কিন্তু এই আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী বিষয়টি অপেক্ষাকৃত কম সত্যবর্জিত মনে হয়, যদি আমরা এই বইয়ের যুক্তিটি অনুসরণ করি এবং কোনো একক সদস্যকে একটি সারভাইভাল মেশিন হিসাবে ভাবি, যে মেশিনটি দীর্ঘায়ু জিনদের স্বল্পস্থায়ী একটি সহযোগিতার মাধ্যমে তৈরী করেছে। অপ্রয়োজনীয় একটি বিষয় হিসাবে পুরো একক কোনো সদস্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা দক্ষতা বা এফিসিয়েন্সি ব্যাপারটি দেখতে পারি। যৌন বা অযৌন বিষয়টিকে গণ্য করা যেতে পারে একটি একক জিনের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো বৈশিষ্ট্য হিসাবে, ঠিক যেমন নীল চোখ বনাম বাদামী চোখ। যৌনতার জন্য কোনো জিন অন্য সেই সব জিনদের তাদের নিজেদের স্বার্থপর উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে প্রভাবিত করবে, একই কাজ করবে মাইওসিস কোষ বিভাজনের সময় ক্রসিং ওভার প্রক্রিয়াটির জন্যে দায়ী একটি জিন। এমনকি এমনও জিন আছে, যাদের মিউটেটর বলা হয়– যারা অন্য জিনের অনুলিপি হবার সময় কি পরিমান ভুল (কপিইং এরর রেট) হবে সেটি নিয়ন্ত্রণ করে। সংজ্ঞা মোতাবেক, কপিইং এরর বা অনুলিপন প্রক্রিয়ার সময় কোনো ভুল হলে যে জিনটির ভুল অনুলিপি হচ্ছে তার জন্যে সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্তু স্বার্থপর মিউটেটর জিনের জন্যে যদি সেটি সুবিধাজনক হয়, তাহলে মিউটেটর জিনটি জনগোষ্ঠীর জিন পুলে বিস্তার লাভ করতে পারে। একই ভাবে ক্রসিং ওভার যদি কোনো একটি জিনকে ক্রসিং ওভার করলে কোনো সুবিধা দেয়, তাহলে সেটিই ক্রসিং ওভার জিনের অস্তিত্বের জন্যে একটি সন্তোষজক ব্যাখ্যা। এবং অযৌন প্রজননের ব্যতিক্রম, যদি যৌন প্রজনন কোনো জিনকে সুবিধা দেয় যৌন প্রজননে, যৌন প্রজননের অস্তিত্বের জন্য সেটাই যথেষ্ট একটি ব্যাখ্যা। প্রজাতির কোনো একক সদস্যের বাকী সব জিনকে এটি কোনো সুবিধা দিক বা না দিক সেটি তুলনামূলকভাবে গৌণ একটি বিষয়। স্বার্থপর জিনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, যৌন প্রজনন আসলেই অদ্ভুত কোনো বিষয় না।
খুব আশঙ্কাপূর্ণভাবে উপরের যুক্তিটি প্রায় আবদ্ধ কোনো যুক্তির কাছাকাছি পৌঁছায়, যেহেতু যৌন প্রজননের অস্তিত্বই এই ধারাবাহিক যুক্তি প্রক্রিয়াটির অগ্রসর হবার একটি পূর্বশর্ত, যা নির্বাচনের একক হিসাবে ‘জিনকে’ বিবেচনা করার বিষয়টিতে আমাদের নিয়ে যায়। আমি বিশ্বাস করি, এই আবদ্ধ যুক্তি থেকে পালাবার পথ আছে, কিন্তু এই বইটি সেই প্রশ্নটির উত্তর অনুসন্ধান নিয়ে আলোচনা করার জায়গা নয়। যৌন প্রজননের অস্তিত্ব আছে, সেটুকু সত্যি। যৌন প্রজনন আর ক্রসিং ওভারের পরিণতি হচ্ছে, সেই ক্ষুদ্র জেনেটিক ইউনিট বা জিনদের আমরা গণ্য করতে পারি এমন কিছু যেটি তার বৈশিষ্ট্যাবলীতে বিবর্তনের মৌলিক আর স্বাধীন এজেন্টের সবচেয়ে নিকটবর্তী কিছু হতে পেরেছে।
যৌন প্রজনন শুধুমাত্র আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী বা প্যারাডক্সই নয়, যা অনেক কম ধাঁধা মনে হয় যে মুহূর্তে আমরা স্বার্থপর জিনের ধারণায় চিন্তা করতে শিখি। যেমন, একটি জীবের শরীরে ডিএনএর পরিমান তার ঠিক যতুটুকু লাগবে অর্থাৎ সেই জীবটি তৈরী করার জন্য জন্য যতটুকু দরকার, তার চেয়েও বেশী দরকার হয়: ডিএনএ এর বিশাল অংশ প্রোটিন অনু তৈরী হবার মাধ্যমে কখনোই অনূদিত হয় না। কেবলমাত্র কোনো এটি একক জীব সদস্যর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটি ধাঁধা মনে হয়। যদি ডিএনএর উদ্দেশ্য কিংবা লক্ষ্য হয় শরীর কিভাবে তৈরী হবে সেটি তত্ত্বাবধান করা, ডিএনএ এর বিশাল একটি অংশ এধরনের কোনো কাজ করে না, সেটি যখন আমরা দেখতে পাই আসলেই অবাক হতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই বাড়তি ডিএনএ আসলে কোনো উপযোগী কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট কিনা বিষয়টি বোঝার জন্যে জীববিজ্ঞানীরা সব ধরনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু স্বার্থপর জিনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি আদৌ কোনো প্যারাডক্স নয়। ডিএরএ এর সত্যিকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে টিকে থাকা, কমও না বেশী না। এই বাড়তি ডিএনএর উপস্থিতি ব্যাখ্যা করার সরলতম উপায় হচ্ছে এমন কিছু মনে করা যে, এটি পরজীবি বা বড়জোর কোনো নিরীহ, ক্ষতি করেনা, তবে কোনো উপকারেও আসেনা এমন কোন যাত্রী, যারা ডিএনএ অন্য অংশ দিয়ে তৈরী সারভাইভাল মেশিনে জায়গা করে নেয় কোনো কিছু না করার বিনিময়েই (১০)।
কেউ কেউ অবশ্য এর বিরোধীতা করেন, কারণ তাদের দৃষ্টিতে তারা। যা দেখেন, সেটি হচ্ছে বিবর্তনের অতিমাত্রায় জিন-কেন্দ্রিক একটি দৃষ্টিভঙ্গি। সর্বোপরি, তারা তর্ক করেন, পুরো একটি জীব সদস্য, তাদের সব জিন নিয়ে আসলেই বাঁচে অথবা মারা যায়। আমার মনে হয় এই অধ্যায়ে আমি যথেষ্ট বলেছি, যা প্রদর্শন করেছে যে আসলেই এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। ঠিক যেমন একটি পুরো নৌকা প্রতিযোগিতায় জিততে পারে অথবা হারতে পারে, আসলেই কোনো একক সদস্য বাঁচে অথবা মারা যায় এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের তাৎক্ষণিক প্রকাশ পায় সবসময়ই একক সদস্য পর্যায়ে। কিন্তু নন র্যানডোম সদস্যদের মৃত্যু এবং প্রজনন সাফল্যের দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাবটি প্রকাশ পায় জিন পুলে জিনের উপস্থিতির হারের তারতম্য ঘটিয়ে। কিছু সীমাবদ্ধতাসহ আধুনিক অনুলিপনকারী অণুদের প্রতিটি জিন পুল একই দায়িত্ব পালন করে, যেমন করে আদিম সেই সুপ মূল অনুলিপনকারীদের সাথে করেছিল। সুপটির আধুনিক সমতুল্য রুপটির তরলত্ব সংরক্ষিত করার ক্ষেত্রে যৌন প্রজনন ও ক্রোমোজোমের ক্রসিং ওভার প্রক্রিয়ার একটি প্রভাব আছে। কারণ যৌন প্রজনন ও ক্রোমোজোমের ক্রসিং ওভারের কারণে জিন পুল যথেষ্ট পরিমান মিশ্রণ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে এবং জিনগুলো আংশিকভাবে রদবদল হয়। বিবর্তন হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কিছু জিনের হার বেড়ে যায় এবং অপেক্ষাকৃতভাবে অন্যদের পরিমান কমে যায়। সুতরাং ভালো হবে যদি আমরা অভ্যাস করে নিতে পারি একটি প্রশ্ন করার, যখনই আমরা কোনো বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের বিবর্তন, যেমন পরার্থবাদী আচরণ, ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি: জিন পুলে জিনদের উপস্থিতির হারের উপর এই বৈশিষ্ট্যটির কি প্রভাব আছে? কখনো কখনো, জিনের ভাষা কিছুটা ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে এবং সংক্ষিপ্ততা আর প্রাণবন্ততা জন্য আমরা মেটাফর বা রুপকের আশ্রয় নেবো। কিন্তু আমরা সবসময়ই আমাদের সংশয়বাদী চোখ রাখবো আমাদের রুপগুলোর উপর, নিশ্চিৎ করার জন্য যে, যদি প্রয়োজন পড়ে তাদের যেন জিনের ভাষায় পুনরায় অনূদিত করা যেতে পারে।
