(২) এই বক্তব্যটি, দুঃখজনকভাবে ভুল। মেনার্ড স্মিথ ও প্রাইসের মূল প্রবন্ধটিতেই ভুলটি ছিল এবং আমি এই অধ্যায়ে তার পুনরাবৃত্তি করেছিলাম এবং খানিকটা সম্প্রসারিত করেছি বরং বোকার মত একটি প্রস্তাব দিয়ে যে, পোবার-রিটালিয়েটর হচ্ছে একটি প্রায়’ ‘ইএসএস’, (যদি কোনো স্ট্রাটেজী একটি প্রায় ‘ইএসএস’ হয়, তাহলে এটি ‘ইএসএস’ নয় এবং অন্যান্য কৌশল সেখানে অনুপ্রবেশ করবেই)। রিটালিয়েটর বা প্রতিশোধগ্রহনকারী কৌশল দেখতে উপরিভাবে একটি ‘ইএসএস’, কোনো একটি রিটালিয়েটর জনসংখ্যায় আর কোনো স্ট্রাটেজী ভালো করে না। কিন্তু ‘ডোভরা’ একই রকম ভালো করে কারণ কোনো একটি রিটালিয়েটর জনসংখ্যায়, ‘রিটালিয়েটরদের আচরণ থেকে তাদের আচরণ অভিন্ন। ডোভা’ তাই সেই জনগোষ্ঠীতে ধীরে ধীরে ঢুকতে পারে। কিন্তু তারপর যা ঘটে সেটাই হলো সমস্যা। জে, এস, গেল, ও রেভারেন্ড এল, জে, ইভস একটি গতিময় কম্পিউটার সিমুলেশন করেছিলেন যে তারা একটি মডেল প্রাণীর জনগোষ্ঠীকে বহু সংখ্যক প্রজন্মের বিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যান। তারা দেখান যে এই কম্পিউটার গেমে সত্যিকারের ‘ইএসএস’ আসলেই ‘হক’ আর ‘বুলিদের একটি স্থিতিশীল মিশ্রণ। শুরুর দিকের ‘ইএসএস’ প্রবন্ধগুলোয় এটাই শুধু একমাত্র ভুল না, যা এই ধরনের কোনো ডায়নামিক উপস্থাপনা উন্মোচন করেছে। আমার নিজের একটি ভুলের সুন্দর উদাহরণ অধ্যায় ৯ পরবর্তী নোটে আমি আলোচনা করেছি।
(৩) আমাদের কাছে এখন মাঠ পর্যায়ে ভালো কোনো কিছুর জন্য মূল্য পরিশোধ ও তার বিনিময়ে সুবিধা পাওয়া বা কস্ট বেনেফিট বিশ্লেষণ সংক্রান্ত পরিমাপ ও উপাত্ত আছে, যা কোনো একটি নির্দিষ্ট ‘ইএসএস’ মডেলের সাথে যুক্ত করা হয়েছিল। অন্যতম একটি ভালো উদাহরণ এসেছে উত্তর আমেরিকার গ্রেট গোলডেন ডিগার ওয়াস্পদের মডেল থেকে। ডিগার ওয়াস্পরা হচ্ছে আমাদের জ্যামের পাত্রের কাছে হেমন্তের সময় আসা সামাজিক ওয়াস্পরা নয়, যারা মূলত বন্ধ্যা স্ত্রী ওয়াস্প, যারা তাদের কলোনীর জন্য পরিশ্রম করছে। কিন্তু প্রতিটি স্ত্রী ডিগার ওয়াস্পকে এককভাবে তার নিজের উপর ভরসা করে বাঁচতে হয়। এবং তার বেশ কয়েক প্রজন্মের লার্ভাদের জন্য আশ্রয় আর খাদ্য অনুসন্ধানে সে তার জীবনের বেশ বড় অংশ নিবেদন করে। সাধারণত, কোনো স্ত্রী ডিগার ওয়াস্প শুরু করে। মাটিতে একটি সরু গভীর গর্ত খোঁড়ার মাধ্যমে, যার একেবারে নীচে থাকে ভোলা একটি ফাপা জায়গা। এরপর সেই স্ত্রী ডিগার ওয়াস্পটিকে শিকার ধরতে বের হয় (ক্যাটিডিড কিংবা লং হর্ন গ্রাসহপারদের, যদি গ্রেট গোল্ডেন ডিগার ওয়াস্প হয়ে