বহু খাওয়ার উপযোগী কীটপতঙ্গ, যেমন আগের অধ্যায়ের প্রজাপতিরা, তাদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করে বাজে স্বাদের বা কামড় দেয় এমন পোকামাকড়ের বাইরের রুপটি মিমিক বা অনুকরণ করে। আমরা নিজেরাই কোনো হলুদ কালো ডোরা কাটা হোভার-ফ্লাইকে ভয়ঙ্কর বোলতা ভেবেপ্রায়ই বোকা বনে যাই। মৌমাছিদের অনুকরণ করা কিছু মাছিরা আরো বেশী নিখুঁত তাদের ছলনাময় ছদ্মরুপে। শিকারী প্রাণীরা মিথ্যা কথা বলে। অ্যাঙলার মাছ। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে সাগরের তলদেশে, চারপাশের পরিবেশের সাথে শনাক্ত করা সম্ভব না এমনভাবে, তাদের একটি মাত্র চোখে পড়ার মত অঙ্গ হচ্ছে কেঁচোর মত আকাবাকা একটুকরো মাংস যা লেগে থাকে একটা দীর্ঘ ‘মাছ ধরার ছিপের মত মাথা থেকে সামনের দিকে বেরিয়ে আসা একটি বর্ধিত অংশে। যখনই কোনো ছোট মাছ নিকটে আসে, অ্যাঙলার তার কেঁচোর মত টোপটাকে নাড়ায় তার সামনে এবং এটিকে লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসে তাদের লুকিয়ে রাখা মুখের কাছে, হঠাৎ করে এটি তার মুখ হা করে, এবং সেখানে টেনে নেয় মাছটাকে তার খাদ্য হিসাবে। এখানে অ্যাঙলার যেন মিথ্যা কথা বলেছে, সে ব্যবহার করছে কেঁচোর মত মোচড়ানোর ভঙ্গি করা কোন বস্তুর প্রতি মাছদের আকর্ষিত হবার প্রবণতাকে : সে এখানে বলছে, “দেখো এই যে একটা কেঁচো এবং যেকোনো ছোট মাছ যে এই মিথ্যাকে বিশ্বাস করে, দ্রুত সে প্রাণ হারায় অ্যাঙলার মাছের খাদ্য হিসাবে।
কিছু সারভাইভাল মেশিন অন্যদের যৌন কামনাকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে। ‘বি’ অর্কিড মৌমাছিদের তাদের ফুলের সাথে সঙ্গম করতে প্ররোচিত করে, কারণ তাদের ফুলগুলো স্ত্রী মৌমাছিদের মত দেখতে। এখানে ছলনার আশ্রয় নিয়ে অর্কিডের লাভ হচ্ছে পরাগায়ন, কারণ কোনো মৌমাছি দুটি অর্কিড ফুলের দ্বারা বোকা বনে গেলেও ঘটনাচক্রে সে একটি থেকে অন্য ফুলে পরাগরেণু বহন করে নিয়ে যায়। জোনাকীরা (যারা মূলত বীটল) তাদের সঙ্গীদের আকর্ষণ করে আলো জ্বলিয়ে নিভিয়ে তাদের দিকে নির্দেশ করে। প্রতিটি প্রজাতির নিজস্ব এই আলো জ্বালানো নিভানোর নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা মোর্স কোডের ডট-ড্যাশের মত প্যাটার্ন আছে, যা ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে যে কোনো ধরনের সংশয় দূর করে, যা ক্ষতিকর সংকর তৈরী হওয়া থেকে প্রজাতিকে সুরক্ষা করে। ঠিক যেভাবে নাবিকরা কোনো নির্দিষ্ট বাতিঘরের আলো জ্বলা আর নেভার প্যাটার্নের প্রতি লক্ষ রাখে, তেমনি জোনাকীরাও তাদের নিজেদের প্রজাতির সদস্যদের সেই আলোর সাংকেতিক বার্তা খুঁজে বের করে। ফোটুরিস (Photuris) গণর স্ত্রী সদস্যরা ‘আবিষ্কার করেছে যে তারা ফোটিনাস (Photinus) গণর পুরুষ সদস্যদের আকর্ষণ করতে পারে, যদি তারা ফোটুরিস গণর কোনো স্ত্রী সদস্যর আলো জ্বলা-নেভার সাংকেতিক কোডটি অনুকরণ করতে পারে। এবং তারা সেটি করে, এবং যখন কোনো একটি ফোটিনাস পুরুষ সেই সংকেতের ডাকে বোকা বনে গিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়, তাকে দ্রুত খাদ্য হিসাবে খেয়ে ফেয়ে ফোটুরিস স্ত্রী সদস্যরা। সাইরেন বা লোরেলেইদের কথা মনে পড়ে যেতে পারে এর সদৃশ্য কোনো একটি উদাহরণ হিসাবে। কিন্তু কর্নিশ কেউ (ইংল্যান্ডের কর্নওয়ালে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী) পছন্দ করবেন সেই প্রাচীন যুগের ‘রেকারদের কথা ভাবতে, যারা লন্ঠন বাতি ব্যবহার করে জাহাজদের পাথুরে উপকুলের দিকে প্রলোভিত করে নিয়ে যেত, তারপর লুট করতে পাথরের আঘাতে ভেঙ্গে পড়া জাহাজের সব মালামাল।
যখনই যোগাযোগের কোনো পদ্ধতি বিবর্তিত হয়, তখন সবসময়ই বিপদের আশঙ্কা থাকে কেউ হয়তো নিজেদের স্বার্থে এই পদ্ধতিটিকে ব্যবহার করতে পারে। প্রজাতির জন্য মঙ্গল’, বিবর্তনের এমন একটি ধারণা নিয়ে আমাদের বেড়ে ওঠার কারণে স্বাভাবিকভাবে আমরা প্রথমে মিথ্যাবাদী আর প্রতারকদের ভিন্ন। কোনো প্রজাতির সদস্য হিসাবেই ভাবি: শিকারী প্রাণী, শিকার, পরজীবি এরকম আরো অনেক। তবে আমাদের অবশ্যই মিথ্যা আর ছলনা এবং যোগাযোগ পদ্ধতির স্বার্থপর অপব্যবহার প্রত্যাশা করতে হবে, যার উদ্ভব হয় যখনই ভিন্ন ভিন্ন একক সদস্যদের জিনগত স্বার্থগুলো আলাদা হয়। আর এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত একই প্রজাতির সদস্যরাও। আমরা পরে দেখবো, অবশ্যই আমরা এমনকি আশা করতে পারি যে শিশুরা তাদের পিতামাতার সাথে ছলনা করবে, স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের সাথে প্রতারণা করবে এবং ভাই ভাইকে মিথ্যা বলবে।
এমনকি সেই বিশ্বাসটিও, প্রাণীদের যোগাযোগের সংকেত মূলত বিবর্তিত হয়েছে পারস্পরিক সুবিধা আদান প্রদানের বিষয়টি লালন করার জন্য এবং তারপর সেটি অপব্যবহৃত হয়ে খারাপ উদ্দেশ্যপূর্ণ কিছু সদস্যদের দারা, আসলেই খুব বেশী সরল একটি ধারণা হতে পারে যে সব প্রাণীদের যোগাযোগের মধ্যে ছলনার কোনো উপাদান শুরু থেকেই থাকে, কারণ সব প্রাণীদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় অন্ততপক্ষে কিছু না কিছু স্বার্থের সংঘাত আছে। পরের অধ্যায়টি স্বার্থের সংঘাতকে বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ভাবার একটি শক্তিশালী উপায় উপস্থাপন করবে।
নোটস (অধ্যায় ৪)
(১) এই ধরনের কোনো বক্তব্য, আক্ষরিক অর্থ নিয়ে ভাবেন এমন সমালোচকদের প্রায়শই উৎকণ্ঠিত করে। তারা অবশ্য সঠিক, কারণ মস্তিস্ক কম্পিউটার থেকে অবশ্যই অনেকভাবেই ভিন্ন। তাদের অভ্যন্তরীণ কাজ করার প্রক্রিয়া, যেমন, খুবই আলাদা কোনো বিশেষ ধরনের কম্পিউটারদের চেয়ে, যা আমাদের প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে। কিন্তু তাদের কাজের সাথে সদৃশ্যতার বিষয়ে সেটি আমার বক্তব্যটির সত্যতাকে কোনোভাবে হ্রাস করেনা। কাজের দিক থেকে, মস্তিস্ক ঠিক অন বোর্ড কম্পিউটারের মত কাজ করে– উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ, প্যাটার্ন রিকগনিশন, স্বল্প মেয়াদী বা দীর্ঘ মেয়াদী উপাত্ত সংরক্ষণ, নানা কাজের সমন্বয় সাধন ইত্যাদি বহু কাজ।
