এর উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ। বিষয়টি প্রদর্শন করা খুব সহজ যে, নিকটাত্মীয়রা–কিন– গড়পড়তার চেয়ে তাদের জিনগুলো ভাগাভাগি করার বেশী সম্ভাবনা আছে। বহুদিন ধরেই বিষয়টি স্পষ্ট যে, এটাই সম্ভবত ব্যাখ্যা করছে, কেন সন্তানদের প্রতি পিতামাতাদের পরার্থবাদী আচরণ এত ব্যাপকভাবে দেখা যায়। আর, এ. ফিশার, জে, বি, এস, হলডেন এবং আরো বিশেষ করে ডাবলিউ, ডি, হ্যামিলটন যে বিষয়টি অনুধাবন করেছিলেন তাহলো– একই ভাবে বিষয়টি প্রযোজ্য অন্যান্য নিকটাত্মীয়দের ক্ষেত্রেও– যেমন ভাই ও বোন, ভাইপো ও ভাইঝি, কাছের সব আত্মীয়রা। যদি কোনো সদস্য মারা যায় তার দশজন নিকটাত্মীয়কে বাঁচাবার জন্য, কিন আলট্রইজম বা আত্মীয়-পরার্থবাদীতার জিনটির একটি কপি হয়তো হারিয়ে যাবে, কিন্তু একই জিনের ‘অনেকগুলো কপি বেঁচে যাবে।
“অনেকগুলো’ শব্দটি বেশ অস্পষ্ট, যেমন, অস্পষ্ট ‘নিকটাত্মীয়’ শব্দটি। আমরা এর চেয়ে ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারি, যেমন করে হ্যামিলটন করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে লেখা তার দুটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, সামাজিক প্রাণি-আচরণবিদ্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অবদান রেখেছে এমন যেকোনো লেখার মধ্যে অন্যতম। আমি কখনই বুঝে উঠতে পারিনি কেন এই দুটি পেপার প্রাণি আচরণবিদরা এতটা অবহেলা করেছেন (তার নাম এমনকি প্রাণি আচরণবিদ্যার দুটি প্রধান পাঠ্যপুস্তকে উল্লেখিত হয়নি, যে বই দুটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭০ সালে)(১ )। সৌভাগ্যক্রমে সাম্প্রতিককালে তার সেই ধারণাগুলো নিয়ে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। হ্যামিলটনের পেপারটি মূলত গাণিতিক, কিন্তু খুব সহজাত ধারণা হিসাবেই এর মূলনীতিগুলো বোঝা সহজ, কোনো জটিল গাণিতিক ধারণা ছাড়াই, যদিও একটু বেশী অতিসরলীকরণের ঝুঁকি থাকে। যে বিষয়টি আমরা পরিমাপ করতে চাই সেটি হচ্ছে সম্ভাবনা, বা “অডস’, যে দুটি একক সদস্য, ধরুন, দুটি বোন, কোন একটি নির্দিষ্ট জিন বহন করছে।
সরলীকরণের খাতিরে আমি ধরে নেবো যে আমরা যে জিন নিয়ে কথা বলছি যারা জিনপুলে দুষ্প্রাপ্য (২)। অধিকাংশ মানুষই তাদের শরীরে ‘আলবাইনো না হবার’ জিন ধারণ করে, তারা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত হোক বা না হোক। আর এই জিনটি এত সাধারণ হবার কারণ হচ্ছে প্রকৃতিতে আলবাইনোদের, যারা আলবাইনো নয়, তাদের চেয়ে বাঁচার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃতভাবে কম থাকে, কারণ, যেমন, সূর্যের আলো তাদের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয় এবং তাদের দিকে ছুটে আসা কোনো শিকারী প্রাণীকে দেখতে না পাবার সম্ভাবনা আছে। আমরা অবশ্য জিনপুলে এধরনের সুস্পষ্ট ‘ভালো’ জিন, যেমন, ‘অ্যালবাইনো না হবার’ জিনটির উপস্থিতির হার ব্যাখ্যা করতে চিন্তিত নই। কোনো একটি জিনের সাফল্য বিশেষভাবে তাদের পরার্থবাদী আচরণের ফলশ্রুতি, আমরা এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে চাই। সুতরাং, আমরা ধরে নিতে পারি, অন্তত এই বিবর্তনের শুরুর দিকে, জিনগুলো দুর্লভ ছিল। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, এমনকি কোনো জিন যা কিনা সামগ্রিক কোনো জনগোষ্ঠীতে দুলর্ভ, কিন্তু সেটি কোনো একটি পরিবারের মধ্যে খুবই সাধারণ হতে পারে। আমি বেশ কিছু জিন বহন করছি, যা মোটামুটিভাবে বাকী জনগোষ্ঠীর মধ্যে দুর্লভ, আপনিও কিছু জিন বহন করেন যা জনগোষ্ঠীতে দুর্লভ। আর আমদের দুজনের একই দুর্লভ জিন বহন করার সম্ভাবনা আসলেই খুব সামান্য। কিন্তু সেই সম্ভাবনাটা আবার বেশ বেশী যে, আমার বোন কোনো একটি বিশেষ দুর্লভ জিন বহন করে যা আমার মধ্যেও আছে এবং একইভাবে আপনার বোনেরও এমন কোনো দুর্লভ জিন বহন করার সম্ভাবনা আছে যা আপনিও বহন করছেন। আর এটা না হবার সম্ভাবনা এই ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ, এবং এটা ব্যাখ্যা করা খুব সহজ।
ধরুন, আপনি কোনো জিন, ‘জি’ এর একটি মাত্র কপি বহন করছেন। আপনি অবশ্য সেই জিনটি আপনার বাবা কিংবা মায়ের কাছ থেকে পেয়েছেন (আমাদের ব্যাখ্যার সুবিধার্থে আমরা কিছু ব্যতিক্রমী সম্ভাবনা অবজ্ঞা করতে পারি– যেমন ‘জি’ জিনটি হয়তো এমন কোনো নতুন মিউটেশন, যা আপনার বাবা-মা দুজনেরই আছে অথবা আপনার বাবা কিংবা মায়ে কারো হয়তো জিনটির দুটি কপি আছে); ধরুন, আপনার বাবা আপনাকে এই জিনটি দিয়েছেন। তাহলে তার শরীরের প্রতিটি সাধারণ কোষ এক কপি ‘জি’ বহন করে; এখন আপনি হয়তো মনে করতে পারবেন যে, যখন কোনো পুরুষ তার শুক্রাণু তৈরী করে, সে তার অর্ধেকটি জিন সেখানে প্রদান করে। সুতরাং সেখানে প্রায় ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা আছে যে শুক্রাণুটি আপনার বোনের জন্মের কারণ, সে ‘জি’ জিনটি পেয়েছে। যদি অন্যদিকে, আপনি ‘জি’ জিনটি পেয়ে থাকেন আপনার মায়ের কাছ থেকে, ঠিক হুবহু সমান্তরাল যুক্তি দিয়ে আমরা দেখাতে পারি, তার অর্ধেক ডিম্বাণু অবশ্যই এ জিনটি ধারণ করে, আবারো সেই সম্ভাবনাটি ৫০ শতাংশ যে, আপনার বোনও ‘জি’ জিনটি বহন করবে। এর অর্থ হচ্ছে যদি আপনার ১০০ টি ভাই-বোন থাকে তাহলে প্রায় ৫০ জন যেকোনো নির্দিষ্ট জিন বহন করবে, যা আপনিও বহন করেন। এর অর্থ এটাও যে আপনার যদি ১০০ টি দুর্লভ জিন থাকে, তাহলে তাদের ৫০ শতাংশ আপনার যে কোনো একজন ভাই বা বোনের শরীরে থাকবে।
একই ধরনের গণনা যেকোনো মাত্রার কিনশীপ বা আত্মীয়তার ক্ষেত্রেই আপনি করতে পারবেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মীয়তা হচ্ছে পিতামাতার সাথে তাদের সন্তানদের। আপনার যদি এক কপি ‘এইচ’ জিন থাকে, তাহলে আপনার কোনো একটি নির্দিষ্ট সন্তানের মধ্যে সেই জিনটি থাকার সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ, কারণ আপনার অর্ধেক জনন কোষেই ‘এইচ’ জিনটি থাকবে। এবং যেকোনো একটি নির্দিষ্ট সন্তানের জন্ম হবে এদেরই কোনো একটি জনন কোষের মাধ্যমে। আপনার যদি ‘এফ’ জিনের একটি অনুলিপি থাকে, আপনার বাবারও ‘এফ’ জিন থাকার সম্ভাবনা থাকবে ৫০ শতাংশ, কারণ আপনি আপনার অর্ধেক জিন আপনার বাবার কাছ থেকে এবং বাকী অর্ধেক আপনার মায়ের কাছ থেকে পাচ্ছেন। সুবিধার জন্য আমরা সম্পর্ক বা রিলেটেডনেস বা আত্মীয়তার একটি সূচক ব্যবহার করতে পারি, যা দুটি সম্পর্কযুক্ত সদস্যের কোনো একটি জিন ভাগাভাগি করার সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে। দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্ক হচ্ছে ১/২, কারণ অর্ধেক পরিমান জিন যা কোনো একটি ভাইয়ের শরীরে থাকবে, সেটি অন্য ভাইয়ের মধ্যেও পাওয়া যাবে। এটি একটি গড়পড়তা সংখ্যা: মাইওটিক কোষ বিভাজনের ক্ষেত্রে ভাগ্যের দান, সম্ভাবনা আছে কোনো একটি নির্দিষ্ট জোড়া ভাই এর চেয়ে কম কিংবা বেশী পরিমান জিন ভাগাভাগি করে। পিতামাতা ও সন্তানদের মধ্যে আত্মীয়তা সবসময়ই ঠিক ১/২।
