাবনা থেকে রিয়ার কথায় মাটিতে ল্যাণ্ড করলাম। আশ্বাসের সুরে বললাম, ‘ও কথা বলতে নেই, রিয়া। মানব জীবন খুব প্রার্থিত। বড় মূল্যবান। এ নিয়ে ছেলেখেলা করতে নেই।’

বুঝমানের মত মাথা নেড়ে আবার শুরু করল রিয়া: ‘ব্যথা সইতে না পেরে অ্যাসপিরিন খেলাম। আমার রুমমেট এশা দুঃস্বপ্নের কথা জানে না। জানলে হয়তো তক্ষুণি ছুটে বেরিয়ে যেত, বা প্রোভোস্ট ম্যাডামকে বলে আমাকে বের করে দিত রুম থেকে। এশা মেয়েটা বড় ভাল। দিনাজপুর বাড়ি, আমার জন্য প্রয়োজনে জীবন দেবে। এশা এত রাতে হলের ফার্মেসিতে গিয়ে অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট নিয়ে এল। ও জানে, কাল আমার পরীক্ষা। বলল, ‘আপু, তুমি বরং এবার একটু ঘুমাতে চেষ্টা করো। কাল সকালে বাকিটুকু পড়ে একযাম হলে যেয়ো।’ ওর কথা শুনে বাধ্য মেয়ের মত শুতে যাই। এশা আমার টেবল-ল্যাম্প অফ করে মশারি খাটিয়ে দেয়। আমার দু’চোখে তখন কান্নার ঢল। আমি এশার কথা ভাবছিলাম। এই ‘অপয়া’ মেয়েটার কারণে এশার না জানি কোন্ ক্ষতি হয়! রুমের ভেতর আবছা আঁধারে দেখলাম এশাকে। ওর মুখটা যেন কেউ সুপার গ্লু দিয়ে সেঁটে দিয়েছে আমার চোখে। আমি কেঁপে উঠলাম ভয়ে। অ্যাসপিরিনের প্রভাবে ব্যথাটা কমে গিয়ে কেমন ঘুম ঘুম পাচ্ছে। এই প্রথম বুঝলাম, এবার বিপদ এশার। নিশ্চিত ওকেই স্বপ্নে দেখব। মৌসুমী ভৌমিকের সেই ‘স্বপ্ন দেখব বলে’ গানটা মনে এল। দুটোই স্বপ্ন, অথচ কত তফাৎ! সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, জানি না। শুধু এটুকু মনে আছে, আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে এশা, তাতে বড্ড আরাম হচ্ছে আমার। হারিয়ে যাচ্ছি ঘুমের অতলে। বিড়বিড় করে বললাম, এশা মেয়েটা সত্যি ভাল!’

‘তারপর, রিয়া? কী ঘটল?’ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে জানতে চাইলাম। আমাকে যেন টানছে রিয়ার কথা। আমি অসহায়! ওর পুরো গল্প না শুনে নিস্তার নেই!

‘স্বপ্নে শুধু রক্ত, রক্ত আর রক্ত। তাজা চটচটে রক্তের ভেতর হামাগুড়ি দিই আমি। আশ্চর্য! এবারে আমার ভূমিকা টোকাইয়ের। আমার কাঁধে প্লাস্টিকের থলে। পানি ও কোমলপানীয়ের বোতল খুঁজে খুঁজে থলে ভরি আমি। সহসাই এক আবাসিক এলাকা সংলগ্ন সুয়েরেজ লাইনের ধারে দেখলাম চটের একটা থলে। নিশ্চয়ই ভেতরে দামি কিছু আছে। ত্রস্ত হাতে থলের মুখ খুলে দেখি…’ থেমে গেল মেয়েটা।

‘কী দেখলে, রিয়া!’ আমার যেন তর সইল না। স্পেলবাউণ্ড। নির্নিমেষ চেয়ে আছি রিয়ার দিকে

‘বিশ্বাস করুন, করুন, স্যর, থলের ভিতর শুধুই রক্ত। রক্তভেজা লাশ।’

‘কার লাশ! চিনতে পারলে?’

‘পেরেছি, স্যর। পেরেছি। আমার সবচে’ প্রিয় একজন মানুষ! একটু আগেও যে আমার চুলে বিলি কেটে ঘুম পাড়িয়ে দিল!’ আবার কাঁদতে লাগল রিয়া।

‘কে, তোমার রুমমেট এশা?’

‘ঠিকই ধরেছেন। বস্তার ভেতর রক্তস্নাত একটি মেয়ের লাশ। অনেক চুল। তাকিয়ে দেখি এশা। কেউ ঘাড় মটকে রক্ত খেয়েছে ওর। ঘোলা চোখে যেন আমার দিকেই তাকিয়ে আছে এশা। কী করুণ সে চাহনি! কী নিদারুণ!’

শ্বাস বন্ধ করে শুনছি। বুকের ভেতর হচ্ছে ঢিব-ঢিব শব্দ। কেবলই মনে হচ্ছে, কী শুনব এবার! এশা মেয়েটা সত্যি মরে গেল! নাকি মরেনি! হে, স্রষ্টা, রিয়ার এই স্বপ্নটা যেন অন্তত মিথ্যে হয়! এশার মত ভাল মেয়ের অনেক, অনেক দিন বেঁচে থাকা দরকার। দুনিয়াটা দিনকে দিন চিড়িয়াখানা বা ল্যাবরেটরি হয়ে যাচ্ছে। মানুষের মনে এতটুকু মায়া-মমতা নেই! মানুষ কেটে এক শ’ উনিশ টুকরো করা হয়!

আমি রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। অথচ আমাকে শোকের সাগরে ভাসাল ও। জান্তব গোঙানির মত করে বলল, ‘এশা বাঁচেনি। অনেক মেয়ের হাঁকডাকের শব্দে ঘুম ভাঙল আমার। ঘুম নয়, এ যেন মরণঘুম। ওরা আমাকে ডেকে তুলে এশার কথা জানতে চাইল। এশা কোথায়! লেডিস হলের পেছনে ড্রেনে পাওয়া গেছে একটা মেয়ের লাশ। দেখতে এশার মত। কিন্তু এশা সেখানে যাবে কেন! এই কেন’র জবাব কেউ জানে না, শুধু আমি জানি, স্যর। হলের সব রুম, ওয়াশরুমে খুঁজেও পাওয়া গেল না এশাকে। ওর চেহারাটা এমন বীভৎসভাবে থেঁতলে গেছে, চেনার উপায় নেই। অনুমান করা যায়, কোনও এক রহস্যময় কারণে ভোর রাতে পাশের ভবনের ছাদে গিয়েছিল এশা। সেখান থেকে পা ফসকে পড়ে ঘাড় মটকে মরে গেছে ও। উপুড় হয়ে পড়েছিল, তাই থেঁতলে গেছে পুরো মুখমণ্ডল। উহ্, কী ভয়ঙ্কর সেই চেহারা! স্যর, আমি অপয়া! আমি অভিশপ্ত! এখন কী করব বলুন, বলে দিন প্লিজ!’

কান্নায় ভেঙে পড়ল রিয়া। এই কান্নার যেন কোনও শেষ নেই।

শীতের অনুভূতিটা আরও বেড়েছে আমার। ডিনারের কথা ভাবলাম। রিয়াকে কিছু খেতে দেয়া দরকার। বড্ড ক্লান্ত মেয়েটা। এমন কিছু ওকে দিতে হবে, যাতে ঝিমিয়ে না পড়ে।

.

এখন কাকভোর।

নিতান্ত স্বার্থপরের মত ডক্টর ফয়সালকে ফোন করে জাগিয়ে তুললাম।

ফোন পেয়ে ভয়ার্ত স্বরে বলল সে, ‘কী ব্যাপার, ভাই, কোনও বিপদ! এত রাতে ফোন করেছ?’

‘বিপদ, ভীষণ বিপদ আমার।’

‘তোমার বিপদ! কী হয়েছে, বলো?’

‘আচ্ছা, ফয়সাল, এমন কোনও ওষুধ কি আছে, যা খেয়ে দু’দশ দিন ঘুমটাকে আটকে রাখা যায়?’

‘তুমি কি পাগল হলে? এমন ওষুধ দিয়ে কী হবে! মানুষ ঘুমানোর জন্য ওষুধ খায়, জেগে থাকার জন্য খায় বলে তো শুনিনি!’

‘তার মানে অ্যান্টি-স্লিপ জাতীয় ওষুধ নেই, যাতে আর ঘুম আসবে না?’ হতাশায় ভেঙে পড়লাম আমি। যেমন, করে হোক, রিয়াকে জাগিয়ে রাখতে হবে। কিছুতেই ঘুমোতে দেয়া চলবে না। আমি মরে যাব, ঘুমোলেই ও স্বপ্ন দেখবে, আমি ফিনিশ!

আমার ভয়ের যথেষ্ট কারণ আছে! সেটা গাণিতিক!

রিয়ার বলা তিনটি ঘটনা রিপ্লে করে দেখলাম, সে প্রথম স্বপ্ন দেখেছে ১৩ জুন, ২০১০ সালে। ১৩ জুন (ইংরেজি ক্যালেণ্ডারে সিক্সথ মাস) মানে মাস ও তারিখের সংখ্যাটা যোগ করলে দাঁড়ায় ১৯।

দ্বিতীয় ঘটনার (সুমন-ছোটনের পানিতে ডুবে মৃত্যু) তারিখ ৭ ডিসেম্বর, এক্ষেত্রেও যোগফল ১২+৭ = ১৯।

লাস্ট ঘটনা এশার মৃত্যু দিন ১৫ এপ্রিল। যোগফল

কত! ১৫+৪ = ১৯!

ভাবতেই ভয়ে কণ্ঠনালীতে উঠে এসেছে হৃৎপিণ্ড! আজ কত তারিখ!

১১ আগস্ট!

যোগফল ১৯!

তার মানে আমার মৃত্যু অবধারিত!

ডাঙায় তোলা মাছের মত খাবি খাচ্ছি!

রিয়া বোধ হয় বুঝল আমার মনের কথা। কণ্ঠে বৃষ্টির ঘ্রাণ মেখে নিয়ে বলল, ‘ভয় পাবেন না, স্যর। আপনার ক্ষতি হোক, তা চাই না। আমি আপনাকে ভালবাসি, শ্রদ্ধা করি। আপনি আমার খুব প্রিয় লেখক। জানি, আমি সবার জন্য বিপদের কারণ। বিশেষ করে আমার প্রিয়জনদের জন্য। যাকেই ভালবাসি, আমার দুঃস্বপ্ন তাকে পাঠিয়ে দেয় ওপারে। আমি আজ তাই তৈরি হয়েই এসেছি।’

‘মানে? এসব তুমি কী বলছ, রিয়া?’

‘মানে, আমি আর বেশিক্ষণ নেই। একটু পর চিরবিদায় নেব দুনিয়া থেকে। শুরু হয়ে গেছে ওষুধের প্রতিক্রিয়া 1 মরে যাচ্ছি, স্যর। ভাববেন না, পুলিশ যাতে আপনাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া না করে, তাই সুইসাইড নোট লিখে রেখেছি। ভাল থাকবেন, স্যর, অ…নে…ক…ভা-ল…’

জ্ঞান হারাল রিয়া।

লোকাল থানা ও হাসপাতালে ফোন করলাম। এখনও লোপ পায়নি আমার ইন্দ্রিয়!

 

পরী – হাফিজ রাসা

এক

সবে ভাদ্র মাস। যতদূর চোখ যায় চারদিকে থৈ-থৈ পানি। আরও অনেক পরে শুকোবে বর্ষার ঢল। এ সময় কাজ থাকে না গ্রামের কৃষকদের। খেয়ে, ঘুমিয়ে আর গল্প-গুজব করে বেশিরভাগ মানুষ কাটায় তাদের সময়।

আবার হাতের কাজ করে কেউ। জাল বোনে, পলো বানায় কিংবা বাড়ির মহিলাদের ফরমায়েশ মত সারায় গৃহস্থালির জিনিসপত্র। কাউকে কাউকে দেখা যায় জাল, ছিপ কিংবা আনতা (মাছ ধরার খাঁচা) নিয়ে মাছ শিকারে মেতে উঠতে। আশ্রাফ আলী এই শ্রেণীর লোক।

বাড়িতে বসে থাকা ধাতে সয় না তার। দিনে ঘুমানোর তো প্রশ্নই আসে না। তার মতে, আল্লাহ রাত দিয়েছেন ঘুমাতে আর দিন হলো কাজ করার জন্য। সুতরাং দিনে ঘুমিয়ে কেন কাজের সময়টাকে নষ্ট করা!

অবস্থাসম্পন্ন না হলেও পরিশ্রমী আশ্রাফ আলীর পরিবার সুখেই আছে। স্ত্রী ময়না, এক ছেলে কাজেম আলী ও দুই মেয়ে হাসনা ও জোছনাকে নিয়ে ভালই কেটে যাচ্ছে তার দিন। নিজের জমিতে কাজ শেষ হলে, তারপর বাড়তি সময়ে পরিশ্রম করে অন্যের জমিতে।

তার আছে হালের একজোড়া পুরুষ্টু বলদ এবং দুটো গাভী। সবসময় দুধ দেয় একটা গাভী। বাড়ির দুধের চাহিদা মেটার পরেও বিক্রি করতে পারে খানিকটা দুধ। সেই টাকায় কিনতে পারে প্রতিদিনকার দরকারি সদাই।

আড়াল-আবডালে নানান কথা বললে বা হিংসা করলেও মুখোমুখি কিছু বলার সাহস পায় না গ্রামের কেউ। কারণ আশ্রাফ আলী অত্যন্ত সৎ মানুষ। কারও সাতে-পাঁচে থাকে না। তার মতে, অন্যের পিছে দৌড়ালে আমার পেট চলবে, কিন্তু পরিবারের পেট চালাতে হলে চাই কাজ করা।

যুক্তি আছে তার কথায়।

যারা মেম্বার-চেয়ারম্যান বা এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কল্কি ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের কারও আর্থিক অবস্থা আশ্রাফ আলীর মত নয়। সে বিশ্বাস করে আল্লার ইবাদতের পর সংসার ধর্মই বড় ধর্ম।

আজ দুপুরে খেতে গিয়ে দেরি হয়েছে তার। আগেই বিলে মাছ ধরতে যাবে ভেবেছিল আশ্রাফ আলী। তাই দেরি হয়ে গেলেও ডিঙি নৌকায় বড়শি ও আনতা তুলে রওনা দিল। এ বেলা জমির আলের পাশে পানির স্রোতে বসাবে সব। আগামীকাল ফজর নামাযের পর গিয়ে তুলে নেবে।

মাঝের এ সময়ে মাছ ধরার গ্রাম্য এসব যন্ত্রে আটকা পড়ে প্রচুর মাছ।

সকালে বাড়িতে যখন ঢেলে দেয়া হবে, এত মাছ দেখে বিরক্ত হবে ময়না। এতই বেশি, একা কেটে শেষ করতে পারে না সে। তখন দা-বটি এনে মাছ কেটে সাহায্য করে আশপাশের বাড়ি থেকে ফজুর বউ, জমিলার মা কিংবা জজির মা। কাটাকুটি শেষে ফেরত যাওয়ার সময় ওদেরকে প্রচুর মাছ দিয়ে দেয় ময়না।

জায়গা দেখে দেখে তার আনতা ও চাঁইগুলো বসায় আশ্রাফ আলী। কোথাও বুক সমান পানি, কোথাও আরও বেশি। কিন্তু জায়গা পছন্দ হওয়া মাত্র নৌকা থেকে টুপ্ করে নেমে যায় সে। কতবার নামল আর কতবার উঠল এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না সে।

কাপড় ভিজে একসা। সব কাজ শেষ হলে এবার সকালবেলা তুলে নেয়া হয়নি এমন দুটো আনতা নৌকায় তুলে নিল আশ্রাফ আলী। প্রত্যেকটাতেই খল্-বল্ করছে মাছ। এগুলো বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর ময়না খুব খেপবে আজ। স্ত্রীর রেগে ওঠা চেহারাটা মনে করে আপন মনে হেসে, ফেলল সে।

কী কম বয়সেই না ময়নাকে স্ত্রী হিসেবে ঘরে এনেছিল? অবশ্য নিজে যে ময়নাকে বিয়ে করে এনেছিল, তেমনটা নয়। আশ্রাফ আলীর বাপ ময়নার বাপকে অনেক আগেই কথা দিয়ে রেখেছিল। নিজেদের ছেলে ও মেয়ের বিয়ে দেবে তারা।

হঠাৎ একদিন সাপের কামড় খেয়ে ময়নার বাপ মারা গেলে আশ্রাফ আলীর বাপ দেরি করেনি। আবার কখন কার কী হয়, বলা যায় না। পরে কথা রাখা না গেলে মৃত মানুষটার কাছে লজ্জিত হতে হবে তাকে।

আশ্রাফ আলী ভেজা কাপড়ে উঠে বসল নৌকায়। আজকের মত তার কাজ শেষ। এখন শুধু নৌকা বেয়ে বাড়ি পৌছানো। আনতা দুটোর মাছ নৌকায় তুলে আনার পর থেমে থেমে লাফাচ্ছে মাছগুলো। দুই আনতায় সব মিলিয়ে পাঁচ-ছয় কেজি মাছ হবে। নৌকা বাইতে বাইতে আশ্রাফ আলী ভাবল, আজকে ময়না এই মাছ কুটতে রাজি না হলে শুঁটকি দিয়ে ফেলতে হবে।

বিলটা পার হয়ে খালে পড়লে বাড়ি পৌঁছাতে আর বেশিক্ষণ লাগবে না। বর্ষার পানিতে ধানি জমি সব ডুবে বিলটাকে দেখাচ্ছে নদীর মত। বিলের চক্-চক্ করা শরীরে নামছে সন্ধ্যা। হাতের লগিটা ঠেলে বিল শেষে ধানখেতে ঢুকবে আশ্রাফ আলী, এসময় শুনল ‘ওয়া’-’ওয়া’ শব্দ। ধারেকাছে কোথাও বুঝি কাঁদছে কেউ।

থমকে গিয়ে চারপাশে তাকাল আশ্রাফ আলী। প্রথমে ভাবল, ভুল শুনেছে।

কারণ বিশাল এই পানিময় জমিনে বাচ্চার কান্না আসবে কোথা থেকে!

তা ছাড়া, গ্রামাঞ্চলে এ সময়টাকে বলে তিন সন্ধ্যা। এ সময়টাতে মাছ নিয়ে যাচ্ছে বলে কি ‘ওঁরা’ তার সঙ্গে কিছু করছে?

আশ্রাফ আলী তিনবার কুলহু আল্লাহ সূরা পড়ে বুকে ফুঁ দিল।

কিন্তু না, আরেকবার শুনতে পেল সে কান্নার শব্দ। তার ভুল হতে পারে না।

এবার লগি দিয়ে ধানখেতে কিছু দেখা যায় কি না চেষ্টা করল।

একটু পর সন্ধ্যা নেমে গেলে কিছুই দেখা যাবে না আর। হঠাৎ দেখল বেশ ক’টা কচুরিপানার ওপর পুটলির মত জিনিসটা।

নৌকাটাকে ওটার কাছে নিল আশ্রাফ আলী।

হ্যাঁ, ন্যাকড়ার ভেতর হাত-পা ছুঁড়ে ওয়া-ওয়া করছে ছোট বাচ্চাটা, আবার থেমে যাচ্ছে।

আশ্রাফ আলী ভাবতে লাগল, এটা এখানে এল কী করে?

সে চলে গেলে এর কী হবে?

ধারেকাছে কোনও বাড়ি নেই। তার মানে, সে চলে গেলে মরে যাবে বাচ্চাটা!

বুকটা কেঁপে উঠল তিন সন্তানের বাপ আশ্রাফ আলীর। মন বলল, বাচ্চাটাকে নিয়ে যা। বাড়িতে নিয়ে যা!

দুই

বাড়িতে মাছ আনলে চেঁচামেচি করবে ভেবেছিল ময়না, কিন্তু আশ্রাফ আলীর কোলে ছোট্ট পুটলিতে বাচ্চাটাকে দেখে বেমালুম ভুলে গেল চিৎকারের কথা। এক দফা চিৎকার শুরু করার আগেই আশ্রাফ আলী ছোট্ট পুটলিটা ধরিয়ে দিতে চাইল তার হাতে।

‘ময়না, কোনও কান্নাকাটি করিস না। আমি এই বাচ্চাটারে বিলে পাইছি। কচুরিপানার মইধ্যে। খোদার কসম, এতে অন্য কোনও কিছু নাই। ওর কী লাগব তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা কর। বাচ্চাটারে বাঁচাইতে হইব।’

একটানা কথাগুলো বলে থামে আশ্রাফ আলী। তার কথার ফাঁকে বাড়ির বাচ্চা তিনটাও এসে বাবা-মাকে ঘিরে দেখছে ছোট শিশুটাকে। ময়নার জেগে উঠেছে মাতৃত্ব, সে নিজের কোলে নেয় শিশুটিকে। এতে মহাখুশি হয় আশ্রাফ আলী। যাক, বিতং করে দেরি করিয়ে দেয়নি ময়না। বাকি ঘটনা পরেও বলা যাবে। এখন দরকার এই শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা। ময়নার ছোট্ট বাচ্চা জোছনার বয়স আট বছর। তাই ময়নার বুকে এখন কোনও দুধ নেই। তা হলে, এইটুকুন শিশু খাবে কী!

ধ্যাৎ! এখন এসব ভাবনা নয়। আশ্রাফ আলী বাইরের কাজ সেরে আসা পর্যন্তই জানে। ঘরে যে কীভাবে কী হয় সে বিষয়ে তাকে কখনও মাথা ঘামাতে হয়নি। ময়না তার জাদুকরী হাতে সব করে ফেলে। এমনও দেখা গেছে টানা বৃষ্টিতে বাইরে যাওয়া যাচ্ছে না। বাজার করাও বন্ধ। অথচ ময়না খিচুড়ি, ঘি, বাচ্চা মুরগির মাংসের সঙ্গে চার-পাঁচ পদের ভর্তা রেডি করে খেতে ডাকে।

একবার ঘরে কী আছে বা নেই জানা ছিল না আশ্রাফ আলীর। হঠাৎ তিন-চারজনকে নিয়ে বাড়িতে হাজির হয়ে সে আওয়াজ দেয় যে, তারা খাবে। টু শব্দটিও না করে ময়না কেবল বড় মোরগটা জবাই করে দিতে বলে। ব্যস, এটুকু করেছিল সে।

কিন্তু খাবার খেতে বসে আশ্রাফ আলী তো বটেই, অতিথি চারজনও অবাক হয়েছিল। পোলাও, গরুর গোশ্ত, মুরগির মাংস, বড় মাছ, ডিম ভুনা, দুধের সঙ্গে কলা এবং আশ্চর্যের বিষয় সব শেষে পাতে মিষ্টিও তুলে দিয়েছিল ময়না। যদিও সবগুলোই আশ্চর্যজনক। একজন অতিথি তো বলেই বসেন, ‘মিয়া, সব আয়োজন কইরাই আমগোরে আনতে গেছ তুমি, তাই না!’

এ কথা শুনে আশ্রাফ আলীর মুখে কোনও কথা জোগায়নি। সত্যিই সে কিছু করেনি। সব করেছে ময়না। কোনও কথা না বলে চুপ করেই থাকে সে। এ রকম ঘটনা অনেক আছে। ময়না আসলেই তার সংসারের লক্ষ্মী। কখনও তার কথায় অমত করেনি। সেই ময়না এখন বিলের শিশুটাকে কোলে তুলে নিল মানে ওর আর ভাবনা নেই। আল্লাহর রহমতে শিশুটা এখন বেঁচে গেলেই হয়।

তিন

ময়না শিশুটাকে কেবল কোলেই তুলে নেয় না, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে: আমি ওকে নিজের সন্তানের মত আদর ভালবাসা দিয়ে বড় করে তুলব। কোনও কিছুর কমতি হতে দেব না এর।

ময়নার মত তার তিন সন্তানও সহজভাবেই নেয় নতুন শিশুটিকে। বিশেষ করে হাসনা ও জোছনা তো মেয়ে শিশুটির জন্য পাগল হয়ে ওঠে। তাকে কোলে নিতে হবে, নিজের পাশে নিয়ে ঘুমাতে হবে, আরও কত কী!

প্রথমে নবাগত এই শিশুটিকে বিলের কন্যা, বিলের কন্যা বলে ডাকা হতে থাকে। প্রায় তিন সপ্তাহ কেটে গেলেও কেউ এর দাবি নিয়ে আসা দূরের কথা, অমুক বা তমুকের সন্তান হতে পারে, তেমনটাও জানা যায় না। শেষে এই শিশুর নাম বিলের কন্যা পাল্টে হয়ে যায় পরীর মেয়ে।

হ্যাঁ, এমন দুধ-আলতা গায়ের রঙ, টানা টানা চোখ, মিশমিশে কালো চুল, একবার তাকালে চোখ ফেরানো যায় না-এটা পরীর মেয়ে না হয়ে যায়ই না!

আশপাশের গ্রাম থেকে কম মানুষ ওকে দেখতে আসেনি। অথচ কেউ একটাবার এর পরিচয় জানে, বলতে পারেনি। সুতরাং পরীদের মেয়েই এটা। ওরাই বিলে ফেলে গেছে। বিশেষ করে আশ্রাফ আলীর মত একজন দিলদরিয়া মানুষকে লক্ষ্য করেই এ কাজটা করেছে তারা। কারণ পরীরা জানত এই লোকটা বাচ্চাটাকে ফেলে আসতে পারবে না।

এভাবেই পুরো গ্রাম এমনকী ইউনিয়নের ছোট-বড় সকলে জেনে গেল আশ্রাফ-ময়নার ঘরে একটা পরীর মেয়ে আছে। নিজেদের ছোট বোনকে বারবার পরীর মেয়ে, পরীর মেয়ে শুনতে হাসনা ও জোছনার খুব একটা ভাল্লাগে না। ওরা দু’দিন খুঁজে খুঁজে এই শিশুর একটা নাম বের করে ফেলে। ওর নাম রাখা হয় জয়গুন। পরীর মেয়ে জয়গুন।

চার

বাড়ির সবার আদর ভালবাসা আর গ্রামের মানুষের স্নেহে দিন দিন বড় হতে থাকে জয়গুন। নামের মতই গুণবতী হয়েছে মেয়েটা। আর দেখাশোনায় তো অপূর্ব, অতুলনীয়। এমন রূপবতী মেয়ে সারা দেশে আরও একটা আছে কি না সন্দেহ। আসলেই সে পরীর মেয়ে। আড়ালে আবডালে সকলে এটা বিড়বিড় করে বলতে বাধ্য হয়।

অন্য বাচ্চাদের মত জয়গুনও পড়াশোনা করবে। সে বাড়ির কাছের প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়ে যায়। তার বড় তিন ভাই-বোন এ স্কুলেই পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে। সে-ও ‘পড়বে। প্রথম দিন থেকেই পড়ালেখায় মনোযোগী হয়ে ওঠে জয়গুন।

স্কুলের শিক্ষকরা বলাবলি করে, মেয়েটা অসম্ভব মেধাবীও বটে। সে ঠিক মত পড়াশোনা চালিয়ে গেলে তার অন্য ভাই-বোনদের চেয়ে অনেক ভাল ফলাফল করবে নিশ্চিত। শিক্ষকদের অভিজ্ঞ মন্তব্য ভুল হয় না। সত্যি সত্যি জয়গুন কৃতিত্বের সঙ্গে পুরো ইউনিয়নে ভাল ফলাফল করে প্রাইমারি পাশ করে।

গ্রামের অন্য মাথায় হাই স্কুল। সেই স্কুলে মেধাবী মেয়ে জয়গুন পড়বে তা দিনের মত পরিষ্কার। খুব খুশি হয়েই হাই স্কুলের হেডমাস্টার রহিম মিয়া তাকে ভর্তি করে নিলেন। জয়গুন এখন হাই স্কুলে পড়ে। কী আনন্দ তার মনে!

জয়গুন স্বপ্ন দেখে সে অনেক বড় হবে। সমাজের সবচেয়ে মহৎ পেশা হবে তার পেশা। হ্যাঁ, সে ডাক্তার হবে। এটাই মনে মনে ঠিক করে ফেলে ও। তাকে লোকজন পরীর মেয়ে বলে, এটা সে-ও শুনেছে। তবে জয়গুন মনেপ্রাণে আশ্রাফ আলী ও ময়নাকেই তার বাপ-মা বলে জানে। লোকে যা বলে বলুক। হয়তো সে খুব সুন্দরী বলেই তারা এমনটা বলে।

বিলে বাতাস বয়ে যায় প্রতিদিন। গাছের পাতা মর্মর শব্দে হাওয়া দেয়। কাছের ‘মেঘনা নদীতে কুল কুল বয়ে যাওয়া ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাছ ধরে জেলেরা।

জয়গুন বাড়িতে আসার পর আশ্রাফ আলীর সংসারের চেহারা বদলে যায় দ্রুত। সব কিছুতেই তার উন্নতি আর উন্নতি হতে থাকে। এমনকী তার বাড়িতে অর্থও আসতে শুরু করে। সে যা করে, তাতেই টাকা আসে ঘরে। ময়নার বহু দিনের শখ ছিল সাতনরী হার গড়ানোর। অনেকগুলো টাকা জমিয়ে রতনপুর বাজার থেকে আশ্রাফ আলী গোপনে স্ত্রীর জন্য সাতনরী হার গড়িয়ে আনে।

সাতনরী হার গলায় পরে হাসে ময়না। ভুবন ভোলানো হাসি হয়তো একেই বলে। স্বামী-সন্তান-সংসার নিয়ে এমন তৃপ্তির জীবন, সুখের জীবন কয়জন নারীর ভাগ্যে জোটে!

বিয়ে হয়ে গেছে হাসনা ও জোছনার। অবস্থাসম্পন্ন আশ্রাফ আলীর বর্তমান আর্থিক অবস্থা এবং মেয়েরা সুন্দরী ও শিক্ষিত হওয়ায় বড় ঘরেই দিতে পেরেছে ওদেরকে। তা ছাড়া, বিভিন্ন উপলক্ষে জামাইবাড়ির সবার জন্য উপহার- উপঢৌকন পাঠিয়েও সকলের মন জয় করে রেখেছে আশ্রাফ আলী। আত্মীয়-স্বজনরা সামনা-সামনি তার প্রশংসা করলেও আড়ালে এই উন্নতির জন্য হিংসা না করে পারে না।

হাসনার এক ছেলে ও এক মেয়ে, আর জোছনার দুটোই ছেলে। এদিকে বছর তিনেক আগে ডিগ্রি পাশ করে ঢাকায় চাকরিতে ঢুকেছে আশ্রাফ আলীর ছেলে কাজেম। তার জন্যও খোঁজা হচ্ছে পাত্রী। তবে কাজেমের পছন্দ মত মেয়ে না পেলে জোর চেষ্টা করবেন না আশ্রাফ আলী। কারণ ঢাকায় পড়ালেখা করা ছেলের ঢাকাতেই কাউকে পছন্দ থাকতে পারে, বা কথা দিয়ে রাখতে পারে। সেক্ষেত্রে গ্রামের কোনও মেয়ের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দিলে হিতে বিপরীত হবে। হিসাবী আশ্রাফ আলী সংসারের বিষয়ে খুবই সচেতন।

স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় জয়গুন। সে অদ্ভুত এক অনুভূতিতে কেঁপে উঠছে বারবার। তাদের স্কুলের ক্লাস টেনের ছাত্র মাজিদ গত কয়েকদিন ধরে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে ওর পিছু নিত। ছাত্র হিসেবে ভাল মাজিদ। রোল নম্বরও প্রথম দিকেই ওর। তবুও পিছনে পিছনে ঘুর-ঘুর করাটা বেখাপ্পা ঠেকছে জয়গুনের।

ঘোরাঘুরির কয়েকদিন কেটে গেলে জয়গুনের বান্ধবী বীথি বলেছিল, ‘মাজিদ মিয়া তোর প্রেমে পড়ছে, জয়গুন। তোর প্রেমে পড়ছে।’

সেদিন এ কথাটা শুনে পুরো শরীর কাঁটা দিয়ে উঠেছিল ওর। জয়গুন ভেবেছে মাত্র ক্লাস এইটে পড়ে ও। এসব প্রেম-ভালবাসায় মন গেলে পড়ার ক্ষতি হবে। কোনওভাবেই ওসবে যাবে না ও। জড়াবে না, জড়াবেই না।

মাজিদ যদিও তার পিছু ছাড়েনি, কিন্তু জয়গুন কোনওরকম সাড়া দেয়নি বা অন্য দুষ্টু মেয়েদের মত করে মাজিদকে পেছনে পেছনে ঘোরানোর জন্য দেখানো হাসি হাসেনি। এসব মিথ্যে ছল করা ওর পক্ষে সম্ভব নয়। সে সবসময়ই নিজের কাছে সৎ থাকবে, এমনটাই ছিল ওর নীতি।

বন্ধ দরজার দিকে একবার তাকিয়ে জয়গুন স্কুল ব্যাগের পকেট থেকে বের করল চিঠিটা। ছোট ভাঁজ করা কাগজ। ভেতরের বর্ণগুলো নীল

বর্ণগুলো নীল কালিতে সাজিয়ে লিখেছে পত্রলেখক। এটাই প্রেমপত্র। জীবনের প্রথম প্রেম, প্রথম প্রেমপত্র প্রত্যেক মেয়ের কাছে ভীষণ আগ্রহের, আকর্ষণের। কিন্তু জয়গুন কোনওভাবেই স্বাভাবিক হতে পারছে না।

রাগ হচ্ছে তার। কান্না করতে ইচ্ছে করছে খুব। মাজিদ প্রেমপত্র পাঠাতে আর কাউকে পেল না। বেছে বেছে তাকেই দিতে হবে এই বিশ্রী চিঠি। বাবা-মা জানলে কী ভাববে ওকে! তা ছাড়া, বড় ভাইয়া, আপুরা আছে। তারা শুনলে কি কখনও বিশ্বাস করবে, ওর কোনও ভূমিকা নেই এই প্রেমপত্রে!

