এই আত্মগত সলিলোকুই বা আত্মকথন হচ্ছে দেখানোর একটি উপায় যে, সিন্ধান্ত, সেটি যুদ্ধ করার জন্য বা না করার জন্যই হোক না কেন, আদর্শগতভাবে সিদ্ধান্তটি নেবার পুর্বে একটি জটিল, যদিও সচেতন পর্যায়ে না, ‘লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ থাকে। সম্ভাব্য উপকারিতার সবটুকু যুদ্ধ করার পক্ষে থাকে না, যদিও নিঃসন্দেহে কিছুটা অবশ্যই থাকে। একইভাবে, যুদ্ধের সময়, প্রতিটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যুদ্ধটির তীব্রতা বাড়ানো বা কমানো হবে কিনা, সেটিরও নীতিগতভাবে লাভ ক্ষতির ব্যাপার আছে, যা বিশ্লেষিত হয়। খানিকটা অস্পষ্ট একটি উপায়ে প্রানি-আচরণবিদরা বহুদিন ধরে বিষয়টি অনুধাবন করেছেন, তবে এই ধারণাটি স্পষ্ট আরো দৃঢ়ভাবে ব্যাখ্যা করার জন্যে প্রয়োজন হয়েছে একজন জন মেনার্ড স্মিথ-এর, যদিও প্রচলিত অর্থে যাকে প্রানি-আচরণবিদ হিসাবে গন্য করা হয় না। জি. আর. প্রাইস ও জি, এ. পার্কারের সহযোগিতায়, তিনি গণিতের একটি শাখার ব্যবহার করেছিলেন এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করতে, সেটি হচ্ছে: ‘গেম থিওরী। তাদের চমৎকার ধারণাগুলো কোনো ধরনের গাণিতিক সংকেত ছাড়াই তারা প্রকাশ করেছিলেন বোধগম্য ভাষায়, যদিও কিছু অনমনীয়তার বিনিময় মূল্যে।
যে মূল প্রয়োজনীয় ধারণাটি মেনার্ড স্মিথ উপস্থাপন করেছিলেন, সেটি হচ্ছে evolutionarily stable strategy (ESS) বা ‘বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল কৌশল (ইএসএস)-এর ধারণা। তার এই ধারণাটির উৎস আরো আগে ডাবলিউ. ডি. হ্যামিলটন ও আর. এইচ, ম্যাকআর্থারের প্রস্তাবিত কিছু ধারণা। একটি কৌশল’ বা ‘স্ট্রাটেজী’ হচ্ছে আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা আচরণ নীতিমালা। একটি স্ট্রাটেজীর উদাহরণ যেমন, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করো। যদি সে পালায়, তার পিছু ধাওয়া করো, যদি সে প্রতি আক্রমণ করে, তাহলে পালিয়ে আসো। এখানে মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা কিন্তু এমন কোনো স্ট্রাটেজীর কথা বলছি না, সচেতনভাবে কোন একক সদস্য হিসাব নিকাশ করে যে স্ট্রাটেজী বা কৌশলে উপনীত হয়েছে। মনে রাখবেন আমরা প্রাণীদের দেখছি রবোট সারভাইভাল মেশিনের মত, যাদের একটি আগেই প্রোগ্রাম করা কম্পিউটার আছে যা তাদের মাংসপেশীর সংকোচন নিয়ন্ত্রণ করছে। এই কৌশলটি একগুচ্ছ সাধারণ নির্দেশনা হিসাবে ইংরেজীতে লেখাটি বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবার জন্য শুধুমাত্র সুবিধাজনক একটি উপায় মাত্র। কিছু অনির্দিষ্ট অজানা প্রক্রিয়ায় কোনো প্রাণী আচরণ করে এমনভাবে যেন মনে হয় তারা এই সব নির্দেশাবলী অনুসরণ করছে।
