এই অধ্যায়টি মূলত বহু ভুল বোঝা একটি বিষয়, আগ্রাসন সংক্রান্ত। আমরা প্রতিটি একক সদস্যকে স্বার্থপর মেশিন হিসাবে মনে করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবো, তাদের ধারণকৃত জিনের সর্বোপরি যেন ভালো হয় এমন সবকিছু করার জন্য যাদের প্রোগ্রাম করা হয়েছে। ব্যাখ্যার সুবিধার জন্যই এই ভাষার ব্যবহার। এই অধ্যায়ের শেষে আবার আমরা একক জিনের ভাষায় ফিরে আসবো।
একটি সারভাইভাল মেশিনের জন্য অন্য একটি সারভাইভাল মেশিন (যে তার নিজের সন্তান নয় বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয়ও নয়) তার পরিবেশের একটি অংশ, একটি পাথর অথবা নদী বা এক টুকরো খাদ্যের মত। এটি এমন কিছু যা তার পথে বাধা হতে পারে বা এমন কিছু যাকে নিজের সার্থে ব্যবহার করা যেতে পারে। কোনো একটি পাথর বা নদী থেকে এটি ভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে: এর পাল্টা আক্রমণ করার প্রবণতা আছে। এর কারণ এটি একটি যন্ত্র, ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষা করবে বলে যা এর অমর জিনকে ধারণ করে এবং এটিও তাদের সুরক্ষা করার জন্য কোন কিছু করতে পিছপা হয়না। প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই সব জিনগুলোকে আনুকুল্য দেয়, যা তাদের সারভাইভাল মেশিনদের নিয়ন্ত্রণ করে এমনভাবে যে, তারা তাদের পরিবেশের সর্বোত্তম ব্যবহার করে। আর একই এবং ভিন্ন প্রজাতির অন্যান্য সারভাইভাল মেশিনদের সর্বোত্তম ব্যবহার করার প্রচেষ্টা তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে সারভাইভাল মেশিনগুলো পরস্পরের জীবনে খুব কমই হস্তক্ষেপ করে বলে মনে হয়, যেমন মোল আর ব্ল্যাকবার্ডরা পরস্পরকে খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করেনা, তারা নিজেদের মধ্যে প্রজনন করে না বা বসবাসের জায়গার জন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেনা। এমনকি তারপরও, তাদের পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভাবা অবশ্যই আমাদের উচিৎ হবেনা। তারা হয়তো অন্য কোনো কিছুর জন্য দ্বন্দ্বরত, হয়তো মাটিতে থাকা কেঁচোদের জন্য। এর মানে এই না যে, আপনি কখনো এমন কোনো দৃশ্য দেখবেন যেখানে একটা মোল ও একটা ব্ল্যাকবার্ড, একটা কেঁচোর জন্যে দড়ি টানাটানি করছে। আসলেই এমনও হতে পারে কোন একটি ব্ল্যাকবার্ড তার জীবনে কখনোই হয়তো কোনো মোলের সাথে দেখা হবার সুযোগ পায় না। কিন্তু যদি আপনি মোলদের জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন, সেই ঘটনাটির একটি নাটকীয় প্রভাব পড়বে ব্ল্যাকবার্ডদের জীবনে। যদিও আমি বিস্তারিতভাবে খুঁটিনাটি কি হতে পারে বা কতটা ঘুরপথে পরোক্ষভাবে সেটি ঘটে, তা অনুমান করার কোনো ঝুঁকি নেবো না।
ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির সারভাইভাল মেশিনগুলো নানা বিচিত্র উপায়ে একে অপরকে প্রভাবিত করে। তারা হতে পারে শিকারী প্রাণী বা শিকার হওয়া কোনো প্রাণী, পরজীবি বা তাদের পোষক, কোনো দুষ্প্রাপ্য সম্পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা স্বার্থের কারণে ব্যবহৃত হতে পারে বিশেষ বিশেষ উপায়ে, যেমন, যখন মৌমাছিদের তাদের পরাগরেণুর বাহক হিসাবে ব্যবহার করে ফুল। একই প্রজাতির সারভাইভাল মেশিনগুলো পরস্পরের জীবনে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব ফেলে আরো। এবং এটি হয় বহু কারণে। একটি কারণ হচ্ছে, কারো নিজের প্রজাতির অর্ধেক হতে পারে তার সম্ভাব্য প্রজনন সঙ্গী এবং সম্ভাব্য কঠোর-পরিশ্রমী আর সার্থের জন্য ব্যবহারযোগ্য, কোনো সন্তানদের পিতামাতা। আরেকটি কারণ হচ্ছে যে, একই প্রজাতির সদস্যরা, পরস্পরের সদৃশ্য, একই ধরনের জায়গায় তাদের জিন সুরক্ষা করা, একই ধরনের জীবনাচরণসহ, জিন সংরক্ষণের মেশিন হবার কারণে সুনির্দিষ্টভাবে তারা জীবন ধারণের জন্যে প্রয়োজনীয় সম্পদের জন্য তারা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী।
কোনো একটি ব্ল্যাকবার্ডে জন্যে একটি মোল হয়তো প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে অন্য একটি ব্ল্যাকবার্ড যতটা গুরুত্বপূর্ণ, মোল তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে কিছুই না। মোল আর ব্ল্যাকবারা হয়তো খাদ্য হিসাবে কেঁচোর জন্য দ্বন্দ্বরত, কিন্তু ব্ল্যাকবার্ডরা কেঁচোসহ আরো প্রয়োজনীয় সব সম্পদের জন্য নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বরত। যদি তারা একই লিঙ্গের সদস্য হয়, তারা হয়তো প্রজনন সঙ্গী পাওয়ার জন্যে দ্বন্দ্বরত। আমরা পরে জানতে পারবো কিছু কারণে, সাধারণত পুরুষরা স্ত্রী-সঙ্গী পাওয়ার জন্যে পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্ব করে। এর অর্থ পুরুষরা হয়তো তাদের জিনদের কোনো উপকার করে, যদি সে এমন কিছু করে যা তার সাথে দ্বন্দ্বরত কোনো পুরুষ সদস্যদের প্রতি ক্ষতিকর হিসাবে প্রতীয়মান হয়।
একটি সারভাইভাল মেশিনের জন্যে যুক্তিসঙ্গত নীতি সুতরাং হয়তো হতে পারে এর প্রতিদ্বন্দ্বীদের হত্যা করা এবং তারপর, বরং তাদের খাওয়া। যদিও হত্যা ও স্বজাতি ভক্ষণের ব্যপারটি প্রকৃতিতে ঘটে, কিন্তু সেই অর্থে তেমন ঘটনা খুব সচরাচর ঘটতে দেখা যায় না, যেমন, স্বার্থপর জিনতত্ত্বের অতি সরল কোনো ব্যাখ্যা হয়তো পূর্বধারণা করতে পারে। আসলেই কনরাড লরে, তার On Aggression বইয়ে, প্রাণীদের দ্বন্দ্বের সংযত, ভদ্রোচিত প্রকৃতির উপর জোর দিয়েছিলেন। তার মতে প্রাণীদের মধ্যে যুদ্ধে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে সেগুলো আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতার কোনো। মত হয়, মুষ্টিযুদ্ধ কিংবা তলোয়ার লড়াইয়ের মত, যা কিছু নিয়ম মেনে চলে। প্রাণীরা যুদ্ধ করে হাতে ‘দস্তানা’ পরে বা ‘ভোতা” তলোয়ার ব্যবহার করে। সেখানে ভয় দেখানো বা ধোকা দিয়ে বোকা বানানো সব কিছু ঘটে তীব্র আন্তরিকতার সাথে। পরাজয় মেনে নেবার ভঙ্গিমা শনাক্ত করতে পারে বিজেতা, যিনি তারপর সংযত থাকেন কোন মরন আক্রমণ বা কামড় দেয়া থেকে, যা আমাদের সরল তত্ত্বটি হয়তো পূর্বধারণা করতে পারে।