কী করবে জয়গুন! বাবাকে ডেকে দেখাবে চিঠিটা? মাকে পড়ে শোনাবে লেখাটা? কিছুটা সময় ভেবে চলে ও। না, কাউকে কিছু জানাবে না। কাউকে কিছু বলা ঠিক হবে না। সে একাই চেষ্টা করবে মাজিদের সঙ্গে কথা বলে ব্যাপারটাকে এখানেই থামিয়ে দেয়ার।

চিঠিটা খুলে দেখে একবার। ছোট্ট ছোট্ট অক্ষরে হাতে লেখা চিঠি। হাতের লেখাও খুব সুন্দর। চোখ টেনে নেয়। পড়বে না পড়বে না করেও পড়ে জয়গুন। পড়ার পর কেমন এক মিশ্র অনুভূতি ওর ভেতরে খেলা করে যায়। ওকে ভালবাসে একজন। ভালবেসে চিঠি দিয়েছে। এটা জনে জনে না বলে মাজিদকেই সরাসরি জানিয়ে দেবে, তার পক্ষে সম্ভব নয়।

দরজার বাইরে শব্দ হয়। ময়না দরজা ধাক্কা দেয়।

‘জয়গুন, দরজা বন্ধ করলি ক্যান? ভাত খাবি না!’

‘আসি, মা। কাপড় বদলাইয়া আসতাছি।’

 

 

জয়গুন আরও অনেকটা সময় পর বের হলেও ভিন্ন অনুভূতিটা তার মন-প্রাণ ছুঁয়ে থাকে। অনেক দীর্ঘ সময় ধরে।

পাঁচ

রাতে ঘুমাচ্ছে পুরো গ্রাম। খাওয়া-দাওয়া শেষে আশ্রাফ আলী ও ময়না শুয়ে পড়েছে। পড়াশোনার খুব চাপ বলে জয়গুন দেরি করে ঘুমাতে যায়। ও ঘুমিয়েছে, তা-ও ঘণ্টাখানেক হয়। এমন সময় দরজায় শব্দ হলো। একাধিকবার জোরে জোরে শব্দ হলে ঘুম ভেঙে গেল আশ্রাফের। সে চোখ মেলে ময়নাকেও ডেকে তোলে। তারপর দরজা খুলতে উদ্যত হয় আশ্রাফ।

‘এত রাইতে কে না কে! দরজা খুলবা?’

‘এই সময়ে কে আসতে পারে? বুঝতেও পারতাছি না।’

‘দরজা না খুললে কেমন হয়?’

‘না-না, দেখি।’ তারপর আশ্রাফ গলা উঁচু করে বলে, ‘কে? কে দরজার বাইরে?’

‘আমরা। হামিদা আর সুখরান।’

নামগুলো একেবারেই অপরিচিত। কারা এরা? তবে মহিলা কণ্ঠ স্পষ্ট এবং জোরালো। আশ্রাফ ছিটকিনি খুলে দরজার পাল্লা মেলে ধরে।

ভেতরে ঢোকে দু’জন ঝলমলে পোশাক পরা নারী। উচ্চতায় আশ্রাফ আলীকে ছাড়িয়ে গেছে দু’জনেই। চেহারা খুবই সুন্দর। মনে হচ্ছে মুখমণ্ডল থেকে বুঝি বেরিয়ে আসছে আলোর ঝিলিক।

‘আপনারা? এত রাইতে?’

‘আমরা পরী। জয়গুন আমার বড় বোনের মেয়ে।’

‘কী!’

‘জী, সত্যি বলতেছি আমরা।’

‘এখন কেন আসছেন?’

‘আর ছাব্বিশ দিন পর ওর বয়স তেরো হইবো। তার আগেই ওরে আমরা নিয়া যামু।’

‘জয়গুনরে নিয়া যাইবেন! ফাইজলামি পাইছেন! জয়গুন আমার মাইয়া। ওরে আমি কোথাও যাইতে দিমু না।’

হামিদা নামের পরী হাসে। অসম্ভব সুন্দর হাসি। হাসির সঙ্গে তার দাঁতগুলো হারিকেনের হালকা আলোতেও ঝিক্ ঝিক্ করছে।

‘বড় হাসির কথা বললা, আশ্রাফ আলী। তোমার এক ছেলে দুই মেয়ে। ও পরীর মেয়ে জয়গুন। সে তোমাদের মেয়ে হবে কেন?’ হামিদা বলে।

‘শোনো,’ কথা বলে সুখরান, ‘আমার বোন মানুষের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করায় ওর জন্ম হয়। জন্মের সময় আমার সেই বোন মারা যায়। মানুষের রক্ত ওর শরীরে থাকায় ওরে আমরা পরীস্থানে নিতে পারি নাই।’

‘আর তাই তারে তোমার ঘরে জায়গা করার ব্যবস্থা করি,’ কথা বলে হামিদা। ‘এখন জয়গুনের তেরো বছর পূরণ হওয়ার সাথে সাথে ওরে নিয়া আমরা এক রাক্ষসের সাথে বিয়া দিব। তারপর সে পরীস্থানে ঢুকতে পারব।’

‘সব বুঝলাম। তোমাদের এই গাল-গল্পের কোনও প্রমাণ নাই। অতএব তোমরা ওরে কোনওভাবেই পাইবা না,’ আশ্রাফ আলী যুক্তি দেখায়।

‘শোনো, আমরা আবার আসব। এখন কথাটা জানাইয়া গেলাম।’

কথাটা বলেই ওরা যেভাবে এসেছিল সেভাবে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। একটু হেঁটে উঠানের মাঝ বরাবর গিয়েই হামিদা ও সুখরান হঠাৎ উড়ে চলে গেল। দরজা বন্ধ করার বদলে আশ্রাফ ও ময়না অদ্ভুত দৃশ্যটা হাঁ করে দেখল। দু’জনের পিঠে কি ডানা লুকানো ছিল? এতক্ষণ তো তা দেখেনি ওরা! কিন্তু সত্যি সত্যি হামিদা ও সুখরান নামের দুই পরী অনেক অনেক উঁচুতে উড়ে গেছে।

দরজা বন্ধ করে বিছানায় গেল আশ্রাফ আলী। কী ঘটল এটা ভেবে শরীরে ঘাম এসে গেছে। ময়নার এগিয়ে দেয়া পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক ঢোকে সবটা পানি খেয়ে নিল সে। আরও পিপাসা লাগছে তার। এ মুহূর্তে বোধহয় এক পুকুর পানিও খেয়ে ফেলতে পারবে আশ্রাফ আলী।

ছয়

সর্ষের তেল দিয়ে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত মেখে খাওয়াটা আশ্রাফ আলীর খুব পছন্দ। সেই ছোটবেলা থেকেই এভাবে খেতে ভাল লাগে তার। কোনও তরকারি না থাকলে এরকম তেল দিয়ে দুই প্লেট ভাত খেয়ে কাজে বেরিয়ে যেত সে। অভ্যাসটা এখনও রয়ে গেছে। জয়গুন এসে তার পাশে বসে খেতে শুরু করল। সামনে সব সাজিয়ে দিয়ে ময়নাও খেতে বসে গেল। খুব তাড়া না থাকলে একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দই আলাদা। আশ্রাফ আলীকে চোখের ইশারায় রাতের ঘটনাটা এখুনি জয়গুনকে বলতে মানা করে ময়না।

খাওয়ার পর্ব শেষ হয়। তারপর বড় জামবাটিতে দই বেড়ে দেয় ময়না। আগে ভাত দিয়ে দই মাখিয়ে খেলেও এখন খালি দই খায় আশ্রাফ আলী। জয়গুন ওর বাটির দইয়ের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে নেয় খানিকটা।

‘জয়গুন।’

‘জী, বাবা।’

‘তোর পড়ালেখা কেমন চলতাছে?’

‘ভালই, বাবা।’

‘কোনও সমস্যা নাই তো!’

জয়গুন ওর প্রেমপত্রের বিষয়টা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যায়, এ ঘটনা এখন পর্যন্ত মাজিদ ও তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। ওর বাবা পর্যন্ত যায়নি। সুতরাং ভয়ের কিছু নেই।

‘না, কোনও সমস্যা নাই।’

দইয়ের খালি বাটি নামিয়ে রাখে আশ্রাফ আলী। পানি খায় এক গ্লাস। তারপর হাতের পিঠ দিয়ে মুখটা মুছে লুঙ্গিতে হাতটা ঘষে। ‘মা, একটা কথা বলি তোরে।’

গতরাতের ঘটনাটা মোটামুটি আদ্যোপান্ত বলে আশ্রাফ আলী। ময়না মেয়ের চেহারা দেখে বোঝার চেষ্টা করে তার প্রতিক্রিয়া।

সবটুকু বলা শেষ করা মাত্র জয়গুন ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে। কান্না একটু থামলে কথা বলে ও। ‘বাবা-মা, তোমরা ওইসব বিশ্বাস কইরো না। ওরা আমার কেউ না। বিশ্বাস করো। আমি তোমাগো মাইয়া। তোমরা দরকার হয় আমারে মাইরা-কাইট্যা পানিতে ভাসাইয়া দেও। আমি তোমাগোরে ছাইড়া কোথাও যামু না। কোথাও না।’

কাঁদতে কাঁদতে জয়গুন একেবারে আশ্রাফ আলী ও ময়নার পায়ের কাছে গড়িয়ে পড়ে। তারা মেয়েকে নানান কথা বলে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করে যায়।

বিষয়টা অতি জরুরি। এ কারণে আশ্রাফ আলী তার সব ছেলেমেয়েকে দ্রুত বাড়িতে ডাকে। জয়গুন কোনও ঝামেলা করেছে ভেবে দেরি না করে ওরা সবাই ছুটে আসে।

পরদিন ছেলেমেয়েদের একই গল্প বলে আশ্রাফ আলী। হতবিহ্বল কাজেম, হাসনা ও জোছনা কোনও সিদ্ধান্ত দিতে পারল না। হঠাৎ কথা প্রসঙ্গে হাশেম কবিরাজের নামটা আসে। পরে ঠিক হয় দুপুরের পরপরই তাকে ডেকে আনা হবে। হয়তো এই বিপদ থেকে তাদেরকে উদ্ধার করতে পারবে সে।

সাত

হাশেম কবিরাজ। বয়স সত্তরের ওপরে। তবে বয়সের তুলনায় তার কাঠামো বেশ শক্তপোক্ত। মাথার চুল হয়ে গেছে সব সাদা। লম্বা চুলগুলো ছুঁই-ছুঁই করছে কোমর। মাঝারি উচ্চতার লোকটার হাতে সবসময় থাকে একটা লাঠি। ওটার ওপরে মানুষের মুখ আঁকা।

ঘরের দাওয়ায় বসে বিস্তারিত শুনে হাশেম কবিরাজ ধ্যান করার মত চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ। শেষে নড়েচড়ে লাঠিটা হাতে তুলে নেয়।

‘আশ্রাফ আলী…’

‘জী, হাশেম ভাই।’

‘তোমার জয়গুন সত্যিই পরীর মাইয়া।’

‘আর যারা আসছিল, ওরা?’

‘ওরা তার স্বজন।

তাইলে এখন কী করা, ভাই?’

‘রাক্ষসের সাথে বিয়া দিয়া ওরা তারে পরী রাজ্যে নিয়া যাইব এই কথাটা ঠিক না।’

‘কিন্তু ওরা তো এই কথাই কইল।’

‘শোনো, ওগো বোন মানুষের সন্তান পেটে নেয়াতে ওদের মনে প্রচণ্ড আক্রোশ চাপছে। এখন এই মেয়েটারে রাক্ষসের সাথে বিয়া দিয়া ওরা তার সর্বাংশে ক্ষতি করতে চাইতাছে। বুচ্ছো?’

‘কন কী, ভাই!’

‘হ।’

‘এর থাইকা মুক্তির উপায় কী? যেমনে হোক মাইয়াটারে বাঁচাইতে হইব। ওর কিছু হইলে আমরা বাঁচমু না।’

এবার কোনও উত্তর দিল না হাশেম কবিরাজ। সে বড় করে শ্বাস টেনে আবার চুপ হয়ে চলে গেল ধ্যানের গভীরে। বাড়ির সব সদস্য উদ্গ্রীব হয়ে কবিরাজের পাটির চারপাশে বসে আছে। একটু পরে হাশেম কবিরাজ উঠে দাঁড়িয়ে তার হাতে ধরে রাখা লাঠির গোড়াটা দিয়ে উঠানে আঁকল একটা বৃত্ত। ওটা আঁকা হয়েছে ওদের বসে থাকা জায়গাটা ঘিরে। আঁকা শেষে কবিরাজ আবার নিজের জায়গায় বসল।

‘আশ্রাফ আলী।’

‘জী।’

‘জয়গুনরে রাখতে হইলে শক্ত একটা কাজ করতে হইব। খুবই শক্ত কাজ।’

‘কী কাজ, হাশেম ভাই?’

‘পরীগো হিসাব মতে আগামী মাসের দুই তারিখে ওর বয়স তেরো হইব। ঠিক না?’

‘জী।’

‘তার আগে ওর একটা ক্ষতি কইরা দিতে হইব।’

‘এইডা কী কও, ভাই? ওর ক্ষতি!’

‘শোনো, একমাত্র ওর কোনও একটা ক্ষতি হইলেই জয়গুনরে তার খালারা আর নিতে চাইব না। কী করা যায় দ্রুত চিন্তা করো। সময় খুবই কম।’

আট

হাসনা ও জোছনার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। তারা কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিয়ে যার যার স্বামীর বাড়ি চলে গেছে। বিশেষ করে জয়গুনকে ধরে তাদের কান্না যেন থামছিলই না। আসলে কোলে-পিঠে মানুষ করা এই বোনটা ওদের কাছে খুব প্রিয়। জয়গুনকে ওরা কখনওই বাইরের মেয়ে, পরীর মেয়ে এভাবে দেখেনি।

আর সেই মেয়েটার কঠিন বিপদে ওরা কিছু করতে পারছে না, তা যে কী কষ্টের, কীভাবে সেটা বোঝাবে। তবুও বাস্তবতা সবচেয়ে বড় সত্য। একে মেনে নিতে হবে। অবশ্য হাশেম কবিরাজ চাচার কথা মত যদি কিছু করা যায়, তা হলে হয়তো মুক্তি মিলবে ওর।

কাজেম এ বাড়ির ছেলে। ও দু’দিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসেছিল। কিন্তু বাড়িতে যে এমন জটিল অবস্থা হয়ে আছে, তা সে আন্দাজও করতে পারেনি।

এখন এমন এক বিপদে কোনও একটা ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত বয়স্ক বাবা-মা ও প্রাণপ্রিয় ছোট বোনকে ফেলে কোনওভাবেই চলে যাওয়া যায় না ভেবে থেকে গেল ও। আইন-সালিশ বা বিচার আচারের ব্যাপার হলে না হয় সে একাই লড়তে পারত। কিন্তু এটা এমন এক ব্যাপার, যাতে তার হাত-পা একেবারেই বাঁধা। এখানে কবিরাজ চাচা যেভাবে যা করে, তাতেই সম্মতি দিয়ে একটা সুরাহা করতে হবে।

কাজেম আলী বাড়ির দক্ষিণের আম বাগানের ভেতরে একা একা হাঁটছে। এই একটা বিষয়ই সারাক্ষণ ঘুরপাক খাচ্ছে ওর ভাবনায়। এমন সময় তার পেছনে খুট্ করে একটা শব্দ হলো। ঘুরে তাকাল কাজেম। দেখে গুটিগুটি পায়ে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে মাজিদ। ওদের বাড়ির ঘটনা এ পাড়া হয়ে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু কেউই কিছু করার উপায় জানে না। এ কারণে পুরোটা গ্রামই কেমন যেন থম মেরে গেছে।

‘কাজেম ভাই….’

‘কী, মাজিদ, কেমন আছ?’

‘ভাল আছি। আপনি?’

‘আছি একরকম।’

‘আপনাদের বিপদের কথা শুনছি। শোনার পর থাইকা আমার খুব খারাপ লাগতাছে।’

‘হ। জয়গুনের জন্য সবারই মন খারাপ রে।’

‘ভাই…’

‘হুম?’

‘একটা বুদ্ধি পাইছি। কমু?’

‘ক।’

‘পরীরা তো জয়গুনরে নিয়া বিয়াই দিব। ওরে, যদি আপনেরা বিয়া দিয়া দেন। তাইলে ওর একটা খুঁত হয় না?’

কথাটা কাজেমের পছন্দ হলো। হ্যাঁ, এমন একটা বিষয়ও হতে পারে। খুঁত বলতে, ওরা জয়গুনের হাত-পা কাটা-ভাঙা এসব ভাবছিল। হ্যাঁ, তা না করে অন্য কিছুও তো করা যেতে পারে।

কাজেম মাজিদকে কিছু না বলে বাড়ির দিকে দৌড়াল। এখনই খবরটা জানাতে হবে। মঙ্গলবার আসতে খুব বাকি নেই।

নয়

জয়গুনের জন্য এলাকা বা এলাকার বাইরে ভাল পাত্রের অভাব হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দুটো কারণে এ বিষয়ে কোনওরকম খোঁজখবর করা গেল না। এক: তারা ওর বিয়ের ব্যবস্থা করছে এটা পরীরা জেনে ফেললে সমস্যা হতে পারে। দুই: জয়গুনকে ওর মা খুব নরম করে তার কোনও পছন্দ আছে কি না জিজ্ঞেস করলে, সে কোনও বাছবিচার না করে মাজিদের নাম বলেছে।

কাউকে না জানিয়ে মাজিদসহ ওর বাবা, মা, কাজীসাহেব ও কবিরাজ এবং এ বাড়ির লোকজনের উপস্থিতিতে হয়ে গেল জয়গুনের বিয়ে। সোমবার বিকেলে ঘরোয়াভাবে সম্পন্ন হলো এ বিয়ে। মাজিদ-জয়গুন নিজেরাও কখনও ভাবেনি এভাবে তাদের বিয়েটা হয়ে যাবে। অথচ হয়ে গেল।

বিয়ে হলো, কিন্তু পরে সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা করা হবে এ কথাও মাজিদের বাবা-মা আদায় করে নিল। তাদের আরেকটা দাবি ছিল, সেটা হলো মেয়ে সাবালিকা না হওয়া পর্যন্ত ছেলে-মেয়ের মেলামেশা চলবে না। এসব দাবি- দাওয়ার বিষয়ে কোনও অমত করেনি জয়গুন পরিবার

সন্ধ্যা গড়ালে কী না কী হয় ভেবে আশ্রাফ আলী হাশেম কবিরাজকে বাড়িতে রেখে দিয়েছে। সে-ও বেশ ভাল প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে আজকের জন্য। কবিরাজ জানে, ছেড়ে কথা বলবে না পরীরা। আজ তাদের তৈরি করা এই খুঁত দেখে যদি পরীরা খেপে যায়, তা হলে যে কী করে, সেটা বলা যায় না।

সবাই আগেভাগেই খাওয়া-দাওয়া সেরে নিল। হাশেম কবিরাজ রাতে হুক্কা খায়। সে হুক্কা জ্বেলে গুড়-গুড় করে টেনে চলেছে।

ঠিক এ সময়ে প্রচণ্ড শব্দ হলো টিনের চালে। পরক্ষণেই দরজায় কড়া নাড়ল কেউ।

কাজেম দরজা খুলতে চাইলে আশ্রাফ আলী তাকে বাধা দিয়ে নিজে গিয়ে খুলে দিল দরজাটা।

দরজায় রক্তাভ চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হামিদা ও সুখরান।

‘তোমরা!’

‘আমাদের তো আসারই কথা ছিল। কিন্তু তুই এর মধ্যে কথার খেলাফ করে ফেললি।’ হামিদা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল কথাগুলো। তার পেছনে পেছনে ভেতরে ঢুকল সুখরান।

ঘরে ঢুকেই প্রথমে ওদের চোখ পড়ল হাশেম কবিরাজের উপর। মেঝেতে চট বিছিয়ে বসে আছে তার জিনিসপত্র নিয়ে।

‘হাশেম! তুই এইসব করাইলি রে! তুই এইসব করাইলি!’ দাঁত কিড়মিড় করে বলল হামিদা। আক্রোশে ফেটে পড়ছে সে।

‘তোরা ওর ক্ষতি করতি। তাই ওরে বাঁচাইলাম। ও আমাদের মেয়ে।’ হাশেম কবিরাজ হুক্কা থেকে মুখ তুলে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল কথাটা।

‘ও তোদের মেয়ে কীসের! ও পরীর মেয়ে। আমরা ওর বিয়ে ঠিক করেছি। পাত্রও বাইরে আছে। এবার তার মোকাবেলা করিস।’ সুখরান পারে তো হাশেম কবিরাজকে যেন চিবিয়ে খেয়ে ফেলে।

‘তোরা চুপচাপ চলে যা। কোনও সমস্যা করলে বোনঝির সাথে তোদেরকেও আজীবন আমাদের সাথে আটকে রাখব।’ হাশেম কবিরাজ তার জিনিসপত্র দেখে নিয়ে বলল কথাটা।

এই কথা, হারামজাদা! তোর বাপ আসছে! পারলে রাখ! হামহাম, ভেতরে আয়!’ হামিদা গর্জে উঠল।

কথাটা বলে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে চোখ রাখল দুই বোন। ঠিক তখুনি গর্জাতে গর্জাতে সাত ফুট লম্বা এক রাক্ষস ঢুকল ঘরে। সন্ধ্যার পর পরই হাশেম কবিরাজ সবাইকে রক্ষাকবচ গলায় পরতে ও পবিত্র পানি দিয়ে শরীর মুছে নিতে বলেছিল। এই রক্ষাকবচের জন্য কোনও অপশক্তি তাদের কারও ক্ষতি করতে পারবে না। পারার কথাও নয়। কুৎসিতদর্শন রাক্ষসটাকে দেখে আতঙ্কিত হলেও নিজেদেরকে সামলে নিল সবাই।

রাক্ষসটা ঘরে ঢুকে কঠিন এক গর্জন ছাড়ল। এতে জয়গুন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল মাজিদের পাশে। হামহাম নামের সেই কুৎসিত রাক্ষস চাইল হাশেম কবিরাজের দিকে এগিয়ে যেতে। কিন্তু অদৃশ্য এক শক্তিতে বাধা পেল সে। চিৎকার করে উঠল। হাশেম কবিরাজ তার সামনে রাখা বিভিন্ন উপাদান নিয়ে ছুঁড়ে মারল দুই পরীর দিকে। এবার রাক্ষসটাকে মারবার আগেই ক্ষিপ্ত হামহাম তার হাত চালিয়ে আশ্রাফ আলীকে নাগালে পেয়ে পেল।

সন্ধ্যার পর আশ্রাফ আলী তার রক্ষাকবচ খুলে বাথরুমে গিয়েছিল। পরে ফিরে আর তা গলায় দিতে ভুলে গেছে। এ কারণে হামহাম রাক্ষস তাকে ধরতেই পারে। আর ধরতে পেরেই উল্লাসে ফেটে পড়ল সে। হাশেম কবিরাজ খুলবুল শেকড় ছুঁড়ে মারার আগেই ভাঙা পুতুলের মত করে আশ্রাফ আলীকে ঘরের চালায় ছুঁড়ে মারল রাক্ষস।

চোখের পলকে পেঁজা তুলার মত উড়ে গেছে আশ্রাফ আলী।

ঘরের মানুষগুলো ভয়ে ঢেকে ফেলল চোখ। মুহূর্তে বলের মত চালে বাধা পেয়ে সশব্দে মাটিতে পড়ল আশ্রাফ আলীর ভারী দেহ। পড়ামাত্রই নিথর হয়ে গেল সে। কারও কল্পনাতেই ছিল না এমনটা ঘটবে। এবার তার সামনে রাখা বড় একটা হাঁড়ি থেকে নিয়ে দুই পরীকে লক্ষ্য করে মন্ত্রপূত তেল ছুঁড়ে মারল হাশেম কবিরাজ। সেই তেল গায়ে পড়ামাত্র তাদের দু’জনের শরীরে জ্বলে উঠল আগুন। বিকট স্বরে চিৎকার ছাড়ল হামিদা ও সুখরান। ভোজবাজির মত আস্তে আস্তে আকারে ছোট হতে থাকল তাদের দুটো দেহ।

এরপর হাশেম কবিরাজ সেই একই তেল হামহামের দিকেও ছুঁড়ে মারল। দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠল রাক্ষসটা। তারপর একইভাবে আকারে ছোট হতে লাগল সে।

অন্য একটা পাত্র থেকে অষ্টধাতুর মিশ্রণ তুলে ওদের দিকে ছুঁড়ে মারল হাশেম কবিরাজ। এবার অষ্টধাতুর স্পর্শ লাগতেই নিভে গেল তাদের শরীরের আগুন। আকারে ছোট হতে শুরু করে ধীরে ধীরে বিড়াল ছানায় রূপ নিল দুই পরী। আর রাক্ষস হামহাম হয়ে উঠল একটা কুকুর। সবার সামনে দুই বিড়াল ছানাকে দাবড়ে তাড়িয়ে নিয়ে গেল কুকুরটা।

অবশ্য এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী থাকল শুধুমাত্র কাজেম ও কবিরাজ। কারণ জয়গুনের মত আগেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছে ময়না। আর মাজিদ চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল ভয়ে। যত যাই হোক, ক্লাস টেনে পড়া পনেরো বছরের বালক সে।

পরদিন ধর্মীয় সব অনুষ্ঠান সেরে মাটি দেয়া হলো আশ্রাফ আলীকে। এরপর পরীর মেয়ে জয়গুনকে নিয়ে আর কোনও সমস্যা হয়নি। বাবার মৃত্যুতে কাজেম খুব মর্মাহত হলেও এটাকে একটা দুর্ঘটনা ভেবে মেনে নিয়েছে সে।

দশ

সাত বছর পর।

মাজিদের বাবা-মা তাঁদের কথা রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের ছেলের বউকে তুলে নিলেন ঘরে। সারা গ্রামের মানুষকে দাওয়াত করা হলো ওই বিয়েতে।

মাজিদ এখন পড়ে মেডিকেলে ফাইনাল ইয়ারে। ক’দিন পরেই হবে পুরোপুরি ডাক্তার। সুন্দরী জয়গুনও কম যায় না। সে-ও মেডিকেলে সেকেণ্ড ইয়ারে পড়ে। ওরা ঠিক করেছে, পাশ করার পর দু’জনেই গ্রামে ফিরবে। তারপর কাজেম আলীর দান করা বিশাল জায়গাটাতে গড়ে তুলবে হাসপাতাল। হাসপাতালের নামও ভেবে রেখেছে জয়গুন।

হাসপাতালের নাম হবে আশ্রাফ আলী মেমোরিয়াল হাসপাতাল।

এগারো

সময়ের হাত ধরে কেটে গেল আরও দশটি বছর।

গ্রামে এখন আছে চমৎকার একটি হাসপাতাল। সেখানে শুধু এলাকার সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পায়, তা নয়। বরং এ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে দূর-দূরান্ত থেকেও আসে লোকজন। বেশিরভাগ মানুষ ভাল চিকিৎসার জন্য এলেও কেউ কেউ আসে পরীর মেয়ে জয়গুনকে দেখতে। অবশ্য ওকে কখনও ডাকা হয় না পরীর মেয়ে হিসেবে। সবাই তাকে বলে ডাক্তার জয়গুন।

.

দুপুর একটা বাজে।

আশ্রাফ আলী মেমোরিয়াল হাসপাতালের গেটে এসে থামল একটা রিক্সা। ওটা থেকে নামল স্কুল ফেরত ক্লাস ফোরের ছাত্র আশ্রাফ মাজিদ। তাকে দেখে অ্যাপ্রন পরা ডাক্তার জয়গুন ছুটে গেল গেটের দিকে।

ছেলেকে কোলে করে হাসপাতাল কোয়ার্টারের দিকে পা বাড়াল ডাক্তার জয়গুন। এখন স্বামী, সংসার আর ছোট আশ্রাফ ও এই হাসপাতালকে ঘিরেই সুখে কেটে যাচ্ছে তার জীবন।

 

রোমশ – নাসির খান

‘বাবু, আজ বাসায় কেউ নেই। আত্মহত্যা করবার জন্য আজকের থেকে ভাল কোন দিন পাব বলে মনে হয় না। কি বলিস? বাবু, তুই তো জানিস গলায় দড়ি দিতে আমি খুব ভয় পাই। তা ছাড়া এটা লজ্জারও। দেখা গেল কোন না কোনভাবে তোরা আমাকে বাঁচিয়ে তুলেছিস, তখন আমার গলায় গোলাকার একটা ঘায়ের মালা হয়ে থাকবে, যে ঘায়ের মালায় মৌমাছির বদলে মাছি ঘোরাঘুরি করবে। তা ছাড়া আমি চাই না কেউ দেখুক আমি মা কালীর মত জিভ বের করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছি। তাই তোর খাটের নিচে রাখা ইঁদুর মারা বিষ খেলাম আর হ্যাঁ, আমার লাশ তোর ঘরে খাটের নিচেই পাবি। আমার উপর রাগ রাখিস না। ইতি-তোর বড় ফুপু।’

ঘরে ঢোকার আগেই জমেলা খালা চিঠিটা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘আফায় দিছে। কইল তুই ঘরে ঢুকার আগেই যেন তোর হাতে দেই। কাহিনী কী, মামা? ‘

কাহিনী জমেলা খালাকে বলা প্রয়োজন মনে করলাম না। কারণ চিঠি পড়ে উদ্বিগ্ন হবার মত কিছু নেই। আমার বড় ফুপুর মাথায় সমস্যা। সমস্যা বলতে বিরাট সমস্যা। পাবনায় গিয়ে পাগলাগারদে ভর্তি করানোর মত সমস্যা। এমন ঘটনা এর আগে আরও দু’বার হয়েছে। আরও দু’বার বড় ফুপু সুইসাইড নোট লিখে রেখে দিয়েছিল বাবার জামার পকেটে। তার মধ্যে একবার ফুপু ছাদের চিলেকোঠায় লুকিয়ে ছিল। আরেকবার বাড়ির পিছন দিকের জঙ্গলের শেষের দিকটার ডোবায় একহাঁটু কাদা মাখামাখি হয়ে হাতিয়ে মাছ ধরছিল। সেদিন ভর দুপুর বেলায় খুঁজতে- খুঁজতে ডোবার পাশে গিয়ে দেখি শুধুমাত্র পেটিকোট আর ব্লাউজ পরে কাদার মধ্যে বড় ফুপু দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ইয়াবড় একটি কালো কুচকুচে মাছ। আমি আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ফুপুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বড় ফুপু! আপনি মারা যাননি?’

আমার প্রশ্নে খুব বিরক্ত হয়ে বড় ফুপু আমার দিকে বড় বড় চোখ করে চেয়ে বলল, ‘না, মরিনি। তোর কোন সমস্যা? মাছ খাবি? ওইখানে দেখ কাপড় ভরা মাছ।’

আমি অবাক হয়ে দেখলাম ডোবার পাশে রাখা বড় ফুপুর কাপড় ভর্তি মাছ। এত মাছ বড় ফুপু হাত দিয়ে ধরেছে আমি বিশ্বাস করতে পারলাম না। আমি ফুপুকে জিজ্ঞেস করতে যাব, তার আগেই ডোবা থেকে উঠে এসে, আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, দুনিয়া কাঁপানো একটি চড় দিয়ে আমাকে অজ্ঞান করে দিল ফুপু।

তাই এমন ঘটনা ঘটানো বড় ফুপুর সুইসাইড নোটে আমাদের তেমন কোন বিকার নেই। হয়তো কোথাও লুকিয়ে

আছে বড় ফুপু। আমরা যখন খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে যাব, তখন কোন এক জায়গা থেকে বেরিয়ে ফুপু বলবে, ‘দেখলি তো, বাবু, আমি কী সুন্দর অভিনয় করতে পারি!’

