আপনি কি কখনো কিছুটা জটিলতাসহ কোনো কৃত্রিম যন্ত্রকে দেখেছেন, উল-বোনা বা সেলাইমেশিন, কোনো তাঁত, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বোতলজাত করার যন্ত্র কিংবা মাঠের খড়কে কুণ্ডলী পাকানোর ‘হে বেলার’ মেশিন? মোটিভ পাওয়ার বা উদ্দেশ্যমূলক শক্তি আসে কোনো একটি জায়গা থেকে, ধরুন, একটি ইলেকট্রিক মটর বা একটি ট্রাক্টর। কিন্তু আরো বেশী ধাঁধার ব্যপারটা হচ্ছে সেই কাজগুলো করার জন্য এর অত্যন্ত সূক্ষ্ম ধারাবাহিকতা। সঠিক ধারাবাহিক নিয়ম মেনে ভালভগুলো খোলে আর বন্ধ হয়, ইস্পাতের আঙ্গুল দক্ষভাবে একটি খড়ের গাঁটির চারপাশে দড়ির গিট বাধে, এবং ঠিক সঠিক সময় একটি ছুরি বের হয়ে এসে সুতাটি কেটে দেয়। অনেক কৃত্রিম মেশিনের এই সময়-সমন্বয় অর্জিত হয়েছে একটি অসাধারণ আবিষ্কার ‘ক্যাম’ এর মাধ্যমে। এটি খুব সাধারণ ঘূর্ণ্যমান গতিকে একটি জটিল ছন্দময় নানা অপারেশনের প্যাটার্নে অনূদিত করে অদ্ভুত অথবা বিশেষ আকারের একটি চাকা ব্যবহার করে। মিউজিক বক্সের মূলনীতিও একই রকম। অন্যান্য মেশিন, যেমন, স্টিম অর্গান এবং পিয়ানোলা কাগজের রোল বা কার্ড ব্যবহার করে, যাদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সজ্জা ছিদ্র করা থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ যান্ত্রিক টাইমারের ব্যবহারের বদলে ইলেক্ট্রনিক টাইমার ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। ডিজিটাল কম্পিউটার হচ্ছে অনেক বড় আর বহুমুখী কর্ম সম্পাদনের জন্যে নির্মিত ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের একটি উদাহরণ, যা জটিল সময় সমন্বয়কৃত নানা গতির প্যাটার্ন তৈরী করার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। আধুনিক ইলেক্ট্রনিক মেশিন, যেমন, কম্পিউটারের মৌলিক একটি উপাদান হচ্ছে, সেমিকন্ডাক্টর, যাদের সবচেয়ে পরিচিত রুপটি হচ্ছে, ট্রানজিস্টর।
টিকে থাকার যন্ত্রগুলো মনে হয় “ক্যাম’ আর ‘পাঞ্চড কার্ডের’ প্রযুক্তি পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়েছিল। যে যন্ত্রাংশটি তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করার জন্য ব্যবহার করে সেটির বেশ মিল আছে একটি ইলেকট্রনিক কম্পিউটারের সাথে। যদিও মূল পরিচালনার স্তরে এটি খুব কঠোরভাবে পৃথক। জৈববৈজ্ঞানিক কম্পিউটারের মূল একক হচ্ছে স্নায়ু কোষ বা নিউরন, তারা অভ্যন্তরীণ স্তরে যেভাবে কাজ করে সেটির সাথে ট্রানজিসটরের কাজ করার প্রক্রিয়ার সাথে কোনো মিল নেই। অবশ্যই নিউরনগুলো পারস্পরিক সংযোগে যে সংকেত ব্যবহার করে করে, সেটি খানিকটা ডিজিটাল কম্পিউটারের পালস কোডের মত মনে হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি নিউরন এককভাবে ট্রানজিস্টরের তুলনায় অনেক বেশী জটিল আর সূক্ষ্ম উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণে দক্ষ একটি ইউনিট। অন্যান্য অংশের সাথে মাত্র তিনটি সংযোগের বদলে একটি একক নিউরনের বহু হাজার সংখ্যক সংযোগ থাকতে পারে। ট্রানজিস্টরের তুলনা নিউরন ধীরে কাজ করে। কিন্তু ক্ষুদ্রাকৃতিকরণের ক্ষেত্রে এটি আরো অনেক অগ্রসর। গত দুই দশক ধরে ইলেকট্রনিক শিল্পে এর আকারে ছোট হয়ে আসবার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিষয়টিকে প্রকাশ করা যেতে পারে এভাবে, মানুষের মস্তিষ্কে দশ হাজার মিলিয়ন নিউরন আছে, এবং আপনি আপনার মাথার খুলির মধ্যে মাত্র কয়েকশত ট্রানজিস্টরের জায়গা দিতে পারবেন।
