কিন্তু আরো উপায় আছে যেখানে কোনো একক সদস্যদের স্বার্থ ভিন্ন প্রজাতির সদস্যদের স্বার্থের সাথে তীব্রভাবে সাংঘর্ষিক হয়। যেমন, কোনো একটি সিংহ অ্যান্টিলোপের শরীর খেতে চায়, কিন্তু অ্যান্টিলোপদের তাদের শরীর নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিকল্পনা আছে। সাধারণত এটিকে কোনো সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা হিসাবে গণ্য করা হয়না কিন্তু যৌক্তিকভাবে এটিকে প্রতিযোগিতা হিসাবে না দেখতে পারাটা কিন্তু কঠিন। এখানে যে সম্পদের কথা বলা হচ্ছে সেটি হচ্ছে ‘মাংস’। সিংহের জিন ‘মাংস’ চাইছে খাদ্য হিসাবে তাদের সারভাইভাল মেশিনের জন্য। অ্যান্টেলোপের জিন ‘মাংস’ চাইছে তার শরীরের কাজের জন্য, এবং তার নিজের সারভাইভাল মেশিনের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য। মাংসের এই দুটি ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন, পারস্পরিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, সুতরাং সেখানে স্বার্থের সংঘাত আছে।
নিজের প্রজাতির সদস্যরাও মাংস দিয়ে তৈরী। তাহলে স্বজাতি ভক্ষণ বা ক্যানিবালিজম এত দূর্লভ কেন? আমরা যেমনটি দেখেছিলাম ব্ল্যাক হেডেড গালদের ক্ষেত্রে, পূর্ণবয়স্ক সদস্যরা মাঝে মাঝে সেখানে নিজেদের প্রজাতির শিশু সদস্যদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু তারপরও পূর্ণ বয়স্ক কোনো মাংসাশী প্রাণীকে সক্রিয়ভাবে খাদ্য বানানো ইচ্ছায় তার নিজের প্রজাতির কোনো পুর্ণবয়স্ক প্রাণীদের তাড়া করতে দেখিনা। কেন নয়? আমরা এখনও এত বেশী অভ্যস্ত প্রজাতির জন্য কল্যাণকর’ এই শর্তাধীন বিবর্তন সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ভাবতে যে, আমরা পায়শই খুবই যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন করতে ভুলে যাই, যেমন, ‘কেন সিংহরা তাহলে অন্য সিংহদের শিকার করেনা”? আরো একটি ভালো প্রশ্ন হচ্ছে জিজ্ঞাসা করা, যা কদাচিৎ আমরা জিজ্ঞাসা করি, সেটি হচ্ছে, পাল্টা আক্রমণ করার বদলে কেনই বা অ্যান্টিলোপরা সিংহ থেকে দৌড়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে?
