এ-পর্যন্ত হামফ্রের যুক্তি আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। তিনি আরো যুক্তি দেন, এই ‘ইনার আই’ কাজ করে আত্ম-সমীক্ষার উপর নির্ভর করে। প্রতিটি প্রাণী নিজের ভিতরে তাকায় তার নিজেদের অনুভূতি আর আবেগের প্রতি, অন্যদের অনুভূতি আর আবেগকে বোঝার জন্য। মনোজাগতিক অঙ্গ কাজ করে আত্ম সমীক্ষার মাধ্যমে। আমি নিশ্চিৎ না বিষয়টিতে একমত কিনা যে এটি আমাদের সচেতনাকে বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু হামফ্রে খুবই চমৎকার লেখক, এবং তার বই জোরালো আবেদন রেখেছে সেটি বোঝাতে।
(৫) মাঝে মাঝে অনেকেই খুবই বিচলিত হয়ে ওঠেন পরার্থবাদীতার ‘জন্য’ জিনদের বিষয়ে বা আপতদৃষ্টিতে তাদের জটিল আচরণ নিয়ে। তারা (ভুল ভাবে) ভাবেন কিছু ক্ষেত্রে আচরণের এই জটিলতা অবশ্যই নিহিত আছে একটি জিনের ভিতরে। কিভাবে পরার্থবাদীতার জন্য একটি একক জিন থাকতে পারে, তারা জানতে চান, যখন কোনো জিনের কাজ শুধু একটি প্রোটিন অনু তৈরীর সংকেত বহন করা? কিন্তু কোনো কিছুর জন্যে’ জিন এইভাবে কোন কথা বলা যা বোঝায়, তা হলো জিনটিতে কোনো ‘পরিবর্তন অন্য কোথাও কোনো পরিবর্তনের কারণ হবে। একটি জিনগত ‘পার্থক্য, কোষের অণুদের কোনো বিশেষ কিছু পরিবর্তন করার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই জটিল জণবিকাশ প্রক্রিয়ায় কোনো পার্থক্যের সৃষ্টি করে এবং সেভাবেই, বলা যায়, আচরণের পরিবর্তন করে।
যেমন, পাখিদের মধ্যে ভাতৃসূলভ পরার্থবাদীতার জন্য একটি পরিবর্তিত জিন অবশ্যই নিঃসন্দেহে এককভাবে একটি সম্পূর্ণ নতুন জটিল আচরণে জন্য দায়ী হবে না। বরং এটি ইতিমধ্যে অস্তিত্ব আছে সম্ভবত জটিল এমন কোনো আচরণের প্যাটার্ন পরিবর্তন করবে। এই ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পূর্বসূরি কারণ হচ্ছে পিতামাতার আচরণ। পাখিদের নিয়মিতভাবে জটিল স্নায়বিক অঙ্গাণুর দরকার হয় তাদের নিজেদের সন্তানের প্রতিপালন ও খাদ্য সরবরাহের জন্যে। এটি, আবার, বহু প্রজন্ম ধরে ধীর ধাপে ধাপে তৈরী হয় পূর্বসূরি থেকে তার নিজের স্নায়ুতন্ত্র অবধি। (ঘটনাচক্রে ভাতৃসূলভ পরার্থবাদী জিনদের নিয়ে সন্দেহবাদীরা প্রায়শই তাদের মনস্থির করতে পারেন না। কেন তারা আগে একই রকম সংশয় প্রকাশ করেনা পিতামাতার প্রতিপালনের সমপরিমান জটিল আচরণটির ক্ষেত্রে?)। আগে থেকে বিদ্যমান আচরণের প্যাটার্ন– এই ক্ষেত্রে বাবা-মার সন্তান প্রতিপালন– মধ্যস্ততা করবে একটি সুবিধাজনক গড়পড়তা নিয়ম রা রুল অব থাম্ব। যেমন, নীড়ের মধ্যে সব জোরে জোরে চিৎকার করা আর মুখ হা করে থাকা জিনিসগুলো খাওয়াতে হবে। ছোট ভাইবোনদের খাওয়ানোর জন্য জিনটিও কাজ করতে পারে, তারপর, বয়স তরান্বিত করা, যে বয়সে এই গড়পড়তা নিয়মটি পুরোপুরি পূর্ণতা পায়। কোনো পাখির ছানা যে ভাতৃপ্রতিম জিনটা বহন করে একটি নতুন মিউটেশন হিসাবে, সেটি শুধুমাত্র পিতামাতার সেই গড়পড়তা নিয়মটাকেই অন্যান্য পাখিদের তুলনা একটু আগে সক্রিয় করে তোলে। এটিও তারা বাবা-মার নীড়ে ‘চিৎকার করা, মুখ হা করে থাকা সদস্যদের’– তার ছোট ভাই ও বোনরা –যেমন, তারা যেন তার নিজের নীড়ে হা করে খেতে চাওয়া জিনিসগুলো– তার নিজের