মা-বাবা, দাদী, কণা আপা কেউ বাসায় নেই সকাল থেকে। ভবানীপুরে কোথায় নাকি নতুন মাজার শরীফের সন্ধান মিলেছে। তাই পুরো পরিবার গিয়েছে সওয়াব আদায় করতে। বাবা, মা আর দাদীর বুদ্ধি সম্পর্কে আমার জানা আছে। কিন্তু কণা আপা কী মনে করে মাজারে গেল কে জানে।

বাড়ির সবার রুম বাইরে থেকে তালা দেয়া। কেবল আমার আর বড় ফুপুর রুম বাদে। বড় ফুপুর রুমে ঢুকে দেখি কেউ নেই। ফাঁকা রুম। ভর দুপুরে ফুপু কখনও নিজের রুম ছাড়া বাইরে থাকে না। জমেলা খালাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘খালা, ফুপু তো রুমে নাই। কোথায়, জানেন?’

উত্তর নেতিবাচক।

জমেলা খালা সকাল থেকেই নাকি কাপড় ধোয়া আর খড়ি কাটায় ব্যস্ত। বড় ফুপুর খোঁজ রাখার সময় তার নেই। অথচ এখন যদি টিভি ছেড়ে দিই, তার কোন কাজ থাকবে না। সোজা মেঝেতে গেড়ে বসে চলচ্চিত্র সম্পর্কে একান্ত ব্যক্তিগত মতামত দিতে শুরু করবে। ‘এই নায়িকার গায়ে গোশ্ত নাই। এমন চিংড়ি মাছ নায়িকা হয় ক্যামনে?’

 

 

শুধু এই না। নায়িকার দুঃখের সিকোয়েন্সে এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি যে চোখের জল ঝরায় সে আমাদের জমেলা খালা।

আমার রুমে এসে কী মনে হতে একবার খাটের নিচে উঁকি দিয়ে চমকে গেলাম। বড় ফুপু শুয়ে আছে। শুধু পেটিকোট আর ব্লাউজ পরা। মুখ দিয়ে ঘন সাদা ফেনা গড়াচ্ছে। দু’একটি মাছিও ওড়াউড়ি করছে। আমার বুক কেঁপে উঠল। বড় ফুপু সত্যি বিষ খেয়েছে। পাশেই ইঁদুর মারা বিষের প্যাকেট। ঘটনার অবিশ্বাস্যতা আর আকস্মিকতা এমন পর্যায়ে যে আমি কী করব বুঝে উঠতে পারলাম না। বাইরে থেকে খাটের নিচে হাত বাড়িয়ে দু’তিনবার ফুপুকে নাড়াচাড়া দিয়ে ডাকলাম। নিশ্চিত হলাম ফুপু সত্যি মারা গেছে।

আমি ছেলেটা একটু আলাদা। যে কোন কিছুতে নির্বিকার থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা আমার কাছে কোন ব্যাপার না। শুধু মনে-মনে কয়েকবার বলি, ‘যা হবার সেটা হয়েই গেছে। এখন আর কিছু করার নেই। মাথা কুটে কোন লাভ নেই।’ এই লাভের হিসাব গুনতে গুনতে কলপাড়ে এসে জমেলা খালাকে বললাম, ‘জমেলা খালা, বড় ফুপু মারা গেছে। আমার খাটের নিচে লাশ পড়ে আছে।’

জমেলা খালা কাঁদো-কাঁদো মুখ করে আমার দিকে তাকাল। নিমেষেই খালার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। এবং আমার সাহস জোরাল করতেই বোধহয় ঠিক তখনই বাড়ির সবাই চলে এল। আমাকে কিছু বলতে হলো না। মাকে দেখেই জমেলা খালা এক চিৎকার দিয়ে সব খুলে বলল। সম্ভবত বড় ফুপু মারা গেছে কেউ বিশ্বাস করল না। বাবা এক দৌড়ে আমার রুমে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। ছেলেমানুষের মত বাবা কাঁদছে দেখে কণা আপা আর মা-ও কাঁদতে শুরু করল। সম্ভবত এখন থেকে শুরু হলো মৃত বাড়ির মত পরিবেশ।

পাশের বাসার আনোয়ার চাচা এসে অকারণে দৌড়াদৌড়ি করতে শুরু করলেন। অমুক করো, তমুক করো, পুলিসে খবর দাও আরও কত কী। বাবা, আমি আর আনোয়ার চাচা মিলে ফুপুর লাশ বের করার জন্য চেষ্টা করছি, তখন খাটের নিচ থেকে গড়াগড়ি দিয়ে বাইরে এসে ফুপু বলল, ‘বাবু, বিষটা মনে হয় দুই নম্বর ছিল। কতক্ষণ ধরে মরার জন্য শুয়ে আছি! ওয়াক থুহ্।’

আমার বড় ফুপুর পাগলামির ধরন ঠিক এমনই। কিছুদিন পুরো সুস্থ মানুষ। হঠাৎ-হঠাৎ আবার পাগলামি। দাদী কতরকম কবিরাজের কাছ থেকে কতরকম তাবিজ এনে ফুপুর গলায় পরিয়ে দিল, কিছুতেই বড় ফুপু সুস্থ হয় না। তাবিজের সংখ্যা যখন বারো-তেরোটা, তখন একদিন সবগুলো তাবিজ গলা থেকে খুলে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে চ্যাপ্টা করে কোথায় যেন ফেলে দিল বড় ফুপু।

বিষ খাওয়ার পর থেকে বড় ফুপুর সমস্যা দিন-দিন বাড়তে লাগল। প্রায় রাতেই বড় ফুপু সবাইকে চেঁচিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। গত শুক্রবারের কথা। রাত প্রায় দেড়টার দিকে পাড়া কাঁপানো শব্দে ফুপু চেঁচাতে লাগল। আমি বিছানায় শুয়ে কান পেতে শুনলাম ফুপু ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে আর বলছে, ‘ও, মা, আমারে বাঁচাও। এই শুয়োরের বাচ্চারে এইখান থেকে যাইতে কও। ও, মা, ও, মা, ও, বাবু, আমারে বাঁচা।’

আমি গিয়ে দেখলাম ফুপুর রুমের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। বাবা দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে ঘেমে গেছে। দাদী বারান্দার মেঝেতে বসে কাঁদছে আর মা কণা আপার পাশে ভয়ার্ত চোখে দাঁড়িয়ে আছে। বাবার শত অনুরোধেও ফুপু দরজা খুলল না। আমি এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে বললাম, ‘বড় ফুপু, আমি বাবু। প্লিজ, দরজা খোলেন।

বড় ফুপু রাজি হলো। কিন্তু শর্ত হচ্ছে আমি আর কণা আপা ছাড়া রুমে কেউ ঢুকতে পারবে না। আর এখন থেকে আমি আর কণা আপা ছাড়া এই বাড়ির আর কারও সঙ্গে ফুপু দেখা করবে না। সবাইকে রুমে পাঠিয়ে দিয়ে আমি আর আপা ফুপুর ঘরে ঢুকলাম। সব কিছু লণ্ডভণ্ড। বিছানার চাদরের নিচে তাকিয়ে আঁতকে উঠলাম। সারা চাদর ভরা রক্ত। অথচ ফুপুর শরীরের কোথাও আঘাত লেগে কেটে- ছড়ে যায়নি। কণা আপা ফুপুকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপনার রুমে কে এসেছিল, বড় ফুপু?’

বড় ফুপু আবার কাঁদতে শুরু করল। বলল, ‘বিরাট একটা জানোয়ার। সারা গায়ে বড়-বড় ঘন কালো লোম। আমারে শেষ করে দিল। ওই শুয়োরটা আমারে বাঁচতে দিবে না।

আমি আর কণা আপা সে রাতে ফুপুর সঙ্গে ঘুমালাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ফুপু উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। আর ফুপুর পিঠ ঘন কালো বড়-বড় লোমে ছেয়ে গেছে। আমার অবাক হওয়ার সীমা থাকল না। হায়, খোদা, এসব কী দেখছি আমরা!

বড় ফুপুর শত নিষেধ সত্ত্বেও ব্যাপারটা বাড়ির সবাইকে জানিয়ে দিলাম। কিন্তু বাবার কথামত বাড়ির কয়েকজন ছাড়া যেন বাইরের কেউ এসব জানতে না পারে এ ব্যাপারে সবাই সচেষ্ট থাকলাম। কারণ এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা জানাজানি হলে প্রতিদিন বাড়িতে লোক আসতে থাকবে। মিডিয়ার লোক এসে বাড়িটাকে চিড়িয়াখানা বানিয়ে দেবে এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই।

দিন পার হয় আর বড় ফুপুর ঘরে আত্মগোপনের মাত্রা ততই বাড়তে থাকে। এতদিন আমি ফুপুর ঘরে যেতে পারতাম। কিন্তু ইদানীং ফুপু আমাকে তার ঘরে ঢুকতে দিচ্ছে না। জানালা দিয়ে খাবার রেখে আসা হয়। বড় ফুপু কোন উচ্চবাচ্য করে না। লক্ষ্মীর মত খাবার খায়। তারপর চুপ করে ঘুমিয়ে যায়। আর দাদীর জোগাড় করা বিভিন্ন সাইজের তাবিজ গলায় ঝুলিয়ে রাখে।

বাবার বোনদের মধ্যে বড় বলে আমরা এই ফুপুকে বড় ফুপু বলে ডাকি। বড় ফুপুর বয়স চল্লিশের একটু বেশি হবে। সবার মুখেই শুনেছি, ফুপুর এমন অবস্থা আগে ছিল না। ফুপুর বয়স যখন আঠারো-উনিশ, তখন ফুপুর বিয়ে দেয়া হয়। দাদী আর বড় ফুপুর কাছে যেমনটা শুনেছি, তাতে গল্পটা ছোট্ট করে এভাবে বলা যায়-

ভারতে বসবাসরত সুলতান নামে এক ফরেস্ট অফিসারের সঙ্গে ফুপুর বিয়ে হয়। সুলতান নামের লোকটি আমার এই অপরূপা ফুপুকে নিয়ে যান ভারতে। সেখানে ফুপুর অনিচ্ছাসত্ত্বেও বসবাস করতে নিয়ে যান মাত্র দুটি ফ্যামিলি থাকে বনবিভাগের এমন এক কোয়ার্টারে।। চারপাশে জঙ্গল আর মাঝখানে মাত্র সাতজনের বসতি। ফুপু নাকি জঙ্গলের মাঝখানে থাকতে একদম পছন্দ করত না। সারাদিন-সারারাত ঘরের মধ্যে থাকা ফুপু একদিন সন্ধ্যায় একাই ঘুরতে বেরোয় জঙ্গলে। ঠিক কী কারণে ফুপুর যেন সাহস, অনেক বেড়ে যায় সেদিন। চারপাশে সারি-সারি গাছের ঘন বন আর বুনোফুলের গন্ধভরা সরু একটি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে বড় ফুপু গহীন বনে চলে যায়। আকাশে তখন হালকা চাঁদের আলো।

অন্যান্য দিন ফুপা সন্ধ্যার পরপর অফিস থেকে বাসায় ফিরে ফুপুকে রুমে পান। কিন্তু সেদিন ফুপুকে তিনি না পেয়ে দক্ষিণের রুমে থাকা আরেক কর্মকর্তার রুমে গিয়ে খোঁজ নিয়েও কিছু জানতে পারেন না। বড় ফুপা সত্যি-সত্যি অবাক হন, সঙ্গে কিছুটা আতঙ্কিতও। যে জঙ্গলের ভয়ে সারাদিন রুমে থাকে, সে এতরাত অবধি কোথায় থাকবে? রাত বাড়তে থাকে, তবু ফুপু ফিরে আসে না। দাদীর মুখে শুনেছি, ফুপু ফিরে আসছে না এই দুশ্চিন্তায় আর ভয়ে ফুপা নাকি সেদিন কেঁদে ফেলেছিলেন।

রাত এগারোটার দিকে লোকজন খবর দিয়ে এনে ফুপুকে খোঁজা শুরু হয়। সারা জঙ্গল জুড়ে জ্বলতে থাকে মশালের আলো। একটানা ঝিঁঝি পোকার ডাক আর একেকজনের হাতে বনবিভাগের সংরক্ষিত মশালের জ্বলন্ত আগুন। এক অন্যরকম পরিবেশ।

রাত প্রায় সাড়ে বারোটার দিকে জঙ্গলের পশ্চিম দিকের ডোবার পাশে বড় ফুপুকে পাওয়া যায় অচেতন অবস্থায়। অক্ষত শরীরের অর্ধেক ডোবার পানিতে আর অর্ধেক ডাঙায়। পরনে শুধু ব্লাউজ আর পেটিকোট। আশপাশে কোথাও খুঁজে ফুপুর শাড়ি পাওয়া গেল না।

সেদিনের পর থেকে আমার বড় ফুপুর মাথায় সমস্যা দেখা দেয়। প্রায় রাতেই নাকি ফুপু দেখত তার শরীরের উপর বিশাল এক জানোয়ার বসে আছে। জানোয়ারটির সারা শরীর লোমে ঢাকা। কত রাত ভয়ে দরজা খুলে ফুপু জ্ঞানশূন্য হয়ে কোথায় চলে গেছে! আবার সবাই মিলে জঙ্গল থেকে ফুপুকে খুঁজে এনেছে। সমস্যা চলতে থাকল বড় ফুপুর। কিন্তু এর দায় মেটাতে হলো ফুপাকে। একদিন রাতে জঙ্গলে ফুপুকে খুঁজতে গিয়ে ফুপাও ফিরে এলেন না। বনবিভাগের কিছু কর্মকর্তা ভোরের দিকে ফুপুকে পেলেন সেই ডোবার ধারে। আর ফুপাকে পেলেন ডোবা থেকে একটু দূরে মৃত অবস্থায়। এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা এর আগে কোনদিন সেখানে ঘটেনি। ফুপার সারা গায়ে ছিল নখের আঁচড় আর কামড়ানোর দাগ। বনবিভাগের কর্মকর্তারা এখানে এ যাবৎকালে এমন কোন প্রাণী দেখেননি যেটা এভাবে কোন ঘটনা ঘটাতে পারে। আবার এ ঘটনাকে পুরোপুরি ভৌতিকও বলা যায় না। প্রথমত অনেকের ভূতে বিশ্বাস নেই। তার ওপর কোন ভূত এমন ঘটনা ঘটায়, এমন কিছু কেউ দেখেনি। বড় ফুপুর বিবাহিত জীবনে ভারতের জঙ্গলে বসবাসের গল্প এখানেই শেষ। এমনটিই শুনেছি।

তারপর থেকে বড় ফুপু চলে আসে আমাদের বাড়িতে। শত চেষ্টা করেও বড় ফুপুকে আবার বিয়ে করতে রাজি করাতে পারেনি কেউ। কিছুদিন পরপর রাতের সেই সমস্যা আর আত্মহত্যা করার সমস্যা ছাড়া তেমন কিছু উল্লেখ করার মত ঘটেনি। মাঝে-মাঝে যদিও উন্মাদের মত আচরণ করে ফুপু, সেটা খুব কম।

তিন মাস হয়ে গেল আমরা কেউ বড় ফুপুকে এক নজর দেখিনি। রুমের সব ছোটখাট ফাঁকফোকর ফুপু বন্ধ করে দিয়েছে। সবাই কর্তবার গিয়ে বড় ফুপুকে অনুরোধ করে। ফুপু শুধু খসখসে গলায় বলে, ‘তোমরা যাও। আমি আর এখন তোমাদের কেউ না।’

জমেলা খালা একদিন জানালায় ভাত রেখে আসতে গিয়ে খুব বড় রকম ভয় পেয়ে গেল। ঘটনা কী জানতে চাইলে জমেলা খালা হেঁচকি টানতে-টানতে বলে, সে নাকি জানালার ফাঁক দিয়ে একটুখানি উঁকি দিয়ে দেখেছে ঘরের মধ্যে তিনটে জানোয়ার। একটা ছোট আর দুটো বড়। আজীবন জমেলা খালার বাড়িয়ে বলার অভ্যাস। আমি ধমক দিয়ে বললাম, ‘জানোয়ার-জানোয়ার করছেন কেন? জানোয়ার মানে কী?’

জমেলা খালা তারপরও কাঁদতে-কাঁদতে বলে, ‘কুত্তার মত দেখতে। তিনটা কুত্তা। ও, আল্লা, এইডা তুমার কীয়ের গজব!’

এতদিনে ফুপুর সমস্যা অনেক আত্মীয়-স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী জেনে গেছে। প্রায় দিনই কেউ না কেউ বাড়িতে আসছেই। কোন লাভ নেই। কারও সঙ্গেই ফুপু দেখা করে না। একদিন আমি টানা এক ঘণ্টা ফুপুর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলাম, যদি ফুপু আমার সঙ্গে একটু দেখা করে। কোন লাভ হলো না। শুধু জানালার ওপাশ থেকে ফুপু ফিসফিস করে ঠিক আগের মত বলল, ‘বাবু, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না রে। জোড় হাত করে বলি আমার উপর রাগ রাখিস না।’

আমিও ফুপুর মত ফিসফিস করে বললাম, ‘প্লিজ, ফুপু, আমার খুব কষ্ট লাগছে। দরজা খোলেন। খুব ইচ্ছা হচ্ছে আপনাকে একবার দেখি।’

‘আমাকে দেখলে তুই খুব ভয় পাবি, বাবু। আমি আর আগের মত নাই।’

আমার এত খারাপ লাগল! আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। কণা আপা এগিয়ে এসে খুব অবাক হয়ে বলল, ‘কাঁদিস না, বাবু। কাল দাদী বড় হুজুরের দেয়া তাবিজ ফুপুকে পরাবে। বড় হুজুর বলেছে তাবিজ নেয়ার সাত ঘণ্টার মধ্যে ফুপু ভাল হওয়া শুরু করবে। দেখিস বড় ফুপু ভাল হয়ে যাবে। চিন্তা করিস না, ভাই।’

শুক্রবার সকাল বেলা ফুপুকে আমি নিজ হাতে জানালায় তাবিজটা দিয়ে এলাম। ফুপু কথা দিল তাবিজটা ডান কোমরে ঝুলিয়ে পরে নেবে। আমি বিকেল থেকেই বুক ভরা আশা নিয়ে ফুপুর দরজার সামনে ঘুরঘুর করতে লাগলাম।

রাত দশটা মত হবে। এখনও ফুপুর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। আমি দরজা ধাক্কাতে যাব, ঠিক তখনই জমেলা খালার আর্তচিৎকার। তার ভয়ার্ত চিৎকারে বাড়ির সবাই গিয়ে দেখি কলপাড়ের পাশে ঝোপমত জায়গায় জমেলা খালা রক্তশূন্য মুখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। বাবা আশপাশে টর্চ মারতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল। দেখলাম মানুষের মত মুখ, আর গরিলার মত শরীর নিয়ে তিনটা প্রাণী নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। একটি বড়, একটি মাঝারি, একটি ছোট। যেন একটি মৃত পরিবার। সারা গায়ে লোম। ঘন কালো বড়-বড় লোম। আমি বাবার হাত থেকে টর্চ লাইট নিয়ে আলো ফেলে দেখলাম পশুগুলোকে। মাঝারি আকারের পশুটার মুখে আলো ফেলে চমকে গেলাম। দেখলাম ওটা আমার বড় ফুপু।

কালো জাদু – মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর

এক

অনেক চেষ্টা করেও অমল কান্তি ইন্সুরেন্স কোম্পানির চাকরিটা বাঁচাতে পারল না। পরপর তিন মাস হলো টার্গেট পূরণ করতে পারেনি। তার বেতন আসে গ্রাহকদের প্রিমিয়াম থেকে। তিন মাসে গ্রাহক জোগাড় করতে পেরেছে মাত্র পাঁচজন। সেই পাঁচজনও এমন কোনও বড় পার্টি না, নিজের পরিচিতদের মধ্য থেকেই ধরে বেঁধে রাজি করিয়েছিল। এরা প্রথম দু’মাস প্রিমিয়াম জমা দিয়েছে, তৃতীয় মাসে প্রিমিয়ামের খবর নেই। দেখা করতে গেলে কাজের মহিলা দরজা খুলে বলে, ‘সাহেব, মেম সাহেব কেউ ‘বাসাত’ নাই।’

ওদিকে ড্রয়িং রুমে হিন্দি সিরিয়াল চলছে, ডাইনিং টেবিলে জগ থেকে গ্লাসে জল ঢালার গবগব শব্দ। অমল কান্তির ভাই-বোন, বিধবা মা পাটুরিয়ায় গ্রামের বাড়িতে থাকে। আগে জমি-জমা ভালই ছিল। এখন পদ্মা ভেঙেচুরে সব শেষ করেছে, সেই সঙ্গে ওপারে পাড়ি জমিয়েছে অমলের বাবাও। সংসার চালানোর দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। অফিস থেকে বেরিয়ে পীর ইয়ামেনী মাজারের কাছে ছোট পার্কে বসে গুলিস্তানের ট্র্যাফিক জ্যাম দেখতে দেখতে এখন কী করবে সেটি ভেবে কাহিল হয়ে যাচ্ছে অমল। ছোটাছুটি, হৈচৈ, কনুইয়ের গুঁতো, জামাই-বউ চানাচুর, আ- য়ে বুট-পালিশ, বাবা ভিক্ষা দেন-কত তাল! কে কার আগে যাবে, কীভাবে দু’টাকা পকেটে আসবে, সেই প্রচেষ্টা। অথচ সে কী করবে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না। অমল লক্ষ করল, বেশ কিছুক্ষণ হয় চেংড়া এক ছেলে আশপাশে ঘুরঘুর করছে। এর কাজ কানের ময়লা পরিষ্কার করা, মাথা বানানো। ছোট্ট একটা কাঠের বাক্সে নানান উপকরণ। খাওয়া-পরার জন্যে মানুষ কত কী যে করে! লোকে চুল- দাড়ি কাটার বেলায় যত রেগুলার, কান পরিষ্কার করার বেলায় ততটা বোধ হয় না। চুল-দাড়ি বাইরে থেকে দেখা যায়। কানের ভেতর কী ছুঁচোর নেত্য হচ্ছে, বাইরে থেকে তো আর সেটা দেখা যায় না। পরিষ্কার করালেই কী, আর না করালেই কী? ময়লার ঠেলায় কান চুলকানো শুরু হলে তবেই না। ছেলেটার জন্যে অমলের মায়া হচ্ছে। এর হয়তো সকাল থেকে খদ্দেরই জোটেনি। এদের খদ্দেরদের যে অর্থনৈতিক বুনিয়াদ, তাতে ছ’মাসে ন’মাসে একবারই হয়তো কান পরিষ্কার করাতে পারে। দুপুরে কী খাবে সেটা ভেবে হয়তো ভেতরে ভেতরে অস্থির কান পরিষ্কার করাঅলা। ছেলেটাকে ডেকে পাশে বসাল অমল। জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার নাম কী?’

‘কামাল।’

‘বাড়ি কোথায় তোমার?’

‘এত কথার কাম কী? কান পরিষ্কার করাইবেন, না মাথা বানাইবেন?’

‘মাথা বানাতে কত লাগবে?’

‘আদা গণ্টা দশ টাকা।’

‘আচ্ছা বানাও, মাথা বানাও। তবে ওই সব তেলফেল দিয়ো না। শুকনো-শুকনো মাথা বানাও। হাই অ্যাণ্ড ড্রাই।’

কামাল মাথা বানাতে শুরু করার পর অমল আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কামাল, তোমার বাড়ি কোথায় তা তো বললে না।’

‘আমার বাড়ি কই জাইন্যা কী করবেন, সাব?’

‘কিছুই করব না। তবুও জানতে চাই। বলতে না চাইলে বাদ দাও।’

‘আমার বাড়ি লালমণির হাট।’

কামাল এখন চুল টানা বাদ দিয়ে দুই হাতের পাঞ্জা একসঙ্গে করে মাথায় হালকা বাড়ি দিচ্ছে। জোড়া জোড়া আঙুলের চটর-পটর শব্দ। ঘুমের আমেজ। দুশ্চিন্তার অবসান। কিন্তু ঘুমানো যাবে না। ঘড়ি, মানিব্যাগ লোপাট হতে পারে।

‘আচ্ছা, কামাল, লালমণির হাটের নাম লালমণির হাট হলো কেন?’

‘এইটা তো, সা’ব, কইতে পারতাম না। তই এক সা’বে মনে লয় পারব।’

‘কোন্ সাহেব পারবে?’

‘মাজে মদ্যে এক সাব চাইরটার দিকে এই পার্কে আহে। হেই সা’ব খুব শিক্ষিত।’

‘সেই সাহেব খুব শিক্ষিত তা তুমি বুঝলে কী করে? তোমাকে কি সে বলেছে?’

‘এমনিই বুজা যায়। আফনে দেকলেও বুজবেন।’

‘সেই সাহেব এসে কী করে? তোমাকে দিয়ে মাথা বানায়?’

‘জী, আমি তার মাথা বানায়া দেই।’

‘এত শিক্ষিত লোক পার্কে বসে মাথা বানাবে কেন? সে মাথা বানাবে এসি সেলুনে। না হয় মাসাজ পার্লারে।’ ^

‘হেইডা তো, সা’ব, কইতে পারতাম না। আমি উনারে কোনও দিন জিগাই নাই।’

‘জিজ্ঞেস করনি কেন?’

‘ওস্তাদের নিষেধ আছে। বড় কাস্টমাররে কোনও কিছু জিগাইতে নাই।’

‘সে বড় কাস্টমার হলো কীভাবে?’

‘সা’বে একবার মাথা বানাইলে এক শ’ টাকা দেয়।’

‘এক শ’ টাকা দেয় পার্কে বসে মাথা বানানোর জন্যে! আজব লোক তো রে, ভাই। আজকে আসবে নাকি?’

‘হেইডা তো, সা’ব, কওন যায় না। আইতেও পারে, আবার না-ও আইতে পারে।’

‘কতদিন ধরে এখানে আসছে সে?’

‘তা ধরেন এক মাস হইব।’

‘এই এক মাসে ক’বার এসেছে ওই লোক?’

‘ছয়-সাতবারের মত।’

‘যদি সাতবার হয়, তা হলে সে এসেছে প্রতি চার দিনে একবার। শেষবার কবে এসেছিল?’

‘দুই দিন আগে।’

‘রুটিনমাফিক এলে আরও দু’দিন পরে আসার কথা, ঠিক না?’

‘জী, ঠিক। তয় আইজ মনে লয় আয়া পড়ব। ঘড়িত্ এখন বাজে কয়টা?’

‘সাড়ে তিন।’

‘আদা গণ্টা বহেন। আইলে লুকটারে দেকতে পারবেন।’

বসা ছাড়া অমল কান্তির আর কাজ কী? কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই।

শ’খানেক চিনে বাদাম কিনে বেঞ্চে বসে অমল আর কামাল বাদাম খেল। বাদাম খেয়ে গলা গেল শুকিয়ে। জলের জগ আর গ্লাস নিয়ে ঘোরাঘুরি করা জলঅলাকে খুঁজতে গেল কামাল। অমলের পাশে বেঞ্চের ওপর তার কাঠের বাক্স। এই বাক্স কামালের ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট। সে যে- পেশার লোক, তার পরিচয় বহন করে ওটা। যেমন ধুনকারের ধুনুরি, নাপিতের ক্ষুর-কেঁচি-আয়না, ডাক্তারের কালো চামড়ার ব্যাগ, ছুরি-চাকু ধারদেয়াঅলার শান দেয়া মেশিন, শিল-পাটা-কোটাঅলাদের ছেনি-হাতুড়ি, উকিলের- মুহুরির ডায়েরি। এইসব ‘দক্ষ’ পেশাজীবীদের সবাই পুরুষ। মেয়েদের ভেতর কেবল বেদেনীরাই ঝোলার ভেতর ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে ঘোরাঘুরি করে। মফস্বল শহরে বেদেনীদের রমরমা ব্যবসার জায়গা হলো কোর্ট প্রাঙ্গণে বটগাছের তলা। পিঠ বের করা ছোট-ছোট ঘটি হাতা ব্লাউজ, ছাপা শাড়ির নিচ দিয়ে সেমিজের কুচি বেরিয়ে আছে, পাড়ে ঢাকা ভারী নিতম্ব, গোলাপি স্যাণ্ডেল, পায়ের বর্তুলাকার আঙুলে হালকা দেবে যাওয়া নিখুঁত কাটা নখে গাঢ় লাল নেলপালিশ, চুড়ো করে খোঁপা বাঁধা চুল, পানের রসে লাল ঠোঁট, গোল গোল মসৃণ হাত ভর্তি চুড়ি, রোদে পোড়া লালচে মুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য। কোর্টে যারা আসে, তাদের সিংহভাগ গ্রামের খেটে খাওয়া মাঝবয়সী মানুষ। বছর-বছর ছেলেমেয়ে হওয়াতে এদের বউরা কাহিল। বেদেনীদের আঁটসাঁট দেহ, চিরল দাঁতের হাসি, ঘাম আর চুলের সুগন্ধ এক বড় ধরনের ডাইভারশান। মেয়েগুলোর কাছাকাছি বসে নানান অসুখ-বিসুখের আলোচনা করলে এদের মনটা অন্তত হালকা হয়। সে বেদেনীর ওষুধে অসুখ ভাল হোক, আর না হোক। কোর্ট এক ভয়াবহ নিষ্ঠুর জায়গা, দয়া-দাক্ষিণ্য, মায়াকাড়া ব্যবহার এখানে নেই। তবে বেদেনীদের আছে। বেদেনীরা যখন কথা বলে, তখন তাদের সামনে বসা মাঝবয়সী লোকগুলো এমনভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন খ্রিস্টের বাণী শুনছে। আসলে আদৌ কিছু শুনছে কি না সেটাই প্রশ্ন। বেদেনী নিজেও সেটা ভালভাবেই জানে। তার অভিজ্ঞতাও কম নয়। কথা দিয়ে আর নানান ঢঙ-ঢাঙ করে এসব লোকেদের মুগ্ধ করাই তার কাজ। তার সাফল্য যতখানি ওষুধে, তার থেকে ঢের বেশি কথায়। কোর্টের উকিল, মুহুরি, পেশকার, বেইলিফদের টাকা দেয়ার পর বাস ভাড়া, দুপুরে খাওয়ার টাকা মাইনাস করে যা থাকে, তার বেশ খানিকটা যায় বেদেনীদের হাতে। অডেসি-র সাইরেনরাও মেয়ে ছিল। তবে পুরো মেয়ে নয়। উপরের অর্ধেক মেয়ে, নিচের অর্ধেক পাখি। সাইরেনদের গলা ছিল সাবিনা ইয়াসমিনের থেকেও বেশি মিষ্টি। একবার এদের গলার গান শুনলে ভুল হয়ে যেত দুনিয়াদারি। সাইরেনদের পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে থাকত পুরুষেরা। তারপর যেত ওদের পেটে। বেদেনীরা সাইরেন নয়। তাদের মায়া-দয়া আছে। টাকা-পয়সা হয়তো কিছু নেয়, তবে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আর চোখ-মুখ নেড়ে মন তো রাঙায়। মেয়েদের সঙ্গ যে কত মধুর হতে পারে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ এই বেদেনীরা। নিজেদের স্বামীদের সঙ্গে বেদেনীরা এরকম মিষ্টি ব্যবহার করে কি না, কে জানে? তবে নিজ গৃহে খাণ্ডারনী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

.

হঠাৎ অমল কান্তির চোখে পড়ল সিটি কর্পোরেশনের অফিসের ওদিকটায় সাদা এক গাড়ি থেকে লম্বা একহারা গড়নের মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক নামছে। পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, পায়ে কালো চামড়ার ফিতেঅলা স্যাণ্ডেল। চোখে কালো সানগ্লাস। সোজা অমল কান্তির সামনে এসে থামল লোকটা। বোঝাই যাচ্ছে দূর থেকেই কামালের ‘টুল- বক্স’ দেখতে পেয়েছে। ওই বাক্সই বেঞ্চটার কাছে টেনে এনেছে তাকে। অমল দেখল ঘসঘসে কালো চুল লোকটার। সম্ভবত কলপ দেয়া। তবে মুখ আর হাত দেখে থমকে যেতে হয়। দেখলে মনে হয় রক্ত নেই শরীরে। টান-টান হয়ে আছে ফর্সা চামড়া। হয়তো পুড়ে গিয়েছিল লোকটার শরীর। অন্য জায়গা থেকে চামড়া কেটে এনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে মুখে আর হাতে। ক্ষয়ে গেছে নাকের পাটা, ঠোঁটের কোনা। আঙুলে নখ নেই বললেই চলে। অমলের বুঝতে দেরি হলো না এই লোকই কামালের ভিআইপি কাস্টমার। মুখ খুলল অমল, ‘আপনি কি কামালকে খুঁজছেন?’

