আমাদের থেকে ২০০ আলোক বর্ষ দূরে, অ্যান্ড্রোমিডা নক্ষত্রপুঞ্জে (২) একটি সভ্যতার অস্তিত্ব আছে, এবং তারা তাদের সভ্যতা আর সংস্কৃতিকে দূরবর্তী জগতগুলোতে প্রচার করে ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছুক। কিভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে সেই কাজটি করা যেতে পারে? সরাসরি সেখানে ভ্রমণ করার তো প্রশ্নই আসে না। আলোর গতি তাত্ত্বিকভাবে উপরে একটি সীমা বেধে দিয়েছে এই মহাবিশ্বে কি গতিতে আপনি একটি জায়গা থেকে অন্য একটি জায়গায় যেতে পারবেন, আর যান্ত্রিক বিবেচনা এই গতিকে আরো নীচে নামিয়ে এসেছে, যা কিনা প্রায়োগিক স্তরে সম্ভব হতে পারে। এছাড়াও মহাবিশ্বে হয়তো বাসযোগ্য এমন কোনো জগৎ নাও থাকতে পারে, যেখানে যাবার জন্য চেষ্টা করা যেতে পারে। আর এছাড়া আপনি কিভাবেই বা জানবেন কোন দিক বরাবর যেতে হবে? রেডিও বরং মহাবিশ্বের বাকী অংশের সাথে যোগাযোগ করার ভালো কোনো উপায়। কারণ, যদি আপনার যথেষ্ট ক্ষমতা থাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট দিক বরাবর সংকেত না পাঠিয়ে আপনার সংকেতকে সব দিক বরাবর সম্প্রচার করতে পারলে, আপনি হয়তো অনেক বেশী সংখ্যক জগতের কাছে পৌঁছাতে পারবেন ( এই সংখ্যা বৃদ্ধি পায় যে পরিমান দূরত্ব সংকেতটি অতিক্রম করে তার বর্গফল অনুযায়ী); বেতার তরঙ্গ আলোর গতিতে ভ্রমণ করে, তার মানে হলো সেই সংকেতটি অ্যান্ড্রোমিডা থেকে পৃথিবীতে আসতে লাগবে ২০০ বছর। এই ধরনের দুরত্বের সমস্যাটি হচ্ছে এই দূরত্বে আপনি কখনোই কোনো কথোপকথন অগ্রসর করতে পারবেন না। এমনকি যদি আপনি সেই বাস্তব সত্যটিও বাদ দেন যে, প্রতিটি ধারাবাহিকভাবে আসা বার্তা পৃথিবীতে সম্প্রচার করবে এমন মানুষরা যারা প্রায় বারটি প্রজন্ম দ্বারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন, এত দূরে বসে কথপোকথন অব্যাহত রাখা স্পষ্টতই সময়ের অপচয়।
সত্যিকারভাবে আমাদের জন্য এই সমস্যাটি শীঘ্রই উদ্ভব হবে: পৃথিবী আর মঙ্গল গ্রহ থেকে বেতার তরঙ্গ আসা যাওয়া করতে সময় নেয় প্রায় চার মিনিট। কোনো সন্দেহ নেই যে নভোচারীদের একটার পর একটা পাল্টা বাক্য বিনিময়ের মাধ্যমে কথা বলার আচরণটি বদলাতে হবে এবং তার বদলে তাদের ব্যবহার করতে হবে দীর্ঘ মনোলোগ বা সলিলিকুই, অনেকটা চিঠির মত, বাক্য বিনিময়ের মত নয়। যেমন, আরেকটি উদাহরণ, রজার পেইন আমাদের দেখিয়েছেন, সমুদ্রে শব্দের গুণাবলী বা অ্যাকুষ্টিকে কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে, যার অর্থ খুব বেশী মাত্রায় জোরে উচ্চারিত তিমির কোনো গান তাত্ত্বিকভাবে সারা পৃথিবীর জুড়ে শোনা যাবে, শর্ত একটাই, তিমিরা যদি একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় সাঁতার কাটে। আসলেই তারা এভাবে নিজেদের সাথে খুব বেশী দুরত্বে যোগাযোগ করে কিনা তা আমাদের জানা নেই, কিন্তু তারা যদি সেটা করে থাকে, তাদেরও সেই মঙ্গল গ্রহে বাস করা কোনো নভোচারীর মত একই সমস্যা হবে। পানিতে শব্দের গতি এমন যে, কোনো গানের আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে এবং একইভাবে তার উত্তর পেতে দুই ঘন্টা সময় লাগবে। আমি প্রস্তাব করছি এটিকে সেই বাস্তব সত্যটির একটা ব্যাখ্যা হিসাবে, কেন কিছু তিমি দীর্ঘ ধারাবাহিক সলিলোকুই বা স্বগতোক্তির মত শব্দ তৈরী করে, কোনো পুনরাবৃত্তি করা ছাড়াই, পুরো আট মিনিট ধরে। তারপর আবার তারা গানের শুরুতে ফিরে যায় এবং পুরো গানটি আবার পুনরাবৃত্তি করে। এভাবে বহুবার সেটি চলতে থাকে, প্রতিটি পূর্ণাঙ্গ চক্রের স্থায়িত্ব প্রায় আট মিনিট।
