কিন্তু আরো একবার আমরা ফিরে গেছি জীবনকে জিন নয় বরং একক কোনো জীব সদস্যের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখার ক্ষেত্রে। আমরা যখন ফুক আর শামুক নিয়ে কথা বলেছিলাম তখন আমরা সেই ধারণার সাথে নিজেদের অভ্যস্ত করিয়ে নিয়েছিলাম পোষকের শরীরে উপর কোনো একটি পরজীবীর জিনের ফিনোটাইপিক প্রভাব থাকতে পারে ঠিক একই উপায়ে, যেমন কোনো প্রাণীর জিনের ফিনোটাইপিক প্রভাব আছে তার নিজের শরীরের উপর। একটি অর্থে কোনো শরীরের মধ্যে বাস করা সব জিনই ‘পরজীবি’ জিন, আমরা তাদের শরীরের নিজস্ব জিন বলি কিংবা না বলি। কোকিলের প্রসঙ্গটি আলোচনায় এসেছিল সেই সব পরজীবিদের উদাহরণ হিসাবে তারা তাদের পোষকের শরীরের ভিতরে না বাইরে বসবাস করে। তারা তাদের পোষককে নিজেদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রিত করে, ঠিক যেমন ভাবে শরীরে অভ্যন্তরে বাস করা কোনো পরজীবি করে থাকে। এবং এই নিয়ন্ত্রণ, যেমন এখন আমরা দেখেছি খুবই শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য হতে পারে যে কোনো মাদকদ্রব্য কিংবা হরমোনের প্রভাবের মতই। আভ্যন্তরীণ পরজীবিদের ক্ষেত্রের মতই, আমাদের উচিৎ হবে পুরো ব্যপারটি আবারো জিন এবং সম্প্রসারিত ফিনোটাইপের ভাষায় ব্যক্ত করা।
কোকিল ও তার পোপাষকের মধ্যে বিবর্তনীয় অস্ত্র প্রতিযোগিতায়, উভয়-পাশের অগ্রগতিগুলো জিনগত মিউটেশন রুপ নেয়, যার উদ্ভব ঘটে ও বিশেষ সুবিধা পায় প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে। কোকিলের হা করা মুখের ব্যপারে এটি যাই হোক না কেন, এটি পোষকের স্নায়ুতন্ত্রে কাজ করে মাদকের মত, এটি অবশ্যই শুরু হয়েছে জিনগত মিউটেশন থেকে। এই মিউটেশন কাজ করে, ধরুন, কোকিল বাচ্চার হা করে থাকা মুখের রঙ ও আকারের উপর তার প্রভাব ফেলে। কিন্তু এমনকি এটাও তার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব নয়। সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব হচ্ছে কোষের অভ্যন্তরে অদৃশ্য রাসায়নিক কর্মকাণ্ড। রঙ এবং আকারের উপর জিনের প্রভাব নিজেই পরোক্ষ। এবং এখানেই আমার মূল বক্তব্য। তাদের মন্ত্রমুগ্ধ পোষকের আচরণের উপর কোকিলে একই জিনগুলোর প্রভাব শুধুমাত্র এর থেকে খানিকটা পরোক্ষ। এটি ঠিক একই অর্থে যেমন আমরা বলতে পারি কোকিলের জিনের (ফিনোটাইপিক প্রভাব আছে কোকিলের হা করে থাকা মুখের রঙ আর আকারের উপর। সুতরাং আমরা কোকিলের জিনদের কথা বলতে পারি এভাবে যে, তাদেরও ( সম্প্রসারিত ফিনোটাইপিক) প্রভাব আছে পোষকের আচরণে। পরজীবি জিনগুলো তার পোষকের শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে, শুধুমাত্র তখনই না যখন পরজীবি কোনো পোষকের শরীরের ভিতরে বাস করে যখন সে এটিকে সরাসরি নিয়ন্ত্রিত করে রাসায়নিক উপায়ে, বরং যখন পরজীবি বাস করে তার পোষকের শরীরের বাইরে, পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে, এবং পোষককে নিয়ন্ত্রণ করে দূর থেকে। বাস্তবিকভাবেই যেমনটি আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখবো, এমনকি রাসায়নিক প্রভাবও কাজ করতে পারে শরীরের বাইরে।