‘কামাল না জামাল সেটা বলতে পারব না। তবে এই বাক্স যার, তাকেই খুঁজছি,’ খসখসে গলায় উত্তর দিল সফেদ আগন্তুক।

‘এই বাক্স কামালের। জল আনতে গেছে। বসেন, এসে পড়বে এখনি।’

বেঞ্চে বসে লোকটা বলল, ‘আপনি কি কামালের আত্মীয়?’

‘জী-না। আমি ওর কাস্টমার। সত্যি বলতে কী আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।’

‘আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন! ইন্টারেস্টিং। কী ব্যাপার বলেন তো?’

‘না তেমন কিছু না। মাথা বানাচ্ছিলাম ওকে দিয়ে। জিজ্ঞেস করলাম বাড়ি কোথায়। ও বলল লালমণির হাট। জানতে চেয়েছিলাম লালমণির হাটের নাম লালমণির হাট হলো কেন।’

‘ও, আচ্ছা। তো এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী?’

‘আছে, সম্পর্ক আছে। কামাল বলছিল, ও জানে না, তবে আপনি জানেন।

‘জানলেই বা কী? সে তো আমাকে চেনে না। এখানে কখন আসব তারও কোনও ঠিক নেই। আপনাকে বলল আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর জানি, আর আপনি কাজ-কাম ফেলে পার্কে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। এ তো দেখি

‘আমার মন বলে তুমি আসবে…’ তাজ্জব ব্যাপার!’

‘আপনি যেরকম ভাবছেন বিষয়টা সেরকম নয় মোটেও। আমি এমনিতেই সময় কাটানোর জন্যে বেশ কিছুক্ষণ বসতাম এখানে। এরই ভেতর আপনি এসে পড়লেন। একে কাকতালীয় ছাড়া আর কী বলব?’

জল নিয়ে কামাল এসে পৌঁছাল। ভিআইপি কাস্টমারকে বেঞ্চের ওপর বসে থাকতে দেখে সব ক’টা দাঁত বেরিয়ে গেল তার। বলল, ‘ছার, কহন আইলেন?’

‘এই তো এখনই। তুমি তো মনে হচ্ছে ব্যস্ত?’

‘কী যে বলেন, ছার? আফনের কাম সবতের আগে। মাথা বানাইবেন, ছার?’

‘না। আজ আর মাথা বানাতে হবে না। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম পার্কে একটু বসি। তোমার কাজ তুমি করো। আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না।’

‘ছার, এই সা’বে একটা কথা জানবার চায়। তারে কইছি আফনে কইবার পারবেন। উনারে জওয়াবটা দিয়া দেন। ছার, সওয়ালটা হইল, লালমণির হাটের নাম লালমণির হাট হইছে কেমনে?’

‘প্রশ্নের জবাব দিলে কি তুমি খুশি হবে?’

‘ছার, কাস্টমারগো খুশি হইল আমগো খুশি। তয়, ছার, আফনার অসুবিদা হইলে দরকার নাই। একজনরে খুশি করতে গিয়া দশজনরে অখুশি করন ঠিক না।’

‘এতদিন জানতাম নাপিতেরাই দার্শনিকের মত কথা বলে। এখন দেখছি কান পরিষ্কার করাঅলারাও ওই একই গুণের অধিকারী। কান টানলে মাথা আসে। মাথা নিয়েই যখন কারবার। দার্শনিক তো হতেই হবে। যা হোক, আমার অসুবিধা নেই। তবে উনাকে খুশি করার চেয়ে তুমি যাতে অখুশি না হও, সেইটে আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আব্দার একটা যখন করেই ফেলেছ, তখন সেটা রাখব আমি। বলছি শোন। লালমণির হাটে আজ থেকে দেড় শ’ বছর আগে ইংরেজরা রেল লাইন বসিয়েছিল। এই রেল লাইন বসাতে গিয়ে শুরু হলো খোঁড়াখুঁড়ি। মাটি খুঁড়তেই পাওয়া গেল অসংখ্য লাল পাথর। এই লাল পাথরকেই ওখানকার লোকেরা বলত লাল মণি। হাটে নিয়ে গিয়ে বেচাও হতে লাগল পাথর। সেই থেকেই ওই জায়গার নাম হলো লালমণির হাট।’

কামাল অমলের দিকে তাকাল। মুখে দিগ্বিজয়ের হাসি। সেই হাসি কথায় ট্র্যানস্লেট করলে এই রকম দাঁড়াবে: দেখলেন তো! আফনারে কী বলছিলাম? ছার খুব শিক্ষিত।

আগন্তুক এইবার অমলের দিকে নজর দিল। তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি আছেন কোথায়?’

‘না, তেমন কোথাও না।’

‘”তেমন কোথাও না’” বলতে?

‘এতদিন এক ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে ছিলাম। তবে এখন আর নেই। বেকারই বলতে পারেন।’

‘বেকারই বললে মনে হয় কিছু না কিছু কাজ-কর্ম আছে। আসলেই কি তা আছে?’

‘না, নেই। কোনও কাজই নেই। একেবারেই ঝাড়া হাত-পা। পুরো বেকার।’

‘হুঁ। তা আপনি পড়াশুনো কতদূর করেছেন, জানতে পারি?’

‘মানিকগঞ্জ কলেজ থেকে বি.কম. পাশ করেছি।’

‘বি.কম. তো ভালই। চাকরি তো হওয়ার কথা। সমস্যা কোথায়?’

‘চাকরি পেতে হলে পরিচিত লোক থাকতে হয়। না থাকলেও যে হয় না, তা না। তবে অ্যাকাউন্টসের কাজ। প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি নিতে গেলে লাখ খানেক টাকা ডিপোজিট দিতে হয়। ওই টাকাটা জোগাড় করা যাচ্ছে না।

‘আপনার নাম কী, বলেন তো?’

‘আমার নাম অমল কান্তি।’

‘বিয়ে করেননি কেন? হিন্দু ছেলেরা বিয়েতে পণের টাকা পায়। ওই টাকায় সমস্যার সমাধান হতে পারত।’

‘বাড়িতে বিধবা মা আর ছোট-ছোট ভাই-বোন। এদের দেখাশুনোর ভার আমার ওপর। বিয়ে করে লেজে-গোবরে হতে চাইনি।’

‘ওরে, বাবা! আপনার জীবন তো দেখি, ভাই, ষাটের দশকের কোলকাতার বাংলা সিনেমা। সে যাই হোক, আপনার একটা চাকরির ব্যবস্থা হয়তো করতে পারব। তবে ইন্টারভিউ দিতে হবে আপনাকে। যদি পাশ করতে পারেন, তা হলে চাকরি পাবেন। দিতে চান ইন্টারভিউ?’

‘দেব। কোথায়, কখন যেতে হবে বলেন।’

‘কোথাও যেতে হবে না। যদি চান, তা হলে এখানেই ইন্টারভিউ দিতে পারেন। এখনই।’

‘তাই নাকি? কে ইন্টারভিউ নেবে? কোন্ কোম্পানি?’

‘আমিই ইন্টারভিউ নেব। পাশ করলে চাকরি করবেন আমার অফিসে। কোন্ অফিস? কোথায় অফিস? এসব জানতে পারবেন ইন্টারভিউ-এ পাশ করার পর। ঠিক আছে?’

‘জী, ঠিক আছে। বলেন কী জানতে চান।’

‘আমি আপনাকে একটা ধাঁধা বলব। তবে ধাঁধার উত্তর যে এখনই দিতে হবে তেমন কোনও শর্ত নেই। আগামীকাল সকাল এগারোটা পর্যন্ত সময় পাবেন। ফোন নম্বর দিয়ে যাব। উত্তরটা যদি আগামীকাল দেন, তা হলে ফোন করে জানাবেন। উত্তর সঠিক হলে কোথায় যেতে হবে বলে দেব। কী, রাজি?’

‘জী, রাজি। ধাঁধাটি কী?’

‘বলছি, মন দিয়ে শোনেন। ধাঁধা বলার সময় বা বলা শেষ হলে কোনও প্রশ্ন করতে পারবেন না। শুধু উত্তর দিতে পারবেন। আর সেই সুযোগ পাবেন মাত্র একবার। এই শর্তগুলোর একটাও ভঙ্গ করা যাবে না। বোঝা গেছে?’

‘জী।’

‘ধাঁধাটা হলো এই: একটা লোক তিনটে জিনিস নিয়ে নৌকো করে ছোট একটা নদী পার হবে। কিন্তু নৌকোটা এতই ছোট যে একবারে সে শুধু একটা জিনিসই নিতে পারবে। অর্থাৎ, একেকবারে একটা করে জিনিস নিে ওপারে গিয়ে সেই জিনিসটা রেখে ফের এপারে এসে আরেকটা নিয়ে যাবে। তবে সমস্যা আছে। সমস্যাটা হলো যে তিনটি জিনিস সে ওপারে নিয়ে যাবে- সেগুলোতে। তিনটে জিনিস হলো: একটা শেয়াল, একটা বাঁধা কপি, আর একটা ছোট ছাগল। এখন লোকটা যদি বাঁধা কপি নিয়ে ওপারে যায়, তা হলে শেয়াল ছাগলটাকে একা পেয়ে খেয়ে ফেলবে। আর প্রথমে যদি শেয়াল নিয়ে ওপারে যায়, তা হলে সেই সুযোগে ছাগলটা খেয়ে ফেলবে বাঁধা কপি। লোকটাকে ঠিকঠাক মত এই তিনটে জিনিসই নদীর ওপারে নিতে হবে। কোনটারই কোনও ক্ষতি হতে দেয়া যাবে না। মনে রাখবেন, এপারে যেমন সুযোগ পেলে শেয়াল ছাগলটাকে কিংবা ছাগল বাঁধা কপিটাকে খেয়ে ফেলবে, সেই একই ব্যাপার কিন্তু ঘটবে ওপারেও। এটাই ধাঁধা। এখন বলেন কীভাবে ঠিকঠাক মত জিনিসগুলো ওপারে রেখে আসা যাবে।’

এতক্ষণ কামাল চুপচাপ ছিল। ধাঁধা শোনার পর সে আর চুপ করে থাকতে পারল না। আগন্তুককে বলল, ‘ছার, সওয়ালের জওয়াব আমি দিলে অইব?’

‘তুমি দিতে চাও? ঠিক আছে, দাও। উত্তর যদি সঠিক হয়, তা হলে ধরে নেব অমল বাবু ইন্টারভিউতে পাশ করেছেন।’

‘ছার, প্রথমে পার করন লাগব খাসিডারে। এইপারে খ্যাক শেয়ালে তো আর বান্দা কপি খাইতে পারবে না।’

‘বেশ, তারপর?’

‘হেরপর বান্দা কপিডারে নৌকাত উডায়া নিতে হইব ওইপারে। কপিডারে রাইখা হেরপর এইপারে আইয়া নিব খ্যাক শেয়ালডারে। ব্যস, কাম শ্যাষ।’

‘উঁহুঁ ‘কাম শ্যাষ’ না। লোকটা যখন বাঁধা কপি রেখে শেয়াল আনতে যাবে, সেই সুযোগে বাঁধা কপি খেয়ে ফেলবে ছাগল। লোকটা শেয়াল নিয়ে ফিরে এসে দেখবে বাঁধা কপি শেষ। সমস্যাটা বুঝতে পেরেছ?’

‘অ্যাঁ? এইডা তো, ছার, খেয়াল করি নাই। বিষয়ডা তো, ছার, মনে লয় বহুত জটিল!’

‘তা, কিছুটা জটিল তো বটেই।’

আগন্তুক এবার অমল কান্তির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী ভাবছেন, অমল বাবু? উত্তর কি এখনই দেবেন, না কাল সকাল পর্যন্ত সময় নেবেন?

‘কাল সকাল অব্দি সময় চাই।’

‘ঠিক আছে। সকাল পর্যন্ত সময় দেয়া হলো। তবে মনে রাখবেন, এগারোটার পর সঠিক-বেঠিক কোনও উত্তরই গ্রহণযোগ্য হবে না। সময়ই সব কিছুর নিয়ন্ত্রক। সময় হচ্ছে স্বয়ং ভগবান। এই নেন ফোন নম্বর। উত্তরটা ফোনে জানাবেন।’

‘আপনার নামটা তো জানা হলো না।’

‘ইন্টারভিউতে পাশ করলে জানতে পারবেন, এখন না।’

উঠে পড়ল আগন্তুক। কামালের হাতে এক শ’ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে ডানে-বাঁয়ে কোনও দিকে না তাকিয়ে সোজা বেরিয়ে গেল পার্ক থেকে। গাড়ির দরজা খুলে দিল ড্রাইভার।

দুই

অমল কান্তি যখন মেসে ফিরল, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। মেসে ঢোকার সময় দেখা হলো মেস ম্যানেজার বিনয় বোসের সঙ্গে। মান্ধাতা আমলের তেলতেলে হাতলঅলা পিঠ-বাঁকা বেঞ্চিতে পা উঠিয়ে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। মেঝের ওপর চামড়ার কোলাপুরি চটি। খুব সম্ভব বিনয় বাবুর শ্বশুরের আমলের। চটির জগতের ডাইনোসর। অরিজিনাল বহু আগেই খতম হয়ে গেছে। মুচির কল্যাণে জোড়া লাগানো ফসিল। পরনে হাতাঅলা সাদা গেঞ্জি, ধুতি। গলায় কাঠের মালা। বেঞ্চের কাঠ যত তেলতেলে, তার থেকেও ঢের বেশি তেলতেলে কাঠের মালা। জন্মের পর থেকেই সম্ভবত বোস বাবুর গলায় ঝুলছে ওটা। মাথার ওপর ঘড়ঘড় করে চলছে পাকিস্তান আমলের হীরা ফ্যান। শেষ কবে ক্যাপাসিটর পাল্টানো হয়েছিল ভগবান বলতে পারবেন। এই ফ্যানের চরিত্র একসময় ফ্যানের মত হলেও এখন এর কুকুর স্বভাব। আওয়াজ যত বেশি, কাজ তত কম।

বিনয় বোস অমলের দিকে ফিরেও তাকালেন না। খবরের কাগজ পড়তেই থাকলেন। অমল যে একটা অপদার্থ সেই ধারণা বিনয় বাবুর একেবারে গোড়া থেকেই। এখন যদি জানতে পারেন তার চাকরি নেই, তা হলে সেই ধারণা হবে ধর্মীয় বিশ্বাসের মত চিরন্তন। রুমে গিয়ে কাপড়- চোপড় ছেড়ে চকির ওপর শুয়ে পড়ল অমল। ধাঁধার উত্তর নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। সে আছে এক ঘোরের ভেতর। বামুন ঠাকুর এসে খাবার দিয়ে গেছে। ইলিশ মাছের মাথা আর কাঁটাকুটি দিয়ে মিষ্টি কুমড়ো ঘণ্ট। তার সঙ্গে করলা ভাজি, অড়হরের ডাল। টেনশনের ঠেলায় খিদেই নষ্ট হয়ে গেছে। এ জীবনে কত অদ্ভুত ঘটনার মুখোমুখি যে হতে হয়! ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশান। নিজের অস্তিত্ব, মা-ভাই- বোনের খোরপোষ সব নির্ভর করছে একটা ধাঁধার উত্তরের ওপর। হায়রে নিয়তি!

অমলের মনে পড়ল কলেজে ইংরেজি প্রফেসরের বলা একটা গল্পের কথা। অনেক দিন আগে লণ্ডনের নাম যখন লণ্ডনিয়াম, তখন সেখানে গ্রাম থেকে অভাবের তাড়নায় এক যুবক এসে হাজির হলো। হন্যে হয়ে কাজ খুঁজতে লাগল ছেলেটি। দিন যায়, যায় সপ্তাহ, কিন্তু কাজ আর পায় না। এদিকে শেষ হয়ে এসেছে পকেটের রেস্ত। একদিন গভীরভাবে চিন্তা করতে করতে কখন যে সে রাজপ্রাসাদের সামনে এসে পড়েছে, খেয়ালই করেনি। আসলে রাজপ্রাসাদ দেখতে কেমন সেইটেই জানত না। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁ করে রাজপ্রাসাদ দেখতে লাগল সে। হঠাৎ তার চোখে পড়ল প্রাসাদ প্রাঙ্গণে এক জনসমাবেশ। বড় একটা পাথরের প্ল্যাটফর্মকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে লোকগুলো। বিষয় কী? না, এক যুবকের শিরচ্ছেদ হচ্ছে। শিরচ্ছেদের কারণ রাজকন্যার ধাঁধার উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে সে। খোঁজ-খবর নিয়ে গ্রাম থেকে আসা যুবক জানতে পারল রাজকন্যাকে যে-কোনও ছেলে বিয়ে করতে পারে। শর্ত হলো: তার ধাঁধার সঠিক উত্তর দিতে হবে। ভুল উত্তর দিলে কাটা পড়বে মুণ্ড। ধাঁধার উত্তর ভেবেচিন্তে বের করার জন্যে এক বছর সময় দেয়া হবে। যুবক ভাবল জীবনে ঝুঁকি একটা নিতেই হবে তাকে। নো রিস্ক নো গেইন। প্রাসাদের গেটের সামনে রাখা ইয়া বড় কাঁসার ঘণ্টায় বাড়ি দিয়ে রাজকন্যাকে বিয়ের ইচ্ছে জানাল যুবক। এরপর তাকে নেয়া হলো রাজদরবারে। সেখানে রাজার পাশে বসে রাজকন্যা শোনাল তার ধাঁধা। বলতে হবে: ‘মেয়েরা কোন জিনিস সবচেয়ে বেশি কামনা করে।’ এক বছর সময় দেয়া হলো যুবককে। দেয়া হলো প্রচুর টাকা-পয়সা, থাকার জায়গা, চাকর-নফর। সেই সঙ্গে রাখা হলো প্রহরী-যুবক যাতে পালাতে না পারে। ঘোরাঘুরির স্বাধীনতা তার আছে। তবে ঘুরতে হবে পায়ের গোড়ালিতে প্রহরী নিয়ে। প্রথম ছ’মাস যেখানে যত বই পেল, সব পড়ার চেষ্টা করল যুবক। এরপর ধর্মগুরু, সমাজগুরু, দার্শনিকগুরু-এঁদের সঙ্গে আলোচনা করে কাটাল আরও পাঁচ মাস। কিন্তু নাহ্। নিশ্চিন্ত হওয়ার মত কোনও উত্তরই পাওয়া গেল না। বাকি আছে আর মাত্র ত্রিশ দিন! প্ৰথম পনেরো দিন কাটল ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে। তার পরের সপ্তাহ শেষ হলো নিজের কামরায় সকাল-সন্ধ্যা শুয়ে- বসে। আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি! যুবক সিদ্ধান্ত নিল শেষ দিনগুলো নদীর ধারে বসে কাটাবে। নদীর ধারে সারাদিন বসে থাকে সে। তাকিয়ে থাকে টলটলে জলের দিকে। দেখতে পায় পাল তোলা নৌকো। ওপারে সবুজ ফসলের খেতে কাজ করছে কৃষক। দুপুরে গাছতলায় বসে বউয়ের আনা খাবার খাচ্ছে। গ্লাসে জল ঢেলে তার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে বউ। খাওয়া শেষ হলে থালাবাটি নদীর জলে ধুয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে কৃষক-বউ। আহ্, কী মধুর এই জীবন! শুধু যদি বেঁচে থাকতে পারতাম! কী কুক্ষণেই যে রাজকুমারীকে বিয়ে করার সাধ জেগেছিল! বামুন হয়ে চাঁদে হাত! এখন আম-ছালা সবই গেল-মনে মনে ভাবে যুবক। খুব আফসোস হয় তার। কিন্তু কী আর করা? এক বছর পূর্ণ হতে আর যখন মাত্র একদিন বাকি, ভয়ানক মুষড়ে পড়ল সে। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর নদীর পাড় ধরে হাঁটতে লাগল মাথা হেঁট করে। কোনদিকে যাচ্ছে খেয়াল নেই। খেয়াল করেই বা কী লাভ? হঠাৎই লক্ষ করল নির্জন এক জায়গায় চলে এসেছে সে। সামনেই ভাঙাচোরা আদ্যিকালের মন্দিরের মত কী যেন। ঝকঝক করছে নিরেট পাথরে তৈরি চত্বর। যুবক ভাবল মন্দির-চত্বরে কিছুক্ষণ বসবে। মনটা হয়তো হালকা হবে এতে। ভেঙে পড়া একটা পাথরের দেয়ালের ওপর বসে আবারও গভীর চিন্তায় ডুবে গেল সে। হঠাৎ মনে হলো পা টেনে টেনে কে যেন এগিয়ে আসছে তার দিকে। মুখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেল, লাঠিতে ভর দিয়ে খুনখুনে এক বুড়ি দাঁড়িয়ে আছে সামনে। ধনুক-বাঁকা পিঠ, শণের গোছা চুল, মুখ কোঁচকানো টমেটো, শালগম থুতনি। অল্প-স্বল্প দাড়িও আছে সেখানে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই থাকতে পারছে না। একদিকে হেলে যাতে পড়ে না যায় সেই প্রচেষ্টাতেই ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে শরীরের সবটুকু বল। যুবককে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুখ খুলল বুড়ি। ওখানে আছে কালো ছোট একটা জিভ আর গোলাপি মাড়ি। দাঁত নেই একটাও। নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধে গাছের ডালে বসা পাখি উড়ে যাবে। বুড়ি বলল, ‘কী, নাতি, এই বয়সেই এত চিন্তা কীসের? এটা তো ফুর্তি করার সময়। যা হবার তা-ই হবে। কী হবে আর ভেবে ভেবে? বরং শুঁড়িখানায় যাও। উড়িয়ে দাও দু’চার পেগ। এরপর ডবকা দেখে এক ছুঁড়ি জোগাড় করে নিয়ে যাও বাড়িতে। আয়েশ করো।’

বুড়ির কথা শুনে দুঃখের ভেতরও হেসে ফেলল যুবক। বলল, ‘শোনেন, বুড়ি মা। বিরাট বিপদের ভেতর আছি। মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করতে চাইলেও পারব কি না কে জানে!’

 

 

‘এই কাঁচা বয়সে আবার কী সমস্যা গো, নাতি? কুমারী মেয়ের পেট বাধিয়ে ফেলেছ? নাকি কারও বউয়ের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে সব লেজেগোবরে করেছ?’

‘আরে, বাবা, এসবের কোনটাই না। আমার সমস্যা, জীবন-মরণ সমস্যা। নিজের পায়ে নিজেই কুড়োল মেরেছি। এখন আর কে বাঁচাবে? জীবনে করতে পারলাম না কিছুই।’

‘সমস্যাটা বলোই না শুনি। সমাধান তো হয়েও যেতে পারে। কে জানে!’

‘আচ্ছা শোনেন তা হলে। এমনিও মরব, ওমনিও মরব। আপনার আকাঙ্ক্ষা তো পূর্ণ হোক।’

যুবক বুড়িকে সব খুলে বলল। সব শুনে বুড়ি বলল, ‘শোন, নাতি, সমস্যার সমাধান আমি করে দেব। তবে শর্ত আছে।’

‘নে, বাবা। খালি শর্ত আর শর্ত। শর্ত ছাড়া জীবনে কি কিছু নেই নাকি? ওসব শর্ত-ফর্তের মধ্যে আমি আর নেই। এমনি এমনি বললে বলেন, না হলে রাস্তা দেখি। কপালে মরণ লেখা থাকলে কারও বাবাও ঠেকাতে পারবে না।’

‘আরে, বাবা, আগে শোনই না! শর্ত শুনে যদি মনে হয় মানতে পারবে, তা হলে আর কথা কী? শর্ত বলব?’

‘আচ্ছা বলেন, কী শর্ত?’

‘শর্ত হলো ধাঁধার উত্তর বলে দেব আমি। তবে তুমি রাজকন্যাকে বিয়ে করতে পারবে না। বিয়ে করবে আমাকে।’

‘এ আবার কী শর্ত! আপনার বয়সের তো গাছ-পাথর নেই। কবরে এক পা চলেই গেছে। এখন বিয়ে-শাদি বাদ দিয়ে ভগবানকে ডাকেন। আপনার হাঁটুর বয়সও হবে না আমার। এ অসম বিয়ে হলে হাসাহাসি করবে লোকে।’

‘ভেবে দেখো, তোমার জীবন তো বাঁচবে। আমি থুরথুরে বুড়ি। ফট করে মরে যাব যে-কোনও দিন। তারপরেই তুমি মুক্ত। যাকে খুশি বিয়ে করতে পারবে। কী, রাজি?’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনার শর্ত মেনে নেব। এখন ধাঁধার উত্তর বলেন।’

‘কাল সকালে রাজকন্যাকে গিয়ে বলবে, ‘সব মেয়ের কামনা একটাই: স্বামীর ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব।’’

পরদিন সকালে রাজদরবারে গিয়ে রাজকন্যার ধাঁধার উত্তর দিল যুবক। খুশি হলো রাজকন্যা। রাজকর্মচারীদের বলল বিয়ের আয়োজন করতে। কিন্তু বাদ সাধল যুবক। বলল, ‘মহামান্য রাজকন্যা, ধাঁধার উত্তর বার করতে গিয়ে আমাকে এত বেশি দুশ্চিন্তা করতে হয়েছে যে বিয়ের সাধ মিটে গেছে আমার। এখন যদি প্রাণ ভিক্ষা দেন তো বাঁচি। যদি অনুমতি দেন তো ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যেতে চাই।’

যুবক মনে মনে ভেবে রেখেছিল রাজদরবার থেকে বেরিয়েই সোজা নিজ গ্রামে ফিরে যাবে। বাড়িতেই কাটাবে বাকি জীবন। যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে। ভাগ্যের জোরে প্রাণে বেঁচে গেছে। বারবার ভাগ্য সহায়তা করবে এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। রাজপ্রাসাদ থেকে বেরুতেই দেখল রাস্তার ধারে সেই খুনখুনে বুড়ি দাঁড়িয়ে। অপেক্ষা করছে তার জন্যে। আদ্যিকালের কোঁচকানো সাদা পোশাক পরে এসেছে। এককালে পোশাকের রঙ হয়তো সাদা ছিল, তবে কালের পরিক্রমায় বর্তমানে অফহোয়াইট। মাথায় লম্বা সাদা স্কার্ফ। হাতে ফুলের তোড়া। বিয়ের জন্যে সম্পূৰ্ণ প্ৰস্তুত!

বুড়ি আর যুবকের বিয়ে হয়ে গেল দুপুরের আগেই। বিকেলটা তারা কাটাল শুঁড়িখানায় মদ খেয়ে। এরপর ফুলশয্যার রাত। প্রচণ্ড মন খারাপ যুবকের। কী ভেবেছিল আর কী হলো? কোথায় ঢলঢলে যুবতী রাজকন্যা আর কোথায় এই কুৎসিত থুরথুরে বুড়ি! ওহ্, ভগবান, এর থেকে মরলেই ভাল ছিল! যুবককে বিছানায় বসিয়ে রেখে বুড়ি গেল কাপড় পাল্টাতে। বুড়ি গেছে তো গেছেই। এদিকে বিছানায় বসে চোখের জল ফেলছে যুবক। হঠাৎ কাপড়ের খসখস শব্দে সংবিৎ ফিরল তার। বুঝতে পারল অপূর্ব সুগন্ধে ভরে গেছে ঘর। কোত্থেকে যেন নীলাভ আলোও আসছে। মুখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেল অনিন্দ্যসুন্দরী এক যুবতী দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। চোখের তারায় আলোর ছটা, পাতলা গোলাপি ঠোঁটের নিচে মুক্তোর মত ঝকঝকে দাঁত। টোল পড়া গালে ভুবন-ভোলানো হাসি। চোয়াল ঝুলে পড়ল যুবকের। এ আবার কোন্ নাটক শুরু হলো! যুবতী বলল, ‘কী হলো, চিনতে পারছ না? এরই মধ্যে ভুলে গেলে বউকে?’

‘কিন্তু আমার বউ তো তুমি নও। আমার বউয়ের বয়স আমার দাদীর চেয়েও বেশি।’

‘ও, বাবা! বিয়ের পর একটা দিনও যায়নি, এরই মধ্যে খোঁটা দিয়ে কথা বলতে শুরু করেছ?’

‘যা সত্যি তা-ই বলছি। ছল-চাতুরি বুঝি না আমি।’

‘আমিই সেই বুড়ি। আমি আসলে ডাইনী। ইচ্ছেমত রূপ বদলাতে পারি। তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে, সেজন্যেই বিয়ে করেছি। এখন বলো, আমাকে কোন্ রূপে পেতে চাও? যদি বলো এখন যেমন আছ তেমনই থাকো, তা হলে একটা শর্ত মানতে হবে-এইটে দাবি করতে পারবে না যে আমি সতীপনা দেখিয়ে বেড়াব। যাকে মনে ধরবে, তার সঙ্গে প্রেম করার অধিকার চাই আমি। আর যদি আগের রূপে থাকতে বলো, তা হলে কথা দিচ্ছি, কারও দিকে ফিরেও তাকাব না কোনও দিন। আমি শুধু তোমারই থাকব। এখন বলো কোটা চাও।’

সব শুনে যুবক বলল, ‘শর্ত শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে আমার। তোমরা মেয়েরা শর্ত না জুড়ে কথাই বলতে পারো না। যা মন চায় করো, বাবা। যেভাবে থাকতে চাও, থাকো। বিয়ে যখন করেই ফেলেছি, তখন বুড়িই কী আর ছুঁড়িই কী? বাদ তো আর দিতে পারব না।’

যুবকের কথা শুনে খুশি হলো ডাইনী। বলল, ‘বাব্বা, জনাবের রাগ তো কম নয় দেখছি! আচ্ছা যাও, এখন যেভাবে আছি, আমাকে পাবে সেভাবেই। আর পুরো বিশ্বস্তও থাকব চিরকাল। কী, দুলহা রাজা, হয়েছে? এবার একটু হাসো তো দেখি।’

.

সূত্রাপুর থানার পেটা ঘড়িতে ভোর চারটে বাজার আওয়াজ শুনল অমল। খিদেয় গুড়গুড় করছে পেট। ভাত খেতে গিয়ে দেখল টক হয়ে গেছে অড়হরের ডাল। করলা ভাজি অ্যায়সা তেতো যে মুখেই দেয়া যাচ্ছে না। মিষ্টি কুমড়োর ঘণ্টে ইলিশ মাছের চ্যাপ্টা কানকোর ছোট একটা টুকরো ছাড়া অন্য কিছু নেই। কী আর করা, কানকোর টুকরোটাই চুষে খেল। বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দিতেই ঘুম নেমে এল চোখে। রাতে স্বপ্ন দেখল ইস্ট লণ্ডনের তস্য গলির ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। চারদিক কুয়াশায় ঢাকা। সুনসান নীরবতা। রাস্তার ধারে ল্যাম্পপোস্টের কয়লা পোড়ানো গ্যাস-বাতির টিমটিমে ভুতুড়ে আলোয় হঠাৎ করেই চোখে পড়ল ক্ষুর দিয়ে ফালি ফালি করে কাটা যুবতী নারীর লাশ। রক্তে মাখামাখি ধূসর রঙের গাউন, দুধ-সাদা নিটোল বুক। কবল-স্টোন রোডের পাথরের খাঁজ বেয়ে থিকথিক করে গড়িয়ে যাচ্ছে রক্ত। যুবতীর হাত-পাগুলো তিরতির করে কাঁপছে তখনও। লম্বা-লম্বা পা ফেলে তার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে কালো রঙের গ্রেট কোট আর মাথায় চার্চিল হ্যাট পরা জ্যাক দ্য রিপার। বিড়বিড় করে বলছে, ‘এই বেশ্যা মাগিটাও আমার ধাঁধার উত্তর দিতে পারল না। কিছু দিন পর আর একটাকে ধরতে হবে। যত্তসব অপদার্থের দল!’

