এ ধরনের আচরণগত অপ্রতিসাম্যতার সবচেয়ে সুস্পষ্ট উদাহরণ যা আমি জানি সেটি ব্যাখ্যা করেছিলেন বিখ্যাত প্রানি-আচরণ বিজ্ঞানী নিকো টিনবার্গেন, তাঁর উদ্ভাবনী ও বুদ্ধিমত্ত্বাময় সরলতার বৈশিষ্ট্যসূচক একটি পরীক্ষার মাধ্যমে (৪)। তিনি এজন্য দুটি পুরুষ স্টিকলব্যাক মাছকে একটি মাছের ট্যাঙ্কে রাখেন। পুরুষ মাছ দুটি প্রত্যেকেই একটি করে ঘর তৈরী করে সেই ট্যাঙ্কের দুই বিপরীত প্রান্তে, এবং প্রত্যেকে তার এলাকা প্রতিরক্ষা করে, তার নিজের বানানো ঘরের আশে পাশের এলাকাটি। এরপর টিনবার্গেন দুটি পুরুষ মাছকে আলাদা আলাদাভাবে একটি কাঁচের টিউবে রাখন, এবং তিনি এই দুটি টিউবকে একে অপরের পাশাপাশি রাখেন এবং লক্ষ করেন পুরুষ মাছ দুটি কাঁচের টিউবের মধ্য দিয়েই পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করার চেষ্টা করছে। এরপর আসে পরীক্ষার সবচেয়ে মজার অংশ, যখন তিনি এই দুটি টিউবকে পুরষ ‘ক’ মাছের ঘরের কাছে আনেন, ‘ক’ মাছটি আক্রমনাত্মক অবস্থান নেয় এবং ‘খ’ মাছটি পালাবার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন তিনি টিউব দুটি পুরষ ‘খ’ এর বাসার কাছে নিয়ে আছে, ঠিক বিপরীত জিনিসটি ঘটে। শুধুমাত্র দুটি টিউব ট্যাঙ্কের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত নাড়াবার মাধ্যমে, টিনবার্গেন দেখাতে পেরেছিলেন কোন পুরুষটি আক্রমণ করে আর কোনটি সেই যুদ্ধ থেকে সরে আসে। দুটি পুরুষই সেই সাধারণ শৰ্তমূলক কৌশলটি অবলম্বন করে, ‘যদি স্থানীয়, আক্রমণ, যদি অনুপ্রবেশকারী, পলায়ন।
জীববিজ্ঞানীরা প্রায়ই প্রশ্ন করেন, এই আঞ্চলিক প্রতিরক্ষার আচরণটির কি কিছু ‘জৈববৈজ্ঞানিক সুবিধা আছে? অসংখ্য মতামত ও প্রস্তাব আছে, তাদের কিছু পরে উল্লেখ করা হবে। কিন্তু আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি সেই প্রশ্নটাই আসলে বাহুল্য মাত্র হতে পারে। আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা হয়তো সাধারণভাবে একটি ‘ইএসএস’, যার উদ্ভব হয় কারণ সেখানে উপস্থিত হবার সময়ের অসাম্যতা যা সাধারণ কোনো এক টুকরো জায়গা দুটো একক সদস্যর সম্পর্ক নির্ধারণ করে।
প্রাণীদের আকার ও যুদ্ধ করার সাধারণ যোগ্যতা সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরনের খামখেয়ালী নয় এমন অপ্রতিসাম্যতার উদাহরণ হতে পারে। কোনো যুদ্ধে জেতার জন্য আকারে বড় হওয়া আবশ্যিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ নয়, কিন্তু সম্ভবত সেটি তাদের মধ্যে অন্যতম একটি কারণ। যদি সবসময়ই দ্বন্দ্বরত দুই সদস্যদের মধ্যে যে আকারে বড় সে জেতে এবং যদি প্রতিটি সদস্য জানে নিশ্চিভাবে যে সে তার প্রতিপক্ষ থেকে আকারে বড় কিংবা ছোট, সেখানে একটি কৌশলই অর্থবহ হয়: “আপনার বিপক্ষ আপনার চেয়ে যদি বড় হয়, তাহলে প্রস্থান করুন সেখান থেকে, শুধু আপনার চেয়ে আকারে ছোট এমন কারো সাথে যুদ্ধ করুন। কিন্তু বিষয়টি আরো খানিকটা জটিলতর হয় যদি আকারের গুরত্ব অপেক্ষাকৃতভাবে অনিশ্চিৎ থাকে। যদি কোনো বড় আকৃতি আপনাকে অল্প কিছু সুবিধা দেয়, যে কৌশল আমি এই মাত্র উল্লেখ করলাম, সেটি তখনও স্থিতিশীল। কিন্তু যদি গুরুতর আহত হবার ঝুঁকি বেশী থাকে, সেখানে হয় আরো একটি প্যারাডক্সিকাল স্ট্রাটেজী থাকতে পারে। সেটি হচ্ছে, আপনার চেয়ে যারা আকারে বড় তাদের বেছে নিন যুদ্ধ করার জন্য, এবং আপনার চেয়ে যারা আকারে ছোট তাদের থেকে দূরে পালান’! খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে কেন এটিকে ‘প্যারাডক্সিকাল’ আপাত স্ববিরোধী কৌশল বলা হচ্ছে, এটি সম্পূর্ণভাবে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের বিপরীত। যে কারণে এটি স্থিতিশীল হবে সেটি হচ্ছে এটি:কোনো একটি জনগোষ্ঠী যা পুর্ণ শুধুমাত্র প্যারাডক্সিকাল কৌশুলীদের দিয়ে, কেউ কখনো আঘাতপ্রাপ্ত হয় না। এর কারণ প্রতিটি প্রতিযোগিতায়, একজন