উদ্ভিদদের কোনো নিউরনের প্রয়োজন নেই, কারণ তারা তাদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করতে পারে জায়গা পরিবর্তন না করে। কিন্তু বহু সংখ্যক প্রাণীদের গ্রুপে আমরা নিউরন দেখি। এটি হয়তো প্রাণীদের বিবর্তনের শুরুর দিকে উদ্ভাবিত হয়েছে এবং সব গ্রুপই উত্তরাধিকার সূত্রে এটি পেয়েছে। অথবা এটি বেশ কয়েকবার উদ্ভব হয়েছে স্বতন্ত্রভাবে।
নিউরন মৌলিকভাবে শুধুমাত্র কোষ, অন্য যেকোনো কোষের মত যার নিউক্লিয়াস আর ক্রোমোজোম আছে। কিন্তু তাদের কোষ পর্দাগুলো সজ্জিত সরু, তারের মত নানা শাখা-প্রশাখা সহ বিস্তৃত। প্রায়শই নিউরনের নির্দিষ্টভাবেই একটি বিশেষ লম্বা ‘তারের মত উপাঙ্গ থাকে, যাকে বলা হয় ‘অ্যাক্সন’। যদিও অ্যাক্সনের প্রশস্ততা আণুবীক্ষণীক, তবে এর দৈর্ঘ্য হতে পারে কয়েক ফুট। জিরাফের ঘাড়ে একক অ্যাক্সনগুলো পুরো ঘাড়ের দৈর্ঘ্য জুড়ে থাকে। অ্যাক্সনরা সাধারণত একসাথে গাঁটবাঁধা থাকে মোটা বহু তার বিশিষ্ট কোনো কেবলের মত, যাদের বলা হয় নার্ভ বা স্নায়ুতন্তু। শরীরের এক প্রান্ত থেকে এরা অন্য প্রান্তে বার্তা বহন করে নিয়ে যায়, ট্রাঙ্ক টেলিফোন কেবলের মত। অন্য নিউরনগুলোর অপেক্ষাকৃত কম লম্বা অ্যাক্সন থাকে। এবং তারা একগুচ্ছ স্নায়ু কোষের ঘন একটি উপাঙ্গ তৈরী করে, যাদের আমরা বলি গ্যাঙলিয়া অথবা যখন সেই স্নায়ুকোষগুচ্ছ আকারে অনেক বড় হয়, সেটি ব্রেইন বা মস্তিস্ক তৈরী করে। কাজের দিক থেকে মস্তিস্ককে আমরা কম্পিউটারের মত মনে করতে পারি (১)। তারা সমরুপ এই অর্থে যে উভয় যন্ত্রই, নানা ধরনের জটিল প্যাটার্নের উপাত্ত ইনপুট বিশ্লেষণ এবং সংরক্ষিত তথ্যভাণ্ডারে প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র যাচাই করার পর জটিল আউটপুট তৈরী করে।
প্রধান যে উপায়ে মস্তিস্ক আসলে টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর সফলতার প্রতি অবদান রাখে, সেটি হচ্ছে মাংসপেশীর সংকোচন নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করা। আর সেটি করতে তাদের দরকার মাংসপেশী পর্যন্ত দীর্ঘ ‘কেবল’ সংযোগ, যাদের বলা হয় মটর নার্ভ, মটর স্নায়ু। কিন্তু এটি দক্ষভাবে জিনের রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে শুধুমাত্র যদি পেশী সংকোচনের সময় যদি বাইরের পৃথিবীতে ঘটা নানা ঘটনার সময়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়। চোয়ালের মাংসপেশী সংকোচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ শুধু যখন এমন কোনো কিছুর সংস্পর্শে আসে যা কামড় দেয়া যায় এবং পায়ের মাংস দৌড়ানোর ভঙ্গীতে সংকোচনের দরকার, যখন কোনো কিছু থেকে দৌড়ে পালানো বা দৌড়ে কাছে যাবার দরকার আছে। আর এ কারণে প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই প্রাণীদের প্রতি আনুকুল্য প্রদর্শন করে যারা অনুভব করার ইন্দ্রিয় দিয়ে সজ্জিত, যে অঙ্গগুলো বাইরের পৃথিবীর নানা ভৌত ঘটনার প্যাটার্ন নিউরনের জন্যে স্পন্দনশীল সংকেতে অনূদিত করে। চোখ, কান, স্বাদ নিরূপক কোষগ্রন্থি এই সব ইন্দ্রিয়গুলোর সাথে মস্তিষ্ক যুক্ত থাকে স্নায়ুরজ্জ্ব বা কেবলের মাধ্যমে, যাদের বলা হয় সেন্সরী বা সংবেদী স্নায়ু। সংবেদী এই তন্ত্রের কাজ বিশেষভাবেই ধাঁধার মত। কারণ প্যাটার্ন চেনার প্রক্রিয়ায় তারা আরো অনেক বেশী অসাধারণ কাজ করতে পারে, যা মানুষের বানানো সবচেয়ে দামী আর সেরা যন্ত্রগুলোকেও হার মানায়। যদি সেরকম না হতো এটি, তাহলে সব টাইপিষ্টই অপ্রয়োজনীয় বাহুল্য হিসাবে চিহ্নিত হতেন, তাদের জায়গা দখল করে নিত মানুষের গলার আওয়াজ শনাক্তকারী বা। হাতের লেখা পড়তে জানা কোনো যন্ত্র। মানব টাইপিষ্টদেরএখনও বহু দশক প্রয়োজন আছে।
