কোষদের এই ক্লাব গঠন করার সুবিধা এর আকারেই সীমাবদ্ধ নয়। এই ক্লাবের কোষগুলো বিশেষায়িত হতে পারে, প্রত্যেকে সেভাবে আরো বেশী দক্ষ হয়ে ওঠে তার সুনির্দিষ্ট কাজগুলো সম্পাদন করার জন্য। বিশেষায়িত কোষগুলো সেই ক্লাবের অন্য কোষদেরও সেবা দেয় এবং তারা ক্লাবের অন্যান্য বিশেষায়িত সদস্যদের মাধ্যমেও উপকৃত হয়। যদি সেখানে অনেক কোষ থাকে, এদের কিছু বিশেষায়িত হতে পারে সংবেদনশীল সেন্সর হিসাবে যারা কোনো শিকার শনাক্ত করে, অন্যরা বিশেষায়িত হয় স্নায়ু হিসাবে যারা সেই বার্তাটিকে বহন করে নিয়ে যায়, অন্যরা সেই হুল ফোঁটানো উপাঙ্গে যার তাদের শিকারকে অবশ করে দিতে পারে, কিংবা মাংসপেশীতে যারা টোকল নাড়াতে সহায়তা করে যা শিকার ধরার জন্য ব্যবহৃতম হয়, নিঃসরণ কোষে যা এটিকে দ্রবীভুত করতে পারে এবং এর রসগুলো শুষে নিতে পারে। আমাদের অবশ্যই ভোলা উচিৎ না, নিদেনপক্ষে আধুনিক শরীর, আমাদের যেমন, সেখানে কোষগুলো আসলে ক্লোন। সবাই এই জিনসমষ্টী বহন করে,যদিও ভিন্ন ভিন্ন। জিনগুলো ভিন্ন ভিন্ন বিশেষায়িত কোষে সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রতিটি ধরনের কোষে জিনগুলো সরাসরি তাদের নিজেদের অনুলিপিগুলোকে সহায়তা করছে, যারা খুব সংখ্যালঘু কোষে থাকে, যে কোষগুলো বিশেষায়িত প্রজননের জন্য, অমর জার্ম লাইনের কোষগুলো।
সুতরাং, এবার আমরা আসি তৃতীয় প্রশ্নটিতে, কেন শরীর এই ধরনের বটোলনেক বা বোতলের গলার মত সংকীর্ণ জীবন চক্রে অংশগ্রহন করে?
শুরুতেই বলতে হবে বটোলকে বলতে আমি কি বোঝাচ্ছি? কোনো একটি হাতির শরীরে যত বেশী সংখ্যক কোষই থাকুক না কেন, এটি তার জীবন শুরু করেছিল মাত্র একটি কোষ দিয়ে– নিষিক্ত ডিম্বাণু। নিষিক্ত ডিম্বাণু হচ্ছে সংকীর্ণ সেই বোতলের ঘাড়, যা জ্বতাত্ত্বিক বিকাশের সময়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক হাতির বহু ট্রিলিয়ন কোষে বিস্তৃত হয়। এবং কত সংখ্যক কোষ তাতে কিছু যায় আসেনা, কতগুলো। বিশেষায়িক ধরণ তাও কিছু যায় আসে না, তারা সহযোগিতা করে একটি পূর্ণ বয়স্ক হাতির শরীরের অকল্পনীয়ভাবে জটিল কাজগুলো সম্পাদন করার জন্য। ঐসব কোষগুলোর সব প্রচেষ্টা একই দিক বরাবর একত্রিত হয় আবারো একক কোষদের তৈরীর সবশেষ লক্ষ্য সৃষ্টিতে– শুক্রাণু এবং ডিম্বাণু। হাতির শুধু সূচনাই হয় না একটি মাত্র কোষ থেকে, একটি নিষিক্ত ডিম্বাণু, এর শেষ, মানে এর উদ্দেশ্য বা শেষ উৎপাদনটিও হচ্ছে একক কোষ তৈরী করা, পরবর্তী প্রজন্মের নিষিক্ত ডিম্বাণু। বিশালাকৃতির হাতির জীবন চক্র শুরু আর শেষ হয় সংকীর্ণ বটোলনেকে। এই বোতলের ঘাড়ের মত সংকীর্ণতা বিষয়টি বহুকোষী প্রাণী আর বেশীর ভাগ উদ্ভিদের জন্য বৈশিষ্ট্যসূচক। কেন? এর গুরুত্ব আসলে কি? আমরা এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারবো না, এটি ছাড়া জীবন কেমন দেখতে হতে পারে সেটি বিবেচনা না করা ছাড়া।
