মোটামুটি যা ঘটে তাহচ্ছে, মোট তেরটি দান করার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়, এবং তেরোটির মধ্যে বারোটি, দাতা বাদুড়টি ছিল অভুক্ত বাদুড়টির পুরোনো বন্ধু, যাদের একই গুহা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। তেরটি দৃষ্টান্তের শুধুমাত্র একটিতে আমরা দেখি অভুক্ত বাদুড়কে খাওয়াচ্ছে নতুন বন্ধু, এবং তাদের একই গুহা থেকে সংগ্রহ করা হয়নি। অবশ্যই বিষয়টি কাকতালীয় কোনো ব্যপার হতে হবে, কিন্তু আমরা এমন কিছু ঘটার বিরুদ্ধে সম্ভাবনাটা পরিমাপ করতে পারি। সেই সম্ভাবনার পরিমান প্রতি ৫০০ বারে একবার। সুতরাং যথেষ্ট নিরাপদ এমন কোনো উপসংহারে পৌঁছানো বাদুড়রা আসলেই পক্ষপাতদুষ্ট তাদের পুরোনো বন্ধুদের খাওয়ানোর ব্যপারে, যখন তারা অন্য গুহা থেকে আসা অপরিচিত আর প্রাকপরিচিত বাদুড়ের মধ্যে কাকে খাদ্য দান করবে এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।
ভ্যাম্পায়াররা দারুণ দক্ষ নানা কল্পকাহিনীর জন্ম দেবার জন্য। ভিক্টোরীয় গথিক ভাবনার অনুসারীদের কাছে তারা হচ্ছে সেই অন্ধকারের শক্তি যারা রাতকে সন্ত্রস্ত করে রাখে, জীবনের প্রাণশক্তিকে শুষে খায়, নিরপরাধ মানুষকে বিসর্জন দেয় শুধুমাত্র তার তৃষ্ণা নিবারণ করার জন্য। এটাকে যুক্ত করুন ভিক্টোরীয় যুগের আরেকটি কল্পকাহিনীর সাথে, দাতে ও নখরে সজ্জিত হিংস্র প্রকৃতি এবং ভ্যাম্পায়াররা স্বার্থপর জিনের এই পৃথিবীর সম্বন্ধে আমাদের গভীরতম ভয়েরই পুনরুজ্জীবিত রুপ নয় কি? আমার ক্ষেত্রে, আমি সব পুরাণ কাহিনীর ব্যাপারেই সন্দিহান। যদি আমরা তাদের জানাতে চাই সত্য কোথায় অবস্থান করছে সুনির্দিষ্ট উদাহরণগুলোতে, আমাদের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। ডারউইনীয় ব্যাখ্যার বিশাল ভাণ্ডার আমাদের যা দিচ্ছে সেটি কোনো একটি নির্দিষ্ট জীব সম্বন্ধে আমাদের বিস্তারিত প্রত্যাশা নয়। এটি আমাদের আরো সূক্ষ্মতর কিছু প্রদান করে এবং আরো মূল্যবান– একটি মূলনীতিকে বোঝার ক্ষমতা। কিন্তু যদি পুরাণ কাহিনীকে এক্ষেত্রে আমাদের অনুভব করতেই হয়, ভ্যাম্পায়ারদের সম্বন্ধে সত্যিকার তথ্য একটি ভিন্ন নীতিকথা আমাদের শেখাতে পারে। বাদুড়দের নিজেদের ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র রক্তই পানির চেয়ে ভারী নয়, তারা আত্মীয়তার বন্ধনকে অতিক্রম করতে পারে, তাদের নিজস্ব অনুগত রক্ত-নির্ভর ভাতৃত্বের গোত্র গড়ে তুলতে পারে। একটি স্বস্তিকর নতুন পুরাণের ভ্যানগার্ড হতে পারে ভ্যাম্পায়াররা, ভাগাভাগি করে নেবার পুরাণ, পারস্পরিক সহযোগিতার একটি সম্পর্ক, তারাই সূচনা করতে পারে প্রসন্ন আর কল্যাণময় সেই ধারণাটি, এমনকি যখন স্বার্থপর জিনের হাতে রাশ ধরা থাকে, ভালোরা সফল হতে পারে।
