‘ডকিন্সের স্বার্থপর জিনের উপস্থিতির হার বৃদ্ধি পায় কারণ শরীরগুলোর উপরতাদের প্রভাব আছে, বেঁচে থাকার সংগ্রামে যা তাদের সহায়তা করে। স্বার্থপর ডিএনএ হারে বৃদ্ধি ঠিক এর বিপরীত কারণে– কারণ শরীরের উপর এর কোনো প্রভাবই নেই।
গুল্ড এখানে যে পার্থক্যটি করেছেন সেটি আমি দেখতে পারছি, কিন্তু আমি সেটাকে মৌলিক কোনো বিষয় হিসাবে দেখছি না। এর বিপরীত, আমি এখনও স্বার্থপর ডিএনএ কে দেখি, পুরো স্বার্থপর জিন তত্ত্বের একটি বিশেষ কেস হিসাবে, এবং ঠিক এভাবেই স্বার্থপর ডিএনএ ধারণাটির উদ্ভব হয়েছিল মূলত (এই বিষয়টি, যে স্বার্থপর ডিএনএ হচ্ছে বিশেষ কোনো কেস, হয়তো আরো বেশী স্পষ্ট এই বইয়ের ২৩৭ পৃষ্ঠায় (মূল বইয়ের)। ৫৭ পৃষ্ঠায় (মূল বইয়ে) উল্লেখিত অনুচ্ছেদ যা ডুলিটল ও সাপিয়েঞ্জা এবং ওরগেল ও ক্রিক উদ্ধৃত করেছিলেন, তার চেয়েও বেশী স্পষ্ট। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা দরকার ডুলিটল ও সাপিয়েঞ্জা তাদের লেখায় বরং selfish DNA এর পরিবর্তে selfish genes শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন); গুন্ডের সমালোচনার উত্তর দেবার জন্য আমাকে এই অনুরুপ উদাহরণটি ব্যবহার করার অনুমতি দেয়া হোক: যে জিনগুলো ওয়াস্প বা বোলতাদের হলুদ আর কালো ডোরা কাটা দাগের সৃষ্টি করে তার সংখ্যা বৃদ্ধি পায় কারণ এই ( সতর্কতামূলক) রঙের প্যাটার্নটি শক্তিশালীভাবে অন্যান্য প্রাণীদেও মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে, যে জিনগুলো বাঘদের শরীরে হলুদ কালো ডোরাকাটা দাগ সৃষ্টি করে সেটি তার সংখ্যায় বাড়ে ‘সম্পূর্ণ বিপরীত কোনো কারণে’– কারণ আদর্শভাবে এই সব (ক্রিপ্টিক বা গোপন) রঙের সজ্জা অন্য কোনো প্রাণীদের মস্তিষ্ককে আদৌ উত্তেজিত করে না। আসলেই এখানে। একটি পার্থক্য আছে, যা খুবই সমরুপী গুন্ডের পাথর্কের সাথে (একটি ভিন্ন হায়ারার্কি বা প্রাধান্য পরম্পরার স্তরে!), কিন্তু শুধুমাত্র বিস্তারিত প্রেক্ষাপটে এটি খুব সূক্ষ্ম একটি পার্থক্য। এমন কোনো কিছু দাবী করার সামান্যতম ইচ্ছা পোষণ করা আমাদের উচিৎ না যে, এই দুটি উদাহরণ, কোনোভাবে ভিন্ন হতে পারে না, সেই ব্যাখ্যার কাঠামোতে, যে ব্যাখ্যাটি এদের লালন করছে। ওরগেল ও ক্রিক সঠিক সেই জায়গাটিকে শনাক্ত করে গুরুত্ব দিয়েছিলেন যখন তারা স্বার্থপর জিনের সাথে কোকিলের ডিমের তুলনা করেছিলেন। কোকিলের ডিম, সর্বোপরি, চোখ ফাঁকি দেয় পোষক পাখির ডিমের হুবহু রুপ ধারণ করে।
ঘটনাচক্রে, Oxford English Dictionary র সাম্প্রতিক সংস্করণে selfish শব্দটির একটি নতুন অর্থ তালিকাভুক্ত করেছে এভাবে, ‘কোনো একটি জিন বা জেনেটিক উপাদানের’: ‘যার চিরস্থায়ী হবার প্রবণতা আছে অথবা সেটি বিস্তার লাভ করে ফিনোটাইপের উপর কোনো প্রভাব না ফেলেই’। স্বার্থপর ডিএনএ’ র এটি আসলে চমৎকার একটি আটসাট সংজ্ঞা এবং দ্বিতীয় সহায়ক উদ্ধৃতিটি আসলেই স্বার্থপর ডিএনএ সংক্রান্ত। আমার মতে যদিও, শেষ বাক্যটি– যদিও ফিনোটাইপের উপরে কোনো প্রভাব ফেলে না– দুর্ভাগ্যজনক। স্বার্থপর জিনদের হয়তো ফিনোটাইপের উপর কোনো প্রভাব নাও থাকতে পারে, কিন্তু তাদের অনেকেরই প্রভাব