যেমন, বেশ কিছু উপযোগী বৈশিষ্ট্য আছে যারা দক্ষ কোনো মাংসাশী প্রাণীর শরীরে কাঙ্খিত, তাদের মধ্যে যেমন আছে কোনো কিছু কাটার উপযোগী ধারালো তীক্ষ্ম দাঁত, মাংস পরিপাক করার জন্যে সঠিক ধরনের আন্ত্রিক নালী এবং আরো অনেক কিছু। একটি দক্ষ তৃণভোজী প্রাণীর অন্যদিকে প্রয়োজন চ্যাপটা, পিষ্ট করার উপযোগী দাঁত এবং অনেক লম্বা আন্ত্রিক নালী, এবং ভিন্ন ধরনের পরিপাক উপযোগী রসায়ন। কোনো একটি তৃণভোজী প্রাণীদের জিন পুলে, যদি এমন কোনো জিনের উদ্ভব হয়, যারা এর বাহককে ধারালো মাংস কাটার উপযোগী কোনো দাঁত দেয়, তারা খুব বেশী সফল হবেনা। এর কারণ কিন্তু এই না যে মাংস খাওয়া সার্বিকভাবে একটা খারাপ ধারণা, বরং যেহেতু কেউ ভালোভাবে মাংস খেতে পারবে না, যদি না তার সঠিক ধরনের আন্ত্রিক নালী না থাকে এবং মাংসাশী প্রাণী হিসাবে জীবন কাটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য গুণাবলীও থাকে। ধারালো, মাংস খাওয়ার উপযোগী দাঁত এমনিতে সহজাতভাবে খারাপ কোনো জিন নয়। তবে তারা শুধুমাত্র খারাপ জিন হয় এমন কোনো জিন পুলে, যেখানে তৃণভোজী বৈশিষ্ট্য সৃষ্টিকারী জিনরা প্রাধান্য বিস্তার করে আছে।
এটি বেশ সূক্ষ্ম আর জটিল একটি ধারণা। এটি জটিল কারণ কোনো একটি জিনের পরিবেশ মূলত গঠিত হয় অন্য অনেক জিনদের দ্বারা, যাদের প্রত্যেকটি এর নিজস্ব পরিবেশে অন্যান্য জিনদের সাথে এর সহযোগিতা করার যোগ্যতার উপর ভিত্তি করে নিজেই নির্বাচিত হয়। এই সূক্ষ্ম বিষয়টির সাথে তুলনামূলক একটি উদাহরণ আমাদের হাতে আছে, কিন্তু এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। এই রুপক উদাহরণটি মানুষের ‘গেম থিওরী’ সংক্রান্ত, অধ্যায় ৫ এ একক প্রাণীদের মধ্যে বিদ্যমান আগ্রাসী প্রতিতিদ্বন্দ্বিতার প্রকৃতি ব্যাখ্যা করার সময় যা আমি আলোচনার জন্যে উপস্থাপন করবো। সুতরাং পরে অধ্যায়ের শেষাংশ অবধি আমি এই বিষয়ে কোনো আলোচনা আপাতত স্থগিত রাখছি, এবং এই অধ্যায়ের মূল বার্তাটিতে আবার ফিরে আসি। সেটি হচ্ছে যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মৌলিক একক হিসাবে প্রজাতিকে গন্য করা ঠিক হবে না, তেমনি কোনো গ্রুপ বা জনগোষ্ঠীর কথা, এমনকি প্রজাতির একক সদস্যদেরও তেমন কিছু ভাবা সঠিক হবেনা, বরং এই একক হিসাবে কাজ করতে পারে খুব ক্ষুদ্র জিনগত উপাদান, যাকে ‘জিন’ হিসাবে সুবিধাজনকভাবে আমরা ডাকতে পারি।
এই যুক্তির মূল বক্তব্যটি হচ্ছে– এর আগেও যা উল্লেখ করা হয়েছে।– সেই ধারণাটি, জিনের অমর হবার সম্ভাবনা আছে, যখন কিনা এদের বাহক শরীরগুলো এবং এর চেয়ে উচ্চ কোনো এককগুলো আসলেই চিরস্থায়ী হতে পারেনা। আর এই ধারণাটি দুটি বাস্তব সত্যের উপর নির্ভর করে আছে: যৌন প্রজনন আর ক্রসিং ওভার প্রক্রিয়ার বাস্তব সত্য এবং একক সদস্যদের মরণশীলতা। এই বাস্তবতাটি অনস্বীকার্যভাবেই সত্যি। কিন্তু বিষয়টি আমাদের সেই প্রশ্নগুলো উত্থাপন করতে বাধা দেয় না, যেমন, কেন তারা সত্য? কেন আমরা এবং অন্য সব টিকে থাকার বা সারভাইভাল মেশিনগুলো যৌন প্রজনন করি? কেন আমাদের ক্রোমোজোমে ‘ক্রসিং ওভার’ প্রক্রিয়াটি ঘটে? কেন আমরা চিরকাল বেঁচে থাকি না?
