খুবই সাধারণ একটি ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে যে, যেহেতু একটি মেশিন যেমন, গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মূলত পরিকল্পনা এবং তৈরী করেছে সচেতনতাসহ মানুষরা, সুতরাং অবশই এটি সত্যিকারভাবে সচেতনতাসহ মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন। এই ভ্রান্ত যুক্তিটির আরেকটি রুপ হচ্ছে যে, কম্পিউটার আসলে দাবা খেলে না, কারণ তারা সেই কাজটি করতে পারে যখনই কোনো মানব অপারেটর সেটি করতে তাদের নির্দেশ দেয়। বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ বোঝা যে কেন এটি ভুল একটি যুক্তি। কারণ এটি আমাদের সেই সত্যটি বোঝার ক্ষমতার উপর এর প্রভাব ফেলে, যখন আমরা বলছি যে, জিনদের বলা যেতে পারে তারা আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার জন্য কম্পিউটারের দাবা খেলা খুব ভালো একটি উদাহরণ হতে পারে। সুতরাং সংক্ষেপে বিষয়টি নিয়ে আমি আলোচনা করবো।
কম্পিউটার এখনও মানব গ্রান্ড মাষ্টারদের মত দাবা খেলতে পারেনা, তবে তারা এমন একটি মানদণ্ডে পৌঁছেছে যা কোনো দক্ষ সখের খেলোয়াড়ের সমতুল্য। আরো কঠোর অর্থে বলতে গেলে, “প্রোগ্রামগুলো’ দক্ষ শখের খেলোয়াড়দের স্তরে পৌঁছাতে পেরেছে, কারণ একটি দাবা খেলার প্রোগ্রাম কোন কম্পিউটারের শরীরের মধ্যে বসে এর দক্ষতা দেখাচ্ছে সেটা নিয়ে সে আদৌ খুঁত খুঁতে নয়। তাহলে এখানে মানব প্রোগ্রামারদের ভূমিকাটি কি? প্রথমত, সে অবশ্যই প্রতিটি মূহুর্তে কম্পিউটারকে নিয়ন্ত্রণ করছে না, পুতুল নিয়ে খেলা দেখানো শিল্পীর হাতের বাধা পুতুলদের মত। কারণ সেটি পুরোপুরিভাবে প্রতারণা হবে। তার কাজ হচ্ছে প্রোগ্রামটি লেখা, এবং সেই প্রোগ্রামটি কম্পিউটারে স্থাপন করা এবং তারপর কম্পিউটার নিজের মত করে একা একাই কাজ করবে: আর কোনো মানবীয় হস্তক্ষেপ নেই, শুধুমাত্র প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় তার দান কি হবে সেটি কি বোর্ডের মাধ্যমে প্রবেশ করানো ছাড়া। প্রোগ্রামার কি তাহলে সম্ভাব্য সব দাবার দান আগে থেকে অনুমান করে রেখেছেন এবং কম্পিউটারকে সেই ভালো দানগুলোর একটি দীর্ঘ তালিকা প্রদান করেছেন, যেকোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য একটি? অবশ্যই না, কারণ দাবা বোর্ডে সম্ভাব্য অবস্থানের সংখ্যা এতই বিশাল যে, পুরো পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে সেই তালিকা সম্পূর্ণ করার আগে। আর একই কারণে সম্ভাব্য সব দান ব্যবহার করে সম্ভবত কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রাম করা সম্ভব নয়, যা কিনা এটি ‘কল্পনা’ করতে পারে, এবং প্রতিটি দানের পরবর্তী পাল্টা দানগুলো, যতক্ষণ না এটি খেলাটি জিতবার একটি কৌশল খুঁজে পায়। দাবার বোর্ডে সারা গ্যালাক্সীতে যত পরমাণু আছে তারচেয়ে বেশী সংখ্যক সম্ভাব্য দান আছে। কম্পিউটারকে দাবা খেলার জন্য প্রোগ্রামিং করার এগুলো হচ্ছে অসমাধানযোগ্য কিছু সমস্যা। আসলেই এটি অতিমাত্রায় একটি কঠিন সমস্যা এবং এজন্য খুব একটা বিস্ময়কর না ব্যপারটা যে, সবচেয়ে সেরা প্রোগ্রামগুলো এখনও গ্রান্ড মাস্টারের মর্যাদা অর্জন করতে পারেনি।