সন্তান। নতুন হওয়া তো অনেক দুরের কথা, জটিল আচরণগত কিছু নতুনত্ব, ভাতৃপ্রতিম আচরণ উদ্ভব হবে একটুখানি ভিন্ন ইতিমধ্যে বিদ্যমান আচরণ বিকশিত হবার একটি সামান্য প্রকরণ হিসাবে। প্রায়ই যা ঘটে, ফ্যালাসি বা ভ্রান্ত ধারণার জন্ম হয় যখন আমরা অত্যাবশ্যকীয় ধীর গতিতে ধাপে ধাপে বিবর্তন হবার কথাটি ভুলে যাই। বাস্তব সত্যটি যে অভিযোজনীয় বিবর্তন অগ্রসর হয় ক্ষুদ্র, ধাপে ধাপে আগে থেকেই বিদ্যমান কোনো গঠন বা আচরণকে পরিবর্তন করার মাধ্যমে।
(৬) যদি মূল বইটির কোনো পাদটীকা থাকতো, তাদের একটি নিবেদিত হতো ব্যাখ্যা করতে যেমন রোথেনবুহলার নিজেই খানিকটা সতর্কতার সাথে করেছিলেন, মৌমাছিদের নিয়ে গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয়। অনেক কলোনির মধ্যে যাদের, এই তত্ত্বানুযায়ী, ‘হাইজিনিক’ আচরণ দেখানোর কথা ছিল না, তাসত্ত্বেও তাদের একটি সেই আচরণটি প্রদর্শন করেছিল। রোথেনবুহলারের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, “আমাদের এই ফলাফলটি অস্বীকার করা উচিৎ নয়, কিন্তু আমরা আমাদের জেনেটিক হাইপোথিসিসের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করেছি অন্য উপাত্ত। অ্যানোলোমাস বা স্বাভাবিক নয় এমন কোনো কলোনি কোনো একটি মিউটেশন সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে, যদিও এর সম্ভাবনা খুব কম।
(৭) প্রাণীদের কমিউকেশন বা সংযোগের বিষয়টি এমনভাবে আলোচনা করার জন্য আমি এখন অসন্তুষ্ট বোধ করছি। জন ক্রেবস এবং আমি দুটি প্রবন্ধে এই বিষয়ে যুক্তি দিয়েছিলাম যে বেশীর ভাগ প্রাণীদের সংকেত যেমন কোনো তথ্য সমৃদ্ধ ভাবা ঠিক না তেমনি তাদের ছলনাপূর্ণ হিসাবে না দেখাটাই উত্তম, বরং দেখা উচিৎ ম্যানিপুলেটিভ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় হিসাবে। কোনো একটি সংকেত হচ্ছে এমন কোনো উপায় যার মাধ্যমে একটি প্রাণী অন্য আরেকটি প্রাণীর মাংসপেশীর শক্তি ও ক্ষমতা ব্যবহার করে। কোনো একটি নাইটিঙ্গলের গান তথ্যপূর্ণ নয়, এমনকি কোনো ছলনাপুর্ণ তথ্য নয়, এটি প্ররোচনা দিতে পারে, মন্ত্রমুগ্ধ করে, হতবাক করে দেবার মত স্বর তৈরী করার ক্ষমতা দিয়ে। এই ধরনের যুক্তি এর যুক্তিসঙ্গত উপসংহার অবধি আলোচিত হয়েছে The Extended Phenotype বইটিতে, যার কিছুটা অংশ আমি সংক্ষিপ্ত আকারে সংযুক্ত করেছি এই বইয়ের ১৩ তম অধ্যায়ে। ক্রেবস ও আমি যুক্তি দিয়েছিলাম যে, সংকেত বিবর্তিত হয় আমরা যাকে বলি মানসিকতা পড়া এবং সেটি নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা, এই দুটি প্রক্রিয়ার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়। প্রাণীদের সংকেত বা যোগাযোগের পুরো বিষয় নিয়ে একটি বিস্ময়কর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে। জীববিজ্ঞানী আমেজ জাহাভীর দৃষ্টিভঙ্গি। অধ্যায় ৯ এর একটি নোটে আমি জাহাভীর দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করেছি আরো সহানুভূতির সাথে, এই বই এর প্রথম সংস্করণে আমি যেভাবে করেছিলাম, তার চেয়ে বেশী।
০৫. আগ্রাসন: স্থিতিশীলতা এবং স্বার্থপর মেশিন
অধ্যায় ৫: আগ্রাসন: স্থিতিশীলতা এবং স্বার্থপর মেশিন
