আমি এখন অন্যান্য কিছু প্রাসঙ্গিক ধারণা নিয়ে আলোচনা করবো, যা আমাদের কম্পিউটার বিজ্ঞান থেকে আমদানী করতে হবে, সিরিয়াল এবং প্যারালেল প্রসেসরের ধারণা।আজকের ডিজিটাল কম্পিউটারগুলো মূলত সব সিরিয়াল প্রসেসর। তাদের একটি কেন্দ্রীয় ক্যালকুলেটিং ‘মিল আছে, একটি একক ইলেকট্রনিক বটলনেক, প্রক্রিয়াকরণ হতে যার মধ্য দিয়ে সব উপাত্তকে অতিক্রম করতে হয়। তারা একই সাথে বহু কাজ করছে বলে একটি বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে, কারণ তারা খুবই দ্রুতকাজগুলো করছে। একটি সিরিয়াল কম্পিউটার হচ্ছে একটি দাবার মাস্টারের মত যে ‘একই সাথে বিশ জনের বিপক্ষে খেলছে কিন্তু আসলে সে একে পর একজনের কাছে যাচ্ছে, রোটেশন করে। আসল কোনো দাবার মাস্টারের সাথে পার্থক্য হচ্ছে, কম্পিউটার এত দ্রুত তাদের অবস্থান পরিবর্তন এবং এত শান্তভাবে এর কাজগুলো সম্পাদন করে যে, প্রতিটি মানব ব্যবহারকারীর একটি বিভ্রম হয় যে, সে একাই কম্পিউটারের একচ্ছত্র মনোযোগ পাচ্ছে। মৌলিকভাবে যদিও, কম্পিউটার ধারাবাহিকভাবে এর ব্যবহারকারীদের সময় দিচ্ছে।
সম্প্রতি আরো বেশী দক্ষ কম্পিউটার, আরো বেশী দ্রুতগতির সৃষ্টি করার প্রচেষ্টায় প্রকৌশলীরা আসলেই সত্যিকারভাবে প্যারালাল প্রসেসিং মেশিন সৃষ্টি করেছে। এরকম একটি হচ্ছে এডিনবরা সুপারকম্পিউটার, যা সম্প্রতি দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম আমি। এটি মূলত সমান্তরালভাবে সাজানো কয়েকশ ‘ট্রান্সপিউটার’, যাদের প্রত্যেকেই তাদের ক্ষমতায় সমসাময়িক ডেক্সটপ কম্পিউটারের সমতুল্য। সুপারকম্পিউটার কাজ করে সমস্যাটি নিয়ে এটিকে খণ্ড খণ্ড করে ভাগ করে নিয়ে, যা স্বতন্ত্রভাবে সমাধান করা হয়, যে কাজটি করে ট্রান্সপিউটারদের একটি দল। ট্রান্সপিউটার আংশিক সমস্যা নেয়, সমাধান করে এর উত্তর দেবার পর নতুন কাজের জন্য আবার প্রস্তুত হয়। সেই সময় আরো একগুচ্ছ ট্রান্সপিউটার তাদের সমাধান প্রস্তুত করে, এভাবে পুরো কম্পিউটারটি তাদের সর্বশেষ উত্তরটি পায় সাধারণ সিরিয়াল কম্পিউটার যত দ্রুত পারে তারচেয়ে বহুগুণ দ্রুত।
আমি বলেছিলাম যে, সাধারণ সিরিয়াল কম্পিউটার প্যারালেল প্রসেসর হবার একটি বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে, যদি এর মনোযোগ যথেষ্ট পরিমান দ্রুত সে বেশ কিছু কাজের উপর রোটেট করতে পারে। আমরা বলতে পারি যে একটি ভার্চুয়াল প্যারালেল প্রসেসর সিরিয়াল হার্ডওয়ার উপর বসে আছে। দার্শনিক ডেনেটর ধারণা হচ্ছে, মানুষের মস্তিস্ক ঠিক একই কাজ করে তবে এর বিপরীত ক্রমে। আমাদের মস্তিস্কে হার্ডওয়্যার মৌলিকভাবে প্যারালাল, এডিনবরা মেশিনের মত। এবং এটি এমন সফটওয়্যার চালায় যার পরিকল্পনা করা হয়েছে সিরিয়াল প্রসেসিং মত একটি বিভ্রম সৃষ্টি করতে: কোনো সিরিয়ালভাবে প্রক্রিয়াজাত করা ভার্চুয়াল মেশিন যা প্যারালাল গঠনের উপর অবস্থান করে। গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যা আমরা সাবজেকটিভ বা আত্মগত অভিজ্ঞতা, যেমন চিন্তা করার প্রক্রিয়ায় শনাক্ত করতে পারি, সেটি ডেনেটের মতে, ধারাবাহিক একটা-পর অন্যটা, অনেকটা জয়েসিয়ান চেতনার প্রবাহ। তিনি বিশ্বাস করেন বেশীর ভাগ প্রাণী এই ধারাবাহিক অভিজ্ঞতাটা অনুভব করতে পারেনা এবং তারা তাদের মস্তিষ্কটা ব্যবহার করে এর আদি, প্যারালেল প্রসেসিং এর মোডে। সন্দেহ নেই যে মানুষের ব্রেইনও, এর প্যারালাল আর্কিটেকচার সরাসরি ব্যবহার করে এর বহু