একজন প্রোগ্রামারের আসল দ্বায়িত্ব হচ্ছে বরং অনেকটা বাবার মত, যিনি তার ছেলেকে দাবা খেলা শেখাচ্ছে। তিনি কম্পিউটারকে খেলার মূল দানগুলো সম্বন্ধে নির্দেশ দেন, আলাদা আলাদাভাবে প্রতিটি সম্ভাব্য শুরুর দান থেকে না, বরং বলা যায় অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত আরো সাধারণ কিছু নিয়ম ব্যবহার করে। তিনি হয়তো আক্ষরিক অর্থে পরিষ্কার ইংরেজীতে বলবেন না যে, ‘বিশপ বা গজ কৌণিক পথে চলে’ বরং এর গাণিতিক সমতুল্য কোনো নির্দেশ, যেমন যদিও সংক্ষিপ্তভাবে: ‘বিশপের নতুন কোঅর্ডিনেট পাওয়া যাবে তার পুরোনো কোঅর্ডিনেট থেকে, একই ধ্রুব পরিমান সংখ্যা যোগ করে– যদিও একই চিহ্ন হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই–পুরোনো x আর y উভয় কোঅর্ডিনেটের সাথে। তারপর তিনি হয়তো কিছু উপদেশ’ সেখানে প্রোগ্রাম করতে পারেন, যা লেখা হয় কোনো এক ধরনের গাণিতিক লজিক্যাল ভাষায়, যা মানুষের ভাষায় একই ধরনের ইঙ্গিতের মত, যেমন ‘রাজাকে কখনোই অরক্ষিত রাখা যাবে না বা কিছু উপযোগী কৌশল যেমন, নাইট বা ঘোড়া ব্যবহার করে ফর্কিং করা। বিস্তারিত বিষয়গুলো কোন সন্দেহ নেই দারুন আগ্রহ উদ্দীপক, কিন্তু সে বিষয়ে আলোচনা আমাদের জন্য অপ্রাসঙ্গিক হবে। প্রধান বিষয়টি হচ্ছে এটি; যখন আসলেই এটি খেলবে, কম্পিউটার একা একাই খেলবে, এবং তখন সে তার মাষ্টার বা প্রোগ্রামারের কাছ থেকে কোনো প্রত্যক্ষ সাহায্য আশা করতে পারেনা। প্রোগ্রামাররা সম্ভাব্য সেরা সব কৌশল প্রোগ্রাম করে আগে থেকে কম্পিউটারকে প্রস্তুত করে রাখতে পারেন, বিশেষ কিছু দক্ষতার তালিকার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করে নানা ধরনের কৌশল আর দান সম্বন্ধে ইঙ্গিত দিয়ে রাখতে।
জিনরাও তাদের টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। তারা যেটা করতে পারে সেটি হলো সব কিছু আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখে, এরপর সারভাইভাল মেশিনকে একাই তার সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং জিনরা অক্রিয় হিসাবে তাদের ভিতর বসে থাকে, সরাসরি তাদের আঙ্গুলগুলো পুতুলদের নিয়ন্ত্রণ করার সুতায় ধরা থাকে না, বরং তারা কাজ করে পরোক্ষভাবে, কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের মত। কেন তারা এত অক্রিয়? মাঝে মাঝে কেন তারা সরাসরি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নেয় না? এর উত্তরটা হচ্ছে তারা সেটা করতে পারেনা কারণ সময়ের ব্যাবধান বা টাইম ল্যাগ সমস্যা। ভালো করে এটা বোঝা সম্ভব হতে পারে আরেকটি সদৃশ উদাহরণ ব্যবহার করলে, এটির উৎস বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী; ফ্রেড হয়েল ও জন এলিয়টের লেখা A for Andromeda, একটি আকর্ষণীয় কল্পকাহিনী। এবং যেকোনো ভালো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মত কাহিনীর অন্তরালে এরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনা আছে। বিস্ময়কর যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে সুস্পষ্টভাবে বইতে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি, পুরোটাই ছেড়ে দেয়া হয়েছে পাঠকের কল্পনার উপর। আমি আশা করছি লেখকদ্বয় কিছু মনে করবেন না যদি বিষয়টি আমি এখানে স্পষ্ট করি।
