ঠিক যেমন অ্যান্ড্রোমিডাবাসীদের দরকার ছিল একটি কম্পিউটার, যা পৃথিবীতে থাকবে তাদের হয়ে দৈনন্দিন সিদ্ধান্তগুলো দেবার জন্য, আমাদের জিনগুলো সেভাবে মস্তিষ্ক তৈরী করেছে। কিন্তু জিনরা শুধুমাত্র অ্যান্ডোমিডাবাসীরা না, যারা সাংকেতিক বার্তা পাঠিয়েছে; তারা নিজেরাও নির্দেশাবলী ধারণ করে। আর যে কারণে তারা আমাদের সুতোয় বাধা কোনো পুতুলের মত সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা সেটিও সেখানে একই: টাইম ল্যাগ বা কোনো কারণ ও তার ফলাফলের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান। জিন কাজ করে প্রোটিন সংশ্লেষণ নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করার এটি একটি শক্তিশালী উপায় কিন্তু এটি খুব মন্থর একটি প্রক্রিয়া। ধৈর্য সহকারে প্রোটিন সুতো নিয়ন্ত্রণ করে ভ্রণ তৈরী করার জন্য বহু মাসের পরিশ্রম প্রয়োজন। কিন্তু অন্য দিকে, আচরণ সংক্রান্ত বিষয়টির মূল হচ্ছে এটি অত্যন্ত দ্রুত একটি প্রক্রিয়া। এটি যে সময়ের পরিমাপে কাজে করে সেটি মাস না বরং সেকেন্ড বা সেকেন্ড এর ভগ্নাংশ সময়ের মাত্রায়। কিছু ঘটলো আশে পাশে, মাথার উপর একটি পেঁচা বসে আছে। লম্বা ঘাসের নাড়াচাড়া শিকারে উপস্থিতি জানিয়ে দেয় এবং মাত্র কয়েক মিলি সেকেন্ডে পুরো স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় হয়ে ওঠে, মাংসপেশী লাফ দিয়ে ওঠে, কারো জীবন বাঁচে বা হারায়। জিনরা এধরনের কোনো প্রতিক্রিয়া করার সময় পায় না। অ্যানড্রোমিডাবাসীদের মত জিনরা শুধু পারে তাদের কাজ চালানোর জন্য খুব ভালোভাবে আগে থেকেই একটি দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কাজ করার কম্পিউটার তৈরী করে নিতে এবং আগে থেকে নানা ধরনের নিয়ম আর উপদেশ সেখানে প্রোগ্রাম করে দেয়া যা সাহায্য করে যতটা ঘটনা ঘটবে বলে সে আশা করে, সেই সব পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য। কিন্তু জীবন, দাবা খেলার মত সেখানে অনেক বেশী ভিন্ন ভিন্ন সম্ভাবনার ঘটনাবলী আছে, যাদের সব কিছু আগে থেকে ধারণা করা সম্ভব না। এবং দাবার প্রোগ্রামারদের মত, জিনদেরকে সারভাইভাল মেশিনদের নির্দেশ দিতে হয় সব কিছু সুনির্দিষ্টভাবে না বরং সাধারণ কৌশল ও উপায় সংক্রান্ত বিষয়ে যা জীবন ধারণের জন্যে প্রয়োজনীয় (৩)।
যেমন, জে. জেড. ইয়ং বলেছিলেন, জিনদের এমন কিছু কাজ করতে। হয় যা ভবিষ্যদ্বাণী সদৃশ। যখন একটি ভ্রণ সারভাইভাল মেশিন তৈরী হচ্ছে, এর জীবনের বিপদ ও সমস্যাগুলো থাকে ভবিষ্যতে। কে বলতে পারে কোনো মাংসাশী প্রাণি ঝোঁপের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে আসে বা দ্রুত দৌড়াতে পারে এমন কোনো শিকার দ্রুত তার সামনে দিয়ে ছুটে যাবে এবং আঁকাবাঁকা হয়ে দৌড়াবে? কোনো মানব ঈশ্বর প্রেরিত দূত যেমন পারবে না, তেমনই পারবে না কোন জিন। কিন্তু বেশ কিছু সাধারণ ভবিষ্যদ্বাণী করা যেতে পারে। পোলার ভালুকদের জিনরা যেমন বেশ নিরাপদের সাথে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে, এখনও জন্ম হয়নি তাদের সারভাইভাল মেশিনের জন্য আগামী ভবিষ্যৎ খুবই শীতল হবে। তারা এটিকে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী বলে মনে করে না, তারা কোনো কিছুই চিন্তাই করে নাঃ তারা শুধু মোটা