নৈমিত্তিক কাজের জন্য যা জটিল সারভাইভাল মেশিনকে চালাতে সাহায্য করে। কিন্তু এছাড়াও, মানুষের মস্তিস্ক একটি ভার্চুয়াল মেশিনের সফটওয়্যার তৈরী করেছে যা সিরিয়াল প্রসেসরের বিভ্রম সষ্টি করে। মন, এর ধারাবাহিক চেতনার প্রবাহসহ হচ্ছে একটি মেশিন, মস্তিষ্কের অভিজ্ঞতাকে অনুভব করার জন্য একটি উপায়, ঠিক যেমন Macintosh User Interface যন্ত্র কম্পিউটারকে ধূসর বাক্সের মধ্যে অভিজ্ঞতায় অনুভব করানোর ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী-বান্ধব’ একটি উপায়।
খুব স্পষ্ট নয় কেন আমাদের মানুষদের কোনো সিরিয়াল ভার্চুয়াল মেশিনের প্রয়োজন, যখন অন্য প্রজাতিরা ভালোই আছে তাদের অনাড়ম্বর প্যারালাল মেশিনসহ। হয়তো বন্য মানুষকে যে কঠিন কাজগুলোর মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সেই কাজগুলো মূলত সিরিয়াল। অথবা হয়তো ডেনেট হয়তো ভুল করেছেন শুধুমাত্র আমাদের আলাদা করে। তার আরো বিশ্বাস হলো এই সিরিয়াল সফটওয়্যার বিকাশ মূলত সাংস্কৃতিক একটি প্রপঞ্চ এবং আমার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট নয় কেন ঠিক এটাই হতে হবে। কিন্তু আমার এখানে যোগ করা উচিৎ, আমার লেখার সময়, ডেনেটের পেপারটি প্রকাশ হয়নি এবং আমার এই ব্যাখ্যাটি মূলত তার ১৯৮৮ সালে লন্ডনে জ্যাকোবসেন লেকচারের স্মৃতির উপর নির্ভর করে প্রস্তাবিত। আমার নিঃসন্দেহে কিছুটা ক্রটিপূর্ণ আর স্মৃতি-নির্ভর ধারণা, এমনকি খানিকটা অলঙ্কৃত কোনো ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করার চেয়ে, পাঠকদের আমি উপদেশ দিচ্ছি ডেনেটের নিজস্ব ব্যাখ্যাটা পড়তে, যখন তা প্রকাশ হবে।
মনোবিজ্ঞানী নিকোলাস হামফ্রে একটি চমৎকার হাইপোথিসিস প্রস্তাব দিয়েছেন, কিভাবে কোনো কিছু সিমুলেট করার ক্ষমতার বিবর্তনের ফলাফল হিসাবে সচতেনতার উদ্ভব হয়েছে। তার The Inner Eye বইটিতে হামফ্রে বিশ্বাসযোগ্য একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন, খুব বেশী মাত্রায় সামাজিক প্রাণী, যেমন, আমরা আর শিম্পাঞ্জিদের অবশ্যই বিশেষজ্ঞ স্তরের মনোবিজ্ঞানী হতে হবে। মস্তিস্কগুলো পৃথিবীর বহু বিষয়কে একই সাথে মোকাবেলা করতে হয় বা সিমুলেট করতে হয়। কোনো সামাজিক প্রাণী আরেকজনের পথিবীতে বসবাস করে, যে পথিবী সম্ভাব্য প্রজনন সঙ্গীদের, প্রতিদ্বন্দ্বীদের, সহযোগী এবং শত্রুদের। এমন কোনো জগতে টিকে থাকা ও উন্নতি করতে এই সব অন্য সদস্যরা কি ভাবছে সেটা বুঝতে আপনাকে খুব দক্ষ হতে হবে, পূর্বধারণা করতে হবে তারা এর পরে কি করতে যাচ্ছে। সামাজিক বিশ্বেকি হতে যাচ্ছে এমন কোনো কিছু পূর্বধারণা করার তুলনায় কোনো প্রাণহীন জগতে কি হতে যাচ্ছে এমন ভবিষ্যদ্বাণী অনেক সহজ। প্রাতিষ্ঠানিক মনোবিজ্ঞানীরা, বৈজ্ঞানিকভাবে কাজ করার মাধ্যমে, মানুষের আচরণ পূর্বধারণা করতে তারা আসলে খুব বেশী দক্ষ না। সামাজিক সঙ্গীরা, মুখের মাংসপেশীর সামান্য নড়াচড়া ও আরো সূক্ষ্ম কোনো ইঙ্গিত দেখে মনোভাব এবং কোন আচরণের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে প্রায়শই বিস্ময়করভাবে দক্ষ। হামফ্রে বিশ্বাস করেন যে, এই স্বভাবজাত প্রাকৃতিক মনোবৈজ্ঞানিক দক্ষতা সামাজিক প্রাণীদের মধ্যে অত্যন্ত অগ্রসরভাবেই বিবর্তিত হয়েছে, অনেকটা একটা বাড়তি চোখ বা অন্য কোনো জটিল অঙ্গ বিবর্তনের মতই। এই ‘ইনার আই’ হচ্ছে বিবর্তিত সামাজিক ও মনোজাগতিক অঙ্গ, ঠিক যেমন করে বাইরের চোখ একটি দেখার অঙ্গ।
