বহু কোষী শরীরের জীব হিসাবে প্রাণী এবং উদ্ভিদরা বিবর্তিত হয়েছে, প্রতিটি কোষে জিনদের সম্পূর্ণ কপি বন্টন করা হয়েছে। আমাদের জানা নেই কখন, কেন অথবা স্বতন্ত্রভাবে কত বার এটি ঘটেছে। কিছু গবেষক ‘কলোনির’ (উপনিবেশ) রুপক ব্যবহার করেন, তারা শরীরকে অগণিত কোষের একটি কলোনি হিসাবে বর্ণনা করেন। শরীরকে আমি কোষ নয় বরং “জিনদের’ কলোনি হিসাবে এবং কোষগুলোকে, জিনদের রাসায়নিক কারখানার সুবিধাজনক কার্যকরী ইউনিট হিসাবে ভাবতে পছন্দ করি।
তারা হয়তো জিনদের কলোনি হতে পারে কিন্তু এটি অস্বীকার করা যাবে না যে, তাদের আচরণে, শরীরগুলো নিজস্ব একটি স্বতন্ত্রতা অর্জন করে। একটি প্রাণী তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে সমন্বিত সম্পূর্ণ, অসংখ্য কোষের সমন্বিত উদ্যোগে সৃষ্ট একক একটি ইউনিট হিসাবে।আত্মগতভাবে আমি নিজেকে অসংখ্য কোষের সমন্বয়ে সৃষ্ট কোনো কলোণী হিসাবে নয়, বরং একক একটি ইউনিট হিসাবে অনুভব করি। আর এটাই প্রত্যাশিত। নির্বাচন সেই সব জিনদের সাহায্য করেছে যারা পরস্পরের সাথে সামঞ্জস্যতাপূর্ণ সমন্বয় রক্ষা করে। সীমিত সম্পদের জন্যে সুতীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, অন্যান্য টিকে থাকার যন্ত্রদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করার অবিরাম সংগ্রাম ও নিজেকে অন্য কারো খাদ্য হওয়া থেকে রক্ষা করার প্রচেষ্টায়, বিচ্ছিন্ন কোষের একত্রে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করার সমন্বয়হীনতা অপেক্ষা একক ইউনিট হিসাবে শরীরে কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত হবার অবশ্যই কোন বিশেষ সুবিধা আর উপযোগিতা আছে। বর্তমানে জিনদের অনিবর্তনীয়ভাবেই জটিল পারস্পরিক সহ-বিবর্তন এমন একটি পর্যায় অবধি অগ্রসর হয়েছে যে কোনো একটি একক সারভাইভাল মেশিনের সমাজবদ্ধ হিসাবে বসবাস করার রুপটি আসলেই শনাক্ত করা সম্ভব না। সত্যিই বহু জীববিজ্ঞানীরাও এটি এভাবে শনাক্ত করেন না এবং আমার সাথে তারা দ্বিমত পোষণ করবেন।
সৌভাগ্যক্রমে, এই বইটির বাকী অংশের জন্যে সাংবাদিকরা যে বিষয়টিকে বিশ্বাসযোগ্যতা বলে থাকেন, এই মতানৈক্য মূলত অ্যাকাডেমিক বা তাত্ত্বিক। ঠিক যেমনভাবে ‘কোয়ান্টা বা মৌলিক কণা সম্বন্ধে কথা বলা সুবিধাজনক নয় যখন আমরা গাড়ি কিভাবে কাজ করে সেটি নিয়ে আলোচনা করি, তেমনি যখন আমরা টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর আচরণ নিয়ে আলোচনা করবো, তখন জিনদের আলোচনায় বার বার টেনে আনা অনেক সময়ই খুব ক্লান্তিকর আর অপ্রয়োজনীয় অনুভূত হতে পারে। সুতরাং বাস্তব ক্ষেত্রে একটি নিকটবর্তিতার আশ্রয় নেয়া সাধারণত সুবিধাজনক, এমন কিছু যা পুরোপুরি