প্রাণীদের আগ্রাসী আচরণের সংযত ও আনুষ্ঠানিক এই ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে। বিশেষ করে, পুরোনো বেচারা Homo sapiens হচ্ছে একমাত্র প্রজাতি, যারা কিনা তাদের স্বজাতিদের হত্যা করে, কেইনের কলঙ্কের একমাত্র উত্তরাধিকারী এবং ইত্যাদি, নানা নাটুকে অভিযোগে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা অবশ্যই ভুল। একজন প্রকৃতিবিদের প্রাণীদের আগ্রাসনে সহিংসতা বা সংযম বিষয়ক দাবী আংশিক নির্ভর করছে কি ধরনের প্রাণীদের নিয়ে তিনি। গবেষণা করছেন এবং আংশিকভাবে নির্ভর করে তার বিবর্তনীয় পূর্বধারণার উপর– তবে যাই হোক না কেন, লরেন্জ, সর্বোপরি, ‘প্রজাতির সবার জন্য কল্যাণ’ ঘরানার মানুষ। এমনকি যদিও বিষয়টিকে নিয়ে অতিশয়োক্তিও করা হয়, মনে হতে পারে ‘দস্তানা’ পরে মুষ্টিবদ্ধ হাতে প্রাণীদের সংযত দ্বন্দ্বের দৃষ্টিভঙ্গিটির ন্যূনতম পর্যায়ে কিছুটা সত্যতা আছে। উপরিভাবে এটি দেখতে এক ধরণের পরার্থদের মত। আর ‘স্বার্থপর জিন’ তত্ত্বটিকে অবশ্যই সেটি ব্যাখ্যা করার কঠিন কাজটির মুখোমুখি হতে হবে। কেনই বা সব প্রাণীরা সুযোগ পাওয়া মাত্রই তাদের প্রজাতির প্রতিদ্বন্দ্বী সদস্যদের হত্যা করছে না?
এই প্রশ্নটির সাধারণ উত্তর হচ্ছে এধরনের সরাসরি দ্বন্দ্বপ্রিয়তার মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতির সুবিধা যেমন আছে, তেমনি শুধুমাত্র সময় আর শক্তি ব্যবহার করা সুস্পষ্ট মূল্য ছাড়াও আরো অনেক বিনিময় মূল্য পরিশোধও করতে হয়। যেমন, মনে করুন যে ‘খ’ এবং “গ” দুজনেই আমার প্রতিদ্বন্দ্বী, ঘটনাচক্রে আগে ‘খ’ এর সাথে আমার আগে দেখা হয়, একজন স্বার্থপর সদস্য হিসাবে আমার জন্য বোধগম্য একটি ব্যাপার হবে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করা। কিন্তু না অপেক্ষা করুন। ‘গ’ ও কিন্তু আমার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ‘গ’ আবার ‘খ’ এরও প্রতিদ্বন্দ্বী। ‘খ’ কে হত্যা করার ফলশ্রুতি হবে, আমি ‘গ’ এর জন্য সম্ভাব্য ভালো একটি কাজ করছি, তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে একজনকে সরিয়ে ফেলে। আমি হয়তো ভালো করতাম ‘খ’ কে বাঁচার সুযোগ দিয়ে, সে হয়তো তারপর ‘গ’ এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা ও যুদ্ধ করতে, এবং সেভাবে আমাকে পরোক্ষভাবে সুবিধা দিতো। এই সাধারণ হাইপোথেটিকাল উদাহরণের মূল নীতিবাক্যটি হচ্ছে, নির্বিচারে প্রতিন্দীদের হত্যা করার চেষ্টা করায় সুস্পষ্টভাবে কোনো উপকারিতা নেই। বিশাল ও জটিল প্রতিদ্বন্দ্বীতারপুর্ণ কোনো পদ্ধতিতে, কোনো একটি প্রতিদ্বন্দ্বীকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দিলে আবশ্যিকভাবে সেটি কোনো উপকারী পদক্ষেপ নয়: সেখানে