কোকিল বাচ্চার উন্মুক্ত হয়ে থাকা লাল মুখ এত বেশী আকর্ষণীয় যে পাখিবিশারদরা প্রায়শই দেখেছেন, অন্য বাসায় বসে থাকা কোকিল বাচ্চা হা করে থাকা মুখে পাখিদের খাবার ফেলতে। কোনো পাখি হয়তো বাসায় যাচ্ছে উড়ে, তার নিজের শিশুর জন্য খাওয়া বহন করে, হঠাৎ করে, চোখের এক কোনা দিয়ে সে কোকিল বাচ্চার লাল বিশাল হা করা মুখ দেখে, কোনো একটি ভিন্ন প্রজাতির পাখির নীড়ে। এটি সেই অপরিচিত পাখির নীড়ের দিকে তার গতি পরিবর্তন করে, তার নিজের বাচ্চাদের জন্য বহন করা খাদ্যটি কোকিলের বাচ্চার মুখে ফেলে দেয়। এই ‘ইররেজিস্টিবিলিটি বা অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ’ তত্ত্বটি খুব ভালোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল আদি জার্মান পাখি বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে যারা এই সব পোষক পিতামাতার আচরণকে তুলনা করেছেন ‘মাদকত্সক্তদের আচরণের সাথে এবং কোকিলের বাচ্চা হচ্ছে তাদের জন্য সেই মাদক। এই ধরনের ভাষার ব্যবহার যে আধুনিক গবেষকরা খুব একটা গ্রহন করেননি সেটা উল্লেখ করাই উচিৎ হবে আমার জন্য। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই যে যদি আমরা ধরে নেই যে কোকিলের হা করা মুখ হচ্ছে খুব শক্তিশালী মাদকের মত কোনো উদ্দীপক, খুবই সহজ হয়। কি ঘটছে তা ব্যাখ্যা করা। অনেক সহজ হয় সহমর্মিতা প্রকাশ করা সেই ক্ষুদ্রকায় পিতামাতার জন্য যা এর দানবাকৃতির সন্তানের পিঠে দাঁড়িয়ে আছে তার মুখে খাবার তুলে দেবার জন্য। এটা কিন্তু বোকা হওয়া না। বোকা বানানো এখানে ব্যবহার করা জন্য ভুল শব্দ। এর স্নায়ুতন্ত্র অপ্রতিরোধ্যভাবে নিয়ন্ত্রিত, যেন তারা অসহায় মাদকসক্ত অথবা কোকিল হচ্ছে যে কোনো বিজ্ঞানী যে এর মস্কিষ্কের মধ্যে ইলেক্ট্রোড ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে।
কিন্তু এমনকি যদি আমরা এখন আরো বেশী ব্যক্তিগত সমবেদনা ব্যবহার করি এইসব দুরভিসন্ধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পোষক পিতামাতাদের সাথে, আমরা তারপরও জিজ্ঞাসা করতে পারি কেন প্রাকৃতিক নির্বাচন কোকিলদের সুযোগ দিয়েছে এ ধরনের কাজ করে পার পেয়ে যাবার জন্য, তাহলে কেন পোষকের স্নায়ুতন্ত্র সময় পায়নি তার কাজ করার জন্য। হয়তো কোকিলরা তাদের পোষক পরিবারে পরজীবিতা শুরু করেছে সাম্প্রতিক শতাব্দীতে এবং আরো কয়েক শতাব্দী পরে হয়তো বাধ্য হবে তাদের পরিত্যাগ করে নতুন কোনো পোষক প্রজাতি অনুসন্ধান করার জন্য। বেশ কিছু প্রমাণ আছে এই তত্ত্বটিকে সপক্ষে। কিন্তু আমি যা অনুভব না করে পারছি না, সেটি হচ্ছে এখানে অবশ্যই এর চেয়ে আরো কিছু ব্যপার আছে।
