কোনো জিনের ফিনোটাইপিক প্রভাব মানে সাধারণত এটি যে শরীরে অবস্থান করছে সেই শরীরের উপর এর সবগুলো প্রভাবকে একত্রে যেভাবে দেখা হয়। এটাই প্রচলিত সংজ্ঞা। আমরা এখন দেখবো, কেন কোনো একটি জিনের ফিনোটাইপিক প্রভাবগুলোকে, ‘পৃথিবীতে সেই জিনটির সামগ্রিক প্রভাবসমুহ’ হিসাবে ভাবা প্রয়োজন। হতে পারে কোনো একটি জিনের প্রভাব, বাস্তবিকভাবে, একের পর এক শরীরের ধারাবাহিকতায় যে শরীরগুলোয় জিনটি অবস্থান করে সেখানে সীমাবদ্ধ। কিন্তু তাই যদি হয়, এটি শুধুমাত্র একটি বাস্তব তথ্য হবে। তবে এটি এমন কিছু হবে না, আমাদের এই বিশেষ সংজ্ঞার যা অংশ হওয়া উচিৎ। এই সব কিছুর মধ্যে, মনে রাখবেন যে, কোনো একটি জিনের ফিনোটাইপিক প্রভাবগুলো হচ্ছে সেই কৌশল, যা দিয়ে সে পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরিত হবার জন্য তার নিজের জন্য সুবিধা করে নেয়। আমি শুধু যোগ করবো যে এই কৌশলগুলো একক কোনো জীব শরীরের বাইরেও সম্প্রসারিত হতে পারে। ব্যবহারিক পর্যায়ে এর কি অর্থ হতে পারে, যখন বলা হয় কোনো একটি জিন, সে যে শরীরের বাস করে, সেই শরীরের বাইরের পৃথিবীতে এটি সম্প্রসারিত ফিনোটাইপিক প্রভাব ফেলতে পারে? মনের মধ্যে যে উদাহরণগুলো জেগে উঠছে সেগুলো হচ্ছে, যেমন, বিভার ড্যামের মত কোনো নির্মাণ,পাখির বাসা, ক্যাডিস মাছির বানানো ঘর।
ক্যাডিস ফ্লাইরা দেখতে তেমন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নয়, বিবর্ণ বাদামী রঙের একটি পতঙ্গ, আমরা বেশীর ভাগ মানুষরাই হয়তো যাদের লক্ষই করিনা যখন সেগুলো নদীর পানির উপর এলোমেলোভাবে উড়ে বেড়ায়। এটি ঘটে যখন তারা প্রাপ্তবয়স্ক। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে বের হয়ে আসার আগে জন্মের পর তাদের জীবনকালের একটি দীর্ঘ সময় লার্ভা হিসাবে নদীর তলদেশে হাটাহাটি করে কাটাতে হয়। এই ক্যাডিস লার্ভা চোখে পড়ার মত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, পৃথিবীর সব আকর্ষণীয় প্রাণীদের মধ্যে তারা অন্যতম। তাদের নিজেদের শরীরের মধ্যে সৃষ্টি করা সিমেন্ট ব্যবহার করে দিয়ে খুব দক্ষতার সাথে নদীর তলদেশে খুঁজে পাওয়া যেকোনো উপাদান দিয়ে তারা তাদের নিজেদের জন্য টিউবের মত ঘর তৈরী করে। এই ঘরগুলো এক জায়গায় স্থির নয়, ক্যাডিসরা যখন হাটে তারা সেটি সঙ্গে করে নিয়ে চলে; কোনো শামুকের খোলস বা হার্মিট ক্র্যাবদের মত শুধুমাত্র পার্থক্য এটা তাদের শরীরে নিজেরা গজিয়ে তোলার বদলে বা খুঁজে পাওয়া কোনো কিছু ব্যবহার করার ব্যতিক্রম এই ঘরগুলো তারা নিজেরা বানায়। ক্যাডিসদের কোনো কোনো প্রজাতির সদস্যরা নির্মাণ সামগ্রী হিসাবে কাঠি ব্যবহার করে, কেউ মরা পাতার টুকরো, কেই হয়তো শামুকের ছোট খোলস ব্যবহার করে। কিন্তু হয়তো সবচেয়ে বিস্ময়কর ক্যাডিস বাড়ি হচ্ছে যা স্থানীয়ভাবে খুঁজে পাওয়া পাথর ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়। খুব সতর্কতার সাথে ক্যাডিসরা পাথর বাছাই করে, খুব ছোট বা বড় পাথরগুলো যা দেয়ালের বর্তমান ছিদ্রটিকে ঢাকতে সম্ভব না সেই পাথরগুলোকে তারা বাদ দেয়, এমনকি প্রতিটি পাথরকে তারা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরীক্ষা করে দেখে যতক্ষণ না দেয়ালে যে জায়গাটা তারা ঢাকতে চাইছে সেটি পুরোপুরিভাবে খাপ খায়।
