এই ধারণাটির বৈপ্লবিক দিক হচ্ছে যে ‘পদার্থ এস’ নিজে বৃদ্ধ বয়সের শুধুমাত্র একটি লেবেল’। কোনো ডাক্তার যিনি রোগীর শরীরের উচ্চামাত্রায় এর উপস্থিতি মৃত্যুর কারণ হিসাবে লক্ষ করবেন, তিনি সম্ভবত ভাববেন,’পদার্থ এস’ হয়তো একটি বিষ এবং তিনি সারাক্ষণই ভাবতে থাকবেন, কিভাবে ‘পদার্থ এস’ এর সাথে শরীরের বিকল হয়ে যাবার একটি যোগসূত্র তিনি খুঁজে বের করবেন। কিন্তু আমাদের এই হাইপোথেটিকাল উদাহরণে তিনি হয়তো তার সময় নষ্ট করবেন!
আরো একটি পদার্থ হয়তো থাকতে পারে, ‘পদার্থ ওয়াই’, যা তারুণ্যের ‘লেবেল’, এই অর্থে যে বৃদ্ধ বয়সের তুলনায় অল্প বয়সে শরীরেএটির মাত্রা বেশী থাকে। আবারো সেই সব জিনগুলো হয়তো নির্বাচিত হবে যারা ভালো প্রভাব ফেলে ‘ওয়াই’ এর উপস্থিতিতে, এবং যার অনুপস্থিতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এস’ ও ‘ওয়াই’ কি সেটি জানার কোনো উপায় ছাড়াই– আরো বহু রাসায়নিক পদার্থে উপস্থিতি থাকতে পারে। আমরা শুধুমাত্র সাধারণ একটি ভবিষ্যদ্বাণী করবো যত বেশী বদ্ধ শরীরে আমরা অনুকরণ প্রণোদনা দেবো তরুণ বয়সের শরীরের কোনো গুণাবলীকে, সেই গুণাবলী যতই উপরি বৈশিষ্ট্য মনে হোক না কেন, বৃদ্ধ শরীর ততই দীর্ঘ সময় বাঁচবে।
মেদাওয়ারের তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে আমি অবশ্যই গুরুত্বারোপ করবো যে এগুলো শুধুমাত্র আনুমানিক কিছু ধারণা। যদি একটি অর্থে যেখানে মেদাওয়ার তত্ত্ব যৌক্তিকভাবে অবশ্যই কিছু সত্য এর মধ্যে ধারণ করে, তবে এর অর্থ এই না যে, কিভাবে বার্ধক্য ও জরায় আমরা আক্রান্ত হই, কোনো একটি ব্যবহারিক উদাহরণের ক্ষেত্রে, এটাই সঠিক কোনো ব্যাখ্যা। বর্তমান আলোচনার উদ্দেশ্যে যেটা সত্যি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে বৃদ্ধ হলে প্রজাতিদের সদস্যদের মারা যাবার প্রবণতাটি ব্যাখ্যা করতে বিবর্তনের জিন নির্বাচন কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো সমস্যা হবেনা। কোন একক সদস্যের মরণশীলতার ধারণা, যা এই অধ্যায়ে আমাদের যুক্তির কেন্দ্রে অবস্থিত, সেটি এই তত্ত্বের ব্যাখ্যার কাঠামোতে যুক্তিযুক্ত।
আরেকটি যে ধারণা আমি হালকাভাবে আলোচনা করেছিলাম, সেটি হচ্ছে যৌন প্রজনন আর ক্রসিং ওভারের অস্তিত্ব, আর সেটি ব্যাখ্যা দেয়া বরং আরো কঠিন। সবসময়ই ক্রসিং ওভার হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। পুরুষ ফুট ফ্লাইরা সেটি করে না। এই প্রজাতির স্ত্রী সদস্যের একটি জিন আছে যা এই ‘ক্রসিং ওভার’ যেন না হয় সেটি লক্ষ করে। আমরা যদি এমন কোনো মাছি জনগোষ্ঠীকে প্রজনন করানোর চেষ্টা করি, যাদের মধ্যে এই জিনটি সর্বজনীন, তাহলে ক্রোমোজোম পুলে একটি ক্রোমোজোম প্রাকৃতিক নির্বাচনের অবিভাজ্য একক হবে। বাস্তবিকভাবে যদি আমরা আমাদের সংজ্ঞাটির যৌক্তিক উপসংহার বরাবর অনুসরণ করতে পারি, একটি পুরো ক্রোমোজোমকে তখন একটি ‘জিন’ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।
