কোনো জিন, যে কিনা এর বাহককে মেরে ফেলে তাকে বলা হয় প্রাণঘাতী একটি জিন। একটি আংশিক-প্রাণঘাতী জিন কিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যেমন, এটি অন্যান্য কারণে মৃত্যু হবার সম্ভাবনা আরো বেশী বাড়িয়ে দেয়। একটি জিন শরীরের উপর তার সর্বোচ্চ প্রভাব ফেলে জীবনের নির্দিষ্ট একটি পর্যায়ে, এবং প্রাণঘাতী কিংবা আংশিক-প্রাণঘাতী জিনগুলো এর ব্যতিক্রম নয়। বেশীর ভাগ জিন তাদের প্রভাব খাটায় ভ্রূণ অবস্থায় এবং অন্যান্যরা শৈশবে, অন্যরা প্রাপ্তবয়স্কতার প্রারম্ভেই, কোনোটি মধ্যবয়সে এবং আরো কিছু অন্য জিন কাজ করে বার্ধক্যে (ভাবুন একটি শুয়োপোকা আর যে প্রজাপতিতে তারা রূপান্তরিত হয়,তাদের ঠিক একই সেট জিন থাকে); অবশ্যই প্রাণঘাতী জিনরা জিন পুল থেকে ক্রমশ অপসারিত হতে থাকে, কিন্তু একই সাথে স্পষ্টতই জীবনের শুরুর দিকে কাজ করা কোনো প্রাণঘাতী জিন অপেক্ষা, পরে কাজ করে এমন একটি প্রাণঘাতী জিন কোনো জিন পুলে বেশী স্থিতিশীল হবে। বৃদ্ধ শরীরে কোনো প্রাণঘাতী জিন হয়তো তারপরও জিনপুলে সফলভাবে টিকে থাকে, শুধুমাত্র শর্ত হচ্ছে তার সেই প্রাণঘাতী প্রভাবটি প্রদর্শিত হয়না যতক্ষণ না কোনো না কোনোভাবে প্রজনন করতে শরীরের কিছুটা সময় থাকে। যেমন, একটি জিন, যা কোনো বৃদ্ধ শরীরে ক্যান্সারের কারণ সেটি বহুসংখ্যক উত্তরসূরিদের মধ্য দিয়ে বিস্তার লাভ করতে পারে কারণ সেই জিনটির বাহক সদস্যটি তার শরীরে ক্যান্সার হবার আগেই প্রজনন করবে। অন্যদিকে, একটি জিন যা কোনো তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক শরীরে ক্যান্সারের কারণ হয়, সেটি বেশী সংখ্যক উত্তরসূরিদের মধ্যে বিস্তার লাভ করবে না এবং কোনো জিন যা কোনো শিশুর শরীরে প্রাণঘাতী ক্যান্সারের কারণ হয় সেটি কোনো উত্তরসূরিদের মধ্যেই বিস্তার লাভ করবে না। এই তত্ত্বানুযায়ী, জিনপুলে জমা হওয়া আর পরবর্তীতে সক্রিয় হতে পারে শুধুমাত্র এমন প্রাণঘাতী ও আংশিক প্রাণঘাতী জিনই জরা বা বার্ধক্যজনিত ক্ষয়ের কারণ। শুধুমাত্র তারা জীবনের শেষাংশে কাজ করে বলে যে জিনগুলোকে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফাঁদ গলে বেরিয়ে যাবার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
যে বিষয়টির উপর মেদাওয়ার নিজেই জোর দিয়েছিলেন, সেটি হচ্ছে। যে, নির্বাচন সেই সব জিনদের সুবিধা দেয় যারা অন্যান্য প্রাণঘাতী জিনগুলোর সক্রিয় হয়ে ওঠাটিকে স্থগিত করে রাখে, এটি আরো বিশেষভাবে সুবিধা দেয় সেই জিনগুলোকে, যারা “ভালো’ জিনগুলো যেন দ্রুত তাদের প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়টিকে তরান্বিত করে। বিবর্তন অনেকটুকুই জিনের কর্মকাণ্ড শুরু হবার সময়ে জিন নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তনগুলোর সমষ্টি হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টির দিকে লক্ষ রাখতে হবে সেটি হচ্ছে, প্রজনন ঘটছে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট বয়সে, এই তত্ত্বটির এমন কোনো পূর্বধারণার প্রয়োজন নেই। শুরুতেই যদি আমরা এমন কোনো ধারণা গ্রহন করে নেই যে, যেকোনো বয়সে সন্তানের জন্ম দেবার জন্যে প্রত্যেকেরই সমান সম্ভাবনা থাকবে। মেদাওয়ারের তত্ত্বটি খুব দ্রুত ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে যে, জিন পুলে শেষের দিকে সক্রিয় হওয়া ক্ষতিকারক জিনগুলো পুঞ্জীভূত হবে, এবং বার্ধক্যে প্রজনন কম করার বিষয়টি এরই পরোক্ষ পরিণতিতে ঘটে।