১৩. জিনের দীর্ঘ হাত
অধ্যায় ১৩ : জিনের দীর্ঘ হাত
অস্বচ্ছন্দ একটি টানাপোড়েন স্বার্থপর জিন তত্ত্বের কেন্দ্রীয় প্রস্তাবটির ধারণায় একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরী করে। এটি হচ্ছে জীবনের মৌলিক এজেন্ট হিসাবে জিন এবং একক প্রজাতি সদস্যদের শরীরের মধ্যকার টানাপোড়েন। একদিকে আমাদের সামনে স্বতন্ত্র ডিএনএ অনুলিপনকারীদের বিস্ময়কর ছবি, শামোয়া হরিনের মত লাফিয়ে লাফিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যা হস্তান্তরিত হচ্ছে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই, মুক্ত, সাময়িকভাবে যাদের একই জায়গায়। জড়ো করে ব্যবহারের-পর-পরিত্যাগ করার মত শরীর নামের সারভাইভাল মেশিনগুলো। অমর সেই কুণ্ডলী, নিজেদের জন্য পৃথক একটি অনন্তকাল রচনা করার লক্ষ্যে অশেষ ধারাবাহিকতায় ক্রম প্রবাহমান মরণশীল জীব শরীর সে রদবদল করে। আর অন্যদিকে আমরা একক প্রজাতি সদস্যদের শরীরের দিকে তাকাই এবং তাদের প্রত্যেকটি, সুস্পষ্টভাবে একটি সঙ্গতিপূর্ণ, পূর্ণাঙ্গ, সুসংহতভাবে সামগ্রিক, অতিমাত্রায় জটিল কোনো যন্ত্র, যা সুস্পষ্টভাবে উদ্দেশ্যপুরণে একীভুত হয়ে আছে। কোনো শরীরকে ‘দেখলে মনে হয়না তারা যুদ্ধরত জিনগত এজেন্টদের একটি শিথিল এবং সাময়িক কোনো জোট, শুক্রাণু বা ডিম্বাণুতে সওয়ার হয়ে পরবর্তীতে বিশাল জিনগত ডায়াস্পোরার অংশ হবার আগে যাদের একে অপরের সাথে পরিচিত হবার সময় নেই বললেই চলে। এর একটি একক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের প্রতি একাগ্র মনের মস্তিষ্ক আছে, যা একটি লক্ষ্য অর্জনে হাত-পা এবং অনুভব করার ইন্দ্রিয়গুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার সমন্বয় সাধন করে। শরীর দেখতে এবং আচরণে তার নিজের যোগ্যতায় যথেষ্ট বিস্ময়কর একটি এজেন্ট।
এই বইয়ের কিছু অধ্যায়ে আমরা আসলেই কোনো একটি একক জীবকে এজেন্ট হিসাবে ভেবেছিলাম, যারা তাদের সব জিনগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সফলতা নিশ্চিৎ করার চেষ্টা করছে। আমরা কল্পনা করেছি, বিভিন্ন পদক্ষেপের সম্ভাব্য জিনগত সুবিধাগুলো নিয়ে একক জীব সদস্যরা জটিল অর্থনৈতিক “কি হতে পারে যদি’ হিসাব নিকাশ করছে। এছাড়া অন্য অধ্যায়ে জিনদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মৌলিক যুক্তিটিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। জিনদের দৃষ্টি দিয়ে জীবনের দৃশ্য ব্যতীত সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই, কেনই বা কোনো জীব তার নিজের ও তার নিকটাত্মীয়দের প্রজনন সাফল্য নিয়ে চিন্তা করবে বরং, যেমন ধরুন, তার নিজের দীর্ঘায়ু হবার কথা চিন্তা করা বাদ রেখে।