কিন্তু আবার, যৌন প্রজননের বিকল্পেরও অস্তিত্ব আছে। স্ত্রী গ্রিনফ্লাইরা জীবন্ত, পিতৃহীন, স্ত্রী সন্তানদের জন্ম দিতে পারে, যাদের প্রত্যেকেই তাদের মায়ের সব জিনগুলো ধারণ করে। (ঘটনাচক্রে কোনো একটি মায়ের গর্ভে’ কোনো ভ্রূণের হয়তো আরো একটি ক্ষুদ্র ভ্রূণ থাকে তার নিজের গর্ভের ভিতর। সুতরাং একটি স্ত্রী গ্রিনফ্লাই এমন কোনো কন্যা এবং নাতনীর একসাথে জন্ম দিতে পারে, যারা দুজনই তার হুবহু জমজ)। অনেক উদ্ভিদ প্রজনন করে অঙ্গজ জননের মাধ্যমে, যেমন, সাকার বা চোষকদের ছড়িয়ে দিয়ে। এই ক্ষেত্রে আমরা হয়তো, প্রজননের বদলে ‘বৃদ্ধি পায় এমনভাবে বলতে পছন্দ করবো। কিন্তু তারপরও, যদি আপনি বিষয়টি নিয়ে ভাবেন, মূলত বৃদ্ধি আর অযৌন প্রজননের মধ্যে সেখানে খুব সামান্য পার্থক্য আছে। কারণ দুটোই ঘটছে মাইটোটিক কোষ বিভাজনের মাধ্যমে। কখনো উদ্ভিদরা অঙ্গজ জননের মাধ্যমে প্রজনন করে এবং তারপর সেই বাড়তি অংশটি তাদের পিতামাতা সদৃশ মূল বৃক্ষটি থেকে পৃথক হয়ে যায়। অন্যান্য ক্ষেত্রে, যেমন, এলম গাছ, তাদের সংযুক্ত সাকার বা চোষকটি অপরিবর্তিত থাকে। আসলেই পুরো এলম জঙ্গলকে একক একটি সদস্য মনে করা যেতে পারে।
সুতরাং প্রশ্নটি হচ্ছে: যদি গ্রিনফ্লাইরা আর এলম গাছ কাজটি না করে, তাহলে বাকী সবাই আমরা কেন এতটাই পরিশ্রম করি, আমাদের সন্তান তৈরীর আগে অন্য কারো জিনের সাথে আমাদের জিনের মিশ্রণ করানোর জন্য? মনে হতে পারে একটি অদ্ভুত পথ বেছে নিতে হচ্ছে। কেন তাহলে যৌন প্রজনন, সরাসরি অনুলিপি তৈরী করার প্রক্রিয়াটির সেই অদ্ভুত বিকৃতি, কেনই বা বিবর্তিত হয়েছিল? যৌন প্রজননের উপকারিতাটি কি (৯)?
এটি বিবর্তনবাদীদের পক্ষে উত্তর দেবার জন্যে খুবই কঠিন একটি প্রশ্ন। এর উত্তর দেবার জন্য বেশীরভাগ গুরুতর প্রচেষ্টার সাথে গাণিতিক যুক্তি প্রক্রিয়ার সংশ্লিষ্টতা আছে। একটি কথা বলা ছাড়া আমি সরাসরি এই বিষয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাবো। সেটি হচ্ছে যৌন প্রজননের বিবর্তন ব্যাখ্যা করার জন্য অন্ততপক্ষে কিছু সমস্যা যা তাত্ত্বিকরা মুখোমুখি হন সেগুলো সূচনা হয়েছিল সেই বাস্তব সত্যটি থেকে, তারা স্বভাবজাতভাবেই মনে করেন একক সদস্যরা যারা টিকে থাকে তারা তাদের জিন সংখ্যা বাড়াতে চেষ্টা করে, আর এই শর্তানুযায়ী, যৌন প্রজনন আসলেই আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী, কারণ এটি একক সদস্যের জন্যে তার জিন টিকিয়ে রাখার একটি অদক্ষ উপায়: প্রতি শিশুর মাত্র ৫০ শতাংশ জিন আসে কোনো একটি সদস্য থেকে, বাকী ৫০ শতাংশ আসে তার যৌন সঙ্গী থেকে। শুধু যদি গ্রিনফ্লাইয়ের মত, তারা সরাসরি সন্তানের জন্ম দিতে পারতো, যারা তার হুবহু অনুলিপি, সেক্ষেত্রে পুরো ১০০ শতাংশ জিনই পরবর্তী প্রজন্মের সকল সন্তানে মধ্যে থাকার নিশ্চয়তা থাকতো। আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী এই বিষয়টি বেশ কিছু তাত্ত্বিককে গ্রুপ সিলেকশনবাদকে গ্রহন করে নিতে সহায়তা করেছে, যেহেতু যৌন প্রজননের একটি গ্রুপ-স্তরের সুবিধার কথা ভাবা অপেক্ষাকৃত সহজ, যেমন ডাব, এফ, বোদমার চমৎকার সংক্ষিপ্ত ভাবে প্রকাশ করেছিলেন, যৌন প্রজনন –’কোন একটি একক ব্যক্তির শরীরে সুবিধাজনক মিউটেশনগুলো পুঞ্জীভূত করার প্রক্রিয়াটিকে সহায়তা করে, যে মিউটেশনগুলো ভিন্ন ভিন্ন একক সদস্যদের শরীরের উদ্ভব হয়েছিল।
