যৌন প্রজনন করে এমন কোনো প্রজাতিতে, একটি জেনেটিক ইউনিট হিসাবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে কোনো একক সদস্য হচ্ছে অনেক বড় ও অনেক বেশী ক্ষণস্থায়ী বা সাময়িক, প্রাকৃতিক নির্বাচনের যে ইউনিটটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারেনা (৬); আর একটি গ্রুপ বা গোষ্ঠী তার চেয়ে আরো বড় একটি ইউনিট। জিনগত দৃষ্টিভঙ্গিতে একক সদস্য আর সদস্যদের কোনো গ্রুপ হচ্ছে আকাশে ভাসমান মেঘ বা মরুভূমির মরু-ঝড়ের মত; একটি ক্ষণস্থায়ী সহযোগিতায় তারা সাময়িকভাবে একসাথে জড়ো হয়। বিবর্তনীয় সময়ের প্রেক্ষিতে এটি যথেষ্ট পরিমান স্থিতিশীল নয়। কোনো জনগোষ্ঠী হয়তো বহুদিন টিকে থাকে, কিন্তু তারা সারাক্ষণই মিশ্রিত হচ্ছে অন্য জনগোষ্ঠীর সাথে এবং তাদের সেই পরিচিতিটাও লঘু হয়ে হারাচ্ছে। এবং তারা নিজেরাও ভিতর থেকে বিবর্তনীয় পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। প্রাকৃতিক নির্বাচনের একক হবার জন্য একটি জনগোষ্ঠী যথেষ্ট পরিমান পৃথক সত্তা নয়, তেমনি এটি স্থিতিশীলও নয় এবং অন্য কোনো একটি জনগোষ্ঠীর তুলনায় যা কিনা নির্বাচিত হতে পারে এমন কোনো এককও নয়।
প্রজাতির কোনো একক সদস্যের দেহকে মনে হতে পারে সুস্পষ্টভাবে যথেষ্ট পৃথক যখন এটি টিকে থাকে, কিন্তু হায়, কতটা দীর্ঘ সময় সেটা? প্রতিটি সদস্যই স্বতন্ত্রভাবে অনন্য। এমন কোন সত্তাদের মধ্যে বাছাই করে আপনি কোনো বিবর্তন পেতে পারেন না, যখন প্রতিটি সত্তার জন্য সেখানে আছে মাত্র একটি কপি। যৌন প্রজনন কিন্তু অনুলিপিকরণ নয়। ঠিক যেমন কোনো একটি জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠী দ্বারা দুষিত হতে পারে, কোন একটি একক সদস্যের বংশধররাও দুষিত হতে পারে তার যৌন সঙ্গীর মাধ্যমে। আপনার সন্তান হচ্ছে অর্ধেকটি আপনি, আপনার পৌত্র হচ্ছে শুধু সিকি ভাগ আপনি। এবং এভাবে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই বড় জোর আপনি হয়তো আশা করতে পারেন বিশাল সংখ্যক উত্তরসূরিদের, যাদের প্রত্যেকেই আপনার সামান্য কিছু অংশ বহন করে– অল্প কিছু জিন এমনকি যদিও তাদের খুব অল্প কয়েকজন আপনার পদবী বহন করে।
একক সদস্যরা স্থিতিশীল নয়, তারা ক্ষণস্থায়ী, রদ বদলের মাধ্যমে ক্রোমোজোম হারিয়ে যায় বিস্মতিতে, ঠিক তাস খেলায় বেটে পাওয়া হাতের তাসের কার্ডের মত; কিন্তু কার্ডরা নিজেরা এই রদবদল আর সাজানো পর্বে টিকে থাকে। এই কার্ডগুলো হচ্ছে জিন। এবং জিনরা ধ্বংস হয়না ‘ক্রসিং ওভারের মাধ্যমে, তারা শুধু সঙ্গী বদলায় এবং প্রজন্মান্তরে বহমান থাকে। অবশ্যই তারা চলতে থাকে, সেটাই তাদের কাজ। তারা হচ্ছে অনুলিপনকারী এবং আমরা তাদের বেঁচে থাকার মেশিন। যা কাজ সেটি হয়ে গেলে পরিত্যক্ত হিসাবে আমাদেরকে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়। কিন্তু জিনরা হচ্ছে ভূতাত্ত্বিক সময়ের নাগরিক: জিনরা হচ্ছে অবিনশ্বর।