থাকে। লেক্সিকোগ্রাফারদের জন্য বিষয়টি তাই উন্মুক্ত দাবী করার জন্য যে, তারা তাদের অর্থটা ‘স্বার্থপর ডিএনএ’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছেন, যাদের আসলেই ফিনোটাইপের উপর কোনো প্রভাব থাকেনা। কিন্তু তাদের প্রথম সাক্ষ্যমূলক উদ্ধৃতি, যেটি নেয়া হয়েছে The Selfish Gene থেকে, সেটি সেই সব স্বার্থপর জিনদের অন্তর্ভুক্ত করেছে যাদের ফিনোটাইপিক প্রভাব আছে। যদিও এটি আমি যা বোঝাতে চেয়েছি তার থেকে বহু দূরে, তাসত্ত্বেও অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারীতে উদ্ধৃত হবার সম্মানের প্রতি এটি সামান্য অভিযোগ মাত্র।
স্বার্থপর ডিএনএ নিয়ে আমি পরবর্তীতে আরো আলোচনা করেছি, The Extended Phenotype (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ১৫৬-১৬৪)।
০৪. জিন মেশিন
অধ্যায় ৪ : জিন মেশিন
সারভাইভাল মেশিন বা টিকে থাকার যন্ত্রগুলো তাদের যাত্রা শুরু করে জিনদের ধারণ করার জন্য একটি অক্রিয় আধার হিসাবে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে রাসায়নিক যুদ্ধ এবং দূর্ঘটনাজনিত আণবিক গোলাবর্ষণের ঘাত প্রতিঘাতের ধ্বংসলীলা থেকে তাদের রক্ষা করার জন্য চারপাশে একটি দেয়ালের ব্যবস্থা করা ছাড়া শুরুর সেই টিকে থাকার যন্ত্রগুলো বেশী কিছু করেনি। শুরুর সেই দিনগুলোতে তারা আদিম সুপে সহজলভ্য নানা জৈব অণুগুলোকে খাদ্য হিসাবে গ্রহন করেছে। এই সহজ জীবন একসময় শেষ হয় যখন আদিম সুপে থাকা জৈব খাদ্য, যা খুব ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল বহু শতাব্দীর সূর্যের আলোর শক্তির প্রভাবে, সবই ব্যবহৃত হয়ে গিয়েছিল। টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর একটি প্রধান শাখা, যাদের আমরা উদ্ভিদ বলি, তারা নিজেরাই সাধারণ সরল অণু থেকে জটিল অণু সৃষ্টি করার জন্যে সরাসরি সূর্যের আলো ব্যবহার করতে শুরু করেছিল, সেই প্রাচীন সুপের সংশ্লেষণ প্রক্রিয়াটির পুনমঞ্চস্থ করে, তবে এবার সেই প্রক্রিয়াটি বহু দ্রুতগতিতে ঘটে। আরেকটি শাখা, যারা প্রাণী হিসাবে এখন পরিচিত, তারা ‘আবিষ্কার করেছিল কিভাবে উদ্ভিদদের এই রাসায়নিক শ্রমটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা যায়, হয় তাদের খাদ্য হিসাবে গ্রহন করে অথবা অন্য প্রাণীদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করে। টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর প্রধান দুটি শাখার প্রতিটিতে বিচিত্র জীবনাচরণে তাদের দক্ষতা বাড়াতে ক্রমবর্ধমান হারে আরো বেশী উদ্ভাবনী কৌশল বিবর্তিত হয়েছিল এবং সেই সাথেই জীবন যাপনের নতুন উপায়গুলো নিরন্তরভাবেই সুযোগ সৃষ্টি করে চলেছিল। উপশাখা এবং উপ-উপ-শাখারা বিবর্তিত হয়েছে। জীবনধারণের জন্য প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট বিশেষায়িত উপায়ে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে: সাগরে, মাটিতে, বাতাসে, মাটির নীচে, গাছে এবং অন্যান্য জীবিত শরীরের অভ্যন্তরে। এই উপ-শাখা-প্রশাখাগুলো জন্ম দিয়েছে সুবিশাল এই জীববৈচিত্র্য, আমাদের আজ যা বিসিত আর মুগ্ধ করে।