কোনো একটি evolutionarily stable strategy বা ESS (ইএসএস)-কে সংজ্ঞায়িত করা হয় এমন কোনো একটি স্ট্রাটেজী হিসাবে, যদি কোনো একটি জনগোষ্ঠীর বেশীর ভাগ সদস্যরা এটিকে গ্রহন করে মেনে নেয়, এবং এর চেয়ে উত্তম কোনো বিকল্প স্ট্রাটেজী দিয়ে এটি প্রতিস্থাপিত হবার নয় (১)। এটি খুব সুক্ষ্ম আর গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা। আরেকভাবে এটি বলা যেতে পারে, কোনো একক সদস্যের জন্যে সেরা স্ট্রাটেজীটি হচ্ছে তার জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা যা করছে সেটি করা। যেহেতু জনগোষ্ঠীর বাকী সদস্যরা একক সদস্য দিয়ে তৈরী, প্রত্যেকেই তাদের সাফল্য সর্বোচ্চ করতে আগ্রহী, শুধু একটি কৌশল যা টিকে থাকবে সেটি, একবার বিবর্তিত হবার পর, আর কোনো ভিন্নপন্থী সদস্যর অবলম্বনকৃত কৌশল দিয়ে উন্নতিকরণ সম্ভব না। কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত পরিবর্তনের পরে বিবর্তনীয় অস্থিতিশীলতার একটি সংক্ষিপ্ত পর্ব থাকে, হয়তো এমনকি দ্রুত কৌশল পরিবর্তন করা একটি দোদুল্যমানতা জনসংখ্যায় লক্ষ করা যায়। কিন্তু একবার যখন একটি ‘ইএসএস’ অর্জিত হয়, এটি টিকে থাকে, এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন এর থেকে কোনো বিচ্যুতিকে শাস্তি দেয় এবং আনুকুল্যতা বর্জন করে।
এই ধারণাটিকে আগ্রাসী আচরণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে মেনার্ড স্মিথ সরলতম হাইপোথেটিকাল কেসগুলোর একটিকে বিবেচনা করুন। ধরুন, কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিতে শুধুমাত্র দুই ধরনের যুদ্ধ করার কৌশল বিদ্যমান, কৌশল দুটির নাম ‘হক’ এবং ‘ডোভ’ (hawk ও dove) : এই নামগুলো যে পাখিদের নাম থেকে নেয়া হয়েছে এখানে তাদের বৈশিষ্ট্য ও আচরণ সম্বন্ধে মানুষের প্রচলিত ধারণার কোনো সম্পর্ক কিন্তু নেই। (ডোভরা বাস্তবিকভাবেই বেশ আগ্রাসী আচরণের একটি পাখি)। আমাদের কল্পিত জনগোষ্ঠীর যেকোনো একক সদস্যকে শ্রেণীভুক্ত করা হয়, ‘হক’ অথবা ‘ডোভ’ হিসাবে। ‘হকরা সবসময় লাগামছাড়াভাবেই যুদ্ধ করে, তাদের পক্ষে যতটা শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করা সম্ভব ততটাই তীব্রভাবে। ‘ডোভরা’ শুধু প্রচলিত উপায়ে সম্মানজনকভাবে হুমকি দেয়, কখনো কাউকে আঘাত করে না। যদি কোনো ‘হক’, কোনো ‘ডোভের সাথে যুদ্ধ করতে আসে ‘ডোভ’ দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায় সুতরাং কখনোই আহত হয় না। যদি কোনো ‘হক’ আরেকটি ‘হকের সাথে যুদ্ধ করে তারা সেই যুদ্ধ থামায় না যতক্ষণ না পর্যন্ত কেউ মারা না যায় বা খুব ভয়ঙ্করভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। যদি কোন ‘ডোভের আরেকটি ‘ডোভের সাথে সাক্ষাৎ হয়, সেখানে কেউই আহত হয়না, তারা একে অপরকে ভয় দেখায় নানা ভঙ্গিমা করে অনেকক্ষণ ধরে, যতক্ষণ না একজন ক্লান্ত হয়ে পড়ে বা সিদ্ধান্ত নেয়। এসব করার আর কোনো মানে নেই, সুতরাং সে পিছু হটে আসে। আপাতত কিছু সময়ের জন্য আমরা ধরে সেই, কোনো একটি একক সদস্যর পক্ষে কোনোভাবেই আগে থেকে বলা সম্ভব না, যে বিশেষ প্রতিদ্বন্দীর মুখোমুখি সে দাঁড়িয়ে, সে কি ‘হক’ নাকি একটি ডোভ’। তার জন্যে এটি জানার উপায় হচ্ছে তার সাথে যুদ্ধ করা, এবং সেই নির্দিষ্ট সদস্যটির সাথে তার কোনো অতীত যুদ্ধের স্মৃতি নেই, কৌশল নির্ধারণে যা কিনা তাকে সহায়তা করতে পারতো।