জিনগুলো, হীরার মত, চিরকালের জন্য, কিন্তু ঠিক হীরার মত একই ভাবে নয়। হীরার একক ভাবে কোনো স্ফটিক, যা পরমাণু সজ্জার অপরিবর্তিত একটি রুপ হিসাবে টিকে থাকে। ডিএনএ অণুর সেই একই ধরনের স্থায়ীত্ব নেই। শারীরিকভাবে কোনো একটি ডিএনএ অণুর জীবনকাল সংক্ষিপ্ত– হয়তো কয়েক মাসের ব্যাপার। নিশ্চয়ই কোনো একটি জীবনকালের চেয়ে দীর্ঘ নয়। কিন্তু একটি ডিএনএ অনু তার নিজের অনুলিপি হিসেবে তাত্ত্বিকভাবেই শত মিলিয়ন বছর ধরে বেঁচে থাকতে পারে। উপরন্তু, সেই আদিম সুপে বা মিশ্রণে প্রাচীন অনুলিপনকারীদের মত, কোনো একটি নির্দিষ্ট জিনের অনুলিপি সারা বিশ্বব্যাপী বিন্যস্ত থাকে। পার্থক্যটি হলো, আধুনিক সংস্করণগুলো তাদের টিকে থাকার যন্ত্র শরীরগুলোতে সব সুন্দর করে সাজানো আছে।
আমি যা করছি, তাহলে শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য হিসাবে অনুলিপি রুপে কোনো একটি জিনের সম্ভাব্য প্রায়-অমরত্বের বিষয়টির উপর গুরুত্ব আরোপ করা। কোনো একটি জিনকে একটি একক সিসট্রোন হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা কিছু কিছু ক্ষেত্রে উপযোগী, কিন্তু বিবর্তনীয় তত্ত্বের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো সম্প্রসারিত হওয়ার দরকার। সংজ্ঞার উদ্দেশ্য অনুযায়ী সেই সম্প্রসারণের সীমানাটি নির্ধারিত হতে পারে। আমরা আসলেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি ব্যবহারিক’ ইউনিট খুঁজতে চাই। আর সেটা করতে আমরা শুরু করি সেই বৈশিষ্ট্যগুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে, যা কোনো প্রাকৃতিক নির্বাচনের সফল ইউনিটের অবশ্যই থাকতে হবে। গত অধ্যায়ের ভাষায়, সেগুলো হচ্ছে দীর্ঘায়ু, উর্বরতা ও নিজের সঠিক অনুলিপি করার ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততা। আমরা তারপর একটি বড় ইউনিট হিসাবে ‘জিনকে’ সংজ্ঞায়িত করতে পারি, যার অন্ততপক্ষে এই সব গুণাবলী থাকার থাকার সম্ভাবনা আছে। কোনো একটি জিন হচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা একটি অনুলিপনকারী, এবং বহু অনুলিপি রুপে সেটি বিদ্যমান। অবশ্যই অসীমভাবে দীর্ঘায়ু নয়, এমনকি একটি হীরকখণ্ডও আক্ষরিক অর্থে চিরস্থায়ী নয় এবং এমন কি একটি সিসট্রোনও ক্রসিং ওভারের মাধ্যমে দ্বিখণ্ডিত হতে পারে। জিনকে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে ক্রোমোজোমের টুকরো হিসাবে, যা যথেষ্ট পরিমানে ক্ষুদ্র এবং যথেষ্ট পরিমান দীর্ঘ সময় ধরে যার টিকে থাকার সম্ভাবনা আছে, যেন সেটি প্রাকৃতিক নির্বাচনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইউনিট হিসাবে কাজ করে।