এক না হলেও তাদের সদৃশ্য অর্থে খুব নিকটবর্তী। সেই অর্থে আমরা কোনো একক সদস্যর শরীরকে গন্য করতে পারি একটি ‘এজেন্ট হিসাবে, যারা ভবিষ্যতে প্রজন্মের শরীরে এর সবগুলো জিনের সংখ্যা বাড়ানোর ‘চেষ্টা করে। সুবিধাজনক ভাষাই আমি ব্যবহার করবো। যদি না আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘পরার্থবাদী আচরণ” এবং “স্বার্থপর আচরণের অর্থ হবে, একটি জীব শরীরের প্রতি অন্য একটি জীব শরীরের আচরণ।
এই অধ্যায়টি ‘আচরণ সংক্রান্ত, দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন কৌশল, যা মূলত ব্যবহার করে টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর প্রাণী শাখাঁটি। কোনো প্রাণী হয়ে ওঠে সক্রিয় উদ্দেশ্য সাধনের তীব্র আকাঙ্খসহ একটি জিন বহনকারী: ‘জিন যন্ত্র। এই আচরণের বৈশিষ্ট্য, যেমন করে জীববিজ্ঞানীরা এই শব্দটিকে ব্যবহার করেন, খুব দ্রুত একটি প্রক্রিয়া। উদ্ভিদরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে, কিন্তু খুবই ধীরে। খুব দ্রুতগতিতে চালানো ফিল্মে যখন দেখা হয়, আরোহী উদ্ভিদকে দেখে মনে হতে পারে যেন কোনো সক্রিয় প্রাণী। কিন্তু বেশীর ভাগ উদ্ভিদের স্থান পরিবর্তন আসলে অপ্রতিবর্তনযোগ্য বৃদ্ধি। প্রাণীরা, আবার অন্যদিকে শত সহস্র গুণ দ্রুততার সাথে নড়াচড়া করার কৌশল বিবর্তিত করেছে। উপরন্তু, যে নড়াচড়া তারা করে সেটি প্রতিবর্তনযোগ্য বা চূড়ান্ত নয় এবং যা অসীম সংখ্যকবার পুনরাবৃত্তযোগ্য।
এই দ্রুততার সাথে স্থান পরিবর্তন করার জন্য যে যন্ত্রটি প্রাণীরা বিবর্তিত করেছে, সেটি হচ্ছে মাংসপেশী। মাংসপেশীরা হচ্ছে ইঞ্জিন, যেটি বাষ্পীয় ইঞ্জিন এবং ইন্টারনাল কম্বাশন বা অন্তর্দহন ইঞ্জিনের মতই, যান্ত্রিক গতি অর্জনের জন্যে যা রাসায়নিক জ্বালানীতে সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে। পার্থক্যটি হচ্ছে গ্যাসীয় চাপের বিপরীত, যা আমরা দেখি বাষ্পীয় বা ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে, এখানে তাৎক্ষণিক যান্ত্রিক শক্তি কোনো মাংসপেশীতে টেনশন বা চাপ রুপে সৃষ্টি হয়। কিন্তু মাংসপেশী আসলেই ইঞ্জিনের মত সেই অর্থে, তারা প্রায়শই তাদের শক্তি প্রয়োগ করে তন্তু, আর হিঞ্জ বা কবজাসহ লিভার বা ভারোত্তলন-দণ্ডের মাধ্যমে। আমাদের শরীরে এই লিভারগুলো পরিচিত অস্থি বা হাড় হিসাবে, আর কর্ড বা তন্তু হচ্ছে টেনডন এবং হিঞ্জ হচ্ছে সন্ধি বা জোড়া। সঠিক সেই আণবিক প্রক্রিয়াটি সম্বন্ধে এখন অনেক কিছু আমাদের জানা, যা ব্যবহার করে মাংসপেশী এর কর্ম সম্পাদন করে, কিন্তু আমার কাছে মাংসপেশীর সংকোচনের সময় কিভাবে নিয়ন্ত্রণ হয়, সেই বিষয়টি আরো বেশী কৌতূহলোদ্দীপক মনে হয়।