একটি পার্শ্ব বিষয় হিসাবে, এই তত্ত্বটির অন্যতম একটি ভালো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি আমাদের বরং আরো কিছু কৌতূহলোদ্দীপক ধারণার দিকে মনোযোগ নির্দেশ করে। যেমন, এখান থেকে আমরা এমন একটি ধারণা পেতে পারি, যদি আমরা মানুষরা আমাদের জীবনকাল বাড়াতে চাই, দুটি সাধারণ উপায় আছে সেটি আমরা করতে পারি। প্রথমত, আমরা একটি নির্দিষ্ট বয়সের আগে প্রজননের নিষিদ্ধ করতে পারি, ধরুন, চল্লিশ বছর বয়সের আগে। কয়েক শতাব্দী পর সর্বনিম্ন বয়সসীমা বেড়ে হবে পঞ্চাশ এবং এভাবে আরো বাড়বে। ভাবা খুবই সম্ভব যে মানুষের দীর্ঘায়ু এভাবে বেশ কয়েক শতাব্দী আরো বাড়িয়ে দেয়া সম্ভব। কোনো পরিস্থিতিতেই আমরা অবশ্য কল্পনা করতে পারিনা এমন কোনো নীতিমালা বাস্তবিকভাবে আরোপ করা সম্ভব হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, জিনদের বোকা বানাতে আমরা চেষ্টা করতে পারি, যেন তারা ভাবে যে শরীরে তারা বাস করছে সেটি আসলে যতটা বয়স হয়েছে, এটি তার চেয়ে তরুণ। ব্যবহারিক পর্যায়ে এর মানে হচ্ছে শরীরের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক পরিবেশে সেই পরিবর্তনটি চিহ্নিত করা, যা বার্ধক্য হবার প্রক্রিয়ার সাথে ঘটে। এর যে কোনোটি শেষের দিকে কাজ করে এমন ক্ষতিকর জিনগুলোকে সক্রিয় হয়ে ওঠার জন্যে ‘ইঙ্গিত’ হতে পারে। কোনো একটি তরুণ শরীরের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের মত পরিবেশ সৃষ্টি করে শেষের দিকে কাজ করা ক্ষতিকর জিনগুলোকে সক্রিয়া হওয়া স্থগিত রাখা সম্ভব হতে পারে। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি হচ্ছে বার্ধক্যের সেই রাসায়নিক সংকেতগুলো কিন্তু সাধারণ অর্থে নিজেরাই ক্ষতিকর হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; যেমন, ধরুন ঘটনাচক্রে আমরা দেখতে পেলাম, বাস্তব একটি সত্য হচ্ছে ‘পদার্থ এস’ বয়স্ক সদস্যদের শরীরে যে পরিমান ঘনত্বে থাকে, তার চেয়ে অনেক কম পরিমানে থাকে তরুণদের মধ্যে। এস পদার্থটি’ নিজে ক্ষতিকর নয়, হয়তো খাদ্যের কোনো উপাদান যা আমাদের শরীরে সময়ের সাথে জমা হয়। কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে, কোনো জিন, যা কিনা ঘটনাচক্রে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এই ‘পদার্থ এস’ এর উপস্থিতিতে, কিন্তু এর অনুপস্থিতিতে এটি কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না বরং ভালো প্রভাব ফেলে, এমন কোনো জিন জিন পুলে ইতিবাচকভাবে নির্বাচিত হবে এবং আসলেই এটি হবে বৃদ্ধ বয়সে মারা যাওয়ার জন্য জিন। এর চিকিৎসা হবে শুধুমাত্র ‘পদার্থ এস’কে শরীর থেকে সরিয়ে ফেলা।