তিন

অমলের ঘুম ভাঙল সকাল আটটার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল ধাঁধার কথা। কিন্তু কোথায় উত্তর? আগে যে তিমিরে ছিল, এখনও সেই তিমিরেই আছে। অমল ভাবল, মেস থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটবে। সকালের আলো-হাওয়ায় মাথাটা খোলতাই হবে। বাইরে বেরিয়ে দেখতে পেল টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে সদরঘাটে চলে এল অমল। আহসান মঞ্জিলের কাছে বুড়িগঙ্গার ধারে বসল। এপারে সদরঘাট, ওপারে কেরানিগঞ্জ। ছোট-বড় নৌকোয় লোক পারাপার হচ্ছে। বাঁশের মাচায় বসে আছে যেসব মাস্তানেরা, ঘাট ডেকেছে তারা। দু’টাকা ভাড়া দিয়ে নৌকোয় উঠতে হয়। আশপাশে চা-পান আর বিড়ি- সিগারেটের দোকান। এক ঘণ্টা ধরে লোক পারাপার দেখল অমল। দশটা বেজে গেল। ধাঁধার উত্তর মিলছে না কিছুতেই। আর মাত্র এক ঘণ্টা আছে। কিছু ভেবে বার করতে পারলে ভাল। না হলে? নাহ্, পরের অংশটুকু আর ভাবতে চায় না অমল।

হঠাৎ করেই তার মনে হলো, বসে থেকে আর কী হবে। তার চেয়ে বরং একবার এপার-ওপার করে দেখা যাক। নদীর জোলো বাতাসে মাথাটা খুললেও খুলতে পারে। দু’টাকা দিয়ে টিকেট কেটে নৌকোয় চড়ে বসল অমল। নৌকো প্রায় ভরেই গেছে। ছেড়ে দেবে যে-কোনও সময়। ঠিক তখনই ছাতা বগলে নিয়ে হনহন করে ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা ধুতি পরা মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক ঘাটে এসে উপস্থিত হলো। টিকেট কিনে নৌকোয় উঠতে যাবে, এমন সময় কী মনে করে পিছিয়ে এসে পানের দোকানে গিয়ে এক খিলি পানের অর্ডার দিল লোকটা। ‘ছাতাটা দোকানের শোকেসের সঙ্গে হেলান দিয়ে রেখে বিল মিটিয়ে পানের বোঁটায় চুন নিতে লাগল। ওদিকে নৌকো প্রায় ছেড়ে দিয়েছে পারানি। লোকটাকে দেখে মনে হলো, হুড়োহুড়ি করে নৌকোয় ওঠার কোনও তাড়া নেই। ভাবছে, ধীরেসুস্থে পরের নৌকোয় গেলেই চলবে। এমন সময় নৌকোর ওপর থেকে কেউ একজন দেখতে পেল লোকটাকে। চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল, ‘এই যে, জামাইবাবু, এই, জামাইবাবু!’

মুখভর্তি পান নিয়ে চমকে ফিরে তাকাল লোকটা। হাসি মুখে এগিয়ে এল নৌকোর দিকে। নৌকোয় উঠে যে ছেলেটা তাকে ডেকেছিল, তার পাশে বসতে বসতে বলল, ‘আরে, ফটিক! তুই কোত্থেকে?’

‘মানিকগঞ্জ থেকে আসছি, জামাইবাবু। মেজদি’র ওখানে গিয়েছিলাম।’

‘ওহ্, তাই নাকি? তা ওরা সব ভাল তো?’

‘আজ্ঞে ভালই। কিন্তু আপনি এখানে? ওপারে যাচ্ছেন নাকি?’

‘হ্যাঁ রে, ফটকে। ওপারে এক লোকের সঙ্গে দেখা করতে হবে।’

এরপর এটা-সেটা নানান কথা বলাবলি করতে লাগল শালা-জামাইবাবু। নৌকো ভিড়ে গেল ঘাটে। এক-এক করে সবাই নেমে গেল। নামল শালা-জামাইবাবুও। অমল নৌকো থেকে নামলই না। এই নৌকোতেই ওপারে ফিরে যাবে সে। পাড় বেয়ে ওপরে উঠতে যাবে, ঠিক এমন সময় থমকে দাঁড়াল জামাইবাবু। বলল, ‘এই, যাহ্। ওরে, ফটকে, ছাতাটা যে ওপারে ফেলে এলাম আমি! তুই এক কাজ কর। দাঁড়া এখানে। দশ-পনেরো মিনিটেরই তো ব্যাপার। ওপারে গিয়ে পানের দোকান থেকে নিয়ে আসি ছাতাটা। নতুন ছাতা। হারিয়ে ফেললে মাথা ফাটিয়ে ফেলবে তোর বড়দি’। এত করে বললাম ছাতা-ফাতার দরকার নেই, তারপরেও জোর করে দিয়ে দিল। বলল, বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। জলে ভিজে জ্বর বাধালে রুগী টানতে পারব না। এখন যদি গিয়ে বলি ছাতা হারিয়েছি, তা হলে বাড়ি মাথায় তুলবে। কেন যে বিয়ে করে মানুষ! এগোলেও নির্বংশের ব্যাটা, পিছালেও নির্বংশের ব্যাটা!’

ঘুরে এসে ফের নৌকোয় উঠল জামাইবাবু। অমলের সঙ্গেই ওপারে ফিরে যাবে। নৌকো ছেড়ে দিতেই সদরঘাটের দিকে তাকাল অমল। লক্ষ করল জামাইবাবুও ওদিকেই তাকিয়ে আছে। আর ঠিক তখনই ধাঁধার উত্তরটা মাথায় এল অমলের। চট করে হাতঘড়ির দিকে তাকাল অমল। সাড়ে দশটা বাজে। নদী পার হতে লাগবে পনেরো মিনিট। ওপারে পৌঁছার পর সময় হাতে থাকবে মাত্র পনেরো মিনিট। এই পনেরো মিনিটের ভেতরই ফোনের কাছে পৌঁছতে হবে। এখন সময় মত ফোন পেলে হয়। তীরে এসে শেষে না আবার তরী ডোবে!

চার

ওপারে পৌঁছে হন্যে হয়ে ফার্মেসি খুঁজতে লাগল অমল। ফোন থাকলে ওখানেই থাকবে। দশ মিনিট ধরে খোঁজাখুঁজি করে পাওয়া গেল ফার্মেসি। কাউন্টারের একপাশে রাখা হয়েছে ফোন। পাশে ফুলস্কেপ কাগজে বলপয়েন্ট পেন দিয়ে লেখা: ‘প্রতি কল দশ টাকা। তিন মিনিট পর প্রতি মিনিট এক টাকা।’ দিন-দুপুরে ডাকাতি। ফার্মেসির ওষুধ বেচে যা আয়, তার থেকে ঢের বেশি টেলিফোন থেকে। খালি নেই ফোন। এক লোক কথা বলছে। কাজের কোনও কথা না। ফালতু আলাপ। ফার্মেসির লোকটাকে অমল জানাল, সে ফোন করতে চায়। জরুরি। লোকটা বলল, ‘দেখতেই তো পাচ্ছেন একজন লাইনে আছে। ওর কথা শেষ হোক, তারপর বলবেন। ‘

এদিকে দু’মিনিট শেষ।

এগারোটা বাজতে তিন মিনিট বাকি!

খেপে গেল অমল। ফার্মেসির লোকটার হাত জোরে চেপে ধরে বলল, ‘আপনি বুঝতে পারছেন না। খুব জরুরি ফোন করতে হবে আমাকে। ওই লোকটাকে বলেন ফোন রাখতে। বুঝেছেন?’

অমলের দিকে তাকিয়ে রইল লোকটা। নড়াচড়ার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না।

আর দু’মিনিট বাকি!

এইবার মাথা খারাপের মত হয়ে গেল অমলের। ছুটে গিয়ে রিসিভার কেড়ে নিয়ে লাইন কেটে দিল সে। কিন্তু ফোন নম্বর! কোথায় ওটা? গতকাল যে শার্ট পরেছিল, ফোন নম্বর লেখা কাগজটা ছিল সেই শার্টের পকেটে। আসার সময় কোন্ শার্ট পরে এসেছে মনে করতে পারল না। ‘হে, ভগবান, রক্ষে করো,’ মনে-মনে ভাবল অমল।

নাহ্, ভাগ্য ভাল।

ওই একই শার্ট আজ সকালেও পরে বের হয়েছে সে। মনের ভুলেই হয়তো পরেছে। যা হোক, পকেটেই আছে নম্বরটা।

এগারোটা বাজতে আর এক মিনিট বাকি!

রিং হচ্ছে!

তিনবার রিং হতেই ওপারে কেউ ফোন ধরল। আগন্তুক তার নাম বলেনি। অমল ধরেই নিল ও প্রান্তে আগন্তুকই ধরেছে ফোনটা।

‘হ্যালো, অমল বলছি। আমাকে চিনতে পেরেছেন?’

‘হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি।’

‘ধাঁধার উত্তরটা দিতে চাই। বলব?’

‘বলেন।’

‘প্রথমে পার করতে হবে ছাগলটাকে।’

‘বেশ। তারপর?’

‘এরপর বাঁধা কপিটা নিয়ে এপারে আসতে হবে।’

‘বলে যান।’

‘বাঁধা কপিটা এপারে রেখে আবার ছাগলটাকে উঠিয়ে নিতে হবে নৌকোয়। তারপর ছাগলটাকে ওপারে রেখে নিয়ে আসতে হবে শেয়ালটাকে। শেয়ালটাকে এপারে বাঁধা কপিটার সঙ্গে রেখে নৌকো নিয়ে আবারও ওপারে ফিরে যেতে হবে। তারপর ছাগলটাকে নৌকোয় উঠিয়ে নিয়ে আসতে হবে এপারে। ব্যস, পার হয়ে যাবে তিনটে জিনিসই। ক্ষতি হবে না কোনওটারই। কয়বার পারাপার করা যাবে এ ব্যাপারে কোনও শর্ত আপনি দেননি। অতএব ‘এটাই সঠিক উত্তর।’

‘বাহ্, বেশ চমৎকার বলেছেন তো! ইন্টারভিউতে পাশ করে গেছেন আপনি। শর্ত পূরণ করেছেন ঠিকঠাক মত। এখন আমার পালা। কোথায় আসতে হবে বলে দিচ্ছি। কাগজ-কলম আছে হাতের কাছে?’

‘জী, আছে।’

‘বেশ, ঠিকানা বলছি। লিখে নেন। ইচ্ছে করলে আজকেই বিকেল চারটার ভেতর জয়েন করতে পারেন।’

ফার্মেসির লোকটাকে ইশারায় কাগজ-কলম দিতে বলল অমল। তারপর লিখে নিল ঠিকানাটা। টেলিফোনে কথা-বলা লোকটা তখনও দাঁড়িয়ে আছে। চোখে-মুখে রাগ। অমলের সঙ্গে একটা বোঝা-পড়ার জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ‘লোকাল মাস্তান হলে খবর আছে,’ মনে-মনে ভাবল অমল। তাড়াতাড়ি লোকটার হাত ধরে বলল, ‘স্যর, কিছু মনে করবেন না। খুব জরুরি ফোন ছিল ওটা। চাকরির ইন্টারভিউ। এগারোটার ভেতরেই ফোন করার কথা। এজন্যেই আপনার সঙ্গে বেয়াদবি করতে হয়েছে। মাফ করে দেন।’

‘চুপ কর্, ব্যাটা। বাতেলা করার জায়গা পাস না। তুই পার করছিস ছাগল, শেয়াল আর মিষ্টি কুমড়ো না কী ঘোড়ার ডিম। চাকরির ইন্টারভিউ এটা! গাঁড়ল পেয়েছিস আমাকে? যা খুশি তা-ই বোঝাবি? আমার জরুরি কথা শেষই হয়নি।’

‘স্যর, শোনেন, আপনার যা বিল হয়েছে দিয়ে দিচ্ছি। আপনি আবার ফোন করেন। এই যে, ফার্মেসির ভাই, উনার বিলটাও রাখেন। সঙ্গে দশ টাকা এক্সট্রা। পরের কলটার জন্যে।’

এবারে কাজ হলো। ফার্মেসির লোকটার দিকে তাকিয়ে মাস্তান এমন ভাব দেখাল, যেটাকে ভাষায় রূপান্তর করলে এই রকম হবে: দেখলি তো, কীভাবে লোককে টাইট করি? আমার সঙ্গে বিটলামি!

পাঁচ

কাগজে লেখা ঠিকানায় যে বাড়ি পাওয়া গেল, সেটা ধানমণ্ডি লেকের ধারে। পনেরো ফুট দেয়ালের ওপর পাঁচ ফুট কাঁটাতার। বিশ ফুট উঁচু গেট। এ বাড়ি এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। বড় গেটের পাশেই দেয়ালে লাগানো ছোট গেট। সবখানে ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরা বসানো। পিপ-হোল টিপ-হোলের কোনও কারবারই নেই। তবে কলিং বেল আছে। কলিং বেল চাপতেই ছোট দরজা খুলে বেরিয়ে এল সাদা উর্দি পরা এক লোক। পেটা শরীর। উপজাতীয় টাইপ চেহারা। এ আসলে নেপালি গুর্খা। গুর্খা দারোয়ান রাখার চল ছিল ব্রিটিশ আমলে। পাকিস্তান পিরিয়ডে বিহারী দারোয়ান রাখা হত। ইয়া বড় গোঁফ। পালোয়ানের মত শরীর। এখন রাখা হয় চল ভাঙা, লুঙ্গি-পরা বাঙালি দারোয়ান। এদের প্রধান কাজ বাড়ি পাহারা দেয়া নয়। প্রধান কাজ হলো চাকরানিদের সঙ্গে ফিল্ডিং মারা আর বাড়ির সামনে মুদি দোকানে গিয়ে দোকানদারের সঙ্গে আড্ডা দেয়া। এ ছাড়াও আরও একটা কাজ আছে। সেটা হলো একে-তাকে ধরে কোনও রকমে একটা সরকারি অথবা বেসরকারি ফার্মে চাকরি ম্যানেজ করা যায় কি না, অনবরত সেই চেষ্টা করা।

গাড়ি বারান্দার দু’দিকে সবুজ ঘাসের বেডে ফুল গাছের ঝাড়। ফুল যা ফুটেছে, তা সবই লাল। লাল-সবুজের সমারোহ। এ লোক প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা নাকি? মনে-মনে ভাবল অমল। নেপালি দারোয়ান অমলকে নিয়ে ছোট একটা অফিস ঘরে বসাল। সেখানে একটা সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপাশে ম্যানেজার মেম সাহেব বসে কী যেন লিখছে। গায়ের রঙ দেখলে যে কেউ বলবে গ্যালন গ্যালন আলকাতরা মাখানো হয়েছে মহিলার শরীরে। ঝামা কালো বললেও সবটুকু বলা হবে না। হালকা গোলাপি সুতি শাড়ি। খাটো-হাতা সাদা ব্লাউজ। নেপালি বলল, ‘মেম সা’ব, নায়া বাবু কো লায়া হুঁ।’

লেখা থামিয়ে মুখ তুলে অমলের দিকে তাকাল ম্যানেজার মেম সাহেব। একটা হার্টবিট মিস হয়ে গেল অমলের। এত সুন্দর চেহারা জীবনে কখনও দেখেছে বলে তাৎক্ষণিকভাবে মনে পড়ল না। এর তুলনা শুধু জাতীয় জাদুঘরে রাখা কষ্টি পাথরে তৈরি রাধার মূর্তির সঙ্গেই হতে পারে। এর চোখের মণি যদি হয় অমাবস্যার রাত, তা হলে বাইরের সাদা অংশটুকু হবে পূর্ণিমার চাঁদ। বাবার আমলের পাকিস্তানি সিনেমার নায়িকা জেবা আলির নাক। সুচিত্রার কপাল, কপোল আর চিবুক। রাখি গুলজারের ঠোঁট। মধুবালার দাঁত। কাঁধের ওপর ছড়ানো স্ট্রেট কালো রেশমী ক্লিওপেট্রা চুল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তুষারের মত নরম ওগুলো। কে বলে কালো মেয়ে সুন্দরী হয় না? এর পায়ের কাছে রাজা-বাদশারা গড়াগড়ি খাবে। তবে এ মেয়ের উপযুক্ত শুধুমাত্র একজন সম্রাটই হতে পারে। বিষাদ-মাখা চোখ মেলে স্পষ্ট গলায় মেম সাহেব জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি অমল কান্তি?’

‘জী, আমিই অমল কান্তি।’

‘একটু বসেন। স্যরকে জানাই আপনি এসেছেন।’

এরপর ইন্টারকমে এক ডায়াল করল মেয়েটা। ওপারে রিসিভার উঠতেই বলল, ‘স্যর, অমল বাবু এসেছেন। নিয়ে আসব? কোথায় বললেন? লিভিং রুমে? আচ্ছা, ঠিক আছে, এখনি নিয়ে আসছি।’ এরপর ড্রয়ারের ভেতর থেকে একটা ফাইল বের করে অমলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চলেন। স্যর অপেক্ষা করছেন।’ অমল ঘুরে দাঁড়াতেই তার চোখে পড়ল দরজার ওপর এক প্যানেলে ছয়টা ক্লোজড সার্কিট টিভি স্ক্রিন। আ-চ্ছা, তা হলে এখান থেকেই অমলের আসার ব্যাপারটা টের পেয়েছে ম্যানেজার মেম সাহেব।

ছয়

ম্যানেজার মেমের পিছে-পিছে বিশাল এক হলঘরে এসে উপস্থিত হলো অমল। দোতলা বাড়ির নিচের তলার অর্ধেকটাই বোধ হয় লিভিং রুম। লম্বা-লম্বা আলমারি ভর্তি পাঁজা পাঁজা পুরনো বই। একপাশে কেমিকেল ল্যাবরেটরি। উল্টোপাশে কাচের টেবিলের ওপর ইয়া মোটা, বেঁটে আর লম্বা সব টেলিস্কোপ। ওগুলোর পাশে ইমেজ প্রিজম আর স্টেইনলেস স্টিলের অ্যাস্ট্রোলোব। খাতা-পেন্সিল, ক্যালকুলেটর। ওদিকটাতে ইঁটের দেয়ালের বদলে বিরাট- বিরাট কাঁচ বসানো। ঘরের ছাতেও কাঁচের পাল্লা বসানো। চাইলেই খোলা যাবে ওগুলো। বার্গাণ্ডি রঙের ভেলভেটের পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে কাঁচের দেয়াল আর ছাত। ঘরের মাঝখানে সাদা রঙের শ্বেত-পাথরে মোড়া নিচু চারকোনা বেদি। সম্পূর্ণ খালি বেদিটা। বেদির পেছনে মজবুত কাঠের পেডেস্টালের ওপর ভারী ছাই রঙা কাপড়ে ঢাকা প্রায় মানুষ সমান কিছু একটা। মূর্তি-টুর্তি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ঘরের আরেকদিকে দুই সেট সোফা। এখানে-সেখানে টেবিল, কুশন, ডিভান, রকিং চেয়ার। যত্রতত্র ফুলদানি। বিশ-ত্রিশটার কম হবে না। সবগুলোতে সাদা ফুল। ফুলের গন্ধে ম-ম করছে ঘরের ভেতরটা। পুরো ঘরটাতেই কালো-সাদা মার্বেল টাইল্স্ বসানো। দেখে মনে হয় বিশাল দাবার ছক বানিয়েছে কেউ।

সোফায় বসে আদ্যিকালের একটা বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিল সফেদ আগন্তুক। বই না বলে বাঁধানো পাণ্ডুলিপি বলাই ভাল। চোখের ইশারায় অমলকে বসতে বলল সে। এই প্রথম কালো চশমা ছাড়া আগন্তুককে দেখল অমল। অনেকেই বলে মানুষের চোখ বাঙ্ময়। চোখ যে মনের কথা বলে। এ লোকের চোখ পাথরের। মনের ভাবনা-চিন্তার কোনও ছাপ সেখানে নেই। অসম্ভব প্রাণহীন আর পুরোপুরি নির্লিপ্ত। তার ওপর আবার চোখের পাতার অর্ধেকটা নেই বললেই চলে। কীসে যেন খেয়ে ফেলেছে ওগুলো। কৃষ্ণ সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে আগন্তুক বলল, ‘ঠিক আছে, মন্দাকিনী, তুমি এখন যাও।’ ফাইলটা অমলের হাতে দিে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল অনন্য সৌন্দর্যের প্রতীক। ‘ফাই খোলেন, অমল বাবু,’ আবার কথা বলল আগন্তুক। ‘ওখানে ফর্ম আছে। ফর্মগুলো পূরণ করেন। ফর্মগুলোর নিচে চাকরির কন্ট্রাক্ট। ভাল করে শর্তগুলো পড়ে সই করবেন। শর্ত ভঙ্গ করা যাবে না কিছুতেই।’

ফর্ম পূরণ করতে লাগল অমল। ফর্মের ডিটেল অত্যধিক বেশি। চোদ্দ গুষ্ঠির ঠিকুজি-কুলজি চেয়ে বসে আছে। সারাজীবনে কোথায় কী করেছে তার প্রায় পুরোটাই লিখতে হলো। সেই সঙ্গে পাঁচটা ভিন্ন ভিন্ন ঠিকানা আর চারজন আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ নয় এমন লোকের ফোন নম্বর। ভাগ্য ভাল, যারা ইন্সুরেন্স পলিসি কিনেছিল, তাদের ফোন নম্বরগুলো পকেট ডাইরিতে লেখা ছিল। ফর্ম পূরণ করা শেষ হলে বেরুল কন্ট্রাক্টের কাগজ। প্রথম শর্ত যেটা মোটা কালিতে লেখা আছে, সেটি হলো: অফিসের কোনও কথা কোনও অবস্থাতেই বাইরে বলা যাবে না। কাউকে না। এই শর্ত ভঙ্গ হলে চাকরি তো যাবেই, সেই সঙ্গে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার কোম্পানির থাকবে।

‘কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’ কী তা অবশ্য বলা নেই। এবং সমস্যাটা ওখানেই। সম্ভবত শাস্তিমূলক ব্যবস্থাটা হবে খুবই সূক্ষ্ম এবং সারাজীবন যাতে ভুগতে হয়, সেই রকমের কিছু একটা। শর্তের শেষের দুটো ক্লজে লেখা, সপ্তাহে কয়দিন কত ঘণ্টা কাজ করতে হবে, ছুটি-ছাটা, আর বেতনের কথা। প্রতি সপ্তাহে সাড়ে সাত হাজার টাকা বেতন। অর্থাৎ মাসে ত্রিশ হাজার। এ তো দেখি গাছে না উঠতেই এক কাঁদি। ত্রিশ হাজার টাকা ছাব্বিশ দিনের মাইনে! খসখস করে সই করে তারিখ বসিয়ে দিল অমল। এরপর কাগজ থেকে মুখ তুলে চাইল আগন্তুকের দিকে। পাণ্ডুলিপির ভেতর ডুবে আছে আগন্তুক। তারপরেও অমল চেয়ে আছে এইটে কীভাবে যেন টের পেল লোকটা। তাকাল অমলের দিকে। জিজ্ঞেস করল, ‘রেডি?’

‘জী। ফরম পূরণ করা শেষ। জব কন্ট্রাক্টে সই করাও হয়ে গেছে।’

‘গুড। কন্ট্রাক্ট ভাল করে পড়েছেন তো?’

‘জী, ভাল করেই পড়েছি।’

‘দশটা-পাঁচটা অফিস। কাল সকাল থেকেই শুরু করেন তা হলে। আজকে এটুকুই। কাল দেখা হবে। আর, হ্যাঁ, যাওয়ার আগে মন্দাকিনীর সঙ্গে দেখা করে যাবেন। ও আপনার ছবি তুলবে। চাকরির দরখাস্তের সঙ্গে ছবি থাকা জরুরি।’

বাসা থেকে বেরিয়ে এল অমল। ছবি ওঠাতে গিয়ে মন্দাকিনী অমলের জামার কলার ঠিকঠাক করার জন্যে বেশ কাছে চলে এসেছিল। নাকে এখনও তার চুলের সুবাস লেগে আছে।

সাত

হাঁটতে হাঁটতে ধানমণ্ডি লেক পার হয়ে মিরপুর রোডে এসে পড়ল অমল। ডানে মোড় নিয়ে হাঁটতেই থাকল। সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে এসে থামল। এখন কোনদিকে যাবে ভাবতে লাগল সেই কথা। সোজা গেলে নিউ মার্কেট, আজিমপুর হয়ে মেসে ফেরা যাবে। বাস ধরে বাম দিকে গেলে গুলিস্তান, পীর ইয়ামেনী মার্কেট। অমল ভাবল, পার্কে গিয়ে দেখা করবে কামালের সঙ্গে। তবে চাকরি পাওয়ার কথাটা বলা যাবে না। বললেই এক শ’টা প্রশ্ন করবে এই ছেলে। জব সিক্রেসি আউট হয়ে যেতে পারে। প্রথম দিনই সব কিছু ভজকট করে ফেলা হবে চূড়ান্ত নির্বুদ্ধিতা।

পার্কে এসে সেদিনের সেই বেঞ্চে বসল অমল। চারদিকে তাকিয়ে কামালকে খুঁজল। কিন্তু কোথাও দেখতে পেল না তাকে। এখন কী করবে এই কথা যখন ভাবছে, ঠিক তখনই সালওয়ার-কামিজ পরা বিশ-একুশ বছরের একটা মেয়ে এসে বসল বেঞ্চটার অন্য মাথায়। বেণি করা চুলে ফিতে বাঁধা। পায়ে চামড়ার স্যাণ্ডেল। মুখে হালকা মেকাপ, ঠোঁটে লিপস্টিক। নাকে সাদা পাথর বসানো ছোট্ট নাক-ফুল, কানে নীল পাথরের ছোট ছোট দুল। খাটো হাতা ব্লাউজের বাইরে চমৎকার গোল বাহু। পুরু আঙুলের মাথায় মাংসে ডোবা চিকন চিকন নখ। কামিজের সাইড-কাট যথেষ্ট লম্বা হওয়ায় ঊরু সহ মাজার গড়ন বোঝা যাচ্ছে। প্রশ্নাতীত উরুর পুরুত্ব আর নিতম্বের গুরুত্ব। অমলের সঙ্গে চোখাচোখি হলো মেয়েটার। চোখে কোনও লাজুক ভাব নেই। তীরের মত সোজা দৃষ্টিতে সীমাহীন আলোর ঝলকানি। এ বারবণিতা। যৌবনে কুক্কুরীও সুন্দর। গায়ের রঙ একটু মাজা-মাজা হলেও স্বাস্থ্য ভাল মেয়েটার। বাজারে-মেয়েছেলেদের যেহেতু যৌনতাই পুঁজি, সে কারণে এদের দেখলেই হৃদয় ঝমঝম করে পুরুষের। মনের জানালা ধরে উঁকি-ঝুঁকি মারা শুরু করে হিয়ার আনাচে-কানাচে যত সুকৃত-বিকৃত কামনা-বাসনা। এদের কাজ নির্ভেজাল আনন্দ দেয়া। দেহ নিয়ে যা খুশি করতে চাও করো। ফেলো কড়ি, মাখো তেল। তারপর রাস্তা দেখো। কোনও দায়-দায়িত্ব নেই। নো স্ট্রিং টায়েড। মানুষের আবেগগুলোর ভেতর যৌনাবেগ সব থেকে বেশি শক্তিশালী। এর কাছে পুরুষ অসহায়। অথচ এই আবেগ মেটাতে গেলে কাঁধে নিতে হয় বড় ধরনের দায়-দায়িত্ব, তার কাছে যেটা ভীষণ অপছন্দের। ওদিকে দায়-দায়িত্ব নিলেই যে সব কামনা-বাসনা মিটে যাবে এমনটি ভাবার কোনও কারণ নেই। লাইসেন্সড্ কামনার বাইরেও আছে অসংখ্য আনলাইসেন্সড্ বাসনা। এজন্যেই বারবণিতার অভ্যুদয় মানব-সমাজের ঊষালগ্নে, পরিবার যখন কেবল গড়ে উঠি-উঠি করছে। উদগ্র কামনা- বাসনা যতদিন আছে, ততদিন আছে বারবণিতাও। প্রকৃতি চায় যেভাবেই হোক টিকে থাক মেয়েরা। পেশা নিয়ে বাছ- বিচার করার সময় কোথায়! অদ্ভুত এক আত্মতৃপ্তিও আছে বারবণিতাদের। যত বড়ে বড়ে খাঁ-ই হোক, কামার্ত পুরুষ আসলে ক্রীতদাসেরও অধম। ক্ষণিকের জন্যে হলেও মেয়েরাই প্রভু। একবার যদি মায়া লাগাতে পারে, তা হলে এই প্রভুত্ব হয় চিরকালের। এই দুর্বলতা ঢাকতেই পুরুষের যত হম্বিতম্বি।

সাত-সতেরো ভাবতে ভাবতে অমল সিদ্ধান্ত নিল, কথা বলবে মেয়েটার সঙ্গে। বারবণিতার সঙ্গে বাক্যালাপ করাও এক বিরল অভিজ্ঞতা। এ সুযোগ প্রতিদিন ঘটে না। খুকুর- খুকুর কেশে গলা-টলা পরিষ্কার করল অমল। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা অনুভব করছে। পুরুষ ঘেঁটে ঘেঁটে মেয়েটাও ঝানু হয়ে গেছে। সে-ও কাশি শুনে বুঝতে পারল, চারের আশপাশে ঘোরাঘুরি শুরু করেছে মাছ। টোপ খেলেও খেতে পারে। মুচকি হেসে অমলের দিকে তাকাল মেয়েটা। তবে কথা কীভাবে শুরু করবে, এইটে বুঝতে পারছে না অমল। এ লাইনে তার কোনও অভিজ্ঞতা নেই। মুচকি হাসির জবাবে অমলও হালকা হাসি হাসল। কিছু একটা বলতে হবে। কিন্তু কী বলবে! ‘এই মেয়ে, তোমার নাম কী?’ উঁহুঁ, এভাবে হবে না। ওটা সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশের জন্যে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণত যা বলা হয় তা হলো: ‘এই, তোর রেট কত?’ অথবা শুধুই ‘রেট কত?’ বাক্যের দৈর্ঘ্য নির্ভর করে বারবণিতার স্ট্যাণ্ডার্ডের ওপর। অমলের চোখে পড়ল সামনে দিয়ে এক চাঅলা যাচ্ছে। বাতচিত শুরু করার এই এক মওকা। চাঅলাকে ডেকে দু’কাপ চা দিতে বলল অমল। এরপর তাকাল মেয়েটার দিকে।

এইবার কথা বলল মেয়েটা, ‘আমার চা লাগবে না। আপনিই খান।’

‘আরে, খাও না এক কাপ।’

‘আচ্ছা, দেন।’

‘নাম কী তোমার?’

‘আমার নাম রেখা।’

অবশ্যই আসল নাম না। বারবণিতাদের প্রায় সবার নামই চিত্রনায়িকাদের নামে হয়। এ-ও একধরনের ফ্যান্টাসি। পুরুষদের সঙ্গিনী খেঁদি-কুঁচি না হয়ে জুহি-মাধুরী- রাভিনা-ঐশ্বরিয়া হলে সেটাই সবিশেষ গ্রহণযোগ্য। স্বপ্নেই যখন খাব, তখন বুন্দিয়া-হালুয়া বাদ দিয়ে চমচমই খাই-মনে মনে ভাবল অমল। তবে মুখে বলল, ‘বাহ্, সুন্দর নাম। এই নামের বিশেষত্ব কী, জানো?’

‘কী?’

‘এই নাম থেকে হিন্দু-মুসলমান বোঝা যায় না।’

‘হিন্দু-মুসলমান নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছেন কেন? আপনি তো হুজুর না। আপনি আসলে হিন্দু। ঠিক না?’

থতমত খেয়ে গেল অমল। কথার পিঠে কথা বলতে মেয়েরা ওস্তাদ, একথা ঠিক। তবে এ মেয়ের বেশ বুদ্ধি আছে বলেই মনে হলো তার কাছে। বলল, ‘বাদ দাও এসব। তুমি থাকো কোথায়?’

‘কোথাও না।’

‘কোথাও না মানে কী?’

কোথাও না মানে, কোথাও না। আমি থাকি রাস্তায়।’

‘কোন্ রাস্তায়?’

‘পিচ ঢালা রাস্তায়। হি-হি-হি।’

‘হাসছ কেন তুমি? রাস্তায় থাকা খুব আনন্দের বিষয় না।’

‘আপনি থাকেন কোথায়? হি-হি-হি।’

‘আমি থাকি কোথায় মানে?’

‘আপনি থাকেন কোথায় মানে, আপনি কোথায় থাকেন। খালি মানে জানতে চান কেন? বাংলা ভাষা বোঝেন না?’

