পুরো বই জুড়ে সেই সম্ভাবনা সম্বন্ধে আমরা সতর্ক যে, একক জীবসদস্যরা তাদের সামাজিক সঙ্গীদের বিরুদ্ধে সূক্ষ্মভাবে ‘প্রতারণা করতে পারে। এখানে আমরা একক জিনের অন্য সব জিনের বিরুদ্ধে প্রতারণা করার বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি, যাদের সাথে এটি একই শরীরে বসবাস করে। জিনতাত্ত্বিক জেমস ক্রো তাদের চিহ্নিত করেছিলেন, সেই জিনগুলো যা সিস্টেমের বিরুদ্ধে জয়ী হয়। একটি সুপরিচিত সেগ্রেগেশন ডিসটটার হচ্ছে ইঁদুরদের ‘টি (t) জিন। যখন কোনো ইঁদুরের দুটি ‘টি জিন থাকে এটি হয় অল্পবয়সে মারা যায়, নয়তো কোনো সন্তান উৎপাদন করতে পারেনা, সে কারণে এটাকে বলা হয় লিথাল বা প্রাণঘাতী, যখন এটি হোমাজাইগাস অবস্থায় বিদ্যমান থাকে (বা ক্রোমোজোমে একই জিনের দুটি কপির উপস্থিতি থাকে); যদি কোনো পুরুষ ইঁদুরের শুধুমাত্র একটি ‘টি জিন থাকে, এটি সুস্থ ও স্বাভাবিক ইঁদুর হবে শুধুমাত্র একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছাড়া। আপনি যদি এই পুরুষ ইঁদুরটির শুক্রাণু পরীক্ষা করে দেখেন, আপনি দেখবেন যে প্রায় ৯৫ শতাংশেই ‘টি’ জিনটি আছে, শুধু ৫ শতাংশের মধ্যে আছে এর স্বাভাবিক অ্যালিলটি। এটি অবশ্যই আমদের প্রত্যাশিত ৫০ শতাংশ অনুপাতের একটি বড় মাপের বিকৃতি। যখনই, কোনো বন্য জনগোষ্ঠীতে, মিউটেশনের মাধ্যমে একটি ‘টি’ জিনের অ্যালিলের আবির্ভাব ঘটে, তাৎক্ষণিকভাবে এটি ‘দাবানলের মতো দ্রুত জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়ে। কেনই বা সেটি হবে না, যখন মাইওটিক লটারীতে এটি এত বেশী মাত্রায় পক্ষপাতিত্বমূলক সুবিধা পায়? এটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে যে, খুব শীঘ্রই জনগোষ্ঠীতে বেশ বড় মাপের একটি জনগোষ্ঠী ‘টি জিন উত্তরাধিকার সূত্রে পায় দ্বিগুণ মাপে (মা ও বাবা দুজনের কাছ থেকে)। এই একক সদস্যগুলো মারা যায় অথবা তারা সন্তান উৎপাদনক্ষম থাকে না, এবং খুব পুরো জনগোষ্ঠীটি বিলুপ্ত হয়ে যাবার জন্য বেশী সময় লাগেনা। বেশ কিছু প্রমাণও আছে যে ইঁদুরদের বন্য জনগোষ্ঠী অতীতে ‘টি’ জিনের মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে বেশ কয়েকবার বিলুপ্ত হয়েছিল।
সব ‘সেগ্রেগেশন ডিসটৰ্টারের’ এ-ধরণের বিধ্বংসী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, তাসত্ত্বেও তাদের বেশীর ভাগ সদস্যেরই নিদেনপক্ষে কিছুটা ক্ষতিকর পরিণতি আছে। (প্রায় সব জিনগত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ক্ষতিকর, এবং একটি নতুন মিউটেশন সাধারণত বিস্তার করে শুধুমাত্র যদি এর খারাপ প্রভাবের চেয়ে এর ভালো প্রভাব বেশী হয়। যদি ভালো এবং খারাপ দুটি প্রভাবই পুরো শরীরের উপর আরোপ করা যায়, এর সর্বমোট প্রভাব তারপরও শরীরের জন্য ভালো। কিন্তু যদি খারাপ প্রভাবটি শরীরের উপর পড়ে এবং ভালো প্রভাবটি শুধুমাত্র জিনের উপর এককভাবে পড়ে, শরীরের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর সর্বমোট প্রভাব হচ্ছে সবটুকু খারাপ); এর এই ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও, যদি কোনো সেগ্রেগেশন ডিসটার মিউটেশনের মাধ্যমে উদ্ভব হয় এটির অবশ্যই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা থাকবে। প্রাকৃতিক নির্বাচন (যা, সর্বোপরি কাজ করে জিন পর্যায়ে) সেগ্রেগেশন ডিসটর্টারের সমর্থন করে, এমনকি যখন একক কোনো জীব সদস্যর উপর এর প্রভাব খারাপ হবার সম্ভাবনাই বেশী।
