প্রথমে তাহলে, জিনরা কেন এক সাথে দল বেধে কোষের মধ্যে বসবাস করে? কেন এই প্রাচীন রেপ্লিকেটর আদিম সুপে তাদের ভাবনাহীন স্বাধীনতা পরিত্যাগ করে এবং সুবিশাল কলোনি নির্মাণের জন্য একসাথে জড়ো হয়? কেনই বা তারা একে অপরের সাথে সহযোগিতা করে? এই প্রশ্নের আংশিক উত্তর আমরা দেখতে পাই আমাদের আধুনিক ডিএনএ অণু জীবন্ত কোষ নামের রাসায়নিক কারখানায় কিভাবে সহযোগিতা করছে সেটি দেখে। ডিএনএ অণুগুলো প্রোটিন তৈরী করে, প্রোটিন উৎসেচক হিসাবে কাজ করে, কোনো একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অনুঘটকের দ্বায়িত্ব পালন করে। কোনো উপযোগী রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদনের জন্য প্রায়শই একটি মাত্র রাসায়নিক বিক্রিয়া যথেষ্ট নয়। মানুষের ঔষধ কারখানায় কোনো একটি কার্যকরী রাসায়নিক দ্রব্য প্রস্তুতে প্রয়োজন একটি প্রোডাকশন লাইন। একেবারে শুরু রাসায়নিক দ্রব্যটিকে কিন্তু একেবারে শেষের কাঙ্খিত দ্রব্যে রুপান্তর করা যাবে না অন্তবর্তীকালীন পর্যায়গুলো বাদ দিয়ে। ধারাবাহিকভাবে বেশ একটি অন্তবর্তীকালীন রুপকে অবশ্যই সংশ্লেষণ করতে হবে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ধারাবাহিকতায়। কোনো একজন গবেষক রসায়নবিদের উদ্ভাবনপটুতার অনেকটুকুই ব্যয় হয় শুরুর রাসায়নিক দ্রব্যটি থেকে শেষের কাঙ্খিত দ্রব্যটি নির্মাণে মধ্যবর্তী অন্তর্বতীকালিন দ্রব্যগুলো নির্মাণ করতে। একই ভাবে একটি জীবন্ত কোষে কোনো একক উৎসেচক সাধারণত একা একাই কোনো উপযোগী কাঙ্খিত দ্রব্য সংশ্লেষণ করতে পারেনা শুরুর রাসায়নিক দ্রব্য বা কাঁচামাল থেকে। কাজটি করার জন্য প্রয়োজন পুরো একগুচ্ছ উৎসেচক, একটি হয়তো কোনো কাঁচামাল দ্রব্যেকে প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন দ্রব্যতে রূপান্তরিত করার বিক্রিয়ায় অনুঘটক হিসাবে কাজ করে, অন্যটি হয়তো প্রথম অন্তবর্তীকালীন দ্রব্যকে দ্বিতীয় অন্তর্বর্তীকালীন দ্রব্যতে রূপান্তরিত করার বিক্রিয়ায় অনুঘটক হিসাবে কাজ করে, এবং এভাবে ধাপে ধাপে এটি চলমান।
এই উৎসচেকগুলোর প্রত্যেকটি তৈরী হয় একটি করে জিনের নির্দেশনায়। যদি ছয়টি উৎসচেকের একটি ধারাবাহিক অনুক্রমের প্রয়োজন হয় একটি বিশেষ সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায়, তাদের বানানোর জন্য ছয়টি জিনকে অবশ্যই থাকতে হবে। যদিও খুবই সম্ভাব্য যে একই শেষ-দ্রব্যে পৌঁছানোর জন্য এখানে দুটি বিকল্প পথ আছে, প্রত্যেকটি প্রক্রিয়ায় আমাদের দরকার ছয়টি করে এনজাইম, এবং তাদের দুটোর মধ্যে থেকে কোনো একটিকে বাছাই করার বিশেষ কোনো নির্দেশনা নেই। এই ধরণের ব্যপারগুলো রাসায়নিক কারখানায় হয়ে থাকে। কোন পথটি বেছে নেয়া হয়েছে সেটি হয়তো ঐতিহাসিক একটি আকস্মিক কোনো ঘটনা অথবা, এটি হতে পারো রসায়নবিকদের আরো কোন বড় বিস্তারিত পরিকল্পনার অংশ। প্রকৃতির রসায়নে কোনো একটি নির্দিষ্ট বাছাই, অবশ্যই, কখনো একটি পরিকল্পিত বাছাই হবে না। বরং এটি ঘটবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে। কিন্তু কিভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন এই দুটি রাসায়নিক পদ্ধতিকে আলাদা করে কোন ধরণের মিশ্রণ না ঘটিয়ে এবং সেই সব পরস্পরকে সহযোগিতাকারী জিনগুলোর গ্রুপের উদ্ভব হয়। এটি খুব বেশী সেই একই উপায়ের মত যা আমি প্রস্তাব করেছিলাম জার্মান এবং ইংলিশ নৌকা চালকদের উদাহরণে ( অধ্যায় ৫)। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে প্রথম পদ্ধতির রাসায়নিক ধাপে একটি জিন সফলভাবে কাজ করে সেই প্রথম পদ্ধতির অন্য জিনদের উপস্থিতিতে, কিন্তু দ্বিতীয় পদ্ধতির জিনগুলোর উপস্থিতিতে না। এবং যদি জনগোষ্ঠীতে ইতিমধ্যেই প্রথম পদ্ধতির জিন দ্বারা প্রাধান্য বিস্তারের কোন পরিস্থিতি থাকে, তাহলে নির্বাচন প্রথম পদ্ধতির অন্য জিনগুলোকে সহায়তা করবে, এবং দ্বিতীয় পদ্ধতির জিনগুলোকে সহায়তা বঞ্চিত করবে, এবং বিপরীত পরিস্থিতিতেও এটি সত্য একইভাবে। যতই প্রলুব্ধকর মনে হোক না কেন, খুব দৃঢ়ভাবে ভুল এমন কিছু বলা যে, দ্বিতীয় পদ্ধতির ছয়টি এনজাইমের জিন নির্বাচিত হয় কোনো একটি গ্রুপ হিসাবে। প্রত্যেকেটি নির্বাচিত হয় একটি পৃথক স্বার্থপর জিন হিসাবে। কিন্তু এটি সফলভাবে বিকশিত হয় শুধুমাত্র যখন অন্য সঠিক সেট জিনের উপস্থিতিতে এটি থাকে।
বর্তমানে এই জিনদের মধ্যে এই সহযোগিতা চলে কোষের অভ্যন্তরে। এটি অবশ্যই শুরু হয়েছিল সেই প্রাথমিক সহযোগিতা থেকে যা বিদ্যমান ছিল আদিম সেই সুপে স্ব-অনুলিপনকারী জিনগুলোর মধ্যে (অথবা যে আদিম মাধ্যমই সেখানে থাকুক না কেন); হয়তো কোষ ঝিল্লীর আবির্ভাব হয়েছিল এই সব উপযোগি রাসায়নিক দ্রব্যগুলোকে একসাথে ধরে রাখার জন্য এবং সেগুলো যেন ছিদ্র দিয়ে বের হয়ে না যেতে পারে, সেটি ঠেকাতে। কোষের বহু রাসায়নিক বিক্রিয়া আসলে সংঘটিত হয় কোষ ঝিল্লীর নিজস্ব গঠনের মধ্যেই, একটি ঝিল্লী একই সাথে কনভেয়ার বেল্ট এবং টেস্ট টিউব র্যাক হিসাবে কাজ করে। কিন্তু জিনদের মধ্যে এই সহযোগিতা শুধুমাত্র কোষের মধ্যে সংঘটিত জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে না। কোষরা একে অপরে নিকটে আসে (বা কোষ বিভাজনের পর পৃথক হয় না) বহু-কোষী শরীর নির্মাণ করার জন্য।
এটাই আমাদের নিয়ে আসে আমরা করা সেই তিনটি প্রশ্নের দ্বিতীয়টিতে। কেন কোষগুলো একত্রে জোট বাধে, কেন এই অদ্ভুত রোবট? এটি সহযোগিতা সংক্রান্ত আরেকটি প্রশ্ন। কিন্তু এই ক্ষেত্রটি পরিবর্তিত হয় অণুদের ক্ষুদ্র জগত থেকে আরো বড় ক্ষেত্রে। বহুকোষী শরীরগুলো আণুবীক্ষণীক জগতের সীমানাকে অতিক্রম করে। তারা এমনকি রুপ নেয় হাতি কিংবা তিমির। কিন্তু আকারে বড় হওয়া আবশ্যিকভাবে একটি ভালো বিষয় নাঃকারণ বেশীর ভাগ জীব আসলে ব্যাকটেরিয়া, সেই তুলনায় হাতির সংখ্যা খুব অল্প। কিন্তু ক্ষুদ্র জীবদের জন্য উন্মুক্ত জীবন ধারণের সব পন্থাই ব্যবহৃত হবার পরও আকারে বড় জীবদের টিকে থাকার সুব্যবস্থা আছে। যেমন, বড় জীবরা ছোট জীবদের খেতে পারে বা তাদের খাদ্য হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।
