সচেতনতা যে দার্শনিক সমস্যাই সৃষ্টি করুক না কেন, এই কাহিনীর উদ্দেশ্যে এটিকে ভাবা যেতে পারে তাদের মূল নিয়ন্ত্রক মনিব, ‘জিনদের নিয়ন্ত্রণ থেকে সারভাইভাল মেশিনদের নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহনকারী হিসাবে মুক্তি লাভ করা একটি প্রক্রিয়া হিসাবে। শুধুমাত্র দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রক হিসাবে তারা সারভাইভালে মেশিনের নানা ধরনের কর্মকাণ্ডই পরিচালনা করে না, তারা একই সাথে সেই যোগ্যতাও অর্জন করে, যে যোগ্যতার বলে তারা ভবিষ্যত সম্বন্ধে পূর্বধারণাও করতে পারে এবং সেই অনযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এমনকি তাদের সেই জিনের নির্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার ক্ষমতাও আছে, যেমন তাদের যতটা সন্তান নেবার ক্ষমতা আছে ততটা সন্তান নিতে অস্বীকার করা। কিন্তু এই ক্ষেত্রে মানুষ অবশ্যই বিশেষ একটি উদাহরণ, আমরা পরে সেটাই দেখতে পাবো।
কিন্তু পার্থবাদীতা আর স্বার্থপরতার কি সম্পর্ক? আমি চেষ্টা করছি। সেই ধারণাটি গড়ে তুলতে যে, কোনো জীবের আচরণ, স্বার্থপরতার অথবা পরার্থবাদীতা– জিনদের নিয়ন্ত্রণাধীন, তবে শুধুমাত্র পরোক্ষভাবে, কিন্তু তাসত্ত্বেও খুব শক্তিশালী অর্থে। কিভাবে সারভাইভাল মেশিন ও তার স্নায়ুতন্ত্র তৈরী হবে সেই বিষয়টির নির্দেশনা দেবার মাধ্যমে জিনরা আচরণের উপর তাদের চূড়ান্ত ক্ষমতার প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু প্রতি মুহূর্তের সিদ্ধান্তগুলো, যেমন এরপর কি করতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত নেয় স্নায়ুতন্ত্র। জিনরাই প্রাথমিক নীতিনির্ধারক, আর মস্তিষ্ক হচ্ছে তাদের নীতি বাস্তবায়নকারী। যখন মস্তিস্ক আরো বেশী উচ্চ পর্যায়ের সংগঠন আর উন্নত হতে থাকে, তারা ক্রমান্বয়ে আরো বেশী পরিমান সত্যিকারের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো নিতে থাকে, নানা ধরনের কৌশল, যেমন কোনো কিছু শেখার মাধ্যমে বা সেটা করার কোনো কাল্পনিক পরিস্থিতির মডেল বা সিমুলেশন সৃষ্টি করে। আর এই প্রবণতার যৌক্তিক উপসংহার হচ্ছে, এখনো কোনো প্রজাতি যা অর্জন করতে পারেনি, সেটি হবে জিনদের জন্য তাদের সারভাইভাল মেশিনকে একটি মাত্র সার্বিক কোনো নীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করা: সেটাই করো যা কিছু তোমার মনে হয় ভালো আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
কম্পিউটার আর মানুষের সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়াটির সদৃশ্যতার বিষয় সব ঠিকই আছে, কিন্তু এখন অবশ্যই আমাদের বাস্তব পৃথিবীতে ফিরে আসতে হবে এবং মনে রাখতে হবে যে বিবর্তন আসলেই ঘটে ধাপে ধাপে ক্রমান্বয়ে, জিনপুলে জিনদের বৈষম্যমূলকভাবে টিকে থাকার মাধ্যমে। সুতরাং, কোনো একটি আচরণের প্যাটার্ন, সেটি স্বার্থপরতা আর পরার্থবাদী যাই হোক না– তার বিবর্তন হবার জন্যে প্রয়োজন যে সেই আচরণের জন্য দায়ী জিনের জিন পুলে বেশী সফলভাবে বাঁচা, তার অন্য কোন প্রতিদ্বন্দ্বী জিনে বা অ্যালিলের তুলনায়, যারা ভিন্ন কোনো আচরণের জন্য দায়ী। পার্থবাদী আচরণের জন্য জিনের অর্থ হচ্ছে এমন কোনো জিন যা স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের উপর এমন ভাবে তাদের প্রভাব বিস্তার করে, যা তাদের পরার্থবাদী আচরণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় (৫)। পরার্থবাদী আচরণের জিনগত উত্তরাধিকার সংক্রান্ত পরীক্ষামূলক কি কোনো প্রমাণ আছে? না, কিন্তু সেটি নিয়ে বিস্মিত হবার কারণ প্রায় নেই বললেই চলে, কারণ কোনো আচরণের জিনতত্ত্ব নিয়ে খুব কম কাজই হয়েছে। বরং আমি আপনাদের একটি গবেষণা নিয়ে কিছু বলি। যে গবেষণাটি করা হয়েছিল আচরণের প্যাটার্নের উপর, যা দেখতে খুব স্পষ্টভাবে পরার্থবাদী আচরণ হিসাবে মনে হয় না। কিন্তু জটিল কৌতূহল মেটানোর জন্য সেটি যথেষ্ট, এটি একটি মডেল হিসাবে কাজ করতে পারে, কিভাবে পরার্থবাদী আচরণ উত্তরধিকার সূত্রে অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।