বৃদ্ধ বয়সে কেন আমরা মারা যাই এই প্রশ্নটি একটি জটিল প্রশ্ন এবং এর বিস্তারিত বিষয়গুলো এই বইয়ের আলোচনা করার সুযোগের বাইরে। সুনির্দিষ্ট কারণগুলো ছাড়াও, আরো কিছু সাধারণ কারণও প্রস্তাব করা হয়েছে। যেমন, একটি তত্ত্ব বলছে, জরা বা বার্ধক্য আসলে কোনো একক জীব সদস্যের জীবদ্দশায় ডিএনএ অনুলিপন প্রক্রিয়ায় ঘটা পুঞ্জীভূত হওয়া সব ক্ষতিকর ভুল ও অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্থ জিনের প্রতিনিধিত্ব করে। স্যার পিটার মেদাওয়ারের (৭) প্রস্তাবিত অপর একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, জিন নির্বাচনের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি দেখার ক্ষেত্রে বেশ ভালো একটি উদাহরণ (৮); মেদাওয়ারই প্রথম প্রচলিত সেই যুক্তিগুলো খণ্ডন করেছিলেন, যেমন, ‘প্রজাতির বাকী সদস্যদের প্রতি পরার্থবাদী একটি কর্ম হিসাবে বদ্ধ সদস্যরা মারা যায়, কারণ যদি তারা বেঁচে থাকে, প্রজননক্ষম হবার জন্যে তারা যথেষ্ট পরিমানে জরাগ্রস্থ হয়ে থাকে। কোনো ভালো কারণ ছাড়া তারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খল ভীড় সৃষ্টি করবে। যেমন, মেদাওয়ার উল্লেখ করেছিলেন, এটি হচ্ছে একটি আবদ্ধ যুক্তি, ধরে নেয়া হয়েছে, এটি শুরু থেকেই প্রমাণ করতে চেয়েছে, তাদের জরাগ্রস্থতার জন্য বৃদ্ধ জীবরা প্রজননক্ষম নয়। এছাড়াও এটি সেই গ্রুপ-সিলেকশন বা প্রজাতি-সিলেকশনের সরল ধরনের একটি ব্যাখ্যা, যদি সেই অংশটি নতুন করে আরো খানিকটা সম্মানজনক উপায়ে বলা যেতে পারে। মেদাওয়ারের নিজের তত্ত্বে ছিল সুন্দর একটি যুক্তি। আমরা এভাবে সেই যুক্তিটি গড়ে তুলতে পারি:
আমরা ইতিমধ্যেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কোনো একটি ভালো জিনের সবচেয়ে সাধারণতম বৈশিষ্ট্য কি হতে পারে। এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, স্বার্থপরতা সেই গুণাবলীর একটি। কিন্তু কোনো সফল জিনের আরো একটি সাধারণ গুণ থাকে, সেটি হচ্ছে। প্রজনন শেষ না হওয়া অবধি এর সারভাইভাল মেশিনের মৃত্যুকে স্থগিত করা। কোনো সন্দেহ নেই আপনার কিছু আত্মীয় এবং কিছু চাচা বা মামা শৈশবে মারা গিয়েছিল, কিন্তু আপনার কোনো পূর্বসূরি শৈশবে মারা যাননি, পূর্বসূরি অল্প বয়সে মারা যেতেই পারে না!