অন্য প্রতিদ্বন্দীদের এমনকি তার নিজের চেয়ে আরো বেশী সুবিধা পাবার সম্ভাবনা আছে। এই ধরনের একটি কঠিন শিক্ষা বহু দিন আগেই পেয়েছেন পেষ্ট-কন্ট্রোল অফিসাররা। ধরুন আপনাকে গুরুতর সমস্যা দিচ্ছে কৃষিকাজের জন্য ক্ষতিকর কোন একটি পতঙ্গ, এবং তাদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেবার জন্য আপনি একটি ভালো উপায় আবিষ্কার করলেন। এবং খুব আনন্দের সাথে আপনি কাজটিও করলেন। এবং আপনি এরপরই আবিষ্কার করলেন যে মানুষের কৃষিকাজের চেয়ে এই নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়ায় লাভবান হয়েছে অন্য কোন একটি ক্ষতিকর পতঙ্গ। আর আপনার অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ।
আবার অন্যদিকে, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বীদের খানিকটা বৈষম্যমূলক উপায়ে হত্যা বা ন্যূনতম পর্যায়ে যুদ্ধ করা একটি ভালো পরিকল্পনা মনে হতে পারে। যদি ‘খ’ কোনো একটি এলিফ্যান্ট সীল হয়, যার বহু স্ত্রী এলিফেন্ট সীল এর একটি বিশাল হারেম আছে এবং যদি আমি, আরেকটি এলিফ্যান্ট সীল, তাকে হত্যা করে তার হারেমটির দখল নিতে পারি, সেটি করার চেষ্টা করাটা আমার জন্য ভালো হবে। কিন্তু এর সাথে যুক্ত ঝুঁকি ও মূল্য পরিশোধের ব্যাপার আছে, এমনকি যখন এই দ্বন্দ্বপ্রিয়তা সুনির্দিষ্ট কারো প্রতি নির্দিষ্ট। আর ‘খ’ এর জন্য সুবিধাজনক অবস্থানটি হবে তার মূল্যবান সম্পদ রক্ষা করার উদ্দেশ্যে এর উপরে আক্রমনের প্রতি আক্রমণ করা। যদি আমি যুদ্ধ শুরু করি, সেই যুদ্ধে তার কিংবা আমার মারা যাবার খুবই সম্ভাবনা আছে। হয়তো আমার মারা যাবার সম্ভাবনা খানিকটা বেশী। তার কাছে আছে মূল্যবান সম্পদ, আর সে কারণে আমি তার সাথে যুদ্ধ করতে চাইছি। কিন্তু সে কিভাবে সেই সম্পদের অধিকারী হয়েছিল? হয়তো কোনো যুদ্ধে সেটি সে জয় করেছিল, নিশ্চয়ই আমার আগে অন্য আরো চ্যালেঞ্জকারীদের সে যুদ্ধে হারিয়েছে। সম্ভবত সে খুব ভালো যুদ্ধ করতে পারে। এমনকি যদি আমি যুদ্ধে জিতি এবং হারেমটির উপর আমার কর্তৃত্ব স্থাপন করি, আমি সেই যুদ্ধে এতটাই আহত, ক্ষতবিক্ষত হতে পারি যে, আমি হয়তো আমার জয়ের সেই সুফলটি ভোগ করতে পারবো না। এছাড়া যুদ্ধ করতে সময় ও শক্তির খরচ হয়। হয়তো আপাতত কিছু সময়ের জন্য সেই শক্তিটা সঞ্চয় করতে পারি, যদি আমি খাওয়ায় ও সব ধরনের বিপদজনক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলি কিছু সময়ের জন্য, তাহলে আমি আকারে আরো বড় ও শক্তিশালী হবে। এবং আমি কোনো না কোনো এক সময় তার হারেম দখলের জন্য তার সাথে যুদ্ধ করবো ঠিকই কিন্তু আমার হয়তো জেতার ভালো সম্ভাবনা থাকে যদি আমি খানিকটা সময় অপেক্ষা করি, এক্ষুনি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে।
