আরেকটি অদ্ভুত উদাহরণ যা প্রকৃতিতে এই টিট ফর ট্যাট বন্দোবস্তের মত, একটি উভলিঙ্গ মাছের মধ্যে সেটি আবিষ্কার করেছিলেন এরিক ফিশার– সি ব্যাস। আমাদের ব্যতিক্রম, তাদের ভ্রূণাবস্থায় ক্রোমোজোমের মাধ্যমে এই মাছগুলোর লিঙ্গ নির্ধারিত হয় না। বরং প্রতিটি মাছই স্ত্রী এবং পুরুষ দুটি ভূমিকাই পালন করতে সক্ষম। সন্তান জন্ম দেবার কোনো একটি পর্বে তারা হয় ডিম পাড়ে অথবা শুক্রাণু নিঃসরণ করে। তারা সাধারণত একগামী সম্পর্কের জোড় বাধে, এবং পালাক্রমে পুরুষ ও স্ত্রী সদস্যের ভূমিকা নেয়। এখন, আমরা একটি ধারণা করতে পারি যে কোনো একটি একক সি ব্যাস মাছ, যদি পার পেতে পারে, প্রতিবারই এটি পুরুষের ভূমিকা পালন করতে পছন্দ করবে, কারণ এখানে পুরুষের ভূমিকাটা অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ বা শক্তি ব্যবহারের হিসাবে অপেক্ষাকৃতভাবে কম ব্যয়সাধ্য। অন্যভাবে বিষয়টি বললে, কোনো একটি মাছ যে কিনা তার সঙ্গীকে রাজী করাতে পারবে বেশীর ভাগ সময় নারীর ভূমিকা নেবার জন্য, সে ডিমের জন্য ‘তার (স্ত্রী) করা সব অর্থনৈতিক বিনিয়োগের সুফল পাবে, একই সাথে তার (পুরুষ) উদ্বৃত্ত সম্পদ থাকবে অন্যান্য নানা জিনিসে সেটি বিনিয়োগ করার জন্য, যেমন অন্যান্য মাছের সাথে প্রজনন।
বাস্তবিকভাবে ফিশার যা পর্যবেক্ষণ করেছেন তা হলো মাছগুলো একটি কঠোর নিয়মমাফিক পালাক্রমে এই দায়িত্ব পালনের পদ্ধতিটি অনুসরণ করে। এটাই ঠিক আমাদের আশা করা উচিৎ যদি তারা ‘টিট ফর ট্যাট’ গেম খেলে থাকে। এবং এটিও সম্ভব যে তাদের সেটি করা উচিৎ, কারণ দৃশ্যতই মনে হয় এটি একটি সত্যিকারের প্রিজনার’স ডাইলেমা গেম, যদিও খানিকটা জটিল প্রকৃতির। ‘সহযোগিতার কার্ড খেলা মানে স্ত্রী খেলোয়াড়দের ভূমিকা পালন করা যখন আপনার সেটি করার পালা। কোনো পুরুষের ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করা যখন তার পালা স্ত্রীর ভূমিকা পালন করার, সেটি অসহযোগিতা বা বিশ্বাসঘাতক খেলার সমতুল্য। বিশ্বাসঘাতকতার সম্ভাবনা থাকে বদলার শিকার হবার, সঙ্গী এর পরের বার স্ত্রীর ভূমিকা পালন নাও করতে পারে, যখন সেটি তার করার পালা। অথবা সে (স্ত্রী) পুরো সম্পর্কটি শেষ করে দিতে পারে। ফিশার সত্যি এটি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে মাছের জুটিতে লিঙ্গ দ্বায়িত্ব পালনে অসাম্যতা জুটি ভাঙ্গার প্রবণতা সৃষ্টি করে।
একটি প্রশ্ন সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীরা মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা করেন কেন রক্তদাতারা (কিছু দেশে যেমন ব্রিটেন, যেখানে এর জন্য কোনো মূল্য পরিশোধ করা হয়না) রক্ত দান করেন। আমার মনে হয় যেকোনো অর্থে এখানে খুব কঠিন হবে বিশ্বাস করা যে উত্তরটি আছে সাধারণ বোধগম্য অর্থে ছদ্ম স্বার্থপরতা অথবা পারস্পরিক পরার্থবাদিতায় কিছু পাবার আশায়। এমন নয় যে নিয়মিত রক্ত দাতারা বিশেষ সুবিধা পান যখন তাদের রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন। হয়। এমন নয় যে পরে থাকার জন্য তাদের ছোট সোনালী কোনো স্টার দেয়া হয়। হয়তো আমি খানিকটা অবুঝ, কিন্তু আমি এটিকে সত্যিকারের বিশুদ্ধ, নিঃস্বার্থ পরার্থবাদের একটি উদাহরণ হিসাবে দেখার জন্য প্ররোচিত হবার তাড়না অনুভব করছি। তবে সেটি যাই হোক না কেন, ভ্যাম্পায়ার বাদুড়দের মধ্যে রক্ত ভাগাভাগি মনে হয় অ্যাক্সেলরডের মডেলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয় বেশ ভালোভাবে। আমরা এটা জানতে পারি জি, এস. উইলকিনসনের গবেষণা থেকে।
