সেই সমস্যাটি নিয়ে আলোচনায় ফিরে আসার অবশেষে সময় এসেছে, যা দিয়ে আমরা শুরু করেছিলাম, একক কোনো জীব এবং জিনের মধ্যে সেই টানাপোড়েনটির বিষয়ে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের মূল ভূমিকা পালন করার ক্ষেত্রে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। আগের অধ্যায়গুলোয় আমি ধরে নিয়েছিলাম যে এখানে কোনো সমস্যা নেই, কারণ একক ব্যক্তির প্রজনন জিনের টিকে থাকার সমার্থক। আমি সেখানে ধরে নিয়েছিলাম যে, আপনি বলতে পারেন, কোনো একটি জীব কাজ করে তার সব জিনকে পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তর করার জন্য ‘ অথবা, ‘জিনরা ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু জীবকে বাধ্য করে তাদের প্রজন্মান্তরে হস্তান্তর করার জন্য। এই বাক্যদুটিকে দুটি সমরুপ উপায়ে একই কথা বলার মতই মনে হয়, এবং শব্দের কোন রুপটি আপনি বাছাই করবেন তা নির্ভর করবে আপনার রুচির উপর, কিন্তু তারপরও কোন না ভাবে টানাপোড়েনটি রয়ে যায়।
পুরো ব্যাপারটি ভালোভাবে সুবিন্যস্ত করার উপায় হচ্ছে ‘রেপ্লিকেটর’ বা অনুলিপনকারী এবং ভেহিকল’ বা ‘বাহক’ শব্দগুলো ব্যবহার করা। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মৌলিক একক, সে মূল জিনিসটি যা টিকে থাকে বা টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়, যা হুবহু প্রতিলিপিদের একটি বংশধারা সৃষ্টি করে কখনো কখনো ঘটা র্যানভোম মিউটেশন সহ, তাদেরকে বলা হচ্ছে রেপ্লিকেটর। ডিএনএ অণুরা হচ্ছে রেপ্লিকেটর বা অনুলিপিকারক। তারা সাধারণত, সেই সব কারণে যা আমরা আলোচনা করবো কিছুক্ষণের মধ্যে, একসাথে জোট বাধে সুবিশাল সমাজবদ্ধ টিকে থাকার মেশিন অথবা ‘বাহক হিসাবে। যে বাহকগুলোকে আমরা সবচেয়ে ভালো চিনি একক কোনো জীব সদস্যদের শরীর হিসাবে, যেমন, আমাদের শরীর। একটি শরীর তাহলে, কোনো রেপ্লিকেটর বা অনুলিপনকারী নয়, বাহক। আমাকে এই বিষয়টির উপর খানিকটা জোর দিতে হবে, কারণ এই বিষয়টি আমরা প্রায়ই ভুল বুঝি। বাহকরা তাদের নিজেদের প্রতিলিপি করতে পারেনা, অনুলিপনকারীদের প্রজন্মান্তের হস্তান্তর করার জন্য। তারা কাজ করে রেপ্লিকেটররা কোনো আচরণ করেনা, তারা পৃথিবীটাকে অনুভব করতে পারেনা, তারা কোনো শিকার ধরেনা বা শিকারী প্রাণীদের আক্রমণ এড়াতে তারা পালায়না। তারা বাহক সৃষ্টি করে, আর সেই বাহকরাই সেই কাজটি করে। নানা কারণেই জীববিজ্ঞানীদের জন্য সুবিধাজনক ছিল তাদের মনোযোগ বাহকের স্তরে নিবদ্ধ রাখা। আর অন্য কিছু কারণে হয়তো তাদের জন্য সুবিধাজনক রেপ্লিকেটরদের স্তরে মনোযোগ দেয়া। জিন আর একক কোনো জীব সদস্য ডারউইনীয় নাটকে একই ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। সেখানে তাদের ভূমিকা ভিন্ন, পরস্পরের সম্পূরক, এবং বহুভাবেই তাদের দুজনেরই ভূমিকা একই ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, রেপ্লিকেটরের ভূমিকা এবং বাহকের ভূমিকা।
অনুলিপিকারকবাহক শব্দের ব্যবহার নানা কারণে সহায়ক। যেমন, প্রাকৃতিক নির্বাচন কোন স্তরে কাজ করছে এটি সেই ক্লান্তিকর বিতর্কটির অবসান করে। উপরিদৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে ‘একক সদস্যদের উপর নির্বাচনটিকে’, জিন নির্বাচন যা সমর্থন করা হয়েছে অধ্যায় ৩ এ এবং অধ্যায় ৭ এর সমালোচিত গ্রুপ সিলেকশনের মাঝামাঝি কোনো স্তরে নির্বাচনের একটি মইয়ের মত কোনো এক ধাপের উপর রাখা যেতে পারে। একক কোনো সদস্যের উপর নির্বাচন’ মনে হয় অস্পষ্টভাবে এই দুটি চূড়ান্ত পর্যায়ের মাঝামাঝি কোনো অবস্থানে, আর বহু জীববিজ্ঞানী