সহায়ক হতে পারে, দুটি কাল্পনিক প্রজাতির সমুদ্র শৈবালের কথা ভাবুন, ধরুন তাদের নাম ‘বটল-রেক’ এবং ‘স্প্লার্জ-উইড’। স্প্লার্জ উইড সাগরে বৃদ্ধি পায় এলোমেলোভাবে নির্দিষ্ট কোনো আকারহীন। শাখা প্রশাখা হিসাবে। মাঝে মাঝে তাদের শাখা ভেঙ্গে যায় এবং তারা দুরে ভেসে চলে যায়। এই ভেঙ্গে যাওয়া উদ্ভিদের যে কোন অংশে হতে পারে, এই টুকরো আকার ছোট কিংবা বড় হতে পারে। বাগানে গাছের কাটিং বা কলমের মত, তারা মূল উদ্ভিদের মত গড়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। এই নানা অংশের ঝরে যাওয়া হচ্ছে প্রজাতির প্রজনন করার একটি পদ্ধতি। আপনি পরে লক্ষ করবেন, বেড়ে উঠবার প্রক্রিয়া থেকে এই প্রক্রিয়াটি ভিন্ন না, শুধুমাত্র যে অংশটি বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটিকে মূল অংশ থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে হবে।
বটোল-র্যাক একই রকম দেখতে একই এলেমেলোভাবে এটি বাড়ছে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে যদিও। এটি প্রজনন করে একটি এককোষী জননকোষ বা স্পোর ছেড়ে দেবার মাধ্যমে, যা সমুদ্রের পানিতে ভেসে দুরে চলে যায় এবং সেখান থেকে নতুন একটি উদ্ভিদের জন্ম নেয়। এই স্পোরগুলো উদ্ভিদের আর যে কোষের মতই দেখতে একটি কোষ। স্প্লার্জ-উইডের ক্ষেত্রে যা ঘটে, কোনো যৌন প্রজনন এখানে ঘটে না। কোনো একটি উদ্ভিদের কন্যা হচ্ছে সেই কোষগুলো যারা মূল উদ্ভিদের কোষেরই ক্লোন। শুধুমাত্র পার্থক্য এই দুই প্রজাতির মধ্যে স্প্লার্জ-উইড তাদের বংশ বিস্তার করে তাদের শরীরের অনির্দিষ্ট সংখ্যক কোষ সমন্বয়ে তৈরী খণ্ডাংশ তার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে, আর বটোল-ব্ল্যাক প্রজনন করে তার নিজের একটি অংশকে বের করে দিয়ে, যেখানে কোষ সংখ্যা মাত্র একটি।
এই দুই ধরনের উদ্ভিদ কল্পনা করার মাধ্যমে আমরা বটোলনেক এবং বটোলনেক নয় এমন জীবন চক্রের মধ্যে মূল পার্থক্যটি দেখলাম। বটোল-র্যাক প্রজনন করে প্রতিটি প্রজন্মে একটি এককোষী বটোলনেকের মধ্য দিয়ে। স্প্লার্জ-উইড শুধু বাড়ে এবং ভেঙ্গে যায় দুটি টুকরোয়। খুব কঠিন হয়ে যায় বলা এর কি ‘পৃথক’ প্রজন্ম আছে নাকি এটি পৃথক “জীবদের দ্বারা গঠিত। কিন্তু বটোল র্যাকদের ক্ষেত্রে কি হচ্ছে? আমি শীঘ্রই সেটি ব্যাখ্যা করবো, কিন্তু আমরা ইতিমধ্যে উত্তরের হালকা আভাস পাচ্ছি। বটোল ব্ল্যাকদের কি ইতিমধ্যেই মনে হচ্ছে না আরো বেশী সুস্পষ্ট পৃথক জীবের মত কিছু?