যদিও সেগ্রেগেশন ডিসটর্টারের অস্তিত্ব আছে, তবে তাদের সচরাচর দেখা যায় না। আমরা জিজ্ঞাসা অব্যাহত রাখতে পারি কেন তাদের এত সচরাচর দেখা যায় না এই বিষয়ে, সেটি মূলত আরেকটি উপায়ে জিজ্ঞাসা করা, কেন মাইওসিস প্রক্রিয়া সাধারণত পক্ষপাতমুক্ত, খুব নিখুঁতভাবে কোনো একটি পেনীকে উপরে ছুঁড়ে টস করার মতই পক্ষপাতহীন। আমরা দেখবো যে, এর উত্তর কিভাবে বেরিয়ে আসে যদি আমরা বুঝতে পারি কেনই বা জীবদের অস্তিত্ব আছে।
প্রতিটি একক জীবই হচ্ছে এমন কিছু যাদের অস্তিত্ব বেশীর ভাগ জীববিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছেন খুব স্বাভাবিক একটি ব্যপার হিসাবে, কারণ, সম্ভবত এর নানা অংশগুলো একসাথে নিজেদের এমনভাবে ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত উপায়ে ধরে রাখে। জীবন সংক্রান্ত সব প্রশ্নগুলোই প্রথাগতভাবে জীবদের প্রসঙ্গে প্রশ্ন। জীববিজ্ঞানীরা জিজ্ঞাসা করেন কেন জীবরা এটা বা ওটা করে। তারা প্রায়ই জিজ্ঞাসা করেন, কেন জীবরা তাদের নিজেদের মধ্যে গোষ্ঠী সৃষ্টি করে সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করে। তারা জিজ্ঞাসা করেন না– যদিও যে প্রশ্নটি তাদের করা উচিৎ– প্রথমে কেনই বা জীবিত পদার্থগুলো একসাথে জড়ো হয়ে কোনো জীব সৃষ্টি করছে। কেন সমুদ্র এখনও মুক্ত আর স্বাধীন অনুলিপনকারীদের আদিম যুদ্ধক্ষেত্র নয়? কেন প্রাচীন অনুলিপনকারীরা একসাথে জড়ো হয়, রবোটের মত শরীর বানাতে ও তার মধ্যে বসবাস করার জন্য এবং কেন ঐসব রোবোটগুলো– একক শরীরগুলো, আপনি এবং আমি– কেন এত বড় আর এত বেশী জটিল?
বহু জীববিজ্ঞানীর জন্য এমনকি কঠিন অনুধাবন করা যে, এখানে আদৌ কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে। এর কারণ এটি যে একক জীব পর্যায়ে সাধারণত প্রশ্ন করা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিছু জীববিজ্ঞানী এমনকি এভাবে ভাবেন যে ডিএনএ হচ্ছে জীবদের প্রজননের জন্য ব্যবহৃত কোনো যন্ত্র, ঠিক যেমন চোখ হচ্ছে কোনো অঙ্গ যা ব্যবহার করা হয় দেখার জন্য। এই বইয়ের পাঠকরা শনাক্ত করতে পারবেন যে এই দৃষ্টিভঙ্গিটি একটি বড় মাপের বোঝার অক্ষমতার কারণে সৃষ্ট ভুল, সত্যটাকে পুরোপুরিভাবে না বুঝতে পারা। তারা একই সাথে শনাক্ত করতে পারবেন যে এর বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গিটি, জীবনের স্বার্থপর জিনের দৃষ্টিভঙ্গির নিজস্ব কিছু গভীর সমস্যা আছে। সেই সমস্যাটি প্রায় বিপরীত হচ্ছে কেন একক প্রাণীদের আদৌ কোনো অস্তিত্ব আছে, বিশেষ করে এমন একটি রুপে, যা এত বড় এবং সংগঠিত এর উদ্দেশ্যে যে, জীববিজ্ঞানীদের সত্যটাকে পুরোপুরি উল্টোভাবে অনুধাবন করার জন্য বিভ্রান্ত করে। এই সমস্যা সমাধান করতে, আমাদের শুরু করতে হবে মনের মধ্য থেকে পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেবার মাধ্যমে, যা খুব গোপনেই একটি একক জীবের অস্তিত্বকে খুব স্বাভাবিক হিসাবে মেনে নিয়েছে। অন্যথায় আমরা আরো প্রশ্নের জন্ম দেবো। যে কৌশলটি ব্যবহার করে আমরা আমাদের মনকে পরিচ্ছন্ন করতে পারি সেই ধারণাটিকে আমি বলবো এক্সটেন্ডেড ফিনোটাইপ বা “সম্প্রসারিত’ ফিনোটাইপ। এই ধারণাটি কি, এর অর্থই বা কি, সেই দিকে আমি এবার দৃষ্টি ফেরাবো।
