এই কাহিনীটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ব্যাখ্যা করে যা আগের অধ্যায়ে আলোচনায় এসেছিল। এটি প্রদর্শন করছে যে খুব সঠিকভাবে বলা যেতে পারে, এই জিনটি এই আচরণের জন্য এমনকি যদিও আমাদের ন্যূনতম কোনো ধারণা নেই সেই ভ্রূণতাত্ত্বিক কারণের রাসায়নিক ধারাবাহিকতার শৃঙ্খল যা জিন থেকে কোনো একটি আচরণের দিকে নির্দেশিত হতে পারে। শঙ্খলের কার্যকারণ এমন কি হতে পারে কোনো কিছু শেখার সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন, হতে পারে যে আনক্যাপিং বা মৌচাকের কোষের ঢাকনীটি খোলার জিনটি প্রভাব খাটায় মৌমাছিদের আক্রান্ত মোমের স্বাদ নেবার ক্ষমতা দিয়ে। তার মানে তারা আক্রান্ত কোষের মোমের ঢাকনী খাওয়ার ব্যাপারটা সুখকর বা এক ধরনের পুরষ্কারের মত মনে করে এবং সেই কারণে এর পুনরাবৃত্তি করার তাদের একটি প্রবণতা থাকে। এমনকি যদি এভাবে জিন কাজ করে থাকে, তারপরও আসলেই এটি একটি সত্যিকারের জিন যা আনক্যাপিং এর জন্য চিহ্নিত, তবে শর্ত হচ্ছে যে, অন্য সব কিছু যদি অপরিবর্তিত থাকে, মৌমাছিরা যারা এই জিনটি বহন করে তারা আনক্যাপিং এর কাজটি করে এবং যে মৌমাছিদের এই জিনটি নেই তারা কোন অ্যানক্যাপিং প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়না।
দ্বিতীয়ত, এটি আরো একটি বাস্তব সত্যকে ব্যাখ্যা করে, সেটি হচ্ছে। তাদের সমাজবদ্ধ সারভাইভাল মেশিনের আচরণের উপর কোন প্রভাব ফেলার জন্য জিনরা পারস্পরিক সহযোগিতা করে। গ্লোয়িং আউট জিনটি কোনো কাজে আসে না যদি না তার সাথে আনক্যাপিং জিনও উপস্থিত না থাকে, একইভাবে থ্রোয়িং আউট জিন ছাড়া আনক্যাপিং জিনও কোনো কাজ করে না। তারপর জিনগত এই পরীক্ষা দেখিয়েছে, একই সাথে স্পষ্টভাবে নীতিগতভাবে দুটি জিন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাদের সেই যাত্রায় সহজেই বিচ্ছিন্নযোগ্য। তাদের উপযোগী কাজটি নিয়ে নিয়ে যদি ভাবেন, আপনি তাদের একটি পারস্পরিক সহযোগিতাময় ইউনিট হিসাবে ভাবতে পারেন, কিন্তু অনুলিপনকারী জিন হিসাবে তারা দুটি মুক্ত এবং স্বতন্ত্র এজেন্ট।
এই তর্কের উদ্দেশ্যে আমাদের প্রয়োজন হবে সেই সব জিনগুলো সম্বন্ধে অনুমান করার জন্য, যারা সব ধরনের অসম্ভাব্য কাজের ‘জন্য দায়ী। আমি যদি কথা বলি, যেমন– এমন কোনো হাইপোথেটিকাল জিনকে নিয়ে, যা তাদের সঙ্গীকে বাঁচায় পানিতে ডুবে মারা যাওয়া থেকে এবং আপনি হয়তো এমন কোনো ধারণাকে অবিশ্বাস্য মনে করতে পারেন, তখন হাইজিনিক মৌমাছিদের গল্পটা স্মরণ করবেন। মনে করে দেখবেন, আমরা জিনকে নিয়ে এমন ভাবে কোনো কথা বলছি না, যেখানে তারা একক ভাবে পূর্বকারণ হবে সব জটিল মাংসপেশী সংকোচন, সংবেদনশীল উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ এবং এমনকি কোন সচেতনভাবে নেয়া সিদ্ধান্তগুলো, যেগুলো সব জড়িত কাউকে পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচানেরা জন্যে। আমরা সেই প্রশ্নটি নিয়ে এখনও কিছু বলছি না, অর্থাৎ কোনো আচরণের গড়ে ওঠান প্রক্রিয়ায় কিছু শেখা,অভিজ্ঞতা বা পরিবেশের প্রভাব কতটুকু ভূমিকা পালন করে। আপনার শুধু মানতে হবে, এটা সম্ভব যেকোনো একটি একক জিনের জন্য, যদি আর সব কিছু অপরিবর্তিত থাকে এবং আরো অনেক জিনের সেখানে উপস্থিতি ও পরিবেশ জণিত শর্ত নিশ্চিৎ হয়, তাহলে এর বিকল্প অ্যালিলের তুলনায় সে এমন কোনো শরীর তৈরী করবে যার ডুবন্ত কাউকে বাঁচানোর সম্ভাবনা থাকবে বেশী। দুটি জিনের পার্থক্যে হয়তো দেখা যেতে পারে সামান্য কিছু পরিমানবাচক পার্থক্য। ভ্রূণগত বিকাশের বিস্তারিত প্রক্রিয়া, যতই কৌতূহলোদ্দীপক তারা হোক না কেন, এখানে তারা অপ্রাসঙ্গিক বিবর্তনীয় বিবেচনায়। কনরাড লরেনজ বিষয়টি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
জিনরা হচ্ছে মাষ্টার প্রোগ্রামার,আর তারা প্রোগ্রামিং করছে তাদের জীবন বাঁচাতে। তাদের বিচার করা হয় তাদের প্রোগ্রামের সফলতার উপর নির্ভর করে, কতটা সফলভাবে তারা খাপ খাইয়ে নেই জীবনের সব ঝুঁকি থেকে যা তাদের সারভাইভাল মেশিনকে মোকাবেলা করতে হয়। আর এর বিচারক হচ্ছে নিষ্ঠুর বিচারক, টিকে থাকার আদালতে। আমরা পরে সেই পথে আসবো যেখানে জিনের টিকে থাকাটা প্রতিপালিত আর সংরক্ষিত হয় এমন কিছু দিয়ে যা আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় পরার্থবাদী বা পরোপকারী আচরণ। কিন্তু স্পষ্টতই প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে, সেই সারভাইভাল মেশিনের এবং সেই মস্তিষ্কটির, যা এর হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়-একক সদস্যটির টিকে থাকা ও প্রজনন সাফল্য। কলনিতে বাস করা সব জিন একমত হয়ে এই অগ্রধাধিকারের ব্যপারটিতে। প্রাণীরা সেকারণেই অনেক জটিল আর বিস্তারিতভাবে পরিকল্পনায় কালক্ষেপণ করে খাদ্য খোঁজা ও সংগ্রহে, নিজেদের কারো খাদ্য হওয়া থেকে বাঁচাতে, কোনো অসুখ বা দুর্ঘটনা থেকে থেকে বাঁচিয়ে রাখতে, নিজেদের কোনো বৈরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা করতে, বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের খুঁজে বের করতে এবং তাদের প্রজনন করার জন্য রাজী করাতে, তাদের সন্তানদের জন্য সেই সুযোগ সুবিধাগুলো ব্যবস্থা করতে, তারা নিজেরা যা ভোগ করেছে। আমি কোনো উদাহরণ দেবো না– যদি আপনি কোনো উদাহরণ চান, শুধুমাত্র খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করুন কোনো বণ্য প্রাণী যার সাথে আপনার দেখা হতে পারে এরপর কোনো এক সময়ে। কিন্তু আমি একটি বিশেষ ধরনের কারণের কথা উল্লেখ করতে চাই কারণ আমাদের সেই আচরনের প্রতি তথ্যসূত্রের ইঙ্গিত দিতে হবে যখন আমরা পরার্থবাদীতা ও স্বার্থপরতা নিয়ে কথা বলবো। এই আচরণটিকে ব্যাপকার্থে কমিউনিকেশন বা সংযোগ হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে (৭)।