অমলকে রেগে যেতে দেখে গা দুলিয়ে হাসতে লাগল মেয়েটা। হাসির দমকে কাপ থেকে চা ছলকে পড়ে গেল। মুখের কাছে বাঁ হাত এনে মুখ ঢাকার চেষ্টা করল সে। তারপরেও কেঁপে কেঁপে হাসতে লাগল। কিছুক্ষণ হেসে চোখের জলটল মুছে চুমুক দিল চায়ে। বলল, ‘কিছু মনে করবেন না। আপনি ভাল মানুষ। একটু মজা করলাম। এর বেশি কিছু না।’

অমল জানে বাজারে-মেয়েগুলোর পুরুষদের ওপর কোনও শ্রদ্ধাবোধ থাকে না। এরা পুরুষদের চোখে শুধু তাল তাল কামনাই দেখতে পায়। পুরুষ মানেই এদের কাছে কাপড় তোলা, মর্দিত হওয়া আর তাদের জঘন্য অশ্লীল কথাবার্তা কান খুলে শোনা। পুরুষেরা বাস্তবে এদের সঙ্গে মিলিত হলেও তাদের কল্পনায় থাকে এদের মায়েরা। মর্দিত হতে হতে এরা শুনতে পায়: চোপ, শালী, তোর মায়েরে… তাদের মাদের সঙ্গে এহেন কাল্পনিক আচরণের সরাসরি বহিঃপ্রকাশে অবশ্য ঝানু বারবণিতারা মোটেও চুপ করে থাকে না। কিংবা কুপিত হয়ে পুরুষদের বিচ্যুতও করে না। উল্টো তারা বিদ্ধ করার কাজে আরও উৎসাহ দেয়। উড়াও কল্পনার ফানুস, ঝরাও কামনা! যেমন বহুকাল আগে ঠগিদের সর্দার কোনও নিরীহ পথিককে ভর পেট খাইয়ে-দাইয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলার আগে তার চেলাদের চিৎকার করে বলত: ঝরকা উঠাও, উঠাও ঝরকা। ওটাই মৃত্যু সঙ্কেত।

অমলকে চুপ করে থাকতে দেখে মেয়েটি বলল, ‘ভুল হয়ে গেছে। মাফ করে দেন, ভাই। আমরা পথের মানুষ। আমাদের কথা ধরতে নেই।’

‘আরে না, কী যে বলো! রাগ করব কেন? আমরা সবাই তো পথের মানুষ। জীবনটাই একটা যাত্রা। আমরা সবাই যাত্রী একই তরণীর। এখান থেকে ওখানে ছোটাছুটি। একদিন সময় সমাপ্ত। বেজে গেল বিদায় ঘণ্টা। শুরু হলো ওপারের যাত্রা। …তারপর বলো, দুপুরে কী খেয়েছ?’

‘দুপুরে ঝালমুড়ি খেয়েছি। আপনি কী খেয়েছেন?’

‘আমার কথা বাদ দাও। এসো, তার চেয়ে বাদাম কিনে খাই। এই, বাদামঅলা, দু’ শ’ বাদাম দাও তো। এক শত এক শ’। নুন ঝাল বেশি করে দাও। দুটো কাগজে আলাদা করে দিবা।’

মুটমুট করে বাদামের খোসা ভেঙে হাতের তালুতে ঘষে লাল ছিলকা ছাড়িয়ে তারপর ফুঁ দিয়ে ছিলকা উড়িয়ে কুটকুট করে বাদাম খেতে লাগল মেয়েটা। হুমায়ূন আহমেদের হিমুর গল্পে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বারবণিতারা যেভাবে বাদাম খায়, ঠিক সেভাবে। তরুণী মেয়েদের বাদাম খাওয়া দেখতে চমৎকার ভাবল অমল। কিন্তু এরপর কী? গল্পের নায়কেরা বারবণিতাদের সঙ্গে শুধু কথা বলে, অন্য কিছু করে না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মেয়েগুলোর দুঃখ-কষ্টে হিমু উহ্-আহ্ করলেও ওদের কাছ থেকে নিজেকে শত হাত দূরে রেখেছে। দেবদাস চন্দ্রমুখীর গান শুনে, নাচ দেখে আর বোতল-বোতল মদ খেয়ে লিভার পচানো ছাড়া এক্সট্রা কোনও কিছু করেনি। বাজারে-মেয়েছেলেদের দারুণভাবে পছন্দ করলেও তাদের আসল সার্ভিস এরা খুব কেয়ারফুলি এড়িয়ে গেছে। সার্ভিস গ্রহণ করলে পাঠকদের কাছে পতন অনিবার্য হয়ে উঠত। সব সমবেদনা উবে যেত হাডে অক্টেনের মত। পাঠকেরা নিজেরা যা পারে না, নায়ককে তা অবশ্যই পারতে হবে। শুরুর দিকে নায়ক চরিত্রহীন হলেও পরের দিকে তাকে হতে হবে সাধু পুরুষ। একই রকম থাকা চলবে না। চললে সিনেমা ফ্লপ হবে, বই মার খাবে। আর নায়িকারা বাইজী হলেও তারা শুধু নাচ-গান পরিবেশন করবে, ‘আসল সার্ভিস’ অবশ্যই না। যদিও প্র্যাকটিক্যালি সেটা অসম্ভব। নাচতে নেমে ঘোমটা দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। দর্শক-পাঠকও যে সেটা বোঝে না, তা নয়। তবুও তারা ‘নাচ-গানের বাইরে কিছুই হয়নি’-তে বিশ্বাস করতে চায়। যেটাকে বলে উইলিং সাসপেনশন অভ ডিসবিলিফ। এসব ভাবতে ভাবতে অমল মেয়েটাকে বলল, ‘চলো যাই। হোটেলে গিয়ে ভাত খাই বরং।’

‘হোটেলে নিয়ে যদি ভাতই খাওয়াবেন, তা হলে বাদাম খাইয়ে খিদেটা নষ্ট করলেন কেন? আচ্ছা, ধরেন খাওয়ালেন। তারপর কী করবেন?’

‘জানি না কী করব। ভাত খেতে চাইলে চলো।’

‘আপনি পারবেন না। বাদ দেন এসব দরদ-ফরদ। আপনি আসলে ভাবছেন আরও কিছুটা সময় পার করলে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। ওভাবে হয় না। তার চেয়ে বরং বাসায় যান। রেস্ট নেন। ব্যাটা-ঘাঁটা আমাদের ব্যবসা। কে কী পারবে এইটা ঠিকই বুঝি।’

অর্ধেক বাদাম বেঞ্চের ওপর ফেলে রেখেই উঠে পড়ল মেয়েটা। একবারও পেছন দিকে না তাকিয়ে চলে গেল পার্কের বাইরে। বিকেলের মরা আলোয় অমল তার চলে যাওয়া দেখল। কী বিষণ্ণ হাঁটার ভঙ্গি! এসব মেয়েদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। যতদিন দেহে রস-কষ আছে, ইনকাম আছে। এরপর অসুখ-বিসুখে পঙ্গু হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে করে খাও। তারপর ড্রেনের পাশে কাপড়েই পেশাব-পায়খানা করে চোখ উল্টে মরো। চলে যাও আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের জিম্মায়। তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়!

আট

পরদিন ঠিক সকাল দশটায় তার ‘অফিসে’ পৌঁছাল অমল। গুর্খা দারোয়ান সরাসরি তাকে নিয়ে গেল আগন্তুকের কাছে। লিভিং রুমে আগের মতই পুরনো বই খুলে বসে আছে সে। অমলের শুভেচ্ছা-গুডমর্নিং এসব গ্রহণ করে তাকে বসতে বলল আগন্তুক। ট্রলিতে করে কফির সরঞ্জাম সাজিয়ে এনে দুটো কাপে কফি পরিবেশন করল একজন উর্দিপরা খানসামা। আগন্তুক বলল, ‘কফি খান, অমল বাবু। কফি খেতে খেতে আপনার কাজ বুঝিয়ে দিই। আপনার কাজ বুঝিয়ে দেয়ার আগে ছোট্ট একটা ভূমিকা প্রয়োজন। ব্যাকগ্রাউণ্ড ইনফর্মেশন ছাড়া বিষয়টা পুরো বুঝতে পারবেন না। আমার নাম দিয়েই শুরু করি। আমার নাম মৃণাল কান্তি। আমার ঠাকুরদা কর্কট কান্তির রাজশাহী এলাকায় জমিদারি ছিল। ছোটখাট জমিদার। তবে সেরিকালচার অর্থাৎ রেশমের ব্যবসা করে অঢেল পয়সা বানিয়েছিলেন। পয়সা বানালেও দাদা ছিলেন সাত্ত্বিক ধরনের লোক। তাঁর জীবন-যাপন ছিল খুব সাধারণ। বাইজী নাচিয়ে কিংবা মদ খেয়ে জুয়া খেলে পয়সা উড়াননি কখনও। বাবাকে মানুষ করেছিলেন কড়া শাসনে। আমার বাবা কৃষ্ণ কান্তি ছিলেন ব্যারিস্টার। খুব নামকরা কেউ না। তবে আয়-ইনকাম খারাপ ছিল না। কোলকাতায় আমাদের বেশ কয়েকটা বাড়ি আর দোকান ছিল। এক খুড়ো দেখাশোনা করতেন। সেখান থেকে বড় অঙ্কের মাসোহারা আসত। জমিদারি বিলুপ্ত হলেও রাজশাহী শহরের প্রপার্টিও রেভেনিউও কম ছিল না। আমার নানার অবস্থাও ছিল বিরাট। আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। আরাম-আয়েশের কোনও ব্যত্যয় কখনও হয়নি। আমার বয়স যখন ছয় বছর তখন আমার মামা আমাকে একটা ইংলিশ রিট্রিভার কিনে দেন। কুকুর হিসেবে রিট্রিভার দারুণ ফ্রেগুলি। ইংরেজদের কুকুর, বুদ্ধির কথা আর কী বলব। শিকারী কুকুর হিসেবে এদের তুলনা নেই। ধবধবে সাদা রঙ, ইয়া মোটা লেজ, বড়-বড় ভাঙা কান মুখের দু’পাশে লটপট করছে। কুচকুচে কালো নাক আর চোখ। সারা গায়ে তুষারের মত নরম ঝুমকো পশম। ন’বছর বয়স পর্যন্ত কুকুরটা ছিল আমার ধ্যান-জ্ঞান। শুধু রাতে শোয়ার সময়ই ওটা আমার কাছ থেকে আলাদা হত। আমার জন্মের তিন বছর পর আমার মায়ের গর্ভপাত হয়। এরপর থেকে প্রায় সবসময় অসুস্থই থাকতেন মা। কুকুরটা ছিল আমার বন্ধু, খেলার সাথী-সব কিছু।

‘তখন আমাদের বাড়ি ছিল পুরান ঢাকায়। ন’বছর বয়সে অর্থাৎ ১৯৬৫ সালে শুরু হলো পাক-ভারত যুদ্ধ। আমাদের দিন কাটতে লাগল আতঙ্কের ভেতর। প্রহ্লাদ মানে আমার রিট্রিভার সারারাত জেগে বাড়ি পাহারা দিত। আসলে বাউণ্ডারি ওয়ালের ভেতর ঘোরাঘুরি করত। সেই সময়ে একদিন সকালে উঠে দেখি গাড়ি বারান্দার সিঁড়ির ওপর মরে পড়ে আছে প্রহ্লাদ। মুখ দিয়ে গাঁজলা-টাজলা বেরিয়ে একাকার। পাড়ার কেউ তাকে বিষ খাইয়েছিল। গাড়ি বারান্দা থেকে বাড়িতে ঢোকার মূল দরজায় আঁচড়ের দাগ। মারা যাওয়ার আগে প্রহ্লাদ হয়তো আমার কাছে যেতে চেয়েছিল। বাড়িতে বিহারী দারোয়ান ছিল। তারপরেও এই ঘটনা কীভাবে ঘটল বোঝা গেল না। আমার মাথা খারাপের মত হয়ে গেল। রাতদিন প্রহ্লাদের কথা মনে পড়ে। নাওয়া- খাওয়া ভুলে গাড়ি বারান্দার সিঁড়ির কাছে বসে থাকতে লাগলাম আমি। ছোট বেলা থেকেই আমার আঁকাআঁকির হাত ভাল। আমার কাজ হলো বসে বসে প্রহ্লাদের ছবি আঁকা। বাচ্চারা খুব দ্রুত শোক কাটিয়ে উঠতে পারে। প্রকৃতিই তাদের সেই শক্তি দিয়েছে। কিন্তু আমার ভেতর শোক কাটিয়ে ওঠার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না। ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়তে লাগলাম। শেষমেশ পড়ে গেলাম বিছানায়। শুধু মনে হত এই বুঝি প্রহ্লাদ ফিরে এল। ঘুমের ভেতর স্বপ্নে দেখতাম, ফিরে এসেছে প্রহ্লাদ। কিন্তু সেটা শুধু স্বপ্নই। বাস্তবে ফাঁকা বাড়ি। শূন্য বাড়ির আঙিনার একপাশে প্রহ্লাদের কাঠের ছোট্ট ঘরটা। প্রহ্লাদের ঘরের সামনে সবুজ ঘাসের ওপর জলহীন কাঠের বারকোশ। ঈশ্বরকে বলতাম, হে, ভগবান, ফিরিয়ে দিন আমার প্রহ্লাদকে। আপনি তো সব পারেন। কিন্তু প্রহ্লাদ আর এল না। আমার মানসিক অবস্থার উন্নতি হবে ভেবে বাড়ি বেচে দিলেন বাবা। উঠে এলেন ধানমণ্ডির এই বাড়িতে। কুষ্টিয়া থেকে নেপালি দারোয়ান আনলেন। কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলে তখন প্রচুর নেপালি দারোয়ান ছিল। মোহিনী বাবুই ব্রিটিশ আমলে নেপাল থেকে এই গুর্খা দারোয়ানদের এনেছিলেন। মোহিনী বাবুর ভাই কানু বাবুর সঙ্গে বাবার খুব খাতির ছিল। পাকিস্তান সরকার মোহিনী মিলকে তখন রাষ্ট্রীয়করণ করেছে। অনেকেরই চাকরি চলে যায় এ কারণে।

‘বাবা দুর্গের মত নিশ্ছিদ্র করলেন বাড়ির নিরাপত্তা। এখন যে দারোয়ান আছে, তাকে অবশ্য আমি নেপাল থেকেই এনেছি। আগের জন মারা গেছে। আমার মন ভাল করার জন্যে সুন্দর সুন্দর সব ছবিঅলা বই কিনে দিলেন বাবা। প্রথম দিকে পড়তে ভাল লাগত না। নেড়েচেড়ে রেখে দিতাম। তবে অবস্থার পরিবর্তন হলো। আস্তে আস্তে পৃষ্ঠা উল্টে ছবিগুলো দেখতে লাগলাম। প্রায় সবই রূপকথার বই। এর ভেতর আলিফ লায়লার গল্পের বইও ছিল। যা হোক, একদিন জাপানি রূপকথার বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছি, হঠাৎ করেই ‘হানা সাকা জিজি’ বলে একটা গল্প চোখে পড়ল। ‘শিরো’ নামের এক কুকুর, তার করুণ মৃত্যু আর প্রভুভক্তি নিয়ে লেখা অপূর্ব এক কাহিনি। জাপানি ভাষায় শিরো মানে বরফের মত সাদা। কুকুরটা তুষার-শুভ্র হওয়াতেই তার ওই নাম। কাহিনিটার ভেতর আবার এক- দুই লাইনের গানও আছে। দুর্দান্ত গানের কথা। অভিভূত হয়ে গেলাম গল্পটা পড়ে। এরপর জন্তু-জানোয়ার নিয়ে লেখা যত রূপকথা আছে পড়তে লাগলাম সেই সব। হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাণ্ডারসেনের টিণ্ডার বক্স গল্পের সেই সাহসী সৈনিক আর তিন ভয়ঙ্কর কুকুরের কাহিনি। জার্মানির রূপকথার ভেড়ার বিনিময়ে পাওয়া তিনটি কুকুর, যাদের নাম ছিল লবণ, মরিচ আর সরষে বাটা। গ্রিক মিথলজির

মৃতদের রাজ্যের গেট পাহারা দেয়া তিন মাথাঅলা অপরাজেয় কুকুর সারবারস। মোদ্দা কথায়, কুকুর নিয়ে লেখা কাহিনি যা আছে, প্রায় সবই পড়ে ফেললাম। এবং সেগুলো বিশ্বাসও করতে লাগলাম। সব শেষে পড়া শুরু করলাম আলিফ লায়লা। এর নাম হাজার এক আরব্য রজনী। কাহিনির পর কাহিনি। কৃষ্ণ জাদু বা ব্ল্যাক আর্টের ছড়াছড়ি। দেদারসে মানুষ, থেকে কুকুরে আর কুকুর থেকে মানুষে রূপান্তর হচ্ছে। তারপর সেই সব কুকুরদের নিয়ে অদ্ভুত কাহিনি। ডাইনী আমিনার খপ্পরে পড়ে সিদি নোমানের কুকুর হওয়া আর তার পরের কর্মকাণ্ড পড়ে অভিভূত হয়ে গেলাম। বাগদাদের তিন রমণী আর কুলির কাহিনি আর দ্বিতীয় শেখের গল্পের কথা না-ই বা বললাম।

‘খুব শিগগিরই বুঝতে পারলাম, বই পড়ার আগ্রহ কুকুর দিয়ে শুরু হলেও এখন সেটা আর কুকুরে সীমাবদ্ধ নেই। এখন আমার সব আগ্রহ জাদুমন্ত্রে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল, জাদুমন্ত্র দিয়ে দিনকে রাত, রাতকে দিন করা সম্ভব। বয়স কম, অনভিজ্ঞ কচি মন। যা পড়তাম, তা-ই বিশ্বাস হত। ব্যাপারটা অনেকখানি স্যান্টা ক্লজে বিশ্বাস করার মত। আলিফ লায়লার আধিভৌতিক জগৎ আমাকে বলতে গেলে মেসমেরাইজ করে ফেলল। আমি বিশ্বাস করতে শুরু করলাম, জীবিত মানুষকে পাথরের রূপ দেয়া সম্ভব কিংবা পাথরের মূর্তিতেও প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। যেমন আলিফ লায়লার জেলে ও দৈত্যের কাহিনির পাথর- রাজকুমার। মনে হলো আমার দরকার শুধু সঠিক জাদুমন্ত্রের। কিন্তু জাদুমন্ত্রের শিক্ষা শহরের বিদ্যানিকেতনগুলোতে দেয়া হয় না। আসলে কোনও বিদ্যানিকেতনেই দেয়া হয় না। এ হলো গোপন বিদ্যা। এর গুহ্যতত্ত্ব শুধুমাত্র হাতে গোনা কয়েকজনের ভেতরই সীমাবদ্ধ থাকে। এ বিদ্যা গুরু ধরে শিখতে হয়। সেই গুরু খুঁজে পাওয়াও ভীষণ কঠিন। সব জাদুবিদ্যার মূলেই কাজ করে ঐশ্বরিক শক্তি। তবে এই শক্তি ঐশ্বরিক হলেও ওটা আসে প্রিন্স অভ ডার্কনেসের কাছ থেকে। ঈশ্বর এর দায়-দায়িত্ব নেন না। আলিফ লায়লাতে যেসব জাদুকরীদের কথা বলা হয়েছে, তাদের অনেকেই মহান আল্লাহকে স্মরণ করেই ব্ল্যাক আর্ট প্র্যাকটিস করে। কারণ সব শক্তির আধার ঈশ্বর স্বয়ং। অনেক ধর্মেই উল্লেখ আছে, জাদুমন্ত্র এসেছে দেবদূত কিংবা ফেরেশতাদের কাছ থেকে। মন্ত্রবলে অতিলৌকিক কর্মকাণ্ড দুনিয়ার বুকে তারাই প্রথম শুরু করে। হারুৎ- মারুতের কথা কে না জানে। সূরা আল বাকারাতে বলা হয়েছে, হারুৎ-মারুৎ দুনিয়ায় যেসব লোক জাদু শিখতে আগ্রহী ছিল, তাদের হাতেকলমে জাদু শিক্ষা দিত, এইটে প্রচার করার জন্যে যে, এসব শিখে ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। এই দুই ফেরেশতাকে পাঠানো হয়েছিল হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর আমলে ব্যাবিলন নগরীতে।

‘ব্যাবিলনে তখন নমরুদের রাজত্ব চলছে। টাওয়ার অভ ব্যাবেল তৈরির জন্যে রাতদিন খেটে মরছে লক্ষাধিক শ্রমিক। একই সঙ্গে এনলিল, ইশথার, মারডক আর শামাশের পুজোয় চারদিকে ধুন্ধুমার। এটেমেনানকি যিগুরাটে চলছে সকাল-সন্ধ্যা এন্তার নরবলি-পশুবলি। নমরুদের রাজত্বে যে যত বড় জাদুকর, সে তত বেশি ক্ষমতাশালী। কামিনী-কাঞ্চন তার দোরগোড়ায় গড়াগড়ি খাচ্ছে চব্বিশ ঘণ্টা। হাজার হাজার টাকমাথা পুরোহিত অনন্ত নক্ষত্রবীথি ছানাছানি করে বের করার চেষ্টা করছে জাদুমন্ত্রের সঠিক তিথি। আসল খোদার কথা কারও মনেও নেই। এসব দেখে ফেরেশতারা খোদার কাছে অনুযোগ করল। তারা খোদাকে বলল, এই মানব জাতি নেমকহারাম। এরা মহান করুণাময়ের ক্ষমা পাওয়ার অযোগ্য। এদেরকে অবিলম্বে শেষ করে দেয়া হোক। খোদা এরই ভেতর মহা প্লাবন পাঠিয়ে নূহ নবীর কওম সহ পৃথিবীর তাবৎ মানুষজন আর পশুপাখি মেরে দুনিয়াকে গড়ের মাঠ বানিয়েছেন। চাইলেই গজব নাজিল করা সম্ভব না। তা করলে ভাঙা-গড়ার খেলা খেলতেই সময় শেষ। মানবসৃষ্টির উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। খোদা বললেন, মানুষের ভেতর লোভ, মোহ, কাম এইসব আছে। তোমাদের ভেতর নেই। থাকলে তোমরাও অমনটাই করতে। ফেরেশতারা এই কথা শুনে তাদের ভেতর সব থেকে ভাল দু’জনকে বেছে বের করল। হারুৎ আর মারুৎ। খোদার গুণগান তাদের থেকে ভাল কেউ করতে পারেনি। খোদাকে ফেরেশতারা বলল, মানুষের দোষ-ত্রুটি দিয়ে এদেরকে দুনিয়ায় পাঠান। পরীক্ষা হয়ে যাক, মানুষ ভাল না ফেরেশতা বেশি ভাল। যা হোক, খোদা এই দু’জনকে লোভ, মোহ, কামনা, বাসনা এসব দিয়ে দুনিয়ায় পাঠালেন। পই-পই করে বলে দিলেন চারটি জিনিস কিছুতেই করা যাবে না। শিরক, ব্যভিচার, মদ্যপান আর নরহত্যা।

‘হারুৎ-মারুৎকে টাওয়ার অভ ব্যাবেলের কাছে নামিয়ে দেয়া হলো। নেমেই তাদের দেখা হলো জহুরা নামে এক যুবতীর সঙ্গে। এই রমণী দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি তার গায়ের সুগন্ধ। স্বচ্ছ মসলিনের ভেতর থেকে রূপ যেন ফেটে বেরুচ্ছে। দৃষ্টিতে বিদ্যুতের চমক, হাসিতে হীরের দ্যুতি। গায়ের চামড়া ঘিয়ে রঙের মখমল। ঠোঁট জর্ডানি কমলার কোয়া। আলেপ্পোর ডালিম অবতল গাল। পারলে তখুনি যুবতীর রাঙা পায়ে লুটিয়ে পড়ে হারুৎ-মারুৎ। জহুরাকে প্রেম নিবেদন করল তারা। জহুরা দেখল চারে মাছ ভিড়েছে। খেলিয়ে তুলতে হবে। সে বলল, আমাকে পেতে চাইলে আমার আল্লাহকে কুর্নিশ করতে হবে। তার আল্লাহ পাষণ্ড দেবতা মারডক। তবে কুর্নিশ করার আগে মদ খাওয়া জরুরি। যেমন, নামাজ আদায়ের আগে ওজু করা। ওদিকে এসব ব্যাপারে খোদার কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। হারুৎ- মারুৎ ভাবল খোদার বিষয়টা পরে দেখা যাবে। জহুরাকে না পেলে বেঁচে থাকাই সম্ভব না। মদ-টদ খেয়ে মারডককে কুর্নিশ করল হারুৎ-মারু। জহুরা বলল, বেশ, তোমাদের ইচ্ছে পূর্ণ হোক তা হলে। তবে এ মন্দির চত্বরে তো ওসব করা যায় না। শহরের এক কোণে একটা নির্জন বাগান আছে, চলো, সেখানে গিয়ে বাগানের কাছাকাছি যখন তারা পৌঁচেছে, ঠিক তখনহ এক বুড়ো হাবড়া এসে হাজির। ব্যাবিলনের রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে করে বুড়ো। ফেরেশতা দু’জনের চোখে-মুখে তালতাল কামনা, অস্থির ভাব, জহুরার চটুল হাসি-এইসব দেখে যা বোঝার বুঝে নিল ভিখিরি। বলল, নগর কোটালের কাছে গিয়ে নালিশ করবে, বলে দেবে সব্বাইকে। ব্যাবিলনের পথে-পথে ব্যভিচার! দেশটার হলো কী!

‘জহুরা তখন আরেক শর্ত দিল।

‘কী?

‘না-এই বুড়ো ভাম শহরে ফেরার আগেই তার মুখ বন্ধ করতে হবে। সব কিছু জানাজানি হলে মান-সম্মান বলে আর থাকবে না কিছুই। রূপের কারণে ব্যাবিলনে জহুরার এন্তার অনুরাগী।

‘হারুৎ-মারুতের মনে পড়ল নরহত্যা করা মানা। তবে একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে ওটা না করলেও তো চলছে না! দুটো শর্ত যখন ভেঙেই ফেলেছে, আরও একটা ভাঙলেই বা কী? বুড়োকে গলা টিপে মেরে ফেলল তারা। জহুরাকে বলল, প্রিয়ে, নিজেকে সঁপে দাও এখন।

‘কিন্তু এত সহজে ভোলার বান্দি তো জহুরা না। সাত ঘাটের জল সে খেয়ে শেষ করেছে বহু আগেই। বাগানের ভেতর ঢুকে কাপড়-চোপড় খুলে জহুরাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় হারুৎ-মারুৎ যখন দাঁত কেলিয়ে হাসছে, তখন জহুরা বলল, শোনো, বন্ধুরা, এত কিছুই যখন করলে, তখন শেষ আরেকটি কাজ আমার জন্যে করো।

‘কী কাজ? না-খোদা তোমাদের প্রতিদিন সন্ধে বেলা সাত আসমানে উঠে যাওয়ার যে গোপন বিদ্যেটা শিখিয়ে দিয়েছেন, সেইটে আমাকে বলে দাও।

‘এই বিদ্যা পৃথিবীর কাউকে শেখানো মানা। হারুৎ-মারুৎ তখন কামনার আগুনে পুড়ে ঝামা ইঁট। তারা ভাবল, এই যুবতী যা চায়, দিয়ে দিই। যেভাবেই হোক একে বিছানায় তুলতে না পারলে আর চলছে না। যাহা বায়ান্ন তাহা তেপান্ন। সাত আসমানে ওঠার গুহ্য বিদ্যা জহুরাকে শিখিয়ে দিল ফেরেশতা দু’জন।

‘বিদ্যা শেখা মাত্র জহুরা উঠে গেল আকাশে। খোদা তাকে শুক্র গ্রহে পরিণত করলেন। ফেরেশতা দু’জন রয়ে গেল ব্যাবিলনের সেই আগাছা ভর্তি রোঁয়া ওঠা বাগানেই। হারুৎ-মারুতের বিচার করলেন খোদা। তাদের সামনে দুটো অপশন রাখলেন। এক, দুনিয়ায় যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন সব রকমের সুখ ভোগ করতে পারবে তারা। তবে মৃত্যুর পর অনন্ত নরকবাস হবে। আর যদি দুনিয়ায় শাস্তি ভোগ করে, তা হলে পরকালে ক্ষমা করে দেয়া হবে তাদের।

‘প্রথমে তারা দুনিয়ার সব সুখ ভোগ করতে চেয়েছিল। পরে দেখবে আখেরাতে কী হয়। তবে এরপর ভেবেচিন্তে মত পাল্টে দুনিয়ায় দেয়া শাস্তি মেনে নেয়। বিচারের পর তারা মানুষকে নিষ্ফল জাদুবিদ্যা শেখাতে লাগল। এভাবে পেরিয়ে গেল কয়েক বছর। এরপর তাদেরকে মাথা নিচে পা ওপরে করে ঝুলিয়ে রাখা হয় প্রথমে টাওয়ার অভ ব্যাবেলের দেয়ালে, পরে টাওয়ার ভেঙে গেলে আসমানে। শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত ওভাবেই ত্রিশঙ্কু হয়ে থাকবে তারা।

‘তবে এটা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক জাদুবিদ্যা চর্চার প্রাথমিক পর্যায়। জাদু অনুশীলনের স্বর্ণযুগ ধরা হয় সোলেমান পয়গম্বরের আমলকে। সোলেমান পয়গম্বরের একটা অতিলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন আংটি ছিল। ওই আংটিতে খোদাই করা ছিল খোদার খুব গোপন এবং পবিত্র একটি নাম। ওটাই ছিল সোলেমান পয়গম্বরের সকল ক্ষমতার উৎস। হামামে গেলে কিংবা রমণী সম্ভোগের সময় আংটিটা হাত থেকে খুলে রাখতেন তিনি। একদিন হামামে যাওয়ার সময় আংটি খুলে চাকরানি আমিনার হাতে দিলেন। শয়তানের অনেক চেলার ভেতর একজনের নাম সেখার। এই সেখারকে দিয়ে সোলেমান নবী একবার একটা মূর্তি বানিয়ে নিয়েছিলেন। মূর্তিটা ছিল সিডনের এক প্রয়াত রাজার হুবহু প্রতিকৃতি। সোলেমান নবী সিডন আক্রমণ করে দখল করার পর সিডনের রাজাকে মেরে তার মেয়ে গেরাদেহ্-কে রক্ষিতা হিসেবে রেখে দেন। বাইবেলের ভাষ্যানুযায়ী এই পয়গম্বরের ছিল সাত শ’ স্ত্রী আর তিন শ’ রক্ষিতা। এইসব স্ত্রী আর রক্ষিতার অনেকেই যে যার বাপ- দাদার দেব-দেবীর পুজো করত। পুজো যাতে ঠিক মত হয়, সেজন্যে সোলেমান পয়গম্বর রাজপ্রাসাদ ঘিরে অনেকগুলো মন্দিরও বানিয়ে দিয়েছিলেন, যদিও খোদার কাছে শির্ক সবচেয়ে বড় পাপ। পই-পই করে নিষেধ করা হয়েছে মূর্তিপুজো না করার জন্যে।

‘যা হোক, এই গেরাদেহ্ ছিল পয়গম্বরের বিশেষ প্রিয় পাত্রী। তিনি দেখলেন গেরাদেহ্ রাতদিন তার বাবার জন্যে চোখের জল ফেলছে। মাঝে-মাঝে অবস্থা এমন হয় যে গেরাদের কান্নাকাটি আর থামতেই চায় না। মহাবিরক্ত হয়ে সেখার শয়তানকে ডেকে পয়গম্বর গেরাদে বাবার আদলে একটি মূর্তি বানাতে বললেন। মূর্তি তৈরি হলে পর ওটা স্থাপন করা হলো মন্দিরে। গেরাদেহ্ রাতদিন মূর্তিটার পুজো করতে লাগল। মূর্তির পায়ের কাছে দিতে লাগল নৈবেদ্য। ঘটনার এখানেই শেষ না। অ্যামোনাইটদের রাজকুমারীকেও বিয়ে করেছিলেন এই পয়গম্বর। তো সেই রাজকুমারী পুজো করত দেবতা মোলকের। মোলক ছিল প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপদেবতা। এই অপদেবতার মাথা ছিল ষাঁড়ের; কাঁধ, হাত আর বুক মানুষের। পেট ভাঁটার চুলোর মত। এর মূর্তি গড়া হত উন্নত ব্রোঞ্জ আর নিরেট লোহা দিয়ে। তাকে তুষ্ট করার জন্যে দেয়া হত শিশুবলি। মূর্তির ভাঁটার মত পেটের ভেতর আগুন জ্বেলে গরম করা হত ওটাকে। আগুনের তাপে মূর্তিটা লাল গনগনে হয়ে উঠলে ওটার সামনের দিকে বাড়িয়ে দেয়া ধাতব হাতের উল্টো করে ধরা তালুর ওপর শুইয়ে দেয়া হত জীবন্ত শিশুকে। দেখতে দেখতে শিশুর ছোট্ট নধর দেহ পুড়ে ঝামা হয়ে যেত। বাইবেলে উল্লেখ আছে, মোলককে অর্ঘ্য নিবেদন করার এমনি কোনও একটা দিনে পয়গম্বর নিজে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। যেহেতু তাঁর অগুনতি স্ত্রী আর রক্ষিতারা নানান মন্দিরে ভিন্ন ভিন্ন দেব-দেবীর পুজো করত, সেহেতু নিয়মিতই বিভিন্ন মন্দিরে তাঁকে দাওয়াত করা হত। এসব কর্মকাণ্ড ছাড়াও সোলেমান পয়গম্বরের নির্দেশে তাঁর ছেলে জেরোবোমকে হত্যা করা হয়েছিল। সোলেমানকে মুসলমানরা পয়গম্বর মনে করলেও ইহুদি, খ্রিস্টানরা করেন না। তাঁদের মতে সে সময় পয়গম্বর ছিলেন এহিয়া বা ইয়াহিয়া। এই ইয়াহিয়ার সঙ্গে জেরোবোমের খাতির ছিল। এসব নানা কারণে খোদা সোলেমান পয়গম্বরের ওপর রুষ্ট হলেন।

