একটি উন্মোচনকারী স্পেকট্রাম বা বিস্তার এখনও আমরা খুঁজে পেতে পারি হাইড্রা প্রজাতিদের মধ্যে– ক্ষুদ্র, অলস, টেন্টাকল যুক্ত প্রাণীরা, মিঠা পানির সি-অ্যানিমোনদের মত তারা দেখতে। তাদের কোষের মধ্যে সাধারণত পরজীবি হিসাবে বাস করে শৈবাল বা আলগি ( এখানে আলগি ইংরেজী বানানের ‘জি’ টি উচ্চারণ করতে হবে গভীরভাবে ‘গ’ এর মত, অজানা কোনো কারণে শুধুমাত্র আমেরিকাতেই না, কিছু প্রাণীবিজ্ঞানী তারা আলজি উচ্চারণ করছেন, যেমন, আলজেরনন, বহুবচন ‘আলগির ক্ষেত্রে শুধু মাত্র না- যা হয়তো ক্ষমাযোগ্য হতে পারে, এমনকি একবচনে ‘আলগা’র ক্ষেত্রে এই উচ্চারণ গ্রহনযোগ্য নয়।) হাইড্রাদের Hydra vulgaris এবং Hydra attenuate প্রজাতিতে আলগি আসলেই সত্যিকারের পরজীবি, যা তাদের অসুস্থ করে ফেলে। কিন্তু Chlorohydra viridissima প্রজাতিতে আলগি হাইড্রাদের কোষে কখনোই অনুপস্থিত না এবং তারা হাইড্রার বেঁচে থাকার জন্য উপযোগী কিছু ভূমিকা পালন করে –যেমন, তাদের অক্সিজেন সরবরাহ করে। এবং যে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি আমাদের নজরে পড়ে যেমনটি আমাদের প্রত্যাশিত হবার কথা, ক্লোরোহাইড্রা প্রজাতিতে আলগি তাদের নিজেদেরকে পরবর্তী পোষকের শরীরের বাহিত করতে হাইড্রার ডিম্বাণু ব্যবহার করে। অন্য দুটি প্রজাতিতে তারা সেটি করতে পারেনা। আলগি জিনের স্বার্থ এবং ক্লোরোহাইড্রাদের জিনের স্বার্থ একই সাথে মিলে যায়। তাদের ক্ষমতায় সর্বোচ্চ করা সম্ভব এমনভাবে তারা ক্লোরোহাইড্রাদের ডিমের উৎপাদন বাড়াতে চেষ্টা করে। কিন্তু অন্য দুটি প্রজাতির জিনের সাথে তাদের বহন করা আলগির স্বার্থ ‘মেলে না, যাই হোক না কেন, একই রকম পর্যায় অবধি। হাইড্রার শরীরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দুই সেট জিনেরই স্বার্থ আছে। কিন্তু শুধুমাত্র হাইড্রা জিনের হাইড্রা প্রজননের জন্য স্বার্থ আছে। সুতরাং, নিরীহ সহযোগিতা গড়ে তোলার দিকে বিবর্তিত হবার পরিবর্তে আলগি সেখানে টিকে থাকে ক্ষতিকারক পরজীবি হিসাবে। এখানে মূল বিষয়টি হচ্ছে, আবারো পুনরাবৃত্তি করছি, কোনো একটি পরজীবি যা তার পোষকের জিনের মত একই নিয়তি অর্জন করা চেষ্টা করে, সে তার পোষকের সব স্বার্থের সাথে একাত্মতা বোধ করে, এবং একপর্যায়ে সেটি আর সেই পোষকের শরীরে পরজীবি হিসাবে কোন সমস্যা সৃষ্টি করেনা।
নিয়তি, এই ক্ষেত্রে মানে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। ক্লোরোহাইড্রা জিন এবং আলগি জিন, বীটল জিন এবং ব্যাকটেরিয়া জিন, শধুমাত্র এর পোষকের ডিমের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে যেতে পারে। সুতরাং, পরজীবি জিন যে হিসাব নিকাশই করুক না কেন, উপযুক্ত নীতি হিসাবে, জীবনের যে-কোনো অংশে, সেগুলো হুবহু কিংবা প্রায় হুবহু মিলে যাবে পোষক জিনের গৃহীত উপযুক্ত নীতির সাথে, কারা তারাও একই ধরনের হিসাব নিকাশ করবে। শামুক এবং তার ফ্লুক পরজীবির ক্ষেত্রে, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, খোলসের পুরুত্বের ব্যপারে তাদের পছন্দের ভিন্নতা আছে। অ্যামব্রোসিয়া বীটল ও তার পরজীবি ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে, পোষক এবং পরজীবি একমত হবে পাখার একই দৈর্ঘ্য এবং বীটলদের শরীরের অন্য সব বৈশিষ্ট্যগুলোর ব্যাপারে। আমরা এটি অনুমান করতে পারি বীটল তার পাখা বা অন্য যে কোনো কিছুই কি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে সেগুলো সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে কোনো কিছু জানা ছাড়াই। ঠিক কিভাবে বীটলরা তাদের পাখা ব্যবহার করবে সেই বিষয়ে বিস্তারিত না জেনেও আমরা এই পূর্বধারণা করতে পারি। শুধুমাত্র যুক্তি থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি, বীটল জিন এবং ব্যাকটেরিয়া জিন, উভয় ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতার মধ্যে সব ধরনেরই পদক্ষেপ নেবে একই ভবিষ্যৎ ঘটনাকে সৃষ্টি করার প্রচেষ্টায়– যে ঘটনাগুলো যা বীটলের ডিম্বাণু বিস্তারে জন্য সহায়ক।