শিক্ষা দেবার মাধ্যম হিসাবে কোকিলরা আসলেই আকর্ষণীয় প্রাণী। কিন্তু মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে এরকম যে কোনো বিস্ময়কে অনায়াসে পেরিয়ে যাবে কীটপতঙ্গরা। তাদের সেই সুবিধা আছে, কারণ তারা সংখ্যায় বিশাল। আমার সহকর্মী রবার্ট মে সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, ‘খুব ভালো করে হিসাব করে দেখলে, সব প্রজাতি আসলে কীটপতঙ্গ। পতঙ্গ ‘কোকিলদের সংখ্যা তালিকা করা প্রায় অসম্ভব। তারা সংখ্যায় অনেক বেশী এবং তাদের আচরণ প্রায়শই পুনরাবিষ্কার করা হয়েছে। কিছু উদাহরণ যা আমরা দেখবো সেগুলো পরিচিত কোকিলসুলভ আচরণকে ছাড়িয়ে যাবে আমাদের সবচেয়ে লাগামছাড়া কল্পনাকে পূর্ণ করে, যা সম্প্রসারিত ফিনোটাইপের’ ধারণা হয়তো অনুপ্রাণিত করতে পারে।
একটি কোকিল তার ডিম পাড়ে এবং অদৃশ্য হয়ে যায়, কিন্তু কিছু পিপড়া কোকিল স্ত্রী সদস্যরা আরো নাটকীয়ভাবে তাদের উপস্থিতির জানান দেয়। আমি সাধারণত ল্যাটিন নাম ব্যবহার করিনা, কিন্তু Bothriomyrmex regicidus এবং B. decapitans এই নাম দুটি আসলেই কাহিনী বর্ণনা করে। এই দুটি প্রজাতি অন্য প্রজাতির পিপড়াদের সাথে পরজীবির মত আচরণ করে। সব পিপড়াদের মধ্যে, অবশ্যই, শিশু প্রজন্মকে সাধারণত প্রতিপালন করে তাদের পিতামাতা নয় বরং কর্মীরা। সুতরাং এই সব কর্মীদেরকে বোকা বানাতে হবে কোকিলের মত পরজীবি হতে ইচ্ছুক এমন কাউকে। একটি উপযোগী প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে কর্মীদের মাকেই সরিয়ে ফেলা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে এমন কর্মী সন্তান পালের জন্ম দেবার যার প্রবণতা আছে। এই দুটি প্রজাতিতে, পরজীবি রাণি, একাকী, লুকিয়ে অন্য প্রজাতির পিপড়াদের ঘরে ঢুকে পড়ে। সে খুঁজে বের করে তার এই পোষক ঘরের রাণিকে, এরপর তার পিঠের উপর চড়ে বসে, এবংনীরবে সে তার কাজ সম্পন্ন করে, যে কাজটি কি সেই সম্বন্ধে এডওয়ার্ড উইলসনের কৌশলী রক্ত হিম করা উনোক্তি যদি উদ্ধৃত করি: ‘একটি কাজ যার জন্য সে অনন্যভাবে বিশেষায়িত হয়েছে: ধীরে ধীরে তার শিকারের মাথা কেটে ফেলা। এই খুনীকে এরপর এতিম হয়ে যাওয়া কর্মীরা তাদের রাণী হিসাবে গ্রহন করে, যারা কোনো কিছু সন্দেহ না করে তার ডিম ও লার্ভাকে প্রতিপালন করতে শুরু করে। তাদের কেউ কেউ পালিত হয়ে নিজেরাই কর্মী হিসাবে গড়ে ওঠে, যারা ধীরে ধীরে সেই নেস্টের মূল প্রজাতিকে প্রতিস্থাপিত করে। অন্যরা রূপান্তরিত হয় রাণী হিসাবে, যারা উড়ে যায় নতুন কোনো পিপড়ার নীড়ে তাদের আগ্রাসণ সূচনা করতে, নুতন কোনো রাজকীয় মাথার খোঁজে, যা এখনও বিচ্ছিন্ন করা হয়নি।