মৌমাছিরা একটি সংক্রামক ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হয়, যার নাম ‘ফাউল ব্রুড’। মৌচাকের কোষের মধ্যেই থাকা অবস্থায় লার্ভা বা গ্রাবদের আক্রমণ করে। গৃহপালিত মৌমাছিদের যে জাত মৌচাষীরা ব্যবহার করে থাকেন, তাদের কোনো কোনোটি ফাউল ব্রুডে আক্রান্ত হবার জন্য বেশী ঝুঁকিপূর্ণ এবং দেখা গেছে যে এই জাতগুলোর মধ্যে পার্থক্য অন্তত কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু আচরণগত। যেমন, তাদের স্ট্রেইনটি যাকে বলা হয় “হাইজেনিক’ স্ট্রেইন, তারা খুব সহজে এই রোগের মহামারী থেকে বাঁচতে পারে আক্রান্ত লার্ভাটিতে শনাক্ত করার মাধ্যমে, তারা কোষ থেকে সেটি বের করে আনে ও মৌচাকের বাইরে ফেলে দেয়। নাজুক ঝুঁকিপুর্ণ স্ট্রেইনটি এই ‘হাইজেনিক’ শিশুহত্যার মত কোনো আচরণ করে না। এখানে যে আচরণটি সংশ্লিষ্ট সেটি আসলেই জটিল। কর্মী মৌমাছিরা সেই কোষ খুঁজে বের করে, যেখানে আক্রান্ত লার্ভাটি থাকে, কোষের মুখে মোমের ঢাকনীটি সরিয়ে ফেলে, লার্ভাটিকে সেখান থেকে বের করে, তারা তাদের মৌমাচের ঢোকার মুখের দরজার কাছে টেনে নিয়ে এসে বাইরে ময়লার স্তূপে ছুঁড়ে ফেলে।
মৌমাছির উপর কোনো জিনতাত্ত্বিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা বেশ জটিল একটি বিষয় বেশ কয়েকটি কারণে। কর্মী মৌমাছিরা নিজেরা সাধারণত প্রজনন করে না সুতরাং আপনাকে একটি জাতের রানির সাথে অন্য একটি জাতের ড্রোন (পুরুষ) এর আন্তঃপ্রজনন করাতে হবে। তারপর ভালোভাবে কন্যা শ্রমিকদের আচরণ লক্ষ করতে হবে। এটাই করেছিলেন,ডাবলিউ জি রথেনবুহলার। প্রথম প্রজন্মের সব হাইব্রিড বা সংকর কন্যাদের মৌচাকগুলো ‘নন–হাইজিনিক’ প্রকারের: তাদের ‘হাইজেনিক’ পিতামাতার আচরণ হারিয়ে গেছে বলেই মনে হয়। দেখা গেছে হাইজিনিক জিন সেখানে এখনও আছে কিন্তু তারা সেখানে রিসেসিভ, যেমন, মানুষের নীল চোখের রিসেসিভ জিন। যখন রোথেনবুহলার আবার ব্যাক ক্রস বা আন্তঃপ্রজনন ঘটান প্রথম প্রজন্মের সংকরদের সাথে বিশুদ্ধ হাইজেনিক জাতের (আবারো অবশ্যই রাণী ও ড্রোন ব্যবহার করে), তিনি এবার বিস্ময়কর কিছু ফলাফল দেখতে পান। কন্যাদের মৌচাক মোট তিন প্রকারের হয়, একটি গ্রুপ সঠিক হাইজিনিক আচরণ করে, দ্বিতীয়টি কোনো হাইজিনিক ব্যবহার দেখায় না আদৌ। আর তৃতীয়টি আংশিক হাইজিনিক হয়। শেষ গ্রুপটি মৌচাকের আক্রান্ত লার্ভাসহ কোষের মুখে মোমের আবরণটি সরায় ঠিকই, তারা আর বাকী কাজটা করে না, অর্থাৎ আক্রান্ত লার্ভাদের বাইরে নিয়ে এসে ফেলে দেয়ার কাজটি তারা করেনা। রোথেনবুহলার বিষয়টির ব্যাখ্যা করেন এভাবে, আসলে সেখানে দটি ভিন্ন জিন আছে, একটি জিন মোমের আবরণ খোলার জন্য আর একটি জিন আক্রান্ত লার্ভাদের বাইরে ফেলে দিয়ে আসার জন্য। সাধারণ হাইজেনিক জাতদের দুটো জিনই থাকে, আর যারা হাইজিনিক না তাদের থাকে এর বদলে তাদের অ্যালিল বা প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি জিন। আর সংকর স্ট্রেইনটি যারা এর অর্ধেক কাজ করে তাদের ধারণা করা হয় তারা কেবল হয়তো মোমের আবরণ খোলা বা ‘আনকাপিং’ জিনটি পায় (দ্বিগুণ মাত্রায়) কিন্তু লার্ভাদের বাইরে বের করে এনে ফেলে দেবার বা ‘থ্রোইং আউট’ জিনটি না। রোথেলবুহলার অনুমান করেছিলেন তার পরীক্ষাধীন গ্রুপের পুরোপুরি নন হাইজিনিক মৌমাছিরা হয়তো একটি সাবগ্রুপকে লুকিয়ে রাখে যারা গ্রোয়িং আউট জিন ধারণ করে কিন্তু সেটি দেখাতে পারেনা কারণ তাদের আনক্যাপিং জিনটি থাকে না। তিনি এটি নিশ্চিৎ করেন চমৎকার একটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিজেই মোমের ঢাকনীগুলো সরিয়ে রেখে, দেখা যায় আসলেই আপাতদৃষ্টিতে নন হাইজিনিক মৌমাছিদের অর্ধেক মৌমাছি পুরোপুরি ভাবে বিশুদ্ধ ‘গ্লোয়িং আউট’ আচরণটি প্রদর্শন করে(৬)।