এবং দার্শনিক এই সহজ পথে ভাবতে প্ররোচিত হয়েছেন এবং এটিকে এভাবে দেখে এসেছেন। কিন্তু আমরা এখন দেখতে পারি যে বিষয়টি আসলে এরকম নয়। আমরা এখন দেখতে পারি যে কোনো জীব এবং জীবদের কোনো গ্রুপ এই গল্পে ‘বাহক’ দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু তাদের কেউই এমনকি কোনভাবেই ‘অনুলিপনকারী ভূমিকা পালন করার প্রার্থী নয়। একক জীবের নির্বাচন এবং গ্রুপ নির্বাচনের মধ্যে বিতর্ক সত্যিকারভাবে দুটি বিকল্প বাহকের মধ্যে ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক। একক সদস্য নির্বাচন এবং জিন নির্বাচনের মধ্যে বিতর্কটি আদৌ কোনো বিতর্ক নয়, কারণ। জিন এবং একক কোনো জীব সদস্য আসলে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালনের প্রার্থী এবং এই কাহিনীতে তারা একে অপরের পরিপুরক ভূমিকা পালন করে, অনুলিপনকারী এবং বাহক।
কোনো একক সদস্য এবং এক গ্রুপ জীব সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাহকের ভূমিকার জন্য, এবং এটি যেহেতু সত্যিকারের দ্বন্দ্ব, এটির সমাধান করা যেতে পারে এবং দেখা গেছে এর পরিণতি, আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে, একক প্রাণীদের জন্য সুনির্দিষ্ট একটি বিজয়। সত্তা হিসাবে গ্রুপ খুবই অস্পষ্ট ধারণা। হরিণদের একটি পাল, সিংহদের একটি গ্রুপ বা প্রাইড, এক দল নেকড়ে, তাদের কিছু নির্দিষ্ট প্রাথমিক পর্যায়ে উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে একাত্মতা আর সংশ্লিষ্টতা আছে। সেটি খুবই তুচ্ছ যখন আমরা কোনো একক সিংহ কিংবা নেকড়ে বা হরিণের শরীরের সংগঠন আর উদ্দেশ্যের একাত্মতা লক্ষ্য করি। এবং এই সত্যটি এখন ব্যাপকভাবে গৃহীত কিন্তু কেন এটি সত্যি? সম্প্রসারিত ফেনোটাইপ এবং পরজীবিরা আবার আমাদের সাহায্য করতে পারে বিষয়টি বুঝতে।
আমরা দেখেছিলাম যে যখন কোনো একটি পরজীবির জিনগুলো একে অপরের সাথে একসাথে কাজ করে, কিন্তু পোষকের জিনের বিরোধিতা করে ( যারা আবার নিজেরা সবাই একই সাথে কাজ করে) এর কারণ হচ্ছে এই দুই সেট জিনের ভিন্ন ভিন্ন উপায় আছে। তাদের একই সাথে ভাগ করে নেয়া বাহকের শরীরের বাইরে আসার জন্য। শামুকের জিনগুলো শুক্রাণু কিংবা ডিম্বাণুর মাধ্যমে তাদের এই ভাগ করে নেয়া বাহন ত্যাগ করে। কারণ সব শামুক জিনই প্রতিটি শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর সাথে একই পরিমান স্বার্থ জড়িত, কারণ সবাই একই নিরেপক্ষ একটি মাইওসিস কোষ-বিভাজন প্রক্রিয়া অংশগ্রহন করে, তারা সবাই একই কাজ করে একটি সার্বিক মঙ্গলের জন্য এবং সেকারণে তারা শামুকের শরীরকে একটি সংগঠিত এবং উদ্দেশ্যময় বাহক হিসাবে নির্মাণ করার প্রবণতা বহন করে। সত্যিকার যে কারণটি ব্যাখ্যা করে কেন ফুক তার পোষক থেকে শনাক্তযোগ্যভাবে ভিন্ন, কেন এটি পোষকের উদ্দেশ্য আর পরিচয়ের সাথে একীভুত হয়ে যায় না– সেটি হচ্ছে ফ্লক জিনগুলো শামুকের জিনগুলোর মত তাদের বাহনের বাইরে আসার একই পদ্ধতি ব্যবহার করেনা। তারা শামুকের মাইওটিক লটারীর সাথে সংশ্লিষ্ট নয়– কারণ তাদের নিজেদের এমন একটি লটারীতে অংশ নিতে হয়। সুতরাং, সেই পর্যায় অবধি, এবং শুধুমাত্র সেই পর্যায় অবধি, দুটি বাহক বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখে, শামুক এবং তাদের মধ্যে বসবাসরত শনাক্ত করা সম্ভব ফুকরা। যদি ফুক জিনরা শামুকের ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু দ্বারা বাহিত হয়, দুটি শরীরই বিবর্তিত হয় এমনভাবে যেন তারা একই শরীর। আমরা হয়তো বলতে পারবো না যে এখানে কোনদিনও দুটি ‘বাহক ছিল।