আমরা এই যুক্তিটিকে একটি যৌক্তিক উপসংহারে নিয়ে যেতে পারি এবং এটিকে স্বাভাবিক, ‘নিজস্ব’ জিনের উপর প্রয়োগ করতে পারি। আমাদের নিজেদের জিনও পরস্পরের সহযোগিতা করে, এর কারণ কিন্তু তারা আমাদের নিজস্ব, তা নয় বরং এর কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মে যাবার জন্য তারা একই বের হবার মাধ্যম ব্যবহার করে– শুক্রাণু অথবা ডিম্বাণু। যদি একটি জীবের যে-কোনো জিন, যেমন, মানুষ, নিজেদের বিস্তার লাভ করার এমন কোনো একটি উপায় আবিষ্কার করতে পারে যা প্রচলিত শুক্রাণু বা ডিম্বাণুর উপর নির্ভরশীল নয়, তারা ঠিক সেটাই গ্রহন করতো এবং অপেক্ষাকৃত কম সহযোগিতাপূর্ণ হতো। এর কারণ তাদের সেখানে সুযোগ থাকে শরীরের অন্য জিনের তুলনায় একগুচ্ছ ভিন্ন ভবিষ্যৎ পরিণতিতে লাভবান হবার। আমরা ইতিমধ্যেই এমন জিনের সাথের পরিচিত হয়েছি যারা মাইওসিস প্রক্রিয়াকে পক্ষপাতদুষ্ট করে তাদের নিজেদের সুবিধা আদায় করতে। হয়তো এমন কোন জিনও আছে যারা শুক্রাণু আর ডিম্বাণুর ‘সঠিক’ চ্যানেলের বাধ্যবাধকতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে নেয় এবং সম্পূর্ণ নতুন কোনো পাশ কাটানো পথ তারা আবিষ্কার করে নেয়।
কোষের মধ্যে ডিএনএ এর বহু খণ্ডাংশ থাকে যারা ক্রোমোজমের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকেনা বরং তারা সাইটোপ্লাজমে স্বাধীনভাবে ভেসে বেড়ায় এবং কোষের তরল পরিবেশেই এটি বিভাজিত হয়, বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়াদের কোষে। তাদের নানা নামে ডাকা হয়,যেমন, ভাইরয়েড অথবা প্লাসমিড। প্লাসমিড এমনকি একটি ভাইরাসের চেয়েও ছোট, সাধারণত এটি অল্প কিছু জিন বহন করে। কিছু প্লাসমিড দক্ষ অনায়াসে কোনো ক্রোমোজোমের সাথে তাদের নিজেদের সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে। এবং এই সংযুক্তি এতই মসৃণ যে আপনি তাদের যোগ হবার সেই অংশটি দেখতে পাবেন নাঃ কারণ প্লাসমিড ক্রোমোজোমের অন্য যে অংশের মতই দেখতে। এই একই প্লাসমিড তাদের নিজেদেরও আবারো সেখান থেকে বিযুক্ত করতে পারে। ডিএনএ এর এই কাটা এবং যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা, ক্রোমোজোমের বাইরে ভিতরে নিজের মর্জিমত যাতায়াত যা খুব অনায়াসে ঘটতে পারে এটি অন্যতম চমকপ্রদ একটি ঘটনা যা বিজ্ঞানীরা উদঘাটন করেছিলেন এই বইটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হবার পর। বাস্তবিকভাবে প্লাসমিড গবেষণায় সাম্প্রতিক কিছু অগ্রগতিকে আমরা দেখতে পারি সুন্দর সহায়ক প্রমাণ হিসাবে, যে সম্ভাব্য ধারণা নির্ভর প্রস্তাবগুলো দেয়া হয়েছে পৃষ্ঠা ২৩৭’র (মূল বইয়ে পৃষ্ঠা ২৩৭) নীচের দিকে ( সেই সময় এই ধারণাগুলো খানিকটা বেশী কল্পনাপ্রবণ ছিল)। এইসব খণ্ডিত ডিএনএ-গুলো আসলে কীভাবে উদ্ভব হয়েছে, আগ্রাসনকারী কোনো পরজীবি, নাকি দলছুট বিদ্রোহী হিসাবে, কিছু দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি খুব একটা সমস্যা করে না। তাদের সম্ভাব্য আচরণ একই হবে। আমি এই ডিএনএ থেকে বিযুক্ত হওয়া খণ্ডিত ডিএনএ নিয়ে কথা বলবো আমার দৃষ্টিভঙ্গিটি বোঝানোর জন্য।
