কিন্তু মাথা কাটার কাজটা বেশ শ্রমসাপেক্ষ। পরজীবিরা নিজেরা কষ্ট করতে অভ্যস্ত নয়, যদি তারা পরিশ্রম এড়িয়ে কাজটি অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারে। উইলসনের ‘দ্য ইনসেক্ট সোসাইটিস বইটির আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্রটি হচ্ছে Monomorium santschil; এই প্রজাতিটি, বিবর্তনের সময়ের পরিক্রমায় পুরোপুরিভাবে তাদের কর্মী শ্ৰেণীটাকে হারিয়েছে। পোষকের কর্মী বাহিনী তাদের সব কাজ করে দেয়, এমনকি সবচেয়ে ভয়ঙ্করতম কাজটি। আগ্রাসনকারী পরজীবি রানির পক্ষে, তারা আসলেই তাদের নিজেদের মাকে হত্যা করার মত কাজটি সম্পাদন করে। আগ্রাসনকারী রানির নিজের চোয়াল ব্যবহার করার কোনো প্রয়োজন। নেই। সে মন নিয়ন্ত্রণ করে। কিভাবে সে এই কাজটি করে তা একটি রহস্য; সম্ভবত এখানে সে-কোনো রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে, কারণ পিপড়াদের স্নায়ুতন্ত্র নানা ধরণের রাসায়নিক দ্রব্যের প্রতি বিশেষ সংবেদী। যদি তার অস্ত্র সত্যি রাসায়নিক হয়ে থাকে, এটি বিজ্ঞানে পরিচিত যে কোনো ড্রাগ অপেক্ষা ভয়ঙ্কর অশুভ প্রকৃতির। কারণ, একটু ভেবে দেখুন সেটি কি করাতে পারছে। এটি কর্মী পিপড়া মস্তিষ্ক প্লাবিত করে, তার মাংসপেশীর দখল নেয়, তাকে তার মস্তিষ্কে গভীরে প্রোথিত নির্দেশনা মোতাবেক কাজ থেকে সরিয়ে এনে নিজেদের মায়ের প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করায়। পিপড়াদের জন্য মাতৃহত্যা বিশেষ একধরণের জিনগত পাগলামী এবং তাদের এমন কোন কাজ করতে প্ররোচিত করতে সেই ড্রাগটিকে অবশ্যই খুব শক্তিশালী হতে হবে। সম্প্রসারিত ফিনোটাইপের জগতে, জিজ্ঞাসা করবেন না কিভাবে কোনো জীবের আচরণ এর জিনদের সুবিধা দেয়, বরং জিজ্ঞাসা করুন কার জিনের উপকার সে করছে।
বিস্ময়ের আসলেই কিছু নেই যে নানা পরজীবি তাদের নিজেদের স্বার্থে পিপড়াদের সফলভাবে ব্যবহার করে। শুধু অন্য পিপড়া প্রজাতি নয়, বিশেষায়িত পরজীবিদের একটি বিস্ময়কর মিশ্রণ তাদের পরজীবি হিসাবে ব্যবহার করে। কর্মী পিপড়া বেশ প্রশস্ত একটি এলাকা থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহের সমৃদ্ধ চালান নিশ্চিৎ করে তাদের নেস্টের কেন্দ্রীয় গুদামে, যা ফ্রিলোডার বা বিনা পরিশ্রমে যারা অন্যদের পরিশ্রমের ফসলে ভাগ বসাতে চায়, তাদের পক্ষে দখল করার জন্য এটি খুব সহজ একটি লক্ষ্য। এছাড়া পিপড়া প্রতিরক্ষা দেবার জন্য বেশ ভালো প্রহরী হতে পারে, তারা যেমন সংখ্যায় বেশী, তেমনি অস্ত্রেও সুসজ্জিত। অধ্যায় ১০ এর এফিড দেখা যেতে পারে নেকটার পরিশোধ করার বিনিময়ে তাদেরকে পেশাজীবি দেহরক্ষক হিসাবে ভাড়া করছে। বেশ কিছু প্রজাপতি প্রজাতিরা তাদের ক্যাটারপিলার স্তরটি কাটায় কোনো না কোনো পিপড়া প্রজাতির নেস্টে। কেউ পুরোপুরিভাবে শুধু আদায় করে নেয়। তাদের স্বার্থটা, অন্যরা তাদের দেয়া প্রতিরক্ষার বিনিময়ে কিছু প্রদান করে। কখনো আক্ষরিক অর্থেই তাদের শরীরে চুলের মত সাজানো থাকে নানা যন্ত্র যা দিয়ে তারা তাদের প্রতিরক্ষাকারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। Thisbe irenea নামের একটি প্রজাপতির ক্যাটারপিলারদের শব্দ তৈরীর একটি বিশেষ উপাঙ্গ থাকে তাদের মাথার কাছে, যার কাজ পিপড়াদের ডাকা, এবং একজোড়া লম্বা টেলিস্কোপের মত উপাঙ্গ থাকে এর পেছনের দিকে, পিপড়াদের জন্য যা মোহাবিষ্ট করে রাখার মত নেকটার বা রস নিঃসরণ করে। এর ঘাড়ে আরো এক জোড়া নলসহ ছিদ্র আছে, যা আরো সূক্ষ্ম