কেন সিংহরা অন্য সিংহদের শিকার করেনা তার কারণ তাদের জন্য সেটি করা বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল স্ট্রাটেজী বা ‘ইএসএস’ হবে না। স্বজাতি-ভক্ষণ বা ক্যানিবলিজম কৌশল হবে খুব অস্থিতিশীল, সেই একই কারণে, আমাদের আগের উদাহরণে যে কারণে ‘হক’ কৌশলটি অস্থিতিশীল। কারণ পাল্টা আক্রমণে বিপদের আশংকা সেখানে অনেক বেশী। ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে এটি ততটা সত্যি না হবার সম্ভাবনা বেশী, সেকারণে অনেক বেশী প্রাণী, যারা শিকার হয় অন্য প্রাণীদের, তারা পালিয়ে বেড়ায় প্রতিআক্রমণ না করে। সম্ভবত এর উৎস হচ্ছে মূলত সেই বাস্তব সত্যটি, দুটি ভিন্ন প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত অপ্রতিসাম্যতা টিকে থাকে, যা একই প্রজাতির সদস্যেদের মধ্যে থাকা অসাম্যতার চেয়ে অনেক বেশী। যখনই কোনো প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী অসাম্যতা থাকে, ‘ইএসএস’ খুব সম্ভবত শর্তসাপেক্ষ কোনো কৌশল হয় যা অপ্রতিসাম্যতার উপর নির্ভর করে। কোনো কৌশল যেমন: “যদি আকারে ছোট, পালিয়ে যাও, যদি বড় আকারের, আক্রমণ করো’ এর সমতুল্য কোনো কৌশল বিবর্তিত হবার খুব সম্ভাবনা আছে ভিন্ন প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্বে, কারণ বহু ধরনের অসাম্যতা সেখানে বিদ্যমান। সিংহ আর অ্যান্টিলোপরা বিবর্তনীয় বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে এক ধরনের স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে, যা প্রতিযোগিতার মূল অপ্রতিসাম্যতাকে ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে আরো প্রকট করেছে। তারা তাদের কৌশল, যথাক্রমে, পিছু ধাওয়া ও পালিয়ে বাঁচার প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত দক্ষতা অর্জন করেছে। কোনো পরিবর্তিত (মিউট্যান্ট) অ্যান্টিলোপ, সিংহদের বিরুদ্ধে যে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পাল্টা আক্রমণ করার কোনো কৌশল গ্রহন করে, সে অপেক্ষাকৃত কম সফল হবে সেই অ্যান্টিলোপটি থেকে, যে কিনা সিংহকে দেখে দিগন্তের ওপারে দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
আমার একটি অনুমান যে, কোনো এক সময় আমরা অতীতের দিকে তাকিয়ে ‘ইএসএস’ ধারণাটির আবিষ্কারকে ডারউইনের পর বিবর্তন তত্ত্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসাবে দেখবো (৭)। এটি প্রযোজ্য সবক্ষেত্রে যেখানে আমরা স্বার্থের সংঘাত খুঁজে পাই এবং তারমানে প্রায় সব জায়গায়। প্রাণি-আচরণ বিদ্যায় শিক্ষার্থীদের ‘সামাজিক সংগঠনের মত কিছু নিয়ে আলোচনা করার অভ্যাস করতে হবে। প্রায়শই কোনো একটি প্রজাতির সামাজিক সংগঠনকে তাদের একটি একক সত্তা হিসাবে ভাবা হয়ে থাকে, যাদের নিজেদের জৈববৈজ্ঞানিক সুবিধা আছে। একটি উদাহরণ আমি ইতিমধ্যেই দিয়েছিলাম, সেটি হচ্ছে ‘ডমিনেন্স হায়ারার্কি’ বা ‘প্রাধান্য পরম্পরা। আমি বিশ্বাস করি এই গোপন গ্রুপ সিলেকশনবাদী ধারণাগুলোকে আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ জীববিজ্ঞানীদের বক্তব্যে আমরা পাই, যখন তারা সামাজিক সংস্থাগুলো নিয়ে কথা বলেন। মেনার্ড স্মিথের ‘ইএসএস’ এর ধারণাটি আমাদের সক্ষম করেছে, প্রথমবারের মত, স্পষ্টভাবে দেখাতে, কিভাবে একগুচ্ছ স্বতন্ত্র স্বাধীন স্বার্থপর সত্তাগুলো সুসংগঠিত একটি একক কোনো সত্তা সদশ আচরণ করতে পারে। আমি মনে করি প্রজাতির সামাজিক সংগঠনের মধ্যেই শুধুমাত্র এটি সত্যি নয়, বরং বহু প্রজাতি সম্বলিত কোনো ইকোসিস্টেম বা কমিউনিটিতেও এটি সত্যি। দীর্ঘমেয়াদীভাবে, আমি আশা করি, ‘ইএসএস’ ধারণাটি ইকোলজী বিজ্ঞানে বিপ্লবের সূচনা করবে।