থাকে); যখন সে তার পছন্দ মত শিকার খুঁজে পায়, সেটিকে সে হুল ফুটিয়ে অবশ করে ফেলে, তারপর সেটিকে টেনে নিয়ে আসে মাটিতে তার করা সেই গর্তে। এভাবে মোট চার থেকে পাঁচটি ক্যাটিডিড সে জড়ো করে তার মাটির ঘরের মুখে, এরপর তাদের উপর ডিম পাড়ে ও গর্তটির মুখ বন্ধ করে দেয়। সেই ডিম থেকে প্রথমে লার্ভা বের হয়, তারা সেই অবশ কিন্তু জীবিত ক্যাটিডিডদের খাদ্য হিসাবে খায়। এখানে মূল বিষয়টি হচ্ছে তারা তাদের শিকারকে হত্যা করার বদলে নড়াচড়া করতে অক্ষম বা অবশ করে রাখে, এর ফলে তার শিকারটি পঁচে যায় না, বরং জীবিত অবস্থায় তার লার্ভারা ভিতর থেকে তাদের খায়, এবং তাদের মাংসটিও তাজা থাকে। এদের ও সম্পর্কযুক্ত আরেকটি প্রজাতি, ইখনিউমন (lchneumon) ওয়াস্পদের এই ভয়ঙ্কর পৈশাচিক আচরণ ডারউইনকে লিখতে প্ররোচিত করেছিল: ‘আমি নিজেকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছি না যে, কোনো কল্যাণময় দয়ালু ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ইখনিউমোনিডির মত কোনো কিছু পরিকল্পনা করে সৃষ্টি করতে পারেন যার একটাই সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য শুয়োপোকার জীবন্ত শরীরের ভিতর থেকে তারা খাদ্য গ্রহন করা। তিনি অবশ্যই একই ভাবে ফরাসী শেফদের উদাহরণও দিতে পারতেন, যারা লবস্টারদের স্বাদ অটুট রাখার জন্য তাদের জীবন্ত দগ্ধ করে। স্ত্রী ডিগার ওয়াস্পদের জীবনে আবার ফিরে আসি, মূলত তাদের জীবন কাটে একাকী, শুধুমাত্র একই এলাকা স্বাধীনভাবে বেশ কিছু স্ত্রী ডিগার ওয়াস্প তাদের ঘর বানায়। কিন্তু কখনো কখনো তারা একে অন্যের মাটির গর্ত ভাগাভাগি করে নেয় নতুন কোন গর্ত খোঁড়া ঝামেলা এড়াতে।
ডঃ জেন ব্রকম্যানকে বলা যেতে পারে ওয়াস্পদের জেন গুড়ল এর মত কেউ। তিনি আমেরিকা থেকে অক্সফোর্ডে, এসেছিলেন আমার সাথে কাজ করতে, তার সাথে তিনি নিয়ে এসেছিল বিশাল পরিমান রেকর্ড, প্রতিটি সদস্যকে আলাদা আলাদা করে শনাক্ত করা দুটি পুরো স্ত্রী ডিগার ওয়াস্পদের কলোনীর জীবনে যা কিছু ঘটেছে, তার লিপিবদ্ধ ইতিহাসসহ তার রেকর্ড এতটাই সম্পূর্ণ ছিল যে প্রতিটি একক ওয়াস্পদের সময়-বাজেট সুস্পষ্টভাবে হিসাব করা সম্ভব ছিল। সময় অর্থনৈতিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে একটি ভোগ্যপণ্য: জীবনের কোনো একটি অংশে যতটা বেশী সময় ব্যয় করা হয়, অন্য ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য ততটাই কম সময় পাওয়া যায়। অ্যালান গ্রাফেন আমাদের দুজনের সাথে যোগ দেন এবং আমাদের শিখিয়েছিলেন কিভাবে সময়-মূল্য