কিন্তু কত দীর্ঘ সময় আসলে যথেষ্ট দীর্ঘ সময়’? এই প্রশ্নের কোনো ধরাবাধা উত্তর নেই। এটি নির্ভর করবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপটি কত শক্তিশালী। অর্থাৎ, একটি ‘ভালো’ অ্যালিলের তুলনায় একটি ‘খারাপ’ জেনেটিক ইউনিট ধ্বংস হয়ে যাবার কতটা বেশী সম্ভাবনা আছে। এটি হচ্ছে গুণবাচক একটি বিষয়, যা উদাহরণ থেকে উদাহরণ ভিন্নতা প্রদর্শন করে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ব্যবহারিক একক– জিন– সাধারণত অবস্থান করে সিসট্রোন আর ক্রোমোজোমের মাঝামাঝি কোনো মাত্রায়।
এই সম্ভাবনাময় অমরত্বের বৈশিষ্ট্যটাই হচ্ছে কোনো একটি জিনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মৌলিক একক হিসাবে দাবী করার পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী একটি কারণ। এখন এই ‘পোটেনশিয়াল’ বা সম্ভাবনাময় শব্দটির উপর জোর দেবার সময় এসেছে। কোনো একটি জিন এক মিলিয়ন বছর বছর বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু অনেক নতুন জিন তাদের প্রথম প্রজন্মই পার হতে পারেনা। অল্প কিছু নতুন জিন সেটি করতে সফল হয় তার কারণ আংশিকভাবে তাদের ভাগ্য ভালো, কিন্তু মূলত তাদের সেই সব বৈশিষ্ট্য আছে যা থাকা দরকার, এবং এর অর্থ হলো তারা সারভাইভাল মেশিন বা টিকে থাকার শরীর যন্ত্রগুলো তৈরীতে দক্ষ। প্রত্যেকটি ধারাবাহিকভাবে আসা শরীরের জণগত বিকাশে তাদের একটি প্রভাব আছে, অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী জিন বা অ্যালিলের সমরুপ প্রভাবের তুলনায় যে শরীরগুলোয় তারা বাস করে যেন সেই শরীরটি খানিকটা বেশী বেঁচে থাকে ও প্রজনন সফল হয়। যেমন একটি “ভালো’ জিন হয়তো, একে পর এক আসা যে শরীরে সে বাস করে, এর টিকে থাকা নিশ্চিৎ করে সেই শরীরে দীর্ঘ পা সৃষ্টি করতে সাহায্য করে, দৌড়াবার দক্ষতা বাড়িয়ে যে পাগুলো সেই শরীরকে শিকারী প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।
এটি একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ তবে সর্বজনীন নয়। লম্বা পা, আর যাই হোক, সব সময় উপকারে নাও আসতে পারে। কোনো একটি মোল ইঁদুরের জন্য এটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা; নানা বিস্তারিত খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা মত্র না করে বরং আমরা কি ভাবতে পারি এমন কোনো বিশ্বজনীন গুণাবলী যা আমরা আশা করবো যে কেন ভালো (যেমন দীর্ঘায়ু) জিনে? এর বীপরিতার্থে, কি সেই গুণাবলী যা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জিনকে চিহ্নিত করে ‘বাজে’ বা ‘স্বল্পায়ু’ জিন হিসাবে? এধরনের বিশ্বজনীন বৈশিষ্ট্য বেশ কয়েক ধরনেরই হতে পারে। কিন্তু একটি আছে, যা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক এই বইটির জন্য: জিন পর্যায়ে, পরার্থবাদীতা অবশ্যই খারাপ এবং স্বার্থপরতা অবশ্যই ভালো। অনতিক্রম্য এই ধারণাটি আসে আমাদের প্রস্তাবিত পরার্থবাদীতা ও স্বার্থপরতার সংজ্ঞানুযায়ী। জিনরা টিকে থাকার জন্য তাদের বিকল্প সংস্করণ বা অ্যালিলদের সাথে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যখন তাদের অ্যালিলগুলো জিনপুলে ভবিষ্যত প্রজন্মেগুলোয় ক্রোমোজোমের একই জায়গা বা স্পটের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। যেকোনো একটি জিন যা কিনা জিন পুলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যালিলকে হটিয়ে তার নিজের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে এভাবে আচরণ করে, সেই জিনটির, সংজ্ঞানুযায়ী, যৌক্তিকভাবেই টিকে থাকার সম্ভাবনা থাকবে। জিন হচ্ছে স্বার্থপরতার মৌলিক একক।