‘আগের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। পয়গম্বর হামামে গেলে এই সেখার পয়গম্বরের রূপ ধরে আমিনার কাছে গিয়ে আংটিটা নিয়ে নেয়। আমিনা বুঝতেই পারেনি আসল সোলেমান পয়গম্বর তখনও বাথরুমে। পয়গম্বর হামাম থেকে ফিরে আমিনার কাছে তাঁর আংটি চাইলে আমিনা আকাশ থেকে পড়ল। সে তো আংটিটা পয়গম্বরকে আগেই দিয়ে ফেলেছে! সোলেমান নবী বুঝে নিলেন, খোদা তাঁর ওপর নাখোশ। রাজপ্রাসাদে তাঁর আর জায়গা নেই। এরই ভেতর পয়গম্বরের রূপও বদলে গেল। চল্লিশ দিন ধরে বন- বাদাড়ে ঘুরতে হয় তাঁকে। সেখার সেই সময় জেরুসালেমের যেসব লোক জাদুবিদ্যা শিখতে আগ্রহী, তাদের সবাইকে ডেকে বলল, সোলেমান পয়গম্বরের সিংহাসনের নিচে লুকানো একটা গহ্বর খুঁড়ে বার করতে। জাদুবিদ্যা সংক্রান্ত যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ, তার সবই লিখিত আকারে ওখানে রাখা ছিল। ওই লেখাগুলো ছাড়াও অতীন্দ্রিয় ক্ষমতাসম্পন্ন আংটির মাধ্যমে খোদা ভবিষ্যতে কী ঘটবে সে বিষয়ে যেসব নির্দেশনা ফেরেশতাদের দিতেন, সেগুলোও সেখার জেনে ফেলতে লাগল। গোপনীয় সব তন্ত্র-মন্ত্রও নতুন করে বিশদভাবে লেখা হতে লাগল। পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে চল্লিশ দিন পর সোলেমান পয়গম্বর যখন নিজ বেশে প্রাসাদে ফিরলেন, তখন চারদিকে কালো-সাদা সব রকম জাদুর ধুন্ধুমার চলছে। এ যেন ওড়ে খই গোবিন্দায় নমঃ। খোদার দয়ায় সোলেমান পয়গম্বর তাঁর আংটি ফেরত পেলেন এবং কঠোর হাতে গোপন-প্রকাশ্য সব জাদু নিষিদ্ধ করলেন। বিধান দিলেন জাদুর চর্চা যারা করবে, তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেললেন এ সংক্রান্ত সব পুঁথি- পত্র যেখানে যা ছিল। এরপর তাঁর নির্দেশে আবারও নতুন করে জাদুমন্ত্রের বই লেখা শুরু হলো। আবার এই যন্ত্রণা নতুন করে কেন করতে গেলেন, সেইটে পয়গম্বরই ভাল বলতে পারবেন। যা হোক, সব কিছু লেখা হলে, তাঁর নির্দেশে লোহার একটা বাক্সে বইগুলো ভরে ফের তাঁর সিংহাসনের নিচে গোপন এক খোঁদলের ভেতর রাখা হয়। ধরা হয় তাঁর মৃত্যুর পর যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়, সেই সময় কালো জাদুর চর্চাকারীরা বইগুলো আবারও খোঁদল থেকে বের করে নেয়।

‘কালো জাদু-চর্চার এই হলো শুরু। এরপর আর সেটা থেমে থাকেনি। তবে আগে যা ছিল প্রকাশ্য, এখন তা হয়ে গেল গোপনীয়। পুরনো সভ্যতা যেসব দেশে ছিল, সেগুলোর প্রায় সব জায়গাতেই হারুৎ-মারুতের উল্লেখ আছে। প্রাচীন আর্মেনিয়ায় হরোত-মরোত নামে দুই সহযোগী দেবতা ছিল। পারস্যেও এদের পুজো করা হত। এদের নাম ছিল হরভাত আর আমেরতাত। বহুকাল আগে ফেরাউনের সাম্রাজ্যে প্রধান দুই জাদুকর ছিল জ্যানেস ও জ্যাম্ব্রেস। ধারণা করা হয় মূসা নবীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব বেধেছিল এদেরই। হারুৎ-মারুই এই জ্যানেস এবং জ্যাম্ব্রেস।’

এতক্ষণ চুপচাপ মৃণাল বাবুর লেকচার শুনে যাচ্ছিল অমল। ভেতরে ভেতরে বিরক্ত। বাবু কিছুটা পজ দিতেই জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার জাদু শেখার কী হলো সেইটে তো বললেন না।

‘সে প্রসঙ্গে আসছি। কুকুরের ছবি আঁকতে গিয়ে দেখলাম আমার আঁকার হাত ভাল। বাবা ড্রয়িং মাস্টার রেখে দিলেন। চারুকলার শেষ বর্ষের এক ছাত্র। নাম হিমেল ভট্টাচার্য। এই হিমেলের কাজ ছিল হিন্দু পুরাণে যেসব কাহিনি আছে, সেগুলোর চিত্রায়ণ করা। যেমন রেনেসান্স যুগে ইতালির নামকরা শিল্পীরা বাইবেলের বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছবি আঁকত। ছবি আঁকতে হলে যে ঘটনার ওপর ভিত্তি করে ওটা আঁকা হবে, সেটা খুব ভাল করে জানতে হয়, কিংবা পড়ে নিতে হয়। গুরু যা করে, শিষ্যকেও সেটাই কম-বেশি করতে হয়। হিন্দু পুরাণে বগ্নামুখী নামে এক দেবীর উল্লেখ আছে। এ এক বিচিত্র দেবী। যত ধরনের তন্ত্র-সাধনা আর কালো জাদু আছে, সেগুলোর প্রায় সবটাই এই দেবীর নিয়ন্ত্রণে। এর সব কিছু হলুদ রঙের, এমন কী যে পদ্মফুলের ওপর দেবী অধিষ্ঠিত, সেটাও। পদ্মফুল যে হ্রদে ভাসছে সেই জলও হলুদ। এই কারণে এর নাম হয়েছে পীতাম্বর মা। বগ্লামুখীর আসল নাম বল্লামুখী। সোজা বাংলায় ঘোড়ার লাগাম পরা মুখ। প্রাগৈতিহাসিক কালে শিবের পিঠ থেকে জন্মানোর পর হলুদ সরোবর থেকে উঠে আসে এই দেবী। একবার মহাজাগতিক এক কৃষ্ণ-ঝড়ের কবলে পড়ে ভগবানের সব সৃষ্টি লাটে উঠে যাচ্ছিল। তখন বগ্নামুখী এসে পৃথিবীকে চিরতরে লুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেছিল। আলো-আঁধার, শব্দ-নৈঃশব্দ, আধ্যাত্মিক-পৈশাচিক আর ভাল-মন্দের বর্ডার লাইনে এর অবস্থান। তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর ভেতর এর সঙ্গে মিল আছে শুধু মাত্র ছিন্ন-মস্তার। এই ছিন্ন-মস্তা দেবী কালীর দশ রূপের একটা। খুবই রহস্যময় এই ছিন্ন-মস্তা।

‘পুরাণের অনেক বর্ণনা-টর্ননা পড়ে হিমেল স্যর ছিন্ন- মস্তার ছবি এঁকেছিলেন। ওই ছবি একবার দেখলে যে-কারও সারাজীবন মনে থাকবে। ছবিটা ছিল এরকম: দেবীর বাঁ হাতে পিশাচের জিভ, ডান হাতে শাল কাঠের শক্ত লাঠি। ছিন্ন-মস্তা নিজেই নিজের মাথা কেটে এক হাতে ধরে রেখেছে। অন্য হাতে সাপের জিভের মত দুই-মাথাঅলা খঞ্জর। কাটা গলা থেকে তিনটি ধারায় ঝরনার মত রক্ত বেরিয়ে আসছে। দেবীর দুই পাশে দাঁড়ানো দুই পিশাচী। কাটা মাথা আর দুই পিশাচী পান করছে সেই রক্ত। দেবী দাঁড়িয়ে আছে সঙ্গমরত এক যুবক-যুবতীর ওপর। যৌনাঙ্গ- বিদ্ধাবস্থায় এলো চুলে পায়ে নূপুর পরা সম্পূর্ণ নগ্ন, ফর্সা ধবধবে স্বাস্থ্যবতী যুবতী ওপরে, মাথায় মুকুট আর হাতে বাজুবন্ধ পরা কালো কুচকুচে দিগম্বর যুবক নিচে। যুবক ধরেছে যুবতীর সুডৌল স্তন, যুবতী যুবকের গলা। এরা সঙ্গম করছে এক ত্রিভুজের ভেতর। ত্রিভুজটা আঁকা হয়েছে একটা বৃত্তের মধ্যে। বৃত্তটা আবার সাদা-গোলাপি ইয়া বড় একটা পদ্মফুলের ওপর আঁকা। পিশাচীদের একজন ধবধবে সাদা, অন্যজন ঘোর কৃষ্ণকায়। এদের মাথার উপর আকাশে উড়ছে দুটো-দুটো করে চারটে শকুনি। দেবী এবং পিশাচীদের গলায় নরমুণ্ডের মালা। পিশাচীদের এক হাতে সাদা মাটির গামলা, অন্য হাতে দুই মাথাঅলা খঞ্জর। দেবী বা পিশাচী পুরোপুরি নগ্ন। রক্তে মাখামাখি দেবীর বুক-পেট। সেই রক্ত ঊরুসন্ধি বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে টপটপ করে। পুরো ব্যাপারটিই ঘটছে কৃষ্ণপক্ষের মাঝরাতে একটা শ্মশান ঘাটে।

‘স্যরের আঁকা বগ্লামুখী আর ছিন্ন-মস্তার ছবি দেখার পর এদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ হলো। মনে হলো জাদুবিদ্যা শিখতে হলে এদের অনুগ্রহ অবশ্যই দরকার। এই দেবীদের ব্যাপারে যেখানে যা লেখা আছে, পড়তে শুরু করলাম। অর্থাৎ; কীভাবে এদের আরাধনা করা যায়, সেইটে জানা। বগ্লামুখীর নিজস্ব মন্দির নেই বললেই চলে। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকে আদ্যিকালের এক মন্দির কমপ্লেক্সে ছোট্ট একটা অংশে এই দেবীর অধিষ্ঠান। ছিন্ন-মস্তার মন্দিরেরও ওই একই অবস্থা। আসামের গোহাটির কামাখ্যা মন্দিরে ছিন্ন- মস্তার সাধনপীঠ। তখন পাকিস্তান আমল। বাবা আমার পীড়াপীড়িতে রাজি হলেও কর্ণাটক কিংবা আসামের গোহাটিতে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর আমার ইচ্ছে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় ভর্তি হওয়ার। বাবা রাজি হলেন না। তাঁর ইচ্ছে, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। সাবজেক্টের ব্যাপারে তাঁর কোনও আপত্তি নেই। আমি ভর্তি হলাম টুলেন ইউনিভার্সিটিতে। পরদাদার আমলের তৈরি দু’ শ’ বছরের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়। সাবজেক্ট, ডিসিপ্লিনের অভাব নেই। প্রথম সেমেস্টার ফাইন আর্টসে ক্লাস করলাম। দ্বিতীয় সেমেস্টারে উঠে ডিসিপ্লিন বদলে ভর্তি হলাম কম্পারেটিভ রিলিজিয়ান স্টাডিজে। এর পেছনে ছোট্ট একটা ঘটনা আছে। নিউ অর্লিন্সের আবহাওয়া বাংলাদেশের মতই। তবে ডিসেম্বরের শেষ দিকে মাঝে- মধ্যে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হয়। আমার ক্লাস শুরু হয়েছিল অগাস্টের শেষে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে সেমেস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। শুরু হবে ক্রিসমাস আর নিউ ইয়ারের ছুটি। একদিন শুক্রবারে দুপুর বারোটা থেকে চার ঘণ্টা পরীক্ষা দিয়ে ডর্মে ফিরছি। ভাবলাম ক্যাফেটেরিয়া থেকে এক কাপ কফি কিনে খাই। যে বিল্ডিং-এ ক্যাফে, সেখানে গিয়ে দেখি রড-লাইটের আলোয় হাহা করছে ক্যাফে। একটা লোকও নেই। শুক্রবার বলে কথা। উইক-এণ্ড শুরু। পাঁচটা বাজতে না বাজতেই সবাই যে যার বাড়ি ফিরে গেছে। ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে আবার যখন রাস্তায় নামলাম, তখন কড়কড় বাজ পড়ছে। শুরু হলো প্ৰচণ্ড ঝড় আর বৃষ্টি। এ কালবৈশাখীর বাবা। আঁধার হয়ে এল চারদিক। যেন সূর্য-গ্রহণ চলছে। চার শ’ বছরের প্রাচীন শহর নিউ অর্লিন্স। কবল-স্টোন রাস্তা, অসংখ্য গলিঘুপচি। বাড়ি-ঘর ওই চার শ’ বছর আগে যেমন ছিল, এখনও বলতে গেলে তেমনিই আছে। ভাঙা হয়নি কিছুই। যখন যতটুকু দরকার মেরামত করেই চালানো হচ্ছে।

‘আমেরিকানদের কাছে নিউ অর্লিপ্স ভূত-পিশাচদের শহর। এখানকার মোড়ে মোড়ে উইচক্র্যাফট বা ডাকিনী বিদ্যার চর্চা হয়। গভীর রাতে চলে পিশাচ সাধনা। ওখানকার শহরগুলোতে ধুলো-বালি নেই। তারপরেও বাতাসের তোড়ে চোখ খোলাই যাচ্ছে না। মূল রাস্তা বিরাট চওড়া। কিন্তু হলে কী হবে, রাস্তা পেরোলেই মিসিসিপি নদী। চওড়ায় পদ্মার সমান। কূলের কাছেই কলকল করছে জল। এই রকম ঝড়ের সময় নদীতে বান ডাকে। তখন ওদিকে যাওয়া মানা। মার্ক টোয়েনের সব বইয়ে এই নদীর ভয়াবহতার কথা আছে। বড় রাস্তা ছেড়ে ঢুকলাম গলির ভেতর। মাথা নিচু করে দৌড়াচ্ছি। কোনদিক দিয়ে কোথায় যাচ্ছি কিচ্ছু জানি না। তখন পর্যন্ত ওই শহরের কিছুই চিনি না। যা হোক, গলির ভেতর ঝড়ের তাণ্ডব কম। ভিজে সপসপ করছে সারা গা। কোনও এক জায়গায় না থামলেই নয়। হঠাৎ সামনে দেখলাম লোহার খুঁটিঅলা চওড়া বারান্দা। বারান্দা পেরিয়ে কাঁচের জানালা-দরজা। ভেতরে আলো জ্বলছে। কোনও কিছু না ভেবেই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। বুঝতে পারলাম, ওটা একটা উন্নতমানের পাব। বাইরে এত যে প্রলয়কাণ্ড অথচ ভেতরে মহাশ্মশান। না কোনও শব্দ, না কোনও বাতাস। একদিকে চওড়া কাউন্টারঅলা বার, অন্যদিকে সাদা টেবলক্লথে ঢাকা চারজন বসার জন্যে ছোট-ছোট ডায়মণ্ড শেপড টেবিল। প্রায় পনেরো-বিশজনের মত লোক বসে আছে টেবিলগুলো ঘিরে। স্যুট-টাই পরা মাঝবয়সী এক লোক ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে রোস্ট্রামের পেছনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ওভারহেড ল্যাম্পের আলোয় বক্তা এবং বারই শুধু আলোকিত। হলের বাকিটা প্রায় আঁধার। খুবই কমন দৃশ্য। শহরের এখানে সেখানে এরকম অনেক পাব আছে। বিতর্কিত সব বিষয় নিয়ে পণ্ডিতেরা এসব জায়গায় লেকচার দেন। বাছাই করা কিছু অডিয়েন্সই শুধু এ ধরনের লেকচার শুনতে আসে। অডিয়েন্সের পেছন দিকে বাথরুম। সেখানে গিয়ে গা-মাথা মুছে পেছন দিকের একটা চেয়ারে বসলাম। দর্শক ডিঙিয়ে বারে গিয়ে ড্রিঙ্ক আনার সাহসই হলো না। লেকচার হচ্ছে প্রাচীন কালে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ধর্ম নিয়ে। সেকালে ধর্ম আর জাদুর ভেতর পার্থক্য ছিল না বললেই চলে। শেষদিকে লেকচার চলে গেল কালো জাদুর রিচুয়ালিস্টিক দিকগুলোতে। পশ্চিমা দেশের পণ্ডিতদের অন্যতম গুণ হলো, যে বিষয় নিয়ে তারা পড়াশোনা করে, সে বিষয়ে তাদের জ্ঞান হয় অসাধারণ। ফাঁকিযোগী কিংবা জোড়াতালির দৃষ্টান্ত বিরল। লেকচার যা হলো, তার বেশিরভাগই বুঝতে পারলাম না। তবে যেটুকু বুঝলাম, মুগ্ধ হয়ে গেলাম তাতেই।

‘এই অধ্যাপকের নাম সিরাস ইসকারিয়াত। কম্পারেটিভ রিলিজিয়ান ডিসিপ্লিনের ফ্যাকাল্টি। ভদ্রলোকের ভক্ত হয়ে গেলাম। তাঁরই পরামর্শে বদলালাম ডিসিপ্লিন। তিন বছর পড়ার পর শুরু হলো গবেষণা। বিষয়: ক্লাসিক্যাল যুগের ধর্ম। ল্যাটিন এবং পুরনো গ্রীক ভাষা আগেই শিখতে হয়েছে। অধ্যাপক বললেন অ্যারামিক ভাষাটাও রপ্ত করতে। দু’হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এই ভাষা দারুণ কঠিন। এ হলো যিশু খ্রিস্ট যে ভাষায় কথা বলতেন, সেই ভাষা। অধ্যাপককে বললাম, অ্যারামিক শেখা আমাকে দিয়ে হবে না। ভদ্রলোক তখন আমাকে একটা শর্ত দিলেন। বললেন, ওই ভাষা না শিখেও গবেষণা যাতে চালাতে পারি সেইটে তিনি দেখবেন, তবে তার বিনিময়ে তাঁকে বিশেষ কাজে সহায়তা করতে হবে। ভদ্রলোক ব্ল্যাক আর্টের চর্চা করতেন। হাতে-কলমে কৃষ্ণ-জাদু চর্চার এই হলো শুরু। অসম্ভব জ্ঞানী সিরাস, সেই সঙ্গে ভীষণ ধূর্ত। আমার উদ্দেশ্য প্রথম থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। প্রয়োজন ছিল আমাকে শুধু বাজিয়ে নেয়ার। তার জন্যে তিন বছর যথেষ্ট সময়। নিউ অর্লিন্সে ভুডুর চর্চা ব্যাপক। দু’ শ’ বছর আগে মেরি লেভো নামে এক আধা-ফরাসি আধা-আমেরিকান মহিলা ভুডুর কর্ণধার হয়ে দাঁড়ায়। এ এত বিখ্যাত ছিল যে, একে আজও ভুডু কুইন বলা হয়। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম প্রফেসর আমাকে এইসব কর্মকাণ্ডের ভেতর জড়াবেন। পরে বুঝতে পারি, ভুডু অনেক নিচু স্তরের আফ্রিকান ব্ল্যাক আর্ট। অশিক্ষিত, আধা-শিক্ষিত লোকজন ভুডু নিয়ে মাতামাতি করে। বাণ মারা এবং পছন্দের রমণী হাসিল করাতেই ভুডু সীমাবদ্ধ। এর থেকে বেশি কিছু ভুডু থেকে পাওয়া সম্ভব না।

‘সিরাস যেটা করতেন সেটা হলো হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আসল ব্ল্যাক আর্টের অনুশীলন। তিনি নৈবেদ্য দিতেন দেবী হেকাটি এবং পিশাচ লিওনার্দ-কে। বহুকাল আগে তুরস্কের দক্ষিণে লিজিয়া নামে এক জায়গা ছিল। হাজারে হাজারে খোজা বা নপুংসক ক্রীতদাস বাস করত ওখানে। নানান জায়গা থেকে সক্ষম যুবকদের ধরে লিজিয়ায় এনে তাদেরকে নৃশংসভাবে খোজা করে দেয়া হত। বাধ্য করা হত চিরকালের জন্যে নপুংসকের জীবন বেছে নিতে। এইসব যুবকের কান্না আর অভিশাপে ভারী হয়ে থাকত লিজিয়ার আকাশ। এই খোজারাই প্রথম দেবী হেকাটির মন্দির তৈরি করে। হেকাটি জাদুমন্ত্র আর ডাকিনী বিদ্যার একচ্ছত্র মালকিন। এর জন্মই হয়েছে কৃষ্ণ-জাদুর চর্চা যারা করে, তাদের সাহায্য করার জন্যে। লিজিয়ার খোজারা বিশ্বাস করত, হেকাটিকে তুষ্ট করতে পারলে যৌন ক্ষমতা ফিরে পাওয়া যাবে। না-পাওয়া গেলেও দেবী অন্যভাবে যৌন-সম্ভোগের আনন্দ পাইয়ে দেবে। এর আরাধনার শুরুটা খোজারা করলেও পরে সক্ষম-অক্ষম, যুবক-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ সবাই পুজো দিতে শুরু করে। উদ্দেশ্য দীর্ঘ জীবন ও অঢেল সম্পদ লাভ। এর তিন শত বছর পরে হেকাটির মন্দির ছড়িয়ে পড়ে মেডিটেরিনিয়ানের দক্ষিণে সবগুলো দেশে, পুবে সিরিয়া থেকে পশ্চিমে কার্থেজ অর্থাৎ লিবিয়া পর্যন্ত। এবং এই কাজটার কৃতিত্ব দিতে হবে ব্যাকট্রিয়া বা সেন্ট্রাল এশিয়ার সম্রাট আগাথোক্লিসকে। আগা নামটা এর কাছ থেকেই এসেছে। সে আর এক কাহিনি। অন্যদিন বলব।

‘তবে সিরাস এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি লিওনার্দকেও খুশি করার চেষ্টা করতেন। লিওনার্দের পুজো বেশিরভাগই জার্মানিতে হয়। এ. পিশাচ ওখানকার ডাইনীদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। যত উইচক্র্যাফ্ট-সব এ-ই শিক্ষা দেয়। এর আরাধনা হয় লোকালয় থেকে দূরে সিডার আর ওক বনের ভেতর ঘাসে ঢাকা বৃত্তাকার খালি জায়গা বা ক্লেয়ারিঙে মোষের শিঙের মত বাঁকা চাঁদের রাতে। লিওনার্দের দেহ মানুষের, মুখ-মাথা তিন শিংঅলা ছাগলের। লিওনার্দের পেছনদিকে গুহ্যদ্বারে মানুষের মুখের মত মুখ আছে। পূজারীদের ডাকে সাড়া দিয়ে বনের ভেতর আবির্ভূত হলে লিওনার্দ প্রথমে পেছন ফিরে দাঁড়ায়। ডাইনীদের তখন তার নিতম্বের ভেতর চুমু দিয়ে তাকে তুষ্ট করার কর্মকাণ্ড শুরু করতে হয়। ওয়ারউল্ফ কিংবা ভ্যাম্পায়ার হতে হলেও এর আশীর্বাদ দরকার। প্রিন্স ভ্লাদ বা ড্রাকুলাও এর পুজো করত। লিওনার্দের পুজোর একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে অবাধ যৌন মিলন। সব ডাইনীকেই এর ডাকে সাড়া দিতে হয়। লিওনার্দ ভোগ করার পরেই কেবল তার পুরুষ অনুসারীরা পুজোর জায়গায় ডাইনীদের সঙ্গে মিলিত হতে পারে। তবে নারী সম্ভোগের জন্যে লিওনার্দকে মানুষের দেহ ধারণ করতে হয়। এই দেহ হতে হয় এমন একজন যুবকের, যে আগে কখনও নারী সঙ্গম করেনি। লিওনার্দের অনুসারীরা এ ধরনের একজন যুবককে ধরে এনে প্রথমে তাকে ধুতুরার বিষ খাওয়ায়। তারপর লিওনার্দের মূর্তির সামনে ওই তরুণকে নী-ডাউনের ভঙ্গিতে তার হাঁটুর ওপর দাঁড় করায়। এরপর পেছন থেকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে শ্বাস রোধ করে মেরে ফেলে। লিওনার্দ তখন এই মৃতের শরীরে ঢোকে। মৃত যুবকের দেহে বীর্যের শেষ বিন্দু নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত লিওনার্দ একের পর এক নারী সম্ভোগ করতেই থাকে। এই যৌন মিলনের ফলে কোনও কোনও নারী গর্ভধারণও করে। কিন্তু প্রসব করার পর দেখা যায় সন্তান মৃত। তবে ডাকিনী বিদ্যার চর্চা যারা করে, তাদের কাছে এই মৃত শিশুর লাশ এক অমূল্য জিনিস।

‘সিরাস লিওনার্দের পুজো করতেন তার যৌন-লালসা নিবারণের জন্যে। সিরাসের অধ্যাপনা ছিল আসলে লোক দেখানো। নিউ অর্লিন্সের সেরা ধনী এই লোক। তাঁর নামে কোটি কোটি ডলারের অফশোর অ্যাকাউন্ট। দারুণ বিলাসবহুল জীবন-যাপন করতেন ভদ্রলোক। তবে সবই চলত আড়ালে আবডালে। তাঁর শিকার হত টিন এজার আর কুমারী মেয়েরা। লাখ-লাখ ডলার খরচা হলেও সিরাস নিয়মিত এদের বিছানায় তুলবেনই। আগেই বলেছি, সিরাস ছিলেন ধূর্ত শিরোমণি। তাঁর নীতি হলো একলা চলো রে। অবশ্য তাঁর অধ্যাপনার আরও একটা কারণ ছিল। কালো জাদুর চর্চা এক চলমান প্রক্রিয়া। যত বেশি গবেষণা তত বেশি উন্নতি। রিসার্চ অ্যাণ্ড ডেভেলপমেন্ট ছাড়া দুনিয়া অচল।’

ফাঁক পেয়ে অমল আবার বলল, ‘কিছু মনে করবেন না, স্যর। সিরাসের নীতি যদি একলা চলো রে-ই হবে, তা হলে আপনাকেই বা নিলেন কেন? আর নেবেনই যদি, তো আপনি ছাড়া আরও লোক ছিল না?

‘অতীতে হয়তো সাহায্যকারী কেউ ছিল। আমার সঠিক জানা নেই। তবে আমাকে বেছে নেয়ার পেছনে প্রধান কারণ ছিল আমার অদম্য আগ্রহ এবং আমি ভিন দেশি। ওদেশে আমার কেউ নেই। বিদেশি ছাত্র যদি দুই-দশটা নিখোঁজও হয়, তবুও কেউ কেয়ার করবে না। তখন বাংলাদেশ কেবল স্বাধীন হয়েছে। সব কিছু এলোমেলো। ওদেশে গিয়েছিলাম পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে। আমি আসলে কোন্ দেশের সেটারই ঠিক নেই। সিরাস এসব জানতেন। আমার চেয়ে উত্তম সহযোগী আর কোথায় পাবেন তিনি? যা হোক, পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সিরাসের প্রধান উপাস্য ছিল দেবী হেকাটি। এর মূর্তির দু’দিকে দুই পিশাচী। মাথায় মোষের শিঙের মত অর্ধেক চাঁদ। চাঁদের ভেতর ছয় কোণের একটি তারা। দেবীর এক হাতে মশাল, অন্যহাতে চাবি, দাঁড়িয়ে আছে তিন রাস্তার মোড়ে। চাবি হলো সম্পদের প্রতীক, মশাল জীবনের। এর আরাধনা করতে হয় ঘোড়া আর কুকুর বলি দিয়ে। শর্ত হলো পুজোর সব আয়োজন করতে হবে তিন রাস্তার মোড়ে রাতদুপুরে। একজনের পক্ষে সব কিছু সম্ভব না। একাজে কমপক্ষে দু’জন লাগবে। যে মূর্তির সামনে বলি চড়ানো হবে, সেইটে হতে হবে অতি প্রাচীন। তারপর দরকার জটিল সব মন্ত্র। এই মন্ত্রের ভাষা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে বহু কাল আগেই।’

‘আপনি সিরাসকে সাহায্য করেছিলেন?’

‘তা তো বটেই।’

‘ব্যাপারটি খুলে বলবেন?’

‘আজ এ পর্যন্তই। এর বেশি কিছু জানার আপনার দরকার নেই। এই ভূমিকাটুকু না জানলে পরের কাজগুলোর গুরুত্ব আপনি বুঝতে পারবেন না। ওটাই এতকিছু বলার কারণ। আজকের মত বাসায় ফিরে রেস্ট নেন। কাল আসবেন।

অমল লক্ষ করল কথা বলতে বলতে ঘেমে নেয়ে গেছে মৃণাল বাবু। নেতিয়ে পড়েছে সোফার ওপর। মেসের দিকে রওনা হলো অমল। গুলিস্তানের ছোট পার্কে বসবে কি না ভাবছে। রেখা মেয়েটার কথা মনে পড়ছে খুব। কিন্তু সমস্যাও আছে। কামাল দেখে ফেলতে পারে। তিনে তিনে ছয় মেলাতে তার তখন সময় লাগবে মাত্র এক সেকেণ্ড। সাত-পাঁচ ভেবে মেসে ফিরে গেল অমল। মেসে ফিরতেই অমলের হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিলেন বিনয় বোস। পৃথিবীতে কিছু লোক আছে, যারা সব কিছুতে শুধু খারাপটাই দেখতে পায়। বোস বাবু যে দৃষ্টিতে অমলের দিকে তাকালেন, সেই দৃষ্টির ভাষা এমন: নিজেই খেতে পাস না। এখন দেখ তোর বাড়িতে কী ছুঁচোর নেত্য হচ্ছে। চিঠি খুলে পড়। তারপর বুঝবি কত পাটে কত দড়ি। যত্ত সব ফকির মিসকিনের দল।

রুমে গিয়ে চিঠি পড়ে অমলের চোয়াল ঝুলে পড়ল। তাদের জ্যাঠা মশাই মানিকগঞ্জ কোর্টে কেস করেছেন। ঠাকুরদা নাকি মৃত্যুর আগে অমলদের বাড়ি সহ চার বিঘে জমি জ্যাঠার নামে লিখে দিয়ে গেছেন। রেজিস্ট্রি করা আমমোক্তারনামা আছে। অমলদের বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে মামলা রুজু করেছেন জ্যাঠা। আপাতত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে। সাত দিনের ভেতর জবাব দাখিল করতে হবে। না হলে একতরফা রায় হয়ে যাবে। নিষেধাজ্ঞার মামলায় নানান ফ্যাকড়া থাকে। এ হলো সিঁড়ি- ভাঙা অঙ্ক। লোয়ার কোর্ট, জজ কোর্ট, হাই কোর্ট করে যদি বা অস্থায়ী নাকচ করা যায়, তারপরও স্থায়ী থাকে। আবারও সেই সিঁড়ি-ভাঙা। জলের মত টাকা খরচ, এন্তার দৌড়াদৌড়ি। কিন্তু তার বিনিময়ে প্রাপ্তি যৎসামান্য। ওদিকে ছেড়ে দিয়ে বসেও থাকা যাবে না। নইলে ভিটে-মাটিছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা ষোলো আনা। দুঃসংবাদের এখানেই শেষ নয়। অমলের ছোট ভাই বিমল ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে বাড়ির পেছনে ব্রয়লার মুরগির খামার করেছিল। সেই সময় আশপাশের অনেকেই ব্রয়লার চাষ করে দু’পয়সা কামাচ্ছিল। মাস ছয়েক আগে বার্ড ফ্লু না কী একটা ভাইরাসে সব মুরগি সাবাড়। কেউ-কেউ মুরগি বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল এবং বলা যায় প্রায় সফলও হয়েছিল, কিন্তু সরকার ওসব কেয়ারই করেনি। যেখানে যা মুরগি ছিল, পুলিশ আর ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে সব মেরে গর্তে ফেলে পুড়িয়ে ছাই করেছে। এখন ক্ষুদ্র ঋণঅলারা সুদ সহ বকেয়া ফেরত চাচ্ছে। এক লাখের ভেতর বিমল পঞ্চাশ শোধ করেছিল। এখনও পঞ্চাশ বাকি। সুদের যে হার, তাতে সুদ যে কত হয়েছে তা ভগবান জানেন! ওদিকে মায়ের ডায়াবেটিস, শ্যামলের (বিমলের ছোট) হার্নিয়া অপারেশন! দুপুরে কোনও কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ল অমল। অসম্ভব ক্লান্ত লাগছে। চোখ খুলে রাখার শক্তিটাও নেই।

.

