সম্প্রতি সিমুলেশনের বড় একটি অংশ পরিচালনা করার দ্বায়িত্ব নিয়েছে কম্পিউটার, শুধু সামরিক কৌশলই না, সব ক্ষেত্রেই, অনাগত কাল সম্বন্ধে যেখানে ভবিষ্যদ্বাণী করার দরকার। অর্থনীতি, পরিবেশবিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান ও আরো অনেক ক্ষেত্রেই এটি ব্যবহার হচ্ছে এখন। এই প্রক্রিয়া কাজ করে এভাবে। কম্পিউটারে পৃথিবী সংক্রান্ত কিছু বিষয়ের মডেল আগে থেকেই তৈরী করা হয়। এর মানে এই না যে, আপনি যদি ঢাকনী সরিয়ে ⇒ খুলে দেখেন আপনি সেখানে ক্ষুদ্রকার অনুরুপ কোনো মডেল বা ডামি দেখতে পাবেন এর ভিতরে যে বিষয়টিকে সিমুলেট করা হচ্ছে সেই বিষয়টির আকার অনুসারে। দাবা খেলতে পারা কম্পিউটারে ভিতরে কোনো ‘মানসিক ছবি’ নেই তার স্মৃতির ব্যাঙ্কের ভিতর, যা কিনা দেখে মনে করা যেতে পারে দাবার গুটি সাজিয়ে রাখা কোনো দাবা খেলার বোর্ড দাবার বোর্ড ও তার বর্তমান অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করবে ইলেকট্রনিক সাংকেতিক কিছু সংখ্যা। আমাদের কাছে কোনো একটি মানচিত্র হচ্ছে ক্ষুদ্রতর স্কেলে বা মাত্রায় বানানো পৃথিবীর কোনো একটি অংশের মডেল, যাকে দ্বিমাত্রিক একটি রুপে উপস্থাপন করা হয়েছে সব উপাত্ত জড়ো করার মাধ্যমে। কোনো একটি কম্পিউটারে একটি মানচিত্রকে বিকল্পভাবে প্রতিনিধিত্ব করা যেতে পারে শহরের তালিকা ও অন্যান্য কিছু স্পটের তালিকা হিসাবে। যাদের প্রত্যেকের দুটো সংখ্যা মান থাকবে, অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশ। কিন্তু কিছু যায় আসে না কম্পিউটার আসলে কিভাবে মডেলটি ধারণ করে এর মাথায়, শুধুমাত্র বিবেচ্য বিষয় এটি এমন একটি রুপে ধারণ করবে, যার উপর সে কাজ করতে পারে, নিয়ন্ত্রণ ও নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারে এবং মানুষ অপারেটরের কাছে সে রিপোর্টগুলো পাঠাতে পারে এমন একটি রুপে যা মানুষ অপারেটররা বুঝতে পারেন। সিমুলেশনের এই কৌশল ব্যবহার করে, মডেল যুদ্ধ জেতা ও হারা যেতে পারে, কাল্পনিক বিমান ওড়ে অথবা ধ্বংস হয়,অর্থনৈতিক নীতি উন্নতির বা ধ্বংসের কারণ হয়; প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে একটি কম্পিউটারের মধ্যে, বাস্তব জীবনের এমন কিছু করার জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের সামান্য খণ্ডাংশ ব্যবহার করে। অবশ্যই পৃথিবীর জন্য ভালো মডেল আছে আবার খারাপ মডেল আছে, এমনকি সবচেয়ে ভালোটাই প্রকৃত পরিস্থিতির নিকটবর্তী একটি রুপ মাত্র। কোনো পরিমান কাল্পনিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারবো না বাস্তবে আসলেই কি ঘটবে। কিন্তু কোনো ভালো সিমুলেশন অবশ্যই অনেক বেশী ভালো কোনো ধরনের অন্ধ প্রচেষ্টা আর ভুল করার প্রক্রিয়ার চেয়ে। সিমুলেশনকে বলা যেতে পারে ট্রায়াল ও এরর’ প্রক্রিয়ার প্রতিনিধিক ট্রায়াল অ্যান্ড এরর, যে নামটি দুর্ভাগ্যজনকভাবে বহু আগেই করায়ত্ত করেছেন ইঁদুর মনোবিজ্ঞানীরা।