এই অধ্যায়ের মূল বার্তাটি এখন বলা হয়ে গেছে, কিন্তু আমি কিছু জটিলতা আর গোপন পূর্বধারণা আলোচনায় এড়িয়ে গেছি। প্রথম সমস্যাটি এর আগে সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রজন্মান্তরে তাদের যাত্রায় জিনদের যতই স্বাধীন আর মুক্ত মনে হোক না কেন, তারা ভ্রূণ বিকাশের উপর তাদের আরোপিত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আসলে খুব বেশী ‘স্বাধীন আর মুক্ত নয়। ব্যাখ্যাতীত অত্যন্ত জটিল নানা উপায়ে তারা পারস্পরিক সহযোগিতা ও তাদের বাহ্যিক পরিবেশের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করে। লম্বা পায়ের জন্য জিন’ বা ‘পরার্থবাদী আচরণের জন্য জিন’, এমন অভিব্যক্তিগুলো আসলে ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করার অর্থেই সুবিধাজনক, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি বুঝতে হবে সেটি হচ্ছে, এই অভিব্যক্তিগুলো আসলে কি বোঝাচ্ছে। এমন কোনো জিন নেই যা কিনা একাই একটি পা তৈরী করতে পারে, লম্বা কিংবা খাটো। পা তৈরী করার মত কোনো কাজ হচ্ছে বহু জিন নির্ভর সমবায়ী সম্মিলিত একটি উদ্যোগ। বাহ্যিক পরিবেশের প্রভাবও সেখানে অপরিহার্য। সর্বোপরি পা আসলে তৈরী হচ্ছে খাদ্য দিয়ে! কিন্তু আসলেই সেখানে এমন কোনো একক জিনও থাকতে পারে, যে জিনটি আর সব কিছু অপরিবর্তিত থাকলে, তার বিকল্প অ্যালিলের প্রভাবে পা যতটা লম্বা হতো তার চেয়ে দীর্ঘতর পা তৈরী করতে পারে। একটি তুলনামূলক উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, জমিতে ব্যবহার করা সারের কথা ভাবুন, যেমন, গমের বৃদ্ধির উপর নাইট্রেটের প্রভাব। প্রত্যেকেই জানেন, অনুপস্থিতির তুলনায়, নাইট্রেটের উপস্থিতিতেই বরং গম গাছ আকারে অনেক দ্রুত বাড়ে। কিন্তু একটি গম গাছ বানাতে শুধুমাত্র নাইট্রেটেরই ক্ষমতা আছে, এমন কোনো দাবী করার মত কেউ খুব বোকা নয়। সেই কাজটি করতে বীজ, মাটি, সূর্য, পানি ও নানা ধরনের খনিজ অবশ্যই সব একান্ত প্রয়োজনীয়, কিন্তু এই সব অন্য শর্তগুলো যদি অপরিবর্তিত থাকে এবং এমনকি যদি তারা একটি সীমার মধ্যে পরিবর্তিত হবার অনুমতিও পায়, যদি গমের ক্ষেতে নাইট্রেট যোগ করা হয় তাহলে গম গাছ আকারে অনেক বড় হয়। এবং ভ্রূণবিকাশের প্রক্রিয়ায় একক জিন যেভাবে তার প্রভাব ফেলার চেষ্টা করে ঠিক একই রকম ঘটে। যে পরস্পরসংবদ্ধ সম্পর্কের বিস্তৃত জালের মত প্রক্রিয়াটি দ্বারা ভ্রূণবিকাশ নিয়ন্ত্রিত হয় সেটি এত বেশী জটিল যে, আমাদের জন্য আপাতত সেটি চিন্তা না করাই উত্তম হবে। একটি শিশুর যেকোনো একটি অংশের একক কারণ হিসাবে জিনগত বা পরিবেশ নির্ভর কোনো পূর্বশর্ত নেই যা কিনা বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো শিশুর সব অংশের প্রায় অসীম সংখ্যক পূর্ববর্তী কারণ আছে। কিন্তু একটি শিশু থেকে অন্য কোনো একটি শিশুর মধ্যে পার্থক্য, যেমন, পায়ের দৈর্ঘের পার্থক্য, খুব সহজেই অনুসরণ করা সম্ভব হবে একটি, কিংবা অল্প কিছু পূর্ববর্তী কারণের প্রতি, এর পরিবেশনতুবা এর জিনে। আর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সংগ্রামে এই পার্থক্যগুলোই টিকে থাকার জন্যে জরুরী এবং জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পার্থক্যগুলোই বিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
