কোচের অন্ধভাবে নির্বাচন করা নৌকা চালকরা অবশেষে দেখা যাবে আদর্শদল হবে, যেখানে চারজন বাহাতি আর চার ডানহাতি থাকবে। দেখে মনে হবে যেন সে তাদের একটি সম্পূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ ইউনিট হিসাবে একসাথে নির্বাচন করেছে। আমি মনে করি এটি আরো বেশী মিতব্যয়ী মনে হবে তাকে এমন ভাবা যে– সে আরো নীচের স্তরে নির্বাচনে কাজ করে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পর্যায়ে। বিবর্তনীয় স্থিতিশীল কোনো অবস্থা (স্ট্রাটেজী এখানে ভুল ইঙ্গিত করবে এ-প্রসঙ্গে) চার ডানহাতি বা চার বাহাতির উদ্ভব হবে শুধুমাত্র নীচু স্তরে আপাতদৃষ্টিতে মেধার উপর ভিত্তি করে নির্বাচনের মাধ্যমে।
জিনপুল হচ্ছে জিনদের দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশ। ‘ভালো’ জিনগুলো অন্ধভাবেই নির্বাচিত হয়, যারা জিনপুলে টিকে থাকে সেই ভাবে। এটি কোনো তত্ত্ব না, এটা কোনো পর্যবেক্ষিত বাস্তব সত্য নয়: এটা একটি টটোলজী বা অর্থহীন পুনরাবৃত্তি। কৌতূহল জাগানো প্রশ্নটি হচ্ছে, একটি জিনকে ভালো বানায় আসলে কোন জিনিসটি। প্রাথমিক একটি ধারণা হিসাবে আমি বলেছিলাম যেকোনো একটি জিন, সারভাইভাল মেশিন, শরীর তৈরীর ক্ষেত্রে তার যোগ্যতার ভিত্তিতে ভালো হয়। আমাদের এখন এই বাক্যটি খানিকটা সংশোধন করতে হবে। জিনপুল রূপান্তরিত হবে ‘বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল জিনদের’ সেট হিসাবে, যা সংজ্ঞায়িত করা হয় জিনপুল হিসাবে যেখানে কোনো নতুন জিন অনুপ্রবেশ করতে পারবেনা। বেশীর ভাগ নতুন জিন যাদের উদ্ভব হয়, পরিব্যক্তি (মিউটেশন) বা পুনঃবিন্যাস (রিঅ্যাসর্টমেন্ট) বা অভিবাসনের (ইমিগ্রেশন) মাধ্যমে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছাকুনীতে তারা দ্রুত বাতিল হয়ে যায়: বিবর্তনীয় স্থিতিশীল জিনদের সেটটি পুনর্বহাল হয়। মাঝে মাঝে একটি নতুন জিন সেই সেটে অনুপ্রবেশ করতে সফল হয়: এটি জিনপুলে বিস্তার লাভ করতে সফল হয়। একটি অস্থিতিশীল অন্তবর্তীকালীন পর্ব সৃষ্টি হয় যার পরিসমাপ্তি ঘটে নতুন বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল জিনের সেট তৈরী করার মাধ্যমে– সামান্য কিছুটা বিবর্তন সংঘটিত হয়েছে। আগ্রাসন কৌশলের সমরুপ উদাহরণ অনুসারে, কোনো জনগোষ্ঠীর হয়তো একাধিক বিকল্প স্থিতিশীল পয়েন্ট আছে এবং এটি হয়তো কখনো কখনো পারে একটি থেকে অন্যটিতে পরিবর্তিত হতে। ক্রমশ বিবর্তন হয়তো সেরকম বেশী মাত্রায় স্থিতিশীল ধাপে ধাপে উপরে ওঠা না, যেখানে সুস্পষ্ট আলাদা আলাদা ধাপ আছে একটি স্থিতিশীল কোন সমতল স্তর থেকে অন্য একটি স্থিতিশীল সমতল অবধি (৮)। দেখে মনে হতে পারে যে পুরো জনগোষ্ঠী একসাথে এমনভাবে আচরণ করছে যেন কোন একটি স্ব-নিয়ন্ত্রিত ইউনিট, কিন্তু এই বিভ্রমটি তৈরী করে নির্বাচন, যা কাজ করে একক জিনদের স্তরে। জিনগুলো নির্বাচিত হয় তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী, কিন্তু যোগ্যতাকে বিচার করা হয় ‘বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল এক সেট জিনের প্রেক্ষাপটে’ জিনটি কেমন কাজ করে তার উপর ভিত্তি করে, যেটি বর্তমান জিনপুল।