ভ্যাম্পায়ার বাদুড়রা, যেমন ভ্যাম্পায়াররা সুপরিচিত, রাতের বেলায় রক্ত পান করে। এবং খাওয়া পাওয়া তাদের জন্য খুব একটা সহজ কাজ নয়, কিন্তু যদি তারা পায় সেটি সাধারণত বেশ বড় কোনো শিকার হয়। যখন ভোর হয়, বাদুড়ের পালে কিছু সদস্যের ভাগ্য তেমন ভালো থাকেনা, তারা ফিরে আসে পুরোপুরি খালি পেটে, কিন্তু সেই সব বাদুড়রা রাতে যারা শিকার খুঁজে পেয়েছিল তাদের সম্ভাবনা থাকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশী পরিমান রক্ত চোষার। পরবর্তী কোনো রাতে ভাগ্যের চাকা অন্যদিকে ঘুরতে পারে। সুতরাং পারস্পরিক সহযোগিতার মত প্রতিশ্রুতিশীল বিষয়টি এখানে কাজ করে বলে মনে করা হয়। উইলকিনসন দেখেছিলেন, যে সদস্যরা বেশী ভাগ্যবান কোন একটি রাতে তারা আসলেই মাঝে মাঝে রক্ত দান করে তাদের অভুক্ত সদস্যদের, কাজটি করে তারা তাদের পাকস্থলী থেকে রক্ত উগরে দেবার মাধ্যমে, যেন তাদের অপেক্ষাকৃত কম ভাগ্যবান কোন সদস্য সেটি পান করতে পারে। উলকিনসন যে সংখ্যক এভাবে রক্ত উগরিয়ে দেবার ঘটনা দেখেছেন তাদের ৭৭ টি খুব সহজেই বোঝা সম্ভব মা বাদুড়দের তাদের সন্তানদের খাওয়ানোর ঘটনা হিসাবে, কিন্তু আরো অনেক উদাহরণের ক্ষেত্রে আমরা দেখি এই রক্ত ভাগ করার সাথে জড়িত তাদের জিনগত আত্মীয় এমন সদস্যরা। কিন্তু তারপরও কিছু রক্ত ভাগাভাগি করার উদাহরণ আমরা দেখি, সেটি ঘটে আত্মীয় নয় এমন বাদুড় সদস্যদের মধ্যে। এই সব ঘটনাগুলোয় ‘রক্ত পানির চেয়ে ভারী’ ব্যাখ্যা বাস্তব সত্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণভাবে এখানে যে সদস্যদের মধ্যে আমরা রক্ত ভাগাভাগি হতে দেখি তাদের প্রায়শই একই জায়গায় ঘুমায় বা বিশ্রাম নেয় বা রুষ্টমেট। তাদের একে অপরের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করার সম্ভাবনা আছে বারবার, যেমনটি দরকার পুনরাবৃত্তি হওয়া প্রিজনার’স ডাইলেমা গেমের মত কোনো পরিস্থিতি হবার মত। কিন্তু প্রিজনার্স ডাইলেমার অন্য শর্তগুলো কি পূরণ হয়? নীচের মূল্য পরিশোধের ছকটি (ছবি ৪) দেখতে হবে সেকরম যদি তারা প্রিজনার’স ডাইলেমা গেমটি খেলে আমরা যেমনটি প্রত্যাশা করছি।
বিশেষ করে, এই সব বাদুড়গুলো কি একে অপরকে আলাদা বাদুড় হিসাবে চিনতে পারে? উইলকিনসন একটি পরীক্ষা করেছিলেন বন্দী বাদুড়দের নিয়ে, প্রমাণ করেছিলেন তারা সেটি করতে পারে। মূল ধারণাটি ছিল এক রাতের জন্য একটি বাদুড়কে সরিয়ে ফেলা হয়, তাকে না খাইয়ে রাখা হয় যখন বাকী সবাই খাবে। এই দুর্ভাগা ক্ষুধার্ত বাদুড়টিকে এরপর তার বিশ্রাম করার স্থানে রেখে আসা হয়। এবং উইলকিনসন লক্ষ রাখেন, কে, যদি কেউ, একে খাদ্য দান করে। এই পরীক্ষাটি যদি বহুবার পুনরাবৃত্তি করা হয়, প্রতিটি বাদুড় পালাক্রমে অভুক্ত শিকার হিসাবে তাদের দ্বায়িত্ব পালন করে। মূল বিষয়টি হচ্ছে এই বন্দী বাদুড়দের জনগোষ্ঠী দুটি পৃথক গ্রুপের মিশ্রণ। যাদেরকে এমন গুহা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে যার মধ্যে দুরত্ব বহু মাইলের। যদি ভ্যাম্পায়াররা সক্ষম হয় তাদের বন্ধুদের শনাক্ত করতে, তাহলে পরীক্ষামূলকভাবে অভুক্ত রাখা বাদুড়গুলোকে দেখতে পাওয়া উচিৎ শুধুমাত্র খাওয়া পাচ্ছে তাদের মূল গুহায় বাসকারী সদস্যদের দ্বারা।