ও প্রজনন সুবিধার বিষয়টি সঠিকভাবে ভাবতে হয়। আমরা প্রমাণ পেয়েছিলাম, একটি সত্যিকারের মিশ্র ‘ইএসএস’ এর, স্ত্রী ডিগার ওয়াস্পদের নিউ হ্যাঁম্পশায়ার কলোনীতে সেটি পাওয়া গেলেও, মিশিগানের ডিগার ওয়াস্প জনগোষ্ঠীতে আমরা তেমন কিছু খুঁজে পাইনি। সংক্ষেপে বললে, নিউ হ্যাঁম্পশায়ার ওয়াস্পরা হয় তারা নিজেদের গর্ত নিজেরা খোড়ে অথবা অন্য ওয়াস্পের খোঁড়া ঘর ব্যবহার করে। আমাদের ব্যাখ্যানুযায়ী ওয়াস্পরা সুবিধাপ্রাপ্ত হয় যখন তারা অন্য কারো বানানো ঘরে ঢোকে, যে ঘরটি এর মূল মালিকের দ্বারা পরিত্যক্ত ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য। যে গর্ত এর আগে থেকে দখল করা সেখানে ঢোকার কোনো অর্থ নেই, কিন্তু অনুপ্রবেশকারীর জানার কোনো উপায় নেই কোন ঘরটি দখল করা আর কোনটি পরিত্যক্ত। দ্বৈতভাবে কোনো একটি গর্তে বাস করারও ঝুঁকি থাকে তার জন্য, এবং এমনকি পরে সে তার বানানো ঘরে এসে দেখতে পারে তার সেই গর্ত অন্য কেউ বন্ধ করে দিয়েছে ডিম পেড়ে এবং তার সব কষ্টই ব্যর্থ হয়– এই সুযোগে অন্য কোন ডিগার ওয়াস্প সেখানে ডিম পেড়ে তার কষ্টের সুফলটি ভোগ করে। যদি কোনো একটি জনগোষ্ঠীতে বেশী মাত্রায় এই ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে, তাহলে ডিম পাড়ার মত যথেষ্ট গর্ত খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে, এবং দ্বৈতভাবে কারো সাথে সেই গর্ত ব্যবহার করার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এবং সে কারণে নিজের গর্ত নিজে খোঁড়াই তখন সুবিধাজনক স্ট্রাটেজী। এর বীপরিতে যদি বহু ওয়ারা গর্ত খুড়তে থাকে, তাহলে যথেষ্ট পরিমান গর্ত থাকবে যা অনুপ্রবেশকারীদের সেখানে ঢোকার সুযোগও বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং একটি সুনির্দিষ্টভাবে গর্তে অনুপ্রবেশ করার হারটির একটি হার থাকে, যেসময় গর্ত খোঁড়া আর কারো খোঁড়া গর্তে অনুপ্রবেশ করা সমানভাবে লাভজনক হয়। যদি এর প্রকৃত হারটি ক্রিটিকাল হারটির চেয়ে নীচে থাকে, প্রাকৃতিক নির্বাচন অনুপ্রবেশকারীদের সুবিধা দেয়, কারণ তখন অনেক বেশী পরিমান পরিত্যক্ত গর্ত থাকে দখল করার। আর যদি আসল হারটি ক্রিটিকাল হারের চেয়ে বেশী হয়, তাহলে ব্যবহার উপযোগী গর্তের সংখ্যা কম হয় এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন গর্ত করাকে সহায়তা করে। সুতরাং জনগোষ্ঠীতে একটি ভারসাম্য বজায় থাকে। বিস্তারিত এই গাণিতিক প্রমাণগুলো প্রস্তাব করে যে আসলে একটি সত্যিকারের মিশ্র ‘ইএসএস’ সেখানে বিদ্যমান। কোনো একটি