বলা যেতে পারে একটি সারভাইভাল মেশিন আরেকটি সারভাইভাল মেশিনের সাথে যোগাযোগ করছে যখন সে এটির আচরণ বা এর। স্নায়ুতন্ত্রের কোনো অবস্থাকে প্রভাবিত করছে। এটি এমন কোনো সংজ্ঞা নয়, যা খুব দীর্ঘ সময় ধরে আমার সমর্থন করতে পছন্দ করা উচিৎ। ‘প্রভাব’ শব্দটি দিয়ে আমি বোঝাতে চাইছি সরাসরি কারণ সংক্রান্ত প্রভাব। সংযোগ বা কমিউনিকেশনের উদাহরণ অগণিত পাখিদের গান, ঝিঁঝি পোকার গান, কুকুদের লেজ নাড়ানো বা এর ঘাড়ের চুল খাড়া হয়ে দাঁড়ানো, শিম্পাঞ্জিদের দাঁত বের করা হাসি, মানুষের অঙ্গভঙ্গী ও ভাষা। সারভাইভাল মেশিনদের বহু সংখ্যক কাজই পরোক্ষভাবে তাদের জিনদের কল্যাণ নিশ্চিৎ করে অন্যান্য সারভাইভাল মেশিনদের আচরণ প্রভাবিত করার মাধ্যমে। সংযোগ যেন কার্যকরী হয় সেটা নিশ্চিৎ করতে প্রতিটি জীবই অনেক পরিশ্রম করে। পাখিদের গান বহু প্রজন্মের মানুষকে মুগ্ধ করে এসেছে, আন্দোলিত করেছে এর রহস্যময়তায়। আমি ইতিমধ্যে হাম্পব্যাক তিমিদের আরো বেশী বিস্তারিত আর রহস্যময় সঙ্গীতের কথা বলেছি, এর বিস্ময়কর ব্যপ্তি এবং এর শব্দ তরঙ্গ সৃষ্টি করার ক্ষমতা মানুষের শ্রাব্যক্ষমতা তো বটেই, এছাড়াও সাবসনিক (শ্রাব্যতার সীমার নীচে) গোঙ্গানী থেকে আন্ট্রাসনিক (শ্রাব্যতার সীমার উপরে) চিৎকারও অন্তর্ভুক্ত। মোল-ক্রিকেটরা তাদের গানের তীব্রতা বাড়াতে পারে অনেক উচ্চ শব্দে, যখন মাটির নীচের গর্তে তারা গান গায়, খুব সতর্কতার সাথে যারা গর্ত খোড়ে দ্বিগুণ হারে বাড়ানো শিঙ্গা বা মেগাফোনের আকৃতি সৃষ্টি করে। অন্ধকারে মৌমাছিরা নাচে অন্য মৌমাছিদের কোথায় খাদ্য আছে তার দুরত্ব আর নির্দেশনা বোঝাতে, এই ধরণের যোগাযোগের শ্রেষ্ঠত্বের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে শুধু মানুষের ভাষা।
প্রাণীদের আচরণ নিয়ে কাজ করেন এমন বিজ্ঞানী বা ইথোলজিষ্টদের চিরাচরিত কাহিনীর একটি হচ্ছে যোগাযোগের সংকেত বিবর্তিত হয় যে সংকেত প্রেরণকারী আর গ্রহীতা, উভয়ের পারস্পরিক কল্যাণে স্বার্থে। যেমন, ধরুন পাখির বাচ্চারা তাদের মায়ের ব্যবহারকে প্রভাবিত করে খুব তীব্র স্বরে আওয়াজ করে যখন তারা হারিয়ে যায় বা ঠাণ্ডায় কাতর হয়। এই আচরণের প্রত্যক্ষ ফলাফল হচ্ছে ঘটনাস্থলে মায়ের উপস্থিত হওয়া, যে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাকে নিরাপদ আশ্রয়ে অন্যান্য বাচ্চাদের সংস্পর্শে ফিরিয়ে আনে। এই আচরণকে বলাই যেতে পারে পারস্পরিক সুবিধার জন্য বিবর্তিত হয়েছে, এই অর্থে যে প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই সব বাচ্চাদের আনুকুল্য প্রদর্শন করে যারা এভাবে ডাকে যখন তারা হারিয়ে যায় এবং এধরনের ডাক শোনার পর সঠিক প্রত্যুত্তর দেবার জন্য মায়েদেরকেও সুবিধা দেয়।
যদি আমরা চাই (যদিও আসলেই সেটা আবশ্যিক নয়), আমরা এই সব সংকেত বা চিপ কল’ কে নিয়ে ভাবতে পানি তাদের একটি অর্থ আছে বা তারা কোনো তথ্য বহন করছে: এই ক্ষেত্রে ‘আমি হারিয়ে গেছি। ছোট পাখিদের দেয়া কোনো সতর্কবাণী, যা আমি প্রথম অধ্যায়ে উল্লেখ করেছি, বলা যায় এমন কোনো তথ্য বহন করে, ‘বাজ-পাখি আছে নিকটে’; কোনো প্রাণী যে এই তথ্যটি পাবে এর উপর ভিত্তি করে সে তার আচরণ করবে ও এর ফলে সে উপকৃত হবে; সুতরাং বলা যায় এই তথ্যটি সত্যি। কিন্তু প্রাণীরা কি কখনো মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করে, তারা কি কখনো মিথ্যা বলে?