পুরো একক সদস্যদের মধ্যে আগ্রাসী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার উপর নজর দিয়ে, মেনার্ড স্মিথ বিষয়টি খুব সুস্পষ্ট করে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ‘হক শরীর’ আর ‘ডোভ শরীরের’ স্থিতিশীল একটি অনুপাতের কথা ভাবা খুবই সহজ, কারণ শরীর আকারে একটি বড় জিনিস যা আমরা দেখতে পারি। কিন্তু এ-ধরনের কোনো জিনদের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া যারা ভিন্ন ভিন্ন’ শরীরে বাস করে আসলেই ডুবে থাকা হিমশৈলের উপরিভাগ মাত্র। জিনদের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার একটি বিশাল অংশ, যা বিবর্তনীয় স্থিতিশীল সেটের জিনদের মধ্যে সংগঠিত হচ্ছে– জিনপুল– সেটি একক সদস্যর শরীরে ‘অভ্যন্তরে’ ঘটে। এই সব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখা বেশ কঠিন, কারণ সেটি ঘটে কোষের মধ্যে, বিশেষ করে বিকাশমান ভ্রণের কোষে। সুসংগঠিতভাবে সৃষ্ট শরীরদের অস্তিত্ব আছে কারণ তারা বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল এক সেট স্বার্থপর জিনের সৃষ্টি।
কিন্তু আমাকে অবশ্যই পুরো প্রাণীদের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রসঙ্গে ফিরে আসতে হবে, যা এই বইয়ের মূল বিষয়। আগ্রাসন বোঝার জন্য, সুবিধাজনক একটি উপায় হলো প্রতিটি একক সদস্য প্রাণীকে স্বতন্ত্র স্বার্থপর মেশিন হিসাবে ভাবা। এই মডেলটি ভেঙ্গে পড়ে যখন সংশ্লিষ্ট একক সদস্যরা নিকটাত্মীয়– ভাই ও বোন, কাজিন, পিতামাতা ও সন্তান। এর কারণ তারা গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ পরিমান জিন ভাগাভাগি করে। সুতরাং প্রতিটি স্বার্থপর জিনের সেহেতু আনুগত্য ভাগ হয়ে যায় ভিন্ন ভিন্ন শরীরে। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা সেটি আলোচনা করবো।
নোটস (অধ্যায় ৫)
(১) আমি এখন কোনো একটি ‘ইএসএস’-এর মূল ধারণাটি আরো মিতব্যায়ীতার সাথে ব্যাখ্যা করতে চাই। “ইএসএস’ হচ্ছে একটি স্ট্রাটেজী যা এর নিজের অনুলিপিগুলোর বিপক্ষে ভালো করে। আর এর যৌক্তিকতা হচ্ছে এরকম। কোনো একটি সফল কৌশল হচ্ছে সেটি, যা জনগোষ্ঠীতে প্রাধান্য বিস্তার করে। সুতরাং এটি এর নিজের অনেক অনুলিপির মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা থাকবে। সেকারণে এটি তার সফলতা ধরে রাখতে পারবে না যদি সে তার নিজের অনুলিপিদের বিরুদ্ধে ভালোভাবে কাজ না করতে পারে। এই সংজ্ঞাটি মেনার্ড স্মিথ এর গাণিতিক সংজ্ঞার মত অতটা সুনির্দিষ্ট নয় আর এটি তার সংজ্ঞাকে প্রতিস্থাপিতও করতে পারবে না, কারণ আসলে এটি অসম্পূর্ণ। কিন্তু এর সেই গুণটি আছে, এটি ‘ইএসএস’ ধারণাটির সারসংক্ষেপকে সহজাত প্রবৃত্তিগত ধারণার মধ্যে ধারণ করতে পারে। ইএসএস’ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে চিন্তা করা এই অধ্যায়টি যে সময় লেখা হয়েছিল, সেই সময়ের তুলনায় এখন জীববিজ্ঞানীদের মধ্যে এটি নিয়ে আলোচনা ব্যাপক হারে বেড়েছে। মেনার্ড স্মিথ নিজেই ১৯৮২ সালে অবধি এই নতুন অগ্রগতিগুলোর পর্যালোচনা করেছিলেন তার Evolution and the Theory of Games বইটিতে। জিওফ্রে পার্কার, এই ধারণাটির আরেকজন প্রথম সারির প্রতিবেদক, সাম্প্রতিক সময়ের আরো কিছু ভাবনা নিয়েও লিখেছেন রবার্ট অ্যাক্সেলরড তার The Evolution of Cooperation বইয়ে, এটি ‘ইএসএস’-এর তত্ত্বটি ব্যবহার করেছে। কিন্তু আমি সেটা এখানে আলোচনা করবো না, কারণ এই বইয়ে আমার নতুন দুটি অধ্যায়ের একটি, Nice guys finish first মূলত অ্যাক্সেলরডের গবেষণাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। এই বইটির প্রথম সংস্করণের পরে আমার নিজের ESS সংক্রান্ত লেখা মূল একটি প্রবন্ধ Good Strategy or Evolutionarily Stable Strategy? এবং ডিগার ওয়াস্পদের নিয়ে একটি যৌথ প্রবন্ধ যা আমি নীচে আলোচনা করেছি।