গল্পের সেই অ্যান্ড্রোমিডাবাসীরাও ঠিক একই কাজটি করছিল। যেহেতু উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করার কোনো অর্থ হয়না, তারা যা কিছু বলতে চায় সবকিছু একসাথে গুছিয়ে একটি বিশাল অখণ্ড বার্তা হিসাবে তারা মহাশূন্যে সম্প্রচার করেছিল, বার বার, কয়েক মাস ব্যাপী একটি সময়ের চক্রাকারে। তাদের সেই বার্তার সাথে তিমির বার্তার যদিও মিল নেই। তাদের বার্তায় একটি বিশাল কম্পিউটার বানানোর জন্য সাংকেতিক নির্দেশাবলী ছিল। অবশ্যই সেই নির্দেশাবলী সেখানে মানুষের ভাষায় লেখা ছিল না, কিন্তু কোনো দক্ষ ক্রিপ্টোগ্রাফারের পক্ষে যেকোনো সাংকেতিক ভাষার মর্মোদ্ধার করার সম্ভব, বিশেষ করে যদি সেই কোডটি যিনি তৈরী করেছেন তিনি যদি চান, সহজে কেউ সেটির পাঠোদ্ধার করুক। জরডেল ব্যাঙ্ক রেডিও টেলিস্কোপে সেই বার্তাটি ধরা পড়ে এবং অবশেষে বার্তাটির অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়, এবং সেই প্রোগ্রামটি চালানোর জন্য একটি কম্পিউটার তৈরী করা হয়। যার ফলাফল মানবজাতির জন্য প্রায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের হয়েছিল, কারণ অ্যান্ড্রোমিডাবাসীদের উদ্দেশ্য সর্বজনীনভাবে খুব পরোপকারী মানসিকতাপূর্ণ ছিল না, এবং তাদের নকশা অনুযায়ী বানানো কম্পিউটারটি সারা পৃথিবীব্যাপী একনায়কতন্ত্র স্থাপন প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছিল, তবে গল্পের নায়ক একটি কুড়াল দিয়ে সেটি ধ্বংস করে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল অবশেষে।
আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, সবচেয়ে মজার প্রশ্নটি হচ্ছে, কি অর্থে বলা যেতে পারে যে অ্যান্ড্রোমিডাবাসীরা পৃথিবীর নানা ঘটনাবলী নিয়ন্ত্রণ করেছিল। প্রতিটি মুহূর্তে কম্পিউটার কি করবে তার উপর তাদের সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, আসলেই আদৌ কম্পিউটারটি তৈরী করা হয়েছিল কিনা সেটা তো তাদের জানারই কোনো উপায় ছিলনা। কারণ সেই খবরটি তাদের কাছে পৌঁছাতে ২০০ বছর লাগবে। কম্পিউটারের সব সিদ্ধান্ত আর কাজ পুরোপুরি তার নিজের। কোন ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবার জন্যে এটির এমনকি তার পরিকল্পক মাষ্টারদের কাছেও পরামর্শ নেবারও কোনো সুযোগ নেই। অনতিক্রম্য ২০০ বছরের প্রতিবন্ধকতার কারণে, তার সব নির্দেশগুলো আগে থেকে এর ভিতর তৈরী করে দেয়া হয়েছিল। নীতিগতভাবে, অবশ্যই আগে থেকে প্রোগ্রাম করতে হবে, অনেকটাই দাবা খেলার কম্পিউটারের মত, কিন্তু আরো বেশী নমনীয় ও ক্ষমতাধর স্থানীয় তথ্য ধারণ করার জন্য। আর এর কারণ সেই প্রোগ্রামটি পরিকল্পনা করতে হয়েছিল এমনভাবে যেন তা শুধু পৃথিবীতেই কাজ করে তাই না, বরং যেকোনো গ্রহে, যেখানে অগ্রসর সভ্যতার উপস্থিতি আছে, যেকোনো সেই একগুচ্ছ গ্রহ, যেখানকার বিস্তারিত পরিবেশ পরিস্থিতি সম্বন্ধে অ্যান্ড্রোমিডাবাসীদের আগে থেকে জানার কোনো উপায় ছিলনা।