কোনো প্রাণী মিথ্যা কথা বলছে এই ধারণাটিকে খুব সহজে ভুল। বোঝার সম্ভাবনা থাকে, সুতরাং আমি আগে থেকেই সেই ভ্রান্ত ধারণাটিকে ঠেকাতে চেষ্টা করবো। আমার মনে পড়ছে বিয়েত্রিস ও অ্যালেন গার্ডনারের দেয়া একটি লেকচারে আমি উপস্থিত ছিলাম, যেখানে তারা কথা বলতে পারা বিখ্যাত শিম্পাঞ্জি ওয়াশো (তিনি আমেরিকার সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করেছিলেন এবং তার গবেষণা ও অর্জন আসলেই ভাষার শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়) সংক্রান্ত বিষয়ে তথ্য আদান প্রদান করছিলেন। দর্শকের সারিতে বেশ কিছু দার্শনিকও ছিলেন এবং লেকচার পরবর্তী আলোচনায় তারা বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা বিতর্কও করছিলেন, ওয়াশো কি মিথ্যা বলতে পারে কিনা। আমার সন্দেহ যে গার্ডনাররা ভেবেছিলেন এর চেয়ে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে সেখানে আলোচনা করার এবং আমি তাদের সাথে একমত এ ব্যাপারে। এই বইতে আমি প্রতারণা বা ছলনা আর মিথ্যার মত শব্দগুলো উচ্চারণ করছি আরো সরাসরি কোনো অর্থে, সেই দার্শনিকদের প্রস্তাবিত অর্থে না। তারা ছলনা বা প্রতারণা করার ‘সচেতন’ উদ্দেশ্য নিয়ে আগ্রহী। আমি শুধুমাত্র কথা বলছি কোনো একটি প্রভাবের কথা, যা কার্যকরীভাবে ছলনা বা প্রতারণার সমতুল্য হতে পারে। যদি কোনো পাখি “বাজ পাখি কাছে কাছে এমন কোনো সংকেত ব্যবহার করে যখন কিনা সেখানে কোনো বাজ পাখি সেখানে নেই, যার মাধ্যমে তার সহকর্মী পাখিরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যায়, আর সে একা তাদের সবার খাবার খাওয়ার সুযোগ পায়, তখন আমরা হয়তো বলতে পারি এই পাখিটি মিথ্যা কথা বলেছে।, সে পরিকল্পিত উপায়ে সচেতনভাবে ছলনা করতে চেয়েছে কিনা, আমরা এমন কোনো অর্থ করছি না। যে বিষয়টি আমাদের অর্থ বোঝাচ্ছে সেটি হলো, এখানে মিথ্যাবাদী অন্য পাখিদের বঞ্চিত করে তাদের খাদ্য খাবার সুযোগ পেলো। এবং যে কারণে অন্য পাখিরা সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল তাহলে তারা মিথ্যাবাদী পাখির ডাকে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল এমন ভাবে যা কোন বাজ পাখির উপস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।