যদি সিম্যুলেশন এতটাই উত্তম ধারণা হয়ে থাকে, আমরা হয়তো আশা করতে পারি সারভাইভাল মেশিনও হয়তো এটি প্রথম আবিষ্কারও করেছিল। মোটকথা তারা বহু আগে মানব প্রকৌশলীদের অনুকরণ করা বহু কৌশল উদ্ভাবন করেছিল, আমাদের যখন কারোরই অস্তিত্ব ছিলনা সেই সময়ে :যেমন ফোকাস করার লেন্স, প্যারাবলিক রিফ্লেকটর, শব্দ তরঙ্গর ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইসিস, সার্ভো-কন্ট্রোল, সোনার, আগত তথ্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বাফার এবং দীর্ঘ-নামসহ অসংখ্য কৌশল, যাদের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখানে অপ্রয়োজনীয়। তাহলে সিমুলেশনের ব্যপারটি কি? বেশ, যখন আপনি নিজে কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে ভবিষ্যত সংক্রান্ত কিছু অজানা উপাত্ত বিদ্যমান, আপনাকে সেখানে একধরনের সিমুলেশনের সাহায্য নিতে হয়। আপনি কল্পনা করেন কি কি হতে পারে আপনি যদি আপনার সামনে থাকা প্রতিটি বিকল্প পরীক্ষা করে দেখেন। আপনি আপনার মস্তিষ্কে একটি মডেল তৈরী করে নেন, পৃথিবীর সব কিছু নিয়ে নয় বরং কিছু সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় বা নিয়ামকের সেট, যাদের আপনি ভাবছেন সেই বিশেষ সিদ্ধান্ত নেবার জন্য প্রাসঙ্গিক। আপনি হয়তো স্পষ্টভাবে আপনার মানসচক্ষতে পুরো বিষয়টি দেখতে পারেন অথবা সেই সব বিষয়গুলোর কোনো রুপকে আপনার মনের সিমুলেশন আপনি দেখতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। যেকোনো ক্ষেত্রেই খুবই কম সম্ভাবনা আছে যে আপনার মস্তিষ্কের কোথাও আসলেই একটি জায়গায় আপনি যা কল্পনা করছেন সেটির সত্যিকারের একটি স্থান দখলকারী মডেল আছে। কিন্তু, ঠিক কম্পিউটারের মতই, কিভাবে আপনার মস্তিষ্ক এর মডেলটি ব্যবহার করছে তার বিস্তারিত প্রক্রিয়াটি, এটি যে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কোনো ঘটনা পূর্বধারণা করতে সক্ষম তার থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সারভাইভাল মেশিনগুলো যারা কিনা ভবিষ্যতের কিছু কাল্পনিকভাবে সিমুলেট করতে পারে তারা অন্য সেই সব সারভাইভাল মেশিন থেকে বহু ধাপ এগিয়ে যায়, যারা শুধুমাত্র কিছু করা ও ভুল করার মাধ্যমে শেখে। সুস্পষ্টভাবে ট্রায়ালের সমস্যা হচ্ছে যে, এটি সময় আর শ্রমসাপেক্ষ একটি ব্যাপার। আর সুস্পষ্টভাবে ভুল হচ্ছে প্রায়শই প্রাণঘাতি। সিমুলেশন এ-কারণেই নিরাপদ আর দ্রুততর।
সিমুলেশন করার দক্ষতার বিবর্তন খুব সম্ভবত তার চূড়ান্ত রুপ পেয়েছিল আত্মগত সচেতনার উদ্ভব হবার মাধ্যমে। আর কেন এমনটাই ঘটার কথা, আমার মতে আধুনিক জীববিজ্ঞানে এটাই সবচেয়ে গভীরতম রহস্য। কোনো কারণ নেই মনে করার যে, ইলেক্ট্রনিক কম্পিউটার সচেতন যখন তারা কোন কিছু সিমুলেট করে, যদিও আমাদের স্বীকার করতে হবে ভবিষ্যতে তারা হয়ত সেটাই হতে পারে। হয়তো সচেতনার উদ্ভব হয়েছিল যখন মস্তিষ্কের পৃথিবীকে সিমুলেশন করার ক্ষমতা এতটাই সম্পূর্ণ হয়েছিল যে, এটি অবশ্যই তার নিজের একটি মডেলও সংযুক্ত করেছিল (৪)। কোন সারভাইভাল মেশিনের শরীর ও হাত-পা অবশ্যই কল্পনার পৃথিবীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তৈরী করে। অনুমান করা যায় একই ধরনের কোনো কারণে, সিমুলেশনটাকেই মনে করা যেতে পারে পৃথিবীর কোনো একটি অংশের মত, যাকে সিমুলেশন করা হবে। আসলেই এর জন্য আরেকটি শব্দ হতে পারে ‘আত্ম-সচেতনতা। কিন্তু আমি এটাকে সচেতনতা বিবর্তনের পুরোপুরিভাবে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা হিসাবে মনে করিনা। আর এর কারণ আংশিকভাবে শুধুমাত্র এর সাথে নিরন্তর পশ্চাৎমুখী যুক্তি বা রিগ্রেসের আশ্রয় নিতে হয়– যদি কোনো একটি মডেলের মডেল থাকে, তাহলে কেনই বা মডেলের মডেলের মডেলের মডেল .. হবে না?