প্রতিযোগী, যে বড়, সবসময় পালিয়ে যায়। গড়পড়তা আকারের কোনো ‘মিউট্যান্ট’, যে যুক্তিসঙ্গত কোনো স্ট্রাটেজী নিয়ে খেলে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের প্রতিপক্ষ বাছাই করে, সে তার দেখা হওয়া অর্ধেক সদস্যদের সাথে গুরুতরভাবে তীব্র হয়ে ওঠা যুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়ে। এর কারণ, যদি সে এমন কারো দেখা পায় তার চেয়ে আকারে ছোট, সে আক্রমণ করে, আকারে ছোট সদস্যরাও তীব্রভাবে এর প্রতি আক্রমণ করে, কারণ তিনি প্যারাডক্সিকাল খেলা খেলছেন; যদিও কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন কোনো কৌশুলীর প্যারাডক্সিকাল কৌশুলীর চেয়ে যুদ্ধে জেতায় বেশী সম্ভাবনা থাকে, তাসত্ত্বেও তার হারার বা গুরুতর আহত হবার বেশী সম্ভাবনা থাকে। যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী প্যরাডক্সিকাল, কোনো বুদ্ধিমান কৌশুলীর কোনো একজন প্যারাডক্সিকাল কৌশুলীর চেয়ে আহত হবার অপেক্ষাকৃত বেশী সম্ভাবনা থাকবে।
এমনকি যদিও কোন প্যারাডক্সিকাল স্ট্রাটেজী স্থিতিশীল হতে পারে, সেটি সম্ভবত অ্যাকাডেমিক ইন্টারেস্ট বা গবেষণা খাতিরে কৌতূহল জাগাতে পারে মাত্র। প্যারাডক্সিকাল যোদ্ধারা শুধুমাত্র গড়পড়তার বেশী পুরষ্কার পায় যদি তারা বুদ্ধিমানদের তুলনায় সংখ্যা অনেক বেশী হয়। খুব কঠিন কল্পনা করা যে, শুরুতেই কিভাবে এমন কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। এমনকি যদি সেটি হয়ও,প্যারাডক্সিকাল এর সাথে কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্নদের অনুপাত জনসংখ্যায় শুধুমাত্র কিছুটা কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্নদের দিকে সরে যেতে হবে অন্য ‘ইএসএস’ এর ‘আকর্ষণীয় জোনটিতে পৌঁছাতে, সেই ‘সেন্সিবল স্ট্রাটেজী। আকর্ষণের জোনটা হচ্ছে পপুলেশন অনুপাতের একগুচ্ছ অনুপাত যেখানে, এই ক্ষেত্রে কোনো সেন্সিবল কৌশুলীরা কিছু বাড়তি সুবিধা আছে, যখনই জনসংখ্যা এই জোনটিতে পৌঁছায়, এটি সাথে সাথেই অবশ্যম্ভাবীভাবে জনগোষ্ঠীর অনুপাতকে ‘সেনসিবল’ স্থিতিশীল গন্তব্য-বিন্দুর দিকে নিয়ে আসে। আসলেই খুব উত্তেজনার ব্যপার হতো, যদি প্রকৃতিতে প্যারাডক্সিকাল ‘ইএসএস’ এর উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যেত, কিন্তু আমার সন্দেহ আমরা কি আসলেই পারি এমন কিছু আশা করতে?(আমি মনে হয় বেশী তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছিলাম, এই শেষ বাক্যটি লেখার পর, অধ্যাপক মেনার্ড স্মিথ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, মেক্সিকোর একটি সামাজিক মাকড়শা প্রজাতি, ০ecobius civitas সংক্রান্ত জে. ডাবলিউ, বুরজেসের নিম্নে উল্লেখিত বিবরণটির প্রতি: ‘যদি একটি মাকড়শা কোনো কারণে বিরক্ত করা হয় এবং তার বিশ্রামের জায়গা থেকে তাকে বের করে দেয়া হয়, এটি দ্রুত পাথরের উপর দিয়ে সরে যায় এবং কোনো খালি খাজে লুকোনোর জায়গার অভাবে, সে হয়তো অন্য আরেকটি একই প্রজাতির মাকড়শার লুকোনোর জায়গায় আশ্রয় খুঁজতে পারে। যদি অন্য মাকড়শাটি সেখানে উপস্থিত থাকে, যখন এই অনুপ্রবেশকারী সেখানে প্রবেশ করে, সে কোনো প্রতি আক্রমণ করে না, বরং দ্রুত নিজেই সেখান থেকে সরে যায় এবং তার জন্য অন্য একটি আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করে। এভাবে একবার যখন প্রথম মাকড়শাকে বিরক্ত করা হয়, এই ধারাবাহিকভাবে একটি মাকড়শার জাল থেকে অন্য একটি মাকড়শার জালে এই অবস্থান পরিবর্তনের ধারাটা চলতে থাকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য। প্রায়ই যা সংখ্যাগরিষ্ঠ মাকড়শাকে একসাথে তাদের ঘর থেকে উৎখাত করে নতুন অজানা কোনো ঘরে আশ্রয় নেবার কারণ হয় (Social Spiders, Scientific American, March ১৯৭৬)}, আর ইতিপূর্বে উল্লেখ করা ধারণাটি অর্থে এটি প্যারাডক্সিকালই বটে (৫)।