পরদিন ভোরে উঠে নাস্তা সেরে হেঁটে হেঁটে তার ‘অফিসে’ গেল অমল। আসার পথে বিস্তর ভাবনা-চিন্তা করেছে সে। বাড়ি যাওয়া দরকার। জ্যাঠার সঙ্গে কোনও রফা করা যায় কি না, দেখতে হবে। জমি-জাতি বেচে অন্তত ঋণটা শোধ করা প্রয়োজন।

ঠিক ন’টায় গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল অমল। দারোয়ান বলল, ‘মেম সা’ব কা অফিস মে যাইয়ে।’

মন্দাকিনীর সঙ্গে দেখা হতেই একতাড়া ফর্ম এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ক্রস মার্ক করা জায়গাগুলোতে আপনার সই লাগবে। ওগুলো নিয়ে স্যরের কাছে যান। ওঁর সঙ্গে কথা বলে তারপর সই করবেন।’

বড় হলঘরটাতে মৃণাল বাবু আগের মতই সোফায় বসা। অমলকে ইশারায় বসতে বলল।

‘অমল বাবু, আপনাকে খুব মনমরা দেখাচ্ছে। বাড়ির সব খবর ভাল তো?’

ভেতরে ভেতরে চমকে উঠল অমল। লোকটা ভয়ানক বুদ্ধিমান। সব সমস্যা ঝেড়ে-ঝুড়ে বলার এখনই সময়। মৃণাল বাবুকে সব কিছু খুলে বলল সে। মৃণাল বাবু বলল, ‘আমার তো মনে হয় আপাতত লাখ দুয়েক টাকা হলেই চলবে। আপনি চাইলে টাকাটা নিতে পারেন। তবে শর্ত আছে।’

‘কী শর্ত?’

‘আমি যা যা বলব, আপনাকে সেইমত কাজ করতে হবে।’

‘আপনার কথা মতই তো কাজ করছি। নতুন করে আবার কী কাজ করতে হবে?’

‘পুরো বিষয়টা আপনাকে এখনও বলা হয়নি। সব কিছু শুনে চিন্তা-ভাবনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন। একবার রাজি হলে আর পিছাতে পারবেন না।’

‘খুন-খারাবির ভেতর আমি নেই। অন্য কিছু করতে বললে ভেবে দেখতে পারি।’

‘আরে নাহ্। এসব কিছু না।’

‘আচ্ছা, বলেন, কী আপনার শর্ত?’

‘আপনার জীবন থেকে কিছুটা আয়ু আমাকে দিয়ে দিতে হবে।’

‘এ আবার কী শর্ত! আয়ু আবার ধার দেয়া যায় নাকি?’

‘হয়তো যায়, হয়তো যায় না। না গেলে নাই। আর যদি যায়, তা হলে আপনি দেবেন কি না?’

‘এ তো মনে হচ্ছে পাগলের শর্ত।’

‘বাবু, আপনি রাজি আছেন কি না সেইটে বলেন। পাগলের শর্ত, না ইন্টেলেকচুয়ালের কণ্ডিশন সেটা শর্ত যে দিচ্ছে তাকে বুঝতে দেন।’

‘ঠিক আছে, শর্ত মানতে রাজি আছি আমি। কয় বছরের আয়ু ধার দিতে হবে?’

‘ধার না। একেবারে দিয়ে দিতে হবে। নন-রিফাণ্ডেবল।’

‘আচ্ছা, বুঝলাম। কিন্তু কয় বছরের?’

‘দশ বছরের।’

‘বেশ, তা না হয় হলো। কিন্তু আমার দশ বছরের আয়ু কার দরকার? আর নেবেই যখন আরও বেশি করে নিচ্ছে না কেন? দশ বছর খুব বেশি সময় তো না।’

‘আপনার আয়ু আপনি দেবেন আমাকে।’

এবার অমল সত্যিই অবাক হলো। মৃণাল বাবুকে খুব হাই লেভেলের পাগল বলে মনে হচ্ছে। এদেরকে ঠিক পাগল বলা যায় না। এরা হচ্ছে ম্যানিয়াক। কোনও তত্ত্ব একবার যদি বিশ্বাস এরা করেছে, তা হলে যত অসম্ভব আর অযৌক্তিকই সেটা হোক না কেন, সেখান থেকে তাদের ফেরানো যাবে না কিছুতেই। মন্ত্রের সাধন, না হয় শরীর পাতন। এরা হচ্ছে এই গোত্রের।

‘অমল বাবু, আপনি কী ভাবছেন আমি জানি। ধরে নেন আমি পাগল কিংবা ম্যানিয়াক। তাতে আপনার অসুবিধা তো কিছু হচ্ছে না। ভেবে দেখেন, টাকার জন্যে মানুষ রক্ত, চোখ, কিডনি, দেহ, কত কিছু বিক্রি করছে। জীবন সংশয় হচ্ছে। আপনি শুধু বিক্রি করছেন আয়ু। তা-ও দশ বছরের। যত টাকা আপনার দরকার, সেটা শুধু কিডনি বিক্রি করলেই জোগাড় হতে পারে। কিডনি বিক্রি করলে অপারেশন থিয়েটারেই মারা যেতে পারেন। সেখানে না মরলেও পরে যে-কোনও সময় মরতে পারেন।’

‘তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু আমার আয়ু আদৌ দশ বছর আছে কি না, সেটাই বা কীভাবে জানা যাবে? যে-কোনও সময়ই যে কেউ মরতে পারে।

‘স্বীকার করছি সেই ঝুঁকি আছে। তবে ক্যালকুলেটেড রিস্ক বলে একটা কথা আছে। আপনার ঠিকুজি-কুলজি নিয়ে গত দু’মাস গবেষণা করেছি। আপনার সঙ্গে দেখা হওয়া কাকতালীয় নয়। তারপরেও যেটুকু সন্দেহ ছিল, চাকরির দরখাস্তে আপনি যে তথ্য দিয়েছেন, তা থেকে দূর হয়েছে।’

‘আপনি তা হলে পার্কে যেতেন আমাকে খুঁজতে! মাথা বানানো, ধাঁধা জিজ্ঞেস করা স্রেফ অজুহাত?’

‘বিষয়টা সেই রকমই। তবে সেই লোক যে আপনিই হবেন, তা জানতাম না। গ্রহ-নক্ষত্রের বিচারে যাকে দিয়ে কাজ হবে, সেই ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হওয়ার সব থেকে বেশি সম্ভাবনা ছিল ওখানটাতেই, বছরের এই সময়ে, জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি। দরকার ছিল লক্ষণ আর গুণ বিচারের। ধাঁধা জিজ্ঞেস করে গুণ বিচার করা অতি পুরনো গ্রিক রীতি। এডিপাস আর স্ফিংসের ঘটনাটা মনে করে দেখেন। এসবই আমার গুরু সিরাসের কাছ থেকে শেখা। তবে আশ্চর্যের বিষয় কী জানেন? আপনিও জাতে হিন্দু এবং আমাদের বংশের লোক। বহুকাল আগে আমার-আপনার একই পরিবার ছিল।’

‘বুঝলাম, আমরা একই বংশের, মান্ধাতার আমলে পরিবারও একটাই ছিল, কিন্তু কী লাভ হচ্ছে?’

‘আপনি বাবর আর হুমায়ুনের ঘটনা তো জানেন। ছোট বয়সে হুমায়ুন মরতে বসেছিল। সে যখন সব চিকিৎসার বাইরে, আজরাইল কখন আসে সেই অপেক্ষায়, তখন এক সুফি সাধক বাবরকে বললেন হুমায়ুনের জীবন বাঁচাতে হলে তাঁর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান যে জিনিস, সেইটে কুরবানি করতে হবে। বাবরের মহামূল্যবান জিনিস মাত্র তিনটি: কোহিনূর হীরে-যেটা তিনি ইতিমধ্যে হুমায়ুনকে দিয়ে দিয়েছেন, তাঁর রাজ্যপাট, এবং নিজের জীবন। বাবর ভেবে দেখলেন শেষেরটির মূল্যই সব থেকে বেশি। কুরবানি করতে হলে ওটাকেই করতে হবে। সুফির নির্দেশে বাবর হুমায়ুনের খাটের চারদিকে তিন পাক ঘুরলেন। ঘোরার সময় মনে-মনে বললেন, হে, করুণাময়, আপনি আমার আয়ু, আমার জীবন আমার ছেলেকে দিয়ে দিন এবং তার অসুখ আর মৃত্যু আমাকে দিন। বাবর এই কাজ করলেন মাগরেবের আযানের সময়। পরদিন ফজরের পর থেকেই হুমায়ুন সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল। কিন্তু বাবর আর বিছানা থেকে উঠতে পারলেন না। তাঁর সব আয়ু তিনি হুমায়ুনকে দিয়ে ফেলেছেন। আত্মীয়তার টান অনেক বড় জিনিস রে, ভাই।’

‘তা না হয় হলো। কিন্তু আপনি তো হুমায়ুন না, আমিও বাবর না। তা ছাড়া, আপনি বিছানায় শুয়ে মরার জন্যে অপেক্ষাও করছেন না।’

‘বাইরে থেকে তা-ই মনে হয়। ভেতরে ভিন্ন চিত্র। আমার দেহে বিচিত্র রোগ বাসা বেঁধেছে। এই অসুখের নাম সিস্টেমিক ক্লেরোসিস। আমার হাত আর মুখের অবস্থা দেখেছেন? কুষ্ঠ রোগীর সব লক্ষণ ওখানে আছে। চামড়া শুকিয়ে শক্ত হয়ে ঝরে ঝরে পড়ছে। চামড়ার রঙ হয়েছে শ্বেতী রোগীদের মত। কিছুদিন পর ঠোঁট, নাকের পাটা, চোখের পাতা, কানের লতি সব বিলীন হয়ে যাবে। ঠেকানোর কোনও রাস্তা নেই। এ এক ভয়াবহ রোগ। এ রোগে শরীরের ইমিউন সিস্টেম দেহকে রোগের হাত থেকে রক্ষা করার বদলে শরীরকেই আক্রমণ করে বসে। কুষ্ঠের চিকিৎসা আছে, কিন্তু এর নেই। বাইরে যেমন দেখছেন, ভেতরে হার্ট এবং লাঙের অবস্থাও অমনই। ইউরোপ- আমেরিকার বড়-বড় সব ডাক্তার দেখে জবাব দিয়ে দিয়েছে। মৃত্যু এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এবং সেটা ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক। ছ’মাস আগে দেশে এসেছি শেষ চেষ্টাটা করার জন্যে।’

‘শেষ চেষ্টাটা কি অন্যের কাছ থেকে আয়ু নেয়া?’

‘এগজ্যাক্টলি।

‘কিন্তু এত দেশ থাকতে এখানে কেন?’

‘টাকা ছড়ালে এখানে সব করা সম্ভব। তা ছাড়া, কাজটা আমি করতে চাচ্ছি ভারতীয় দেবীর সহায়তায়। কৃষ্ণ-জাদুর চর্চা করে কোনও দেবীকে একবার ডেকে আনলে তাঁকে আর দ্বিতীয়বার ডাকা ঠিক না। সাড়া না-ও দিতে পারেন। আর যদি দেনও, জীবন সংশয় হতে পারে।’

‘অসুখটা বাধালেন কী করে?’

‘সিরাসের সঙ্গে পুরনো সব দেব-দেবীর মূর্তির খোঁজে দুনিয়ার নানান জায়গায় যেতে হয়েছে। ঘুরতে হয়েছে লোকালয় থেকে বহুদূরে সমাধি চত্বরে আর মন্দিরের ধ্বংসস্তূপে। আমরা একবার গেলাম লিবিয়ার গাদামিসে মেডিটেরিনিয়ানের কাছেই তিউনিসিয়া-আলজেরিয়া বর্ডারে। সিরাসের কাছে পাকা খবর ছিল ওখানে অ্যানুবিসের এক প্রাচীন মন্দিরে সাইমন মেগাসের লেখা অমূল্য পার্চমেন্ট আছে। এই সাইমন মেগাস যিশু খ্রিস্টের আমলে ইজরাইলের সব থেকে বড় জাদুকর ছিল। সামারিয়া এলাকার সব লোককে কালো জাদুর প্রভাবে বশীভূত করে রেখেছিল এই সাইমন। ‘ঊষর মরুভূমির ভেতর গাদামিস এক অদ্ভুত শহর। বাড়ি-ঘর, মন্দির, রাস্তা-ঘাট সব মাটির নিচে। হাজার-হাজার বছর ধরে তিল-তিল করে লক্ষ-লক্ষ লোক গড়ে তুলেছিল ওই নগরী। অ্যানুবিসের মন্দির খুঁজে বার করে আমরা যতদিনে ঢুকলাম, ততদিনে পার্চমেন্ট হাওয়া। মন্দিরের গর্ভগৃহে অ্যানুবিসের ইয়া বড় মূর্তি। মূর্তির পায়ের নিচে গোল-গোল অনেকগুলো খোপ। বোঝাই যাচ্ছে ওগুলোতে পার্চমেন্ট স্ক্রোল রাখা হত। কী মনে হলো, একটা খোপে হঠাৎ করেই হাত ঢুকিয়ে দিলাম। ভেতরে ধুলো-বালি, মাকড়সার ঝুল। আর কিছুই নেই। হাত বের করে আনছি, এমন সময় টের পেলাম কুট করে কীসে যেন কামড়ে দিল। হাত বাইরে আলোয় এনে দেখি কালো কুচকুচে পিঠঅলা বিট্‌ট্ল বসে আছে তালুর ওপর। মাথায় ত্রিশূলের মত শিং। দু’দিকে দুটো দাঁড়া। দাঁড়ার শেষ প্রান্তে মানুষের আঙুলের মত আঙুল। আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন সিরাস। বুঝলাম ঘটনা দেখে ঘাবড়ে গেছেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ওখান থেকে বের করে নিয়ে আসেন সিরাস। পরদিনই আমেরিকায় ফিরে যাই আমরা। সিরাস আমাকে জানান, ওই বিলগুলোকে বলা হয় মেগাসোমা অ্যানুবিস। অতি বিরল প্রজাতির বিল। ওগুলো কাউকে কামড়ালে মৃত্যু অনিবার্য। ধরা হয় দেবতা অ্যানুবিসের অভিশাপ পড়েছে তার ওপর। এরপর কেটে গেছে দুই বছর। সিরাস মারা গেলেন। আমি পড়লাম অসুখে। ব্ল্যাক আর্টের চর্চা অনেক কিছু দেয় ঠিকই, তবে বিনিময়ে কেড়ে নেয় জীবনটাকেই!’

‘আপনার সব কথা যদি সত্যি হয়, তা হলে মাত্র দুই লাখ টাকার বিনিময়ে আপনি আমার আয়ু থেকে দশ বছর নিয়ে নেবেন, তাই তো? টাকাটা পাব কখন?’

‘প্রস্তাবে রাজি হলে দুই লাখ টাকা এখনই পাবেন। কাজ শেষ হলে আরও আট লাখ। মোট দশ লাখ নগদ। তবে সাবধানের মার নেই। আপনার জীবন বীমা করিয়ে রাখতে চাই। যদি কোনও কারণে দ্রুত মারা যান, তা হলে আপনার নমিনি পাবে আরও দশ লাখ। পলিসি কেনা হয়ে গেছে। আমার হাতে যে ফর্মগুলো দেখছেন, ওগুলোতে যদি সই করেন, তা হলে আজই অ্যালিকোয় পলিসি খোলা হয়ে যাবে। এখন বলেন, আমার প্রস্তাবে রাজি আছেন কি না।’

‘আমি রাজি। কী করতে হবে বলেন।’

‘আজ ডিসেম্বরের তেরো তারিখ। আপনাকে সাত দিনের ছুটি দেয়া হবে। এর ভেতর যদি ইচ্ছে হয় বাড়ি যেতে পারেন। তবে অন্য একটি কাজ আপনাকে অবশ্যই করতে হবে। সেটি হলো সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড়ে যাওয়া। হাওড় পার হলে পুব দিকে ভারত সীমান্ত। মাত্র তিন শ’ গজের একফালি সমতল জমি বাংলাদেশকে ভারত থেকে আলাদা করেছে। ওই জায়গাটাতে ওপারের পাহাড় থেকে খাসিয়া মেয়েরা পিঠে খড়ির বোঝা এনে বিক্রি করে। হাওড় অঞ্চলে গাছ নেই। এই খড়ি জ্বেলেই রান্নাবান্না করে ওখানকার লোকেরা। খাসিয়া মেয়েরা খড়ি বেচে যে টাকা পায়, তা দিয়ে ওখান থেকে বাজার-সদাই করে আবারও ফিরে যায় তাদের পাহাড়ি গ্রামে। এই খাসিয়া মেয়েগুলোর মাধ্যমে এক বিশেষ জাতের ধান সংগ্রহ করবেন। এই ধানের নাম ডুমাহি। ধরা হয় এটাই পৃথিবীর প্রথম ধান। উৎপত্তিও ওই হাওড় অঞ্চলেই। কম করে হলেও দশ হাজার বছরের পুরনো এই ধান। তুলনাহীন এর স্বাদ। ছিন্ন-মস্তা অহম উপজাতীয়দের দেবী। হাজার হাজার বছর আগে প্রথম যখন এই দেবীর উদ্ভব হয়, তখন এই ধানের অর্ঘ্য দিয়েই তাকে তুষ্ট করত পূজারীরা। টাকা যা চায়, দেবেন। খাসিয়ারা সৎ। উল্টো-পাল্টা ধান গছিয়ে দেয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ডুমাহি পাওয়া কঠিন।’

‘এই ধান দিয়ে কী হবে? তা ছাড়া, এই ধান তো কাছে- পিঠেও কোথাও পাওয়া যেতে পারে। অতদূর যেতে হবে কেন?’

‘এই ধানের ফলন অত্যন্ত কম। গাছে থাকা অবস্থাতেই ঝরে যায় বেশির ভাগ। ওই ধান এখন আর খাওয়ার জন্যে চাষ করা হয় না। এর চাষ হয় শুধুমাত্র পুজোয় ব্যবহার করার জন্যে। আর ওই কাজটা কেবল খাসিয়ারাই করে। ধান দিয়ে কী হবে, সেটা পরে জানবেন। মন্দাকিনীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে রওনা হয়ে যান। যাওয়ার আগে ফর্মগুলো সই করে ওর হাতে দিয়ে যাবেন। আর একটা কথা, একুশে ডিসেম্বর বিকেলে আপনাকে অবশ্যই রিপোর্ট করতে হবে। রিপোর্ট করতে ব্যর্থ হলে সব চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে চলে যাবে আপনার চাকরিটাও। আর যা-ই করেন, ধান আনতে ভুলবেন না।’

.

অফিস থেকে বেরিয়ে রিকশা নিয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পৌঁছাল অমল। তারপর লোকাল বাস ধরে গাবতলী। পাটুরিয়ায় নিজ গ্রামে পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল। মানিকগঞ্জ থেকে বড় ইলিশ মাছ, মাংস, দই, মিষ্টি, মা-বোনের জন্যে কাপড়, ছোট দুই ভাইয়ের জন্যে বাটার জুতো-স্যাণ্ডেল এইসব কিনে হুলস্থুল করেছে। বাসে আসতে আসতে ভেবে দেখেছে অমল। দুই লাখ টাকা অনেক টাকা। বহু সমস্যার সমাধান এই টাকায় হবে। আদৌ যদি আর অফিসে ফিরে না যায় সে, তা হলেও খুব বেশি ক্ষতি হবে না। যদিও আয়ু বিক্রির বিষয়টা একেবারেই হাস্যকর। গেলেও ক্ষতি নেই। তারপরেও কী দরকার এসব ঝামেলার? মৃণাল বাবু মরলেই কী আর বাঁচলেই কী?

নয়

পরদিন সকালে ইলিশ মাছ ভাজি আর মসুরির ডাল ঘাঁটা দিয়ে গরম ভাত খেয়ে বিমলকে সঙ্গে নিয়ে মানিকগঞ্জ কোর্টে গেল অমল। দেখা করল তার বাবার পরিচিত, উকিল অপূর্ব কুমার নন্দীর সঙ্গে। কেসের নোটিশ, কাগজপত্র সব দেখে অপূর্ব বাবু বললেন, ‘শোনো, অমল, তোমার জ্যাঠা শৈলেনকে আমি চিনি। কেস-কাচারি করে করে পেকে ঝুনো হয়ে গেছে। এর সঙ্গে পাল্লা দেয়া খুব কঠিন। এই মামলা যদি জিততেও পারো, তবুও দেখবে কেস চালাতে গিয়ে ভিটে-মাটি বিক্রি করতে হয়েছে। আমি বলি কী, কিছু টাকা-পয়সা ওর হাতে দিয়ে মিটমাট করে নাও। ওকে বলো, কেসটা তুলে নিয়ে জমি-বাড়ি তোমাদের নামে লিখে দিতে। আজ বাড়ি ফিরে যাও। ভেবেচিন্তে দেখো। যদি মামলা লড়তেই চাও, তা হলে কাল এসো। তখন দেখব।’

বাড়ি ফিরে বিকেলের দিকে মাকে নিয়ে জ্যাঠার সঙ্গে দেখা করল অমল। জ্যাঠা কেস উঠিয়ে নিতে রাজি। জমিও লিখে দেবে, তবে তার জন্যে নগদ চার লাখ দিতে হবে। পরিবারের ভেতরে বলেই এত কম! বাইরের লোক হলে দশ লাখের নিচে হত না। রাতে বিছানায় শুয়ে পরদিন কীভাবে সুনামগঞ্জ যাবে, অমল ভাবতে লাগল সেই কথা।

দশ

বাসে করে সিলেট শহরে পৌঁছতেই রাত হয়ে গেল। দরগা গেটের এক হোটেলে উঠল অমল। সুনামগঞ্জের বাস ছাড়ে আম্বরখানা নামের এক জায়গা থেকে। হোটেল থেকে ওয়াকিং ডিসট্যান্স। ঝরঝরা লোকাল বাসে চড়ে সুনামগঞ্জে গিয়ে যখন উঠল, তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। মৃণাল বাবু যে জায়গার কথা বলেছিল, তা তখনও চল্লিশ মাইল দূরে। ওই জায়গার নাম ট্যাকের ঘাট। বর্ষাকালে যাওয়া সহজ। হাওড় পাড়ি দিয়ে লঞ্চে কিংবা ইঞ্জিন লাগানো নৌকোয় হাওয়া খেতে-খেতে ওপারে গেলেই হলো। যত সমস্যা শুকনোর সময়। হাওড় শুকিয়ে কাদা। মাঝে-মধ্যে আবার গভীর জলাশয়। হেঁটে-সাঁতরে যদিও বা যাওয়া যায়, তবে ওপারে পৌঁছতে কত সময় লাগবে, ভগবান জানেন। হাওড়ের রুট বাদ দিলে বিকল্প পথ হলো ভারতীয় বর্ডারে পাহাড়ের কোল ঘেঁষা সরু রাস্তা। রাস্তা না বলে ট্রেইল বলাই ভাল। ট্রেইল যেখানে চওড়া সেখানে রিক্সা-ভ্যান, টেম্পো চলে। বাকিটা হয় হাঁটো, না হয় সাইকেল চালাও।

ওবেলায় সেই জায়গায় যাওয়ার সাধারণ যানবাহন সব বন্ধ হয়ে গেছে। রাতটা সুনামগঞ্জের ছারপোকা বোঝাই বেড়অলা বোর্ডিং-এ প্রায় নির্ঘুম কাটিয়ে সকালে ভটভটি টেম্পোয় চড়ে রওনা হলো অমল।

ঝাঁকি-ধুলো বাদ দিলেও টু-স্ট্রোক ইঞ্জিনের ধোঁয়ায় চোখে- নাকে জলের বান ডাকল। নানান তাল করতে-করতে ট্যাকের ঘাটে অমল যখন পৌছাল, তখন সূর্য পাটে বসেছে। খাসিয়া মেয়েরা খড়ি-লাকড়ি বেচে, বাজার-সদাই করে ফিরে গেছে যে যার বাড়িতে। তারা আবার আসবে পরদিন সকালে। রাস্তা ঘেঁষা বিশাল এক রেইনট্রি গাছের নিচে বসল অমল। পশ্চিমে টাঙ্গুয়ার হাওড়। উল্টো দিকে এক চিলতে জমির ওপর ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির পরিত্যক্ত কয়েকটা হাফ বিল্ডিং, জং-ধরা লোহার ট্রলি, ঘাস-গজানো রেলওয়ে ট্র্যাক, আদ্যিকালের মরচে-পড়া ইয়া বড়-বড় সব ক্রেন, স্বচ্ছ নীল জলের ছোট্ট একটা সরোবর। সমতল জমিনটার পরেই আদিগন্তবিস্তৃত ঘন গাছপালা ঢাকা আকাশছোঁয়া পাহাড়ের সারিতে পড়ন্ত বিকেলের সোনালি আলো। ছবির মত সুন্দর জায়গাটা দারুণ রকম নীরব চারদিকে কী যেন নেই ভাব। জীবন আর সময় দুটোই থমকে গেছে এখানে। এ যেন ইহজাগতিক ব্ল্যাক-হোল। অনন্তকাল ধরে সব কিছু একই রকম। সিমেন্ট ফ্যাক্টরির কম্পাউণ্ডের পরেই ঘাসে ঢাকা বিশাল এক খালি মাঠ। মাঠ পেরিয়ে ছোট মহল্লায় একতলা-দোতলা টিনের বাড়ি। মহল্লার ওপারে বাজার, মসজিদ। কিছুক্ষণ বসে থেকে বাজারের দিকে রওনা হলো অমল।

হোটেল-বোর্ডিং এখানে নেই। রাতটা কোথায় কাটাবে বুঝতে পারছে না। বাজারটা ছোট হলেও ভাল। ছোটখাট রেস্তোরাঁ, চায়ের স্টল, মনোহারি দোকান, এমন কী ইলেকট্রনিক আইটেম সারাইয়ের দোকানও আছে। সম্ভবত খাসিয়াদের জন্যেই- এসবের আয়োজন। রেস্টুরেন্টে খেয়েদেয়ে রাতে কোথায় থাকা যায় মালিকের কাছে সেই কথা পাড়ল অমল। মসজিদের মোয়াজ্জিনের ঘরে থাকার ব্যবস্থা হলো। সে জাতে হিন্দু হলেও সমস্যা নেই। মেহমান বলে কথা। তবে ট্যাকের ঘাটে আসার উদ্দেশ্য গোপন রেখে জানাল, এমনিই বেড়ানোর জন্যে এসেছে। পরদিন মসজিদের পুকুরে স্নান করে নাস্তা সেরে আবারও রেইনট্রি গাছটার নিচে গিয়ে বসল অমল। এখন খাসিয়া মেয়েরা কখন আসে, সেই অপেক্ষা। এগারোটা বেজে গেল, খাসিয়াদের দেখা নেই। এখন কী করবে বুঝতে পারছে না। বাজারে ফিরে গিয়ে খাসিয়া মেয়েরা কখন আসবে সেইটে জিজ্ঞেস করা সম্ভব না। উল্টো-পাল্টা ভেবে বসতে পারে। বসে বসে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগল অমল। আর ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল পাহাড়ের গায়ের ট্রেইল বেয়ে পিলপিল করে নেমে আসছে একদল খাসিয়া মেয়ে। পিঠে খড়ির বোঝা। মেয়েগুলো সোজা এসে থামল রেইনট্রি গাছটার নিচে। লাকড়ির বোঝা নামিয়ে জিরোতে বসল। তাদের ফর্সা ধবধবে গালে লাল রঙের ছোপ, কপালে মেরুন টিপ। পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল অমল। মাঝবয়সী তিনজন মহিলার সব খড়ি কিনে ফেলল। দর-দামের ধারই ধারল না। এরপর পাড়ল আসল কথা। সর্দারনী টাইপ একজনের হাতে পাঁচ শ’ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বলল এক কেজি ডুমাহি ধান এনে দিতে। এবং সেটা আজকের মধ্যেই। মহিলা জানাল আজ আর হবে না। ওখান থেকে তার বাড়ি আধা বেলার রাস্তা। তা ছাড়া, বর্ডার দিনে একবারই পার হওয়া যায়। পরদিন সকালে এনে দেবে।

পর-পর দু’রাত মোয়াজ্জিনের ঘরে থাকা সম্ভব না। মহাযন্ত্রণা হলো দেখছি, মনে-মনে ভাবল অমল। কিন্তু কী আর করা? গাছতলায় শুতে হলেও আরও একটা রাত এখানে তাকে কাটাতে হবে। গাছতলায় শুতে সমস্যা নেই, সমস্যা হলো লোকে সন্দেহ করতে পারে। নানান প্রশ্ন করবে তারা। ফেরারি আসামি ভেবে পুলিশে খবর দেয়াও বিচিত্র না। অমল মহিলাকে জানাল, ধান হাতে পাওয়ার পর আরও পাঁচ শ’ টাকা বকশিশ দেয়া হবে। তবে সকাল সকাল এনে দিতে হবে। কথাবার্তা সেরে বাজারের দিকে হাঁটা ধরল অমল। এমন সময় পেছন থেকে মহিলাদের ডাক শুনে থমকে দাঁড়াতে হলো তাকে। মহিলারা জানতে চাচ্ছে, খড়ির বোঝা কোথায় ডেলিভারি দিতে হবে। ধানের টেনশনে খড়ির কথা বেমালুম ভুলে গেছে সে। অমল জানাল আপাতত খড়িগুলো ওখানেই থাক। পরে উঠিয়ে নেবে। আগের রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে অমল জানাল, তার শরীরটা ভাল না। বিছানায় শুয়ে একটু রেস্ট নিতে চায় সে। আবারও মোয়াজ্জিনের ঘর। রাতে কিছু খেল না অমল। বলল, পেট খারাপ। কোনও মতে রাতটা যাতে পার হয়, ভগবানের কাছে সেই প্রার্থনা। পরদিন সকালে মোয়াজ্জিনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রেস্টুরেন্টে নাস্তা করে আবার গাছতলা। রাতে হাওয়া হয়ে গেছে খড়ির বোঝাগুলো। খাসিয়া সর্দারনী ধান নিয়ে এলেই হয় এখন।

বেলা চড়ে গেল, খাসিয়া মেয়েরা আসছে-যাচ্ছে, অথচ সর্দারনীর দেখা নেই। সুনামগঞ্জ ফিরতে হলে আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই রওনা হতে হবে। এরপর অতদূরের রাস্তায় কেউ আর যেতে চাইবে না। অধৈর্য হয়ে পায়চারী শুরু করল অমল। কী সিদ্ধান্ত নেবে ভেবে পাচ্ছে না। খাসিয়া মেয়েদের কাউকে যে জিজ্ঞেস করবে, সেটাও সম্ভব নয়। কাল যে মেয়েগুলো এসেছিল, আজ তাদের কেউ আসেনি। সর্দারনীর নাম পর্যন্ত জানে না সে। একটাই রাস্তা খোলা আছে, সেটা হলো আজ সুনামগঞ্জ গিয়ে রাতটা কাটিয়ে কাল আবার এখানে ফিরে আসা। কিন্তু ফিরে আসতে গেলেও দিন পার হয়ে যাবে। এর ভেতর সর্দারনী এসে তাকে না পেয়ে ফিরে গেলে আর হয়তো দেখাই হবে না। হলেও সেটা হবে একুশ তারিখের পর। তখন আর কী হবে ওই ধান দিয়ে? গাছতলায় বসে মাটির দি