জনগোষ্ঠীতে গর্ত খোঁড়ার আর অনুপ্রবেশ করার বিশেষজ্ঞ ওয়াস্প থাকার বদলে বরং দেখা যায় প্রতিটি একক ওয়াস্পেরই সম্ভাবনা থাকে গর্ত খোঁড়ার বা অনুপ্রবেশ করার। (৪) টিনবার্গেনের স্থানীয়রা সবসময় জয়ী হয় এই প্রপঞ্চটির আরো স্পষ্ট উদাহরণ এসেছে এন, ডব, ডেভিসের স্পেকলড উড প্রজাপতির নিয়ে গবেষণা থেকে। টিনবার্গেন তার গবেষণা করেছিলেন ‘ইএসএস’ তত্ত্বটি আবিষ্কার হবার বহু আগেই। আর আমার ‘ইএসএস’ ব্যাখ্যাটি যা প্রথম সংস্করণে আমি উল্লেখ করেছি, সেটি করা হয়েছে বর্তমানের তথ্যপুষ্ট হয়ে অতীত ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে। ডেভিস তার প্রজাপতি গবেষণাটি পরিকল্পনা করেছিলেন ‘ইএসএস’ তত্ত্বের আলোকে। তিনি লক্ষ করেছিলেন যে অক্সফোর্ডের কাছে ভাইথাম উডে প্রতিটি পুরুষ প্রজাপতিরা মাটি কিংবা কোথাও পড়া সূর্যের আলোর টুকরোগুলোকে পাহারা দেয়। স্ত্রী প্রজাপতিরা এই সুর্যের আলো পড়া জায়গাগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয় সুতরাং এই সূর্যের আলো পড়া অংশগুলো খুবই মূল্যবান সম্পদ, যার জন্য যুদ্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু সূর্যের আলোর টুকরোর সংখ্যার চেয়ে পুরুষদের সংখ্যা অনেক বেশী। এবং বাকী পুরুষরা গাছের পাতার চাদরে তাদের সুযোগের অপেক্ষা করে। পুরুষ প্রজাপতিদের ধরে এবং তাদের একটা পর একটা মুক্তি দেবার মাধ্যমে ডেভিস দেখান যে দুটি একক প্রজাপতি যাকে কোনো সূর্যের আলোর টুকরোয় প্রথম মুক্তি দেয়া হয়, দুজন সদস্যই তাকে সেই এক চিলতে রোদ্দুরের মালিক হিসাবে গণ্য করে। যে পুরুষটি সূর্যের আলোয় পূর্ণ টুকরোয় দ্বিতীয় এসে পৌঁছায় তাকে গন্য করা হয় অনুপ্রবেশকারী হিসাবে। সবসময় অনুপ্রবেশকারী, কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া, দ্রুত তার পরাজয় স্বীকার করে নেয়, পুরো নিয়ন্ত্রণ প্রথম যে প্রজাপতি সেখানে এসেছে তার হাতে ছেড়ে দেয়। সর্বশেষ চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসাবে, ডেভিস দুটো প্রজাপতিকে বোকা বানাতে সক্ষম হন, দুটো প্রজাপতিকে তিনি ভাবতে প্ররোচিত করেন যে, সেই আসল মালিক, অন্যজন অনুপ্রবেশকারী, এবং শুধুমাত্র এই পরিস্থিতিতে সত্যিকারভাবে গুরুতর আর দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ হয় তাদের মধ্যে। যাইহোক, এই সব ক্ষেত্রে যেখানে, সহজতরভাবে বোঝানোর জন্য, আমি বলছি এমনভাবে যে শুধু মাত্র এক জোড়া প্রজাপতি আছে, কিন্তু আসলেই পরিসংখ্যানগত যুক্তিযুক্ত এমন সংখ্যক প্রজাপতি জোড়া সেখানে ছিল অবশ্যই।