যাদুকরী সম্মোহনী প্রভাব ফেলে। তাদের নিঃসরণ কোনো তরল রস নয় বরং উদ্বায়ী একটি রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণ যা পিপড়াদের আচরণের উপর আরো নাটকীয় প্রভাব ফেলে। যখনই কোন পিপড়া এর কাছাকাছি আসে দেখা যায় সে রীতিমত উত্তেজিত হয়ে ওঠে, এর চোয়াল পুরো খুলে এটি হয়ে ওঠে তীব্র আক্রমণাত্মক। আক্রমণ করার জন্য তার মধ্যে দেখা যায় স্বাভাবিক পরিস্থিতির আরো বেশী আকুলতা, যে-কোন চলমান বস্তুকে সে কামড় বা হুল ফোঁটাতে তেড়ে যায়, শুধু ব্যতিক্রম, এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে, সেই ক্যাটারপিলারদের সে কিছু করেনা, যারা তাকে এই রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে উত্তেজিত করে। উপরন্তু, কোনো পিপড়া, যা এই মাদক বিতরণকারী ক্যাটারপিলারের প্রভাবে আওতায় থাকবে সে ধীরে ধীরে এমন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করে যাকে বলা যায় ‘বাইন্ডিং’, যেখানে এটি এর ক্যটারপিলার এর সাথে পুরোপুরিভাবে অবিচ্ছিন্ন একটি বন্ধনে আবদ্ধ হয় বেশ কিছু দিনের জন্য। সুতরাং আফিডদের মত, কিছু ক্যাটারপিলার, পিপড়াদের দেহরক্ষী হিসাবে ব্যবহার করে, কিন্তু এটি আরো খানিকটা বেশী কিছু করে। যখন আফিডরা পিপড়াদের শিকারী প্রাণীদের প্রতি সহজাত আগ্রাসী মনোভাবের উপর ভরসা করে, সেখানে ক্যাটারপিলার তাদের আরো আগ্রাসী করে তোলার জন্য বিশেষ রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে, যা মাদকের মত সেই পিপড়াদের নিজেদের সাথে বেধে ফেলে তাদের আসক্ত করে তুলে।
আমি কিছু চরম উদাহরণ বেছে নিয়েছি। কিন্তু আরো বেশ মৃদু উপায়ে, প্রকৃতি জুড়েই আছে বহু প্রাণী আর উদ্ভিদের উদাহরণ, যারা একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করে, যারা তাদের একই প্রজাতি কিংবা অন্য প্রজাতির সদস্য। প্রতিটি ক্ষেত্রে যেখানে প্রাকৃতিক নির্বাচন এই নিজেদের স্বার্থে অন্য প্রজাতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জিনহগুলোকে সুবিধা দেয়। সুতরাং এটি বৈধ হবে যদি বলা হয় এই সব একই জিনদের (সম্প্রসারিত ফিনোটাইপিক) প্রভাব আছে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এমন জীবের শরীরের উপর। কোন শরীরের মধ্যে জিনটি সত্যিকার শারীরিকভাবে বসে আছে, সেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর নিয়ন্ত্রণের নিশানা হতে পারে একই শরীর কিংবা ভিন্ন কোনো শরীর। প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই সব জিনদের সহায়তা করে যারা পরিবেশকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে তাদের বংশ বৃদ্ধির জন্য। এটাই নির্দেশ করে সেই প্রস্তাবনাটির প্রতি যাকে আমি বলেছি সম্প্রসারিত ফিনোটাইপের সেন্ট্রাল থিওরেম বা কেন্দ্রীয় মূলনীতি: ‘একটি প্রাণীর আচরণের প্রবণতা আছে সেই আচরণের জন্য নির্দিষ্ট জিনগুলোর টিকে থাকার ব্যপারটি সর্বোচ্চভাবে নিশ্চিৎ করার, সেই জিনগুলো যে জীবটি সেই আচরণ করছে তার শরীরে থাকতে পারে, আবার নাও থাকতে পারে। আমি প্রাণীদের আচরণের প্রসঙ্গেই কথাটি বলেছি, তবে এই মূলনীতিটি আমরা আরোপ করতে পারি, অবশ্যই রঙ, আকার, আকৃতি ইত্যাদি তো বটেই, যে-কোনো কিছুর ব্যপারে।