কোকিল এবং কোনো পোষক প্রজাতির মধ্যে বিবর্তনীয় অস্ত্র প্রতিযোগিতার ভিতরেই থাকে এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব, যার কারণ ব্যর্থতার মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে অসাম্যতা। প্রতিটি কোকিল বাচ্চা এসেছে বংশানুক্রমিকভাবে কোকিল বাচ্চাদের পূর্বসুরীদের দীর্ঘ বংশতালিকায়, তাদের প্রত্যেকেই অবশ্যই তাদের পোষক পিতামাতাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে সফল হয়েছে। কোনো কোকিল ছানা যারা কিনা তাদের এই প্রভাবটি এক মুহূর্তের জন্য শিথিল করেছে সে মারা যাবে এর পরিণতিতে। কিন্তু প্রতিটি একক পোষক পিতামাতা এসেছে পূর্বসূরীদের দীর্ঘ বংশধারায় যাদের অনেকেই জীবনে কখনো কোনো কোকিল বাচ্চা দেখেনি। কিন্তু যারা তাদের নীড়ে কোনো কোকিলকে পেয়েছে তারা তার শিকার হয়েছে এবং আরো কিছু বাচ্চা জন্ম দেবার জন্য পরবর্তী প্রজনন কাল অবধি বেঁচে ছিল। মূল বিষয়টি হচ্ছে ব্যর্থতার জন্য যে মূল্য পরিশোধ করতে হয় তার একটি অসাম্যতা। জিন যা ব্যর্থ হয়। কোকিলের আরোপিত দাসত্বকে প্রতিরোধ করার জন্য, সেগুলো খুব সহজেই রবিনস অথবা ডানোকস-এর পরবর্তী প্রজন্মে বিস্তার লাভ করতে পারে। কিন্তু পোষক পিতামাতাকে দাসত্ব করাতে ব্যর্থ জিন কোকিল প্রজন্মের মধ্যে বিস্তার লাভ করতে পারেনা। এটাই আমি বোঝাতে চেয়েছি ‘অন্তর্গত পক্ষপাতিত্ব’ কথাটা বোঝাতে। এই বিষয়টি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছে ঈশপের একটি উপকথা: ‘খরগোশ শিয়ালের চেয়ে জোরে দৌড়ায়, কারণ খরগোশ তার জীবনের জন্য দৌড়ায় যখন শিয়াল শুধু তার রাতের খাবারের জন্য দৌড়ায়। আমি এবং আমার সহকর্মী জন ক্রেবস এর নাম দিয়েছিলাম, ‘লাইফ/ডিনার প্রিন্সিপাল।
এই লাইফ/ডিনার প্রিন্সিপালের কারণে প্রাণীরা হয়তো কখনো কখনো এমনভাবে আচরণ করে যা তাদের স্বার্থের জন্য সবচেয়ে ভালো নয়, যে আচরণগুলো নিজেদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করে অন্য কোনো প্রাণী। আসলেই এক অর্থে, তারা কেবল তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে সেরা উপায়টি বেছে নিচ্ছে। এই লাইফ/ডিনার প্রিন্সিপলটির মূল বক্তব্য হচ্ছে যে তারা তাত্ত্বিকভাবে কোনো ধরণের অন্যের স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়া থেকে নিজেদের সুরক্ষা করতে পারবে কিন্তু সেটি করা তাদের জন্য বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। হয়তো কোকিলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিরোধ করার জন্য দরকার হয় বড় চোখ অথবা বড় আকারে মস্তিষ্কের, সেগুলো সব বাড়তি খরচের হিসাবে পড়ে। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী যার জিনগত প্রবণতা আছে এই ধরনের কোকিলের স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়াটি প্রতিরোধ করতে পারে, তারা আসলেই কম সফল হবে এই জিনগুলো পরের প্রজন্মে হস্তান্তর করার জন্য, কারণ এই প্রতিরোধ করার অর্থনৈতিক মূল্যটি।