পুরুত্বের চুলের একটি আস্তরণ তৈরী করে, কারণ তারা ঠিক সেই কাজটি করেছে আগে তাদের অতীত শরীরগুলোয় এবং সেকারণে এটি এখনও টিকে আছে তাদের জিনপুলে। তারা আরো ভবিষ্যদ্বাণী করে যে মাটিতে বরফ থাকবে এবং তাদের ভবিষ্যদ্বাণী রুপ নেয় শরীরের চুলের রং সাদা করার জন্য, যা সাদা বরফের সাথে সহজেই মিশে ক্যামোফ্ল্যাজ বা লুকিয়ে থাকার বেশ তৈরী করবে। যদি উত্তর মেরুর জলবায়ু দ্রুত বদলে যায় কোনো কারণে যে কোনো শিশু মেরু ভালুক নিজেকে জন্ম নিতে দেখবে ক্রান্তীয় কোনো মরুভূমিতে, তাহলে জিনদের ভবিষ্যদ্বাণী হবে ভুল এবং এর জন্য তাদের মূল্য পরিশোধ করতে হবে। শিশু সেই ভালুকটি মারা যাবে, যার ভিতরে সেই জিনগুলোর বাস।
কোনো একটি জটিল পৃথিবীতে ভবিষদ্বাণী খুব ভাগ্য নির্ভর একটি কাজ। প্রতিটি সিদ্ধান্ত যা কোনো একটি সারভাইভাল মেশিনকে নিতে হয় সেটি জুয়া খেলার মত এবং জিনদের কাজ হচ্ছে মস্তিষ্ককে আগে থেকেই প্রোগ্রাম করে রাখা যেন গড়পড়তা তারা সেখানে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি যেন তাদের উপকারে আসে। বিবর্তনের ক্যাসিনোতে যে বিনিময় মূল্যটি ব্যবহৃত হয় সেটি হচ্ছে ‘টিকে থাকা’, খুব কঠোর অর্থে ‘জিনদের’ টিকে থাকা, কিন্তু বহু উদ্দেশ্যে বলা যেতে পারে একক সদস্যদের টিকে থাকাটা খুব নিকটবর্তী অর্থে একটি যুক্তিসঙ্গত বিনিময় মূল্য হতে পারে। যদি আপনি কোনো পানির উৎসের কাছে পানি খেতে যান, কোনো শিকারী প্রাণীর খাদ্য হবার সম্ভাবনায় আপনি নিজের ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন, যারা তাদের জীবন ধারণ করে পানির মধ্যে শিকার ধরার জন্যে লুকিয়ে থেকে। কিন্তু সেই ভয়ে আপনি যদি পানি খেতে না যান, তাহলে একসময় আপনি তৃষ্ণার্ত হয়ে মারা যাবেন। আপনি যে পথই বেছে নেন না কেন, ঝুঁকি থাকবেই এবং কিভাবে আপনার জিনগুলোর দীর্ঘায়ু হবার সম্ভাবনাকে বাড়ানো যায় আপনাকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হয়তো সবচেয়ে ভালো নীতিটি হবে, যতক্ষণ না আপনার তৃষ্ণা পাচ্ছে ততক্ষণ পানির কাছে গিয়ে পানি খাওয়াটা স্থগিত রাখতে, তারপর সময় হলে সেখানে গিয়ে বেশ ভালো পরিমান পানি পান করে আসা, যেন আপনি অনেকক্ষণ সময় পানি ছাড়া থাকতে পারেন। বিকল্পভাবে সবচেয়ে বড় বাজটি হবে অল্প করে মাঝে মাঝে পানি পান করা, পানির কোনো উৎসের পাশ দিয়ে দৌড়াবার সময় দ্রুত এক ঢোঁক পানি গিলে ফেলা। তবে কোনটি বাজীর সবচেয়ে ভালো দান, সেটি নির্ভর করে নানা ধরনের জটিল বিষয়গুলোর উপর, শুধুমাত্র শিকারী প্রাণীদের শিকার করার অভ্যাসই ন্যুনতম শর্ত না, কারণ সেটিও বিবর্তিত হয়েছে শিকারী প্রাণীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে, সবচেয়ে দক্ষ কৌশল হিসাবে। সুতরাং এখানে বিপক্ষের বেশ কিছু শর্তকে গুরুত্বের সাথে বিবচেনা করতে হবে, কিন্তু অবশ্যই প্রাণীদের সম্বন্ধে আমাদের এমনভাবে ভাবতে হবে না যে, তারা এই হিসাব নিকাশগুলো খুব সচেতনভাবে করে থাকে। আমাদের শুধু বিশ্বাস করতে হবে যে সেই সব একক সদস্যদের জিন তাদের মগজকে এমনভাবে তৈরী করেছে যে তারা এই সবক্ষেত্রে সঠিক বাজিটা খেলে, যার প্রত্যক্ষ ফলাফল হচ্ছে সেই সব সদস্যদের টিকে থাকা এবং সেভাবেই তারা তাদের সেই একই জিন ভবিষ্যত প্রজন্মের মধ্যে বিস্তারে সাহায্য করবে।