কিন্তু ঘটনাটি আমাদের কেন এত মুগ্ধ করে? আমরা যদি বাধ্য হই নির্মোহ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে, তাহলে আমাদের তো ক্যাডিসের চোখের স্থাপত্য বা এর কনুইয়ে অস্থিসন্ধি নিয়ে আরো বেশী বিস্মিত হওয়া উচিৎ হবে, কারণ সেই তুলনায় তাদের বানানো পাথরের বাড়ির স্থাপত্য মাঝারী মানের। আর যাই হোক না কেন, সর্বোপরি তাদের বানানো ঘরের চেয়ে চোখ আর অস্থিসন্ধি অনেক বেশী জটিল আর ‘পরিকল্পিত’। তারপরও হয়তো তাদের চোখ আর কনুইয়ের অস্থিসন্ধি আমাদের নিজেদের চোখ এবং কনুই যেভাবে বিকশিত হয়েছে সেভাবেই বিকশিত হয়েছে ভ্রূণ থেকে, মায়ের গর্ভে বিকশিত হয়ে ওঠা এই নির্মাণ প্রক্রিয়ার জন্য আমরা কোনো কৃতিত্ব দাবী করি না, সে কারণে আমরা অযৌক্তিকভাবে আরো বেশী মুগ্ধ আর বিস্মিত হই তাদের বানানো ঘরগুলো দেখে।
প্রসঙ্গান্তরে অনেক কিছু বলার পর, আমি বিস্তারিতভাবে খানিকটা বাড়তি আলোচনা করার প্রলোভন এড়াতে পারছি না, ক্যাডিসদের বানানো বাসা দেখে আমরা যতই মুগ্ধ আর বিস্মিত হইনা কেন, তবুও বেশ ধাঁধার মতই একটি ব্যপার যে, আমাদের নিকটবর্তী একটি প্রাণীর সমরুপ অর্জন দেখে কিন্তু আমরা অপেক্ষাকৃত কম বিস্মিত হই। শুধু কল্পনা করুন কোনো পত্রিকার প্রধান শিরোনাম কি হতে পারে, যদি কোনো সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী আবিষ্কার করেন যে ডলফিনের কোনো একটি প্রজাতি অনেক বড়, জটিল বুনানিসহ মাছ ধরার জাল বানাতে পারে, যার দৈর্ঘ্য বিশটি ডলফিনের সমান! অথচ, মাকড়শার বোনা জটিল জালগুলো আমরা খুব স্বাভাবিক একটি ব্যপার হিসাবে ধরে নেই, পৃথিবীর অন্যতম বিসয় নয় বরং ঘরবাড়িতে সৃষ্ট হওয়া বাড়তি কোনো ঝামেলা হিসাবে। এবং সেই হট্টগোলটির ভাবুন যদি জেন গুডল গমবে স্ট্রিম থেকে এমন কোনো আলোকচিত্র নিয়ে ফিরে আসেন, যেখানে বন্য শিম্পাঞ্জিকে দেখা যায় নিজেদের জন্য ছাদসহ এবং পরিবেশ থেকে সুরক্ষিত করে সুন্দর বাড়ি বানাচ্ছে, খুব কষ্ট করে পাথর নির্বাচন করে, তারপর একটার পর একটা সাজিয়ে সিমেন্ট সদৃশ কিছু দিয়ে সেগুলো পরস্পর সংযুক্ত করছে! কিন্তু দেখুন, ক্যাডিস লার্ভা ঠিক সেই কাজটি করছে, যা সামান্য এক ঝলক মুগ্ধ হয়ে তাকানোর চেয়েও আরো বেশী আগ্রহ আমাদের কাছে প্রত্যাশা করে। মাঝে মাঝে বলা হয়, যেন এই সব দ্বিমুখী মানদণ্ডের সমর্থনে, মাকড়শা আর ক্যাডিসরা তাদের ‘ইন্সটিঙ্কট বা সহজাত প্রবৃত্তির মাধ্যমে তাদের এই স্থাপত্য নির্মাণের দক্ষতা অর্জন করে। কিন্তু তাহলেই বা কি আসে যায়? একটি উপায়ে এই সবকিছুই তো তাদের আরো বেশী মুগ্ধ করে তোলে আমাদের কাছে।
